মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এরা আমাদের আশেপাশেই, আমাদের সঙ্গেই বাস করে। এরা যে কোনো সাধারণ স্বাভাবিক মানুষের মতোই দেখতে। আমাদেরই বাবা, ভাই, আমাদেরই মামা, কাকা, আমাদেরই বন্ধু, প্রতিবেশী। শিশু কিশোরীদের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করে, এমন মানুষের সংখ্যা সমাজে অনেক, তবে সবাই যে উদ্যোগ নেয় যৌন ক্রিয়া বা ধর্ষণ করতে তা নয়। অধিকাংশ পুরুষই চেষ্টা করে সমাজের কথা ভেবে নিজেদের সংযত করতে। তারা জানে তাদের কামনা বাসনা মানবতাবিরোধী। কিছু পুরুষ তো রীতিমত ডাক্তারের পরামর্শে নিজেদের অতিরিক্ত বা অবাধ যৌন-ইচ্ছে কমাতে ওষুধ সেবন করে। তারা টেস্টস্টেরন হরমোন শরীর থেকে কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। যারা নিজেদের সংযত না করে, তারা সুযোগ পেলে শিশু কিশোরীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, কিছু লোক আছে শিশুদের ধর্ষণ করে, শিশু ছাড়া তারা আর কারও প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করে না। আবার আরেক দল শিশু ধর্ষণ করে, কারণ শিশু ধর্ষণের সুযোগ পেয়ে যায় বলে, শুধু শিশু নয়, প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রতিও তাদের সমান যৌন আকর্ষণ। যারা শিশু ছাড়া আর কারও প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করে না, তারা, কিছু মনোবিজ্ঞানী বলেন, মানসিক রোগী। তাদের মস্তিষ্ক অন্যান্য মানুষের মস্তিষ্কের মতো নয়। আবার অন্য বিজ্ঞানীরা বলেন, শিশু ছাড়া আর কারও প্রতি যৌন আকর্ষণ না থাকা কোনো মানসিক সমস্যা নয়, এ নিতান্তই রুচির তফাত। এদের মধ্যে যারা সৎ, দায়িত্ববান, তারা নিজেদের যৌনাকাঙ্ক্ষা সংযত করে, আর যারা তা নয় তারা চরম দায়িত্বহীনতার কাজ করে, অন্যায় করে, তারা ধর্ষণ করে।
এখন যেহেতু মস্তিষ্কের ওপর কারো হাত নেই, যেহেতু তারা জন্মই নেয় শিশুকামী হয়ে, অথবা যে কোনো কারণেই হোক তারা শিশুকামী, আমরা তাদের উপদেশ দেব, শিশু ধর্ষণ বন্ধ করার সব রকম উদ্যোগ নিতে। শিশুদের আঘাত করার, নির্যাতন করার কোনো অধিকার তাদের নেই, শিশুদের ধর্ষণ করার কাজ যেন তারা কখনও না করে। তারা যদি একা সামলাতে না পারে তাদের সমস্যা, যেন শুভাকাঙ্ক্ষীদের জানিয়ে দেয় যে তারা শিশুকামী, এই কাম দূর করার জন্য সবার সহযোগিতা চায়।
অনেকের ইচ্ছে করে কিছু লোককে খুন করার। কিন্তু তারা খুন করে না। খুন করা ভাল নয় বলে করে না। তেমনি যাদের ইচ্ছে করে ধর্ষণ করতে, তারাও যদি ভেবে নিতো, ধর্ষণ করার ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু করব না, কারণ ধর্ষণ করা ভাল নয়।
আমরা তাদের দোষ দিতে পারি না, কেন তাদের ধর্ষণ করার ইচ্ছে হয়? মস্তিষ্ক বড় জটিল, সমাজের ভাল মন্দ বুঝে এ গড়ে ওঠে না, আমরা একে ভাল মন্দের শিক্ষা দিয়ে বড় করি।
২. যে সব দেশে ধর্ষণ সবচেয়ে কম, সেসব দেশে পুরুষাঙ্গ কর্তন বা মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি নেই। তবে সেসব দেশে মেয়েদের মর্যাদা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। মেয়েদের স্বাধীনতা এবং অধিকার সেসব দেশে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি, সেসব দেশে মেয়েরা শিক্ষিত, মেয়েরা স্বনির্ভর, সংরক্ষিত আসনের সুযোগ ছাড়াই সংসদ সদস্যের পঞ্চাশ ভাগই মেয়ে।
