কোথায়? আমি হঠাৎই ভয় পেয়ে গেলাম। ডানহাতটা ধীরে-ধীরে টেবিল থেকে নামিয়ে পাশের চেয়ারে রাখা ব্রিফকেসের ওপর নিয়ে গেলাম। তারপর কাকড়াবিছের মতো হামাগুড়ি দিয়ে আমার ডানহাত পৌঁছে গেল ব্রিফকেসের হাতলে।
যে-কোনও অবস্থার জন্যে আমি এখন তৈরি। দরকার হলে বিফ্রকেন্স আমাকে খুলতে হবে।
অনামিকা আমাকে খুঁটিয়ে দেখল। বোধহয় বুঝতে পারল, আমি ভয় পেয়েছি। আমার কপালের বিন্দু বিন্দু ঘামও হয়তো ওর নজর এড়াল না।
ও হেসে বলল, ইন্দ্রজিৎ, শুধু-শুধু সিন ক্রিয়েট করে কোনও লাভ নেই। চলুন, সময় হয়ে গেছে–আপনাকে আমি নিয়ে যেতে এসেছি।
আমি বাচ্চাদের মতো জেদ করে বললাম, না, আমি কোথাও যাব না। এখানেই চুপচাপ বসে থাকব।
অনামিকা হাসল–অবুঝ শিশুর জেদি কথায় সুন্দরী মা যেমন হাসে।
কিন্তু আমি পাগলের মতো ভাবছিলাম। অনামিকা আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়? কীসের সময় হয়ে গেছে?
স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টায় আমি আবার চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। চা জুড়িয়ে জল, কিন্তু তা-ই সই। যেভাবেই হোক আমাকে স্বাভাবিক থাকতে হবে। আমি যে ভয় পেয়েছি সেটা ওকে বুঝতে দেব না।
আমি ওকে বললাম, চা খাবেন? সঙ্গে টোস্ট?
অনামিকা হেসে মাথা নাড়ল। যার মানে, চা-টোস্ট কিছু চাই না–শুধু তোমাকে চাই।
এবার একটু রূঢ় স্বরে বললাম, মাপ করবেন, ম্যাডাম–আপনাকে আমি চিনি না। একজন অচেনা মহিলার সঙ্গে কোথাও যেতে আমি রাজি নই।
আবার হাসল অনামিকা। ওর ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে গোল বলের মতো কী একটা বের করে আমার মুখের সামনে ধরল।
বলটা চকচকে ধাতুর তৈরি। তার ওপরে কয়েকটা রঙের রহস্যময় ছায়া।
এবার কি কিছু মনে পড়ছে? প্রশ্ন করল অনামিকা।
আমি পাগলের মতো মাথা আঁকালাম। বললাম, না, না কিছু মনে পড়ছে না।
অনামিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলটা আবার ঢুকিয়ে রাখল ওর ব্যাগের ভেতরে। তারপর চোয়ালের রেখা শক্ত করে বলল, থ্রি এক্স ওয়ান বি ওয়ান। কিছুক্ষণ আমাকে ভাবার সময় দিয়ে তারপরঃ এবার কিছু মনে পড়ছে?
আমি আবার মাথা নাড়লাম পাগলা ঘোড়ার মতো।
একটা হতাশ ভাব ফুটে উঠল অনামিকার মুখে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও বলল, ইন্দ্রজিৎ, সত্যি, তোমার মাথার ভেতরে বোধহয় কোনও গণ্ডগোল হয়েছে।
ওর আপনি থেকে তুমি-তে যাওয়া ওর শরীরের বাঁকগুলোর মতোই কী স্বাভাবিক!
