আছে দুঃখ আছে মৃত্যু

এক এক করে সবাই চলে যাচ্ছে। জানি এভাবে সবাই যাবে, আমিও। তারপরও কারও মৃত্যু আমি মেনে নিতে পারি না। খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুরছি, কিন্তু যে মানুষটা নেই, কিছুদিন আগেই ছিল, তাকে মনে করতে করতে উদাস হয়ে যাই। ডানে যাবো, বাঁয়ে যাই। চা তো ঠাণ্ডা হয়ই, বইয়ের যে প্যারাগ্রাফে চোখ, সেই প্যারাগ্রাফেই সারাদিন চোখ পড়ে থাকে, মন অন্য কোথাও, মন মানুষটার থাকায়, না-থাকায় নয়। মৃত্যু জিনিসটাকে যদি কিছু দিয়ে মুছে ফেলা যেত। আমার মতো এমন আগাগোড়া বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের এত আবেগ থাকবে কেন, এমন প্রশ্ন অনেক শুনেছি। তারপরও আমি আমিই থেকে যাই। ধর্মে যাদের বিশ্বাস আছে, তারা কষ্ট পায় কম, তারা তো ভেবেই নেয়, মৃত্যুই শেষ কথা নয়, মানুষ আবার জেগে উঠবে, মানুষকে দাঁড়িপাল্লায় বিচার করবে কোনও এক সর্বশক্তিমান, তারপর মানুষ আর মরবে না। অথবা মৃত্যুর পর আবার এই পৃথিবীতে ফিরে ফিরে আসবে মানুষ, মানুষ নয়তো পশু পাখির রূপ ধরে। এসব বিশ্বাস থাকলে দুঃখ ঢুঃখ পাওয়ার ব্যাপারটা কমই থাকে। আমার কষ্ট হয়, কারণ আমি জানি, যে গেছে সে একেবারেই গেছে, সে আর জাগবে না কোনও দিন, তার সঙ্গে আর কোনওদিন কারও দেখা হবে না।

মা চলে গেল। এরপর বাবা। মাঝেমাঝে বিশ্বাস হতে চায় না যে সত্যিই বাবা মা নেই। মামা খালারা যারা ভালোবাসতো, তারাও নেই। দেশে যদি কোনওদিন ফিরতে পারি, দেখবো দেশটা ফাঁকা। আগে যারা শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, তাদের বেশির ভাগই আর নেই। শামসুর রাহমান, কে এম সোবহান, কবীর চৌধুরী, আহমেদ শরীফ, ওয়াহিদুল হক, কলিম শরাফী, কেউ নেই। কলকাতায় পাশে ছিলেন অন্নদাশংকর রায়, নিখিল সরকার, শিবনারায়ণ রায়, অম্লান দত্ত, সবাই চোখের সামনে চলে গেলেন। কলকাতাও অনেকটা ফাঁকা। খুব স্নেহ করতেন মদনজিৎ সিং, মারা গেছেন। দিন কয়েক হলো। দিন দিন জগতটা ফাঁকা হচ্ছে। দুটো ভাই, দিব্যি বেঁচে আছে, এর মধ্যেই একজনকে ধরেছে কর্কট রোগ, আরেকজনকে হৃদপিণ্ডের রোগ। কেউ জানে না হঠাৎ কী অসুখ কাকে থাবা দেবে। কাকে ধাক্কা দিয়ে কোন অতলে ফেলবে। আমিও ভাইদের মতো বাবা মার অসুখগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। অসুখই পেয়েছি, আরাম আয়েশ, ধন দৌলত দুভাই নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। নি বাসন জীবনে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছি, ঝড়ে ঝঞ্চল্লায় দুর্যোগে দুঃসময়েও লেখাটা ছাড়িনি, এখনও লিখছি, যেমন লিখতাম, সেসব লেখাই যেসব লেখার জন্য ফতোয়া, নির্বাসন, হরতাল, আর লক্ষ লোকের মিছিল হয়। লিখতে লিখতেই হঠাৎ কোনও কঠিন অসুখ হবে, বুকে ভীষণ ব্যথা হবে, চুপচাপ মরে যাবো। একা একাই মরতে হবে। তাতে কী! মানুষ কি আর কাউকে সঙ্গে নিয়ে মরে! পাশে হয়তো থাকে লোক। মৃত্যুটাকে, মৃত্যুর যন্ত্রণাটাকে কেউ তো আর ভাগ করে নেয় না। মৃত্যু নিয়ে আমার কোনও স্বপ্ন টপ্ন নেই। অনেকের থাকে। আত্মায় বিশ্বাস করলেই ওসব থাকে। আমার ওই ঝামেলা নেই।

জগতটা ফাঁকা হলেই যে বেঁচে থাকার ইচ্ছে উবে যায়, তা নয়। যারা জানে জীবন একটাই, এবং জীবন একবারই, তারা কেবল পেছনে তাকিয়েই জীবন যাপন। করে না, সামনেও তাকায়। আমি সামনে তাকাই, তাই বলে কি পেছনে তাকাবো না, মাকে মনে করবো না, বাবার জন্য দুফোঁটা চোখের জল ফেলবো না, শিবনারায়ণ রায়ের স্নেহ আর ভালোবাসার কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলবো না, তা কি হয়? বিজ্ঞানে আর বিবর্তনে বিশ্বাস করলে মানুষ খুব নিষ্ঠুর হয়, ধর্মবাদীরা এমন কুৎসা সবসময়ই রটায়। আসলে জীবনে আমি উল্টোটাই দেখেছি। খুন করছে, শিশু-ধর্ষণ করছে, চুরি ডাকাতি করছে, মিথ্যে কথা বলছে, মানুষকে ঠকাচ্ছে- এমন ভয়ংকর বর্বর মানুষ গুলোর বিশ্বাস ধর্মে আর ঈশ্বরে অগাধ। আর যে ধার্মিকগুলো ভালো, তারা যদি কো নওদিন জেনে যেতে পারে যে ঈশ্বর বলে কিছু নেই, তাহলে সর্বনাশ। তাদের বেশির ভাগই খুন খারাবী, লুটতরাজ, অন্যায় অত্যাচার করে পৃথিবীকে আস্ত একটা নরক বানিয়ে ছাড়বে। ঈশ্বরের শাস্তির ভয়ে যারা ভালো মানুষ, তারা সত্যিকার ভালো মানুষ নয়। সত্যিকার ভালো মানুষ তারা, যারা ঈশ্বর নেই জেনেও খারাপ কাজ করে না। শত সহস্র কোটি গ্রহ নক্ষত্রের এই মহাবিশ্বে একটি ছোট্ট গ্রহে মানুষ নামক প্রজাতি অন্য প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়েছে। আরও লক্ষ প্রজাতির মতো আমরাও হয়তো একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবো। মহাবিশ্বের অযুত-নিযুত-কোটি বছরের ইতিহাসে মানবপ্রজাতির বিবর্তন এবং বিলুপ্তি সবই হয়তো এক পলকের ঘটনা। আমাদের বিলুপ্তিতে কিছু কি যায় আসে এই ব্রহ্মাণ্ডের? এ যেমন চলছে তেমন চলবে। গ্যাস ফুরিয়ে গেলে একদিন আমাদের সূর্যটাও চুপসে যাবে, আশে পাশে যা কিছু আছে, পৃথিবীসুদ্ধ সব কিছুকে শুষে নিয়ে, তবে। অত কোটি বছর অবধি কি আমাদের প্রজাতি বেঁচে থাকবে। হয়তো আরও নষ্টের দিকে যাবে, নয়তো অবিশ্বাস্য কোনও ভালোর দিকে। কে জানে আমাদের কোনও জল্পনা কল্পনার ধারে কাছেই হয়তো যাবে না, মানুষই একদিন পারমাণবিক বোমায় ধ্বংস করে দেবে পৃথিবীর সবকিছু। নয়তো কোনও একদিন মহাশূন্য থেকে কোনও একটা পাথর ছিটকে পড়ে ডায়নোসোরের জাতকে যেমন নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে, তেমন আমাদেরও করবে। এত কিছু জেনেও কিন্তু এই অনিশ্চিত অকিঞ্চিৎকর অর্থহীন জীবনকে ভালোবাসি, একে অর্থপূর্ণ করার চেষ্টা করি। মানুষ সুখে শান্তিতে স্বস্তিতে বাস করুক তার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে কিছু মানুষ। অধিকাংশই নিজেকে ছাড়া কিছু ভাবে না, তারা আরামে এই জীবনটা কাটিয়ে ঈশ্বরকে উৎকোচ দিয়ে পরকালেও আরামে কাটানোর ব্যবস্থা করে নেয়। অন্যে কী খাবে, অন্যে কী পরবে, তা তাদের ভাবার বিষয় বলে তারা মনে করে না। অন্যের সমস্যা অন্যে ঘোচাবে। ধৰ্মৰ্বাদীরা যে দুঃস্থ দরিদ্রদের একেবারে সাহায্য করে না, তা নয়। করে, তবে স্বার্থের কারণে করে। ঈশ্বরের কাছ থেকে বিনিময়ে কিছু জুটবে বলেই করে। নিঃস্বার্থ আর কজন। অল্প কিছু মানুষই শুধু ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়। চিরকালই। ও না হলে কি আর সমাজটা পাল্টাতো যতটুকুই পাল্টেছে বা যতটুকুই ভালো হয়েছে।

