বুধবার রওনা হয়ে আমরা ফিরে আসব রবিবার। এবং ডেডবডি আবিষ্কার করার জন্যে আমাদের তৈরি থাকবে হবে। স্টেশন থেকে বাড়িতে ফেরার পথে আমি অফিস হয়ে আসব। জানিয়ে আসব আমি কলকাতায় ফিরেছি। আর সেই সুযোগে আমার চেম্বারে গিয়ে দেওয়াল-ঘড়ির কাটা পিছিয়ে সময় শুধরে দেব। তোমাকে আগেই বলেছি, সমর বুধবার থেকে সোমবার পর্যন্ত ছুটি নিচ্ছে। তাই ও কাজে লাগার আগেই ঘড়ির ব্যাপারটা আমি ঠিক করে ফেলতে চাই।
কিন্তু সমরের ঘড়িটার কী করবে?
সেটা আমি ভেবে রেখেছি। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। ইলাকে আশ্বাস দিয়ে বলে চললাম, আমাদের শেষ কাজটা হবে প্রাণকান্তর বডি আবিষ্কার করে পুলিশে খবর দেওয়া। পুলিশ তদন্ত করে জানবে ঠিক পাঁচটার সময় বেরিয়ে পাঁচটা একুশের ট্রেনে আমরা বাইরে গেছি (দরকার পড়লে ট্রেনের পাঞ্চ করা টিকিটগুলোও ওদের দেখাব)। আর আমাদের কথা সাপোর্ট করবে যথাক্রমে সমর এবং মিসেস অরোরা। অর্থাৎ, আমরা দুজনেই হব নিটোল অ্যালিবাইয়ের মালিক। তখন সেই রহস্যময় চোরের ভূমিকা মরা প্রাণকান্তের ঘাড়ে গিয়েই পড়বে। পুলিশ প্রাণকান্তর পকেটে পাবে সেই নকল চাবি, যা সাবানের ছাপ তুলে কেউ তৈরি করিয়েছে বলে পুলিশের সন্দেহ। তখন চাবি পরীক্ষা করে তাতে শুধু প্রাণকান্তরই আঙুলের ছাপ পাওয়া যাবে (পাওয়া যাতে যায়, সে বিষয়ে আমি বিশেষ যত্ন নেব)। অর্থাৎ, ডায়াল এম ফর মার্ডার-এর নায়কের মতো আমি আর চাবির পাচে পা দিচ্ছি না। সমস্ত ব্যাপারটা পুলিশের কাছে সহজ-সরল বলে মনে হবে। প্রাণকান্তর হাত থেকে আমরা চিরদিনের জন্যে মুক্তি পাব।
কিন্তু কিন্তু প্রাণকান্তকে আমরা খুন করব কেমন করে?–অস্ফুট স্বরে জানতে চাইল ইলা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলাম, কী করে খুন করব জানি না। তবে ওর মৃত্যুটা অ্যাক্সিডেন্ট বলে মনে হওয়াটা খুব দরকার। সেই স্টাইলটা জানতে পারলেই আমার কাজ শেষ হবে।
ওটা তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও। ইলা বলল, তুমি যখন এত বুদ্ধি করে সমস্ত কিছু সভ করতে পেরেছ, তখন ওই খুনের ব্যাপারটা আমিই বুদ্ধি করে বের করতে পারব। আমাকে এত বোকা ভাববেন না, মশাই।
প্রাণকান্তকে কীভাবে খুন করা যায় শুধু সেইটুকু ভাবতে-ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমোনোর আগে ব্যাপারটা যতই ভাবতে লাগলাম, ততই একটা কনফিডেন্স টের পেতে লাগলাম। মনে হল, পুলিশকে আমি বোকা বানাতে পারবই।
ইলাকে আরও কাছে টেনে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সে-রাতের মতো নিশ্চিন্তে আর কোনওদিন ঘুমিয়েছি বলে মনে পড়ে না।
.
