ইস, খুন হয়ে যাওয়া লোকগুলো যদি জানত আসল ক্লায়েন্টরা কখনও তার দোকানে আসে না–তারা ফোনেই কাজ সারে–আর নিজের কবর খোঁড়ার জন্য শিকারকেই পাঠিয়ে দেয় তার দোকানে!
একটা ঘুঁটি কম ছিল
চন্দ্রাণীকে খুন করার জন্য দেবপ্রিয় যে-ছক তৈরি করেছিল তাতে কোনও ভুল ছিল না। ছকটাকে নানাদিক থেকে বারবার খতিয়ে দেখে দেবপ্রিয়র অন্তত সেইরকমই মনে হয়েছিল।
সবাই জানে, কোনও বিবাহিতা মহিলা খুন হলে পুলিশ সবার আগে তাঁর স্বামীকে সন্দেহ করে। দেবপ্রিয়ও একথা জানত। সেইজন্যই ও বারবার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছকটাকে যাচাই করছিল।
ব্যাপারটা অনেকটা স্লো মোশানে অ্যাকশন রিপ্লে দেখার মতো।
প্রায় মাসখানেক ধরে খুনের ছকটায় খুঁটি চালাচালি করে দেবপ্রিয় যেদিন নিশ্চিত হল যে,, ছকটায় কোনও গোলমাল নেই, সেদিন ফুর্তিতে ও তিন পেগ হুইস্কি চড়িয়ে বাড়ি ফিরল। চন্দ্রাণীকে ও আর ভয় পায় না।
ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে পাখির ডাকের কলিং বেল টিপতেই ম্যাজিক আই-এ চোখ রাখল চন্দ্রাণী। তারপর দরজা খুলল।
এবং মদের গন্ধ পেল।
আজ আবার এসব গিলে এসেছ। চাপা গলায় হিসহিস করে বলল চন্দ্রাণী। ও চায় না ঘরের অন্তর্বাস চৌরাস্তার মোড়ে কাঁচা হোক, তাই গলার স্বর তিরিশ ডেসিবেলের ওপরে উঠল না।
তেমন কিছু খাইনি। জড়ানো গলায় বিড়বিড় করে জবাব দিল দিবপ্রিয়, ওরা জোর করে খাইয়ে দিল…।
ওরা কারা দেবপ্রিয় জানে না। জানার দরকার নেই।
ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে চন্দ্রাণীর গীতাপাঠ শুরু হল; ভদ্রসমাজে বাস করতে হলে সামাজিক নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়; আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদা ইত্যাদি বোধ থাকা দরকার; সম্মান গেলে কখনও আর ফিরে আসে না; ডিসিপ্লিন একটা সুখী সংসারের চাবিকাঠি।
গীতাপাঠ চলছিল, আর দেবপ্রিয় এক অদ্ভুত চোখে বউকে দেখছিল। মনে-মনে বেশ মজা পাচ্ছিল ও। চন্দ্রাণী জানে না, ওর শেষ ঘণ্টা বেজে গেছে। আর কদিন পর যখন ও নেই হয়ে যাবে, তখন বেনিয়ম করলে দেবপ্রিয়কে এরকম জ্ঞান দেবে কে!
আক্ষেপের চুক-চুক শব্দ বেরিয়ে এল দেবপ্রিয়র মুখ থেকে। ও বলল, সরি, চন্দ্রা….আর হবে না। প্লিজ, ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট।
দেবপ্রিয় অন্যদিন এত সহজে বশ মানে না। আজ মানল, কারণ, আজ একটু আগেই ও চন্দ্রাণীর কপালে মনে-মনে কাটা চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এখন থেকে ও চন্দ্রাণীর সব কথা শুনবে, পদে-পদে ওর কাছে হার মানবে। আর তো মাত্র কটা দিন!
