আমি বেরোলাম। বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল দেবপ্রিয়।
বাথরুমে শাওয়ারের জল পড়ার শব্দ হচ্ছিল। চন্দ্রাণী ঠিক আছে জাতীয় কিছু একটা বলল। দেবপ্রিয় ভালো করে বুঝতে পারল না।
বিশ্বকর্মা ইলেকট্রিকে একবার মিস্তিরির জন্যে তাগাদা করে যাব– দেবপ্রিয় বলল।
হুঁ…আচ্ছা। জলের শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে কথাগুলো শোনা গেল।
সঙ্গে-সঙ্গে লম্বা-লম্বা পা ফেলে ফ্ল্যাটের দরজার কাছে পৌঁছে গেল দেবপ্রিয়। নাইটল্যাচের নব ঘুরিয়ে দরজা খুলল। তারপর দরজাটা বেশ শব্দ করে ঠেলে বন্ধ করে দিল। দরজা নিজে থেকেই লক হয়ে গেল।
দেবপ্রিয় কিন্তু ফ্ল্যাটের বাইরে বেরোল না–ভেতরেই থেকে গেল।
সাবধানে পা ফেলে ও ফিরে গেল জামাকাপড়ের আলনার কাছে। চটপট অফিসের পোশাক খুলে ঘরোয়া পাজামা-পাঞ্জাবি পরে নিল। তারপর অফিসের পোশাক আর ব্রিফকেস আঁকড়ে ধরে চলে গেল গেস্টরুমে। হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ল গেস্টরুমের খাটের নীচে। শরীরটাকে টেনে নিয়ে গেল দেওয়ালের গায়ে, অন্ধকার এলাকায়।
এবং রুদ্ধশ্বাসে বেলা বারোটা বাজার অপেক্ষা করতে লাগল।
এটা ছকের একটা নতুন ধাপ। দেবপ্রিয় ছকটা একটু-আধটু বদলেছে। তাতে ওর মনে হয়েছে, খুনের ব্যাপারটা আরও নিখুঁত হবে।
দেবপ্রিয় লুকিয়ে অপেক্ষা করছিল আর দাঁতে নখ কাটছিল। ওর জামাকাপড়ের আলনাটা যেরকম লন্ডভন্ড থাকে তাতে পাজামা-পাঞ্জাবির ঘাটতিটা নিশ্চয়ই চন্দ্রাণীর চোখে পড়বে না। আর পড়লেও হয়তো ভাববে ওগুলো লন্ড্রিতে দেওয়া হয়েছে।
ওর এইসব উথালপাথাল ভাবনার মধ্যেই ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে উঠল।
দেবপ্রিয়র বুকটা ধড়াস করে উঠল। তারপর ওর হৃৎপিণ্ড যেন বাজি জেতার ঘোড়দৌড় শুরু করে দিল।
ছক অনুযায়ী দেবপ্রিয়র লেখা চিরকুট দেখিয়ে স্টেন মদন ফ্ল্যাটে ঢুকল। চন্দ্রাণীকে বউদি, বউদি করে একগাল হেসে টিভির কাছে গেল। হাতের ব্রিফকেস খুলে যন্ত্রপাতি বের করতে লাগল।
টিভির পিছনের ঢাকনাটা খুলে স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে কিছুক্ষণ কীসব দেখল। চন্দ্রাণী টিভির পাশে দাঁড়িয়ে মদনের কাজ দেখছিল আর বিড়বিড় করে বলছিল, সুইচ অন করতেই ফ্ল্যাশ-ট্যাশ হয়ে একেবারে সব ফিউজ হয়ে গিয়েছিল। কে জানে এখন কত খরচ হবে…।
আপনার কোনও চিন্তা নেই, বউদি..যতটা কমে হয় করে দেব। বিজ্ঞের মতন টিভির ভেতরটা দেখতে-দেখতে মদন বলল।
তারপর হঠাৎই ওর হাত থেকে ক্রু-ড্রাইভারটা পড়ে গেল মেঝেতে।
বউদি, স্ক্রু-ড্রাইভারটা একটু তুলে দিন না…।
মদনের অনুরোধে চন্দ্রাণী ঝুঁকে পড়ল মেঝের ওপর। হাত বাড়িয়ে স্ক্রু-ড্রাইভারটা তুলতে গেল।
স্টেন মদন চট করে টিভির একদিকে চলে এল। পকেট থেকে রিভলভার বের করে টিভির অন্যদিকে ঝুঁকে-পড়া চন্দ্রাণীর মাথায় নল একেবারে ঠেকিয়ে গুলি করল।