কুড়ি কুড়ি বছর উড়ে যাচ্ছে এক তুড়িতে। জীবনের সময় বড় অল্প। ধর্মের রূপকথায় বিশ্বাস করি না বলে সময় আমার অহেতুক পুজোয় বা প্রার্থনায় নষ্ট হয়না। যতটুকু সময় আছে জীবনে, তা পুরোটাই চাই নিজের জন্য। নিজের যা ভালো লাগে, নিজের যা ইচ্ছে করে, তা করবো। সবাই যদি পারতো এমন! কী করতে নিজের ভালো লাগে, তা টের পেতে পেতেই অনেকের জীবন ফুরিয়ে যায়। কারও কারও ইচ্ছেগুলো ধার করা, নিজের নয়। কত কত মানুষের মুখের হাসিটা নকল, কথাগুলো নকল, কাপড়চোপড় নকল! অনেক সময় মনে হয় চারদিকের মানুষগুলো ঠিক মানুষ নয়, প্রাণহীন রোবট। এসবের মধ্যে থেকেও প্রতিদিন ভালোবাসছি। প্রতিদিন স্বপ্ন দেখছি সমতার, সতোর। স্বপ্ন দেখছি সুন্দর পৃথিবীর। যারা আমার মতো ভাবছে- তারা কে বলেছে সংখ্যায় খুব কম! পৃথিবীর সবখানে তারা ছড়িয়ে আছে। কেউ ভেড়া নই বলে মাথা গোণার উপায় নেই। না, আমরা কেউই একা নই। মাঝেমাঝে যে একা বলে নিজেকে ভাবি, ভুল ভাবি। বাড়িভর্তি লোক থাকলেই যেমন মানুষের একাকীত্ব ঘোচে না, এক বাড়িতে জীবনভর একা থাকলেও এ আসলে একা থাকা নয়।

আটপৌরে কবিতা

আমার বেশ কিছুদিনের চেনা এক কবি এর মধ্যে বেশ কিছু কবিতা পড়ে ফেলেছেন আমার। ব্লগেই পড়েছেন। বললেন, আমার কবিতা খুব আটপৌরে। আটপৌরে বলতে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন জানি না। কী? খুব পাশের বাড়ি পাশের বাড়ি, চিনি চিনি ধরনের? খুব ঘরের কিছু, মাছ ভাত, হলুদ নুনএর মতো? পানের বাটা, চালকুমড়ো, দিদিমা দিদিমা, মামা? নাকি মেঝের আল্পনা, মুড়ি ভাজা, দুপুরবেলার উল্টোরথ, দিদিদের শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়া? কবি আমাকে ঠিক বলেন নি কী। তবে আটপৌরে শব্দটা উচ্চারণ করতেই মার। পরণের সেই আটপৌরে ধনেখালি শাড়িটা যেন উড়ে এসে আচমকা আমার শরীর, আমার মুখ চোখ ঢেকে দিল। আমি শুধু চোখ বুজে ঘ্রাণ নিলাম আমার মার শরীরের। একটাই ফুল জুই ফুল ঘ্রাণ ছিল মার শরীরে! কত হাজার বছর মাকে দেখিনা।

মা মারা যাওয়ার পর বেশ কয়েক বছর আমি ঘুমের মধ্যে একটা স্বপ্ন দেখতাম। ওই একটা স্বপ্নই আমি প্রতিরাতে দেখতাম। স্বপ্নটা এমন: মা বাড়িতে আছে, হাঁটছে, হাসছে, কথা বলছে। ঠিক আগের মতো সবকিছু। মাকে আমরা সবাই খুব আদর যত্ন করছি, খুব ভালোবাসছি, মাও বাড়ির সবার খোঁজ খবর নিচ্ছে, সবাই খাচ্ছে কিনা, ঘুমোচ্ছে কিনা, বাড়ি ফিরছে কিনা দেখছে। মার শরীরে অসুখ। কিন্তু অসুখটা নিয়েই মা বেঁচে আছে। মা মারা যাবে এরকম ভাবছে অনেকে, কিন্তু মা আসলে মারা যাচ্ছে না। অথবা মারা গিয়েছিলো, কিন্তু কী করে যেন মৃত্যুকে ঠেলে সরিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। এই স্বপ্নের নরম পালক কে যেন আমার চোখে মুখে আলতো ছুঁইয়ে ঘুম ভাঙাতো। ঘুম ভাঙার অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমার মনে হতো যে স্বপ্নটা বুঝি সত্যি। অনেকক্ষণ, সম্ভবত কয়েক সেকেণ্ড। স্বপ্নের জন্য, ঘোরের জন্য, পরাবাস্তবতার জন্য কয়েক সেকেণ্ডই অনেকক্ষণ। কয়েক সেকেণ্ড পার হলে বুঝে যেতাম, ও স্বপ্ন, মা বেঁচে নেই। খুব কষ্ট হতো। স্বপ্নটা সত্যি হোক, কী যে ভীষণ চাইতাম। মার নামরে যাওয়াটা যদি সত্যি সত্যিই সত্যি হতো। স্বপ্নটাকে সত্যি করে ফেলা আর সত্যিটাকে স্বপ্ন করে ফেলার ইচ্ছেটা আমার ভেতরে চিরকাল বোধহয় রয়েই যাবে। আমি ঠিক জানিনা কেন আজকাল এই স্বপ্নটা আমি আর  দেখি না। কেন আমি ওই একই স্বপ্ন প্রতিরাতে দেখতাম, সেও জানি না। মাকে, ঠিকই যে, আজকাল আগের চেয়ে কম মনে পড়ে। মাকে নিয়ে নেই কিছু নেই বইটা লিখে ফেলার পর, আমি লক্ষ্য করেছি, ভেতরে ভেতরে দায়িত্ব পালন করার পর যেমন এক প্রশান্তি জোটে, তেমন জুটেছে। বেদনার তীব্রতা কমে এসেছে ধীরে ধীরে। বইটা লেখার সময় চোখের জল অনেক ঝরেছে। একহাতে জল মুছেছি, আরেক হাতে লিখেছি। লিখলে, আমার বিশ্বাস, দুঃখ কষ্ট অনেক কমে। সে কারণেই বোধহয় ওই স্বপ্নটা আমি আর দেখি খুব ইচ্ছে করে স্বপ্নটা আবার দেখি। আবার দেখি মা বাড়িতে আছে, হাঁটছে, হাসছে, কথা বলছে। ঠিক আগের মতো সবকিছু। লেখকরা কি খুব স্বার্থপর? আমি তো কবিতা লিখেও অনেক বিরহের যন্ত্রণাকে কমিয়ে ফেলেছি। কমিয়েছি নারীবাদী লেখা লিখে বৈষ ম্যের বিরুদ্ধে জমে থাকা দীর্ঘ বছরের রাগকে, ক্ষোভকে।

আমি আটপৌরে জীবনই চাই, আমার কবিতাও আমার জীবনের মতো। একরকম জীবন যাপন করবো, আর আরেক রকম কবিতা লিখবো, তা আমার দ্বারা হবে না। যে ভাষায় কথা বলি, সেই ভাষাটাকে, সেই ভাষার শব্দ আর অক্ষরকেই তো রোপন করবো কবিতার মাটিতে। জীবনই তো জন্ম নেবে ছত্রে ছন্দে। জীবনকেই তো তুলে নেবো শব্দ থেকে। তুলে নিয়ে শহর বন্দর গ্রাম খালি পায়ে দৌড়ে বেড়াবো। যে জীবনটাকে চিনিনা, যে শব্দ আমি প্রতিদিন ব্যবহার করি না, প্রতিদিন শুনি না, যে বাক্য আমি নির্মাণ করি না, যে বাক্য আমি আমার চারপাশের কাউকে নির্মাণ করতে শুনি না, সেই শব্দ বাক্য আমি কবিতায় জড়ো করি না। যে ভাষায় আমি মনে মনে নিজের সঙ্গে কথা বলি না, সে ভাষায় আমি কবিতা লিখি না। লিখলে সেই কবিতাকে, আমি খুব ভালো করে জানি, আমার নিজের কবিতা বলে মনে হবে না। লিখলে সেই কবিতা মিথ্যে কবিতা হবে। মিথ্যের সঙ্গে আমার ওঠা বসা নেই। লেনদেন নেই। কোনও মিথ্যেকে আমি আমার বলে মনে করি না। আমি লেখায় কায়দা খাটাই না, যা-ই লিখি, যা কিছুই লিখি, হৃদয় দিয়ে লিখি। কী লিখলে অত্যাধুনিক কবিতা হবে, কী ঢংএ লিখলে ক্রিটিকদের প্রশংসা পাওয়া যাবে, কী ধরনের ছন্দ হলে নতুন কবিতার ধারাতৈরি হবে, এসব আমার ভাবনার বিষয় নয়। পাঠক আমার লেখা বুঝবে কি না, আমার লেখাকে ভালো বলবে কি না, সে নিয়েও আমি ভাবি না। পাঠককে সুখ আনন্দ জোগাতে আমি কখনও কোনও লেখা লিখিনি। কিছু কথা আমার ভেতর-ঘরে বসে হাঁসফাঁস করে, আমি তাই জানালা দরজাগুলো খুলে দিই। এটুকুই। যা কিছুই লিখি, লিখি আমার মায়ের ভাষায়, যে ভাষা মা আমাকে শিখিয়েছিল সে ভাষায়, হৃদয়ের ভাষায়। ধার করে লিখি না। অনুকরণ করি না। কবিতাকে জাদুঘরে নিয়ে যাই না, কবিতাকে পড়ে থাকতে দিই কলমিলতায় ছেয়ে থাকা পুকুরপাড়ে।

