এই ধরনের খুনের ক্ষেত্রে পুলিশ স্বামীকে সন্দেহ করে প্রথমেই খোঁজ করবে সম্প্রতি স্বামীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে মোটা টাকা তোলা হয়েছে কি না। সেইজন্যই দেবপ্রিয় প্রতি মাসে অল্প অল্প করে টাকা তুলে নিজের কাছে ক্যাশ টাকা জমাতে লাগল। যেদিন ওর লুকোনো ক্যাশ টাকার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজারে পৌঁছোবে সেদিন ও ছকের নতুন ধাপে পা দেবে।
টাকাটা জমাতে আট মাস সময় লাগল। তারপর দেবপ্রিয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রফেশনাল কিলারের খোঁজ করতে শুরু করল।
পাড়া থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে প্রোমোটার সেজে জমির খোঁজে নেমে পড়ল দেবপ্রিয়। মাসখানেক ঘোরাঘুরি করতেই একজন পেশাদার খুনির খোঁজ পেয়ে গেল ও।
লোকটার নাম স্টেন মদন। কালো, রোগা দড়ি পাকানো চেহারা। বাঁ-চোখটা সামান্য ট্যারা। বয়েস বড়জোর পঁয়তিরিশ। তবে ওর কারিকুলাম ভিটা দেখবার মতো। পাঁচটা খুন, তিনটে ধর্ষণ, আটবার ডাকাতি, এ ছাড়া গুলি-গোলা বোমাবাজি তো আছেই! এ-পর্যন্ত সব মিলিয়ে মোট সাত বছর জেল খেটেছে।
মদনের গলায় সোনার চেন, গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবি, পায়ে জিনস, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, হাতে সোনার ব্যান্ড লাগানো ঘড়ি। ছিটেবেড়া আর টিনের চাল লাগানো একটা মিষ্টির দোকানের বেঞ্চিতে বসে টেপ-রেকর্ডারে গান শুনছিল আর গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল।
দেবপ্রিয় চুল উশকোখুশকো করে চোখে রে-বান-এর সানগ্লাস লাগিয়ে মদনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। একমিনিটের মধ্যেই ওর কাজের কথা শেষ হয়ে গেল।
দরাদরির মধ্যে না-গিয়ে ও প্রথমেই মদনকে পঞ্চাশ হাজার টাকা অফার করে বসল। তারপর চন্দ্রাণীর একটা রঙিন ফটো ওকে দিল। সঙ্গে টাইপ করা ঠিকানা।
নোংরা বালবের আলোয় মদন ফটোটা তেরছা চোখে দেখল। গ্লাসে একটা জোরালো চুমুক মেরে বলল, কোনও টেনশন নেই–মাল নেমে যাবে।
দেবপ্রিয় গলাটা অন্যরকম করে বলল, এই মেয়েটি ফ্ল্যাটে একাই থাকবে। তবে কলিং বেল বাজালেই আপনাকে দরজা খুলে দেবে না। তখন আমার লেখা একটা চিরকুট আপনি দরজার নীচ দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেবেন। ওটা পড়লেই ও দরজা খুলে দেবে। তারপর ফ্ল্যাটে ঢুকে….।
কথা শেষ না করে মদনকে তিরিশ হাজার টাকা দিয়ে দিল দেবপ্রিয় লাল রঙের তিরিশটা নোট। তারপর স্টেন মদনের মোবাইল নাম্বার নিয়ে চলে এল। বলল, ওর সঙ্গে মদনের আর দেখা হবে না। বাকি আলোচনা ও ফোনে করবে।
মদনকে দেবপ্রিয় নিজের নাম বলেনি। ওদের আলাপ-পরিচয় যত কম হয় ততই ভালো। তাতে ধরা পড়ার ভয় কম। খুনের দিন সকালে মদন ওর নাম জানতে পারবে–তার আগে নয়।
কিন্তু আপনি ফোন করলে বুঝব কেমন করে? মদন জানতে চাইল।
