পীতাম্বর টাকা খরচ করার চেয়ে জমাতেই বেশি ভালোবাসেন। পদ্মাবতীর উচ্চুঙ্খল খরচের লাটসাহেবিয়ানা পীতাম্বরকে ভেতরে-ভেতরে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়। তাই বৃদ্ধের মুখে বিযের দাম শুনে তিনি রীতিমতো ধাক্কা খেয়েছেন। কিন্তু…।
এ ছাড়া উপায়ও তো নেই।
তবে একটাই সান্ত্বনা, এই বিশহাজার টাকা খরচ করার পর তিনি পদ্মাবতীর বেপরোয়া খরচের জ্বালাপোড়া থেকে মুক্তি পাবেন–চিরকালের জন্য।
পীতাম্বর মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, ও. কে., এগ্রিড। বিশহাজার।
আপনি বুদ্ধিমান। থ্যাংক য়ু– হেসে বললেন বৃদ্ধ, এবারে আপনার কাজ হল পাঁচহাজার টাকা অ্যাডভান্স দেওয়া। তারপর পরশুদিন সন্ধেবেলা এসে বাকি পনেরো দিয়ে..ইয়ে…মানে ওষুধের শিশিদুটো নিয়ে যাওয়া…।
পরশু পনেরোহাজার টাকা দিয়ে দেওয়ার পর যদি বাই চান্স ওষুধে কাজ না হয়, তখন?
পীতাম্বর বেশ দোটানায় পড়ে গেলেন। কেস জন্ডিস হয়ে গেলে পীতাম্বর কার নামে অভিযোগ করবেন? আর কার কাছেই-বা করবেন? এই বুড়োটা যদি ডাহা ঠকায়, তখন? আচ্ছা, পরশুদিন পাঁচহাজার দিলে হয় না–তার পরে, কাজ ঠিকমতো চুকে গেলে বাকি দশ?
সে কথাই বৃদ্ধকে বললেন পীতাম্বর।
বৃদ্ধ হেসে বললেন, হতে পারে–তবে একটা কন্ডিশান আছে। পরশুদিন আপনাকে আইডেন্টিটি প্রুফ আর অ্যাড্রেস প্রুফ নিয়ে আসতে হবে মানে, ভোটার কার্ড আর লেটেস্ট ইলেকট্রিক বিল কিংবা টেলিফোন বিল নিয়ে আসতে হবে। তা না হলে, আলট্রানিড পয়জনের কাজ মিটে গেলে যদি আপনি আর টাকা না দেন? তখন আমি কার পেছনে টাকার জন্যে ঘুরব?…যদি রাজি থাকেন তা হলে পাঁচহাজার টাকা দিন।
অ্যাড্রেস প্রফের কথা বলতেই পীতাম্বরের মুখে ফুটে ওঠা অস্বস্তির ভাব বৃদ্ধের নজর এড়ায়নি। তিনি গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন, বেকার দুশ্চিন্তা করবেন না। আগেই তো বলেছি, সিক্রেসি আমাদের গুডউইল। ক্লায়েন্টদের ট্রাস্ট যদি একবার চলে যায় তা হলে আমার ব্যাবসা দু দিনেই লাটে উঠবে। সুতরাং একবার কানের লতি চুলকে নিলেন? সুতরাং পরশু সন্ধেবেলা সাতটা নাগাদ নিশ্চিন্তে চলে আসুন আইডেন্টিটি প্রফ আর অ্যাড্রেস প্রুফ নিয়ে..সঙ্গে ক্যাশ পাঁচহাজার টাকা। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ও এখন তা হলে পাঁচহাজার দিন…।
পীতাম্বর নীরবে শর্ত পালন করলেন।
বৃদ্ধ একটা খাতা খুলে ছোট-ছোট হরফে কীসব লিখে নিলেন। তারপর খাতা থেকে মুখ তুলে বললেন, তা হলে এই কথা রইল। পরশু সন্ধে সাতটা।
.
