এমন সময় ঘরের এককোণে রাখা টেলিফোন বেজে উঠল।
সোফা ছেড়ে উঠলেন কল্যাণ। টিভি-র ভলিয়ুম কন্ট্রোলের নব ঘুরিয়ে শব্দ কমিয়ে দিলেন। তারপর তাড়াতাড়ি পা ফেলে টেলিফোনের কাছে গিয়ে রিসিভার তুলে নিলেন। টেলিফোনটা আসায় তার ভালো লাগছে। একঘেয়েমির শান্ত পুকুরের জলে কেউ যেন একটা পাথর ছুঁড়ে জল তোলপাড় করার চেষ্টা করছে।
হ্যালো
মিস্টার কল্যাণ চৌধুরি? সল্ট লেক সিটি? একটা ভারী কণ্ঠস্বর নিপ্রাণ গলায় ওপ্রান্ত থেকে প্রশ্ন করল।
অচেনা গলা। সম্পূর্ণ অকারণেই কল্যাণের বুকের ভেতরটা আচমকা টিপটিপ করতে শুরু করল।
হ্যাঁ, আমি কল্যাণ চৌধুরি বলছি। কী হয়েছে? আপনি কে বলছেন? কথা বলতে গিয়ে কল্যাণের গলা কেঁপে গেল।
লালবাজার থেকে বলছি। আপনার ওয়াইফের নাম মিসেস অজন্তা চৌধুরি?
হ্যাঁ। কী হয়েছে অজন্তার?
আপনি বাড়িতে থাকুন। এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা আপনার বাড়ি যাচ্ছি।
কল্যাণ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই ওপ্রান্তের রিসিভার নামিয়ে রেখেছে। ভারী কণ্ঠস্বরের মালিক।
রিসিভার জায়গামতো রেখে দিয়ে ঘরের দেওয়ালে টাঙানো কোয়ার্জ ঘড়ির দিকে তাকালেন কল্যাণ। পৌনে নটা। এক ঘণ্টার মধ্যে ওঁরা আসছেন। কল্যাণের বুকের ভেতরে একটা বড় পাথর নিষ্ঠুরভাবে চুরমার করছিল কেউ। কী হয়েছে অজন্তার!
ভি সি আর-এর সুইচ অফ করে দিলেন কল্যাণ। একই সঙ্গে মনে হল তার ভেতরেও কেউ যেন একটা সুইচ অফ করে দিয়েছে।
অজন্তা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি করে ক্যামাক স্ট্রিটের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি কম্পিউটেক লিমিটেড-এ। আর কল্যাণ আর্কিটেক্ট হিসেবে মোটামুটি নাম করেছেন। সল্ট লেকে এ পর্যন্ত এগারোটা শৌখিন বাড়ি তৈরি করেছেন। তার অফিস কঁকুড়গাছিতে। পাঁচজন স্টাফ নিয়ে ছোট হলেও সফল ব্যবসা।
সুতরাং স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ব্যস্ত থাকেন নিজেদের কাজ নিয়ে। কিন্তু অফিসের বাইরের সময়টুকু একসঙ্গে কাটানো ওঁদের বহুদিনের অভ্যেস। অজন্তাকে প্রায়ই অফিসের মিটিং-এ বম্বে, দিল্লি, মাদ্রাজ করে বেড়াতে হয়। গত তিন বছরে এই মিটিং-এর ব্যাপারটা বেশ বেড়ে গেছে। ফলে অজন্তা না থাকলে কল্যাণ কেমন একা হয়ে যান। গত বাইশ বছরের চেষ্টাতেও ওঁদের দুজনের সংসারে তিনজন হননি। অজন্তা অনেকবার বিশদ ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য বলেছে, কিন্তু কল্যাণ রাজি হননি। বলেছেন, কী হবে ডাক্তারি পরীক্ষা করে, অজন্তা! পরীক্ষার রিপোর্টে জানা যাবে, হয় তুমি দোষী, নয় তো আমি। কিংবা দুজনেই। যদি তুমি বা আমি দোষী হই তা হলে জেনো আমাদের একজন নির্ঘাত ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্সে ভুগবে। আমাদের এতদিনের সুন্দর সম্পর্কে চিড় ধরে যাবে। বাইরে থেকে সেটা বোঝা যাবে না, তবে ভেতরে ভেতরে থাকবে। সুতরাং এই বেশ ভালো আছি, ডার্লিং।
অজন্তা রাজি হয়েছে কল্যাণের প্রস্তাবে। হেসে বলেছে আমরা দুজন ছিলাম, দুজন আছি, দুজনই থাকব। কোনও থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বারের জায়গা নেই এখানে, কী বলো!
