প্রতিদিন লেখাপড়ার জন্যে আলাদা নম্বর আছে। সারাদিন পড়াশোনার শেষে বাবা কিংবা মা কম্পিউটারের বোতাম টিপলেই নম্বর ফুটে ওঠে পরদায়, তাতে অন্যমনস্কতার জন্য কত নম্বর কাটা গেছে তাও লেখা থাকে। সেটা দেখলেই মা-বাবা বকাবকি করবেন।
চিকুর একটুও ভালো লাগছিল না। তবুও কোনওরকমে পড়া শেষ করে মা-র কাছে গেল। বলল, মা, মা, জানো, আমাদের বাগানের পাখিগুলো সব নকল বিজ্ঞানীদের তৈরি।
মা মাইক্রো-টিভি হাতে নিয়ে খবর শুনছিলেন, হাত থেকে টিভি পড়ে গেল। অবাক চোখে ছেলের দিকে তাকালেন।
চিকু এক নিশ্বাসে বলে গেল পুরোনো দিনের কথা। আসল ফুলের কথা, আসল পাখির কথা, আসল মৌমাছির কথা। একদিন সূর্য ছিল আকাশে। দিনে থাকত উজ্জ্বল আলো, আর রাতে গাঢ় অন্ধকার।
মা কাছে এগিয়ে এলেন। হাঁটুগেড়ে বসে পড়লেন ছেলের সামনে। ওর দুধে হাত রাখলেন, তুই এসব কার কাছে শুনেছিস?
চিকু হঠাৎ যেন একটা ধাক্কা খেল। মনে পড়ল, বুড়ো লোকটা ওকে বারবার করে বারণ করেছিল, তার কথা কাউকে না বলতে। বললে সাঙ্ঘাতিক বিপদ হবে।
সুতরাং মা-র কথার জবাব না দিয়ে চিকু বলল, বলো না মা, এসব সত্যি?
মা-র কপালে ভাঁজ পড়ল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারপর বললেন, সব সত্যি। কিন্তু কে তোকে এসব কথা বলল! তোর বাবা জানতে পারলে…।
বাবা ঘরে ছিলেন না। অফিসে গেছেন। অফিস বলতে বাড়ির লাগোয়া একটা ছোট ঘর। সেখানে নানারকম সব কম্পিউটার বসানো আছে। আর আছে চার-চারটে রঙিন টিভি। বাবা রোজ সেই ঘরে যান। সারাদিন বসে-বসে শুধু ছোট-বড় বোতাম টেপেন। টিভির পরদা খুঁটিয়ে লক্ষ করেন। কম্পিউটার থেকে যেসব ছাপা কাগজ বেরিয়ে আসে সেগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়েন। বাবা বলেন, সারা দেশ জুড়েই নাকি এরকম শক্তিশালী কম্পিউটার যোগাযোগ রয়েছে। দেশের প্রতিটি কোণের গোপন খবরাখবর আদানপ্রদান হয় হাজার-হাজার কম্পিউটারের মাধ্যমে।
তোর বাবা জানতে পারলে ভীষণ রাগ করবেন। এসব কথা তোর বাবাকে বলিস না যেন। মা অবাক চোখে ছেলেকে দেখছিলেন। চিকু যেন কোনও স্বপ্নের দেশে মগ্ন হয়ে গেছে। ওকে বুকে টেনে নিয়ে মা বললেন, তুই খুব সাবধানে থাকিস। তোর জন্যে আমার ভয় করছে।
চিকু মা-র ভয়ের কারণ বুঝতে পারল না। ও শুধু বিস্ময়ে ভাবছিল, সমস্ত নকল জিনিসের মধ্যে থেকেও মা-বাবা কেমন নিশ্চিন্ত হাসিখুশি রয়েছেন। অথচ এই ভয়ংকর রহস্যটা ফাঁস হয়ে যেতেই চিকুর বুকের ভেতরে কষ্ট হচ্ছে।
সেদিন রাতে নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে চিকু শুনতে পেল বাবা-মা চাপা গলায় কথা বলছেন। কী কথা তা স্পষ্ট না বুঝতে পারলেও চিকুর আন্দাজে মনে হল আলোচনাটা ওকে নিয়েই।
কিছুক্ষণ পরে বাবার একটা কথা কানে এল ওর, ঠিক আছে। কাল ওকে আমার সঙ্গে অফিসে নিয়ে যাব। সব বুঝিয়ে বলব। ও এখন বড় হয়েছে। সব ওর জানা দরকার।
তারপরই চিকু ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমের মধ্যে সত্যিকারের ফুল, পাখি, লতাপাতা, মেঘ, সূর্য, স-ব এসে ভিড় করল ওর চোখের সামনে। ও দেখল, সত্যিকারের ফুল থেকে সত্যিকারের মধু খাচ্ছে সত্যিকারের মৌমাছি।
.