আমি পালটা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমাকে চমকে দিল।
বিভূতি কেবিন-এর জীর্ণ মলিন রান্নাঘরে একটিমাত্র দরজা ও একটি বড় মাপের গরাদহীন জানলা। কিচেন থেকে চপ-কাটলেট ইত্যাদি জানলা দিয়েই বেয়ারাদের হাতে আসে। সেই জানলা এবং দরজার মাথায় বড় বড় দুটো কাচের সাইনবোর্ড। তাতে প্রকাণ্ড মাপের লাল হরফে লেখা বিভূতি কেবিন এবং মোগলাই পরোটা। আমি যখনই এখানে আসি তখন এই লেখাগুলোর দিকে মুখ করে বসি। আজও তাই।
হঠাৎই দেখি বিভূতি কেবিন লেখাটার কিছু কিছু জায়গা অদৃশ্য হয়ে গিয়ে শুধু পড়া যাচ্ছে ভূত কেবিন। আর দ্বিতীয় সাইনবোর্ডের মোগলাই পরোটা হয়ে গেছে গলা রাটা।
আমার অবাক ভাবটা অনামিকার নজরে পড়েছিল। ও পেছন ফিরে তাকাল একবার। তারপর জিগ্যেস করল, কী হল! কী দেখে অমন চমকে উঠলে?
আমি ওকে ব্যাপারটা বললাম।
তাতে ও ঝরনার জলে ভাসিয়ে দেওয়া একরাশ রঙিন কাচের চুড়ির মতো রিনরিন করে হেসে উঠল। সে-হাসি আর থামতেই চায় না।
রেস্তোরাঁয় অন্যান্য আড্ডাবাজ পরচর্চা-ভক্ত লোকগুলো ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দেখতে লাগল।
আমি চাপা গলায় বললাম, কী হচ্ছে! সবাই দেখছে!
অতি কষ্টে হাসি থামিয়ে অনামিকা বলল, এবার তো মানবে যে, সময় হয়ে গেছে। কোনও লেখারই সঠিক মানে তোমার চোখে আর ধরা পড়বে না। আচ্ছা, আমার এই কড়ে আঙুলটা ধরো তো! বলে ও টেবিলের ওপরে রাখা বাঁ-হাতটা এগিয়ে দিল আমার কাছে।
অন্য সময় হলে ওর হাতের ছোঁয়া পাওয়ার আশায় আমার মন আবেগে উথালপাতাল হয়ে যেত, রক্তকণিকা-রক্তকণিকায় বেধে যেত মরণপণ লড়াই।
কিন্তু এখন ওর কড়ে আঙুলহীন বাঁ-হাতটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন গুড়গুড় করে উঠল। একটা পরদেশি ভয় ঠান্ডা শিরদাঁড়া বেয়ে কুলকুল করে নামতে লাগল।
আমি অনামিকার কথা অমান্য করতে পারলাম না।
চায়ের কাপটা আলতো করে সরিয়ে দিলাম একপাশে। তারপর আমার বাঁ-হাত গুঁড়ি মেরে এগিয়ে যেতে লাগল ওর বাঁ-হাতের দিকে কড়ে আঙুলের শূন্যস্থান লক্ষ্য করে।
শূন্যস্থানে পৌঁছেই আমি অবাক!
আমার ছোঁয়ায় ওর কড়ে আঙুল আমি দিব্যি টের পেলাম। অথচ সেই কড়ে আঙুলটা আমি একফেঁটাও দেখতে পাচ্ছি না!
আমি হতবাক হয়ে অনামিকার সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ও ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল, ইন্দ্রজিৎ সেন, এবার বুঝতে পারছ, তোমার গল্প শেষ!
আমি ওর কথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সে কথাই জানালাম ওকে। তারপর বললাম, এসব কাণ্ডকারখানা আমার কাছে ভূতুড়ে ঠেকছে। বরং চলো, আমরা অন্য কোথাও গিয়ে একটু নিরালায় বসে গল্প করি। তোমাকে ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে।
অনামিকা ওর বাঁ-হাতটা টেনে সরিয়ে নিল। তারপর শক্ত গলায় বলল, তুমি দেখছি ভালো কথার মানুষ নও! তা হলে খারাপভাবেই কিছু করা যাক।
কথাটা বলেই ও ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আবার সেই ধাতব বলটা বের করল। ওটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কী একটা করতে লাগল।