কল্যাণ ওকে জাপটে ধরে চুমু খেয়েছেন। বলেছেন, অজন্তা-ইলোরাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।
অজন্তাকে প্রায়ই কল্যাণ মজা করে অজন্তা-ইলোরা বলে ডেকে থাকেন। সেই অজন্তা ইলোরার কোনও বিপদ হল নাকি!
কল্যাণ দোতলার ঘরে-বারান্দায় পায়চারি করছিলেন। বাড়িটা এখন ভূতুড়ে মনে হচ্ছে। রাতদিনের কাজের লোক পরাশর একতলায় ওর ছোট্ট ঘরটিতে বসে নিশ্চয়ই রেডিয়ো শুনছে। ঠিক সাড়ে নটা বাজলেই ও এসে খেতে দেবে কল্যাণকে। রোজকার রাঁধুনি-বউ গীতা এসে রান্না bast করে ফ্রিজে তুলে রেখে গেছে। পরাশর শুধু গরম করে নেবে। কিন্তু কল্যাণের এতটুকু খাওয়ার ইচ্ছা নেই। বারান্দায় ছুটে আসা হালকা বাতাসে অকারণেই তার শীত করছিল।
পরাশর যখন জিগ্যেস করতে এল খাবার দেবে কি না, তখন কল্যাণ সংক্ষেপে শুধু বলে দিলেন, খিদে নেই। তুই খেয়ে শুয়ে পড়। তারপর নিস্তব্ধতার মধ্যে শুধু অপেক্ষা। কখন একতলার কলিংবেলের সুইচে কেউ আঙুল ছোঁয়াবে, আর মিষ্টি সুরে বেজে উঠবে ইলেকট্রনিক ঘণ্টা।
কতক্ষণ পরে কে জানে, একটা গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল, আর তারপরই বেজে উঠল কলিংবেল।
কল্যাণের বুকের ভেতরে হাতুড়ি পড়ল ভয়ঙ্কর শব্দে। প্রায় ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন নীচে। পরাশর দরজা খুলতে যাচ্ছিল। ওকে ইশারায় চলে যেতে বলে কল্যাণ নিজেই সদর দরজা খুলে দিলেন।
দরজার কাছে লাগানো শৌখিন আলোয় একজন শক্তপোক্ত মানুষকে দেখা গেল। চোয়ালের রেখা স্পষ্ট। চৌকো মুখে অভিজ্ঞতার ছাপ। চওড়া গোঁফ। ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল। চোখা নাক। গায়ের রং মাজা।
আমরা লালবাজার থেকে আসছি। আপনি মিস্টার কল্যাণ চৌধুরি?
টেলিফোনে শোনা ভারী গলা চিনতে পারলেন কল্যাণ। কোনওরকমে মাথা নেড়ে ভদ্রলোকের প্রশ্নের জবাব দিলেন। তারপর অস্পষ্ট স্বরে বললেন, আসুন, ভেতরে আসুন–
প্রথম ভদ্রলোককে অনুসরণ করে ফরসা রোগা চেহারার আর একজন মানুষ বাড়ির ভেতরে ঢুকে এল। ওকে হিসেবে ধরেই আমরা শব্দটা ব্যবহার করেছেন প্রথম জন।
কল্যাণের গলা শুকিয়ে আসছিল। কেশে গলা পরিষ্কার করে তিনি ওঁদের নিয়ে এলেন বসবার ঘরে। ওঁরা সোফায় বসামাত্রই কল্যাণ গলা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে জিগ্যেস করলেন, কী হয়েছে। একটু বলবেন?
