প্রথমজন কোনওরকম ভণিতা না করে সরাসরি বললেন, খুব খারাপ খবর। আপনি মন শক্ত করুন।
দ্বিতীয় জন তখন ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখছেন। তাঁর চোখেমুখে তারিফ করার ছাপ। কল্যাণের ড্রইংরুম সত্যিই প্রশংসা করার মতো। দেওয়াল আর আসবাবে মানানসই রং। এ ছাড়া দুটো অভিনব অয়েল পেইন্টিং আর একটা পিতলের ভাস্কর্য ঘরের সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কল্যাণের বুকের ভেতরে এবার ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। দাঁতে দাঁত চেপে চাপা গলায় তিনি বললেন, বলুন–
অজন্তার নিশ্চয়ই কোনও অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। মনে মনে ভাবলেন কল্যাণ। নাকি দিল্লিতে পৌঁছে এয়ারপোর্ট থেকে কোম্পানির গেস্ট হাউসে যাওয়ার পথে কোনও গ্যাঙের হাতে পড়েছে? কিন্তু অজন্তার বয়েস তো প্রায় তেতাল্লিশ। অবশ্য দেখতে এখনও সুন্দরী। পুরুষদের নজর কাড়তে পারে এখনও। তা হলে কি নির্জন রাস্তায় ওর গাড়ি আটকে কোনও গুন্ডার দল…
মিস্টার চৌধুরি, আপনার স্ত্রী তমলুকের কাছে একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন। প্রথম জনের ভারী কণ্ঠস্বরে কোনও আবেগ নেই। যেন খবরের কাগজের খবর পড়ে শোনাচ্ছেন।
কল্যাণের চোখের সামনে ওঁর শৌখিন ড্রইংরুমটা মুহূর্তের মধ্যে মর্গ হয়ে গেল। বরফের দেওয়ালে ঘেরা একটা ঘরে কল্যাণ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বরফের দেওয়াল থেকে ঘন সাদা ধোঁয়া বেরিয়ে কল্যাণের নাকে-মুখে ঢুকে পড়ছে। কল্যাণের শরীরের ভেতরটা হিম হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
কল্যাণ চৌধুরির মাথা টলছিল। অজন্তা-ইলোরা আর নেই! চারপাশে আর কেউ নেই। কিচ্ছু নেই।
কল্যাণের গলার কাছে অনেক প্রশ্ন এসে জড়ো হল। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন, কথা বলতে গেলেই একরাশ কান্না তাঁকে ভাসিয়ে দেবে। গলায় জমাট বেঁধে ওঠা শক্ত ডেলাটাকে দম বন্ধ করে নিয়ন্ত্রণে রেখে তিনি সর্বহারার ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন।
কতক্ষণ কেটে গেল কে জানে! এক সময় কল্যাণের বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। দু-হাতে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠলেন তিনি। অনেকক্ষণ ধরে তার শরীর থরথর করে কাপল। অফিসার দুজন কল্যাণকে বাধা দিলেন না। পাথরেরর মুখ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
অবশেষে নিজেকে খানিকটা সামলে নিতে পারলেন কল্যাণ। মুখ তুলে প্রথম অফিসারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, কী করে অ্যাক্সিডেন্ট হল?
উত্তরে জানা গেল, হাইওয়ের ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল অজন্তা চৌধুরির গাড়ি। হঠাৎই একটা মালবোঝাই ট্রাক বেসামাল হয়ে গাড়িটাকে মুখোমুখি ধাক্কা মারে। চোখের পলকে সব চুরমার। এবং সব শেষ। ট্রাকের ড্রাইভার এবং খালাসি দুজনেই পালিয়েছে। অজন্তার হাতব্যাগ থেকে কল্যাণের একটা কার্ড পাওয়া গেছে। তাতে ঠিকানা, ফোন নম্বর সবই ছিল। সেই সূত্র ধরেই পুলিশ কল্যাণের সঙ্গে যোগযোগ করতে পেরেছে।
প্রথম জন যখন দুর্ঘটনার ব্যাপারটা বিশদভাবে বলছিলেন, তখনই কল্যাণ একটা ভয়ংকর ধাক্কা খেলেন।
অজন্তা তো অফিসের মিটিং-এ দিল্লি রওনা হয়েছিল! তা হলে তমলুকের কাছে ওর অ্যাক্সিডেন্ট হল কেমন করে! কোথায় দিল্লি, কোথায় তমলুক! কল্যাণের সব কিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। অজন্তা, গাড়ি, তমলুক!
কল্যাণদের গাঢ় নীল মারুতি এখন, এই মুহূর্তে, বাড়ির গ্যারেজেই রয়েছে। তা ছাড়া অজন্তা তো গাড়ি চালাতে জানে না!
ওইরকম একটা ভয়ংকর মানসিক অবস্থার মধ্যেও কল্যাণ বুঝতে পারছিলেন, অজন্তার দিল্লিতে মিটিং-এ যাওয়ার নাম করে রওনা হওয়ার ব্যাপারটা এঁদের বলা যায় না। কাউকে বলা যায় না।
কিন্তু দিল্লির নাম করে, কল্যাণের কাছে মিথ্যে কথা বলে, অজন্তা হঠাৎ তমলুকের দিকে গেল কেন? আর কার গাড়িতে করেই বা ও যাচ্ছিল?
কল্যাণের মনে পড়ল, তমলুকের ওপর দিয়ে তিনি দুবার গেছেন অতীতে। দুবারই অজন্তাকে নিয়ে তিনি দীঘায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। একবার শৌখিন বাসের যাত্রী হয়ে, আর একবার গাড়িতে চড়ে। কল্যাণ নিজেই গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন দীঘায়, সমুদ্রের কাছাকাছি।
অজন্তা কি তাহলে দীঘা যাচ্ছিল? কী কারণে যাচ্ছিল, বেড়াতে? কে চালাচ্ছিল গাড়ি? আর কে কে ছিল ওই গাড়িতে?
কল্যাণ চৌধুরির ভেতরে নানা রকমের ভাঙচুর চলছিল। গাড়িটা কি প্রাইভেট কার, না ট্যাক্সি? ট্যাক্সি ভাড়া করে কলকাতা থেকে কেউ দীঘা যায় না! তা হলে?
অজন্তা ছাড়া আর কে কে ছিল ওই গাড়িতে? কেমন এক শূন্যতার মধ্যে থেকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন কল্যাণ।
আর এক ভদ্রলোক ছিলেন গাড়িতে। উনিই গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
কল্যাণ অবাক চোখে প্রথম অফিসারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। অজন্তা আর এক ভদ্রলোক! কে সে? অজন্তার প্রেমিক? অজন্তা বলত, ওঁদের দুজনের মাঝখানে আর কেউ নেই। তা হলে কে এই লোকটা? থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার?
কল্যাণ এলোমেলোভাবে আরও সব প্রশ্ন করে গেলেন। উত্তরে যেসব কথা তার কানে ঢুকল সেগুলো কেমন বুদবুদের মতো ভেসে উঠে ছড়িয়ে যাচ্ছিল মাথার ভেতরে।
লাল রঙের মারুতি গাড়ি নিয়ে হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল ওরা দুজনে। দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে দুজনেই শেষ। গাড়িটা একেবারে তালগোল পাকিয়ে গেছে। না, ওই ভদ্রলোকের কোনও পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে খোঁজখবর নেওয়ার কাজ চলছে। পুলিশ হাল ছাড়েনি।
