অনেকক্ষণ পর কল্যাণের নিজেকে ক্লান্ত মনে হল। তৃপ্তির অবসাদ তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দিল। ঘুঘু-ডাকা দুপুরের সেই ঘুমের মধ্যে অজন্তা-ইলোরাকে তিনি স্বপ্নে দেখলেন। তবে অজন্তার মুখটা কেমন অস্পষ্ট অচেনা ঠেকছিল। আর একটা লম্বা কালো ছায়া তেরছাভাবে এসে পড়ছিল অজন্তার সুঠাম শরীরে।
*
কল্যাণ চৌধুরীর ঘুম যখন ভাঙল তখন আকাশ ভগবানের স্লেট। বিছানা ছেড়ে ওঠামাত্রই অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোন নম্বরটা মাথায় ধাক্কা মারল। কিন্তু কল্যাণ সংখ্যাগুলো স্পষ্টভাবে মনে করতে পারছিলেন না।
পরাশর এসে কফি আর বিস্কুট দিয়ে গেল।
হাত-মুখ ধুয়ে কফির কাপে চুমুক দিলেন কল্যাণ। ফোন নম্বরটা দেখে নিয়ে এখুনি ফোন করতে হবে। নিশ্চয়ই মিসেস ব্যানার্জি ফোন ধরবেন। তখন কী বলবেন কল্যাণ?
কফি শেষ করে অস্থির মন নিয়ে টেলিফোনের কাছে চলে এলেন। একটা চিরকুটে লেখা অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোন নম্বরটা একপলক দেখে নিয়ে রিসিভার তুলে বোতাম টিপলেন। তাঁর চোখ চলে গেল অজন্তার ফটোর দিকে। ওর চোখের দৃষ্টি যেন বলতে চাইল, এ-সব কী ছেলেমানুষি করছ!
কল্যাণ চোয়াল শক্ত করে রিসিভার কানে চেপে অপেক্ষা করতে লাগলেন। ও-প্রান্তে। টেলিফোন বাজছিল। কল্যাণের হঠাৎই মনে হল, এই বুঝি অচিন্ত্য নিজেই ফোন ধরে কল্যাণের সঙ্গে কথা বলবেন। থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বারের সঙ্গে ফার্স্ট পারসন সিঙ্গুলার নাম্বারের কথা হবে, বোঝাঁপড়া হবে।
ও-প্রান্তে কেউ ফোন তুলে হ্যালো বলতেই কল্যাণ জিগ্যেস করলেন, ফোর সেভেন থ্রি, এইট সেভেন থ্রি এইট?
হ্যাঁ…বলুন… একটি অল্পবয়েসি মেয়ের গলা। বয়েস বড়জোর চোদ্দো-পনেরো হবে। অচিন্ত্যর মেয়ে নয়তো! নাকি অন্য কেউ!
মিসেস ব্যানার্জির সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। আমার নাম কল্যাণ চৌধুরি। গলা যাতে না কেঁপে যায় সেদিকে খেয়াল রেখেছিলেন কল্যাণ। আর একই সঙ্গে ও-প্রান্তের প্রতিটি শব্দ খুঁটিয়ে শুনতে চাইছিলেন।
একটা চাপা ঠনঠন শব্দ শোনা যাচ্ছিল। অনেকটা করতাল কিংবা খঞ্জনির শব্দের মতো। তার সঙ্গে টিভির অনুষ্ঠানের নানান টুকরো শব্দ মিশে যাচ্ছিল। সেইসব শব্দ ছাপিয়ে মেয়েটি বলল, একটু ধরুন দিচ্ছি।
তারপর মা, তোমার ফোন। কথাটা আলতোভাবে শুনতে পেলেন কল্যাণ। অচিন্ত্যর মেয়েই তা হলে ফোন ধরেছিল!
একটু পরেই মহিলাকণ্ঠ শোনা গেল টেলিফোনে ও মিসেস ব্যানার্জি বলছি–
কণ্ঠস্বর খানিকটা ভারী, একটু যেন পুরুষালি ছোঁয়া–পপ গায়িকাদের মতো। আর প্রচ্ছন্ন হলেও ব্যক্তিত্বটা টের পাওয়া যায়।
নমস্কার মিসেস ব্যানার্জি। আমার নাম কল্যাণ চৌধুরী। আমি..আমি কাজল–মানে, অচিন্ত্যর খুব ক্লোজ…ইয়ে…ছিলাম। শুনলাম ও অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে। আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা বলতে পারলে খুব ভালো হত।
শান্ত গলায় মিসেস ব্যানার্জি জিগ্যেস করলেন, কী কথা?