দীর্ঘ নির্বাসনের শেকল ছিঁড়ে যখন কলকাতায় এসে থাকতে শুরু করেছিলাম, দু পুরবেলায় বারান্দার রোদে কাপড় শুকোতো আর হাওয়ায় ভাসতো রান্নার সুগন্ধ, হলুদ মরিচের, ধনে জিরের সুগন্ধ। ঠিক ওই ছবিটিকে আমি স্থির করে রাখতাম মনে, ওই ছবিটিই আমাকে আমার শৈশব দিত, কৈশোর দিত। বিদেশের আধুনিক জীবন যাত্রা তুচ্ছ করে ওই ছবিটির জন্য আমি বাঙালির আটপৌরে জীবনের কাছে ফিরেছিলাম। মার আটপৌরে শাড়ির আঁচলখানির কাছে। আঁচল ছিঁড়ে ফেলেছে লোকেরা।

কিন্তু আমার আটপৌরে কবিতাকে আমি বাঁচিয়ে রেখেছি। ওগুলো ছিঁড়ে টুকরো করতে এখনও পারেনি কেউ। আমার কবিতা থেকে সোঁদামাটির যে ঘ্রাণ আসতো, সে ঘ্রাণ এখনও আসে। সবচেয়ে যে ঘ্রাণটা বেশি আসে, সে আমার মার শরীরের সুঁই ফুল জুই ফুল ঘ্রাণটা। আর কেউ পায় কি না জানি নি, ঘ্রাণটা আমি পাই। ওই ঘ্রাণটা যতক্ষণ না পাই, ততক্ষশ বুঝি যে আমার কবিতা কবিতা হয়ে ওঠে নি।

আমেরিকা

আমেরিকার বঙ্গ সম্মেলনে একবারই আমি গিয়েছিলাম, এটিই প্রথম, সম্ভবত ওটিই শেষ। প্রদীপ মুখার্জি অথবা প্রদীপ ঘোষ টোষ বলে সে বছর, দুহাজার পাঁচে, একজন কর্ণধার ছিলেন বঙ্গ সম্মেলনের, তিনি আমাকে কয়েক মাস ধরে আক্ষরিক অর্থেই হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করেছিলেন বঙ্গ সম্মেলনে যাওয়ার জন্য। ইওরোপ আমে রিকায় বাঙালির কোনও অনুষ্ঠানে আগে যাইনি। সকলেই পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালি বলে একটু স্বস্তি ছিল। বাংলাদেশের বাঙালি হলে কোনও প্রশ্নই ছিল না আমার অংশ গ্রহণের।

নিউইয়র্ক শহরের মেডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠান হয়েছিল। দর্শকের সারিতে ছিল পনেরো হাজার বাঙালি, প্রায় সবাই পশ্চিমবঙ্গের। দেশের গান বাজনা শুনতে এসেছে, দেশি নাচ দেখতে এসেছে। সেখানে পড়লাম কিনা কবিতা, তাও আবার আমেরিকার বিদেশ নীতির সমালোচনার করে। এক দল চিৎকার করে উঠলো, তারা আমেরিকার সমালোচনা শুনতে চায় না, আমেরিকা তাদের খাওয়ায় পরায়, আমেরিকা ইরাকে আফগানিস্তানে যা করছে, ঊচিত কাজ করছে, মুসলমানদের মেরে শেষ করে দেওয়াই উচিত। ব্যস। কবিতাটি শেষ না হতেই আমাকে মঞ্চ থেকে নেমে পড়তে বাধ্য করা হল, পুরো মেডিসন স্কোয়ার গার্ডেন এরিয়া থেকে যে আমাকে দূর দূর করে তাড়ালো, সে ওই প্রদীপ লোকটি। এফবিআই আসছে, আমেরিকাবিরোধী কবিতা পড়েছি বলে অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারদের গ্রেফতার করবে, আমার কারণে বঙ্গ সম্মেলনটাই নষ্ট হয়ে গেল –এসব বলছিল আর আমার ওপর রেগে আগুন হচ্ছিল লোকটি। না, এই কবিতাটি আমেরিকাবিরোধী কবিতা নয়। এটি আমেরিকার সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষের পক্ষে লেখা কবিতা, মানবতার পক্ষের কবিতা।

আমেরিকা

কবে তোমার লজ্জা হবে আমেরিকা?
কবে তোমার চেতন হবে আমেরিকা?
কবে তোমার সন্ত্রাস বন্ধ করবে তুমি আমেরিকা?
কবে তুমি পৃথিবীর মানুষকে বাঁচতে দেবে আমেরিকা?
কবে তুমি মানুষকে মানুষ বলে মনে করবে আমেরিকা?
কবে এই পৃথিবীটাকে টিকে থাকতে দেবে আমেরিকা?
শক্তিমান আমেরিকা, তোমার বোমায় আজ নিহত মানুষ,
তোমার বোমায় আজ ধ্বংস নগরী,
তোমার বোমায় আজ চূর্ণ সভ্যতা,
তোমার বোমায় আজ নষ্ট সম্ভাবনা,
তোমার বোমায় আজ বিলুপ্ত স্বপ্ন।

কবে তোমার হত্যাযজ্ঞের দিকে, কুৎসিত মনের দিকে,
কলঙ্কের দিকে তাকাবে আমেরিকা,
কবে তুমি অনুতপ্ত হবে আমেরিকা?
কবে তুমি সত্য বলবে, আমেরিকা?
কবে তুমি মানুষ হবে আমেরিকা?
কবে তুমি কাঁদবে আমেরিকা?
কবে তুমি ক্ষমা চাইবে আমেরিকা?

আমরা তোমার দিকে ঘৃণা ছুঁড়ে দিচ্ছি আমেরিকা, আমরা ঘৃণা ছুঁড়তে থাকবো ততদিন, যতদিন না তোমার মারণাস্ত্র ধ্বংস করে তুমি হাঁটু গেড়ে বসো, ঘৃণা ছুঁড়তেই থাকবো যতদিন না তুমি প্রায়শ্চিত্ত করো, আমরা ঘৃণা ছুড়বো, আমাদের। সন্তান ছুড়বে, সন্তানের সন্তান ছুড়বে, এই ঘৃণা থেকে তুমি পরিত্রাণ পাবে না আমেরিকা।

তোমার কত সহস্র আদিবাসীকে তুমি খুন করেছো,
কত খুন করেছো এল সালভাদরে,
খুন করেছো নিকারাগুয়ায়,
করেছো চিলিতে, কিউবায়,
করেছো পানামায়, ইন্দোনেশিয়ায়, কোরিয়ায়,
খুন করেছে ফিলিপিনে, করছো ইরানে, ইরাকে, লিবিয়ায়, মিশরে, প্যালেস্তাইনে,
ভিয়েতনামে, সুদানে, আফগানিস্তানে
–মৃত্যুগুলো হিসেব করো,
আমেরিকা তুমি হিসেব করো,
নিজেকে ঘৃণা করো তুমি আমেরিকা।
নিজেকে তুমি, এখনও সময় আছে, ঘৃণা করো।
এখনও তুমি তোমার মুখখানা লুকোও দুহাতে,
এখনও তুমি পালাও কোনও ঝাঁড়-জঙ্গলে,
তুমি গ্লানিতে কুঁকড়ে থাকো,
কুঁচকে থাকো, তুমি আত্মহত্যা করো।

থামো,
একটু দাঁড়াও,
আমেরিকা, তুমি গণতন্ত্র, তুমি তো স্বাধীনতা।
তুমি তো জেফারসনের আমেরিকা,
লিংকনের আমেরিকা,
তুমি মার্টিন লুথার কিংএর আমেরিকা,
তুমি রুখে ওঠো,
রুখে ওঠো একবার, শেষবার, মানবতার জন্য।

