প্রথম ছবিটা চিকুকে দেখাল বুড়ো। সূর্য উঠছে পূর্ব দিক থেকে। লাল। গোল বলের মতো। আকাশে অল্প-অল্প মেঘ। মেঘের কিনারে লাল রেখা। একপাশে কিছু সবুজ গাছপালা। তার পাশ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে একপাল গরু নিয়ে যাচ্ছে একটি ছেলে। খালি গা। হাতে লিকলিকে খাটো বেত।
রাখাল ভোরবেলায় যাচ্ছে গরু চরাতে। বুড়ো বিড়বিড় করে বলল। চিকু ছবিটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল। গরু শুধু ও মিউজিয়ামের ছবিতেই দেখেছে। গরু দেখতে সুন্দর নয় বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। তাই তাঁরা নকল গরু তৈরি করে নকল তৃণভূমিতে নিশ্চয়ই রাখেননি। তা ছাড়া বইতেও পড়েছে, একসময়ে মানুষ গরুর দুধ খেত। গরু ছিল গৃহপালিত পশু। কিন্তু এখন তো ওসব খাদ্য বা পানীয় দূষিত। চিকু কখনও দুধ দেখেনি।
ছবিটা দেখতে-দেখতে ওর নাকে ধুলো উড়ে আসছিল। কী সুন্দর!
তারপর দ্বিতীয় ছবিটা দেখাল বুড়ো। কুলকুল করে বয়ে যাওয়া নদী। নদীর বুকে কালো ছায়ার মতো নৌকো ভেসে যাচ্ছে। ওপারে অস্ত যাচ্ছে টকটকে লাল সূর্য। আকাশে নানা রঙের মেঘ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ভাসছে। অপূর্ব!
নদীর তীরে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আবার বিড়বিড় করল বুড়ো। তারপর বাকি ছবিগুলোও একে-একে দেখাল সে। ছেলেমেয়েরা পার্কে ছুটোছুটি করে খেলা করছে। বাগানে রংবেরঙের ফুলের উৎসব! দীপাবলির আলোকসজ্জা। কত চিত্র-বিচিত্র পাখি…।
ছবিগুলো দেখানো শেষ হলে সেগুলো আবার প্যাকেটে ভরে রাখতে লাগল বুড়ো। বলল, এখন সূর্যও নেই, আর এসব কিছুও নেই, খোকাবাবু। আরও অনেক ফটো ছিল আমার কাছে…নষ্ট হয়ে গেছে। এই বুড়ো শরীরে পালিয়ে বেড়ানো কি কম ধকলের কাজ! খকখক করে কাশতে শুরু করল সে। কিছুক্ষণ পর কাশি থামলে জড়ানো গলায় বলল, এই নোংরা বাতাসে আমি শ্বাস নিতে পারি না। চারদিকে সব কেমন ধোঁয়াটে মেঘলা। অক্সিজেন কত কমে গেছে। চারদিকে শুধু বিষ বাতাস। কথা আটকে গিয়ে বুড়ো আবার কাশতে লাগল।
শ্বাস নিতে চিকুর কোনওরকম কষ্ট হচ্ছিল না। ও জানে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এখন অক্সিজেন শতকরা আট ভাগ। বাকি অংশে নাইট্রোজেন ছাড়াও রয়েছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড। গত পঞ্চাশ বছরে ক্ষতিকর গ্যাসগুলো পরিমাণে অনেক বেড়ে গেছে। কলকারখানা-যানবাহনের ধোঁয়া বিপদসীমা ছাড়িয়ে গিয়ে পৃথিবীর আবহাওয়াই গেছে পালটে। সূর্য ঢাকা পড়ে গেছে। আকাশ-বাতাস মেঘলা, ঘোলাটে। সেইজন্যেই কি আসল পশু-পাখিগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে? মরে গেছে আসল ফুল, ফল, গাছ? তাই যদি হয়, তা হলে মানুষ সুস্থভাবে বেঁচে রইল কেমন করে! সবকিছুই কেমন দুর্বোধ্য আর রহস্যময় ঠেকছিল চিকুর কাছে। ওর কোনও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে না, অথচ এই বুড়ো মানুষটার কাশতে কাশতে প্রাণ বেরুবার জোগাড়।
