আমার সবকিছু। আমার জীবনদর্শন। মানে…ঠিক বোঝাতে পারছি না। থাকগে, পরে কখনও দেখানো যাবে।
ব্রিফকেসটা কি অজুহাত? এই ছুতোয় অমৃতার ফ্ল্যাটে গিয়ে ওর সঙ্গ চাইছে সুকান্ত? না, না, প্রথম আলাপেই এতটা দুঃসাহসী কেউ হবে না। তা ছাড়া, ও যদি আজ চলে যায়, আবার কবে ওর সঙ্গে অমৃতার দেখা হবে…।
চলুন, আপনাকে কলেজ স্ট্রিট পর্যন্ত এগিয়ে দিই। নীচু গলায় সুকান্ত বলল।
ওর কি অভিমান হল? নিশ্চয়ই ও অমৃতাকে ভীতু ভাবছে।
আপনার ব্রিফকেসে কী আছে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। কিশোরী গলায় আবদার করল অমৃতা।
খুব দেখতে ইচ্ছে করছে?
ইয়েস, খুব।
ও. কে.। তা হলে দুটো অপশান দিচ্ছি। আপনার বাড়ি যাব না। বি–আপনার বাড়ি যাব। বলুন, আপনার চয়েস কোনটা?
বি।
শিয়োর।
হ্যাঁ।
কনফিডেন্ট?
ইয়েস।
ফাইনাল জবাব? কম্পিউটার লক কর দিয়া যায়ে?
হ্যাঁ।
ও. কে. ডান। বলে হেসে অমৃতার দিকে ডানহাত বাড়াল সুকান্ত।
অমৃতাও হাত বাড়াল।
ওরা হ্যান্ডশেক করল।
ঠিক তখনই অচেনা এক উত্তেজনার তরঙ্গ অসংখ্য ডালপালা মেলে ছড়িয়ে গেল অমৃতার শরীরে। অমৃতার ভালো লাগল। এরকম নতুন ভালো-লাগা আগে কখনও ও টের পায়নি।
হাত নেড়ে একটা ট্যাক্সি দাঁড় করাল সুকান্ত। তারপর দুজনে উঠে পড়ল তাতে। অমৃতা লক্ষ করল, সুকান্ত ভদ্রমাপের দূরত্ব রেখেই পাশে বসল।
মিনিটকুড়ির মধ্যেই অমৃতার বাড়ির কাছে পৌঁছে গেল ট্যাক্সি। অমৃতা কিছু বলে ওঠার আগেই সুকান্ত ভাড়া মিটিয়ে দিল। তারপর ঢুকে পড়ল সদর দরজা পেরিয়ে।
বাড়িটা বেশ পুরোনো। দু-পাশে দুটো বাড়ির দেওয়ালে দেওয়াল সাঁটিয়ে তৈরি। দু-পাশের বাড়ি দুটো রং-চং করে ভোল ফেরানো হয়েছে। তাদের তুলনায় মাঝেরটা বয়েসের ভারে এতই নুয়ে পড়েছে যে, পাশের বাড়ি দুটো যেন দু-পাশ থেকে বাড়িটাকে সযত্নে সামলে রেখেছে। গান্ধীজির কথা মনে পড়ে গেল সুকান্তর–দুই সঙ্গিনীর কাঁধে ভর দিয়ে তার পথ চলা।
অমৃতার ফ্ল্যাট তিনতলায়। ফ্ল্যাট না-বলে আস্তানা বলাই ভালো। তবে ও নিজের মতো করে একটু-আধটু সাজিয়ে নিয়েছে।
ঘরে ঢুকে টিউব লাইট জ্বেলে দিল অমৃতা। ছোট্ট করে হেসে সুকান্তকে আহ্বান জানাল ও আসুন।
সুকান্ত চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকল। তারপর দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে খিল আর ছিটকিনি এঁটে দিল।
অমৃতা একটু অবাক হল। সেইসঙ্গে একটু বিরক্ত। কিন্তু ধৈর্য না হারিয়ে ও শান্ত গলায় প্রশ্ন করল, দরজা বন্ধ করলেন কেন?
