নিঃসন্দেহে পিশাচ। কিন্তু মনে রেখো, ইলা, ওকে খুন করার প্ল্যানটা আমরা এখনও ঠিক করতে পারিনি।
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ইলা জবাব দিল, কে বলল পারিনি? প্রাণকান্ত সমাদ্দার মারকিউরিক ক্লোরাইডের সলিউশান খেয়ে মারা যাবে।
তার মানে? স্তব্ধ বিস্ময়ে চেয়ে রইলাম ইলার দিকে।
হ্যাঁ। তুমি বোধহয় ভুলে গেছ, অমিত, আমরা যে অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করি সেটা মারকিউরিক ক্লোরাইড। বাথরুমে বাদামি রঙের বোতলে যে কাচের দানার মতো বস্তুটা রয়েছে, আমি ওটার কথাই বলছি। সেই মারকিউরিক ক্লোরাইড জলে মিশিয়ে আমরা প্রাণকান্তকে খাওয়াব। ব্যস আর দেখতে হবে না–প্রাণকান্ত চিরকালের জন্যে একেবারে কাত হয়ে যাবে।
কিন্তু সেটা তো আর দুর্ঘটনায় মৃত্যু হবে না, ইলা।–চিন্তান্বিত স্বরে জবাব দিলাম, অথচ…।
তুমি আমার কথা ঠিক পুরোপুরি বুঝতে পারোনি, অমিত। তুমি বোধহয় জানো না, মারকিউরিক ক্লোরাইড ইঁদুর মারার কাজেও ব্যবহার করা যায়। সুতরাং, বাইরে যাওয়ার আগে ইঁদুর মারার জন্যে আমরা এই টেবিলের (ইশারায় টেবিলটা দেখাল ইলা) ওপর এক গ্লাস জল খোলা রেখে যাব। আর টেবিলের ওপর থাকবে তোমার পুরোনো, নতুন, গোছা-গোছা পাণ্ডুলিপি। আর পাণ্ডুলিপির পাহারায় রেখে যাচ্ছি ওই এক গ্লাস জল। শুনতে ব্যাপারটা অত্যন্ত হাস্যকর ঠেকছে, তাই না, অমিত? কিন্তু ভেবে দ্যাখো তো, প্রাণকান্ত খুন হওয়ার পর এই ঘরের দৃশ্য ঠিক কীরকম হয়ে উঠবে? পুলিশ এসে দেখবে, তোমার পাণ্ডুলিপির বেশ কিছুটা জলে ভেজা। টেবিলের কাছে মরে পড়ে আছে প্রাণকান্তর বিকৃত মৃতদেহ। আর তার পাশেই ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে পড়ে রয়েছে একটি কাচের গ্লাস, তার গায়ে শুধুমাত্র প্রাণকান্তরই হাতের ছাপ।
তখন জলটা আমরা কী জন্যে রেখে গিয়েছিলাম, সে-প্রশ্নটা পুলিশের কাছে আর তেমন জরুরি বলে মনে হবে না, তাই না?
ইলার যুক্তি শুনে অবাক হয়ে গেলাম। আনন্দে ওর হাত চেপে ধরলাম ও ইলা, আমরা দুজনে মিলে এই শতাব্দীর মোস্ট পারফেক্ট মার্ডার কমিট করব। অতএব এরপর থেকে সব চলবে প্ল্যানমাফিক। ডান।
ডান, সম্মতি জানিয়ে আমার কাঁধে মাথা রাখল ইলা।
.
