এই ব্যাগটা তুমি কোথায় পেয়েছ?
সল্টলেকে বাস স্টপেজের কাছে কুড়িয়ে পেয়েছি।
রূপালির কথা থেকে জানা গেল, ব্যাগটা যখন ও কুড়িয়ে পায় তখন আশেপাশে কেউ ছিল না। তাই ও ব্যাগটা নিয়ে বাসে উঠে পড়ে। কঁকুড়গাছির কাছে ওর বন্ধু রীতার বাড়ি। সেখানে ওদের আর-এক বন্ধু রঙ্গনার আসার কথা। তারপর তিন বন্ধুতে মিলে ধর্মতলার পুজোর ড্রেস কিনতে রওনা হবে এইরকমই ঠিক করা ছিল।
বাস থেকে নেমে রীতার বাড়ি যাওয়ার সময় ও কী ভেবে ওর ছোট্ট পার্স আর রুমালটা এই ব্যাগটায় রাখে। কিন্তু তারপরই দ্যাখে যে ওগুলোর আর কোনও হদিস নেই। তখন ও অবাক হয়ে ঢিল-পাটকেল, গাছের পাতা, চায়ের ভঁড়, অনেক কিছুই ব্যাগটার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় এবং দ্যাখে যে, সেগুলোও বেমালুম অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রথমটায় ও ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরই ওর মনে হয়, ব্যাপারটা খুব মজার। তাই রীতা আর রঙ্গনাকে ও কিছুই জানায়নি। শুধু বলেছে, বাস থেকে নামার পর ওর পার্সটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। তারপর এই দোকানে ঢুকে ও স্রেফ মজা করার জন্যই বেশ কিছু জামাকাপড় ব্যাগটায় ঢুকিয়ে অদৃশ্য করে দেয়। কিন্তু ওগুলো যে কোথায় গেছে ও তার বিন্দুবিসর্গও জানে না।
কথা শেষ করে রূপালি কেঁদে ফেলল। ছোটকাকে বারবার করে অনুরোধ করল ওর বাড়িতে যেন কিছু না জানানো হয়।
ছোটকা মালিকের কাছ থেকে একটা প্যাডের কাগজ নিয়ে খসখস করে একটা রিপোর্ট লিখে সই করে দিল। তারপর তিন জায়গায় ফোন করে মিনিটকয়েক ধরে কথাবার্তা বলল।
কথাবার্তা শেষ হলে ছোটকা রূপালিকে বলল, তোমার আর কোনও চিন্তা নেই–তুমি যাও। শুধু জেনে রেখো, আজ তুমি সাংঘাতিক বিপদ থেকে বেঁচে গেছ। কারণ এই ব্যাগটা আসলে ব্যাগ নয়…একটা টানেল।
রূপালি কাচের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চোখ মুছতে মুছতে বন্ধুদের খোঁজে চলে গেল।
মিস্টার আস্থানার সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ব্যাগটা নিয়ে ছোটকাও বেরিয়ে এল কাচের ঘর থেকে।
ছোটকা বেরিয়ে আসতেই ঝামেলা জিগ্যেস করল, কী হল, সলভ হইল?
ছোটকা হেসে বলল, হ্যাঁ, হইল। তারপর ঝালা-পালাকে লক্ষ করে বলল, এখন চটপট তোদের প্যান্ট-জামা পছন্দ কর তো।
চন্দ্রকান্ত আবদারের সুরে বলল, ব্যাগটার মিস্ট্রিটা আমাদের খুলে বলো, ছোটকা।
আগে কেনাকাটা সেরে নে, তারপর যেতে-যেতে বলছি।
কেনাকাটা সেরে রাস্তায় বেরোনোর সময় একটা লম্বা রোবট ঝামেলাকে লক্ষ করে মন্তব্য করল, ন্যাড়া খোকা।
সেটা শুনে ঝামেলা তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে উঠে তেড়ে গেল লম্বা রোবটটার দিকে। বলল, টুডে তোর ওয়ান ডে কি আমার ওয়ান ডে!