এ লড়াই প্রাচ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের নয়

পশ্চিমের নারীবাদ কেন, প্রাচ্যের নারীবাদ সম্পর্কেও আমার কোনও ধারণা ছিল না। ওসব না জেনেও শিশু বয়স থেকেই পরিবারের এবং সমাজের অনেক আদেশ উপদেশ, অনেক বাধা নিষেধকে আমি প্রশ্ন করেছি। আমাকে যখন বাইরের মাঠে খেলতে দেওয়া হত না, কিন্তু আমার ভাইদের দেওয়া হত, ঋতুস্রাবের সময় আমাকে যখন অপবিত্র বলা হত, আমাকে যখন বলা হত আমি এখন বড় হয়েছি, যেন কালো বোরখায় আপাদমস্তক ঢেকে বাইরে বেরোই, আমি প্রশ্ন করেছি, আমি মানিনি। রাস্তায় হাঁটলে আমাকে যখন গালি ছুঁড়ে দিত অচেনা ছেলেরা, যখন ওড়না কেড়ে নিত, স্তন টিপে ধরতো, প্রতিবাদ করেছি। ঘরে ঘরে যখন দেখেছি স্বামীরা বউ পেটাচ্ছে, কন্যাশিশু জন্ম দিয়ে মেয়েরা আশঙ্কায় কাঁদছে, আমি সইতে পারিনি। ধর্ষিতা মেয়েদের লজ্জিত মুখ দেখে বেদনায় নীল হয়েছি। পতিতা বানানোর জন্য এক শহর থেকে আরেক শহরে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে মেয়েদের পাচার করার খবর শুনে কেঁদেছি। শুধু দুটো ভাত জোটাতে পতিতাপল্লীতে মেয়েরা চরম যৌন নির্যাতন সইতে বাধ্য হচ্ছে, পুরুষেরা চার চারটে মেয়েকে বিয়ে করে ঘরের দাসী বানাচ্ছে, উত্তরাধিকার থেকে শুধু মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলে বঞ্চিত হচ্ছে, পারিনি মেনে নিতে। যখন দেখতাম ঘর থেকে দু পা বেরোলে মেয়েদের একঘরে কার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, পরপুরুষকে ভালোবাসার অপরাধে তাদের পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, উঠোনে গর্ত করে সেই গর্তে ঢুকিয়ে মেয়েদের পাথর ছুঁড়ে মারা হচ্ছে, আমি চিৎকার করতাম। কোনও যুক্তি দিয়ে কোনও বুদ্ধি দিয়ে মেয়েদের ওপর পুরুষের, পরিবারের, সমাজের, রাষ্ট্রের ওসব অত্যাচার মেনে নিতে পারিনি। আমার সেই বেদনা, সেই কান্না, সেই অস্বীকার, সেই মেনে-না-নেওয়া, সেই বাকরুদ্ধ হওয়া, সেই না-সওয়া, সেই যুক্তি তর্ক, সেই চিৎকার কেউ দেখেনি। দেখলো, যখন থেকে লিখতে শুরু করলাম।

আমি যে সমাজে বড় হয়েছি, সেই সমাজে অনেকের মনেই প্রশ্নের উদয় হত। তারা মেনে নিতে বাধ্য হত পুরুষতন্ত্রের কর্তাদের উত্তর। আমি বাধ্য হইনি। আমাকে কেউ অবাধ্য হতে শেখায়নি। কোনও বই পড়ে আমি অবাধ্য হওয়ার শিক্ষা অর্জন করিনি। সচেতন হওয়ার জন্য বড় বড় বই পড়তে হয় না। দেখার চোখ থাকলেই অনেক কিছু দেখা যায়। বুকের পাটাটাও কেউ গড়ে দিয়ে যায় না। গ্রামের মেয়েরা যখন জোতদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, জমি কেড়ে নিতে চাইলে দেব না বলে রুখে দাঁড়ায়, সেই মেয়েরা কোনও কার্ল মাকর্স বা লেনিনের বই পড়ে ওই প্রতিবাদটা শেখে না। জীবনই তাকে জীবনের প্রয়োজনে বলে দেয় কী করতে হবে বা হবে না।বুদ্ধির মুক্তি কারওর হয়, কারওর হয় না। বড় বড় দর্শনের বই পড়েও মানুষ অশিক্ষিত থেকে যায়, কোনও বই না পড়েও অনেকের বোধবুদ্ধি জন্ম নেয়। নারীর অধিকারের দাবি করতে গেলে বেটি ফ্রিডান বা রবিন মরগ্যান পড়তে হয় না। নিজের চেতনই যথেষ্ট।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজের অধিকারের বিষয়ে যাঁদের সচেতনতা এসেছে, তাঁদের একের সঙ্গে অপরের জানাশোনা হওয়ার কোনও দরকার হয়নি। মুক্তবুদ্ধির মানুষের চিন্তাধারা এবং ভাষার মধ্যে মিল থাকেই। পুবের নারীরা যখনই বন্ধ ঘরের কপাট খুলে বেরিয়ে আসতে চেয়েছে তখনই পুবের পুরুষবাদীরা তাদের দোষ দিয়েছে যে তারা পাশ্চাত্যের নারীবাদীদের অনুকরণ করছে। আমার ক্ষিধে পেলে আমি খাবো, আমাকে চাবুক মারলে আমি চাবুক কেড়ে নেবো, আমাকে পিষতে চাইলে আমি উঠে দাঁড়াবো– এটা চিরকালীন। নারীবাদ পাশ্চাত্যের সম্পত্তি নয়। নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, অত্যাচারিত, অসম্মানিত, অবহেলিত নারীদের একজোট হয়ে নারীর অধিকারের জন্য জীবন বাজি রেখে কঠিন সংগ্রাম করার নাম নারীবাদ।

পশ্চিমের মেয়েদের জীবন জানতে গিয়ে দেখেছি ওরাও কম দুর্ভোগ পোহায়নি। অত্যাচারিত হতে হতে, রক্তাক্ত হতে হতে ওদেরও দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে। একসময় চিৎকার করেছে। পুরুষতান্ত্রিকতা, ধর্ম, নারী-বিরোধী সংস্কার ইত্যাদির শিকার হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ভূগেছে পুবের মেয়েদের মতো পশ্চিমের মেয়েরাও | ধর্মান্ধরা তাদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছে, নারী বিরোধী সংস্কার তাদের শরীরে সতীত্বের লোহার খাঁচা পরিয়ে দিয়েছে, তাদের যৌনদাসী করে রেখেছে, ক্রীতদাসী করেছে। মেয়ে হওয়ার অপরাধে মেয়েরা একই রকম ভোগে পুবে পশ্চিমে, উত্তরে দক্ষিণে। পশ্চি মের মেয়েরা দলবদ্ধ হয়ে সমানাধিকারের জন্য আন্দোলন শুরু করেছিলো, যুগের পর যুগ সে আন্দোলন তাদের চালিয়ে যেতে হয়েছে। ভোটাধিকারের আন্দোলন করতে গিয়ে তাদের অপমানিত হতে হয়েছে। পুরুষেরা তাদের দিকে থুতু ছুঁড়েছে, গালি দিয়েছে। তবু তারা বারবার একই কথা বলে গেছে, বৈষম্য যে করেই হোক ঘোচাতে চাই, সমানাধিকার যে করেই হোক চাই। শতাব্দী জুড়ে আন্দোলনের ফলে তারা আজ যেটুকু অধিকার অর্জন করেছে, তা সম্পূর্ণ নয়। গর্ভপাতের অধিকারের জন্য মেয়েরা আজও লড়ছে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে আজও তারা প্রতিবাদ করছে, শ্রমিকের সমান বেতনের দাবিতে আজও মিছিলে নামছে, সংসদে নারী সংখ্যা বাড়ানোর জন্য আজও আন্দোলন করছে। আশ্রয় কেন্দ্রে আজও নির্যাতিত মেয়েদের ভিড়। হ্যাঁ, পা শ্চাত্যের সাদা মেয়ে, সোনালী চুলের মেয়ে। এখনও প্রতারিত হয়ে, এখনও অভাবে অত্যাচারে তাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হয় শরীর বিক্রি করতে। আশির দশকে নারীবাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সাফল্য এসেছে পশ্চিমে। নারীবাদকে নেতিবাচক সংজ্ঞায় পুরে প্রায় আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। আইনে সমানাধিকার জুটলেও পুরুষতান্ত্রিক তা এবং ধর্মান্ধতা নিরলস ফণা উঁচিয়ে থাকে, সুযোগ পেলেই ছোবল দেয়। নারী বিরোধী মানসিকতা পশ্চিমের অধিকাংশ পুরুষের মস্তিষ্কের বড় অংশ জুড়ে এখনও ঘাঁপটি মেরে থাকে।

নারী নির্যাতনের কোনও দেশভেদ নেই। সমানাধিকারের বা মানবাধিকারের কোনও পুর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ হয় না। মেয়েরা সব দেশেই সব কালেই নির্যাতিত। মানবাধিকার ইউনিভার্সাল। বিশ্বজনীন। প্রাচ্যের জন্য আলাদা মানবাধিকারের কথা। বলে বিশ্বজনীন মানবাধিকার থেকে যারা আলাদা হতে চায় এবং মনে করে এই করেই বুঝি পাশ্চাত্যের এতকালের নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে ভারী একটা যুদ্ধ করা গেল, তারা পাশ্চাত্যের নয়, প্রাচ্যের ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি করে। পাশ্চাত্যের বিদেশনীতি প্রাচ্যকে শোষণ করেছে। সবল মাত্রই দুর্বলের ওপর যে শোষণ করে, সেই শোষণই করেছে। প্রাচ্যের ক্ষমতাসীনরাও প্রাচ্যের সাধারণ মানুষকেও শোষণ করে চলেছে, ওই একই কায়দায়। পাশ্চাত্যের ক্ষমতাসীন, বর্ণবাদী, উন্নাসিক এবং পাশ্চাত্যের সাধারণ মানুষকে এক করে দেখার কোনও কারণ নেই। পৃথিবীর সব দেশের সাধারণ মানুষ, সে প্রাচ্যে হোক, পাশ্চাত্যে হোক অত্যাচারী দ্বারা কোনও না কোনও ভাবে অত্যাচারিত। যুদ্ধটা প্রাচ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের নয়। যুদ্ধটা সর্বকালেই সবদেশেই ক্ষমতাবানের সঙ্গে ক্ষমতাহীনের, যুদ্ধটা বৈষম্যের সঙ্গে সমানাধিকারের। বিরোধ বর্বরতার সঙ্গে বোধের, অন্ধের সঙ্গে আলোকিতের, ক্ষমতার সঙ্গে জ্ঞানের, অযুক্তির সঙ্গে যুক্তির, পরাধীনতার সঙ্গে স্বাধীনতার,অলৌকিকের সঙ্গে লৌকিকের, অমানবিকতার সঙ্গে মানবিকতার, রক্ষণশীলতার সঙ্গে প্রগতির, পুরাতনের সঙ্গে নতুনের। এই যুদ্ধ দেশ কালবর্ণলিঙ্গশ্রেণী নির্বিশেষে সর্বত্র চলেছে, আজও চলছে।

.

