এমন সময় ঘুমটা ভেঙে গেল সুমনের। বাবা ওকে ডাকছেন, সুমন, ওঠ, ভোর হয়ে গেছে।
ঘুম-চোখ মেলে তাকাল সুমন। পুবের আকাশ সবে ফরসা হয়ে এসেছে। কাকটা এখনও আসেনি ওর ঘুম ভাঙাতে। ও ধীরে-ধীরে উঠে পড়ল। বাবা বললেন, যা, স্নান করে আয়। নতুন জামা-প্যান্ট বের করে রাখছি, এসে পরবি। আজ যে তোর জন্মদিন!
আঙুল দিয়ে চোখ ঘষে ও বলল, আমার বয়স আজ পনেরো পুরো হল, তাই না, বাবা?
হ্যাঁ। এখন যা, চটপট স্নান সেরে নে।
নতুন জামা-প্যান্ট বাবা কবে কখন কিনে এনেছেন সুমন টের পায়নি।
স্নান করে এসে দেখল ঘরের গোটা ছবিটাই পালটে গেছে। সারা ঘরময় ঘন ধূপের গন্ধ, মিষ্টি ধোঁয়া। এক ঝক নয়নতারা ফুলের মালা মায়ের গলায় পরানো। চন্দনের ফোঁটা আর সিঁদুরের টিপ দিয়ে কত দরদ দিয়ে বাবা সাজিয়েছেন মা-কে। আর একটা ছোট্ট পিতলের চাবি রাখা হয়েছে টুলের ওপর–চন্দনকাঠের বাক্সটার ঠিক সামনে।
নতুন পোশাকে বাবার হাত ধরে মায়ের ছবির সামনে এসে দাঁড়াল সুমন। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বাবা ভারী গলায় বললেন, তোমার চলে যাওয়ার দুঃখ সইতে না পেরে সব ছবি আমি নষ্ট করে ফেলেছিলাম। শুধু এইটা পারিনি খোকার মুখ চেয়ে। তা হলে ও যে আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করত না।
বাবার চোখে জল এসে গেছে। শীর্ণ গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুরেখা। সুমনের মাথায় হাত রেখে মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে বাবা বললেন, তোমার কথামতো আজ এই বাক্সের চাবি আমি তুলে দিচ্ছি খোকার হাতে। তোমার প্রিয় দামি জিনিস তুমি নিজের হাতে ওকে দাও। সুমনের দিকে ফিরে বাবা বললেন, বাক্স খোল। দ্যাখ, তোর মা তোর জন্যে কী রেখে গেছে।
সুমনের হাত-পা কাঁপছে। বুক দুরুদুরু। গায়ে যেন কাটা দিচ্ছে। ধীরে-ধীরে হাত বাড়িয়ে চাবিটা তুলে নিল ও। হাতজোড় করে নমস্কার করল–কে। তারপর গুপ্তধনের সিন্দুক খোলার মতো রোমাঞ্চ অনুভব করে বাক্সের তালা খুলে ফেলল।
ধূপের ঘন ধোঁয়া সরে গিয়ে দৃষ্টি পরিষ্কার হল। ও দেখল, সেই বাক্সের ভেতরে নীল মখমলের ওপর একটা বিবর্ণ হলুদ কাগজ। কাঁপা হাতে সেটা তুলে নিল সুমন। তারপর ধীরে-ধীরে ভাঁজ খুলল। কিছু কাগজের টুকরো ভেঙে ঝরে গেল মেঝেতে। অতি সাবধানে কাগজটা মেলে ধরতে বিবর্ণ তামাটে লেখাগুলো নজরে পড়ল সুমনের। সুন্দর অক্ষরগুলো যেন কোনও শিল্পীর হাতে আঁকা। তেরো বছরেও ওদের সৌন্দর্য এতটুকু নষ্ট হয়নি। সুমনকে লেখা ওর মায়ের চিঠি! এক ও একমাত্র চিঠি! এটা নিঃসন্দেহে সুমনের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। সবচেয়ে দামি।
সুমনের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। থরথর করে ঠোঁট কাঁপছে। ও পড়তে শুরু করল ও
