মার্ডারার যখন আপনার ওয়াইফকে গুলি করে তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
শরীরটা ভালো লাগছিল না বলে চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানার এককোণে শুয়ে ছিলাম। গুলির শব্দ শুনে বেরিয়ে এসে দেখি একটা লোক চন্দ্রাকে গুলি করে পালাচ্ছে। তখন আমার জ্ঞান ছিল না। শোওয়ার ঘরের দরজার পাশ থেকে খিলটা তুলে নিয়ে…। ব্যঙ্গ করে কাঁদতে লাগল দেবপ্রিয়। চন্দ্রাণীর ফটোটা খুঁজে পেল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, কালচার্ড ওয়াইফ, এবার তোমাকে চিবিয়ে খাব।
কথা শেষ করার সঙ্গে-সঙ্গে ফটোটা মুখে পুরে দিয়ে হিংস্রভাবে চিবোতে লাগল দেবপ্রিয়। চিবোতে চিবোতেই কাঁদতে লাগল আর কাল্পনিক ইনস্পেক্টরকে বলতে লাগল, জানেন, আমার জীবনটা একেবারে শেষ হয়ে গেল..সত্যিকারের আত্মীয় বলতে আর কেউ রইল না…কেউ রইল না…।
দেবপ্রিয় ফ্ল্যাটটা যেটুকু গোছগাছ করার করে নিল। তারপর দেওয়াল-ঘড়ির দিকে তাকাল। চন্দ্রাণী খুন হওয়ার পর প্রায় আট মিনিট পার হয়ে গেছে। এইবার চেঁচিয়ে লোক জড়ো করা যেতে পারে।
মুখে রাখা ফটোর পিণ্ডটা গিলে ফেলে সর্বহারা স্বামীর মতো হইচই শুরু করে দিল দেবপ্রিয়।
খুন! খুন! বলে ফ্ল্যাটবাড়ি একেবারে মাথায় তুলল।
ফলে, আধঘণ্টা কি চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ, সব এসে হাজির হল।
দেবপ্রিয় বাইরে কাঁদছিল, তবে ভেতরে-ভেতরে মজা দেখছিল। নিখুঁত খুন করতে পারার অহংকার ওর ভেতরে ফুলে-ফুলে উঠছিল।
*
দেবপ্রিয় জানত না, ওর খুনের ছকে সব ঘুঁটি ঠিকমতো সাজানো হয়নি। তাই ওর খুনটাও নিখুঁত হয়নি।
কারণ, ওর হাতে লেখা চিরকুটটা পাড়ারই একটা দোকান থেকে স্টেন মদন ফোটোকপি করে নিয়েছিল। তারপর সেই কপিটা দেবপ্রিয়র লেটার বক্সে রেখে ওপরে উঠে এসেছিল। ভেবেছিল, খুনের কাজ সেরে ফেরার পথে ওটা নিয়ে যাবে। মদন পেশাদার খুনি। সেইজন্যই একটা অস্ত্র ও হাতে রাখতে চেয়েছিল। দরকার হলে যাতে দেবপ্রিয়র বিরুদ্ধে সেটা ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সেটা মদন আর হাতে পায়নি। কারণ, দেবপ্রিয়র লেটার বক্সের অন্ধকার এককোণে চিরকুটের জেরক্স কপিটা পুলিশের জন্য অপেক্ষা করছিল।
একটু-একটু দেখা যায়
নীল শাড়ি পরা মেয়েটি রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই মলিন রেস্তোরাঁয় পরিবেশটাই যেন বদলে গেল। কোনও সুন্দরীর বাঁ-হাতের কড়ে আঙুল যদি না থাকে তা হলে ওর দিকে আমি একবারের বেশি তাকাব না এটা ঠিক নয়। তাই চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া থামিয়ে আমি রূপসি মেয়েটির দিকে অপলকে চেয়ে রইলাম।
মেয়েটি হঠাৎই একচিলতে হাসল–তারপর আমাকে তাজ্জব করে দিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল আমারই টেবিলের দিকে।