ধর্মীয় স্পর্শকাতরতায় আঘাত দিয়েছি আমি, এমন প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে। ধর্মের সঙ্গে না রীবাদের বিরোধ চিরকালের, নারীর অধিকার সম্পর্কে অতি সামান্য জ্ঞান যার আছে, সে-ই এটা জানে। ধর্ম আগাগোড়াই পুরুষতান্ত্রিক। আমি ধর্মও মানবো, নারীর অধি কারও মানবো, এ অনেকটা আমি বিষও খাবো, মধুও পান করবোর মতো। যখনই নারীর অধিকার আদায়ের জন্য নারীর ওপর ধর্মীয় নির্যাতনকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, তখনই ধর্মীয় স্পর্শকাতরতাকে আঘাত দেওয়া চলবে না এই স্লোগান তুলে গণতন্ত্র বিরোধী, বাক-স্বাধীনতা বিরোধী, নারী-স্বাধীনতা বিরোধীরা সরব হয়ে উঠেছে দেশে দেশে। ধর্মের বর্ম ব্যবহার করে পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার ষড়যন্ত্র খুব পুরোনো। কোনও সংস্কৃতি যদি নারীকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করে রাখে, সেই সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করা, সে সংস্কৃতি হিন্দুর হোক, মুসলিমের হোক, ক্রিশ্চানের হোক, ইহুদির হোক– কোনও সুস্থ, সভ্য, প্রগতিশীল মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আমি কোনও বর্ব রতাকে সংস্কৃতি বলি না। বর্বরতার বিরুদ্ধে চিরকাল সব সংস্কৃতির মানুষই প্রতিবাদ করেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর রামমোহন রায়কেও হিন্দুর ধমীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে হয়েছিলো।

মুসলিমের ধর্মীয় স্পর্শকাতরতায় আঘাত লেগেছে বলে কিছু কুপমণ্ডুক এক বাক্যে রায় দিয়ে দেন যে আমার বয়ান পাশ্চাত্যের বয়ান, পশ্চিমের চোখে প্রাচ্যকে দেখার বয়ান। সহিষ্ণুতার নামে মুসলিম মৌলবাদীদের এই অর্থহীন-যুক্তিহীন দাবিটি তথাকথিত ভারতীয় সংজ্ঞার সেকুলার নামধারীরা প্রায়শ উচ্চারণ করেন। পাশ্চাত্য মুসলিম সংস্কৃতি বিরোধী হলে লক্ষ লক্ষ মুসলিম পাশ্চাত্যে বাস করতে পারতো না, নিরাপদে নিশ্চিন্তে তাদের ধর্মচর্চা করে যেতে পারতো না, এলাকায় এলাকায় মসজিদ মাদ্রাসা গড়ে তুলতে পারতো না। ইরাকের যুদ্ধের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের রাস্তায় লক্ষ লক্ষ মানববাদীর মিছিল হতো না। আজ ব্রিটেনে মুসলিমরা তাদের নারী-বিরোধী। শরিয়া-আইন, যে আইনে পুরুষের বহুবিবাহ, পুরুষের নারী নির্যাতন, নারীকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা, নারীকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা আইনসিদ্ধ হবে– সেটি আনার দাবি তুলছে, এতে সায় দিচ্ছে ইংলেন্ডের বিশপ সহ বেশ কজন ব্রিটিশ মন্ত্রী। মুসলিমদের ধর্মীয় সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখে এঁরা কি মুসলিমদের সত্যিকার কোনও উপকার করবেন? যারা আজ সমানাধিকারের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে মুসলিমদের বৈষম্যের সংস্কৃতি লালন করার পক্ষে, তারা মুসলিমদের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী নন, তারাই মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু। ক্রিশ্চান সমাজে ধর্মীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে আইন তৈরি হয়েছে, হিন্দু সমাজে হয়েছে। কিন্তু মুসলিম সমাজে ধর্মান্ধতার অন্ধকার বিরাজ করুক, সংস্কৃতির নামে বর্বরতা চলুক, নারী পুরুষের চরম বৈষম্য টিকে থাকুক, তাকে বাহবা দিয়ে যাবো, প্রগতির পথে মুসলিমদের চলতে দেব না, তাদের আলোকিত হতে দেব না– এই মানসিকতার মানুষ মুসলিম সমাজের কত বড় যে ক্ষতির কারণ, তা মুসলিমরা আজ না বুঝলেও নিশ্চয়ই একদিন বুঝবে। মুসলিম সমাজের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে যে মেয়েরা আজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, নির্বাসনের হুমকি নিয়ে নারীর অধিকারের কথা বলছে –সেই মেয়েদের সেই কথাকে পাশ্চাত্যের বয়ান বলে যারা হেয় করে, তাদের আধুনিকতাকে আমি ধিক্কার দিই।

.

ক্রিস্টান ধর্ম বাইহুদি ধর্ম এবং অন্য আরও নারী-বিরোধী ধর্মের নিন্দা আমি করেছি, কিন্তু তারপরও এ নিয়ে কোনও অভিযোগ করে না কেউ। অমুসলিমদের ধর্মীয় অনু ভূতিতে আঘাত দিলে কেউ আমাকে হত্যা করার ফতোয়া দেয় না। যারা ফতোয়া দেয় তাদের অসহিষ্ণুতাকে মেনে নিতে, তাদের ধর্মীয় স্পর্শকাতরতাকে সম্মান দেখাতে লোকের কোনও অসুবিধে হয় না এবং নির্দ্বিধায় আমাকে অসহিষ্ণু বলতে তাদের বাধে না। সম্ভবত তাঁরা আমাকে মুসলিম হিসেবে দেখছে, মুসলিম হয়ে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আমার আঘাত হানাকে স্পর্ধা বলে বিবেচনা করছেন। কবিতা সিংহনারীবাদের কথা লিখলে বা জার্মেন গ্রিয়ার লিখলে ঠিক আছে, তসলিমা লিখলে ঠিক নেই। কারণ তসলিমা মুসলিম। মুসলিম মেয়েদের একটু রয়ে সয়ে চলতে হয়, মুখটা অন্য ধর্মগোষ্ঠীর মেয়েদের চেয়ে একটু বেশি বুজে থাকলে মানায়।

কিন্তু সত্য কথা হলো, নারীর অধিকারে বিশ্বাস করলে ধৰ্মপরিচয় থেকে প্রথমেই নিজেকে মুক্ত করতে হয়। কৈশোরের শুরুতেই ও থেকে আমি মুক্ত। যখন শিশু ছিলাম, শিশুদের গায়ে যেমন অন্যায়ভাবে ধর্ম-পরিচয় এঁটে দেওয়া হয়, তেমনই আমার গায়েও এঁটে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, একটি শিশুকে তার বাবা-মার ধর্মবিশ্বাস দিয়ে চিহ্নিত করা নিশ্চিতই শিশু-নিগ্রহ। একটি শিশুকে তো আমরা তার বাবা-মার রাজনৈতিক বিশ্বাস দিয়ে চিহ্নিত করি না। আমরা কোনও কমিউনিস্টের বাচ্চাকে কমিউনিস্ট বলি না। কিন্তু দু বছরের একটি বাচ্চাকে দিব্যি হিন্দু বা মুসলিম বা খ্রিস্টান বলে রায় দিয়ে দিতে আমরা দ্বিতীয়বার চিন্তা করি না। শিশু বড় হওয়ার পর বাবা-মার ধর্ম, বা অন্য কোনও ধর্ম, বা কোনও ধর্ম-নয়, পছন্দমতো কিছু একটা গ্রহণ করবে। তাই তো হওয়া উচিত।আমার জীবনে আমি তা ঘটিয়েছি। আমি মানববাদ বা মানবতন্ত্র বেছে নিয়েছি বিশ্বাসের জন্য। আমাকে মুসলিম রিফর্মার ভেবে ভুল করা উচিত নয়। আমি রিফর্মার নই, কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীরও কেউ নই। আমার গোষ্ঠী ধর্মমুক্ত মানববাদীর।

কথোপকথন

গত বছর কলকাতার বইমেলায় আমার আত্মজীবনীর সপ্তম খণ্ড নির্বাসনএর উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল। প্রকাশক অডিটোরিয়াম ভাড়া নিয়েছিলেন, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সেই উদ্বোধন হতে দেননি। অতঃপর অডিটোরিয়ামের বাইরে রাস্তায় কিছু পাঠকের উপস্থিতিতে প্রকাশক একটা প্রতিবাদী উদ্বোধন করেছিলেন বইটার।

কিছুদিন যাবৎ কথোপকথন নিয়ে ভাবছিলাম। নির্বাসনে কথোপকথন নামে একটা অধ্যায় আছে। অধ্যায়টা আমার খুব প্রিয়। এখনও প্রায় ছ বছর আগের ওই কথোপকথন মনে হয় যেন এই সেদিনের ঘটনা। গা শিউরে ওঠে ভাবলে, কী করে শাসকেরা দুটো ভোটের জন্য, ক্ষমতার গদির জন্য অসহায় আর নিরীহ মানুষদের অত্যাচার করতে একটুও দ্বিধা করে না, এমন কোনও অন্যায় নেই যে তারা করতে জানে না।

