.
রাত আটটা নাগাদ লেক গার্ডেন্সে অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির দরজায় কল্যাণ যখন পৌঁছোলেন, বুকের ভেতরে ছুটে বেড়ানো হাউইটা তখনও নেবেনি।
পাড়াটা নির্জন হয়ে গেছে এখন। মাঝারি মাপের গলি দিয়ে পাক-পাক হর্ন বাজিয়ে দুটো সাইকেল-রিকশ চলে গেল। চোখে পড়ল দু-চারজন পথচারী। একটা স্টেশনারি দোকান ঝাঁপ বন্ধ করছিল। দোকানের ভদ্রলোককে ৭৪ নম্বরের কথা জিগ্যেস করতেই উলটোদিকের ছাই-রঙা একটা চারতলা বাড়ি দেখিয়ে দিলেন। বাড়িটার সামনে একটা ল্যাম্প পোস্ট–তার টিউবলাইট বিকল হয়ে যাওয়ায় একটা উলঙ্গ বা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বাড়ির চারপাশে খাটো পাঁচিল। তারই এক জায়গায় কালো রং করা গ্রিলের দরজা।
ল্যাম্প পোস্টের আলোর নীচে দাঁড়িয়ে দরজা খুললেন কল্যাণ। সামান্য শব্দ হল। কল্যাণ ভেতরে ঢুকলেন, এগোলেন একতলার ফ্ল্যাটের দিকে। তার ছায়া ক্রমেই দীর্ঘ হল।
সিঁড়ির নীচে সরাসরি আলো না পড়ায় লেটার বক্স আর মেইন সুইচগুলো আবছাভাবে দেখা গেল। দু-ধাপ সিঁড়ি উঠে কল্যাণ একতলার ফ্ল্যাটের কোলাপসিবল দরজার মুখোমুখি হলেন। তার পরেই কাঠের দরজা। বন্ধ।
একটা চাপা উত্তেজনা কল্যাণকে কিছুতেই স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। তিনি কাঠের দরজায় বসানো প্লাস্টিকের নেমপ্লেট পড়লেন মিস্টার এ. ব্যানার্জি, মিসেস এস. ব্যানার্জি। অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামটা এখনও মুছে যায়নি। ওঁর নাম মুছে ফেলা বোধ হয় সহজ নয়।
নেমপ্লেটের ওপরেই ম্যাজিক আই। আর তার বাঁদিকে, কাঠের দরজার ফ্রেমে, বসানো কলিংবেলের সুইচ।
দরজার ওপার থেকে কিছু শব্দের টুকরো শোনা যাচ্ছিল। টেলিফোনে যেমন শুনেছেন, প্রায় সেইরকমই।
কল্যাণ কলিংবেলের বোতাম টিপলেন। টুং-টাং করে ইলেকট্রনিক মিউজিক বেজে উঠল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই খুলে গেল কাঠের দরজা। সুন্দর ফরসা গোলগাল চেহারার একটি মেয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে। চোখে কার্বন ফ্রেমের চশমা। পরনে সবুজ কালোয় ছাপা চুড়িদার।
ডান হাতের তর্জনির ডগা দিয়ে চশমাটাকে নাকের গোড়ায় ঠেলে দিয়ে প্রশ্নের দৃষ্টিতে কল্যাণের দিকে তাকাল মেয়েটি।
তুমি কাজলের মেয়ে?
প্রশ্নটা কেমন সহজভাবে বেরিয়ে এল কল্যাণের ঠোঁট চিরে। কল্যাণ নিজেই ভারী অবাক হয়ে গেলেন। একটু আগেই তিনি ভেবেছিলেন, কীভাবে নিজের পরিচয় দেবেন, তারপর মিসেস ব্যানার্জির সঙ্গে পরিচয়ের পালা সেরে…।
মেয়েটি সামান্য হেসে বলল, হ্যাঁ। আপনি?
