এবার বাথরুমে গিয়ে ঘড়িটা হাতে পরে বেরিয়ে এলাম। অফিস রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে সমরের অপেক্ষা করতে লাগলাম।
মিনিট-পাঁচেক পরে দোতলায় সারা অফিস চষে ও ফিরে আসতেই বললাম, তোমাকে শুধু শুধু বিরক্ত করলাম। ঘড়িটা ভুল করে বাথরুমেই ফেলে এসেছিলাম। আমি দরজা আগলে এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম, যাতে সমর ভেতরে ঢুকে দেওয়াল-ঘড়ির সময় না দেখে ফেলে।
ঘড়ির কথা ওঠায় একটা কথা মনে পড়ে গেল, সমর।
সমর জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল আমার দিকে।
আমাকে একটা ঘড়ি কিনতে হবে, এক রিলেটিভের জন্যে। এই ধরো একশো-সোয়াশোর মধ্যে (সমর আগে একদিন বলেছিল, ওর ঘড়িটার দাম একশো তিরিশ টাকা। ভাগ্যিস কথাটা মনে ছিল)। এখন কী ঘড়ি দিই ভাবছি।
কেন, অ্যাংলো সুইস দিন না।
আচ্ছা দেখি, তোমার হাতটা দেখি।–বলতে-বলতে সমরের ঘড়িসুদ্ধ বাঁ-হাত টেনে নিলাম আমার বুকের কাছে। আমার বুড়ো আঙুলের ডগা এমন নিখুঁতভাবে ওর হাতঘড়ির ডায়াল ঢেকে রইল যে, সমরের পক্ষে তখন সময় দেখা সম্ভব হল না।
তোমার ঘড়িটা কী ঘড়ি?–এবং এবার কথা শেষ হতে না হতেই সমরের হাতঘড়ি আমি খুলে নিয়েছি, নিয়ে ডায়ালটা আমার দিকে ফিরিয়ে দেখতে শুরু করেছি।
অ্যাংলো সুইস।–আমার ব্যবহারে একটু অবাক হলেও সমর নির্বিকার।
তা হলে এইরকম একটা ঘড়িই কিনে দেওয়া যেতে পারে।–ঘড়িটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে-দেখতে বললাম, কত দাম তোমার ঘড়িটার? দেড়শোর বেশি হলে আমার পক্ষে…।
না না, ওটার দাম মাত্র একশো তিরিশ টাকা।
সমরের কথা শেষ হতে না হতেই ওর হাতঘড়িটা আমার আঙুলের আওতা ছাড়িয়ে (অথচ আমি জানি, কতখানি কুশলী হলে সমরের চোখের সামনে ওইরকম কায়দা করে ঘড়িটাকে মেঝেতে ফেলা যায়!) মেঝেতে ছিটকে পড়ল, এবং অনিবার্যভাবেই ঘড়ির ডায়ালের কাচ তখন ভেঙে গেছে।
সমর অস্বস্তিভরে কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল।
সমর, এক্সট্রিমলি সরি। রোববার দিন আমি ফিরছি। কথা দিচ্ছি, তোমার ঘড়িটা মেরামত করিয়ে সোমবার দিনই তোমাকে দিয়ে দেব। বলে অচল ঘড়িটা নির্বিবাদে পকেটে ভরে ফেললাম।
না, না, অমিতদা, তার কোনও দরকার নেই। আমিই ওটা সারিয়ে নেবখন। সমর ইতস্তত করে বলে উঠল।
কিন্তু ও কী করে জানবে আমার মনের কথা। সুতরাং ওর সদিচ্ছায় ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়ে বললাম, আমি যদি ঘড়িটা সারিয়ে দিই, তবে কি তোমার আপত্তি আছে, সমর? আফটার অল দোষটা যখন আমারই।
সমর নিশ্চপ। বস বলে কথা।
যাও, লেখাটা শেষ করে ফ্যালো গিয়ে বেশ জমেছে। আমি এখন হাতের কাজটা সেরে নিই। ওদিকে তোমার বউদির সঙ্গে একেবারে স্টেশনে গিয়ে দেখা করতে হবে। টিকিট অবশ্য আগেই কাটা আছে।বলতে-বলতে সমরের লেখাটা ফেরত দিলাম। তারপর ধীরেসুস্থে আমার টেবিলে গিয়ে বসলাম।
যাক, ঘড়ির ব্যাপারটা অনেক কষ্টে কায়দা করা গেছে। ওদিকে ইলা কী করছে কে জানে। ওকে যথাসম্ভব প্রাঞ্জল করে সময় চুরির পরিকল্পনাটা আমি বুঝিয়ে দিয়েছি। এরপর ও যদি ঠিকমতো মিসেস অরোরাকে বোকা বানাতে না পারে, তো সমস্ত কিছুই ওলটপালট হয়ে যাবে।
লেখা নিয়ে ব্যস্ত সমরের দিকে একপলক চোখ বুলিয়ে আয়েস করে একটা সিগারেট ধরালাম। সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে যেন ইলার গতিবিধি আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম।
.