ঝালাপালা কোনওরকমে ঝামেলাকে টেনে ধরে সামাল দিল।
ছোটকা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ও কী বলল একটু ঝুঝিয়ে দে তো!
চন্দ্র বলল, ঝামেলা বলল, আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।
ইন্দ্র বলল, ওসব বাদ দাও। তুমি আগে ব্যাগের মিস্ট্রিটা বলো দেখি।
চোর ধরল ঝামেলা
ছোটকা বলল, শোন তা হলে বলছি। ব্যাপারটা বিজ্ঞানের খুব জটপাকানো ব্যাপার, তোরা সহজে বুঝবি না–তবুও সহজ করে বোঝাতে চেষ্টা করছি।
আমরা যে দুনিয়ায় বাস করি সেটা হল ত্রিমাত্রিক দুনিয়া বা থ্রি ডাইমেনশন্যাল ওয়ার্ল্ড। সেইজন্যেই আমাদের তিনটে মাপ আছে–দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতা। এইবার কল্পনা কর যে, একটা দ্বিমাত্রিক দুনিয়া, মানে টু ডাইমেনশন্যাল ওয়ার্ল্ড আছে। সেখানকার প্রাণীদের শুধু দুটো মাপ থাকবে– দৈর্ঘ্য আর প্রস্থ। অর্থাৎ, প্রাণীগুলো হবে চিঁড়েচ্যাপটা চেহারার, আর ওরা দ্বিমাত্রিক কোনও সমতলে লেপটে চলাফেরা করবে। শুধু কি তাই! ওদের দেখার কাজটাও হবে ওই দ্বিমাত্রিক সমতল বরাবর। ফলে ওদের জগতে–মানে, ওই সমতলে–যদি একটা ফুটো করে দেওয়া যায় তা হলে ওরা সেটাকে একটা অন্ধকার গর্ত হিসেবে দেখবে। কারণ, ওদের দেখার অভ্যেসটা সমতল বরাবর –তাই ওরা ফুটো দিয়ে কিছু দেখতে পাবে না। আর দেখতে না পাওয়া মানেই অন্ধকার। একটা কাগজের পৃষ্ঠা নিয়ে তাতে একটা ফুটো করে ব্যাপারটা ভাবলে অনেক সহজে বোঝা যাবে।
তা হলে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াল? ওই ফুটোটা হল দ্বিমাত্রিক জগৎ আর ত্রিমাত্রিক জগতের মধ্যে যাতায়াতের একটা পথ–মানে, টানেল। দ্বিমাত্রিক জগৎ থেকে যা কিছু ওই ফুটো দিয়ে ঢুকবে তা সরাসরি চলে যাবে ত্রিমাত্রিক দুনিয়ায়। ফলে দ্বিমাত্রিক জগতের প্রাণীরা দেখবে জিনিসগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কাগজের পৃষ্ঠায় একটা ব্যাগের ছবি এঁকে তার মধ্যে একটা ফুটো করে নিলে ব্যাপারটা আরও সহজে বোঝা যাবে। দ্বিমাত্রিক প্রাণীরা ভাববে ব্যাগটার কোনও শেষ নেই। ঠিক আমার হাতের ব্যাগটার মতো। কথাটা বলে রূপালির কাছ থেকে নেওয়া ব্যাগটা ছোটকা ওদের দেখাল। তারপর বলল, এইবার ত্রিমাত্রিক আর চতুর্মাত্রিক দুনিয়ার মধ্যে ঠিক একইরকম জিনিস কল্পনা করে দ্যাখ। রূপালির ব্যাগটার মধ্যে কেউ হয়তো এমন একটা ফুটো করে দিয়েছে যাতে ব্যাগের মুখটা ত্রিমাত্রিক আর চতুর্মাত্রিক দুনিয়ার মধ্যে একটা টানেল তৈরি করে ফেলেছে। ওই ফুটো দিয়ে যা কিছু ঢোকানো হচ্ছে তা সরাসরি চলে যাচ্ছে ফোর ডাইমেনশন্যাল ওয়ার্ল্ডে।
কিন্তু ফুটোটা তৈরি হল কীভাবে? চন্দ্রকান্ত জিগ্যেস করল।
