স্পষ্ট টের পাচ্ছিলাম, এই নিম্নমধ্যবিত্ত জীবন, এই নিম্নমধ্যবিত্ত রেস্তোরাঁ ছেড়ে যেতে আমার কষ্ট হচ্ছে।
অনামিকা ওর সঙ্গীকে বলল, ওকে ওই আয়নাটার কাছে নিয়ে চলো।
লোকটা আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেল বেসিনের কাছে। সেখানে বড় মাপের একটা আয়না লাগানো আছে বয়েসের ভারে মলিন অথচ অভিজাত আয়না।
আয়নায় আমার প্রতিবিম্ব দেখে চমকে উঠলাম। আমার শরীরের অনেকটাই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
সেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন ছায়া দেখে আমার কান্না পেয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি অসহায়ভাবে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলাম।
আমি তা হলে শুধুই হার্ডওয়্যার আর সফ্টওয়্যার! নিছকই একটা রোবট!
কলকাতার নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্গে আমার কোনও যোগ নেই! যাকে আমি ভালোবাসি তার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই!
আমার কান্নার মাঝেই অনামিকার গলা পেলাম। কালো পোশাক পরা লোকটাকে ও বলল, ইন্দ্রজিতের ব্যাটারিটা শর্ট সার্কিট করে দাও। নইলে ফেরার সময় ঝামেলা হবে।
আয়নায় আমার ছায়া তখন অসম্পূর্ণ থেকে আরও অসম্পূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল।
একতিলের জন্য
বেঁচে গেল অমৃতা।
প্রথমটা ও ঠিক বুঝতে পারেনি। ডানদিক দেখে, বাঁ-দিক দেখে, তারপর আবার বাঁ-দিকে তাকিয়ে রাস্তা পার হওয়ার জন্য একটা পা সামনে বাড়িয়েছে কি বাড়ায়নি–কোথা থেকে একটা মানুষ-বোঝাই মিনিবাস ছুটে এসে হুস করে বেরিয়ে গেল ওর নাকের ডগা দিয়ে। মিনিবাসের গা ঘেঁষে ছুটে যাওয়া বাতাসের ঝাপটা ওর সোনার নাকছাবিটা ছুঁয়ে গেল। মৃত্যুভয়ে অমৃতার শরীরটা পলকে পাথর হয়ে গেল।
মিনিবাসটা ডানদিক থেকে আচমকা ছুটে এসেছিল। ট্র্যাফিক লাইট সবুজ হয়ে থাকায় ওটা আর দাঁড়ায়নি–মরণপণ ছুট লাগিয়েছে বড় রাস্তা ধরে।
সন্ধের মুখে অফিসপাড়ায় ভিড় কিছু কম ছিল না। তাই অমৃতার একতিলের জন্য বেঁচে যাওয়াটা অনেকেরই নজরে পড়েছে। ব্যস্তসমস্ত হয়ে বেশ কিছু মানুষ ছুটে এল ওর কাছে। শুরু হয়ে গেল চেঁচামেচি, গুঞ্জন, জ্ঞানবর্ষণ এবং কলকাতার জঘন্য যানবাহন চলাচল-ব্যবস্থা নিয়ে বিচিত্র সব মন্তব্যের ফুলঝুরি।
চারপাশের প্রায় কোনও কথাই অমৃতার কানে ঢুকছিল না। পাথর হয়ে ও শুধু ভাবছিল, কেমন করে বেঁচে গেলাম? মরে গেলে বেশ হত…পিছনে কাঁদার কেউ ছিল না। একা-একা অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। বসন্ত কবে থেকেই যাই-যাই করছে–তাকে সরিয়ে দিয়ে হেমন্ত উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করেছে।
নাঃ, শুধু গানকে আঁকড়ে ধরে বাঁচা যায় না। অমৃতা এখন একজন পুরুষকে আঁকড়ে ধরতে চায়–অন্তত একটিবারের মতো।
ওর গানের প্রশংসা অনেকে করে। পুরুষরাই বেশি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। গান ডিঙিয়ে ওরা আর এগোতে চায় না। অমৃতার চেহারা ওদের থামিয়ে দেয়। ওরা সৌজন্যের হাসি হেসে চলে যায়। ওদের আড়ো-আড়ো ছাড়ো-ছাড়ো ব্যবহার অমৃতাকে মনে পড়িয়ে দেয় ওকে দেখতে মোটেই ভালো নয়। ওর মুখটা অচল পয়সার মতো।
আচ্ছা, রূপই কি সব! মনটা কিছু নয়!