সুকান্ত একটু বিব্রত হয়ে বলল, যদি হুট করে কেউ এসে পড়ে। এসময়ে কেউ এসে পড়লে আমার ভীষণ নার্ভাস লাগবে।
কেন, নার্ভাস লাগার কী আছে! দরজাটা খুলে বরং পরদাটা টেনে দিন। বুঝতেই তো পারছেন…মি ক্লাস পাড়া…এখানে পান থেকে চুন খসলেই লোকের জিভ লকলক করে।
দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াতে লাগল সুকান্ত। মিনমিন করে বলল, ঠিক আছে, খুলে দিচ্ছি। তার আগে আপনি টিভিটা চালিয়ে দিন।
এই অনুরোধটা অমৃতাকে অবাক করে দিল। কিন্তু ও কিছু বলল না। ঘরের এককোণে চোদ্দো ইঞ্চি একটা কালার টিভি দাঁড় করানো ছিল। ও পায়ে-পায়ে এগিয়ে গিয়ে সেটা অন করে দিল। তারপর ঘরের দুটো বন্ধ জানলা খোলার জন্য পা বাড়াতেই সুকান্তর গলা ওকে থামিয়ে দিল।
ওসব পরে হবে, ম্যাডাম–আগে আমার ব্রিফকেসটা দেখে নিন।
অমৃতা অবাক হয়ে ফিরে তাকাল সুকান্তর দিকে। ওর আচরণে কোথায় যেন একটু সুর কেটে গেছে।
কী চায় সুকান্ত? সব পুরুষ যা চায় তাই? কিন্তু অমৃতার কাছে তোত কেউ কখনও তা চায়নি! চাইলে কী হত কে জানে! অমৃতা হয়তো খুশি হয়ে সবকিছু উজাড় করে দিত। হয়তো দিত না। কিন্তু সুকান্তকে পছন্দ হয়েছে বলেই না ওকে ঘর পর্যন্ত নেমন্তন্ন করেছে!
অমৃতার হঠাৎই খেয়াল হল, সুকান্ত এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তাই বলল, বসুন।
সুকান্ত ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা একটা সোফায় বসল।
সামনেই খাটো টি-টেবল। তার ওপরে ব্রিফকেসটা রেখে শব্দ করে লক খুলল। তারপর ধীরে-ধীরে ঢাকনা তুলল।
অমৃতার চোখের নজর ঢাকনার দেওয়ালে আটকে গেল। ব্রিফকেসের ভেতরটা ও দেখতে পাচ্ছিল না। তবে ঢাকনার ওপর দিয়ে সুকান্তর মুখটা দেখা যাচ্ছিল।
একটু চা করি আপনার জন্যে?
ব্রিফকেসের ভেতরটা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল সুকান্ত। অমৃতার প্রশ্নে চমকে মুখ তুলে তাকাল। বলল, না, এখন চায়ের তেষ্টা নেই। আগে এগুলো আপনাকে দেখাই…।
অমৃতা সুকান্তর কাছে এগিয়ে আসতে যাচ্ছিল, কিন্তু তখনই ফোন বেজে উঠল। তাই থমকে দাঁড়িয়ে ও টিভির পাশে রাখা টেলিফোনের রিসিভার তুলে নিল।
ফোনে কথা বলতে বলতেই অমৃতা দেখল সুকান্ত কয়েকটা কাগজ ব্রিফকেস থেকে বের করে টেবিলের ওপরে সাজিয়ে রাখল। তারপর অমৃতার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
ফোনে কথা বলা শেষ হতেই কাগজগুলো তুলে নিল সুকান্ত। চট করে উঠে দাঁড়াল। অমৃতার দিকে দু-পা এগিয়ে কাগজগুলো বাড়িয়ে দিল ওর দিকে, বলল, এগুলো একটু পড়ে নিন…তা হলে সুবিধে হবে।
অমৃতা অবাক চোখে সুকান্তর দিকে তাকিয়ে কাগজগুলো নিল।
অনেকগুলো খবরের কাগজের কাটিং। সাদা কাগজে আঠা দিয়ে লাগানো। ওপরে এককোণে তারিখ লেখা। আট-দশটা কাগজ সুকান্ত ওকে পড়তে দিয়েছে।
অমৃতা কাগজগুলো পড়ছিল। সেই ফাঁকে সুকান্ত টিভির কাছে গিয়ে ভলিয়ুমটা বেশ বাড়িয়ে দিয়েছে।
