ইলার দিকে একবার তাকালাম। ও কী ভাবছে, কে জানে! কিন্তু ওর মুখে আতঙ্কের লেশমাত্র ছায়াও কাঁপতে দেখলাম না।
*
রবিবার দিন অফিসের দেওয়াল-ঘড়ির সময় শুধরে যখন বাড়ির কাছে পৌঁছলাম, হাতঘড়িতে (এখন ঘড়ি ঠিক সময় দেখাচ্ছে) তখন রাত আটটা। অফিসে গিয়ে সমর ফেরেনি দেখে আরও নিশ্চিন্ত হয়েছি। কারণ, আমার চেম্বারের দুটো চাবির একটা থাকে আমার কাছে, আর অন্যটি থাকে সমরের কাছে। সুতরাং ঘড়ির কারসাজি যে কেউ ধরে ফেলেছে এমন সম্ভাবনা নেই।
লিফটে উঠতে-উঠতে পাশে দাঁড়ানো ইলার দিকে তাকালাম। কী আশ্চর্য! ওর এতটুকু ভয়ডর নেই? সুখের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে ওর চোখে-মুখে।
ইলা, দরজা কি আমিই খুলব?–ওকে জিগ্যেস করলাম। মনে ক্ষীণ আশা, যদি ও দরজা খুলতে রাজি হয়।
কেন, তোমার কি ভয় করছে?ব্যঙ্গের সুরে জানতে চাইল ইলা।
এ কোন নতুন ইলা? একটু অবাক হলাম।
যতই লিফট উঠছে দুদ্দাড় করে বেতালা ছুটে চলেছে হৃৎপিণ্ড। কখনও কি থামবে না এর অশান্ত গতি? নাকি ট্যাবলেট খেয়ে নেব একটা?
লিফট থামতে দুজনে করিডরে পা রাখলাম। পকেট হাতড়ে ফ্ল্যাটের চাবি বের করে বাগিয়ে ধরলাম। করিডরের আলো সোজা গিয়ে পড়েছে আমাদের ফ্ল্যাটের দরজায়।
চাবি ঢোকাতে গিয়ে অবাধ্য ডানহাত বারকয়েক কেঁপে গেল। আমার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ইলা। দরজায় ওর ছায়া এসে পড়েছে।
কী হল, খোলো?–পেছন থেকে ইলার অধৈর্য স্বর ভেসে এল। কোনওরকমে চাবি ঘোরালাম। খট করে লকটা সরে গেল।
হাতের চাপে ধীরে-ধীরে খুলতে শুরু করল সেগুন কাঠের বার্নিশ করা দরজা।
ভেতরটা কালো অন্ধকার।
দরজা যতই খুলছে, করিডরের আলোর ফলা ততই চওড়া হচ্ছে ঘরের ভেতরে।
দরজা পুরোটা খুলতেই যে-দৃশ্য দেখলাম তাতে..।
অন্ধকার ঘরের আলোছায়ায় পড়ে রয়েছে প্রাণকান্ত। কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছে ওর দেহটা। দু-চোখ বিস্ফারিত। ধীরে-ধীরে ও উঠে দাঁড়াল। দু-হাতের দশ আঙুল শকুনের নখের মতো বাঁকিয়ে ঘৃণাভরে কুটিল চোখ নিয়ে টলতে টলতে ও এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে। নিষ্ফল আক্রোশে হাওয়া আঁকড়ে ধরছে ওর হাত। জীবন্ত শীতল মৃতদেহের মতো অনিশ্চিত পদক্ষেপে ও এগিয়ে আসছে। এগিয়ে আসছে রক্তপিপাসায়। কাছে আরও কাছে…।
বুকের খাঁচায় হৃৎপিণ্ডটা ভীষণভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। লাফিয়ে উঠল গলা দিয়ে। মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছেয় শেষবারের মতো উন্মাদ হয়ে এসে আঘাত করল টাকরায়।
সেই মুহূর্তে পেছন থেকে এক প্রচণ্ড ধাক্কা দিল কেউ। হুমড়ি খেয়ে ছিটকে গেলাম প্রাণকান্তর আওতায়। ওর বাঁকানো নখসুদ্ধ দশ আঙুল আঁকড়ে ধরল আমার গলা…।
পুরো ব্যাপারটার একটা যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা ভেবে ওঠার আগেই আমার রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ডটা যেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসে বাইরে ছিটকে পড়ল। তারপর নিশ্চল হয়ে পড়ে রইল মেঝেতে।
অন্ধকার ঘরের ভেতর অমিত সান্যালের প্রাণহীন দেহটা লুটিয়ে পড়তেই ইলা ঘরের দরজা বন্ধ করে আলো জ্বেলে দিল। তারপর কাছে এগিয়ে গিয়ে প্রাণকান্তর প্রসারিত হাতের বাঁধনে ধরা দিল ও বিজন–বিজন!
