হ্যাঁ, ভারী অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না?
হ্যাঁ। বলছিলাম, আজ পাঁচটা একুশের ট্রেনে আমি আর উনি বাইরে যাচ্ছি। এ কটা দিন সুযোগ-সুবিধে মতো যদি আমাদের ফ্ল্যাটের দিকে একটু নজর রাখেন, তা হলে বড় উপকার হয়।
কেন, দরজায় তালা দেননি বুঝি?অরোরার কণ্ঠে বিস্ময়ের সুর।
(এই রে! গবেটটা লক্ষই করেনি কত কায়দা করে আমি দরজায় তালা দিলাম। নাকি ব্যাটা নকল চাবির কথা জানে না?)
হ্যাঁ, দরজায় চাবি দিয়েছি। কিন্তু আপনি বোধহয় জানেন না, চোর নকল চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুকেছিল, তাই।
তা হলে এক কাজ করুন না, আমি কড়া আর শেকল দিয়ে দিচ্ছি– ছুতোরমিস্তিরি ডাকিয়ে শেকলটা লাগিয়ে নিন, আর তাতে একটা তালা লাগিয়ে দিন।অরোরা ঘুরে দাঁড়িয়ে এগোতে গেল। সম্ভবত শেকল আর কড়া আনার জন্যে। আর ঠিক তখনই ইলা দেখতে পেল অরোরার হাতে কোনও ঘড়ি নেই।
ও নিশ্চিন্ত হয়ে অরোরাকে বাধা দিল, না, না, আপনার কষ্ট করার দরকার নেই। বাইরের ঘরে আমরা তেমন কিছু রেখে যাইনি। তা ছাড়া এখন তো আর সময়ও নেই। পাঁচটা বাজে। বলে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল ইলা। আর একইসঙ্গে বন্ধ দরজার ওপিঠ থেকে ওদের দেওয়াল-ঘড়ির চাপা ঢং-ঢং শব্দ ভেসে এল।
অনেকটা স্বস্তি পেল ইলা। বলল, ওই পাঁচটা বাজল। আর দেরি হলে ট্রেন ফেল করব। তা ছাড়া উনি স্টেশানে ওয়েট করছেন।
তা হলে এক কাজ করুন। আমাদের যে-বাচ্চা চাকরটা আছে, ওটাকে বলে দিই, এ কটা দিন আপনাদের ফ্ল্যাটেই ও রাত কাটাক। চোর-টোরের ভয় তা হলে আর থাকবে না।
(ড্যাম য়ু) না, না, শুধু-শুধু একটা বাচ্চাকে কষ্ট দিয়ে লাভ কী? আপনি একটু নজর রাখলেই হবে। থ্যাংক য়ু।
অরোরার দিকে চেয়ে একটুকরো মিষ্টি হাসি ছুঁড়ে দিল ইলা। তারপর হনহন করে এগিয়ে গিয়ে লিফটে উঠল।
ইলার পিছনটা জরিপ করতে করতে ফ্যান্টাবুলাস! বলে শিস দিয়ে উঠলেন অরোরা। তারপর দরজা বন্ধ করে, নিজের দজ্জাল বউকে বিয়ে করে যে কী ভুল করেছেন সে কথা ভাবতে ভাবতে ডিক্যান্টারের দিকে এগিয়ে গেলেন।
.
