আপনাকে আমাদের সঙ্গে তমলুক যেতে হবে, মিস্টার চৌধুরি। আপনার স্ত্রীর বডি আইডেন্টিফাই করতে হবে।
অনেক দিন পর একটু বেশি মাত্রায় মদ্যপানের সাধ জেগে উঠল কল্যাণের। অন্ধকার দোতলার বারান্দায় বসে চাঁদ-তারাকে সাক্ষী রেখে গ্লাসে চুমুক দিতে লাগলেন তিনি। গাঢ় গাছপালা আর ঘন নীল ছায়াময় আকাশের দিকে শুন্য চোখে তাকিয়ে ছিলেন। সেখানে অত্যন্ত দ্রুতগামী চলচ্চিত্রের ছবির মতো পরপর ভেসে যাচ্ছিল গত তিন দিনের ঘটনা।
পুলিশের সঙ্গে তমলুক গিয়ে অজন্তার মৃতদেহ–অথবা, বলা যায় মৃতদেহের অবশেষ শনাক্ত করতে কোনও অসুবিধে হয়নি কল্যাণের। মৃতদেহটা বলতে গেলে একরকম তালগোল পাকিয়ে গেছে। কিন্তু মুখটা কোন এক অলীক লীলায় প্রায় অক্ষত থেকে গেছে। দেখে মনে হচ্ছিল, একটু জোরে অজন্তা-ইলোরা বলে ডাকলেই বোধ হয় জেগে উঠবে। আর মুখে কোথাও অপরাধবোধের ছায়া পর্যন্ত নেই।
শুধু মুখ ছাড়াও অনেক কিছু শনাক্ত করেছেন কল্যাণ। পায়ের চটি, কানের দুল, গলার হার, লেডিজ ব্যাগের টুকিটাকি জিনিসপত্র, আরও কত কী! ভেবেছিলেন, এতটুকুও দুর্বল হবেন না, কিন্তু চোখের জলের ফোঁটাগুলো কোথায় লুকিয়ে ছিল কে জানে! সামান্যতম সুযোগেই কল্যাণের চোখ ভাসিয়ে গড়িয়ে পড়েছে গালে। ভালোবাসা বড় নিষ্ঠুর। সুযোগ পেলেই কাদায়।
শনাক্ত করার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা যখন কেটে গেছে, তখন কল্যাণের মনের ভেতরে কৌতূহল ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিল। যে লোকটা গাড়ি চালাচ্ছিল তার মৃতদেহটা কোথায়? সেটারও কি মুখটা অবিকৃত রয়েছে অজন্তার মতো? কল্যাণ কি মুখ দেখলে চিনতে পারবেন লোকটাকে?
অফিসারদের প্রশ্ন করে তিনি জানতে পারলেন, পুরুষ সহযাত্রীটির মৃতদেহ এতই বীভৎসভাবে গুঁড়িয়ে গেছে যে, চেনার কোনও উপায় নেই। তবুও পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, নানান কায়দায় খোঁজখবর করছে।
শূন্য হাতে শূন্য হৃদয়ে কলকাতায় ফিরে এসেছেন কল্যাণ। অফিসে বেরোনো বন্ধ করে দিলেন কিছুদিনের জন্য। শূন্য বাড়িতে তার ভালোবাসার অশৌচ শুরু হয়ে গেল।
অনেক রাত পর্যন্ত মদের গ্লাসে চুমুক দিলেন কল্যাণ।
অজন্তার মৃতদেহ কলকাতায় এসেছে, পোস্ট মর্টেম হয়েছে, তারপর দাহ করা হয়েছে নিমতলা শ্মশানে। উভয়পক্ষের কয়েকজন করে আত্মীয়স্বজনকে সাক্ষী রেখে অজন্তা পুড়ে ছাই হয়েছে। শেষ হয়েছে অসতীদাহ। কিন্তু কল্যাণের বুকের ভেতরটা তখনও জ্বলেপুড়ে যাচ্ছিল।
অজন্তা যে অফিসের মিটিং-এ দিল্লি যাচ্ছি এ কথা বলে গিয়েছিল, সে কথা কাউকে বলেননি কল্যাণ। কেউ জানে না ওঁদের জীবনে অজ্ঞাত সেই তৃতীয় ব্যক্তির কথা। অজন্তা নিশ্চয়ই লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছিল সেই লোকটার সঙ্গে। প্রাপ্তবয়স্ক প্রেম করতেই বোধ হয় ওরা দীঘা রওনা হয়েছিল।
