ব্যস। আমি চোখের পলকে আমার বাঁ-হাতে এক হিংস্র কামড় বসিয়ে দিলাম। সে যে কী অসহ্য যন্ত্রণা কী বলব, ইনস্পেক্টরসাহেব! কিন্তু আমি কামড় ছাড়িনি। আমার হাতটাকে বোধহয় ঋতুর গলা কিংবা রীতেনের ঘাড় ভেবেছিলাম। আমার মুখ দিয়ে গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোচ্ছিল। মাথার সবকটা শিরা ছিঁড়ে পড়তে চাইছিল বারবার। তবুও আমি কামড় ছাড়িনি। শেষ পর্যন্ত একটুকরো মাংস ছিঁড়ে এল হাত থেকে। আর একেবারে যাচ্ছেতাই রক্তারক্তি কাণ্ড। আমি মেঝেতে পড়ে গলাকাটা ছাগলের মতো ছটফট করতে লাগলাম আর চিৎকার করতে লাগলাম। ঋতুও চিৎকার করছিল। তারপর ঠিক কী হয়েছে জানি না। আমি তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম, তাই।
এরপর বেশ কিছুদিন ধরে আমার চিকিৎসা চলল। ঋতু দু-তিনরকম ডাক্তার ডেকে নিয়ে এল আমার জন্যে। তার মধ্যে একজন ডাক্তার তো স্রেফ ঘুমের ইনজেকশান দিয়ে চলে যেত, আর কড়িকাড়ি প্রশ্ন করত। কিছু মনে করবেন না–ঠিক আপনাদের পুলিশি জেরার মতো। তবে ভীষণ উলটোপালটা প্রশ্ন। যেমন, ছোটবেলায় আমি চুপচাপ থাকতাম কিনা। প্রথম ইয়ে শুরু করেছি কত বছর বয়েসে। লাল রং পছন্দ করি কি না। এক-একা থাকতে ভালো লাগে, না খারাপ লাগে। এইসব ফালতু প্রশ্ন। আপনিই বলুন, কোনও মানে হয়!
ঋতু একটু-একটু করে মনমরা হয়ে যাচ্ছিল। বাইরে বেরোনোটাও বেশ কমিয়ে দিল। আগের চেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে লাগল আমার।
কী বললেন? ঋতুকে ডিভোর্স করিনি কেন? ডিভোর্স করা মানে তো হেরে যাওয়া। আমার মা আমাকে কখনও হারতে শেখায়নি। আর ঋতু আমাকে ছেড়ে চলে যায়নি কেন? হাসালেন? কী করে যাবে! আমার যে অনেক বিষয়-আশয়। টাকার লোভ বড় সাঙ্ঘাতিক জিনিস, স্যার। অনেক মহান মানুষকে দেখেছি টাকার লোভের কাছে কাবু হয়ে যতে। ঘরে তারা চুরি করে, কিন্তু বাইরের লোকের কাছে পরোপকারী, মহান সেজে ঘুরে বেড়ায়।
যাই হোক, এরপর তিনবার আমি ক্ষুর দিয়ে আমার বুকে-পেটে-পায়ে দাগ টেনেছি। কাটারি দিয়ে বাঁ-হাতের দুটো আঙুলের ডগা উড়িয়ে দিয়েছি। এই তো, দেখুন না। এই যে–এইসব সেলাই আর দাগ দেখছেন, এইগুলো। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, এসবই করেছি ঋতুর চোখের সামনে। না, কেন করেছি জানি না। হয়তো নিজেকে কষ্ট দিয়ে ওকে বদলাতে চেয়েছিলাম। নাকি ওকে ভয় দেখাতে চেয়েছি?