রেস্তোরাঁর নাম বিভূতি কেবিন–হাতিবাগান অঞ্চলে ব্রিটিশ আমলের রেস্তোরাঁ। চা, টোস্ট, মাংসের সিঙাড়া, চপ-কাটলেট, মোগলাই ছাড়াও এখানে পাওয়া যায় দুশো ছত্রিশবার হাতবদল হওয়া রোজকার খবরের কাগজ, নানান মাপ ও রঙের আরশোলা এবং হাফডজন টিকটিকি।
এখানে আমি প্রায়ই আসি, তবে এই সুন্দরীকে কখনও দেখিনি। এই মুহূর্তে ওকে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।
মেয়েটির বাঁ-হাতের কড়ে আঙুল নেই কিন্তু সেটা ও লুকিয়ে রাখার কোনওরকম চেষ্টাই করছে না। ডানহাতে ভ্যানিটি ব্যাগ আর বাঁ-হাতে হালকা নীল সিনথেটিক শাড়ির মনোরম ভাজগুলো ধরে রেখেছে।
আজ আমি এখানে আচমকা ঢুকে পড়েছি একটু দম নেওয়ার জন্যে। সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ মাথায় নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে কাদা প্যাঁচপেচে রাস্তায় প্রচুর ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। তারই মধ্যে হঠাৎ খেয়াল করেছি, কালো জামা-প্যান্ট পরা একটা লোক আমাকে বিচ্ছিরিভাবে ফলো করছে।
লোকটাকে আমি দিনচারেক ধরে লক্ষ করছি। ভাবলেশহীন মুখ যেন পাথর কেটে তৈরি। ছিপছিপে লম্বা চেহারা। আর পরনে আধুনিক ঢঙের কালো ফুলশার্ট আর কালো জিম্স।
আমি একা মানুষ, নিজেকে নিয়েই সময় কাটিয়ে দিই। আমার কোনও শত্রু আছে বলে মনে হয় না। অথচ আমাকে ওই লোকটা কদিন ধরে ফলো করছে।
শ্যামবাজারে ভিড়ের মধ্যে লোকটাকে আমি কঁকি দিতে পেরেছিলাম। তারপর বৃষ্টির মধ্যেই ঢুকে পড়েছি হকার্স কর্নারের সরু একচিলতে গলির মধ্যে। সেখান থেকে এ-গলি ও-গলি করে অবশেষে এই বিভূতি কেবিন। এবং বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় ধোঁয়া ওঠা স্পেশাল চায়ের কাপে তৃপ্তির চুমুক।
মেয়েটি সোজা এসে আমার মুখোমুখি বসে পড়ল। হাসল। অর্থপূর্ণ চোখে দেখল আমার দিকে।
মেয়েটিকে যা ভাবা উচিত, বুঝতে পারছিলাম মেয়েটি তা নয়। ওর ফরসা মুখে, নিপুণ সাজগোজে, কোথায় যেন একটা আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে।
আমাদের মাঝে শুধু একটা শ্বেতপাথরের টেবিলের ফাঁক। সেই ফাঁক কিছুটা কমিয়ে দিতে মেয়েটি ঝুঁকে পড়ল টেবিলের ওপর। দুটো সুন্দর হাতের পাখনা মেলে ধরল সাদা পাথরের বুকে। তারপর আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে বলল, আপনি তো ইন্দ্রজিৎ ইন্দ্রজিৎ সেন…।
আমি চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খেলাম।
সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে একবার আলাপ হলে আমি কখনও ভুলি না। এই মেয়েটিকে আমি আগে কখনও দেখিনি–কিন্তু ও আমার নাম জানল কী করে!
আপনি–আপনি আমার কথা বারবার আটকে যেতে লাগল।
আবার হাসল রূপসি। বলল, আমার নাম অনামিকা…আপনাকে আমি নিয়ে যেতে এসেছি।