কল্যাণ জানেন, ভালোবাসলে অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করে–সেগুলোই শেষ পর্যন্ত হয়ে যায় প্রেমপত্র। অজন্তার আলমারিতে সেরকম কি কিছু নেই? একটাও কি চিঠি লেখেনি দুর্ঘটনার মরে যাওয়া তালগোল পাকিয়ে যাওয়া ওই লোকটা।
অসহ্য এক জ্বালায় নেশা-টেশা ছেড়ে উঠে পড়লেন কল্যাণ। একটু এলোমেলো পায়ে চলে এলেন শোবার ঘরে পাশাপাশি দাঁড় করানো দুটো স্টিলের আলমারির কাছে। একটা আলমারিতে কল্যাণের জিনিসপত্র, অন্যটায় অজন্তার। গোড়ার দিকে এই ভাগাভাগিটা বজায় ছিল। কিন্তু পরে কিছু কিছু জিনিস এলোমেলোভাবে রাখা হয়ে গেছে। আর তার জন্য কল্যাণ নিজেই দায়ী। কারণ, অজন্তা যতটা গোছানো স্বভাবের, কল্যাণ ঠিক ততটাই অগোছালো।
অজন্তার আলমারির দরজায় দুটো কালো টিপ লাগানো রয়েছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নাতেও এরকম দু-একটা টিপ লাগানো থাকে। ওর ফরসা কপালে কালো টিপ চমৎকার মানাত। কল্যাণ এক লহমার জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।
আলমারিটা খুলতেই হালকা পারফিউমের গন্ধ নাকে এল কল্যাণের। অজন্তা ওর শাড়ি জামাকাপড়ে মাঝে-মাঝেই পারফিউম স্প্রে করে রাখত। পয়জন পারফিউমের গন্ধ খুব ভালোবাসত ও। আলমারির দু-পাল্লা খুলে অনেক সময়, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকত। বুক ভরে সুগন্ধির ঘ্রাণ নিত। গন্ধটা কল্যাণেরও প্রিয় ছিল।
এখন আলমারি খুলতেই পয়জন-এর গন্ধ অন্যরকমভাবে কল্যাণের নাকে এসে ধাক্কা মারল। কল্যাণের গা গুলিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি অনুসন্ধানের কাজ শুরু করলেন তিনি। একটা চিঠিও কি পাওয়া যাবে না?
একটু খোঁজাখুজি করতেই চিঠির গোছাটা পাওয়া গেল। কতকগুলো দামি শাড়ির ভাজের তলায়, আলমারির পিছনের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা ছিল চিঠিগুলো। অনেকগুলো চিঠি–অন্তত কুড়ি পঁচিশটা তো হবেই। তারই একটা টেনে বের করলেন কল্যাণ। লক্ষ করলেন, এক অকারণ উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছে। নিজেকে সি আই এ বা কে জি বি-র গুপ্তচর বলে মনে হচ্ছিল। অথচ কারও হাতে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। অজন্তা নেই, সে-ও নেই।
বোধহয় নিজের কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছিলেন কল্যাণ। এ কদিন যা নিছক আশঙ্কা অথবা অনুমান ছিল এখন আর তা নয়। হাতে এসেছে অকাট্য প্রমাণ। চিঠিটা খামসমেতই রেখে দিয়েছে অজন্তা। খামের ওপরে সুন্দর হাতের লেখায় মিসেস অজন্তা চৌধুরী এবং ঠিকানা লেখা রয়েছে।
কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলেন কল্যাণ। আবেগজর্জর এলোমেলো লেখা। আপনি সম্বোধনে লেখা হলেও প্রেমপত্র বলে চিনে নিতে কোনও অসুবিধে হয় না। আর চিঠির কিছু কথা পড়লে বেশ অনুমান করা যায় ওরা পরস্পরের যথেষ্ট কাছাকাছি এসেছে। হয়তো আরও কাছে আসার জন্য ওরা দীঘা যাচ্ছিল।