ফট করে একটা চাপা শব্দ হল।
টিভির পিছনের দেওয়ালটা বিচ্ছিরিরকম লাল হয়ে গেল। চন্দ্রাণীর জ্ঞান, অহংকার, আর আই. কিউ. ছত্রখান হয়ে দেওয়ালে লেপটে গেল। ও টু শব্দটি করার সময় পেল না।
টিভির আড়াল থাকায় মদনের গায়ে রক্ত ছিটকে এসে লাগেনি। লাগলেও কোনও ক্ষতি ছিল না, কারণ, ওর ব্রিফকেসে একই রঙের আর-এক সেট জামা প্যান্ট ছিল। মদন পেশাদার খুনি। ও-ও নিজের মতো করে ছক কষতে জানে।
রিভলভারটা পকেটে ঢুকিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গে মদন অবাক হয়ে গেল।
একটা ভারী খিল হাতে দেবপ্রিয় কখন যেন ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। মদন অবাক হয়ে কিছু একটা বোধহয় বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই দেবপ্রিয় খিলটা সপাটে মদনের মাথায় বসিয়ে দিয়েছে।
মদন টাল খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেল।
দেবপ্রিয় পাগলের মতো মদনের মাথা লক্ষ্য করে খিল চালাতে লাগল। একবার… দুবার…তিনবার…চারবার…।
দেবপ্রিয় যখন থামল তখন মদনের মাথাটা থেঁতলে যাওয়া কালোজামের মতো দেখাচ্ছিল।
খিলটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে চটপট কাজ শুরু করে দিল দেবপ্রিয়।
সাবধানে মদনের পকেট হাতড়ে মোবাইল ফোনটা বের করে নিল। ফোনের পিছনটা খুলে সিম কার্ডটা টেনে খুলল। তারপর সেটা টক করে মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে লাগল। ফোনটা ঠিকঠাক করে লাগিয়ে আবার ঢুকিয়ে দিল মদনের পকেটে।
মুখ নাড়তে নাড়তেই টিভির পাশে রাখা একটা ছোট টি-টেবিলের দিকে গেল দেবপ্রিয়। টেবিলে ওর লেখা চিরকুটটা রাখা ছিল।
সেটা তুলে নিয়ে একবার দেখল। শেষের দুটো লাইন মিহি গলায় ব্যঙ্গ করে পড়ল : .বাড়ি ফিরে কথা হবে। লাভ ইউ। তারপর চিরকুটটাও মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে লাগল।
যাক, ছকের নটা ধাপ শেষ! হাঁফ ছাড়ল দেবপ্রিয়। এরপর ললনার সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলা আর চন্দ্রাণীর সবরকম সম্পত্তি ওর মা-বাবাকে নিঃশর্ত গিট করে দেওয়া। এই দুটো ধাপ তেমন কঠিন নয়।
খুনের ছকের কয়েকটা খুঁটি দেবপ্রিয় ইচ্ছে করেই একটু নতুনভাবে সাজিয়েছিল। স্টেন মদনের বেঁচে থাকাটা ওর ঠিক পছন্দ হয়নি। এত কাণ্ড করার পর মদনকে বাঁচিয়ে রাখাটা নিতান্ত বোকামি। তাই…।
চিবোনা কাগজের মণ্ডটা এইবার জোর করে গিলে ফেলল দেবপ্রিয়।
তারপর গলার স্বর দু-রকম করে এক কাল্পনিক পুলিশ ইনস্পেক্টরের সঙ্গে চাপা গলায় কথা বলতে লাগল। আর একইসঙ্গে মদনের জামাকাপড় হাতড়ে চন্দ্রাণীর রঙিন ফটোটা খুঁজতে লাগল। খুঁজতে লাগল মদনকে চিনে ফেলা যায় বা মদনের সঙ্গে ওর যোগাযোগ ধরে ফেলা যায় এমন কোনও কাগজপত্র আছে কি না।
