এমন সময় বাবার ডাক শোনা গেল, চিকু! চিকু!
বুড়ো মানুষটা চোখ বুজে শুয়ে ছিল। শুকনো গোলাপটা বুকের ওপরে। শ্বাস-প্রশ্বাসের তালে তালে বুকটা উঠছে নামছে।
পরে আবার আসব। বলে চিকু উঠে এল বুড়োর পাশ থেকে। কিন্তু মানুষটার কাছ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।
.
রঙিন টেলিভিশনের পরদাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল চিকু। বাবা ওকে বাঁ-হাতে আলতো করে জড়িয়ে রেখেছেন, আর ডানহাতে বেশ অভ্যস্ত ভঙ্গিতে নানান বোতাম টিপছেন। একইসঙ্গে কথা বলছিলেন বাবা।
চিকু, তুমি কি জানো, কেন আমরা নকল গাছপালা, নকল ফুল, নকল পাখি–এসব তৈরি করেছি?
টেলিভিশন-পরদায় বিভিন্ন জটিল অঙ্ক আর নকশা দেখতে-দেখতে চিকু জবাব দিল, জানি বাবা, জানি।
অসুস্থ বুড়ো মানুষটার ছবি ওর চোখের সামনে ভাসছিল।
বাবা নরম গলায় বললেন, অনেক দিন আগে আমার জন্মেরও আগে–নানান কারণে পৃথিবীর আবহাওয়া বিষিয়ে উঠেছিল। সেই বিষাক্ত বাতাসে একে-একে মরতে শুরু করল গাছপালা, লতাপাতা, ফুল-ফল, পশু-পাখি–এমনকী মানুষও। তখন প্রাণে বাঁচার জন্যে বিজ্ঞানীরা মরিয়া হয়ে পথ খুঁজতে লাগলেন। সারা পৃথিবী জুড়েই চলল বেঁচে থাকার লড়াই। মানুষের সামান্য যা ক্ষমতা ছিল তা দিয়ে ওই ভয়ংকর দূষিত বাতাসকে বিশুদ্ধ করার কোনও পথ ছিল না। ফলে বিজ্ঞানীরা ঠিক করলেন, মানুষকেই যেমন করে তোক ওই বিষাক্ত পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। চলল বহুরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বেশিরভাগই সদ্যোজাত শিশুদের নিয়ে। কারণ বিজ্ঞানীরা চাইছিলেন, আগামী দিনের মানুষের যেন দূষিত পরিবেশে কোনওরকম অসুবিধে না হয়। শিশুদের ফুসফুঁসে, শ্বাসনালীতে, নানারকম অস্ত্রোপচার করা হল। দূষিত বাতাসের চেম্বারে রেখে ওদের আচার-আচরণ লক্ষ করা হল। এ ছাড়া আরও কত কী! তারপর একদিন বিজ্ঞানীরা সফল হলেন।
বাবা কয়েকটা বোতাম টিপলেন। একটা মাইক্রোফোনে সাঙ্কেতিক কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করলেন। কম্পিউটার থেকে বেরিয়ে আসা একটা ছাপা কাগজ ছিঁড়ে নিয়ে তাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, এইভাবে মানুষ টিকে গেল। আমরা দূষিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলাম। অবশ্য তখন মানুষের গড় আয়ু অনেক কমে গেল। কারণ পরিবেশের সঙ্গে মোটামুটি খাপ খেয়ে গেলেও মানুষের শরীরের কলকবজাগুলো তাড়াতাড়ি অকেজো হয়ে পড়তে লাগল…।
চিকু বুঝল, কেন ও আগে কখনও বাগানের লোকটার মতো বুড়ো মানুষ দেখেনি। ও ঘুরে বাবার দিকে তাকাল। বাবা কত সহজভাবে শুনিয়ে যাচ্ছেন পুরোনো ইতিহাস। বাগানের বুড়ো লোকটার মতো বাবার চোখে স্বপ্ন নেই, গলা কেঁপে উঠছে না আবেগে। বাবা শুধু বিজ্ঞানের কথা শোনাচ্ছেন, বিজ্ঞানীদের সাফল্যের কথা শোনাচ্ছেন।
অবশ্য যতই নতুন-নতুন জেনারেশান আসবে গড় আয়ু ধীরে ধীরে ততই বাড়বে। কারণ মানুষ ক্রমশ আরও বেশি করে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবে পরিবেশের সঙ্গে।
কিন্তু বাবা, গাছপালা, পাখি, এসব…।
ও, হ্যাঁ। বিজ্ঞানীরা মানুষের সমস্যার সমাধান করে দিলেন বটে, কিন্তু গাছপালা, ফুল-ফল, পাখি, কীটপতঙ্গ, এসব বাঁচিয়ে রাখতে পারলেন না। একে-একে সব মরুভূমি হয়ে যেতে লাগল। মুছে যেতে লাগল প্রকৃতির সৌন্দর্য।
চিকু পলিথিনের প্যাকেটে মোড়া শুকনো গোলাপটার কথা ভাবছিল। প্রকৃতির সৌন্দর্য কবে মুছে গেছে কে জানে! শুধু স্মৃতি রয়ে গেছে। ও বলল, সেইজন্যেই নকল গাছপালা-পাখি তৈরি করে দিলেন বিজ্ঞানীরা?