যারা নির্বাসন পড়েছে, তারা তো পড়েইছে। আর যারা পড়েনি, কিন্তু পড়তে চায়, তাদের জন্য কথোপকথনের ওই অধ্যায়টা এখানে দিচ্ছি। অনেকে ভাবে ২০০৭ সালের নভেম্বরে পার্ক সার্কাস থেকে কিছু মুসলমান লোক বেরিয়ে মিছিল করেছিল বলে আমাকে তাড়ানো হয়েছে। তা কিন্তু নয়, আমাকে তাড়ানোর পরিকল্পনা অনেক আগেই শুরু হয়েছিল।

বন্দি আমি। ঘরের বাইরে বেরোনো নিষেধ। গায়ে শ্যাওলা পড়ছে। মনে ভুতুড়ে বাড়ির উঠোনের বড় বড় ঘাসের মতো ঘাস। এর মধ্যেই তিনি এলেন। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় এক সন্ধ্যায়। আসার দশ মিনিট আগে ডিসি এসবি বিনীত গোয়েল ফোনে বলে দিলেন সিপি আসছেন। পুলিশ কমিশনারকে সংক্ষেপে সিপি বলা হয়। মুখ্যমন্ত্রীকে বলা হয় সিএম। চিফ এর প্রথম বর্ণ সি আর মিনি স্টারের প্রথম বর্ণ এম নিয়ে সিএম। পশ্চিমবঙ্গের সিএম বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সিপি প্রসূন মুখোপাধ্যায়। প্রসূন মুখোপাধ্যায় আমার বাড়ি আসবেন। কী কান্ড, এত বড় একজন মানুষ আমার বাড়ি আসছেন কেন? এই প্রশ্নের আমি কোনও উত্তর জানি না। উত্তর খোঁজারও চেষ্টা করিনি। হতে পারে এমনি সৌজন্য সাক্ষাৎ! আমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছেন, আমি তো আর হাবিজাবি কোনও মানুষ নই। দেখা করার ইচ্ছে ওঁর হতেই পারে। পুলিশের বড় দুজন অফিসার এর আগে একবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করে গেছেন। বলেছেন, আমি যেন কোনও দুশ্চিন্তা না করি, আমার নিরাপত্তার জন্য সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অফিসার দুজনের মধ্যে একজন ছিলেন শামীম আহমেদ, রীতিমত সুদর্শন। কথায় কথায় বললেন, হায়দারাবাদে যারা আপনার ওপর হামলা চালিয়েছিলো, তারা হেলা করার মতো লোক নয় কিন্তু। সবাই উচ্চশি ক্ষিত। লেখাপড়া করতে বিলেত পর্যন্ত গেছে ওরা। চমৎকার ইংরেজি বলে। ওদের ইংরেজি শুনলে বোঝাই যায় না ওরা ভারতীয়। শামীম আহমেদের চোখে ছিল হায়দারাবাদের ওয়াইসি বংশের লোকদের জন্য সমীহ আর মুগ্ধতা! প্রসূন মুখোপা ধ্যায় এলে মিষ্টি, বিস্কুট, চা, চানাচুর ইত্যাদি নানা কিছু দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। এর আগে ফোনে ওঁর সঙ্গে কথা হয়েছে। দেখা যদি হয়েও থাকে কোথাও, কেমন। আছেন, ভালো জাতীয় মামুলী কথা ছাড়া বেশি কিছু কথা হয়নি। আলাপচারিতা মোট দুঘণ্টার। মোদ্দা কথাগুলো এরকম।

প্র– অবস্থা তো খুব খারাপ।

ত– কী রকম খারাপ?

প্র– কিছু নন- বেঙ্গলি মুসলিম তো আপনাকে মেরে ফেলার সব প্ল্যান করে ফেলছে।

ত– তাই নাকি?

প্র– হ্যাঁ তাই। আমি তো আপনাকে সিকিউরিটি দিচ্ছি। আমার ছেলেরা তো সব আছে এখানে। সিকিউরিটি বাড়িয়েছি তো অনেক। জানেন তো?

ত– হ্যাঁ নিশ্চয়ই। অনেক ধন্যবাদ। আমি খুব নিরাপদ বোধ করছি এখন।

প্র– কিন্তু আপনি হায়দারাবাদে না গেলেই পারতেন। হায়দারাবাদে যাওয়াটা উচিত হয়নি আপনার।

ত– আসলে কয়েক বছর থেকেই যেতে বলছিলো। বারবারই না বলে দিয়েছি। কিন্তু এবার আমার বই এর প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করে এমন করুণভাবে। ডাকাডাকি করলো যে, মনে হল, না হয় ঘুরেই আসি। শহরটায় আগে যাইনি কখনও, যাওয়াও হল।

প্র– যাওয়া উচিত হয়নি।

ত– ওখানে যে সিকিউরিটির ব্যবস্থা ছিল না, আমি জানতামই না। আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল যারা, বুঝতে পারেনি এরকম কিছু ঘটতে পারে।

প্র–হুম। খুব ভুল করেছেন।

ত– ভুল করবো কেন? হায়দারাবাদে যে অমন ঘটনা ঘটবে, তা তো আর আমি আগে থেকে জানি না!

প্র– হায়দারাবাদে কেন গিয়েছিলেন?

ত– আমার একটা বই তেলুগু ভাষায় বেরিয়েছে। বইটার উদ্বোধন করতে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন হায়দারাবাদের প্রকাশক।

প্ৰ– আপনার বই? হায়দারাবাদে? কেন? কেন ওরা তেলুগু ভাষায় বের করেছে? কী কারণে?

ত– আমি তো বই লিখি বাংলা ভাষায়। প্ৰ– সেটা জানি।

ত– বাংলা ভাষায় বই বেরোলে সে বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। তেলুগু ভাষায়ও হয়েছে।

প্র– তাই নাকি?

ত– হাঁ। তেলুগু ভাষা ছাড়াও অন্য ভাষাতেও আছে বই।

প্র– সত্যি বলছেন?

ত– মিথ্যে বলবো কেন?

প্ৰ– আর কোন ভাষায় বই বেরিয়েছে?

ত– মারাঠি, হিন্দি, উড়িয়া, অসমীয়া, পাঞ্জাবি, মালায়ালাম..

প্র– তাই নাকি? কেন? কেন ওসব ভাষায় বেরিয়েছে?

ত– বেরিয়েছে কারণ ওসব ভাষার মানুষ আমার বই পড়তে চেয়েছে। তাই পাবলিশাররা ছাপিয়েছে।

প্র– যাই হোক। আপনার হায়দারাবাদে যাওয়াটা উচিত হয়নি।

ত– গিয়েছি তো ভারতের অনেকগুলো রাজ্যে। ওসব জায়গায় সংবর্ধনা দিয়েছে। আমার ভালোও লাগে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মিশতে। আর পাঠকের সঙ্গে কথোপকথন তো ভালো লাগারই কথা।

প্র– হায়দারাবাদ ছাড়াও অন্য জায়গায় গিয়েছেন?

ত– তা তো গিয়েছিই। দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকেই আমাকে ডাকা হয়।

প্র– কেন ডাকে আপনাকে? কে ডাকে?

ত– প্রকাশক আমন্ত্রণ জানান। সাহিত্য সংগঠন থেকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। সব সময় যাওয়া হয় না। মাঝে মাঝে যাই। কখনও তো কোথাও ভালো ছাড়া মন্দ কিছু ঘটে না। সব রাজ্যেই অবশ্য নিরাপত্তার একটা ব্যবস্থা থাকে। দিল্লিতে দুবার গিয়েছি। একবার উইমেনস ওয়ার্ল্ডের আমন্ত্রণে। আরেকবার র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্টদের আমন্ত্রণে। তখন কোনও সিকিউরিটিই ছিল না। কিচ্ছু তো বিপদ হয়নি।

প্ৰ– তাই নাকি? কেন ডেকেছিল ওরা?

ত– মানবাধিকার নিয়ে বা নারীর অধিকার নিয়ে কিছু বলার জন্য, অথবা নিজের লেখা থেকে পড়ার জন্য, এরকম আমন্ত্রণ তো জানানোই হয়।

প্র– কারা শোনে?

ত–মানুষ।

প্ৰ– ও।

ত– (দীর্ঘশ্বাস)

প্র– কী বলেছিলেন আপনি হায়দরাবাদে? কেন আপনাকে অ্যাটাক করলো?

ত– শোধ বইটার অনুবাদ হয়েছে ওখানে, একটা মেয়ের জীবনকাহিনী। আমার বক্তব্যে আমি শুধু মেয়েদের নিজের ডিগনিটি নিয়ে, সম্মান নিয়ে বাঁচার অধিকারের কথা বলেছি।

প্র– ধর্ম নিয়ে কিছু বলেছিলেন?

ত– ধর্মের ধু-ও উচ্চারণ করিনি। ইসলামের ই-ও উচ্চারণ করিনি।

প্র– তাহলে ওরা ক্ষেপলো কেন?