নীল লেবেল লাগানো ছোট্ট শিশিটার দিকে তাকালেন পীতাম্বর।
কবিরাজ নেপালপদ সরকারের আশ্চর্য আবিষ্কার। হালকা বিষ। অ্যান্টিডোট। প্রতিষেধক। আসল বিযের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার একমাত্র দাওয়াই।
এটা খাওয়ার পর তিনঘণ্টা কাটবে। রাত দশটা নাগাদ তিনি আর পদ্মা খেতে বসবেন। তেল ঝাল মশলা দিয়ে রান্না করা কষা মাংস আর পরোটা সঙ্গে বাদশাহী স্যালাড। মাংসের মধ্যে মেশানো থাকবে লাল লেবেল লাগানো শিশির মারাত্মক বিষ। তার একফেঁটা গন্ধও টের পাবে না পদ্মাবতী। কারণ, রানিবালা চিকিৎসালয়ের বৃদ্ধ দোকানদার বলেছেন, বিষটা কষা মাংসে মিশিয়ে দিলে তার কোনও স্বাদ-গন্ধ পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া বেশিরভাগ রাতেই পদ্মা অল্পবিস্তর নেশা করে ফেরে।
সুতরাং কষা মাংস এবং পরোটা ইত্যাদি খাওয়ার পরেই পদ্মার গল্প শেষ। নতুন গল্প শুরু।
এইসব কথা চিন্তা করতে করতে নীল লেবেল লাগানো শিশিটার ছিপি খুললেন পীতাম্বর। মাথা পিছনে হেলিয়ে বড় মাপের হাঁ করে শিশির স্বচ্ছ তরলটুকু নিশ্চিন্তে গলায় ঢেলে দিলেন।
পীতাম্বরের গলা জ্বলতে শুরু করেছিল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তিনি খাওয়ার টেবিলে রাখা জলের বোতলের দিকে হাত বাড়ালেন। কিন্তু ঠিকমতো বোতলটা ধরতে পারলেন না। ওঁর হাতের ধাক্কায় বোতলটা টেবিলে কাত হয়ে পড়ে গেল। জলে ভেসে গেল টেবিল।
পীতাম্বরের হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ। দম নিতে অসহ্য কষ্ট হচ্ছিল।
ওঁর শরীরটা হঠাৎই টলে পড়ে গেল মেঝেতে। সেই অবস্থাতেই পকেটে হাত ঢুকিয়ে মোবাইল ফোনটা বের করার চেষ্টা করলেন–পারলেন না।
ওঁর গল্প শেষ হয়ে গেল।
মারা যাওয়ার আগে পীতাম্বরের শেষ চিন্তা ছিল, দুটো শিশির লাল আর নীল রঙের লেবেল ভুল করে উলটে যায়নি তো!
.
পদ্মাবতী রাতে ফিরে পীতাম্বরের মৃতদেহটা দেখতে পেল। সঙ্গে-সঙ্গে ও মোবাইল ফোনের বোতাম টিপে একটা নম্বর ডায়াল করল।
হ্যালো, রানিবালা চিকিৎসালয়?
হ্যাঁ–বলুন।
আমি পীতাম্বর বিশ্বাসের ওয়াইফ বলছি। কাজটা হয়ে গেছে…।
আপনি খুশি তো, ম্যাডাম?
অফ কোর্স।
ক্লায়েন্টদের স্যাটিসফ্যাকশনই আমাদের মটো। এবার তা হলে…ইয়ে…আমাদের সার্ভিস চার্জের বাকি বিশহাজার টাকাটা কাউকে দিয়ে কাইন্ডলি একটু পাঠিয়ে দেবেন। আপনাকে তো আগেই বলেছি, টোটাল তিরিশ হাজারের দশহাজার টাকা আপনার হাজব্যান্ড দিয়ে গিয়েছিলেন…।
কোনও চিন্তা করবেন না কালই টাকাটা পাঠিয়ে দেব।
থ্যাংক য়ু, ম্যাডাম।
ফোনে কথা শেষ করে বৃদ্ধ ভাবছিলেন, কী অদ্ভুত পেশায় তিনি জড়িয়ে আছেন! যারা খুন হতে চায় তারা নিজের ইচ্ছেয় তার দোকানে আসে। খুন হওয়ার জন্য আগাম দেয়..অবশ্য কেউ-কেউ পুরো পেমেন্টও করে দেয়। তারপর নিজেই নিজেকে খুন করে। আর পুলিশের খাতায় সুইসাইডের সংখ্যা একটা বেড়ে যায়।