হ্যাঁ। না তৈরি করলে আমাদের অসুবিধে হচ্ছিল। প্রকৃতির সৌন্দর্য না থাকায় মানুষের মন খারাপ হচ্ছিল, মনটা খিটখিটে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিল, ফলে মানুষের কাজ করার ক্ষমতাও কমে যাচ্ছিল। তাই মনোবিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিলেন, মানুষের মন ভালো রাখতে, মনে আনন্দ-ফুর্তি বজায় রাখতে, নকল প্রকৃতি তৈরি করা হোক। নইলে দেশের উন্নতির কোনও আশা নেই। তখন হাজার-হাজার বিজ্ঞানী বছরের পর বছর পরিশ্রম করে তৈরি করলেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য । পরিবেশ ক্রমশ গাঢ় ঘোলাটে হয়ে ওঠায় সূর্যের আলো নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল সূর্যকে তো আর দেখাই যেত না। তখন বিকল্প হিসেবে তৈরি হল ভাসমান আলোকপিণ্ড। তুমি তো সবই দেখেছ।
বাবাকে নতুন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। যেন একটা অচেনা লোক বসে আছে চিকুর সামনে। লোকটা বিষাক্ত বাতাসে দিব্যি শ্বাস নিচ্ছে। প্রকৃতি আসল না নকল তা নিয়ে লোকটার কোনও মাথাব্যথা নেই। শুধু বাইরের চেহারাটা ঠিক থাকলেই সে খুশি। আজ যদি চিকু মানুষ না হয়ে একটা রোবট হত তা হলে বাবার বোধহয় কোনও অসুবিধে হত না। শুধু রোবটের চেহারাটা আসল চিকুর মতো হলেই হল!
বাবা এবার ওকে কাছে টেনে নিলেন। আদরের গলায় বললেন, চিকু, এখন বলো তো, তোমাকে পুরোনো দিনের সমস্ত কথা কে বলেছে? তোমার মা বলছিলেন, তুমি নাকি কারও কাছে ওসব কথা শুনে এসেছ? কে বলেছে তোমাকে?
চিকুর শরীরটা কেমন কাঠ হয়ে গেল। একথার উত্তর দিলেই অসুস্থ বুড়ো লোকটা হয়তো বিপদে পড়বে। কিন্তু কেন? ও পালটা প্রশ্ন করল, বাবা যখন সবকিছু আসল ছিল তখনকার মানুষেরা কেউ বেঁচে নেই?
বাবার কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বাবা ধীরে-ধীরে বললেন, বেঁচে থাকা উচিত নয়। এই দূষিত পরিবেশে বেঁচে থাকতে তাদের অসুবিধে হবে। কিন্তু তবুও যে কেউ-কেউ বেঁচে নেই তা নয়। তাদের খুঁজে পেলে বর্তমান সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। তা নইলে তারা পুরোনো দিনের সব গালগল্প শুনিয়ে এখনকার মানুষের মন অকারণে দুর্বল করে তুলবে। সেইজন্যেই তো তোমাকে বলছি, যার কাছে ওসব আজেবাজে কথা শুনেছ সে কে?