ত– আমার সম্পর্কে একটা প্রচার হয়েছে চারদিকে, আমি নাকি অ্যান্টি-ইসলাম, সে কারণেই অ্যাটাক। অবশ্য পরে নানা লেখালেখি থেকে যা জানলাম তা হল, মুসলমানদের ভোট পাওয়ার জন্য আমাকে আক্রমণ করে বোঝাতে চেয়েছে ওরা। ইসলামকে আমার হাত থেকে বাঁচাচ্ছে।

প্র– আপনার বিরুদ্ধে কলকাতায় ফতোয়া জারি হয়েছে।

ত– ফতোয়া তো অনেক জারি হয়েছে। এখন তো ফতোয়া নিয়ে তেমন কিছু আর হচ্ছে না। আর আপনি তো টিপু সুলতান মসজিদের ইমামকে ডেকে এনে একবার বোঝাতে পারেন। আগের বার ফতোয়া দেওয়ার পর আপনি তাকে ঘরে ডেকে নিয়ে কথা বলার পর সে বলেছিল, ফতোয়াই নাকি দেয়নি। ওরকম করে এবার তো তাঁকে ডাকতে পারেন।

প্ৰ– ওই ইমামের কথা বাদ দিন। ইমাম কোনও ভয়ংকর লোক নয়। যারা সামনে আসছে, ফতোয়া দিচ্ছে, ওরা ভালো। খারাপ লোক নয়। খারাপ লোক সব দল পাকাচ্ছে। তারা ডেনজারাস। গোপনে গোপনে সব তৈরি হয়ে আছে। আমাদের কাছে খবর আছে, ওদের প্ল্যান প্রোগ্রাম হয়ে গেছে আপনাকে মারার।

ত- আপনি জানেন কারা ওরা?

প্র– জানি।

ত– সব খবর যদি জানেন কারা এসব করছে, তাহলে তো অ্যারেস্ট করতে পারেন।

প্র– না, সেটা সম্ভব না।

ত– আমার মনে হয়না কিছু হবে। আমার সঙ্গে তো সিকিউরিটির লোক আছে। মনে হয়না ও এই কলকাতায় একজনকে প্রাণে মেরে ফেলার সাহস পাবে।

প্র– কী করে জানেন আপনি? আমি কি খবর না জেনে বলছি?

ত– কিছু তো ঘটছে না। সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীরা বলেছিলো মহাকরণ ঘেরাও করবে। সেই প্রোগ্রামও তো বাদ দিয়েছে।

প্র– (ধমক মেরে, জোরে) আপনি আমাকে ইনফরমেশন দেবেন নাকি আমি আপনাকে ইনফরমেশন দেব?

ত– কাগজে পড়লাম বলে বলছি।

প্ৰ– খবরের কাগজ কিচ্ছু জানে না। আমরা সব জানি। গোপনে কী হচ্ছে শহরে, তা জার্নালিস্টরা কী করে জানবে। (ধমক)

ত–তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু, যারা মেরে ফেলার প্ল্যান করছে, তাদেরকে অ্যারেস্ট করা যায় না? কারণ মেরে ফেলার প্ল্যান করা তো আইনের চোখে অপরাধ, তাই না?

প্ৰ– না, অ্যারেস্ট করা যায় না। বিশেষ করে যখন মাইনরিটির ব্যাপার, তখন যায় না।

ত– এটা কোনও কথা হল? আইন তো সবার জন্য এক হওয়া উচিত।

প্ৰ– রিলিজিয়াস সেন্টিমেন্ট আলাদা জিনিস।

ত– তা ঠিক। কিন্তু এই টেরোরিস্ট, যাদের কথা আপনি বলছেন, তারা কি আমার বই পড়েছে? মনে তো হয় না।

প্ৰ– তা জানি না। তবে ওরা তৈরি আপনাকে মারার জন্য। সব আয়োজন কমপ্লিট। এখন শুধু টাইমের অপেক্ষা। আর নভেম্বরের মাঝামাঝি তো বিরাট করে বন্ধ ডাকা হচ্ছে আপনার বিরুদ্ধে। খুব বিচ্ছিরি কান্ড হতে যাচ্ছে।

ত– কী রকম?

প্র–মব চলে আসতে পারে আপনার বাড়িতে

ত– তাই নাকি? বাড়ি অবদি চলে আসার আগে নিশ্চয়ই বাধা দেওয়া হবে।

প্ৰ– আমি তো আপনাকে প্রোটেকশান দিচ্ছি। নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন প্রোটে কশান বাড়িয়েছি অনেক। কিন্তু মব চলে এলে যদি আমার ছেলেরা ওদের একটাকে গুলি করে, তাহলেই তো রায়ট লেগে যাবে।

ত– বলছেন কী?

প্ৰ– ঠিকই বলছি।

ত– রায়ট লাগবে কেন?

প্ৰ– হ্যাঁ রায়ট লেগে যাবে। আপনি চান গুলি চলুক? আপনি চান আপনার কারণে কাউকে গুলি করা হোক?

ত–না আমি চাই না।

প্র– ওদের কারও গায়ে গুলি করলেই রায়ট বাধবেই। মুসলমানদের পাড়ায় খবর হয়ে যাবে। ব্যস।

ত– রায়ট কেন? এখানে কোনও তো হিন্দু মুসলমানের ব্যাপার নেই। এটা ক্রিমিনালিটির ব্যাপার। আইন কি হিন্দু মুসলমান বিচার করে?

প্র– করতে হয়। আইনের কথা বলছেন? আপনি দেখছেন না আপনার বেলায় কী হচ্ছে। কোনও সাপোর্ট পেয়েছেন কারওর? এই যে হায়দারাবাদে মার খেলেন, কেউ কি আপনাকে সাপোর্ট করেছে? কোনও পলিটিক্যাল পার্টি? সবারই মুসলিম ভোট দরকার। সুতরাং এগুলো আপনাকে বুঝতে হবে। আপনার কিন্তু সোসাইটিতে কোনও সাপোর্ট নেই।

ত– আমি তো সাধারণ মানুষের সাপোর্ট পাই।

প্র– কে বলেছে আপনাকে?

ত– আমি বলছি। মানুষ আমাকে ফোন করছে। চিঠি লিখছে। বলছে, আমার লেখা তাদের ভালো লাগে।

প্ৰ– ওসবে কি হবে না। কোনও পলিটিক্যাল পার্টি আপনাকে সাপোর্ট করছে। না, সেটা বড় কথা। খুব বাজে অবস্থা আপনার।

.

উস্রি মজুমদার বিস্কুট, সন্দেশ, চা দিয়ে গেল ট্রেতে। উর্সি আরও অনেকের মতো ভালোবেসেই আমার কাছে আসে। চা বিস্কুট খেতে খেতে প্রসূন মুখার্জি কথা বলতে থাকেন।

প্ৰ– মাইনরিটি লিডাররা দেখা করবে সিএম-এর সঙ্গে। ওরা তো আপনাকে ডিপোর্টেশনের দাবিতে পথে নামছে। ওরা প্ল্যান করছে সিএমএর কনভয় আটকাবে। আটকালে আমাদের তো লাঠিচার্জ করতে হবে। আর লাঠিচার্জ করার মানে জানেন? খবর হয়ে যাবে। বিরাট রায়ট লেগে যাবে। লাগবেই।

ত– অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

প্ৰ– অবিশ্বাস্য নয়। আপনার জন্য তো রায়ট লাগবে কলকাতায়। আপনি থাকলে রায়ট লাগবেই।

ত– কলকাতায় আমি থাকলে রায়ট লেগে যাবে! এত বছর কলকাতায় আছি আমি, কোনওদিন কিছু হয়নি। আর হঠাৎ করে রায়টের মতো কাণ্ড ঘটবে, এ আমার বিশ্বাস হয় না।

প্ৰ– বিশ্বাস না হলে সেটা আপনার প্রবলেম। তবে ঘটনাটা তাই ঘটতে যাচ্ছে। এখন আপনাকে ডিসিশান নিতে হবে।

ত– কী ডিসিশান?

প্র– আপনি কিছুদিনের জন্য কোথাও চলে যান।

ত–মানে?

প্র–মানে আপনাকে কিছুদিনের জন্য কলকাতার বাইরে কোথাও যেতে হবে।

ত– কোথায়?

প্র–ইওরোপে চলে যান না।

ত– ইওরোপে? কিন্তু ওখানে তো আমার বাড়িঘর নেই।

প্র- দেখুন, কোথাও থাকার বন্দোবস্ত করুন।

ত– ফিরবো কবে?

প্র– পরিস্থিতি শান্ত হলে ফিরবেন।

ত– (হেসে) মনে পড়ছে বাংলাদেশ থেকে যখন চুরানব্বই সালে আমাকে প্লেনে তুলে দেওয়া হয়, আমাকেও বলা হয়েছিল, পরিস্থিতি শান্ত হলে ফিরবেন। আজ তেরো বছর হয়ে গেল, পরিস্থিতি এখনও শান্ত হয়নি।

প্ৰ– আপনি ফিরে আসতে চাইলে নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন।

ত– কিন্তু আমি তো ইওরোপে যেতে পারবো না। ওখানে সব গুটিয়ে আমি এসেছি। গেলে ওখানে আমাকে হোটেলে থাকতে হবে। সে আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর আমার কাছে আমার বোন আসছে দুদিন পর। অনেকদিন থাকবে।

প্র বোনকে নিয়ে চলে যান।

ত– কোথায় যাবো?

প্র– আমেরিকায় চলে যান।

ত– আমেরিকা থেকেই তো আসছে আমার কাছে। ওকে নিয়ে আমি আমেরিকা যাবো কেন?