আমার নাম কল্যাণ চৌধুরি। আজ সন্ধেবেলা আমি ফোন করেছিলাম…
হ্যাঁ, মা বলছিল। কোলাপসিবল দরজা খুলে গেল? আসুন, ভেতরে আসুন–
ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে কল্যাণ ডুবে গেলেন নতুন এক জগতে। অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফেলে যাওয়া ঘর-সংসার তাকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। শব্দ, গন্ধ, অনুভব–সব কিছু তাকে দ্রুত আপন করে নিচ্ছিল। কল্যাণের ভীষণ অবাক লাগছিল। এ তোমার কেমন খেলা, ঈশ্বর!
ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে টিভির শব্দ আরও জোরালো হয়েছে। আর টেলিফোনে শোনা ঠনঠন ধাতব শব্দটার কারণটাও বোঝা গেছে।
ঘরের বাঁদিকের কোণে মেঝেতে প্রচুর খেলনা ছড়ানো। আর খেলনার পুকুরের মাঝে পাঁচ-ছবছরের একটা ফুটফুটে ছেলে বসে আছে। সে একমনে একটা প্লাস্টিকের স্টেনগান ফায়ার করে চলেছে, আর বকবক করে যাচ্ছে আপনমনে।
তার ছড়ানো এলোমেলো খেলনার মাঝে একটা বানর চোখে পড়ল কল্যাণের। খুব সাধারণ সস্তা খেলনা। বানরটার মাথায় টুপি আর পরনে ডোরাকাটা শার্ট ও হাফপ্যান্ট। দুটো ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে। দু-হাতে দুটো পিতলের করতাল। হাত দুটো ফাঁক করে মুখে বিমূঢ় হাসি ফুটিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। চাবি ঘুরিয়ে দম দিলেই শুরু হয়ে যাবে ঠনঠন বাজনা।
বাচ্চাটার কাছাকাছি মেঝেতে বসে কুড়ি-বাইশ বছরের একটি মেয়ে কী যেন সেলাই করছিল। কল্যাণকে ঢুকতে দেখেই উঠে দাঁড়াল।
যে-মেয়েটি দরজা খুলে দিয়েছিল সে ঘরে ঢুকে তাকিয়েছে তার মায়ের দিকে। মা টিভির। কাছ থেকে খানিকটা দূরে একটা সোফায় বসেছিলেন। কল্যাণের দিকে চোখ ফেরাতেই মেয়েটি আলতো করে বলল, কল্যাণবাবু। তুমি আসতে বলেছিলে।
উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রমহিলা। হাত জোড় করে নমস্কার জানালেন কল্যাণকে, বললেন, আসুন…আসুন…
অভ্যর্থনায় ত্রুটি ছিল না, তবে কোথায় যেন উষ্ণতার অভাব ছিল।
ভদ্রমহিলা মেয়েকে বললেন, অনি, দরজাটা বন্ধ করে দাও। তারপর কল্যাণের দিকে তাকিয়ে সামান্য ইতস্তত করে হেসে বললেন, আমার মেয়ে অনমিতা। আপনি বসুন–
অনি দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘরের ডানদিকে দেওয়াল ঘেঁষে রাখা একটা বুক শেলফের কাছে গেল। কয়েকটা বই নিয়ে চলে গেল ভেতরের কোনও ঘরের দিকে। যাবার আগে ছোট্ট করে বলে গেল, আমি পড়তে গেলাম।
কল্যাণ আর একটা সোফায় বসলেন। দেওয়ালে টাঙানো সুদৃশ্য কোয়ার্জ ঘড়িতে আটটার সংকেত বেজে উঠল নানা সুরে। মিসেস ব্যানার্জি টিভিটা অফ করে দিলেন। তারপর খেলনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকা বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার ছেলে নয়ন। খুব দুরন্ত। ওর বাবাকে একেবারে নাজেহাল করে দিত– শেষ দিকে ওঁর গলার স্বরটা সামান্য ধরে গেল।
একটু সময় নিয়ে তারপর আবার কথা বললেন মিসেস ব্যানার্জি, শীলা, তুই নয়নকে ভেতরে নিয়ে যা। এখানে আমরা কথা বলব। নয়নকে অনির কাছে দিয়ে তুই আমাদের একটু চা-টা কিছু দে…
