বুড়ো লোকটা চমকে উঠল। চোখ আরও ছোট করে চিকুকে দেখতে চেষ্টা করল। তারপর ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। আলখাল্লা মোড়া শরীরটা কাঁপতে লাগল থরথর করে।
চিকু কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। কেন ভয় পাচ্ছে মানুষটা! ও আরও কাছে এগিয়ে গেল। একটা হাত রাখল বুড়ো লোকটার হাতের ওপর। চামড়া কোঁচকানো। পার্চমেন্ট কাগজের মতো খসখসে। চিকু আবার বলল, বলো না, তুমি কে?
বুড়ো অনেকক্ষণ ধরে চিকুকে দেখল। ভয় কেটে গিয়ে ভরসা ফিরে এল মুখে। সামান্য হাসতে চেষ্টা করল। তারপর পালটা প্রশ্ন করল ঘড়ঘড়ে গলায়, তুমি কে, খোকাবাবু?
আমি চিকু। ওই বাড়িতে থাকি। চিকু আঙুল তুলে ওদের বাড়িটা দেখাল। তারপর একটু থেমে জিগ্যেস করল, তুমি এখানে কোত্থেকে এলে?
বুড়ো মানুষটা কী একটা বলতে গিয়ে কাশতে শুরু করল। দম ফেটে যাওয়ার মতো কাশি। হিজিবিজি দাগকাটা ফরসা মুখটা টকটকে লাল হয়ে গেল। কাশি থামলে হাঁফাতে-হাঁফাতে সে বলল, আমি এখানে লুকিয়ে আছি প্রাণের ভয়ে, খোকাবাবু। এই কদিন হল এসেছি। তুমি কাউকে আমার কথা বোলো না যেন।
চিকুর অদ্ভুত লাগল। প্রাণভয়ে এই বুড়ো মানুষটা লুকিয়ে রয়েছে কেন! কে ভয় দেখাচ্ছে। ওকে!
বাগানে নানা পাখি মিষ্টি সুরে ডাকছিল। মাঝে-মাঝেই অমন ডাক শোনা যায়। শোনা যায় সুরেলা শিসের শব্দ। চিকুর ভালো লাগছিল। কিন্তু বুড়ো মানুষটা শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আক্ষেপের গলায় বলল, নকল! সব নকল গো, খোকাবাবু! চেহারা আছে, নড়নচড়ন আছে, কিন্তু প্রাণ নেই।
চিকু কিছুই বুঝতে পারছিল না। ও অবাক চোখে বুড়ো লোকটার রংবেরঙের আলখাল্লা দেখছিল। দেখছিল আঁকাবাঁকা লাঠি, আর ধবধবে সাদা চুল-দাড়ি।
বুড়ো চিকুকে ডেকে তার পাশে বসাল। কাঁপা গলায় বলল, চিরটাকাল এমন ছিল না, খোকাবাবু। আমাদের সময়ে সত্যিকারের ফুল থেকে সত্যিকারের মধু খেত সত্যিকারের মৌমাছি।
একটা মৌমাছি একটা হলদে গোলাপের আশেপাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল। গুনগুন শব্দ উঠছিল বাতাসে। চিকু সেদিকে দেখিয়ে বলল, ওই তো মৌমাছি!
নকল মৌমাছি। হতাশ সুরে বলল বুড়ো, এই যে বাগানের গাছপালা, ফুল, ফল, পাখি, কীটপতঙ্গ, স-ব নকল। সবই মানুষের তৈরি, ভগবানের নয়। ভগবানকে মানুষ ছুটি দিয়েছে। একটু আগে ওই যে পাখির শিস শোনা গেল, রোজ সকালে একই সময়ে হুবহু ওই একই সুরে শিস দেবে নকল পাখিটা। এই যে মৌমাছি ফুলকে ঘিরে উড়ে বেড়াচ্ছে, রোজ একই ভঙ্গিতে ওই ফুলটাকে ঘিরেই সে উড়ে বেড়াবে।
কেন?–চিকু বিশ্বাস করতে পারছিল না লোকটার কথাগুলো। কই, চিকুর মা কিংবা বাবা তো কোনওদিনও এ-সব কথা ওকে বলেননি!