আসল সময় অনুযায়ী ঠিক পাঁচটা বাজতে চব্বিশ মিনিটের সময় ইলা সান্যাল ফ্ল্যাট ছেড়ে বাইরে এল। কিন্তু ওর হাতঘড়ি, এবং ঘরের দেওয়াল-ঘড়ি দুটোতেই পাঁচটা বাজতে এক মিনিট। অর্থাৎ ওর স্বামীর কথা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করেছে ইলা। বাইরে বেরিয়ে ও দরজা ভেজিয়ে দিল, কিন্তু সামান্য ফাঁক রেখে দিল। চারপাশে একবার তাকাল। তারপর টুক করে করিডরের কার্পেট মোড়া প্রস্থটুকু নিঃশব্দে পার হয়ে অরোরাদের দরজায় আস্তে নক করেই নিজের জায়গায় আবার ফিরে এল, ঝুঁকে পড়ল দরজায় কাছে। ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি চাবি বের করে লকের ভেতর গলিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে খটাং-খটাং শব্দ করতে লাগল।
ঠিক এইসময় ইলার পিছনে অরোরাদের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেল, ভেসে এল ভরাট গম্ভীর পুরুষ কণ্ঠ, আপনি কি দরজায় নক করেছিলেন?
ভীষণভাবে চমকে উঠল ইলা। মিসেস অরোরার গলা তো এত গম্ভীর নয়! দরজায় চাবি ঘুরিয়ে চাবি ভ্যানিটি ব্যাগে ভরল ইলা।
ততক্ষণে আরও একবার আপনিই কি একটু আগে নক করছিলেন? জিগ্যেস করা হয়ে গেছে।
এবার দুরুদুরু বুকে ঘুরে দাঁড়াল ইলা: কই, ন্-না, না তো!
তা হলে আমারই বোধহয় শুনতে ভুল হয়েছে। মিস্টার অরোরা দরজা বন্ধ করতে যেতেই বেপরোয়া হয়ে ইলা বলে উঠল, শুশুনছেন!
(ইস, এভাবে যে হুমদো বুড়োটা বেরিয়ে আসবে কে জানত! অমিত বলেছিল, মিস্টার অরোরা রাত বারোটার আগে ফেরেন না। কিন্তু…)
কী?–অরোরার ভুরু ঊর্ধ্বমুখী হল।
মিসেস অরোরা আছেন? ওঁর সঙ্গে একটু কথা ছিল। ইতস্তত করে বলল ইলা।
কী দরকার আমাকেই বলুন না।–আলাপের আগ্রহের সুরে বললেন অরোরা। এমনিতে মহিলাদের সঙ্গে আলাপে ওঁর কোনও আপত্তি নেই, বরং ভালোই লাগে। আর এখন ইলাকে দেখে ওঁর মনে হচ্ছে, আ বিউটি ইন ডিসট্রেস। মরিয়া হয়ে ইলা মিসেস-এর পরিবর্তে মিস্টারের সঙ্গে ই পরিকল্পনা অনুযায়ী ছক বাঁধা কথা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
আপনি বোধহয় শুনেছেন, লাস্ট সানডে আমাদের ফ্ল্যাটে চোর এসেছিল?
