৮. লেটার বক্স থেকে চিরকুটটা নিয়ে খুনি দেবপ্রিয়দের ফ্ল্যাটে যাবে। কাজ শেষ করে চিরকুটটা মুখে পুরে স্রেফ গিলে ফেলবে–অথবা, লেটার বক্সে রেখেই চলে যাবে। দেবপ্রিয় পরে ওটা সরিয়ে নেবে।
সতর্কতাঃ চিরকুটটা যাতে কিছুতেই পুলিশের হাতে না-পড়ে সেটা সুনিশ্চিত করতে হবে। ওতে দেবপ্রিয়র হাতের লেখা থাকবে। তা হলেই জানা যাবে মিস্তিরি পাঠানোর ব্যাপারটা মিথ্যে। আর খুনির সঙ্গে দেবপ্রিয়র যোগাযোগের ব্যাপারটা ধরা পড়ে যাবে।
৯. চন্দ্রাণীর খুনটা নিশ্চিত করতে বড়জোর দুটো গুলি ব্যবহার করা যেতে পারে। গুলির শব্দ চাপা দেওয়ার জন্য সাইলেন্সার অথবা বালিশ কাজে লাগানো যেতে পারে। ব্যাপারটা ফোনে খুনির সঙ্গে আলোচনা করে নিতে হবে।
সাড়ে বারোটা নাগাদ খুনিকে মোবাইলে ফোন করবে দেবপ্রিয়। যখন জানবে কাজ শেষ, তখন খুনিকে বলবে মোবাইল ফোনের সিম কার্ডটা ফেলে দিয়ে নতুন একটা সিম কার্ড ভরে নিতে। তখনই ও জেনে নেবে, খুনির বাকি টাকাটা কোনও মিলম্যানের মারফত কবে কখন খুনিকে পৌঁছে দিতে হবে।
সতর্কতাঃ সিম কার্ড পালটানোর ব্যাপারটা বেশ জরুরি। দরকার হলে একাজের জন্য খুনিকে বাড়তি দু-হাজার টাকা অফার করা যেতে পারে।
১০. চন্দ্রাণীকে খুন করানোর অন্তত একমাস আগে থেকেই ললনার সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিতে হবে। খুনের পর কমপক্ষে ছ-মাস ললনার সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলবে দেবপ্রিয়। তারপর ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে।
১১. চন্দ্রাণী খুন হওয়ার পর পুলিশ যথারীতি দেবপ্রিয়কে সন্দেহ করবে এবং পাগলা কুকুরের মতো খুনের মোটিভ খুঁজে বেড়াবে। সেইজন্যই দেবপ্রিয় শ্রদ্ধশান্তি চুকে যাওয়ার পর চন্দ্রাণীর স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি কোর্টের কাগজ তৈরি করে চন্দ্রাণীর মা-বাবাকে গিফ্ট করে দেবে। তাহলে পুলিশ কিছুতেই আঁচ করতে পারবে না, চন্দ্রাণীর আন্ডারে-আন্ডারে থেকে মানসিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তি থেকেই দেবপ্রিয় চন্দ্রাণীকে খুন করার ছক কষেছে। অর্থাৎ, ওরা কোনও মোটিভ খুঁজে পাবে না।
.
এগারোটা ধাপের পর আবার সুস্থ স্বাভাবিক স্বাধীন জীবন। তার মধ্যে তিনটে ধাপ ইতিমধ্যেই দেবপ্রিয় শেষ করে ফেলেছে। বাকি আর মাত্র আটটা ধাপ।
তৃপ্তিতে দেবপ্রিয়র চোখ বুজে এল। অন্ধকারে পাশবালিশটা আঁকড়ে ধরে ফিশফিশ করে দুবার ললনা বলে ডাকল। পাশবালিশ কোনও উত্তর দিল না। তবে দেবপ্রিয়র শরীরের চাপ টের পেল।
.