আমি ফোন করে প্রথমেই বলব, চন্দ্রাণী বলছি। তাতে আপনি বুঝে নেবেন। আর কবে, কখন কাজটা সারতে হবে সেটা আমি কাজের দিন সকালে আপনাকে জানাব। এসবই সেফটির জন্যে। বাকি কুড়ি হাজার টাকাও আপনি সেদিনই পেয়ে যাবেন–তবে কীভাবে পাবেন সেটা এখনই বলছি না।
মদন হাসল। বলল, ডিউ বিশ হাজার টাকা নিয়ে কোনও পরেনি আমার নেই। আমার টাকা কেউ চোট করতে পারে না…তাহলে সে নিজেই চোট হয়ে খাল্লাস হয়ে যাবে।
দেবপ্রিয় কাজ সেরে বাড়ি ফিরে এল। গলা ছেড়ে হিন্দি গান গাইতে গাইতে ফ্ল্যাটে ঢুকল।
চন্দ্রাণী ওর হেঁড়ে গলার গান শুনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, আনকাম্ফার্ড।
রাতে বিছানায় শুয়ে ক্রিকেটারদের ক্যাচ প্র্যাকটিসের মতো খুনের ছকটাকে নিয়ে অন্ধকারে লোফালুফি করতে লাগল দেবপ্রিয়। ওর ভেতরে একটা খুশির তুবড়ি জ্বলছিল।
সারা রাত ধরে খুনের ছকের প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখল দেবপ্রিয়। নাঃ, কোথাও কোনও ফঁক নেই। সব খুঁটি ঠিক-ঠিক জায়গাতেই বসানো আছে।
দেবপ্রিয়র ছকের ধাপগুলো এইরকম :
১. চন্দ্রাণীকে খুন করার জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া।
২. ধীরে-ধীরে, বেশ সময় নিয়ে, পঞ্চাশ হাজার টাকা গোপনে জমানো। টাকাটাকে ধীরেসুস্থে নানান জায়গা থেকে হাজার টাকার নোটে বদলে নেওয়া। এতে টাকা দেওয়া-নেওয়ার সুবিধে হবে।
৩. একজন ভাড়াটে খুনিকে কাজের দায়িত্ব দেওয়া। সঙ্গে চন্দ্রাণীর রঙিন ফটো এবং কম্পিউটারে ছাপানো ফ্ল্যাটের ঠিকানা।
সতর্কতাঃ খুনিকে ঠিক করতে হবে বেশ দুরের কোনও এলাকা থেকে। খুনির সঙ্গে দেখা করার সময় হালকা ছদ্মবেশ–যেমন, সানগ্লাস ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে। খুনির সঙ্গে একবারের বেশি দেখা করা ঠিক হবে না। সব যোগাযোগ ফোনে সারতে হবে। ফ্ল্যাটের ঠিকানাটা যে-কোনও একটা কম্পিউটার সেন্টার থেকে অন্যান্য বাজে ঠিকানার সঙ্গে ছাপিয়ে নিতে হবে। তাতে হাতের লেখা মিলিয়ে পুলিশ তদন্তে এগোতে পারবে না।
৪. খুনের দিনক্ষণ ঠিক করার পর তার দু-দিন কি তিনদিন আগে ঘরের রঙিন টিভিটা খারাপ করে দিতে হবে।
৫. পাড়ার এমন একটা ইলেকট্রিকের দোকানে খবর দিতে হবে, যার বেশ গাফিলতি আছে। সাতবার কি আটবার তাগাদা না-দিলে মিস্তিরি পাঠায় না।
৬. খুনের দিনটা কাজের দিন হিসাবে বেছে নেওয়া হবে–যাতে অফিস-কাছারি সব খোলা থাকে। সেদিন বেলা বারোটার সময় ভাড়াটে খুনিকে ফ্ল্যাটে আসতে বলবে।
৭. খুনি টিভি সারানোর মিস্তিরি সেজে বাড়িতে ঢুকবে। একতলায় সিঁড়ির নীচে দেবপ্রিয়দের নাম লেখা লেটার বক্সে একটা চিরকুট রাখা থাকবে। চিরকুটে চন্দ্রাণীর নামে একটা ছোট্ট চিঠি লিখবে দেবপ্রিয়। যার সারমর্ম হল, টিভি সারানোর মিস্তিরি যাচ্ছে–ওকে টিভিটা সারাতে দিয়ো। টাকাপয়সা কিছু দিয়ো না দেওয়ার আমি দিয়ে দেব। চিঠির ওপরে ইলেকট্রিকের দোকানের নাম ও মালিকের নাম লেখা থাকবে–যাতে খুনি নাম দুটো জানতে পারে, চন্দ্রাণী আচমকা জিগ্যেস করলে ঠিক ঠিক জবাব দিতে পারে।
