ভালোবাসায় যদি পরিণতি না থাকে তা হলে সে কি পূর্ণতা পায় না? সমাজ যে-ভালোবাসাকে স্বীকার করে না, তারই নাম কি ব্যভিচার? তা হলে আমাদের ইচ্ছের কোনও দাম নেই।
আমাদের সংসারী জীবনে তৃতীয়জনের আসাটা কি অন্যায়? আর যদি বা কেউ আসে, তা হলে দ্বিতীয়জনকে কি অস্বীকার করা হয়! আর তৃতীয় জনের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়াটা কি দুর্বল হৃদয়ের রোগলক্ষণ? জানো, নিজের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে করে আমি ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। মনে হচ্ছে, আমি শেষ হয়ে গেছি।
আমাদের ভালোবাসা যদি নিতান্ত শরীরের আকর্ষণই হবে তা হলে কেন তুমি স্পর্শ করলেই আমার গায়ে কাঁটা দেয়, কেন তোমাকে দেখামাত্রই বুকের ভেতরে একটা বাচ্চা ছেলে খুশিতে তিনতলার সমান লাফিয়ে ওঠে, কেন আনন্দে আমার চোখে জল এসে যায়!
অজন্তা, চৈত্র মাসে আমাদের প্রথম দেখা হয়নি, তবে সর্বনাশ দেখেছিলাম পরস্পরের চোখে। বুঝলে, সর্বনাশ বোধ হয় মাসের তোয়াক্কা করে না।
তীব্র রোদে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল কল্যাণের, কিন্তু তিনি নিজেকে কষ্ট দিতে চাইছিলেন। তার মাথার ভেতরে ঝড় উঠেছে। সব কিছু এলোমেলো ছত্রখান হয়ে যাচ্ছে। কাজলের পরিচয় না জানা পর্যন্ত এ ঝড় বোধ হয় থামবে না। তবে এটা বোঝা যায়, অজন্তা আসার পর কাজলের জীবনের মনে অনেক পালটে গেছে। কল্যাণের এই ধারণার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে কাজলের আর একটা চিঠিতে ও চরণতলে পড়ে ছিলাম সরল অভিমানে,/আদর করে কুড়িয়ে নিলে, জীবন পেল মানে,/ একথা আর কেউ জানে না, যে জানে সে জানে।
একটা মৃত মানুষের অশরীরী অস্তিত্বের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে লড়াই করতে করতে কল্যাণ ক্রমেই যেন অবসন্ন হয়ে পড়ছিলেন। এই অর্থহীন বাড়তি জীবনটাকে নিয়ে কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। এরকম এক অসহায় মুহূর্তে কল্যাণ ঠিক করে ফেললেন, তিনি তমলুক যাবেন। সেখানে গিয়ে যে করে-তোক খুঁজে বের করবেন ওই মারুতি গাড়ির নম্বর। আর সেই নম্বরের সূত্র ধরে কলকাতার মোটর-ভেহিকলস-এর দফতর থেকে বের করবেন গাড়ির মালিকের নাম-ঠিকানা। সেই নাম-ঠিকানাই যে কাজলের নাম-ঠিকানা সেটা শতকরা নিরানব্বই ভাগ হলফ করে বলা যায়। তারপর…।
তারপর কী? হা ঈশ্বর! তারপর কী করবেন কল্যাণ!
এইরকম একটা মনের অবস্থা নিয়ে পরদিন তমলুক রওনা হয়ে গেলেন কল্যাণ চৌধুরী।
.
অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। ৭৪, লেক গার্ডেন্স, কলকাতা ৭০০০৪৫।
একটা ছোট্ট চিরকুটে লেখা অক্ষরগুলো বারবার পড়ছিলেন কল্যাণ। থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বারের পোশাকি নাম আর ঠিকানা। গত উনিশ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল।
গাড়ির নম্বর জোগাড় করতে গিয়ে দুর্ঘটনার প্রায় গোটা এলাকাটাই একরকম চষে ফেলেছেন কল্যাণ। সাধারণ মানুষের কাছে তিন দিন ধরে একটানা অনুসন্ধানের এই পরিশ্রম হয়তো অমানুষিক, তবে কল্যাণের মতো ভূতে পাওয়া মানুষের কাছে কিছুই নয়। তৃতীয় দিনের মধ্যে অন্তত তিনজনের কাছ থেকে গাড়ির নম্বরটা পেয়েছেন কল্যাণ ও ডব্লিউ. এন. সি. ১২৩। তারপর বাকি পনেরো ষোলো দিনে নম্বর থেকে মালিকের নাম-ঠিকানা।
কিন্তু কী করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এই অচিন্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়েরই ডাকনাম কাজল? এই নামটাই ওঁদের জীবনে তৃতীয় নাম?
অনেক চিন্তাভাবনার পর কল্যাণ ঠিক করলেন অজন্তার অফিসে একবার ফোন করবেন। অজন্তা গল্প করতে করতে অফিসের দু-চারজন সহকর্মীর নাম প্রায় বলত? যেমন, ঘোষদা, জিতেনবাবু, সলিলদা, সরকার সাহেব। এর মধ্যেই ঘোষদাই বোধহয় ওর খুব কাছাকাছি ছিলেন। কিন্তু…।
একটা লোহার ডাইসে কল্যাণের মাথাটা চোপে ধরে কেউ বোধ হয় হাতল ঘোরাচ্ছিল। মড়মড় করে শব্দ হচ্ছিল। ধীরে ধীরে শেষের খুব কাছে এগিয়ে যাচ্ছিলেন কল্যাণ। এক ঝটকায় অবসন্ন শরীরটাকে চেয়ার থেকে তুলে নিয়ে কল্যাণ টেলিফোনের কাছে চলে গেলেন। টেলিফোনের পাশে রাখা ছোট্ট টেলিফোন-বই দেখে অজন্তার অফিসের ফোন নম্বরটা মুখস্থ করে নিলেন। তারপর কাঁপা হাতে পুশ বাটনগুলো টিপে দিলেন একে একে।
গুড মর্নিং, কম্পিউটেক লিমিটেড। অপারেটরের মিহি পেশাদারি গলা ভেসে এল।
একটু সময় নিয়ে কল্যাণ বললেন, একটু…একটু সফ্টওয়্যার ডিভিশনে দেবেন।
ধরুন দিচ্ছি–
সঙ্গে সঙ্গে প্রতীক্ষার ইলেকট্রনিক মিউজিক বাজতে শুরু করল টেলিফোনে। অপেক্ষা করতে করতে বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত চাপ অনুভব করছিলেন কল্যাণ। কীভাবে কথাগুলো বলবেন সেটা মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। যদি কোনও কারণে ঘোষদা অফিসে না থাকে তা হলে জিতেনবাবু, সলিলদা, সরকার সাহেব–যাকে পাবেন তাকেই জিগ্যেস করবেন।
হঠাৎই মিউজিক থেমে গিয়ে শোনা গেল ।
হ্যালো, সফ্টওয়্যার ডিভিশন—
চমকে উঠে তাড়াতাড়ি কথা বললেন কল্যাণ, মিস্টার ঘোষ আছেন?
এক মিনিট ধরুন, দিচ্ছি।
কল্যাণের বুক ঠেলে একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল। যাক, ঘোষদা তা হলে আছেন।
হ্যালো, অজিত ঘোষ স্পিকিং ভারী কণ্ঠস্বর শোনা গেল। তবে কেন যেন মনে হয়, এই কণ্ঠস্বরের মালিকের ওপর আস্থা রাখা যায়।
আমি..আমি কল্যাণ চৌধুরি বলছি। আপনার কোলিগ অজন্তা চৌধুরির হাজব্যান্ড। মানে, আমাকে আপনি ঠিক…বোধহয়…চিনবেন না।
বুঝেছি। অজিত ঘোষ আশ্বাসের গলায় বললেন, আর্কিটেক্ট কল্যাণ চৌধুরি, তাই তো?
