কেন?–বাধা দিয়ে জানতে চাইল ইলা।
দরকার আছে, তাই। যাকগে, শোনো। সেইদিন ঠিক পৌনে পাঁচটার সময় প্রাণকান্তর সঙ্গে আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করব। ওকে প্রচুর টাকার লোেভ দেখাব, তা হলে ও ঠিক সময়মতোই আসবে। এদিকে অফিস থেকে পাঁচটা বাজতে পঁচিশের সময় আমি বেরিয়ে পড়ছি। কিন্তু আমার সহকর্মী সমর জানবে আমি বেরুলাম ঠিক পাঁচটায়–পাঁচটা বাজতে পঁচিশে নয়। কারণ, বুধবার আমার রুমের দেওয়াল-ঘড়ির কাটা সমরকে লুকিয়ে আমি পঁচিশমিনিট এগিয়ে দেব। এগিয়ে দেব আমার হাতঘড়ির কাটাও। এবং সমরের হাতঘড়ির কাটাও যে করে থোক আমাকে সরাতে হবে। মোটমাট পাঁচটা বাজতে পঁচিশ মিনিটের সময় অফিস থেকে বেরিয়ে আমি সোজা বাড়িতে আসছি।
এখন ভালো করে শোনো তোমাকে কী করতে হবে। ঠিক পাঁচটা বাজতে পঁচিশের সময় তুমি রেডি হয়ে বাইরে বেরোবে–অবশ্য বেরোনোর আগে তোমার ঘড়ির কাটা পঁচিশ মিনিট এগিয়ে নেবে। যাতে সময় তখন পাঁচটা বলে মনে হয়। ফ্ল্যাটের বাইরে বেরিয়েই তুমি অরোরাদের (আমাদের উলটোদিকের ফ্ল্যাটের সেই পাঞ্জাবি ভদ্রলোকদের কথা বলছি) ফ্ল্যাটের দরজায় আস্তে নক করবে। নক করেই চট করে এসে ঝুঁকে দাঁড়াবে আমাদের ফ্ল্যাটের দরজায়। বেশ খটাং-খটাং করে চাবি ঘোরাবে। তবে দরজার পাল্লায় সামান্য ফাঁক রেখে দেবে যাতে ঘরের ভেতরের শব্দ বাইরে থেকে শোনা যায়। এদিকে তোমার পেছনে অরোরাদের ফ্ল্যাটের দরজা ততক্ষণে খুলে গেছে। আর সেই দরজায় দাঁড়িয়ে মিসেস অরোরা বেশ কৌতূহলে তোমাকে লক্ষ করছেন (যেহেতু মিস্টার অরোরা রাত বারোটার আগে কোনওদিনই বাড়ি ফেরেন না)। তখন তোমার কাজ হবে ওঁর সঙ্গে কথা বলা। নকল চাবি দিয়ে যে আমাদের ফ্ল্যাটে গত রবিবার চোর ঢুকেছিল, সে কথা ওঁকে চটপট জানিয়ে দেবে। তুমি যে আমার সঙ্গে পাঁচটা একুশের ট্রেনে বাইরে যাচ্ছ সে কথাও বলবে এবং রোববার পর্যন্ত, অর্থাৎ, যে কদিন আমরা থাকব না, ওঁকে আমাদের ফ্ল্যাটের দিকে একটু নজর রাখতে রিকোয়েস্ট করবে। বলা তো যায় না, সেই চোরটা কখন আবার এসে নকল চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ে? মিসেস অরোরা নজর রাখতে পারুন আর নাই পারুন, একগাল হেসে নজর রাখবেন বলে তোমাকে আশ্বাস দেবেন এবং আমিও সেটাই চাই। কারণ, পরে প্রাণকান্তর ডেডবডি পাওয়ার পর মিসেস অরোরা ওঁর নজর রাখার কাজে গাফিলতি করেছেন বলে নিজেই আপশোশ করবেন। ইশ, কেন তিনি ভালো করে নজর রাখলেন না! নয়তো ওই চোরটি কি কখনও ঢুকতে পারত?–যাক, আশা করি ব্যাপারটা তুমি পরিষ্কার বুঝতে পেরেছ? হ্যাঁ, এইবার কথার ফাঁকে তোমার ঘড়িতে যে পাঁচটা বাজে (অর্থাৎ, প্রকৃতপক্ষে সময় তখন পাঁচটা বাজতে পঁচিশ মিনিট) সেটাও বেশ কায়দা করে জানিয়ে দেবে ওঁকে। আর ঠিক সেইসময় তুমি কাঁটা এগিয়ে দেওয়ার ফলে আমাদের দেওয়াল-ঘড়িতেও ঢং-ঢং করে পাঁচটা বাজবে। সুতরাং ভবিষ্যতে মিসেস অরোরা যদি কোনওদিন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সামনে পড়েন, তখন তিনি শপথ করেই বলবেন যে, ঠিক পাঁচটার সময় তুমি ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে গেছ। ব্যস, তারপর মিসেস অরোরার চোখের সামনে দিয়েই চাবি ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে তুমি লিফটে চড়ে নামতে শুরু করবে।