বুধবার অফিসে যাওয়ার আগে গত কদিনের ঘটনাগুলো আরও একবার যাচাই করে দেখলাম, আমি ভুল করিনি। সাবানের ছাপ, নকল চাবি থেকে আরম্ভ করে পুলিশে ডায়েরি করা পর্যন্ত সমস্ত কাজই নির্বিঘ্নে শেষ হয়েছে। পুলিশ এবং আমার বাড়ির অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বাসই হয়েছে যে, আমার ফ্ল্যাটে এসেছিল এক অদৃশ্য চোর। কিন্তু আমার ধারণা মতো পুলিশ সরেজমিনে তদন্ত করতে একবারের জন্যেও আসেনি। অর্থাৎ, এত কষ্ট করে সাবানের ছাপ তুলেছি, সেটা ওরা আর দেখল না। অবশ্য এতে চিন্তার কারণ খুব একটা নেই। কারণ, আগামী রবিবার প্রাণকান্তর ডেডবডি আমার ফ্ল্যাটে পাওয়া গেলে, পুলিশ দরজার চাবির ফুটো থেকে শুরু করে প্রাণকান্তর পকেটে পাওয়া নকল চাবি, সবই পরীক্ষা করে দেখবে। তখন প্রমাণগুলো জোরদার হবে।
কিন্তু ইলার ইঁদুর মারার ব্যাপারটা কেমন হালকা ঠেকছে না! পুলিশ কি ওতে ভুলবে? তার চেয়ে পুলিশের কাছে অন্য একটা ব্যাখ্যা দিলে কেমন হয়? যদি বলি, ওই মারকিউরিক ক্লোরাইড মেশানো জল ব্যবহার করব বলে ইলা তৈরি করেছিল, কিন্তু পরে ভুলে যাওয়ায় ওই এক গ্লাস বিষাক্ত জল টেবিলেই থেকে গেছে।…যাকগে, ও নিয়ে পরে ভাবার অনেক সময় পাওয়া যাবে। আপাতত এখনকার কাজ নিয়ে ভাবি।
অফিসের দেওয়াল-ঘড়িতে সোয়া চারটে বাজতেই সোজা হয়ে বসলাম। তাকিয়ে দেখি সমর চৌধুরী সকাল থেকে সেই একইভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে কী যেন লিখছে। না, আর দেরি নয় এখনই কাজ শুরু না করলে বিপদে পড়তে হবে। সুতরাং চট করে কাজের টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লাম। বড়-বড় পা ফেলে এগোলাম অ্যাটাচড বাথরুমের দিকে। কাটা ঘুরিয়ে আমার হাতঘড়িটা খুলে রাখলাম বেসিন স্ট্যান্ডে। তারপর চোখে-মুখে জল দিয়ে ফিরে এলাম কাজের জায়গায়। রুমাল বের করে হাত মুছতে মুছতে সমরকে লক্ষ করে বললাম, সমর, আমি আজ বিকেল পাঁচটা একুশের ট্রেনে বাইরে যাচ্ছি।
কোথায় অমিতদা?–লেখা থেকে মুখ তুলে প্রশ্ন করল সমর।
লিলুয়া সঙ্গে মিসেসও যাচ্ছেন। শুনলাম তুমিও নাকি আজ থেকে কয়েক দিনের জন্যে ছুটি নিচ্ছ?
হ্যাঁ, সোমবার পর্যন্ত। মায়ের শরীরটা ভালো নয়, তাই।
ভূমিকা ছেড়ে এইবার আসল কথায় এলাম।
কী লিখছ সেই সকাল থেকে, দেখি? হাতটা বাড়িয়ে দিলাম সমরের দিকে। ওর হাত থেকে লেখাটা নিয়ে চোখ বোলাতে লাগলাম। তারপর হঠাৎ যেন খুব দেরি করে ফেলেছি এমনি ভাব দেখিয়ে বলে উঠলাম, নাঃ, আর দেরি করলে বোধহয় ট্রেন ধরতে পারব না।বলে ক্যাসুয়ালি একবার আমার হাতঘড়ির দিকে তাকালাম: আরে, কোথায় গেল ঘড়িটা? নীচে ফেলে আসিনি তো। সমর, ইফ য়ু ডোন্ট মাইন্ড, প্লিজ, একবার দেখ না, ঘড়িটা আমি সুকান্তর কাছে ফেলে এসেছি কি না?
আমি এক্ষুনি যাচ্ছি। প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল সমর। বেচারা অনেক উন্নতির আশা রাখে, তাই বসকে অখুশি করতে চায় না।
সমর বেরিয়ে যেতেই আমি তৎপর হয়ে উঠলাম। একলাফে হাজির হলাম দেওয়াল-ঘড়ির সামনে। দেওয়াল-ঘড়িতে তখন চারটে বেজে একুশ মিনিট। সুতরাং কাটা ঘুরিয়ে সাড়ে চারটের জায়গায় নিয়ে গেলাম। ঢং করে একটা ঘণ্টা বাজতেই মিনিটের কাটাটা এগিয়ে দিলাম ৪-৪৬ মিনিটের জায়গায়। বাথরুমে আমার হাতঘড়ি ফেলে আসার সময় ঘড়ির কাটা পঁচিশ মিনিট এগিয়ে দিয়েছিলাম। অতএব এখন বাকি শুধু সমরের ঘড়িটা।
