একটা ঠান্ডা ভয় আমাকে ক্রেপ ব্যান্ডেজের মতো জড়িয়ে ধরল। তারপর সেই ভয়টা টুইয়ে চুঁইয়ে ঢুকে যেতে লাগল আমার শরীরের ভেতরে।
কী যে হল আমার, আচমকা গাড়ি স্টার্ট করে পাগলের মতো ছুটিয়ে দিলাম।
ধুলো উড়ল, ইঞ্জিনের গোঁ-গোঁ শব্দ হল, ক্ষিপ্র হাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি তুলে নিয়ে এলাম রাস্তায়। তারপর শুধু অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিয়ে রাখলাম। মনে শুধু একটাই চিন্তা ও এখান থেকে যেভাবে হোক পালাতে হবে।
গাড়ি আমার কথা শুনেছে। দেখলাম, সামনের পিচের রাস্তাটা মরিয়া হয়ে ছুটে যাচ্ছে পেছন দিকে।
খোলা জানলা দিয়ে হু-হু করে বাতাস ঢুকছিল। আমার প্রচণ্ড শীত করার কথা, কিন্তু আতঙ্কে শীতের কামড়টা টের পাচ্ছিলাম না।
এই যে বেপরোয়া গাড়ি চালাচ্ছেন–দেখবেন, আবার একটা অ্যাকসিডেন্ট হবে।
কে বলল কথাটা।
চমকে বাঁ-দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখি গাড়ির জানলায় সেই লোকটা। গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে সমান তালে ছুটছে। এক হাতে জানলায় নামানো কাচটা চেপে ধরে আছে।
আমি পাথর হয়ে গেলাম।
গাড়ি ঘণ্টায় অন্তত ষাট-সত্তর কিলোমিটার বেগে ছুটছে। লোকটা এই গতিবেগের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে কী করে! এ যে বেন জনসনকে হার মানায়!
সামান্য হেসে লোকটা বলল, আমরা জিহাদপুরের লোক। অন্যায় দেখলেই আমরা প্রতিবাদ করি। আপনি যে আমার বডির ওপর দিয়ে গাড়িটা চালিয়ে দিলেন, এর বিহিত করবে কে!
আমি কোনও জবাব দিতে পারলাম না। রোবটের মতো গাড়ি ছুটিয়ে চললাম।
লোকটা জানলায় ফ্রেমে আঁটা ছবির মতো গাড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্বিকারভাবে ছুটে চলল। আর একনাগাড়ে ওর প্রতিবাদ জানিয়েই চলল।
জিহাদপুরের লোকদের কাছে অন্যায় জুলুম চলবে না। আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদ করতে জানি। মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের প্রোটেস্ট থামবে না। এমনকী মরে গেলেও আমরা প্রতিবাদ করতে ছাড়ি না–আমাদের জেদ এমন!
লোকটার শেষ কথাটা আমাকে যেন চাবুকের বাড়ি মারল।
মরে গেলেও আমরা প্রতিবাদ করতে ছাড়ি না…। তার মানে!
আমার হাতের কথা স্টিয়ারিং আর শুনল না। পলকে বেসামাল হয়ে গেল। গাড়ির পথটা এলোমেলো হয়ে গিয়ে আমি শেষ পর্যন্ত ধাক্কা মারলাম রাস্তার ধারের একটা মোটা গাছের গুঁড়িতে।
যে-কোনওভাবেই হোক, আমার বাঁ-পা নিতান্ত অভ্যাসবশে চেপে বসেছিল ব্রেকের ওপরে। তাই ধাক্কাটা সেরকম মারাত্মক হয়নি।
তালগোল পাকানো শব্দ হল নানারকম। ব্রেক কষার কাচকাচ আর্তনাদ, আমার ভয়ের চিৎকার, আর সবশেষে সংঘর্ষের শব্দ।
আমি স্টিয়ারিং-এর ওপরে মাথা ঝুঁকিয়ে হাঁপাচ্ছিলাম। একটু সময় নিয়ে ভয়েভয়ে আড়চোখে তাকালাম জানলার দিকে।
ভেবেছিলাম, জানলায় জিহাদপুরের লোকটাকে আর দেখতে পাব না। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই আমার চোখের ভুল ছিল–এখন সেই অলীক স্বপ্ন মিলিয়ে গেছে।
কিন্তু না, লোকটা তখনও জানলায় রয়েছে।
ওর মাথার ঘোমটা সরে গেছে। এখন ওর চোয়াড়ে মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জিনিসটাকে আগে পানের রস ভেবে ভুল করেছিলাম।
এখন বুঝলাম, ওটা রক্তের রেখা।
লোকটার বাঁ-গাল বেয়েও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। বোধহয় মাথায় চোট পেয়েছে।
আমার চিন্তাভাবনা সব জট পাকিয়ে শুধু আতঙ্ক মনে বাসা বেঁধেছিল। সেই আতঙ্কের ঠেলায় ডান হাতে আমার দিকের দরজাটা খুলে ফেললাম। পালাতে হবে! যেভাবেই হোক, এই ভয়ংকর লোকটার কাছ থেকে আমাকে পালাতে হবে!
