হ্যাঁ…মানে, একটা বিশেষ দরকারে…।
খুব স্যাড ব্যাপার, মশাই। কী বলে যে আপনাকে সান্ত্বনা দেব জানি না। অবশ্য সান্ত্বনা দেবার কোনও মানেও হয় না। আসলে ব্যাপারটা আমাদের কাছে একেবারে আনএক্সপেক্টেড…
হ্যাঁ, কাজলের ব্যাপারটা আমার কাছেও একেবারে আনএক্সপেক্টেড।
অজিত ঘোষ কথা বলেই যাচ্ছিলেন, কিন্তু কল্যাণ কখন যেন লাল মারুতি, দুজন আরোহী, দুর্ঘটনা–এ-সবের কথা ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলেন। ওঁর সংবিৎ ফিরল মিস্টার ঘোষের প্রশ্নে : …আপনি তো একদিনও এলেন না। যাই হোক, বলুন কী দরকার, যথাসাথ্য হেল্প করব।
একটু ইতস্তত করে কল্যাণ বললেন, আচ্ছা..আপনি…অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায় নামে কাউকে চেনেন, মিস্টার ঘোষ?
ও-প্রান্ত থেকে কোনও কথা নেই–অন্তত দশ সেকেন্ড। তারপর ও হ্যাঁ, চিনি। অচিন্ত্য ব্যানার্জি–নিউট্রেন্ড লিমিটেড-এর জেনারেল ম্যানেজার। ওঁর কথাই কি বলছেন?
হ্যাঁ। আপনার সঙ্গে ওনার কীরকম আলাপ?
কেশে গলা পরিষ্কার করলেন অজিত ঘোষ। একটু সময় নিয়ে বললেন, তা…ইয়ে…ভালোই আলাপ ছিল। মানে, উনি..মাসখানেক মাসদেড়েক আগে..মারা গেছেন। মিস্টার ব্যানার্জি আমাদের অফিসে মাঝে মাঝে আসতেন–অফিসের কাজে। ওঁদের কোম্পানির মেইনলি সফটওয়্যার এক্সপোর্টের কাজ। তাই…।
কল্যাণ একবার ভাবলেন, অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে মারা গেছেন সেটা জানতে চাইবেন। তারপর মত পালটালেন। জিগ্যেস করলেন, নিউট্রেন্ড লিমিটেড-টা কোথায়?
২৩৭ উড স্ট্রিট। থার্ড অ্যান্ড ফোর্থ ফ্লোর।
ওই অফিসের ফোন নম্বরটা আমাকে দিতে পারেন?
এক মিনিট।
কিন্তু এক মিনিট শেষ হওয়ার আগেই অজিত ঘোষের গলা পাওয়া গেল আবার : লিখে নিন। টু নাইন ফোর সেভেন জিরো ওয়ান।
কল্যাণ টেলিফোনের পাশে রাখা পেন তুলে নিয়ে নম্বরটা টুকে নিলেন। নম্বরটা পড়ে শোনালেন অজিত ঘোষকে। তারপর ছোট্ট কাছে থ্যাঙ্ক য়ু বললেন।
অজিত ঘোষ ফোন ছেড়ে দেননি। কল্যাণের ধন্যবাদের উত্তরে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, মিস্টার চৌধুরী, আপনার সঙ্গে আমার আলাপ নেই, তবে..অজন্তার সঙ্গে ছিল। ওকে আমি ছোট বোনের মতোই ভালোবাসতাম ।
আমিও ওকে ভালোবাসতাম! হে ঈশ্বর, তুমি তো জানো, আমি ওকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতাম!
–খুব ভালো মেয়ে ছিল। আপনার জন্যেও আমি ফিল করছি। হয়তো আপনাদের বাড়িতে যেতাম… কিন্তু এরকম একটা আনফরচুনেট ব্যাপার..কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াব! তাই শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি। তবে একটা কথা আপনাকে বলি… অজিত ঘোষ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তারপর বললেন, যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। ওসব নাড়াচাড়া করে আর কী লাভ!