সেই কথাই ও জিগ্যেস করল লোকটাকে।
লোকটা কাশি থামিয়ে আলখাল্লার হাতায় মুখ মুছছিল। বারদুয়েক গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, আমি পুরোনো দিনের মানুষ, খোকাবাবু। জানি না, আমার মতো আর কজন এখনও লুকিয়ে চুরিয়ে প্রাণে বেঁচে আছে। আর তোমরা হলে গিয়ে নতুন বিজ্ঞানের যুগের নতুন জাতের মানুষ। তোমাদের কাছে এই নোংরা বিষ-বাতাসই প্রিয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বুড়ো। তারপর ঝোলার ভেতরে হাতড়ে হাতড়ে কী যেন খুঁজতে লাগল। আপনমনেই নীচু গলায় বলল, বাতাস পরিষ্কার করতে আমরা বহু চেষ্টা করেছিলাম গো, খোকাবাবু। পরিষ্কারও হয়েছিল। ফলে মানুষের আয়ু গিয়েছিল বেড়ে।
চিকুর দিকে তাকাল সে ও এই আমাকেই দ্যাখো না। কত বুড়োটি হয়েও বেঁচে আছি। যাই হোক…তারপর যুদ্ধ বাধল। ভয়ানক যুদ্ধ। বাতাসে বিষ ছড়িয়ে পড়তে লাগল দিনের পর দিন। মানুষ বিষে মরতে লাগল। বাতাস পরিষ্কার করার চেষ্টাও গেল থেমে। কলকারখানা, গাড়িঘোড়ার ধোঁয়া আকাশে-বাতাসে জমতে লাগল। ওঃ, সে কি আজকের কথা! আমরা কিছু মানুষ গোপন জায়গায় অক্সিজেন সঞ্চয় করে বেঁচে রইলাম। দূষিত বাতাস পরিষ্কার করার জন্যে লড়াই করে চললাম গোপনে। কিন্তু পারলাম না। বাতাস আরও বিষিয়ে যেতে লাগল, আমরাও বুড়ো হয়ে গেলাম ধীরে-ধীরে, আর অক্সিজেনও এল ফুরিয়ে। তখন নিরুপায় হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম মাঠে-ঘাটে-পথে দূষিত পরিবেশে। একইসঙ্গে চালিয়ে যেতে লাগলাম বাঁচার লড়াই।
বুড়ো আবার কাশতে শুরু করল। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টায় লাঠিটা আঁকড়ে ধরতে গেল। চিকুর কেমন ভয়-ভয় করছিল। কী করবে, কী করা উচিত, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। এমনসময় দূর থেকে ওর নাম ধরে কেউ ডাকল, চিকুউ!
ও চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বুড়োকে বলল, যাচ্ছি। মা ডাকছেন।
আমার কথা কাউকে বোলো না, খোকাবাবু। তুমি বরং কাল আবার এসো। তোমাকে পুরোনো দিনের অনেক গল্প শোনাব, কেমন! কী করে ফুল ফুটত, পাখি ডাকত, মৌমাছি মধু খেতসব।
আচ্ছা, আসব। বলে গোলাপ বাগানের মধ্যে দিয়ে বাড়ি লক্ষ করে ছুটে চলল চিকু। ওর নাকে ফুলের সুগন্ধ ভেসে আসছিল। শুনতে পাচ্ছিল গাছের ডালে বসে পাখি ডাকছে সুরেলা গলায়। চিকু ছুটতে ছুটতেই মনে-মনে বলল, নকল গন্ধ। নকল পাখি। বিচ্ছিরি।
বুড়োর দেখানো বিবর্ণ ফটোগ্রাফের ছবিগুলো ওর মনে জীবন্ত হয়ে ভেসে উঠছিল বারবার।
কম্পিউটার শিক্ষকের সামনে বসে লেখাপড়া করছিল চিকু। কিন্তু বারেবারেই ও আনমনা হয়ে পড়ছিল আর কম্পিউটার শিক্ষকের ধমক টেলিভিশন পরদায় ফুটে উঠছিল, তুমি অমনোযোগী হয়ে পড়ছ। তোমার নম্বর কাটা যাচ্ছে।