না, স্যার, অতশত ভেবে কিছু করিনি। তবে ওই যে বললাম, আমার মাথার ভেতরে একটা ধুনি জ্বলত সবসময়। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ঋতুকে আমি খুন করিনি। আমার যে কী অবস্থা তা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারবে না, স্যার। আমি না-পারি মারতে, না-পারি মরতে। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি শুধু ছটফট করেই গেলাম। আমি নিজেই যেন পায়ে দড়ি বাঁধা একটা মুরগি। ভগবানের মুরগি। আড়ালে থেকে কেউ যেন পাগলের মতো আমাকে হকিস্টিক দিয়ে পেটাচ্ছে…পেটাচ্ছে। স্যার…স্যার…ঋতুকে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে। কোথায় রেখেছেন আমার বউকে? আমার কলাবউকে একবারটি দেখান না, স্যার। একটিবার ওর মরামুখ দেখতে না-পেলে আমি পাগল হয়ে যাব, একফোঁটা শান্তি পাব না। বিশ্বাস করুন, স্যার, সত্যি বলছি…।
জিহাদপুরের সেই লোকটা
পিকনিকের দিনক্ষণ আয়োজন যখন সব ঠিকঠাক তখন সুনীতকাকু হঠাৎ বলে উঠল, না, আমি গাড়ি চালাতে পারব না। তোমরা ড্রাইভার জোগাড় করো। সে-ই গাড়ি চালিয়ে আমাদের পিকনিক স্পটে নিয়ে যাবে।
সুনীতকাকু খুব ভালো গাড়ি চালায়। সেটা আমরা সব্বাই জানি। এতক্ষণ কাকু গাড়ি চালাতে রাজি ছিল। কিন্তু পিকনিক স্পটের নামটা শোনামাত্রই বেঁকে বসল। অথচ ড্রাইভার নিলে আমাদের খরচের চাপ বাড়বে।
কেন, গাড়ি চালাতে পারবি না কেন?–রীতাপিসি জিগ্যেস করল।
সুনীতকাকু কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। একটা খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে ঘোর লাগা গলায় বলল, গড়বেতায় যেতে হলে জিহাদপুরের ওপর দিয়ে যেতে হয়। আর লক্ষ টাকা দিলেও আমি জিহাদপুরের ওপর দিয়ে যেতে পারব না। সে দিনে তোক কি রাতেই হোক।
কেন, জিহাদপুরে কী হয়েছে?–লিলিদি, আমার জ্যাঠতুতো দিদি, জানতে চাইল।
সুনীতকাকু তক্ষুনি কোনও উত্তর দিল না। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরাল।
সিগারেট দেখে আমার চার বছরের বোন চন্দনা বায়না করতে লাগল। সুনীতকাকুর হাত ধরে টানতে লাগল আর বলতে লাগল, সাদা লজেন খাব, লম্বা সাদা লজেন খাব।
আমি ওকে কোলে করে সরিয়ে নিয়ে এলাম, কিন্তু জেদ ধরে ও চিৎকার করতে লাগল, আর হাত-পা ছুঁড়তে লাগল। ওর মুখে সেই এক কথা, লম্বা সাদা লজেন খাব।
অন্যসময় হলে চন্দনাকে আদর করে ভুলিয়ে-ভালিয়ে বেশ তোয়াজ করতাম। কিন্তু এখন সেরকম মনের অবস্থা কোথায়। সুনীতকাকুর জন্যে আমাদের শীতকালের বাঁধা পিকনিকটাই ভেস্তে যেতে বসেছে।
লিলিদি আবার জানতে চাইল, কেন, জিহাদপুরে কী হয়েছে?
মাত্র চার বছর আগে একটা ব্যাপার হয়েছিল–এইরকমই শীতের সময়ে। তার পর থেকে ঠিক করেছি, জিহাদপুরের ওপর দিয়ে আর কখনও গাড়ি ড্রাইভ করে যাচ্ছি না।
কথা বলতে বলতে কান ধরার ভঙ্গিতে দু-হাত কানে ঠেকাল সুনীতকাকু। ঠোঁটে সিগারেট ধরা অবস্থাতেই বলল, হনুমানের দিব্যি–ও রাস্তায় আর নয়!
আমি হেসে বললাম, হঠাৎ হনুমানের দিব্যি কেন?