পরদিন আরও ভোরে উঠে পড়ল চিকু। পা টিপেটিপে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ল বাগানে।
চারদিক মেঘলা, ধোঁয়াটে। আবছা আলোয় বাগানের গাছপালা চোখে পড়ছে। চিকু গোলাপ বাগানের দিকে এগোল। লক্ষ করল, ফোঁটা-ফেঁটা শিশির জমে আছে রঙিন গোলাপের পাপড়ির ওপরে। এই শিশিরের ফোঁটাও কি নকল! ভাবল চিকু। আর তখনই ওর চোখে পড়ল, গোলাপ বাগানের ভেতরে মাটির ওপরে শুয়ে আছে আলখাল্লা পরা বুড়ো লোকটা। চিকু ঝুঁকে পড়ল নীচু হয়ে। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে চলে গেল তার কাছে।
বুড়ো মানুষটার দু-চোখ বোজা। হাঁফাচ্ছে। লাল-নীল তালি মারা আলখাল্লা নিশ্বাসের তালে তালে ওঠানামা করছে। পুঁটলি আর লাঠি পড়ে রয়েছে পাশেই।
হয়তো কেউ এসেছে টের পেয়েই বুড়ো মানুষটা চোখ খুলল। প্রথমে ভয় পেয়েছিল, কিন্তু চিকুকে দেখেই ভয় কেটে গেল। ধবধবে সাদা দাড়ির ফাঁকে মলিন হাসল বুড়ো। ঘড়ঘড়ে স্বরে কোনওরকমে বলল, এসেছ, খোকাবাবু?
সঙ্গে-সঙ্গে কাশির দমক শুরু হল। সাদা মাথাটা কঁকিয়ে উঠল বারবার। চোখ-মুখ লালচে হয়ে গেল।
চিকু বুঝল, মানুষটার খুব কষ্ট হচ্ছে। ও তার বুকে হাত রাখল। কাশি থামলে লোকটা হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল। তারপর হাতড়ে পুঁটলিটা টেনে নিল। অতিকষ্টে ভেতর থেকে বের করল একটা পলিথিনের স্বচ্ছ প্যাকেট। তার মধ্যে রয়েছে একটা শুকনো বিবর্ণ ফুল। গোলাপ।
বুড়ো মানুষটা অস্পষ্ট গলায় বলল, সত্যিকারের গোলাপ, খোকাবাবু। কতদিন ধরে আগলে আগলে রেখেছি, আর পারব না। আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে।
চিকুর হাতে তাপ লাগছিল। ও লোকটার চুল সরিয়ে কপালে হাত রাখল। জুরে গা পুড়ে যাচ্ছে।
তুমি আমাদের বাড়িতে চলো। বাবা ওষুধ দিলেই তুমি সেরে উঠবে।
চিকুর উদ্বেগে বুড়ো যেন মজা পেল। বলল, কোনও ওষুধেই আমি আর সেরে উঠব না গো। এ-যুগের ওষুধ আমার সইবে না। তা ছাড়া, তোমার বাবা-মা জানতে পারলে আমাকে..নাঃ, থাক খোকাবাবু, খোলা আকাশের নীচেই আমি থাকব।
আবার কাশি। চিকুর খুব খারাপ লাগছিল বুড়ো মানুষটার জন্যে। আজ আর কোনও গল্প শোনা হল না ওর। তবে ওই সত্যিকারের গোলাপটা দেখা গেল। মুগ্ধ চোখে শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ ফুলটা দেখছিল চিকু। হাজারটা টাটকা নকল ফুলের চেয়ে একটা শুকিয়ে যাওয়া আসল ফুল অনেক বেশি দামি।