লোকটা আবার কাশল। পাতলা ধোঁয়াশা বেড়াচ্ছে চারদিকে। রোজই এইরকম থাকে। কেমন মেঘলা ঘোলাটে পরিবেশ।
খোকাবাবু, এই পাখি, মৌমাছি, সবই তোমাদের বিজ্ঞানীদের তৈরি। ওদের শরীরের কলকবজায় ঠিক যেরকম-যেরকম নির্দেশ দেওয়া আছে, ঠিক সেরকমভাবেই ওরা গুনগুন করে, শিস দেয়, উড়ে বেড়ায়। এই যে সব ফুল–এগুলো বিজ্ঞানীদের হিসেবমতো ফোটে আর ঝরে পড়ে। ফুলের গন্ধও তৈরি হয়েছে তোমাদের ল্যাবরেটরিতে। তারপর সেই নকল সুগন্ধি ভরে দেওয়া হয়েছে ফুলের ভেতরে। ওই যে গাছের ফল, ওগুলো তোমরা কি কখনও খেয়ে দেখেছ? দেখোনি নিশ্চয়ই!
না, মা-বাবা বারণ করেছেন। আমরা তো শুধু ভিটামিন খাই চামচে করে, আর কার্বোহাইড্রেট প্রোটিন মেশানো ফুড ট্যাবলেট।
হাসল বুড়ো। মাথা নাড়ল হতাশায়। লাঠিটা নামিয়ে রাখল পাশে। তারপর চিকুর পিঠে হাত রেখে বলল, খোকাবাবু, ওই ফল শুধু দেখবার জন্যে। আর নকল পাখিগুলো বিজ্ঞানীদের তৈরি করে দেওয়া রুটিনমাফিক ওই ফলগুলো মাঝে-মাঝে ঠোকরায়। এমনকী খাওয়ার ভানও করে। হায় রে! কী দিনকালই না এল!
বুড়ো আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখ তুলে ওপরে আকাশের দিকে তাকাল। ভুরুর ওপরে হাত রেখে নজর করে দেখতে চেষ্টা করল আকাশটা। ঘোলাটে মেঘলা আকাশে অনেক আলো জ্বলছে। শক্তিশালী আকাশ-প্রদীপের মতো সাদা উজ্জ্বল আলোক-পিণ্ডগুলো আকাশে ভাসছে। আলো ছড়াতে চেষ্টা করছে আবছায়া পৃথিবীর বুকে।
চিকুর দিকে তাকিয়ে বুড়ো প্রশ্ন করল, তুমি কোনওদিন সূর্য দেখেছ, খোকাবাবু? সূয্যিমামা?
না। মাথা নাড়ল চিকু। তবে সূর্যের কথা ও শুনেছে মা-বাবার কাছে। বছর কুড়ি আগেও নাকি সূর্য দেখা যেত পৃথিবীর আকাশে। পুবে উঠত, পশ্চিমে অস্ত যেত। দিন ছিল উজ্জ্বল আলোময়, রাত ছিল ঘন অন্ধকার। এখন দিন আর রাতের তফাত বেশ কমে এসেছে। পরিবেশ গাঢ় হয়ে, ঘন হয়ে, সূর্য ঢেকে গেছে। বুদ্ধিমান মানুষ এখন নতুন ধরনের আলোর উৎস তৈরি করেছে। হাউইয়ের মতো আলোক-পিণ্ড ছুঁড়ে দিয়েছে আকাশে। সেগুলো ভারী বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকে। আলো ছড়ায়। মাসখানেক পরে সেগুলোর জ্যোতি কমে আসে। নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে। তখন নতুন-নতুন আলোক পিণ্ড ছুঁড়ে দেয় মানুষ। আবার আলো হয়।
বিশাল আলখাল্লার ভেতর থেকে একটা কাপড়ের ঝোলা বের করল বুড়ো। ঝোলাতেও আলখাল্লার মতো রংবেরঙের অজস্র তালি। হাতড়ে হাতড়ে তার ভেতর থেকে একটা বিবর্ণ প্যাকেট বের করল। হলদেটে কাগজে মোড়া। কাগজ বেশ কয়েক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। চিকু আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিল। কঁপা হাতে প্যাকেট থেকে কয়েকটা রঙিন ফটো বের করল সে। বহুদিনের হাওয়ায় ফটোগুলোর রঙের জৌলুস অনেক ফিকে হয়ে গেছে। চিকুর বেশ কৌতূহল হল। এরকম ফটোগ্রাফের ব্যবহার আজকাল প্রায় নেই বললেই চলে। এখন শুধু মাইক্রোফিম, মাইক্রো-ভিডিয়ো, মাইক্রো টিভি ক্যামেরা–এসবের যুগ।
