আপনি কি রোজ এই স্টুডিয়োর ওপর নজর রাখেন না কি?
না। আসলে সেলসম্যানের চাকরি করি। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোই আমার পেশা। তারই মাঝে ফাঁক পেলে মানুষ দেখি…ওটা আমার নেশা। এই যে, আমার কার্ড…। কথা শেষ হতে-না হতেই জামার পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে অমৃতার হাতে তুলে দিয়েছে ছেলেটি।
রাস্তার সোডিয়াম-আলোয় কার্ডটা পড়তে পারল অমৃতা।
সুকান্ত চক্রবর্তী। বি. এ. এল. এল. বি.। সেলস এক্সিকিউটিভ।
তার নীচে একটা সাহেবি ধরনের কোম্পানির নাম লেখা।
আপনার পারসোনালিটি আমাকে খুব স্ট্রাইক করেছে। মিনিবাসের ওরকম ডেঞ্জারাস অ্যাক্সিডেন্ট থেকে বেঁচে যাওয়ার পর আপনাকে যেরকম স্টেডি দেখলাম…রিয়েলি…খুব রেয়ার কোয়ালিটি। যাদের মনের জোর খুব বেশি তাদের সঙ্গে আলাপ করতে আমার ভালো লাগে।
কেন?
আমার মনের জোর কম–তাই।
অমৃতা ছোট্ট করে হাসল। মনে মনে ভাবল, দেখাই যাক না, আলাপটা কতদূর গড়ায়। সুকান্তকে দেখে মনে হচ্ছে না ও সুযোগ-খোঁজা পুরুষের দলে। সেরকম হলে ও অনায়াসে কোনও সুন্দরী মেয়েকে বেছে নিত। সুন্দরী না-হোক, অন্তত অমৃতার মতো বত্রিশ-তেত্রিশের কোনও অসুন্দরী মেয়েকে বেছে নিত না।
আচ্ছা, প্রেম কি এভাবেই শুরু হয়?
ধুৎ, কীসব যা-খুশি ভাবছে অমৃতা। মনে হয়, সুকান্ত..।
আমরা কি এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়েই কথা বলব? সুকান্ত জিগ্যেস করল, যদি আপনার অমত না-থাকে আমরা কোনও একটা দোকান-টোকানে বসতে পারি। অবশ্য আপনার তাড়া থাকলে অন্য কথা।
তাড়া? আগামী একশো বছরে অমৃতার কোনও তাড়া নেই।
সুতরাং কথা বলতে বলতে একটা ছোটখাটো রেস্তোরাঁয় পৌঁছে গেল ওরা।
ধোঁয়া-ওঠা ফিশ ফ্রাই সামনে রেখে মুখোমুখি বসে চলল কথার-পর কথা।
জানেন, একসময় আমার গায়ক হওয়ার শখ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হল না।
কেন? আপনার গলার স্বর তো বেশ…।
দোয়াত আছে, কালি নেই। স্বর আছে, সুর নেই। হাসল সুকান্ত। তারপর আলতো করে বলল, আপনার দুটোই আছে। ভগবান আপনাকে অনেক কিছু দিয়েছেন।
মাথা নাড়ল অমৃতা : দিয়েছে আবার অনেক কিছু দেয়নি। কথাটা বলতে গিয়ে অমৃতার গলা কেঁপে গেল।
সুকান্ত বুঝল। বলল, মনখারাপ করবেন না। ভগবান লোকটা কৃপণ নয়। আপনাকে যা দিয়েছে তা-ই যথেষ্ট। ভাবুন তো, যদি এই জীবনটাই আপনাকে না-দিত! তখন তো অনেক কিছুই আপনি হারাতেন। এই যে এখন এই রেস্তোরাঁয় বসে আপনার সঙ্গে গল্প করছি, সেটাও হত না। তার মানে আমিও অনেক কিছু হারাতাম।
অমৃতা সুকান্তর মুখের দিকে তাকাল। সুকান্তর কথাগুলো ওর ভালো লেগেছে বলেই তার মধ্যে তোয়াজ আছে কি না খুঁজল।
