তালুকদার খোলা ফাইলটা শব্দ করে বন্ধ করে কল্যাণের চোখে সরাসরি তাকালেন। তার নজরে স্পষ্ট বিরক্তি। একটা জলের মতো সহজ ব্যাপার কেউ বুঝতে না পরলে যে ধরনের বিরক্তি হওয়া স্বাভাবিক।
ছোট ছোট চোখের কোণে সামান্য হাসি ফুটিয়ে তুললেন বিনয় তালুকদার, বললেন, মিস্টার চৌধুরি, আপনি কি এখনও ছেলেমানুষ সেজে বসে থাকবেন! বলুন তো মশাই, ওই লোকটার নাম ধাম জেনে আপনার কী লাভ!
কল্যাণ জেদি সুরে বললেন, ওই লোকটার জন্যে আমার স্ত্রী মারা গেছে।
তালুকদার শ্বাস ফেলে চোখ বুজে মাথা নাড়লেন। তারপর খানিকটা খোঁচা দিয়ে বললেন, ওই লোকটার জন্যে আপনার বউ মারা গেছে! আপনি এখনও বোঝেননি ওরা গাড়ি নিয়ে কোথায় যাচ্ছিল..কেন যাচ্ছিল?
কল্যাণকে একটু সময় দিলেন তালুকদার। যখন দেখলেন কল্যাণ কোনও উত্তর দিচ্ছেন না, তখন বললেন, মিস্টার চৌধুরী, এটা সুইসাইড বা মার্ডার কেস নয়–প্লেন অ্যাকসিডেন্ট। সুতরাং এ-নিয়ে আর ফালতু মাথা ঘামাবেন না। শুধু শুধু খুঁচিয়ে স্ক্যান্ডাল করে লাভ কী! সব কিছু যখন মিটে গেছে তখন বাদ দিন। একটা হাই তুলে তালুকদার বললেন, আমরা তো ফাইল ক্লোজ করে দিয়েছি। যান, বাড়ি যান।
শেষ কথাটা রুক্ষভাবে বললেন বিনয় তালুকদার। এবং কথাটা বলেই টেবিলের বাঁদিকে বসা এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথাবার্তায় মনোযোগ দিলেন। অর্থাৎ, কল্যাণ এবার যেতে পারেন।
কল্যাণ অপমানটা টের পেলেন। ঘরের চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন একবার। অন্তত পাঁচ ছজন লোক রয়েছে ঘরে। তাদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই শুনেছে ওঁদের কথাবার্তা। এখন কী করবেন কল্যাণ? তালুকদারকে বাড়তি কিছু বলতে গেলে তিনি যদি একঘর লোকের মাঝখানে অজন্তার ব্যাপারটা নোংরাভাবে খোলাখুলি বলতে শুরু করেন।
কল্যাণ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। কিছু বলবেন না ঠিক করেছিলেন, কিন্তু তবুও তার মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গেল।
ওই লাল মারুতির নম্বরটা আপনারা তা হলে পাননি?
লেজে পা দেওয়া সাপের মতো চকিতে কল্যাণের দিকে মুখ ফেরালেন বিনয় তালুকদার। স্থির চোখে কল্যাণকে কিছুক্ষণ দেখলেন। মানুষটাকে দেখে বোধ হয় মায়া হল তাঁর। তাই ঠান্ডা গলায় শুধু বললেন, না। পাইনি।
ঘোর লাগা মানুষের মতো আনমনা পা ফেলে কল্যাণ চৌধুরি বেরিয়ে এলেন লালবাজার থেকে। চারপাশের যানবাহন মানুষজন কিছুই তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না। একটা আগুনের গোলা তার মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। যে করে তোক ওই লাল মারুতির নম্বরটা তার চাই। তারপর, গাড়ির নম্বরের সূত্র ধরে কাজলের পুরো নাম-ঠিকানা। তারপর…। তারপর যে কী সেটা কল্যাণ নিজেই ভালো করে জানেন না। কাজল আর বেঁচে নেই। অজন্তাও নেই। তা হলে শূন্য ভাগশেষ থেকে কল্যাণ নিজের জন্য নতুন করে আর কোন শূন্যতা তৈরি করবেন!