এইবারই শুরু হচ্ছে পরিকল্পনার সবচেয়ে জটিল এবং কুটিল অংশ। লিফট চলতে শুরু করামাত্রই তুমি চোখে একটা গগল্স লাগিয়ে নেবে, চুলের কায়দা সামান্য পালটে নেবে। এবং আমাদের ফ্ল্যাটের ঠিক নীচের তলাতেই লিফট থামিয়ে লিফট থেকে নেমে পড়বে। তুমি লিফটের বোতাম এমনভাবে টিপবে যাতে তুমি নেমে পড়ার পর খালি লিফট চলে যায় একতলায়। কারণ, ঠিক সেইসময়ে আমি একতলায় সানগ্লাস পরে লিফট নামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি।
লিফট নেমে যাওয়ামাত্রই তুমি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করবে। লক্ষ রাখবে, যেন কেউ তোমাকে দেখতে না পায়। তুমি ফিরে এসে চাবি দিয়ে দরজা খুলে আবার ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়বে। নিঃশব্দে বন্ধ করে দেবে ফ্ল্যাটের দরজা। তারপর তোমার হাতঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে ঠিক জায়গায় নিয়ে আসবে। দেওয়াল-ঘড়ির কাটার ব্যাপারটা আমিই ভাবব, তোমাকে ভাবতে হবে না। এবার তুমি সোফায় বসে আমার জন্যে ওয়েট করবে।
পৌনে পাঁচটার মধ্যেই (অফিস থেকে বাড়িতে আসতে আমার মিনিট দশেকের বেশি লাগবে না। কারণ, অফিস আমার বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়) আমি ফ্ল্যাটে চলে আসছি। তারপর আমরা দুজনে মিলে প্রাণকান্তর জন্যে ওয়েট করব। আমাদের ফ্ল্যাটে আসার সময় প্রাণকান্তকে যদি কেউ দেখতে পায়, তবে কোনও ক্ষতি নেই। কারণ, পরে সেই ব্যক্তিই আমাদের ফ্ল্যাটে মৃত প্রাণকান্তকে শনাক্ত করে বলবে, ও সেই আগন্তুক। অর্থাৎ, নকলচাবি নিয়ে হানা দেওয়া রাতের চোর।
আমি থামতেই ইলা আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরল ও ওয়ান্ডারফুল, অমিত, ওয়ান্ডারফুল! ফিশফিশ করে ও বলল, আমাদের কেউ ধরতে পারবে না। প্রাণকান্তর হাত থেকে খুব সহজেই আমরা ফ্রি হয়ে যাব।
কিন্তু এখনও কিছুটা বাকি আছে, ইলা।
অন্ধকারেই ইলা মুখ তুলে তাকাল আমার দিকে।
পরের কাজগুলোর কথা তোমাকে বলা হয়নি।
কী কাজ?
প্রাণকান্ত পৌনে পাঁচটায় আসার পর আমরা ওকে খুন করব। ওর প্যান্টের পকেটে গুঁজে দেব আমার বানানো সেই নকল চাবিটা (পুলিশ সেই চাবিওলাকে কোনওদিন খুঁজে পাবে না বলেই আমার ধারণা)। ততক্ষণে দেওয়াল-ঘড়িতে প্রায় পাঁচটা কুড়ি হবে (অর্থাৎ, আসলে ঠিক পাঁচটা)। তখন আমি দেওয়াল ঘড়ির কাটা ফিরিয়ে নিয়ে যাব ঠিক কুড়ি মিনিট পেছনে। এবং দেওয়াল-ঘড়ির নিয়ম অনুযায়ী, ঘড়িতে ঘণ্টা বাজার ঢং একই থাকবে। অর্থাৎ, সাড়ে পাঁচটার সময় আবার একটা ঘণ্টাই বাজবেতার বেশি নয়। এবার তুমি আর আমি ফ্ল্যাটের দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে চুপিসাড়ে বেরিয়ে পড়ব পাঁচটা একুশের ট্রেন ধরার জন্যে।