না, সেরকম কোনও ইশারা পেল না।
আপনাকে একটা মনের কথা বলি, ম্যাডাম। এই দেওয়া-নেওয়া ব্যাপারটা ভারি মিস্টিরিয়াস। এক ধরনের মানুষ আছে যারা কিছু দিলে তার বদলে কিছু নেয়…।
ঘাড় নেড়ে সায় দিল অমৃতা। হ্যাঁ, এইরকম মানুষ ও দেখেছে।
ফিশ ফ্রাই-এর টুকরো চিবোতে চিবোতে সুকান্ত বলল, ম…ম…ম..আর-এক টাইপের মানুষ আছে যারা কিছু দিলে তার বদলে কিছু নিতে চায় না।
আপনি কোন টাইপের? অমৃতা মজা করে জিগ্যেস করল।
সেটা বললে কি আপনি বিশ্বাস করবেন? বরং খানিকটা বন্ধুত্ব হোক, তা হলে টের পাবেন।
তারপর অমৃতার গানের কথা জানতে চাইল সুকান্ত। অমৃতা বলতে লাগল, সুকান্ত মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনতে লাগল। সময় কাটতে লাগল একটু-একটু করে।
অনেক গল্পের পর ওরা উঠল।
সুকান্ত একরকম জোর করেই রেস্তোরাঁর বিল মিটিয়ে দিল।
তারপর রাস্তায় পা দিয়ে বলল, আপনি এখন বাড়ি ফিরবেন তো?
হ্যাঁ–।
আপনার বাড়িতে আর কে-কে আছে?
কেউ না। আমি একা। একটা বড় শ্বাস ফেলল অমৃতা : শুধু-আমি, আর গান। মা-বাবা আর ছোট ভাই দেশের বাড়িতে থাকে। আমার এই গানের ব্যাপারটা ওরা খুব একটা পছন্দ করে না। আমাকে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে।
সেটা আপনাকে দেখে বোঝা যায়।
আপনার বাড়িতে কে কে আছে?
সবাই। তবে মনে-মনে আমি সবসময় একা-একা থাকি।
কেন?
দুঃখ পাওয়া আমার ছোটবেলাকার অভ্যেস। তাই সুখের হদিস পেলে খুব ভয় পাই। এই বুঝি সুখের খেলনাটা কেউ কেড়ে নিল। তাই মনে-মনে একা থাকাটাই ভালো।
আমার ব্যাপারটাও অনেকটাই তাই। মনখারাপ গলায় বলল অমৃতা।
মোটেই না। আপনার গান আছে। এখন বাড়ি গিয়ে আপনি গানের রেওয়াজ করতে বসবেন। আর আমি? হুঁ…চারপাশে আড়াল তুলে আকাশপাতাল ভাবব। তবে আজ হয়তো আপনার কথা ভাবব। কালও, পরশুও…। সেইজন্যেই আমার আজ বাড়ি ফেরার তাড়া নেই।
অমৃতা সুকান্তকে দেখল। রাস্তার ঠিকরে পড়া আলোর ওর মুখে হাইলাইট তৈরি হয়েছে। সেখানে নুন-গোলমরিচের মতো দুঃখ ছিটিয়ে দিয়েছে কেউ।
জিগ্যেস করে জানল সুকান্তর বাড়ি টালিগঞ্জে। তাও ওর বাড়ি ফেরা তাড়া নেই! সেকি অমৃতার জন্য?
অসম্ভব। মনে-মনে নিজেকে এক বকুনি লাগাল অমৃতা। একটু আলাপ হতে-না-হতেই বুকের ভেতরে সারস পাখি ডানা মেলে দিয়েছে!
আপনার বাড়ি কোথায়? সুকান্ত জানতে চাইল।
কলেজ স্ট্রিটের কাছে…সূর্য সেন স্ট্রিটে…।
আপনার সঙ্গে কথা বলতে খুব ভালো লাগছিল। আপনার বাড়ি গেলে আপনাকে ব্রিফকেসটা খুলে দেখাতে পারতাম। রাস্তায় তো দেখানো যায় না!
কী আছে আপনার ওই ব্রিফকেসে? হেসে জিগ্যেস করল অমৃতা।
