আপনি–আপনি সেটা জানলেন কেমন করে?
আমাদের জানতে হয়। শান্ত স্বরে শকুন উত্তর দিল, যাকগে, আপনি জিগ্যেস করছিলেন। আমি পাঁচবছর কেন অপেক্ষা করলাম, তাই তো? তার কারণ কুমারী গাই কখনও দুধ দেয় না। পাঁচটি বছর ধৈর্য ধরে আমি অপেক্ষা করেছি আপনার শ্রীবৃদ্ধির জন্যে। তারপর আজ যখন আপনি গর্ভবতী, উন্নতির চরম ধাপে, তখনই আমি আমার দোহনপর্ব শুরু করতে চাইছি। পাঁচ বছর আমার নষ্ট হয়েছে ঠিক কথা, কিন্তু এখন কাজটা আমার পক্ষে অনেক সোজা হয়ে গেছে।
আমার অসহায়তা লোকটি পরিষ্কার বুঝতে পারল, তাই মুচকি হেসে বলে চলল, জানি না, ইলা কেন ব্যাপারটা আপনার কাছে চেপে গেছে, তবে এটা সত্যি যে, ওর ভূতপূর্ব স্বামী এখনও বহাল তবিয়তে বেঁচে রয়েছে। তার নাম প্রাণকান্ত সমাদ্দার…সে তো কালই আপনাকে ফোনে জানিয়েছি।
ইলার মতো কোনও বুদ্ধিমতী মেয়ে যে কখনও এরকম বোকার মতো কাজ করে বসতে পারে, তা আমি কল্পনাও করিনি। আমিও তো অনেক মেয়ের সঙ্গে প্রাকবিবাহজীবনে অনেক লটরপটর করেছি, কিন্তু কই, এত বড় ভুল তো করিনি!
এবার লোকটিকে বোকার মতো বলেছি, কই, আমি তো কিছু জানি না!
তারপর যখনই লোকটি বলেছে, সে-ই ইলার প্রথম স্বামী, তখন অবাক হয়ে হাঁ করে তার মুখের দিকে চেয়ে থেকেছি।
পরিস্থিতির ঝটকা সামলে নিয়ে বললাম, কত টাকা চান আপনি?
আপাতত হাজার-দুয়েক। কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই লোকটা প্যান্টের পকেট হাতড়ে কিছু কাগজপত্র বের করল, টাকা দেওয়ার আগে আমার কথা সত্যি কি না পরখ করে নিন। এই যে আমাদের বিয়ের পর তোলা ফটো। আর এটা হল ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশান সার্টিফিকেট।
প্রাণকান্তর কথা যে আমি অবিশ্বাস করেছি, তা নয়। তবু একবার ক্ষীণ আশা নিয়ে আমার চোখের নজর ঝাঁপিয়ে পড়েছে কাগজগুলোর ওপরে, এবং আমার বিশ্বাস আরও মজবুত হয়েছে।
সুতরাং অকারণে সময় নষ্ট না করে উঠে গিয়ে পাশের ঘর থেকে চেকবই নিয়ে এলাম। প্রাণকান্তর সামনেই পেন বাগিয়ে ধরে লিখতে শুরু করলাম।
স্যার!