বাবা সুমন, ইচ্ছে না করলেও অনেক কষ্টে তোকে ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। রে। তোর বাবা রইলেন, ওঁকে দেখিস। লেখাপড়া করবি মন দিয়ে। কারণ, অনেক বড় হতে হবে তোকে, অনেক বড়। এখন তুই বড় হয়েছিস, আমার কথা নিশ্চয়ই বুঝবি। অনেক ত্যাগ স্বীকার করে তোর বাবা তোকে বড় করেছেন। সেই ত্যাগের মর্যাদা তুই দিস। আমি অকালে চলে গেলাম। তোর জন্যে কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। শুধু অনেক সাধ নিয়ে লেখা এই চিঠিটা ছাড়া। তোকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করছে রে। ভালো হয়ে থাকিস, সোনা আমার। আজ তা হলে আসি।
ইতি–মা-মণি।
একটা হলদে বিবর্ণ কাগজে এতখানি স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা থাকতে পারে ভাবতে পারেনি সুমন। ও চোখ তুলে মায়ের ছবির দিকে তাকায়। চোখের জলে ছবিটা ঝাপসা হয়ে গেছে। চোখ দুটো জ্বালা করছে। ও টের পেল বাবা ওকে কাছে টেনে নিয়েছেন। মাথায় পিঠে হাত বোলাচ্ছেন। বাবার কোলে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে সুমন, মা, মা-মণিগো, তোমার কথা আমি রাখব। নিশ্চয়ই রাখব। তুমি দেখে নিয়ে!
সুমন টের পায়, ওর বাবার শরীরটাও ওর মতো থরথর করে কাঁপছে। ওর ছোট্ট মাথা ভিজে ওঠে বাবার চোখের জলে।
চিকুর স্বপ্ন
ভোরবেলা বুড়ো লোকটাকে দেখতে পেল চিকু।
গোলাপ বাগানের ভেতরে জবুথবু হয়ে বসেছিল সে। পরনে একটা পুরোনো আলখাল্লা। তাতে লাল, নীল, হলদে, সবুজ হরেক রঙের তালি মারা। আর হাতে সাপের মতো আঁকাবাঁকা একটা লাঠি।
রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে চিকু বাগানে বেড়াতে আসে। মা-বাবা তখন ঘুমিয়ে থাকেন। বাড়ির লাগোয়া বিরাট এলাকা জুড়ে বাগান। বাগানে নানা ফুলের গাছ, নানা ফলের গাছ। ফুলে ফুলে মধু খেয়ে উড়ে বেড়ায় মৌমাছি। গাছের ডালে-ডালে পাখি খেলা করে। সুরেলা শিস দেয়। চিকু দ্যাখে। চিকুর খুব ভালো লাগে। ও বাগানে এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়ায়।
এমনি করেই হঠাৎ বুড়ো মানুষটার মুখোমুখি হয়ে পড়ল চিকু। গোলাপ বাগানের লাল, হলদে, বেগুনি, নানারকম গোলাপের মাঝে আলখাল্লার লাল, নীল, হলদে রং যেন মিশে গিয়েছিল। তাই হঠাৎ সামনা-সামনি পড়ে গিয়ে চিকু চমকে উঠেছিল। মাথায় ধবধবে সাদা চুলের জঙ্গল। একইরকম গোঁফ-দাড়িতে মুখের অনেকটাই ঢেকে গেছে। চোখ কুঁচকে ছোট। তার চারিদিকে বলিরেখার আঁকিবুকি। গোটা মুখে একইরকম অসংখ্য দাগ। আলখাল্লার বাইরে বেরিয়ে থাকা হাত দুটোরও একই দশা। লাঠি আঁকড়ে ধরা ডানহাতটা অল্প-অল্প কাঁপছিল।
চিকু অবাক হয়ে গেল। এরকম বুড়োমানুষ সে কখনও দেখেনি। আর লোকটা বাগানে এলই বা কোথা থেকে!
কাছে এগিয়ে গেল চিকু। জিগ্যেস করল, তুমি কে?