আমার কথা শোনার পর আপনি কি এমন শান্ত গলায় কথা বলতে পারবেন, ম্যাডাম?
কয়েকটা জরুরি কথা। এগুলো আপনাকে না বলা পর্যন্ত আমি স্বস্তি পাচ্ছি না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর মিসেস ব্যানার্জি বললেন, বলুন, কী বলবেন–
সেকথা টেলিফোনে বলা যাবে না। আপনার সঙ্গে দেখা করে বলতে হবে। ভয় নেই, বেশিক্ষণ নেব না–মাত্র দশ-পনেরো মিনিট।
ওই দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই সবকিছু পালটে যাবে। জানি, সূর্য রোজ যেমন ওঠে তেমনই উঠবে, রোজ যেমন অস্ত যায় তেমনই অস্ত যাবে। কিন্তু তবু, বিশ্বাস করুন, সব কিছু পালটে যাবে।
আপনি কবে দেখা করতে চান, বলুন–
কল্যাণ কণ্ঠস্বর শুনে মিসেস ব্যানার্জির চেহারাটা আঁচ করতে চেষ্টা করছিলেন। ফরসা, লম্বা চওড়া, চোখে রিমলেস চশমা, পরনে সাদা থান, নাকি…?
আপনি যদি আপত্তি না করেন তা হলে আজই সাড়ে সাতটা-আটটা নাগাদ দেখা করতে পারি–
কল্যাণ মনপ্রাণ দিয়ে ঈশ্বর বা যাহোক কাউকে ডাকছিলেন। মিসেস ব্যানার্জি যেন আপত্তি না করেন। আজ রাতেই যেন কল্যাণ ওঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেন, তারপর বলতে পারেন নিজের কথা। অজন্তার মৃত্যুকে ঘিরে এতদিন ধরে জমানো তিলতিল যন্ত্রণা যেন আজ শুকনো ফুলের পাপড়ির মতো ঝরে পড়ে তার বুকের ভেতর থেকে।
অজন্তাকে এ কেমন ভালোবাসা, এ কেমন ঘৃণা! এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে কল্যাণ যেন এক আশ্চর্য মানুষ হয়ে গেছেন।
ঠিক আছে–আসুন। আমাদের ফ্ল্যাটটা চেনেন তো?
কল্যাণের অনুরোধে বাড়ির ঠিকানা, কীভাবে সেখানে পৌঁছোনো যাবে, সবই বলে দিলেন মিসেস ব্যানার্জি। কল্যাণ অন্যমনস্কভাবে ওঁর কথা শুনছিলেন। ঠনঠন ধাতব শব্দটা তখনও একঘেয়েভাবে শোনা যাচ্ছিল।
কথা শেষ হলে ধন্যবাদ জানিয়ে টেলিফোন রেখে দিলেন কল্যাণ চৌধুরি। অজন্তার ফটোর দিকে তাকালেন। তারপর কী ভেবে তাকালেন টেলিফোনের দিকে। এই টেলিফোন সব জানে। অচিন্ত্যর কণ্ঠস্বর কতবার তার বেয়ে এই টেলিফোনে পৌঁছে গেছে তার সব হিসেব ধরা রয়েছে এই যন্ত্রের শরীরে। যে-টেলিফোন নম্বর এত কাঠখড় পুড়িয়ে কল্যাণ হাতে পেয়েছেন সেটা অজন্তার ঠোঁটে হাজির ছিল। অজন্তার সুন্দর ঠোঁটের দিকে তাকালেন কল্যাণ। অচিন্ত্য বেঁচে থাকলে কি এই ঠোঁটজোড়াকে ওষ্ঠাধর বলতেন? অদ্ভুত এক হীনম্মন্যতা কল্যাণকে জড়িয়ে ধরছিল। কোন এক অজানা কারণে নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যাচ্ছিলেন। আর একটা হাউইবাজি এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল বুকের ভেতরে। ভেতরটা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছিল।