তিলতিল সাধনা করে গান শিখেছে অমৃতা। গানকে সুন্দর করে তুলেছে। তেমনই মনটাকেও ও সুন্দর করে তুলেছে। অথচ সেটার খবর কেউ জানতেই চাইল না!
গান গেয়ে এখন যৎসামান্য নাম-ডাক হয়েছে ওর। সকলেই এগিয়ে আসে ওই গান পর্যন্ত বাইরের কুরূপের আড়াল সরিয়ে মনের অন্দরে কেউ উঁকি দিতে চায় না।
আপনি খুব লাকি।
ভরাট পুরুষালি কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল অমৃতা। মুখ ঘুরিয়েই দেখতে পেল সুন্দর চেহারার এক তরুণকে। কাটা কাটা নাক, ঠোঁট, চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি। ফরসা রং, একমাথা চুল, গায়ে ঢোলা জিন্স-এর শার্ট, পায়ে বাদামি কটন প্যান্ট, কোমরে চওড়া বেল্ট হাতে ছোট্ট একটা ব্রিফকেস।
আর গায়ে কেমন এক হালকা পুরুষ-পুরুষ গন্ধ।
এক নিশ্বাসে যুবকটিকে জরিপ করে নিল অমৃতা।
গানের ক্যাসেটে অমৃতার কোনও ছবি ছাপা হয় না। তাই ওর যারা ফ্যান তারা বেশিরভাগই ওকে চেনে না। বছরে দু-চারটে ফাংশান করে অমৃতা। তার দৌলতে কিছু লোক ওকে চেনে। এই পুরুষটি…।
আপনি যেভাবে বেঁচে গেলেন সেটাকে মিরাকল বলে। চওড়া হাসল ছেলেটি : এখন কোথাও বসে একটু রেস্ট না-নিয়ে কিছুতেই যেন বাড়ির দিকে রওনা হবেন না! এরকম বিপদ থেকে বাঁচলে পর মনটাকে সেল করার টাইম দিতে হয়।
অমৃতা ফুটপাথের ওপর সরে এসেছিল। চারপাশে নজর বুলিয়ে দেখল, সবাই যে-যার কাজে ব্যস্ত–অমৃতার দিকে নজর দেওয়ার সময় কারও নেই। তবুও অমৃতা একটু অস্বস্তি পাচ্ছিল।
আপনি গান করেন?
একটা ধাক্কা খেল অমৃতা। আবার সেই গানের প্রশংসা, ন্যাকা-ন্যাকা অভিনন্দন, তারপর পিঠ বাঁচিয়ে পিঠটান! এর চেয়ে মিনিবাসের ধাক্কা অনেক ভালো ছিল।
কী করে বুঝলেন? ভীষণ রুক্ষভাবে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল অমৃতা। তার পর আরও বিরক্ত হয়ে? আপনি জ্যোতিষী না কি?
উত্তরে মিষ্টি করে হাসল ও না, জ্যোতিষী নয়…পরপর তিনদিন ওই রেকর্ডিং স্টুডিয়োটা থেকে আপনাকে বেরোতে দেখলাম…তাই। আমি গান ভালোবাসি, তবে ভালো বুঝতে পারি না বলে সবসময় কাঁচুমাচু হয়ে থাকি। যেমন এখন।
অমৃতার হাসি পেয়ে গেল। ছেলেটিও হাসছে। ওর মুখটা মোটেই কাঁচুমাচু মনে হচ্ছে না। তবে সন্দেহ একটা তৈরি হচ্ছিল অমৃতার মনে। মেয়েদের সঙ্গে গায়ে পড়ে যারা আলাপ করতে চায় এই ছেলেটি কি সেই দলের? বোধহয় না। কারণ আজ পর্যন্ত অমৃতার সঙ্গে গায়ে পড়ে কেউ আলাপ করতে চায়নি। কোনও গীতিকার, সুরকার, কিংবা ক্যাসেট কোম্পানির মালিক কখনও ওকে উলটোপালটা প্রস্তাব দেয়নি। কেউ ডিনারে নিয়ে যেতে চায়নি। কেউ সন্ধের পর ওর এক কামরার ফ্ল্যাটে আসতে চায়নি। পুরুষের হ্যাংলাপনা থেকে ও বরাবরই নিরাপদে থেকেছে–পঞ্চাশ কি ষাট পেরোনো কোনও মহিলা যেমন নিরাপদ।