আশ্চর্য! এতসব স্পষ্ট করে বোঝা সত্ত্বেও কল্যাণের ভেতরে একরোখা একটা আক্রোশ কাজ করছিল। ভূতে-পাওয়া মানুষের মতো কাজলের নাম-ঠিকানা খুঁজে বের করার জন্য ছটফট করছিলেন তিনি–মরণাপন্ন কোনও মানুষ জীবনকে ধরে রাখার জন্য যেভাবে ছটফট করে।
দাদা কত টাইম হয়েছে?
ট্রামরাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে চোখ তুলে তাকালেন কল্যাণ। একজন ভদ্রলোক তার কাছে সময় জানতে চাইছেন। গোলগাল ফরসা চেহারা। সরু গোঁফ। পাতলা চুল। চোখে চশমা। পরনে পরিচ্ছন্ন শার্ট-প্যান্ট। বয়েস কল্যাণের কাছাকাছি। তবে হাতে ঘড়ি নেই।
কাজলকে কি খানিকটা এইরকম দেখতে? মানে, এইরকম দেখতে ছিল. তালগোল পাকিয়ে যাওয়ার আগে?
কল্যাণ অদ্ভুত চোখে ভদ্রলোককে দেখছিলেন। এই মুখের ছবিটাকে একটু-আধটু ঠিকঠাক করে নিলে কি কাজলের মুখটা পাওয়া যাবে না?
ভদ্রলোক তার প্রশ্নের কোনও উত্তর না পেয়ে ভুরু কুঁচকে কল্যাণের দিকে বিরক্তির দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে হনহন করে পা ফেলে এগিয়ে গেলেন। অকারণে অপেক্ষা করার সময় তার নেই। কিন্তু কল্যাণের আছে। অফুরন্ত অনন্ত সময়। সময় ছাড়া এখন তার হাতে আর কিছু নেই।
পুলিশ যখন ব্যাপারটা নিয়ে সহযোগিতা করবে না, তখন কল্যাণকে একাই কিছু একটা করতে হবে। সেই কিছু একটা কী? যেমন, অজন্তার অফিসে গিয়ে ওর সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা যায়। নানান প্রশ্ন করা যায় অজন্তার আচার-আচরণ নিয়ে। কার সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল অজন্তার, এমনকী অফিসের মিটিং-এ দিল্লি যাচ্ছি বলে কার সঙ্গে দীঘার দিকে বেড়াতে যেতে পারে ও–এ-সব নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে।
কিন্তু সমস্যা একটাই ও কী করে সকলের সামনে তিনি অজন্তার গোপন ভালোবাসার কথা প্রকাশ করবেন! অন্তর্বাস কি চৌরাস্তায় বসে কাঁচা যায়! কাউকে কি বলা যায় কাজলের কথা!
অজন্তাকে একটা ডায়েরি উপহার দিয়েছিল কাজল। চিঠির গোছার নীচেই ছিল ডায়েরিটা। তার প্রথম পৃষ্ঠায় সুন্দর অক্ষরে লেখা আছে দুটি ছত্র ও ব্যক্তিগত বর্ণমালা লিখে যাও গোপন অক্ষরে,/মনচিহ্ন রেখে যাও প্রতিদিন নিজের স্বাক্ষরে।
কল্যাণ কখনও এ-ভাবে কাব্য করে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেননি। তবে…।
অবাক হয়ে কল্যাণ খেয়াল করলেন, কখন যেন তিনি কাজলের সঙ্গে এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন।
পথ চলতে চলতে চিঠিগুলোর নানান অংশ মনে পড়ছিল।
হয়তো আপনাকে সত্যিকারের ভালোবাসব বলেই আর কাউকে এতদিন সত্যিকারের ভালোবাসা হয়নি।