একটা মঙ্গলবারকে চন্দ্রাণীর অমঙ্গলের দিন বলে দেবপ্রিয় বেছে নিল।
তার আগের বৃহস্পতিবার স্টেন মদনকে ও ফোন করল। বলল, দিন এগিয়ে আসছে– তৈরি থাকতে। খুনের দিন সকাল নটায় ও মদনকে ফাইনাল সিগনাল দেবে। তারপর ওর সঙ্গে মদনের যোগাযোগ হবে বেলা সাড়ে বারোটার। তারপর আর কোনওদিন হবে না।
শুক্রবার রাত আটটা নাগাদ চন্দ্রাণী কিছু কেনাকেটা করতে কাছেই সুপারমার্কেটে গিয়েছিল। সেই সুযোগে টিভির পিছনের ঢাকনা খুলে সার্কিট বোর্ডে জল ঢেলে রাখল দেবপ্রিয়।
মার্কেট থেকে ফিরে এসে রান্নাবান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল চন্দ্রাণী। দেবপ্রিয় তখন ফ্ল্যাটের গেস্টরুমে অফিসের কাগজপত্র ছড়িয়ে কাজের ভান করছে। কিছুতেই ও টিভির সুইচ অন করবে না।
দেবপ্রিয়কে মন দিয়ে কাজ করতে দেখে খুশি হল চন্দ্রাণী। রান্নার ফাঁকেই ওকে এক কাপ চা করে দিল। তারপর হাতের কাজ সেরে যেই না টিভি অন করেছে অমনি শর্ট সার্কিট, শব্দ, অন্ধকার, পোড়া গন্ধ। নিশ্চয়ই ফিউজ উড়ে গেছে।
পত্নীব্রতা স্বামীর মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ল দেবপ্রিয়। ফিউজ-টিউজ পালটে সবকিছু ঠিকঠাক করল। তারপর টিভি অন করে দেখল টিভি চলছে না।
অতএব চার নম্বর ধাপ শেষ।
পরদিন দেবপ্রিয় পাড়ার বিশ্বকর্মা ইলেকট্রিক-এ খবর দিল। মালিক অনিমেষ পাত্র– দেবপ্রিয়র অনিমেষদা বললেন, চিন্তার কিছু নেই…দু-একদিনের মধ্যেই তিনি লোক পাঠাচ্ছেন।
দেবপ্রিয়র ছকের পাঁচ নম্বর ধাপ মসৃণভাবে শেষ হল।
সোমবার রাতে কাজের ছল করে প্রায় বারোটা পর্যন্ত জেগে রইল দেবপ্রিয়। অনেক মকশো করার পর একটা ছোট্ট চিঠি দাঁড় করাল ও
বিশ্বকর্মা ইলেকট্রিক
অনিমেষ পাত্র
চন্দ্রা, টিভি সারানোর মিস্তিরি যাচ্ছে। ওকে টিভিটা সারাতে দিয়ো। টাকাপয়সা কিছু দিয়ো –যা দেওয়ার আমি পরে হিসেব করে দিয়ে দেব। বাড়ি ফিরে কথা হবে। লাভ ইউ।
দেবপ্রিয়
১৮/৯/২০০১
পরদিন–অর্থাৎ, মঙ্গলবার বাজার থেকে ফেরার সময় মদনকে ফোন করে ফাইনাল সিগনাল দিল দেবপ্রিয়। তারপর বাড়িতে ঢুকে চিঠি দেখার ভান করে লেটার বক্স খুলে হাতড়াল। আর সেই ফাঁকে চিরকুটটা লেটার বক্সের মেঝেতে শুইয়ে রাখল। তারপর বাক্সের টিপতালাটা না টিপে এমনিই ঝুলিয়ে রাখল আংটার গায়ে। যাতে মদনের কোনও অসুবিধে না-হয়।
বেলা এগারোটা নাগাদ চন্দ্রাণী যখন স্নান করতে ঢুকল তখন দেবপ্রিয় তৈরি হয়ে অফিসে বেরোল।
এই কাজটা ওকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে করতে হয়েছে।
শরীরটা ভালো নেই। গা ম্যাজম্যাজ করছে। সকাল থেকে এইসব বলে সময় কাটিয়েছে। দেবপ্রিয়। এমনকী অফিসে ফোন করে বলেও দিয়েছে, আজ অফিসে যাব না। তারপর দশটা নাগাদ হঠাৎ অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে শুরু করেছে।
চন্দ্রাণী রোজই পৌনে এগারোটা-কি-এগারোটা নাগাদ স্নান করতে যায়। দেবপ্রিয় ঠিক করল, চন্দ্রাণী যখন বাথরুমে থাকবে তখনই ও ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরোবে। অর্থাৎ, বেরোনোর ভান করবে।