চন্দ্রাণীর বাবা রিটায়ার্ড বিচারপতি। আর মা কলেজের প্রফেসর। চন্দ্রাণী ওঁদের একমাত্র মেয়ে।
বিয়ের পর শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে মেলামেশা করে দেবপ্রিয় যা বোঝার বুঝেছে। ওর মনে হয়েছে, চন্দ্রাণীর বাবার ডাকনাম ডিসিপ্লিন, আর মায়ের ডাকনাম আত্মসম্মান। এই দুটি মহান মানুষের মিলনে জ্ঞান লগ্নে অহংকার রাশিতে চন্দ্রাণীর জন্ম। ওর ডাকনাম চানু, কিন্তু দেবপ্রিয়র মনে হয়েছে ডাকনামটা গীতা হলেই ভালো মানাত।
প্রেম গীতা-টিতা মানে না। তাই দেবপ্রিয়র সঙ্গে চন্দ্রাণীর প্রেম হয়েছিল। বিয়েও।
তার পাঁচ বছর পর আবার প্রেম এল। শরীরী প্রেম।
মেয়েটির নাম ললনা। দেবপ্রিয়দের অফিসে সিস্টেম অ্যানালিস্ট-এর কাজ করে। দেখতে রীতিমতো কুৎসিত। কিন্তু ওর অন্য লুকোনো গুণ আছে। যে-গুণ মরা মানুষের শরীরেও শ্মশানের লকলকে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ললনার কোনও ডাকনাম নেই। তাই দেবপ্রিয় ওর ডাকনাম রেখেছিল কামনা। ডাকনামটা কামনার বদলে বাসনা অথবা বিছানা হলেও কোনও ক্ষতি ছিল না।
অনেকে হয়তো ভাববে কামনাকে বিয়ে করার জন্যই চন্দ্রাণীকে দেবপ্রিয় খুন করতে চাইছে। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই সেরকম নয়। কারণ, কামনাকে বিয়ের ব্যাপারে দেবপ্রিয়র কোনও মাথাব্যথা নেই। তা ছাড়া কামনার ইন্টারেস্ট শুধু ইয়েতে বিয়েতে নয়। ও কারও আন্ডারে থাকতে ভালোবাসে না। যেমন দেবপ্রিয় চন্দ্রাণীর আন্ডারে রয়েছে।
যখন ওরা আদরে-আদরে ব্যস্ত থাকে তখন এই আন্ডারে থাকা নিয়ে দেবপ্রিয়কে মাঝে-মাঝে খোঁচা দেয় কামনা। সেইসঙ্গে খিলখিল হাসি এবং মারাত্মক শরীর ঝাঁকুনি–যা একমাত্র ও-ই পারে। তখন দেবপ্রিয় সুখে পাগলের মতো হয়ে যায়।
এখন তুমি আমার আন্ডারে আছ। শব্দ করে হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে এলোচুল সরিয়ে দেয় কামনা। তারপর ও কাল রাতে আমি তোমার আন্ডারে ছিলাম। খিলখিল হাসি ও এইরকম আন্ডারে থাকতে ভালো লাগে। তবে তুমি যেভাবে তোমার বউয়ের আন্ডারে দিন কাটাও সেরকম নয়। আমার কাছে লাইফের মানে হচ্ছে ফ্রিডম…।
এইরকম একটা অবস্থায়, অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে কামনার কথা শুনতে-শুনতে হঠাৎই আন্ডারওয়ার্ল্ড শব্দটা দেবপ্রিয়র মাথায় আসে। এবং মনে হয়, চন্দ্রাণীকে খুন করলে কেমন হয়!
আশ্চর্য! এ-কথা ভাবামাত্রই ওর শরীর উত্তেজনায় ফেটে পড়তে চাইল। লোহা হার মেনে গেল ওর শরীরের দৃঢ়তার কাছে।
কামনা সেটা টের পেল। টের পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে ওর কাজে মন দিল।
দেবপ্রিয় যখন পিছন ফিরে ভাবে তখন ও বেশ বুঝতে পারে সেই বিশেষ মুহূর্তেই চন্দ্রাণীকে খতম করার মতলবটা প্রথম ওর মাথায় জন্ম নিয়েছিল।
তারপর থেকে দেবপ্রিয় ধীরে-ধীরে টাকা জমাতে শুরু করে। কারণ, আন্ডারওয়ার্ল্ডের যে পেশাদারি খুনিকে ও চন্দ্রাণীর দায়িত্ব দেবে তাকে টাকা দিতে হবে। এখন এসব কাজের যা বাজারদর তাতে হাজার পঞ্চাশেক হলেই কাজ হয়ে যাবে।