শুক্রবার দিন ঠিক করা সময়ের কিছু আগেই প্রাণকান্ত এসে হাজির হল। দরজা বন্ধ করে আগের দিনের মতোই সোফায় ওর মুখোমুখি বসলাম। কথাবার্তা শুরু করার আগে প্রাণকান্ত একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর শোওয়ার ঘরের বন্ধ দরজার দিকে ইশারা করল, ইলা নেই তো?
না–নেই।–নির্জলা মিথ্যে বেশ মোলায়েম করে ওকে শুনিয়ে দিলাম। কারণ, শোওয়ার ঘরের বন্ধ দরজার ওপিঠেই কান পেতে অপেক্ষা করছে ইলা। ওর কাছে যখন কিছুই আর অজানা নেই, তখন ওর এই ছেলেমানুষি প্রস্তাবে আর না বলিনি।
তা স্যার, আমার টাকাটা।
এই যে।–পকেট হাতড়ে দুটো দশটাকার নোটের বান্ডিল বের করে ওর হাতে দিলাম।
থ্যাঙ্কস্। হাড়জিরজিরে পাঁচ আঙুলে বান্ডিল দুটো খামচে ধরল প্রাণকান্ত। একবার যেন ওজন করে দেখল টাকাটা। এবং পরমুহূর্তেই বান্ডিল দুটো চালান করে দিল আকাশ-নীল প্যান্টের পকেটে।
মিস্টার সমাদ্দার, একটা কথা ছিল আপনার সঙ্গে, ইতস্তত করে বলেই ফেললাম কথাটা, মানে, ভবিষ্যতে আপনার আবার টাকার দরকার হবে কি না সেটা জানা থাকলে।
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। হায়েনা হাসির সঙ্গে-সঙ্গে ওঠবোস করল প্রাণকান্তর প্রকট কণ্ঠা, লাগবে বই-কি!
কত?–স্থির চোখে শকুন সমাদ্দারের দিকে চেয়ে জানতে চাইলাম।
ভবিষ্যতের কথা কি কেউ বলতে পারে, মিস্টার সান্যাল? প্রয়োজন অনুসারে আমার দাবির পরিমাণও ফ্লাকচুয়েট করবে।
ওসব বাজে কথা রেখে কাজের কথায় আসুন। রুক্ষ স্বরে বললাম, আমি আপনাকে একসঙ্গে একটা মোটা টাকা দিয়ে আপনার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাই। বিশ হাজার টাকায় কি আপনার আপত্তি আছে?
সঙ্গে-সঙ্গে প্রাণকান্তর উশখুশ ভাবটা উবে গেল। ঝুঁকে পড়া শিরদাঁড়াটা টান-টান করে স্বচ্ছ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। চেষ্টা সত্ত্বেও মুহূর্তের জন্যে ওর মুখে ফুটে উঠল বিস্ময়ের ভাব। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আমি কি ভুল শুনছি?
না, ঠিকই শুনছেন। অমি সোজাসুজি উত্তর চাই। হ্যাঁ কি না?
অবশ্যই হ্যাঁ। কিন্তু টাকাটা পাচ্ছি কবে?–প্রাণকান্তর স্বর এবার অর্থলালসায় উৎসুক।
আগামী বুধবার বিকেল পৌনে পাঁচটার সময়। তবে মনে রাখবেন, ঠিক পৌনে পাঁচটায়। কারণ আপনার ওই সময়ানুবর্তিতা রচনায় আমিও একবার হায়েস্ট নম্বর পেয়েছিলাম, হেঁ, হেঁ, হেঁ।–প্রাণকান্তকে ব্যঙ্গ করে উঠে দাঁড়ালাম।
বিদায় দেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। সোফা ছেড়ে চটপট দরজার দিকে পা বাড়াল সমাদ্দার।
দরজা বন্ধ করে ফিরে দাঁড়াতেই শোওয়ার ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এল ইলা। ওর চোখে-মুখে ঘৃণা উপচে পড়ছে।
কী, প্রথম স্বামীদেবতার মধুর কণ্ঠস্বর শোনার সাধ মিটেছে?
লোকটা…লোকটা একটা পিশাচ!–ঘৃণাভরা স্বরে জবাব দিল ইলা।
