কেমিক্যালের গন্ধে পীতাম্বরের দম আটকে যাচ্ছিল। মাথার ওপরে ছোট একটা পাখা ঘুরলেও পীতাম্বর বেশ ঘামছিলেন।
আমি…মানে…।
আপনি কি আপনার ওয়াইফকে সরাতে চান?
বৃদ্ধের প্রশ্নে যেন ইলেকট্রিক শক খেলেন পীতাম্বর। ওঁর শরীর কেঁপে গেল। মনের কথা পড়তে পারে নাকি এই বুড়োটা!
দোকানদার সবজান্তা-হাসি হাসলেন অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমার কাছে হাজব্যান্ড ওয়াইফ-এর কেসই বেশি আসে। হয় হাজব্যান্ড ওয়াইফকে সরাতে চায়, নয় ওয়াইফ হাজব্যান্ডকে। আপনি…।
বৃদ্ধকে কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়ে পীতাম্বর বললেন, হ্যাঁ, হাওয়াইফকে।
জিভ টাকরায় ঠেকিয়ে একটা দুঃখের শব্দ করলেন বৃদ্ধ। নরম গলায় বললেন, একটা সময়ের পর সব বিয়ে কেমন তেতো হয়ে যায়। তখন মনটা মুক্তি চায়। কিন্তু মুক্তি, ওরে মুক্তি কোথায় পাবি..হাসলেন বৃদ্ধ ও আর সেইজন্যেই আপনাদের মতো নিপীড়িত ক্লায়েন্টদের আমি সার্ভিস দিই…।
এবারে আসল কথায় আসি হাতে হাত ঘষে পীতাম্বরের দিকে ঝুঁকে এলেন বৃদ্ধ ও যে আলট্রানিউ পয়জনটার কথা আপনাকে এখন বলব সেটা আমার বাবার আবিষ্কার। আমার বাবা নেপালপদ সরকার এককালের বিখ্যাত কোবরেজ ছিলেন। বাবার তৈরি মোদক একবার খেলে মানুষ নেশার ফাঁদে পড়ে যেত। বাবা সবসময়েই হাজাররকম গাছগাছড়ার নির্যাস আর কেমিক্যাল নিয়ে হাজাররকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। তো ওইসব করতে করতেই একদিন–আজ থেকে প্রায় বাহাত্তর বছর আগে–এক মারকাটারি বিষ আবিষ্কার করলেন। তার কেমিক্যাল ফরমুলা এখন আমি ছাড়া আর কেউ জানে না।
পীতাম্বর অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, মারকাটারি বিষ মানে?
এ-প্রশ্নে বৃদ্ধ বেশ মজা করে হেসে উঠলেন। বললেন, মারকাটারি মানে একেবারে স্পেশাল টাইপের অব্যর্থ বিষ। এই ধরুন খাবারের মধ্যে এই বিষ মাপা পরিমাণে মিশিয়ে আপনি আর আপনার ওয়াইফ একসঙ্গে খেয়ে নিলেন। আপনার ওয়াইফ যে মারা যাবেন তার একেবারে ফুল গ্যারান্টি। কিন্তু আপনি, বিষাক্ত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেও বেঁচে যাবেন। মানে, দু-চারদিন নার্সিংহোমে কাটাতে হলেও প্রাণে বেঁচে যাবেন। তখন পুলিশ আপনাকে মোটেই সন্দেহ করবে না–যেহেতু একই বিষ মেশানো খাবার আপনিও খেয়েছেন, অথচ লাকিলি আপনি বেঁচে গেছেন।
ব্যস, তখন মুক্তি–এবং মনের মতো করে নবজীবন শুরু। এককথায় আনন্দের আর সীমা নেই! কী বলেন?