নাবালিকা-সাবালিকা সব ধর্ষণই বহাল তবিয়তে চলে সেসব দেশে, যেসব দেশের বেশির ভাগ পুরুষ মেয়েদের ভোগের বস্তু, দাসী-বাঁদি, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র, বুদ্ধিশুদ্ধিহীন প্রাণী, নিচুজাতের জীব ইত্যাদি হিসেবে বিচার করে; যেসব দেশে পতিতালয় গিজগিজ করছে, শত শত বাচ্চা-মেয়েকে যৌনপাচারের শিকার করা হচ্ছে; যৌন হেনস্থা, ধর্ষণ, স্বামীর অত্যাচার, পণের অত্যাচার, পণ অনাদায়ে খুন— এই দুর্ঘটনাগুলো প্রতিদিন ঘটছে, ঘটেই চলছে।
ধর্ষণের সঙ্গে যৌন সঙ্গমের সম্পর্ক আছে। কিন্তু ধর্ষণ মানেই যৌন সঙ্গম নয়। অধিকাংশ ধর্ষক যৌন-ক্ষুধা মেটানোর জন্য ধর্ষণ করে না। প্রায় সব ধর্ষকেরই স্থায়ী যৌনসঙ্গী আছে। ধর্ষণ নিতান্তই পেশির জোর, পুরুষের জোর। মোদ্দা কথা, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের পরম পূজনীয় পুরুষাঙ্গের ন্যাড়া মাথায় মুকুট পরানো বা বিজয় নিশান ওড়ানোর আরেক নাম ধর্ষণ।
ধর্ষণ বন্ধ হবে কবে অথবা কী করলে ধর্ষণ বন্ধ হবে? এই প্রশ্নটির সবচেয়ে ভালো উত্তর, ‘যেদিন পুরুষ ধর্ষণ করা বন্ধ করবে, সেদিনই বন্ধ হবে ধর্ষণ’। কবে কখন বন্ধ করবে, সে সম্পূর্ণই পুরুষের ব্যাপার। সম্মিলতভাবে সিদ্ধান্ত নিক যে এই দিন থেকে বা এই সপ্তাহ থেকে বা এই মাস থেকে বা এই বছর থেকে নিজের প্রজাতির ওপর ভয়াবহ বীভৎস এইসব নির্যাতন তারা আর করবে না।
৩. পূজা হিন্দু পরিবারের মেয়ে। পূজার জীবনে যা ঘটলো, তা দেখে আমার আশঙ্কা হচ্ছে, অনেক হিন্দু পরিবার তাদের কন্যার নিরাপত্তার কথা ভেবে দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেবে।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৭ অক্টোবর, ২০১৬
» আমরা আর তারা
আমরা সবাই দেখেছি বদরুল কী করে কুপিয়েছে খাদিজাকে। যখন কোপাচ্ছিল, বদরুলের মনে হয়নি সে কোনো অন্যায় করছে। বদরুল কি মানসিক রোগী? না, বদরুল কোনো মানসিক রোগী নয়। বদরুল সুস্থ মস্তিষ্কেই কোপানোর কাজটি করেছে। সুস্থ মস্তিষ্কে সে চাপাতি কিনেছে, সুস্থ মস্তিষ্কে সে ভেবেছে ওই চাপাতি দিয়ে সে কুপিয়ে মারবে খাদিজাকে, কারণ খাদিজা তার আদেশ এবং উপদেশ কোনোটিই মেনে নিচ্ছে না। কোপানোর দৃশ্যটি দেখতে ভয়ঙ্কর হলেও ওটিই সমাজের চিত্র। সমাজের সত্যিকার চিত্রটি ভয়ঙ্কর। এভাবেই পুরুষ নারীকে কোপায়, পেটায়, লাথি মারে, চাবুক মারে, জুতো মারে, প্যান্টের বেল্ট খুলে মারে, উঠোনে ফেলে হাতের কাছে বাঁশ ডাল লোহা লাকড়ি যা পায় তা দিয়েই মারে, পাথর ছুড়ে মারে, অ্যাসিড ছুড়ে মারে। এভাবেই পুরুষ নারীকে আগুনে পুড়িয়ে মারে, কড়িকাঠে ঝুলিয়ে মারে, জলে ফেলে দিয়ে মারে, সাততলা থেকে ধাক্কা দিয়ে মারে। খাদিজা ‘লাইফ সাপোর্টে’ আছে, আমরা নারীরাও পুরুষের এই সমাজে ‘লাইফ সাপোর্টে’ আছি। আমরা মৃত। কারণ পুরুষেরা আমাদের মৃত দেখতে ভালোবাসে। আমরা আমাদের ইচ্ছেমতো নড়লে চড়লে, আমাদের খুশিমতো বাঁচলে পুরুষেরা আমাদের হত্যা করে, তাই আমাদের ইচ্ছেগুলোর ডানা কেটে দিয়ে আমরা মৃত হয়ে থাকি, পুরুষেরা আমাদের ‘লাইফ সাপোর্ট’ দিয়ে রাখে, ‘লাইফ সাপোর্ট’, তারাও জানে এবং আমরাও জানি, যে কোনো সময় বন্ধ করে দিতে পারে তারা। পুরুষেরা যদি আমাদের মেরে ফেলতে চায়, মেরে ফেলতে পারে। তারা যদি আমাদের হেনস্থা করতে চায়, অপদস্থ করতে চায়, করতে পারে। তারা চাইছে বলেই করছে। আজো তারা প্রতিদিন আমাদের হত্যা করছে, হেনস্থা করছে, অপদস্থ করছে। পুরুষেরা তাদের প্রয়োজনে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আমরা আমাদের প্রয়োজনে বেঁচে থাকতে পারি না। পুরুষের এই পৃথিবীতে সে অধিকার আমাদের নেই।