লেখা বন্ধ করে মাঝপথে মুখ তুলে তাকালাম।
স্যার, আমি ইংরেজি পড়তে জানি না, তবে মা-বাবার অনুগ্রহে এক-দুইটা জানি। তাই বলছিলাম, চেকের বদলে ক্যাশটাকা দিলে আমার পক্ষে নিতেও সুবিধে, পরখ করতেও সুবিধে।
প্রাণকান্তর মিছরিমাখা স্বরে টের পেলাম ধরা পড়ে গেছি। নাঃ, লোকটা নেহাত বোকা নয়। নগদনারায়ণের কারবারে যে কোনও দুশ্চিন্তা নেই, সেটা ও ভালোই জানে।
সুতরাং চেকটা ছিঁড়ে ফেলে পেন বুকপকেটে গুঁজে ফেললাম, বললাম, তা হলে আমার পক্ষে এখন ক্যাশটাকা দেওয়া সম্ভব নয়। দিনকয়েক সময় চাই।
প্রাণকান্ত কিছুক্ষণ কী ভাবল, তারপর বলল, ছোটবেলায় সময়ানুবর্তিতা রচনায় আমি ক্লাসে হায়েস্ট নম্বর পেয়েছিলাম। তাই ওই সময়-টময়ের ব্যাপারগুলো আমি নিখুঁতভাবে মেনটেন করি! আগামী শুক্রবার রাত নটার সময় আসব। দেখবেন স্যার, টাকাটা যেন পাই।
একটু হেঁ-হেঁ করে হাত কচলে উঠে দাঁড়াল সমাদ্দার। এগিয়ে চলল দরজার দিকে। আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে ধরলাম। এবং খেয়াল করলাম, আমার সাহিত্যজীবনে এই প্রথম এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমি এক নিখুঁত খুনের প্লট চিন্তা করে চলেছি। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শ্ৰীঅমিত সান্যাল জীবনে সর্বপ্রথম এক যুগান্তকারী গোয়েন্দা উপন্যাস লেখায় হাত দেবেন।
কিন্তু দরজা ছেড়ে বেরোনোর সময়ও প্রাণকান্ত আমার মনের পরোপকারী চিন্তাধারার কথা টের পেল না। কারণ, আমার মুখের অমায়িক হাসিটা ওকে ভাববার সুযোগ দিচ্ছিল, আমি ভয় পেয়েছি।
ইলার ফিরতে যে খুব বেশি দেরি হবে না, তা জানতাম। তাই ওর স্নায়ুর ওপর যাতে হঠাৎ চাপ সৃষ্টি করা যায়, সেইজন্যে দৃশ্যসজ্জায় চটপট মনোযোগ দিলাম। ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খুলে রাখলাম। নিভিয়ে দিলাম ঘরের সব কটা আলো। তারপর বসবার ঘর ছেড়ে শোওয়ার ঘরে গেলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে চেয়ারে বসলাম দরজার ঠিক মুখোমুখি। তারপর আমার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে থাকা শেড দেওয়া টেবল-ল্যাম্পটাকে জ্বেলে দিলাম। অর্থাৎ, দরজায় সামনে থেকে দেখলে আমার শরীরের সিলুয়েট ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়বে না। আর দেখা যাবে শুধু জ্বলন্ত সিগারেটের অগ্রভাগটুকু।
প্রতীক্ষা শুরু করার মিনিট-দশেকের মধ্যেই সদর দরজায় কাছ থেকে কানে এল একটা অস্ফুট চাপা আর্তনাদ। তারপরেই ইলার কাঁপা স্বর, অমিত, অমিত।
আমি নীরব।
অমিত, তুমি কোথায়?
আমি তবুও নীরব। সিগারেটের ধোঁয়ার কালো ছায়া ঘুরে বেড়াতে লাগল ঘরের দেওয়ালে।
এবার ওর হালকা পায়ের শব্দ এগিয়ে আসতে লাগল শোওয়ার ঘরের দরজার দিকে, যে-ঘরে আমি বসে আছি।
দরজার কাছে আসামাত্রই আমি উঠে দাঁড়ালাম। এবং একইসঙ্গে ঘটে গেল তিনটে ঘটনা।
এক, কিনে আনা জিনিসপত্রের বাক্সগুলো ইলার হাত থেকে স্খলিত হয়ে পড়ে গেল।
দুই, ওর ভোকাল কর্ড ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। ওর গলাফাটানো চিৎকারে গমগম করে উঠলো গোটা ঘরটা।
আর শেষ ঘটনাটা যেমন চমকপ্রদ তেমনি আকস্মিক। ইলা ঘুরে দাঁড়িয়েই উন্মাদের মতো ছুটতে শুরু করল।
আমিও আর দেরি না করে ক্ষিপ্রগতিতে ওকে অনুসরণ করলাম। সিগারেটের টুকরোটা বসবার ঘরের টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলাম। তারপরই ফ্ল্যাটের খোলা দরজা লক্ষ করে দৌড়তে শুরু করলাম।
