আমাদের আর্লি স্টেজে হনুমান আমাদের ক্লোজ রিলেটিভ ছিল। মানে, লক্ষ লক্ষ বছর আগের কথা বলছি আর কী! তাই সিনিয়ারমোস্ট গুরুজন হিসেবে আমি হনুমানকে খুব রেসপেক্ট করি।
চন্দনা তখনও জেদ দেখিয়ে তিড়িং তিড়িং করে লাফাচ্ছিল। সেদিকে তাকিয়ে মনে হল, সুনীতকাকুর হনুমান-থিয়োরিটা বোধহয় একেবারে মিথ্যে নয়।
রীতাপিসি প্রায় চোখ পাকিয়ে বলে উঠল, চার বছর আগে মাথামুণ্ডু কী না কী হয়েছে, তার জন্যে পিকনিক পণ্ড! তোর ওসব চালাকি ছাড়, সুনীত! আসলে তুই পিকনিকে যাবি না– তাই নানান ছুতো খুঁজছিস।
আমার খুব মনখারাপ লাগছিল। কারণ, আমার কাছে বছরের ছটা ঋতু হল এইরকম : গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, পিকনিক, বসন্ত। সেই পিকনিকটাই হবে না! খোলা মাঠ আর গাছপালার মধ্যে শীতের রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে বসে খাওয়াদাওয়া, খেলাধুলো, গানবাজনা–সব মাটি!
লিলিদি চন্দনাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে করতে বলল, সুনুকা, তুমি কি সিরিয়াসলি বলছ, না কি ঠাট্টা করছ?
সিগারেটে টান দিয়ে একমুখ ধোয়া ছেড়ে সুনীতকাকু বলল, বিশ্বাস কর–সিরিয়াসলি বলছি। তোরা অন্য কোথাও পিকনিক স্পট ঠিক কর–সেটাই ভালো হবে।
কেন, কী হয়েছিল তোর ওই জিহাদপুরে সাতজন্মে নাম শুনিনি! খুলে বল দেখি! রীতাপিসি ভাইকে যেন সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাল।
শোন তা হলে!বলল সুনীতকাকু, তবে ছোটরা কিন্তু ভয় পেতে পারে।
আমি বললাম, ভয়! পিকনিক পণ্ড হওয়ার ভয়ে আমি অস্থির! এর চেয়ে বেশি ভয় আর কিছুতে আছে নাকি!
সুনীতকাকু কিন্তু বেশ গম্ভীর গলায় বলল, আছে জিহাদপুরের ভয়। শোন, বলছি…।
.
তোরা তো জানিস, ছোটবেলায় আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন। তারপর থেকে বলতে গেলে জ্যাঠামশায়ের কাছেই আমি মানুষ। জ্যাঠামশায় দারুণ মানুষ ছিলেন। আজকাল এরকম গুরুজন পাওয়াই মুশকিল। আমার ছোটবেলাটা এত দারুণ কেটেছিল যে, এখনও সেসব দিনের কথা মনে পড়লে মনটা কেমন হয়ে যায়।
জ্যাঠামশায় বরাবর মহানগঞ্জে থাকতেন, জমি-জমা দেখাশুনো করতেন। শহর ওঁকে মোটেই টানত না। বছর চারেক আগে তিনি একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমি কলকাতা থেকে গাড়ি চালিয়ে ওঁকে দেখতে গেলাম। তখন বুঝতে পারিনি যে, আমি জিহাদপুরের ওপর দিয়ে গেছি।
তিনদিন পর কলকাতার পথে যখন রওনা হলাম তখন মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কারণ, জ্যাঠামশায়ের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। বলতে গেলে এখন-তখন।
সুতরাং গাড়ি চালিয়ে ফেরার পথে মনটা কেমন যেন ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। বারবার ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিল। আর ভুলে যাচ্ছিলাম যে, ছুটন্ত গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে বসে আছি।