পীতাম্বর মন্ত্রমুগ্ধের মতো বৃদ্ধের কথা শুনছিলেন। এসব কি রূপকথা, নাকি বাস্তব? ওঁর বুকের ভেতরে হাতুড়ি পেটাচ্ছিল কেউ, আর অঝোরে লোভের লালা ঝরছিল।
কিন্তু ভদ্রলোকের কথাবার্তায় কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে না! বিষ মেশানো খাবার খেলেন দুজন কিন্তু একজন বেঁচে যাবে কেমন করে? তার রহস্যটা বৃদ্ধ এখনও ফাস করেননি।
সে-কথা জিগ্যেস করতেই টেবিলে চাপড় মেরে হেসে উঠলেন তিনি। বললেন, ওটাই তো আসল মিস্ত্রি। ওটার জন্যেই তো আমার এত পসার।
এবার মনোযোগ দিয়ে কৌশলটা শুনুন… বৃদ্ধ বড় করে একটা হাই তুললেন। হাঁ-করা মুখের সামনে দু-আঙুলে কয়েকবার তুড়ি বাজালেন। তারপর ও ওই বিষটার একটা অ্যান্টিডোট– মানে, প্রতিষেধকবাবা তৈরি করতে পেরেছিলেন। আসলে সেটাও একরকমের হালকা বিষ।
বিষ মেশানো খাবার খাওয়ার আগে…ঠিক তিনঘণ্টা আগে..ওই অ্যান্টিডোটটা খেয়ে নিতে হবে। তা হলেই আপনি হয়ে গেলেন পুরোপুরি সুরক্ষিত। তখন মনের আনন্দে বিষ মেশানো খাবার খান–নো প্রবলেম। তবে হ্যাঁ… মাথা চুলকোলেন বৃদ্ধ। চোয়ালে হাত বোলালেন। বললেন, তবে হা…একটু কষ্ট তো হবেই। আপনি বিষ মেশানো খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়বেন, নার্সিংহোমে যাবেন, জীবন নিয়ে একটু টানাটানি হবে–কিন্তু শেষ পর্যন্ত যমরাজ জিতবে না…আপনিই জিতবেন। আর…বুঝতেই পারছেন, আপনাকে সন্দেহ করার কোনও প্রশ্নই উঠবে না…।
টেবিলে চাপড় মেরে বক্তৃতা শেষ করলেন বৃদ্ধ। মুখে তৃপ্তির হাসি। কারণ, ব্যাপারটা তিনি ক্লায়েন্টকে ঠিকমতো বোঝাতে পেরেছেন।
পীতাম্বরও মনে-মনে খুশি হয়েছিলেন। সত্যিই এই প্ল্যানটায় হিসেবের কোনও ফঁক নেই। তবে একটা ছোট্ট প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে : বিষটায় কোনও গন্ধ নেই তো! খাবারে মেশানোর পর যদি উৎকট কোনও গন্ধ পাওয়া যায়…?
সেই প্রশ্ন করতেই বৃদ্ধ হেসে বললেন, নো প্রবলেম। মাংসের ঝোল।
মাংসের ঝোল মানে?
আপনার ওয়াইফ মাংস খেতে পছন্দ করেন তো?
পছন্দ মানে! ও পুরোপুরি মাংসাশী প্রাণী। কষা মাংস ওর হট ফেবারিট।
চমকার। বেশ করে মশলাপাতি দিয়ে কষে মাংস রান্না করার বন্দোবস্ত করবেন। মানে, দুজনের জন্যে। তাতে আমি যে-শিশিটা দেব ওটার লিকুইডটা পুরোটা ঢেলে দেবেন। ব্যস কাজ শেষ।
ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন পীতাম্বর। কোথাও কোনও রিস্ক ফ্যাক্টর আছে কি না সেটাই খতিয়ে দেখছিলেন। পদ্মাবতীর মুখটা মনে পড়ল ওঁর। কল্পনায় দেখলেন, সেই সুন্দর মুখটা চোখের পলকে নীল হয়ে গেল।
মনে-মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। এখন পিছিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। তাই বৃদ্ধের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, কত?
বিশহাজার।
বিশহাজার? আলট্রানিউ পয়জনের দাম শুনে আঁতকে উঠলেন পীতাম্বর।
হ্যাঁ, স্যার–বিশহাজার। হাসলেন বৃদ্ধ ও দামটা বেশি মনে হলে আপনি বরং ছুরি দিয়ে কাজ সেরে নিন বিশটাকায় হয়ে যাবে। আর যদি ঘরোয়া কোনও ব্লান্ট ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করেন তা হলে পুরো বিনিপয়সায় হয়ে যাবে…। একটু কেশে নিয়ে আরও যোগ করলেন, আপনার যা সমস্যা তাতে বিশহাজার তো জলের দর!
