বিয়ের পর আমাদের পাঁচ বছর কেটে গেছে। খ্যাতি আর সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখন প্রশমিত। আজ অমিত সান্যাল নামটা প্রায় প্রতিটি পাঠকের পরিচিত। আমার ছবি ছাড়া কোনও সংস্কৃতি-সংবাদ প্রকাশিত হয় না। যে-কোনও পুরস্কার বিবেচনার আগে সবার মনে পড়ে আমার নামটার কথা। চলাচল পত্রিকা ও অমিত সান্যাল আজ এক ও অভিন্ন।
উপরোক্ত ইত্যাদি ইত্যাদির ফলস্বরূপ ভবানীপুরে দেড়লাখ টাকা দিয়ে কিনেছি এই ফ্ল্যাট। যে-ফ্ল্যাটে বসে এখন আমাকে কথা বলতে হচ্ছে এক ব্ল্যাকমেলারের সঙ্গে।
কারণ, পাঁচবছর নির্বিঘ্ন দাম্পত্যজীবনের পর গতকাল রাত বারোটার সময় হঠাৎ একটা ফোন এল।
ওয়াল ক্লকের রাত বারোটার সংকেত ঘরের চারদেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে ঝনঝন করে বেজে উঠেছে ঘরের টেলিফোন। ইলা অঘোরে ঘুমিয়ে রয়েছে বিছানায়। সুতরাং ওর যাতে ঘুমের ব্যাঘাত না হয়, সেইজন্যে সাততাড়াতাড়ি লেখার টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়ে রিসিভার তুলে নিলাম, হ্যালো, অমিত সান্যাল স্পিকিং।
অধম আপনাকে একটা সামান্য সংবাদ দিতে চায়।-ও-প্রান্ত থেকে নরম, মিঠে স্বর ভেসে এল।
কীসের সংবাদ?–রূঢ় স্বরে প্রশ্ন করলাম। লোকটা খবর শোনানোর আর সময় পেল না।
আপনার স্ত্রী বিগ্যামির অপরাধে অপরাধিনী। সে আপনার সঙ্গে বিবাহের পূর্বে একজন ব্যক্তির সহিত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়।
ব্যাটা দেখি সাধু ভাষায় কথা বলে! একটা খিস্তি দিয়ে বলে উঠলাম, কে আপনি?
শান্ত স্বরে উত্তর এল, আপনার স্ত্রী ইলা সমাদ্দারের প্রথম স্বামীর নাম শ্রীপ্রাণকান্ত সমাদ্দার। আইনত সেই ব্যক্তির সঙ্গে শ্রীমতী ইলার সম্পর্ক আজও অটুট। যদি অনুমতি দেন তবে আমি আগামীকাল সন্ধে সাতটায় আপনার বাড়িতে উপস্থিত হতে চাই। মনে হয় আমাদের মধ্যে একটা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এবং স্বভাবতই সে-আলোচনার সময় আপনার স্ত্রী অনুপস্থিত থাকাই বাঞ্ছনীয়।
কিছুক্ষণ চিন্তা-ভাবনার পর লোকটার কথায় রাজি হলাম, ঠিক আছে। আগামীকাল সন্ধে সাতটায়।
ভারাক্রান্ত মনে রিসিভার নামিয়ে আবার লিখতে বসলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ নিষ্ফল চেষ্টার পর আলো নিভিয়ে ইলার পাশে এসে শুয়ে পড়লাম।
*
অতএব গতকাল রাতের ওই টেলিফোনের পরিণতি হিসেবে আজ সন্ধে সাতটায় এই কালান্তক সাক্ষাৎকার।
ছটা নাগাদ ইলাকে বলে-কয়ে প্রায় জোর করেই শপিং-এ পাঠিয়েছি। কেন জানি না, যে ইলা কোনওদিন আমার কথার অবাধ্য হয়নি, সে-ই হঠাৎ কেমন বেঁকে বসেছে। ওর নাকি শরীর খারাপ। মন ভালো নেই। তা ছাড়া কেনাকাটার কীই-বা আছে! এইসব নানান কথা বলেছে। কিন্তু আমিও নাছোড়বান্দা। যতরকম উপায় সম্ভব, সবকটাই প্রয়োগ করে শেষ পর্যন্ত ওকে বাড়িছাড়া করেছি।
