কল্যাণ নীচু গলায় বললেন, শুধু চা, আর কিছু না…
শীলা বাচ্চাটাকে খানিকটা টানা-হাচড়া করে খানিকটা ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে গেল। তবে যাবার আগে দুরন্ত ছেলেটা বন্দুক ছাড়াও বেশ কয়েকটা খেলনা বগলদাবা করে নিয়ে গেল।
বসবার ঘরে এখন শুধু ওঁরা দুজন। কোনও কথা নেই, কোনও শব্দও নেই।
কল্যাণ ঘরটাকে খুঁটিয়ে দেখছিলেন। সুদৃশ্য ছিমছাম। দুটো সোফা, একটা ডিভান, বুক সেলফ, গ্লাসটপ, ছোট টি-টেবল। দেওয়ালে টাঙানো একটা গ্রুপ ফটো, আর একটা মধুবনী ছবি কাপড়ে সুতোর কাজ করে আঁকা। টিভিটা ডানদিকের দেওয়াল ঘেঁষে চাকাওয়ালা টেবিলে বসানো। আর তার খানিকটা দূরেই একটা বুককেসের ওপরে টেলিফোন। তার পাশে নতুন টেলিফোন ডিরেক্টরি।
অচিন্ত্যর ছবি কোথায়? কোথায় সেই থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, যাকে আমি এত কাঠখড় পুড়িয়ে দেখতে এসেছি।
অচিন্ত্যর কোনও ছবি বাঁধিয়ে রাখেননি? ঘরের চারপাশ দেখতে দেখতে বললেন কল্যাণ। তাঁর কথায় প্রশ্নের সুরটা খুব হালকা শোনাল।
বেডরুমে আছে। ছোট্ট করে জবাব দিলেন মিসেস ব্যানার্জি, আর ওই গ্রুপ ফটোটা– ওদের অফিসে তোলা–ওতেও আছে।
বিধবা মহিলাকে ভালো করে জরিপ করলেন কল্যাণ। লম্বাটে ফরসা মুখ। টানা ভুরু। আলতো খোঁপা করা চুল। রগের পাশে একটা কি দুটো রুপোলি সুতো। লম্বা নাক। চোয়ালের রেখা স্পষ্ট। চোখে সরু কালো ফ্রেমের চশমা। অনেকটা যেন দিদিমণি-দিদিমণি চেহারা। কিন্তু কাছাকাছি এসে বসলেই ব্যক্তিত্বের অদৃশ্য কোমল বিকিরণ অনুভব করা যায়।
মিসেস ব্যানার্জির পরনের শাড়িটা সাদা নয়, খুব হালকা আকাশি। তার ওপরে কপালের টিপের মতো অসংখ্য গাঢ় নীল বুটি। সরু পাড়ে রুচিসম্মত নকশা। দেখে মনে হয় না প্রথাগত বিধবা-জীবনযাপন করছেন। নিরামিষ খাওয়াদাওয়া মেনে নিয়েছেন কি না কে জানে!
কল্যাণের কৌতূহল এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
আপনি কী জরুরি কথা বলবেন বলছিলেন…
বোঝা গেল, মিসেস ব্যানার্জি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে চান না। তা ছাড়া কল্যাণ চৌধুরি তার সম্পূর্ণ অপরিচিত।
কল্যাণ নিজেকে মনে মনে নিষ্ঠুর করলেন। গড় দেড় মাসের যন্ত্রণা তিনি একা সয়েছেন। একটু পরেই তিনি আর একা থাকবেন না। তার মনে হল, অচিন্ত্যকে হারিয়ে মিসেস ব্যানার্জির সংসার যতটা সুখী হওয়া সম্ভব ঠিক ততটাই সুখী। কী সুন্দর! যেন স্বচ্ছ স্ফটিকের তৈরি একটা মনোহারি বল–অনেকটা প্রকাণ্ড বুদবুদের মতো। কল্যাণ মনে মনে সেই বলটা শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে লোফালুফি শুরু করলেন।
কল্যাণ উঠে দাঁড়ালেন সোফা ছেড়ে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন গ্রুপ ফটোটার দিকে। ওটার খুব কাছে গিয়ে গভীর মনোযোগে ছবির মানুষগুলোর মুখ দেখতে দেখতে হঠাৎই ঘুরে তাকালেন মিসেস ব্যানার্জির দিকে । এর মধ্যে কে কাজল?