সকলের চোখ এড়িয়ে নিজের ফ্ল্যাটে যখন পৌঁছোলাম, তখন পাঁচটা বেজে ন মিনিট (অর্থাৎ, আসল সময় পাঁচটা বাজতে চোদ্দো মিনিট)। দরজা ঠেলতেই নিঃশব্দে খুলে গেল। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। দেখি ঘরের সোফায় ইলা বসে রয়েছে। আমাকে দেখেই ও ঘাড় হেলিয়ে জানাল সবকিছুই ঠিক আছে। তার মানে, পরিকল্পনার কোথাও কোনও চেঞ্জ হয়নি।
মারকিউরিক ক্লোরাইড মেশানো জলের গ্লাসটা কোথায়?–চাপা গলায় ওকে প্রশ্ন করলাম।
রান্নাঘরে।–আস্তে জবাব দিল ইলা। ।
ঠিক এইসময় দরজায় সামান্য শব্দ হতেই আমি ছুটে দরজার কাছে গিয়ে উপস্থিত হলাম। ম্যাজিক আই দিয়ে তাকিয়ে দেখি, বাইরে নির্বিকার ভাবলেশহীন মুখে দাঁড়িয়ে প্রাণকান্ত সমাদ্দার। অতএব সঙ্গে-সঙ্গে দরজা খুলে ওকে ভেতরে টেনে নিলাম। তারপর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলাম। প্রাণকান্ত সোফায় এসে বসতেই আমি তিরিশটা দশটাকার বান্ডিল টেবিলের ওপর অবহেলা ভরে ছুঁড়ে দিলাম। প্রাণকান্ত স্থির লোভাতুর চোখ মেলে নোটের বান্ডিলগুলোর দিকে চেয়ে রইল।
আমি এইবার আসল কথাটা উচ্চারণ করলাম, মিস্টার সমাদ্দার, মোট তিরিশহাজার আছে, দশহাজার টাকা বোনাস। আমাদের আপনি মুক্তি দিন।
প্রাণকান্ত কাঠ হয়ে বসেই রইল। লম্বা জিভটা বের করে শুকনো ঠোঁটে একবার বুলিয়ে নিল।
ইলা, মিস্টার সমাদ্দারের বোধহয় গলা শুকিয়ে গেছে।
ইলা বুঝল আমার ইঙ্গিত। ও চট করে রান্নাঘরে চলে গেল।
একটু পরে ও যখন জলভরা গ্লাসটা এনে সমাদ্দারের সামনে ধরল, সমাদ্দার স্বপ্নচ্ছন্নের মতো যান্ত্রিকভাবে গ্লাসটা নিয়ে পুরো জলটাই খেয়ে নিল। ওর স্বচ্ছ দৃষ্টি তখনও ওই টাকার স্কুপের দিকে।
বিপর্যয় ঘটল কয়েকসেকেন্ড পরেই।
প্রাণকান্ত মেঝেতে উলটে পড়ল। তারপর শুরু হল ওর ছটফটানি। দু-হাতে গলা খামচে ধরে সমাদ্দারের দেহটা ওলটপালট খেতে লাগল।
সেই মুহূর্তে শুরু হল আমার আর ইলার কাজ।
এক : দেওয়াল-ঘড়ির কাঁটা ঠিক করলাম।
দুই : নোটের বান্ডিলগুলো আবার সিন্দুকে ঢুকিয়ে চাবি দিয়ে সিন্দুকের দরজা বন্ধ করে দিলাম।
তিন : ইলা রান্নাঘর থেকে আরও কিছুটা মারকিউরিক ক্লোরাইড মেশানো জল নিয়ে এসে টেবিলে রাখা আমার কয়েকটি পাণ্ডুলিপির ওপর সেই জল ছিটিয়ে দিয়ে বাকি জল টেবিলে ঢেলে দিল।
চারঃ প্রাণকান্তর জল খাওয়া গ্লাসটা রুমালে ধরে টেবিল থেকে তুলে মেঝেয় ফেলে দিলাম। গ্লাসটি সশব্দে ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল।
প্রাণকান্তর অবস্থা তখন ভয়ংকর। দু-হাতে ও হাওয়া আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে। দেহটা ক্ষণে-ক্ষণেই খিচুনি মেরে কেঁপে উঠছে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে সাদা গাজলা। চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে।
শেষ মুহূর্তের প্রতীক্ষায় বিষাক্ত প্রাণকান্তকে রেখে আমি আর ইলা চটপট ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে এলাম (তার আগেই নকল চাবিটা প্রাণকান্তর পকেটে গুঁজে দিয়েছি)। দরজায় চাবি দিয়ে সকলের চোখ এড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম সিঁড়ির দিকে।
আমার উত্তেজিত হৃৎপিণ্ড তখন আতঙ্কে ধুকপুক করছে। উত্তেজনা কমানোর জন্যে পকেট থেকে একটা ট্যাবলেট বের করে মুখে পুরে দিলাম। নিজেকে ভীষণ ক্লান্ত মনে হল। বেশি বয়েসে এত ঝক্কি পোয়ানো বোধহয় ঠিক হয়নি। সামনের রোববারের কথা ভেবে নাড়িভুড়ি যেন উলটে এল। নাঃ, অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রাণকান্তর বরফশীল বিকৃত মৃতদেহটা আমাদেরই আবিষ্কার করতে হবে।
