হাতের ব্যাগটার দিকে একবার তাকিয়ে চিন্তিত মুখে ছোটকা বলল, সেটাই তো তখন থেকে ভাবছি। দেখি, অফিসে গিয়ে ব্যাপারটা জানাই। তারপর আমাদের রিলেটিভিটি ল্যাবরেটরিতে ব্যাগটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে।
ঝামেলা উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল, সবই সম্পূর্ণরূপে বুঝিলাম। তবে কিছু সামথিং ঝাপসা রয়ে গেল।
ঝালাপালা হেসে জবাব দিল, তোমার কাছে ঝাপসা থাকাই ভালো। তুমি বেশি বুঝে গেলে আর এক বিপদ হবে। এখন চুপচাপ বাড়ি চলো, নইলে তোমাকে ওই টানেলে ঢুকিয়ে ফোর ডাইমেনশন্যাল ওয়ার্ল্ডে পাচার করে দেব।
ঝামেলা মাথা নেড়ে বলল, সে যা-ই বলো, আজ আমার জন্যেই তস্করং ধৃতং
চন্দ্রকান্ত অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, শেষের কথাগুলোর মানে?
ঝামেলা বলল, ওগুলো হল মডার্ন সংস্কৃত–তোমরা বুঝবে না। সেই কোন আদিম যুগে পড়ে আছ! তস্করং ধৃতং মানে চোর ধরা পড়ল।
আর হস্তনস্ত মানে? ইন্দ্ৰকান্ত প্রশ্ন করল।
ছোটকা হেসে জবাব দিল, হস্তনস্ত মানে বোধহয় হাতেনাতে। কী রে, ঝামেলা, ঠিক বলিনি?
ঝামেলা মিহি গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ফুজিয়ামা! ফুজিয়ামা! সেই সঙ্গে ওর কপালের লাল নীল-হলদে-সবুজ বাতিগুলো দপদপ করে জ্বলতে-নিভতে লাগল।
ছকের বাইরে (নভেলেট)
প্রাকবিবাহকালে ইলার প্রেমিকের সংখ্যা কত ছিল বিয়ের পর সে নিয়ে আমি একেবারেই মাথা ঘামাইনি। অবশ্য ইলাও যে আমার ভূতপূর্ব প্রেমিকার সংখ্যা নিয়ে গবেষণা করছে, এমন নয়। অথচ এই ব্ল্যাকমেল সংক্রান্ত ব্যাপারটা যে আমাদের অতীত জীবনের প্রেমিক-প্রেমিকাকে জড়িয়েই, তা বুঝতে আমার অসুবিধে হল না। তবুও বোকা-বোকা, ন্যাকা-ন্যাকা চোখ মেলে সামনে বসে থাকা শকুনটার দিকে তাকিয়ে আধো-আধো স্বরে বললাম, কই, আমি তো কিছু জানি না।
লোকটা একটু অপমানিত বোধ করল। রুমাল জড়িয়ে খঙ্গ নাকটাকে পাকড়ে ধরে সশব্দে নাক ঝাড়ল। তারপর কাচের মতো স্বচ্ছ দৃষ্টি মেলে ধরল আমার দিকে, তাই বুঝি?
এবার অপমানিত হওয়ার পালা আমার। কারণ, কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে ওর হাড়জিরজিরে হাতটা বাড়িয়ে আমার থুতনিটা ঈষৎ তুলে ধরেছে লোকটা।
একঝটকায় ওর হাত ছাড়িয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম, কী, কী চান আপনি?
ট-এ আকার, ক-এ আকারটাকা।–নিঃশব্দে হাসল লোকটা। বাইরে চুপ করে থাকলেও মনে-মনে পরিস্থিতির গুরুত্ব ওজন করলাম। একদিকে আমার সুনাম, সামাজিক মর্যাদা, আর অন্যদিকে টাকা, হয়তো বিশাল অঙ্কের টাকা। আর যদি এই অর্থপিশাচের কথার প্রতিবাদ করি তা হলে অনিবার্যভাবেই ও সব ফাঁস করে দেবে। রাস্তার লোকে আমার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে বেড়াবে, ওই যে বৎসগণ, যে-ব্যক্তিটি তোমাদের চর্মচক্ষুর সম্মুখ দিয়া ছন্দোময় পদবিক্ষেপে উত্তরদিক অভিমুখে চলিয়াছেন, তিনি একজন নিরীহ নাগরিকের বিবাহিতা স্ত্রীকে পুনরায় বিবাহ করিয়া উক্ত নাগরিককে বাধিত এবং দেশের জনসাধারণকে আহ্লাদিত করিয়াছেন। অতএব বৎসগণ…।
নাঃ, আর ভাবতে পারছি না। শেষে কি প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক শ্রীঅমিত সান্যাল মুখে চুনকালি মেখে সং-এর নাচ নাচবেন? অসম্ভব।
আপনার নামটা জানতে পারি?–শকুনমুখো লোকটার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলাম।
অবশ্যই। আমারই নাম প্রাণকান্ত সমাদ্দার।
মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। জলে ভেসে থাকা নৌকোর মতো দুলে উঠল গোটা ঘরটা। কোনওরকমে উচ্চারণ করলাম, আপ–আপনিই?
