চিঠিটা খুলে ধরামাত্রই কল্যাণ চৌধুরীর চোখ বিদ্যুতের মতো ছিটকে চলে গিয়েছিল একেবারে শেষের লাইনে–যেখানে লেখকের নাম লেখা আছে। নামটা পড়লেন কল্যাণ ও কাজল। না, এ নামে সেভাবে কাউকে চেনেন না তিনি।
একটা একটা করে বেশ কয়েকটা চিঠি পড়ে ফেললেন কল্যাণ। কোনওটায় তুমি আর কোনওটায় আপনি সম্বোধন। তবে চরিত্র সব চিঠিরই এক। কিন্তু কোনও চিঠি থেকেই লেখকের স্পষ্ট পরিচয়ের কোনও সূত্র বেরিয়ে এল না। শুধু এটুকু অনুমান করা গেল, ভদ্রলোক কোনও একটি কোম্পানির দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন মানে, ছিলেন। বহু চেষ্টা করেও সেই কোম্পানির নাম কিংবা ঠিকানা কল্যাণ আঁচ করতে পারলেন না।
চিঠিগুলো আবার জায়গামতো রেখে দিয়ে আলমারি বন্ধ করে দিলেন কল্যাণ। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি এখন এই চিঠিগুলোর মালিক। অজন্তা দুর্ঘটনার মারা গিয়ে তাকে অনেক জ্বালা, যন্ত্রণা, লজ্জা এবং অস্বস্তির মালিক করে দিয়ে গেছে।
গতকাল দুটো খবরের কাগজে এই দুর্ঘটনার খবর ভারী অদ্ভুতভাবে ছাপা হয়েছে। কাগজের তিনের পাতায় অজন্তার নাম এবং বয়েস দিয়ে চার লাইনের একটি খবর ছাপা হয়েছে। আর তার সামান্য নীচেই ছাপা হয়েছে দ্বিতীয় একটি দুর্ঘটনার খবর। তাতে বলা হয়েছে, তমলুকের একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ভদ্রলোক নিজেই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ট্রাকের সঙ্গে তাঁর গাড়ির মুখোমুখি ধাক্কা লাগে।
বাঃ! চমৎকার! একটা দুর্ঘটনাকে কী অনায়াসে দু-দুটো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনায় দাঁড় করানো হয়েছে! এর পিছনে কোন কারসাজি কাজ করছে কে জানে! এর মধ্যে নিশ্চয়ই পুলিশ অথবা চতুর সাংবাদিকদের হাত রয়েছে। কিন্তু কল্যাণ কিছুতেই ভেবে পাননি, একটা দুর্ঘটনাকে দুটো আলাদা দুর্ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টার কারণ কী!
আবার অন্ধকার বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন কল্যাণ চৌধুরী। অন্ধকার আকাশ, চাঁদ-তারা, আর কয়েকটা গাছের ভৌতিক ছায়ার দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হল, ওরা সবাই তার লজ্জার কথা জানে। কিছু একটা করার জন্য কল্যাণ ভেতরে ভেতরে জানোয়ারের মতো ছটফট করছিলেন কিন্তু কী করবেন! অন্তত ওই খুনি ট্রাক ড্রাইভারটিকেও যদি হাতের কাছে পেতেন।
কল্যাণ প্রায় ছুটে চলে গেলেন রান্নাঘরে। সাদা রং করা ক্যাবিনেটের পাল্লা খুলে স্টেইনলেস স্টিলের একটা চপার বের করে নিলেন। এই মাংস কাটা ছুরিটা খুব একটা ব্যবহার করা হয়নি। কালো ফাইবার গ্লাসের হাতল। ঝকঝকে চওড়া ফলা। তার একদিকে করাতের ধারালো দাঁত।
ছুরিটা ডান হাতের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে আবার বারান্দায় চলে এলেন কল্যাণ। পশুর হিংস্রতায় ছুরিটা ক্ষিপ্রভাবে বসিয়ে দিলেন বারান্দায় শৌখিন কাঠের রেলিং-এ। তারপর এক হ্যাঁচকায় গেঁথে যাওয়া ছুরিটা তুলে নিলেন। এবং দ্বিতীয়বার বসিয়ে দিলেন।
কল্যাণ চোখের সামনে অচেনা ট্রাক ড্রাইভারের নিষ্ঠুর মুখটা দেখতে পাচ্ছিলেন। লোকটার লাল চোখ থেকে আগুন আর মুখ থেকে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। এই লোকটা কল্যাণের জীবন খতম করে দিয়েছে। এই লোকটা না থাকলে কল্যাণ অজন্তার পরকীয়ার কথা জানতে পারতেন না। হয়তো তথাকথিত সুখে কাটিয়ে দিতে পারতেন জীবনের বাকি দিনগুলো। কিন্তু… ।
বারান্দায় রেলিংটাকে কল্যাণ পাগলের মতো কুপিয়ে যাচ্ছিলেন বারবার। চাঁদের আলোয় ভোতা শব্দগুলো পরপর ভেসে যাচ্ছিল। কল্যাণের মুখ থেকে গোঙানির মতো টুকরো কিছু আওয়াজও বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু কল্যাণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। প্রতিশোধ নেবার জন্য একজন শত্রু এই মুহূর্তে তার কাছে খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।
সংবিৎ ফিরে পেলেন পরাশরের ডাকে।
দাদাবাবু–
কল্যাণের হাত থেমে গেল। ভাঙাচোরা মুখে তাকালেন আধো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে থাকা পরাশরের দিকে। তারপর কী যে হয়ে গেল! ছুরিটা ফেলে দিয়ে ক্ষতবিক্ষত রেলিংটাকে আঁকড়ে ধরে চাঁদের আলোয় হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। জীবনটা তার শেষ হয়ে গেলেও কোথায় যেন একটু গ্লানিময় অবশেষ থেকে গেছে।
অজন্তার অকালমৃত্যুর অনুষ্ঠান একেবারে নীরবে শেষ করলেন কল্যাণ চৌধুরী। সেই সময়ে, যখন তার চোখ জলে ভেসে যাওয়ার কথা, তিনি ফুলের মালা, ধূপ আর অজন্তার ফটোর দিকে তাকিয়ে কাজল লোকটার কথা ভাবছিলেন। লোকটার পরিচয় না-জানা পর্যন্ত কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলেন না। সুতরাং সেই মুহূর্তেই তিনি মনে মনে ঠিক করলেন, আগামীকাল থেকেই কাজলের খোঁজ শুরু করবেন।
লালবাজার থেকে যে দুজন অফিসার তার সঙ্গে প্রথম দিন যোগাযোগ করেছিলেন তাদের নাম বিনয় তালুকদার আর অভিজিৎ দাস।
তবে তালুকদারই বরাবর কথাবার্তা চালিয়েছেন কল্যাণের সঙ্গে। তাই শ্রাদ্ধশান্তির ব্যাপারটা মিটে যেতেই কল্যাণ দেখা করলেন বিনয় তালুকদারের সঙ্গে।
আপনারা এখনও জানতে পারেননি, ওই লোকটা কে?
তালুকদার একটা মোটা ফাইল উলটে-পালটে দেখছিলেন। পাখার হাওয়ায় ফাইলের কাগজ উড়ছিল। হাত দিয়ে সেটা ঠিক করে নিয়ে ছোট্ট করে জবাব দিলেন, নাঃ, এখনও পারিনি।
কল্যাণের কেন যেন মনে হল তালুকদার সত্যি কথা বলছেন না। তাই তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া গাড়িটার নম্বর থেকে কোনও খোঁজখবর করেননি আপনারা?