মিসেস ব্যানার্জির মুখে পলকে বিস্ময় ফুটে উঠল, চোয়াল শক্ত হল। একটু সময় নিয়ে তারপর কথা বললেন তিনি, আপনি এঁকে চেনেন না! ফোনে যে বললেন—
চিনি। তবে কখনও সামনা-সামনি দেখিনি। এ-ছবিতে কোন জন? কল্যাণ স্ফটিকের বলটা নিয়ে তখনও লোফালুফি করছেন। যে-কোনও মুহূর্তে শূন্যে ছুঁড়ে দেওয়া বলটা না লুফে হাত সরিয়ে নিলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। বিশ্রী শব্দে মেঝেতে আছড়ে পড়ে সুন্দর বলটা চুরমার হয়ে যাবে।
বাঁদিক থেকে ফোর্থ।
কল্যাণ আবার ফটোর দিকে তাকালেন। বাঁদিক থেকে চতুর্থ জনই সেই তৃতীয় ব্যক্তি।
অচিন্ত্যকে দেখে কল্যাণ কেমন দিশেহারা হয়ে গেলেন। ফটোতে মুখটা মাপে ছোট হলেও স্পষ্ট বোঝা যায়। খুবই সাধারণ চেহারা, কিন্তু চোখ দুটো একেবারে অন্য জগতের কেমন যেন মায়া জড়ানো। যেন বোঝা যায়, এ-চোখের আড়ালে একটা অন্যরকম মন আছে। অসুখী এই মানুষটাকে অজন্তা আদর করে কুড়িয়ে নিয়েছিল। তার অর্থহীন জীবনের একটা মানে খুঁজে পেয়েছিল মানুষটা।
হঠাত্ কল্যাণের এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হল। দুজ্ঞেয় এক জ্বালা তাকে অস্থির করে তুলল। ছবির দিকে চোখ রেখেই তিনি বললেন, মিসেস ব্যানার্জি, আপনার স্বামী যেদিন তমলুকে অ্যাকসিডেন্টে মারা যান, সেদিন ওখানে আরও একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। কাগজে দুটো খবরই বেরিয়েছিল–পড়েননি?
স্ফটিকের বলটা এখন শূন্যে। কল্যাণ ওটা শেষ মুহূর্তে লুফে নেবেন, নাকি হাত সরিয়ে নেবেন?
কল্যাণ ঘুরে দাঁড়িয়ে ফিরে আসছিলেন সোফার দিকে, মিসেস ব্যানার্জিকে দেখছিলেন, তখনই একটা খেলনার হোঁচট খেলেন।
সেই করতাল বাজানো বানরটা। কাত হয়ে পড়ে গিয়ে হঠাৎই করতাল বাজাতে শুরু করেছে। ধাতুর সঙ্গে ধাতুর সংঘর্ষের শব্দ ঘরের চুপচাপ পরিবেশে এলোপাতাড়ি ছুরি চালাতে লাগল।
মিসেস ব্যানার্জি ইতস্তত করে বললেন, কাগজে বেরিয়েছিল? আমার ঠিক খেয়াল পড়ছে না।
কল্যাণ কোনও জবাব না দিয়ে ঝুঁকে পড়ে বানরটা তুলে নিলেন। প্রাণহীন চোখ। ভোম্বলদাস মুখ নিয়ে বানরটা করতাল বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছেই। বোধ হয় ওটার ভেতরে কিছুটা দম তখনও ছিল।
করতালের শব্দটা খানিকটা ঢিমে হয়ে আসতেই কল্যাণ চাবি ঘুরিয়ে একেবারে শেষ পর্যন্ত দম দিলেন। কিন্তু বানরটা চুপচাপ রইল। কল্যাণ একটু অবাক হলেন। কী ভেবে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিলেন খেলনাটাকে। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র শব্দে শুরু হয়ে গেল বাজনা। কল্যাণের দিকে শুন্য চোখে তাকিয়ে বানরটা করতাল বাজাচ্ছে। বানরটার পুরু ঠোঁটের কাছে কি এক চিলতে হাসি? কল্যাণের কেমন অস্বস্তি হল। মনে হল, বানরটা করতাল বাজিয়ে তাকে দুয়ো দিচ্ছে।