আজ্ঞে হ্যাঁ। সলজ্জ নম্র স্বরে উত্তর দিল প্রাণকান্ত সমাদ্দার, আমিই সেই হতভাগ্য, আপনার স্ত্রীর ভূতপূর্ব স্বামী। ইলার সঙ্গে আমার সম্পর্ক আইনত ছেদ হয়েছে বলে আমার তো মনে পড়ে না।
বিয়ের পর ইলার অতীত ভুলে গিয়ে (সেইসঙ্গে আমার অতীতটাও ভুলেছিল ইলা) আমি ওকে মেনে নিয়েছিলাম। আরও প্রাঞ্জল করে বলতে গেলে আমরা পরস্পরকে গ্রহণ করেছিলাম দূর অস্ত সুখের প্রাসাদের পাসপোর্ট হিসেবে। তখন বুঝিনি ইলা প্রেম, ভালোবাসা ছাড়াও বিবাহজাতীয় একটা বিরক্তিকর জিনিস আগেভাগেই সেরে বসে আছে। জানলে কি আর ওই ভুল করি!
ইলাকে ভালোবাসার পর আমার জীবনে এসেছে সাফল্যের ঝাপটা। যে আমি রোজ নতুন জুতো কিনে পাবলিশারদের বাড়ি-বাড়ি ধরনা দিতাম, সেই আমাকেই চাকরি দিল বিখ্যাত বাংলা তোমার সঙ্গে জগ্যেস করায় বিরকার? কিন্তু সে বিয়ের কথা দৈনিক চলাচল। তাও আবার সাতশো টাকা মাইনের। সুতরাং ইলা সমাদ্দার আমার কাছে হয়ে দাঁড়াল জীবন্ত পরশপাথর। তার পরেই আমার কোন এক দূরসম্পর্কের কাকা না জ্যাঠা পরলোকগমন করে আমাকে করে দিয়ে গেল লাখপতি। জানি না ভদ্রলোক সুস্থ মস্তিষ্কে ছিলেন কি না। নইলে আপনারজন ছেড়ে একেবারে পরেরজন এই অধমকে কেনই-বা সব বিষয়সম্পত্তি দিয়ে যাওয়া!
আমার সেই স্বর্ণযুগের সময়েই ইলা হঠাৎ বলে বসেছিল, অমিত, আমাকে বিয়ে না করলে তোমার সঙ্গে আমার এই বোধহয় শেষ দেখা।
কারণ জিগ্যেস করায় বিষণ্ণ হাসি হেসে ইলা বলেছে, তোমার যা-যা পাওয়ার তা তো তুমি পেয়েই গেছ, আমাকে আর কী দরকার? কিন্তু সেটা তো আমি মুখ ফুটে বলতে পারি না। তুমি যাতে আমাকে একেবারে ছেড়ে দাও, সেইজন্যে ওই বিয়ের কথা বললাম।
ইলার কথার প্রতিটি শব্দ মিছরির ছুরির মতো আমার পুরুষত্বের ওপরে কেটে বসেছে। মাথা ঝাঁকিয়ে অট্টহাসি হেসে ইলাকে বুকে টেনে নিয়েছি। এতদিনকার মিথ্যে আশ্বাসকে সত্যে পরিণত করে ওকে বিয়ে করেছি। অর্থাৎ, জীবনযুদ্ধে অভিজ্ঞ এবং অভিজ্ঞা দুই নরনারীর মিলন সংঘটিত হয়েছে। এবং স্বাভাবিকভাবেই এ বিয়েতে আমাদের দুজনেরই কোনও আপোশ ছিল না।