শীতের সময়। সন্ধে নেমে গেছে অনেকক্ষণ। সোয়েটার-জ্যাকেট পরে গাড়ির ভেতরে বসে থাকলেও কনকনে শীত হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় কুয়াশা ভেদ করে কালো পিচের রাস্তা আবছা দেখা যাচ্ছিল।
দিব্যি গাড়ি চালিয়ে আসছি, হঠাৎই দেখি আমার ঠিক সামনে মাথায় ঘোমটা দিয়ে চাদর মুড়ি দেওয়া একটা লোক কোত্থেকে এসে যেন দাঁড়িয়ে পড়ল।
লোকটা এত আচমকা গাড়ির সামনে এসে হাজির হল যে, মনে হল সে ঠিক একটা গাছের মতো মাটি খুঁড়ে মাথাচাড়া দিয়েছে।
ব্যস! যা হওয়ার তাই হল। আমি প্রাণপণে ব্রেক কষলাম বটে, স্টিয়ারিংও কাটালাম, কিন্তু কোনও লাভ হল না। লোকটা এত কাছে দেখা দিয়েছিল যে, পৃথিবীর কোনও ড্রাইভারই ওকে বাঁচাতে পারত না।
আমার গাড়ি সপাটে লোকটাকে ধাক্কা মারল। বীভৎস একটা শব্দ হল। লোকটা কোথায় কাত হয়ে পড়ল দেখতে পেলাম না।
আরও অন্তত হাত দশেক গিয়ে তবে আমার গাড়ি থামল। স্টিয়ারিং কাটানোর ফলে গাড়িটা পিচের রাস্তা ছেড়ে মাটির ওপরে নেমে এসেছে। আর আমি হতভম্ব হয়ে চুপচাপ বসে আছি। ভাবছি, লোকটা আছে, না খতম হয়ে গেছে!
একটু পরে যখন কাণ্ডজ্ঞান ফিরে পেলাম তখন দরজার হাতল ঘুরিয়ে গাড়ি থেকে নামতে গেলাম। বুকের ভেতরে ধড়াস ধড়াস শব্দ হচ্ছিল। এর আগে আমি কখনও মানুষকে ধাক্কা মারিনি। আশপাশে তাকিয়ে দেখলাম, কোনও লোকজন চোখে পড়ে কি না।
নাঃ, কেউ নেই।
হঠাৎই বন্ধ কাচের জানলায় ঠকঠক শব্দ হল।
চমকে মুখ ফিরিয়ে দেখি বাঁ-দিকের দরজার বাইরে চাদর মুড়ি দেওয়া একজন মানুষ সামান্য কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হেডলাইটের আলো গাছের গুঁড়িতে ঠিকরে পড়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যাচ্ছিল। তারই আভায় লোকটির মুখ আবছা চোখে পড়ছিল। তা ছাড়া কপালের ওপরটায় চাদরের আড়াল থাকায় চোখ দুটো প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না।
তবে লোকটা বোধহয় পান খাচ্ছিল। কারণ, ওর ঠোঁটের কোণ দিয়ে পানের রস গড়িয়ে পড়ছিল।
লোকটা ইশারায় আমাকে জানলার কাচটা নামাতে বলল।
আমার হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল। গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করলে তারপর যা-যা হয় সেসব মনে পড়ছিল : গণধোলাই, পুলিশের হাতে নাকাল হওয়া, ঘুষ–আরও কী কী আছে কে জানে!
কোনও কথা না বলে কাঁপা হাতে জানলার কাচটা নামালাম।
সঙ্গে-সঙ্গে রুক্ষ কর্কশ গলায় লোকটি বলে উঠল, একটু দেখে চালাতে পারেন না! স্টিয়ারিং হাতে পড়লেই কি জ্ঞানগম্যি হারিয়ে ফেলেন।
আমি সাফাই হিসেবে কিছু একটা বলতে গেলাম। কিন্তু এত অবাক হয়েছিলাম যে, ঠোঁট কেঁপে ওঠাই সার–গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোল না। আশ্চর্য! এইরকম ধাক্কা মারার পরেও লোকটা বেঁচে আছে।