দরজা খুলে সবে একটা পা গাড়ির বাইরে রেখেছি, তক্ষুনি লোকটা বকবক করতে করতে এক হ্যাঁচকায় ওর দিকের দরজাটা হাট করে খুলে ফেলল।
দেখুন! আমার কী হাল করেছেন দেখুন! আর আপনি এখন পালাচ্ছেন।
খোলা দরজা দিয়ে যা দেখলাম তা যেমন ভয়ংকর তেমনই অবিশ্বাস্য।
মাথা থেকে শুরু করে রক্তাক্ত কোমর পর্যন্ত পৌঁছেই লোকটার শরীর শেষ হয়ে গেছে। তারপর শুধু শুন্য!
যেন বাতাসে ভর করে একটা অর্ধেক মানুষ রক্তাক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
আমার দাঁতে-দাঁতে ঠোকাঠুকি লেগে গিয়েছিল। চোখ দুটো বোধহয় ভয়ে পাগল হয়ে বাইরে ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। বিশাল হাঁ করে ফেলেছিলাম এক প্রাণান্ত চিৎকার করে ওঠার জন্যে।
ঠিক তখনই লোকটা ঠান্ডা গলায় বলেছিল, দেখেছেন, আপনার গাড়ি চাপা পড়ে আমার বডিটা একেবারে দু-আধখানা হয়ে গেছে! নীচের অর্ধেকটা সেই অ্যাকসিডেন্টের জায়গাতেই পড়ে আছে। চলুন, দেখবেন চলুন, মিথ্যে বলছি কি না!
লোকটা হাত বাড়াল আমার হাত ধরার জন্যে।
তারপর আর আমার কিছু মনে নেই।
পরদিন জেনেছি, গাড়ির জ্বলন্ত হেডলাইট দেখে স্থানীয় লোকজন আমাকে খুঁজে পেয়েছিল।
তা ছাড়া ওরা কখনও জিহাদপুরের নাম শোনেনি।
.
সুনীতকাকুর গল্প শেষ হওয়ার পর আমরা আর কোনও কথা বলতে পারলাম না।
জীবন যখন ফুরিয়ে যায়
ভিসি আর-এ অমরসঙ্গীর ক্যাসেট চালিয়ে দেখছিলেন কল্যাণ চৌধুরি। সারাটা সন্ধে একঘেয়েভাবে কেটেছে। অফিসের কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পর থেকেই এই একঘেয়েমির শুরু। অজন্তা বাড়ি না থাকলে এরকমটাই হয়। আজও ও বাড়ি নেই। আজ সকালেই অফিসের মিটিং-এ দিল্লি গেছে। চারদিন পর ফিরবে। মনে মনে আজকের একঘেয়েমিকে চার দিয়ে গুণ করলেন কল্যাণ। অঙ্কের তত্ত্ব ওলটপালট করে দিয়ে গুণফল বেরোল চল্লিশ। রঙিন টিভি-র পরদায় তখন একটি যুবক একটি যুবতাঁকে প্রাণপণে প্রেম নিবেদন করে চলেছে। চিরদিনই তুমি যে আমার… ইত্যাদি একটা গানও হচ্ছিল। কল্যাণ হাসলেন মনে মনে। ছাব্বিশ বছর আগে তার বয়েস ছাব্বিশ বছর ছিল। তখন এরকম গানের বয়েস থাকলেও গান করেননি ঠিকই, তবে বাকি কাজটুকু করেছেন। প্রাণপণে প্রেম করেছেন অজন্তার সঙ্গে।
