বাবা বিছানায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। ঘুরে তাকিয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে ভালো করে দেখলেন সুমনকে। ক্লাস সিক্সের ছেলেটা ঘাড় বাঁকিয়ে সামান্য জেদি ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। হাতের কাগজটা নামিয়ে রেখে বাবা ওকে ডাকলেন কাছে। বললেন, আয়, এখানে আয়।
সুমন ধীরে-ধীরে কাছে গেল। বসল বাবার পাশে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বাবা বললেন, খোকা, তুই তো আমার সব। এ-সংসারে আমার আর কেউ নেই।
বাবা কেমন যেন উদাস হয়ে গেলেন। শীর্ণ হাতে ওকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে রূপকথার মতো করে শোনালেন ওই বাক্সের গল্প।
তোর মা বিয়ের সময় পেয়েছিল ওই চন্দনকাঠের বাক্সটা–তোর দিদিমার কাছ থেকে। ওঁদের পরিবারের রীতি ছিল, সবচেয়ে প্রিয় আর দামি জিনিসই ওই বাক্সে রাখা হবে। বিয়ের পর তোর মা সমস্ত গয়নাগাটি রেখেছিল ওই বাক্সে। আমি তখন ইস্কুলে মাস্টারি করি। এরপর তোর জন্ম হল। বেশ কিছুদিন হইহই করে খুশিতে কাটল। তারপরই এক ভয়ংকর ঘটনা বোবা করে দিল আমাকে। তোর মা পেটে ব্যথা নিয়ে ভরতি হল হাসপাতালে। পরীক্ষা করে ডাক্তার বলল, অপারেশান করা দরকার। অপারেশান করতে গিয়ে দেখা গেল পেটের ভেতরটা ক্যানসারে শেষ হয়ে গেছে। ডাক্তার বলল, কোনও আশা নেই। এভাবেই যতদিন বাঁচে। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম রে তোর মা-কে বাঁচাতে, কিন্তু পারিনি। তোর মা বুঝতে পেরেছিল যে, তার দিন শেষ হয়ে এসেছে। তাই একদিন তোকে দেখতে চেয়েছে, বলেছে, সুমনকে নিয়ে এসো। আর চন্দনকাঠের বাক্সটাও নিয়ে আসবে, দরকার আছে…।
বাবা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। হয়তো বৃষ্টি হবে। সুমনের পিঠে হাত রেখে বাবা বললেন, অবাক হলেও তোর মায়ের অনুরোধ আমি রেখেছিলাম। তোকে কোলে নিয়ে শেষ দেখা দেখতে গেলাম তাকে। আমাকে লুকিয়ে বাক্সটা নিয়ে কী যেন করল তোর মা। তারপর সেটা নিয়ে আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, এটা রেখে দাও। আর, এই নাও চাবি। সুমনের যেদিন পনেরো বছর পূর্ণ হবে, সেদিন চাবিটা দেবে ওর হাতে। তার আগে নয়। তুমি কথা দাও আমাকে।
মন্ত্রমুগ্ধ সুমনের মাথায় হাত বুলিয়ে সুমনের বাবা বললেন, আমি কথা দিয়েছিলাম রে…
সুমন আন্দাজ করে বলল, বাক্সে কি তা হলে গয়না আছে?
দুঃখের হাসি হেসে বাবা বললেন, না রে, বোকা। সেগুলো তোর মা আলাদা করে আমার কাছে দিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, তোর লেখাপড়ার জন্যে, তোকে মানুষ করার জন্যে সেগুলো যেন আমি কাজে লাগাই।
তা হলে কী আছে ওই বাক্সে? সুমন আগ্রহের চোখে তাকাল বাবার মুখের দিকে।
আমি জানি না। সময় হলে চাবিটা তোকে দেব। তখন তুই নিজেই খুলে দেখিস।
সুমন তখন খুশির গলায় বলল, নিশ্চয়ই খুব প্রিয় আর দামি জিনিস আছে, না বাবা? তাই তো রাখার নিয়ম ছিল ওই বাক্সে?