সাধারণত ইলার কাছে আমি কোনও কথাই গোপন করি না। কিন্তু ভেবে দেখলাম, এ ব্যাপারটা ভালো করে তলিয়ে না দেখে ওকে কিছু বলে বসা ঠিক হবে না। তাই সেই অচেনা আগন্তুকের প্রতীক্ষা করেছি।
ঘরের দেওয়াল-ঘড়িতে ঢং-ঢং করে সাতটা বাজতেই দরজায় কারও নক করার শব্দ হল, ঠকঠক –।
উৎকণ্ঠার চরম সীমায় পৌঁছে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। তাই চার-পাঁচ লাফে সোফা ও দরজার দূরত্বটুকু পার হয়ে ঝটিতি দরজা খুলে দাঁড়িয়েছি। সামনেই হাড়ের ওপর চামড়া জড়ানো একটা লোক। ফরসা রং সূর্যদেবের অনুগ্রহে তামাটে হয়ে গেছে। তোবড়ানো গালে বয়েসের ভাঁজ। সম্ভবত অকালবার্ধক্য। ছোট-ছোট ভুরুর নীচে কটা চোখ দুটো দু-টুকরো ফসফরাসের মতো জ্বলছে। কিন্তু মাঝে-মাঝে সে-চোখে ভেসে উঠছে এক প্রশান্ত স্বচ্ছ দৃষ্টি। মাথার চুল পরিপাটি করে পাতা কেটে আঁচড়ানো। পাতলা ঠোঁটের ওপর ঝাটা গোঁফটার মতো খগ নাকটিও ভীষণভাবে বেমানান।
লোকটির পরনে ঢোলা হাওয়াই শার্ট ও একটি সুতির প্যান্ট। দুটোরই রং আকাশ-নীল। কিন্তু যত্নের অভাবে অনেক জায়গায় রং জ্বলে গেছে।
সব মিলিয়ে একটা ডানাকাটা শকুন যেন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
লোকটা সরু-সরু কাঠির মতো হাত দুটো এক করে নমস্কার করল, নমস্কার, আমিই কাল রাত বারোটার আপনাকে ফোন করেছিলাম। একটু থেমে লোকটি আবার বলল, অপেক্ষাকৃত নীচু স্বরে, ইলা বাড়িতে নেই তো।
ভেতরে আসুন। একটা অজানা ভয়ে হাত-পা সিঁটিয়ে উঠল। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন উত্তাল হয়ে উঠল।
লোকটা ঘরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দিলাম। ইশারায় সোফায় বসতে বললাম। তারপর এগিয়ে গিয়ে বসলাম শকুনটার মুখোমুখি। বললাম, আমিই অমিত সান্যাল।
আজকাল আমার নিজের নামটা উচ্চারণ করতে বেশ ভালো লাগে। যেন সকলকে ডেকে বলছি, আমিই আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট।
লোকটি কিন্তু এতে একটুও প্রভাবিত হল না। শুকনো স্বরে জবাব দিল, নামটা আমি জানি বলেই তো মনে হচ্ছে।
রাগ হলেও মুখে সে-ভাব প্রকাশ করলাম না। লোকটা কতটা জানে, সেটা আগে আমার জানা দরকার।
ইলার ব্যাপারটা আমি আপনার কাছ থেকে খোলাখুলিভাবে জানতে চাই।
সেটা বলব বলেই তো এসেছি।একটু থেমে আবার বলল সে, ইলা আপনাকে বিয়ে করার সময় অলরেডি বিবাহিতা ছিল।
তা হলে সে কথা আপনি আমাকে পাঁচবছর আগে জানাননি কেন?– উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলাম, এখন কেন এসেছেন এ কথা বলতে?
চেঁচাবেন না, স্যার। হাত তুলে শকুনপাখি বাধা দিল আমাকে, আপনার তো আবার হার্টের রোগ আছে।