ইলার মাথায় হাত বুলিয়ে বিজন বলল, ভয় পেয়ো না, ইলু সোনা। আমরা দুজনে মিলে এইমাত্র এই শতাব্দীর নিখুঁততম খুন এক্সিকিউট করেছি। ডাক্তার অমিত সান্যালকে হার্ট ফেলিয়োর কেস বলেই রায় দেবে, তাই না?
ইলা বিজনের বুক থেকে মুখ তুলল : তুমি এখন চলে যাও, নয়তো বিপদে পড়বে। আমি এদিকে ডাক্তার ডেকে ব্যাপারটার একটা শেষ ফয়সালা করে ফেলি।
হ্যাঁ, যাচ্ছি। বলে বিজন সোফায় বসল । এই তিনদিন একটা বন্ধ ফ্ল্যাটে কাটাতে আমার ভীষণ বোর লেগেছে। অবশ্য তুমি যে রান্নাঘরে খাবারের স্টক রেখে যাবে, সেটা জানতাম।
ইলা হাসলঃ জানো, যখন তুমি শুধু জল খেয়ে পড়ে গিয়ে অভিনয় করতে শুরু করলে, তখন অমিত ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
তা তো পাবেই। তবে আমি একটু ওভারঅ্যাকটিং করে ফেলেছি।
বিজন সেন এবার ওর পকেট থেকে একটি ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশান সার্টিফিকেট বার করে ইলার দিকে এগিয়ে দিল । এই নাও, তোমার হতভাগা প্রথম স্বামীর কাগজখানা ফেরত নাও। কে জানত ছবছর আগে যে-প্রাণকান্ত সমাদ্দার মারা গেছে, তার সঙ্গে তোমার বিয়ের কাগজখানা এতদিন পরে হঠাৎ কাজে লাগবে। তবে ইলা, আমাদের একসঙ্গে তোলা এই ফটোখানা কিন্তু আমি ফেরত দিচ্ছি না। বলে বিজন সেটা ইলাকে দেখাল।
রেখে দাও, কোনও ক্ষতি নেই। কিন্তু ওই ফটোটাকে প্রাণকান্ত আর আমার বলে চালাতে কে শিখিয়ে দিয়েছিল, স্যার?
হেসে ইলাকে কাছে টেনে নিল বিজন। ওর গালে একটা চুমু খেয়ে বলল, অমিত সান্যাল একটি গর্দভ। তোমার নতুন প্রেমিকের খোঁজ ও রাখেনি।
ছলাবউ কলাবউ
সত্যি বলছি স্যার, বউটা আমার যাকে বলে একেবারে স্পেশাল ছিল। ছিল মানে পাস্ট টেন্স। আমাদের ভগবান লোকটা বড় মজার। একদিনের মধ্যে আমার ডাগর সোমত্ত বউটাকে প্রেজেন্ট টেন্স থেকে পাস্ট টেন্স করে দিল। কী বললেন? না, স্যার সত্যি বলছি–আপন গড, ঋতুপর্ণাকে আমি খুন তো দূরের কথা, দুইনি পর্যন্ত। ছুঁইনি মানে ক্ষতি করার জন্যে দুইনি। ওই আদর-টাদর করার সময় ছুঁতে হয়েছে। না ছুঁয়ে আবার আদর করা যায় না কি!
দুঃখের কথা কী জানেন? বউটা স্বর্গলোকে গিয়েও আমাকে রেহাই দিল না। ওর জন্যেই আমাকে আপনাদের এই থানায় আসতে হল–থানা দেখতে হল, আবার শ্মশানও দেখতে হবে। সবই আমার কপাল!