উদাস স্বরে বাবা বললেন, হবে হয়তো।
এরপর আরও বড় হয়ে উঠতে লাগল সুমন। ক্লাসের পর ক্লাস ডিঙিয়ে উঠতে লাগল ওপরে। আর একইসঙ্গে মা-কে স্বপ্নে দেখতে শুরু করল–প্রায়ই। তখন একদিন রাতে খেতে বসে হঠাৎই স্বপ্নের কথাটা বাবাকে বলল ও।
বাবা খাওয়া থামিয়ে তাকালেন। বললেন তোর মা তোকে ভীষণ ভালোবাসত। তোকে ছেড়ে মোটেই যেতে চায়নি। কিন্তু কঠিন অসুখ..রাখা গেল না। সেইজন্যেই বোধহয় স্বপ্নে অমন ফিরে ফিরে আসে। তোকে নিয়ে অনেক আশা ছিল তো।
সুমনের মনটা ব্যথায় মুচড়ে উঠল। বাবা অনেকদিন রিটায়ার করেছেন স্কুলের চাকরি থেকে। চোখে ভালো দেখতে পান না, তাই সময়ের আগেই রিটায়ার করতে হয়েছে। সারাদিন বাড়িতে থেকে সব কাজ করেন আর সময় করে সুমনের পড়া দেখিয়ে দেন রোজ। সুমনের লেখাপড়া যে কত কষ্টে চলে তা ও খুব ভালোভাবেই জানে। মায়ের অভাব বাবা যে বুঝতে দিতে চান না।
এই বছর ক্লাস টেন-এ উঠে সুমন আর থাকতে পারেনি। বাবাকে গিয়ে বলেছে, বাবা, আমার বয়েস এখনও পনেরো হয়নি?
দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো ক্যালেন্ডারের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন বাবা। চোখ কুঁচকে তারিখ দেখে বলেছেন, এখনও প্রায় ছমাস বাকি রে।
ওর জন্মদিন কবে সুমন জানে না। বাড়িতে ওর জন্মদিনের উৎসব কিছু হয় না। হয়তো সেই উৎসব শুরু হবে ওর পনেরো বছর পূর্ণ হওয়ার পর–যেদিন খোলা হবে ওই চন্দনকাঠের বাক্স। সুমন সেদিন জিগ্যেস করেছে বাবাকে, আমার জন্মদিন কবে, বাবা?
সাতই জুলাই।
উত্তর শুনে সুমনের মনটা একটু দমে গেছে। তবু ভেবেছে, আর তো মাত্র ছটা মাস। দেখতে দেখতে কেটে যাবে।
.
আজ সেই দিন এসেছে। ছয় জুলাই। সুমন যেন সুস্থির হয়ে কোনও কাজ করতে পারছে না। স্নান-পড়া-খাওয়া সবকিছুতেই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে। বাবা সবকিছু লক্ষ করলেও, নিজের কাজ নিয়মমতো করে গেছেন। মনের বিচলিত ভাব বুঝতে দেননি।
আনমনা হয়ে স্কুল থেকে ফিরে এল সুমন। চুপচাপ বসে রইল বাড়িতে। ইশ, আর একটা মাত্র দিন। তারপরই ওর পনেরো বছর পূর্ণ হবে! ও জানতে পারবে ওই চন্দনকাঠের বাক্সে মা ওর জন্য কী অমূল্য জিনিস রেখে গেছেন। আজকের রাতটা পেরোলেই।
রাতে স্বপ্নে মা আবার এলেন। যেন হাসিমুখে আশীর্বাদ করলেন সুমনকে, অনেক বড় হ, খোকা। তোর বাবা যে তোর মুখ চেয়ে আছে। তারপর ধূপের ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে ও যেন দেখল, একটা ছোট্ট চাবি কোথা থেকে এসে গেছে ওর হাতে। সুমন ধীরে-ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বাক্সটার দিকে। ওটা খুলে এবার দেখবে ও। অপেক্ষা শেষ হবে।