কল্যাণ সব শুনছিলেন, কিন্তু কোনও কথা বলেননি। অজিত ঘোষের শেষ কথাটা তিনি পাথরের মূর্তি হয়ে শুনলেন।
অস্বস্তিকর নীরব মুহূর্তগুলো ডিঙিয়ে অজিত ঘোষ আলতো গলায় বললেন, মিস্টার চৌধুরি, আশা করি এই বুড়ো মানুষটার অনুরোধ আপনি শুনবেন। অজন্তার আত্মাকে মিছিমিছি কষ্ট দিয়ে কোনও লাভ আছে! একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল ও-প্রান্তে ও আচ্ছা, রাখছি। কোনও দরকার হলে উইদাউট হেজিটেশান আমাকে ফোন করবেন। অজন্তার ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের অ্যাকাউন্ট ডিপার্টমেন্ট কাগজপত্র সব তৈরি করছে। ওগুলো রেডি হয়ে গেলে আপনি বাড়িতে অফিসিয়াল চিঠি পাবেন।
কল্যাণ আবার ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন নামিয়ে রাখলেন। একটা সিগারেট ধরিয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসলেন। পরিচয়হীন একটা মানুষ ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছে। কল্যাণ বুকের ভেতরে অদ্ভুত ধরনের এক উত্তেজনা টের পাচ্ছিলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার মানুষটি ধীরে ধীরে যেন কাছে এগিয়ে আসছে।
সিগারেটের ধোঁয়ার ফিনফিনে পরদা ভেদ করে ডানদিকের দেওয়ালে নজর গেল কল্যাণের। অজন্তার বড় মাপের ফটোগ্রাফ টাঙানো রয়েছে সেখানে। কী নিষ্পাপ সুন্দর মুখ! ব্যভিচারের কণামাত্রও নেই কোথাও।
হঠাৎই মন খারাপের বাতাস কল্যাণকে ভাসিয়ে দিল। চোখে জল এসে গেল পলকে। সম্পূর্ণ অকারণে অবুঝ বাচ্চা ছেলের মতো ফুলে ফুলে কাঁদতে শুরু করলেন কল্যাণ। এখন তিনি কী চান তা নিজেই জানেন না।
এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অজন্তাকে থেতলে চুরমার করে দিয়েছে। একইসঙ্গে কল্যাণকেও। অজন্তার বাইরেটা, আর কল্যাণের ভেতরটা। অজিত ঘোষ অজন্তার আত্মার কথা বলছিলেন। কেন, কল্যাণের বুঝি আত্মা নেই।
সময় কখন কীভাবে গড়িয়েছে কল্যাণের স্পষ্ট খেয়াল নেই। তবে সংবিৎ ফিরে পেয়েই কল্যাণ শ্লথ পায়ে আবার চলে এসেছেন টেলিফোনের কাছে। অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির ফোন নম্বরটা তার দরকার। তারপর…।
নিউট্রেন্ড লিমিটেড থেকেই অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির ফোন নম্বরটা পাওয়া গেল। অচিন্ত্যর ছোটবেলার বন্ধু, বারো বছর বিদেশে ছিলেন, দেশে ফিরেই ওঁর মৃত্যুসংবাদ পেয়েছেন– এইসব বলতেই আর কোনও অসুবিধে হয়নি। উপরন্তু কাজল নামটাও কল্যাণ একবার ব্যবহার করে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের পরিচয় দিলেন।
ও-প্রান্ত থেকে একজন তরুণী যখন অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোন নম্বরটা উচ্চারণ করছিল আর কল্যাণ সংখ্যাগুলো লিখে নিচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল, তিনি যেন একটা অপার্থিব ভয়ংকর দরজার কম্বিনেশান লকের নম্বর জেনে নিচ্ছেন। সেই দরজার ওপিঠে রয়েছে একটা অন্ধকার ঘর। সেই ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে আছে আবছায়া চেহারার একজন থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার। আর সেই ঘরের অন্ধকারে মৃত্যুর ঠান্ডা বাতাস বইছে।