প্র– তবে অন্য কোথাও চলে যান।

ত– আমি তো বললাম আপনাকে, ইওরোপ বা আমেরিকায় যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আমি অত খরচ কুলোতে পারবো না।

প্র– তাহলে ভারতের কোথাও যান।

ত– কোথায় যাবো?

প্র– সে আপনি খুঁজে দেখুন কোথায় যাবেন। কেউ নেই আপনার চেনা পরিচিত কোথাও ভারতের কোনও রাজ্যে?

ত– আমার চেনা আছে তো অনেকে। আমার পাবলিশার আছে কেরালায়, মহা রাষ্ট্রে, উড়িষ্যায়। কেরালার সরকার আমাকে বেশ ভালোবাসে। এডুকেশন মিনিস্টিার এমএ বেবি আমাকে তাঁর বাড়িতে নেমন্তন্ন করেছেন। ফরেস্ট মিনিস্টারের বাড়িতেও ব্রেকফাস্টের জন্য ডেকেছিলেন। ওঁরা বেশ চমৎকার মানুষ।

প্র– কেরালায় চলে যান। আপনার পাবলিশারকে বলুন আপনার থাকার ব্যবস্থা করতে।

ত– কিন্তু ওখানে তো মানুষ জেনে যাবে যে আমি গেছি। গতবার কেরালায় কিছু মুসলিম মৌলবাদী আবার আমার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছিল।

প্র– কেরালায় জানিয়ে দিন আপনি আসছেন। ওখানে প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করবে, সে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আর কোথায় বললেন, মহারাষ্ট্র?

ত– ওখানে আমার মারাঠী পাবলিশার আছেন। অনিল মেহতা। উনিও খুব ভালো।

প্র–মধ্যপ্রদেশে চলে যান না, ওখানে তো বিশাল জঙ্গল আছে!

ত– আপনি আমাকে জঙ্গলে পাঠিয়ে দিতে চান?

প্ৰ– (অপ্রস্তুত হেসে) না, আসলে আমি তো জঙ্গল খুব ভালোবাসি, তাই বলছি।

ত– আমার জঙ্গল ভালো লাগে না।

প্র– তাহলে কী ভালো লাগে?

ত– সমুদ্র, পাহাড় এসব ভালো লাগে।

প্র– তাহলে কেরালায় চলে যান। ওখানে এনজয় করুন সমুদ্র।

ত– ফিরবো কবে?

প্ৰ– তিনচার মাস থাকুন। এদিকের আগুনটা কমলে ফিরবেন।

ত– আগুনের তো কিছু দেখছি না।

প্র– আপনি দেখছেন না, আমরা তো দেখছি।

ত– আপনি যে এভাবে বাইরে চলে যেতে বলছেন, কতদিনের জন্য বলছেন যেতে। ফিরবো কবে? ফেরার কথা ঠিক করে তো বলছেন না।

প্র– যান। দুতিন মাস পর ফিরে আসুন।

ত–দুতিন মাসে কি পরিস্থিতি শান্ত হবে বলে আপনার বিশ্বাস?

প্ৰ– হা হয়ে যাবে। কত আর নেবে? কয়েক মাস পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বছর খানেকের মধ্যে তো হবেই মনে হচ্ছে।

ত– পরিস্থিতি তো আমি মোটেও অশান্ত দেখছি না। কিন্তু আমি কলকাতায় থাকলে, যা আপনি বলছেন, পরিস্থিতি অশান্ত হয়। তাহলে তো আমি ফিরে এলে আবার পরিস্থিতি অশান্ত হবে। আমি ফিরে এলে ওরা কি চুপ করে বসে থাকবে? মেনে নেবে?

প্র– এ নিয়ে ভাববেন না। তখনেরটা তখন দেখা যাবে।

ত– তাহলে এখনেরটা এখন দেখাই ভালো। পালিয়ে গিয়ে কোনও সমস্যার কি সত্যিকার সমাধান হয়? ওরা যদি জানে যে আমি ওদের ভয়ে চলে গেছি, তাহলে বিরাট ভিকটরি হবে ওদের।

প্র– আপনার এই ফ্ল্যাটটা কবে নিয়েছেন?

ত– এই তো বছর তিনেক আগে।

প্র– জায়গাটা ভালো না। মুসলিম এরিয়ার খুব কাছে। যে কোনও সময় অ্যাটাক হতে পারে। দেখি তো ফ্ল্যাটটা, কত স্কোয়ার ফুট?

ত– ঠিক জানি না, মনে হয় সতেরোশ। দুহাজারও হতে পারে। একেকজন একেকরকম বলে।

প্ৰ– ( উঠে ফ্ল্যাট দেখতে দেখতে) হা এরকমই একটা আমরা দেখে রাখবো। ওদিকে বাথরুম?

ত– হ্যাঁ ওদিকে বাথরুম।

প্ৰ– (স্টাড়িতে এসে) স্টাডি?

ত– হ্যাঁ। এখানেই বেশির ভাগ সময় থাকি।

প্র– এখানেই বেশির ভাগ সময়? কেন, এখানে কী করেন?

ত– লেখা পড়া করি।

প্র– (কমপিউটারের কাছে এসে) কমপিউটারে লেখেন?

ত– হ্যাঁ।

প্ৰ–বাংলায় লেখেন?

ত– হ্যাঁ।

প্ৰ– আশ্চর্য!

প্র– আর ফিরে এসে আপনি এই ফ্ল্যাটটা পাল্টে নেবেন। সাউথের দিকে কোথাও ফ্ল্যাট নিন। বালিগঞ্জের দিকে নিন। এটা মুসলিম এরিয়ার খুব কাছে।

ত– ফ্ল্যাট খুঁজে পাওয়া এত কষ্টের! প্রচুর ফ্ল্যাট দেখেছি। ভালো জায়গায় ভালো ফ্ল্যাট এখনও পাওয়া হয়নি। এই ফ্ল্যাটটা খুব তাড়াহুড়ো করে নিয়েছিলাম। কোনও উপায় ছিল না। ভাড়া খুব বেশি। একটু কম ভাড়ার ফ্ল্যাট পেলে ভালো হয়।

প্র– কোনও চিন্তা করবেন না। আমরাই খুঁজে দেব।

ত– এই বাড়ি ফেলে এতদিনের জন্য কী করে আমি দুরে থাকবো? আমার তো খুব দরকারি জিনিসপত্র আছে এ বাড়িতে। কত বই। কত সার্টিফিকেট, ডকুমেন্টস। সব কি এভাবে ফেলে চলে যাওয়া ঠিক হবে?

প্র– দামি কী আছে?

ত– সোনার মেডেল টেডেল আছে…

প্র– শুনুন, ভ্যালুবল জিনিস বরং নিয়ে যান।

ত– নিয়ে যাবো? ওগুলো নিয়ে পথে পথে ঘুরবো? আর ঘর বাড়ি এভাবেই পড়ে থাকবে? আমার বেড়ালটা কোথায় যাবে?

প্র– একটুও চিন্তা করবেন না। আমার ছেলেরা দেখবে আপনার ফ্ল্যাট। বেড়াল নিয়েও দুশ্চিন্তার কিছু নেই।

ত– আশ্চর্য কেন?

প্র– কী করে লেখেন, দেখান তো।

ত– (বাংলা একটি লাইন আমার পক্ষে কোথাও যাওয়া অসম্ভব। না, এ হতে পারে না –লিখে) এভাবেই বাংলা লিখি।

প্র– (মৃদু হেসে) কী করে জানেন কোন্ কী তে কোন্ বাংলা অক্ষর আছে?

ত– অনেক বছর ধরে লিখছি কমপিউটারে। কোন রোমান হরফের তলায় বাংলা কোন হরফ লুকিয়ে আছে, জানা হয়ে গেছে।

প্র– (দরজার কাছে, চলে যেতে যেতে) আপনার বোন কবে আসছে যেন?

ত–এই তো দুদিন পর। ও অসুস্থ। কিছু ডাক্তার টাক্তার দেখাবে।

প্র– শুনুন। আপনি কিন্তু চলে যান অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল। কবে যাচ্ছেন এটা আমাকে তাড়াতাড়ি ফোনে জানিয়ে দেন।

ত– আমাকে একটু ভাবতে হবে।

প্র– ভাবার কিছু নেই। অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল চলে যেতে হবে।

.

প্রসূন মুখার্জি বেরিয়ে গেলেন। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশগুলো সব মুহূর্তে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। অসম্ভব সমীহ করে এরা উঁচু পদের কর্মকর্তাদের। আমি দরজা বন্ধ করে স্টাডিতে এসে স্থবির বসে থাকি। কণ্ঠের কাছে থোক থোক কষ্ট এসে জমছে। উস্রি চলে গেল, আমি চরাচর জুড়ে একা। পায়ের তলায় যেন মাটি কঁপছে। সবচেয়ে কাছের যে মানুষের সঙ্গে মনে হল এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারি, তিনি মানস ঘোষ। তাঁর পত্রিকায় প্রতি বুধবার আমার কলাম বেরোয়। মানস ঘোষকে ফোনে খবরটা দেবার সঙ্গে সঙ্গে বললেন, সৌগত রায়কে খবরটা জানাবেন তিনি। আমার যে ক্ষুদ্র পরিচয়ের গন্ডি, এর মধ্যে রাজনীতি বোঝার লোক বা দুঃসময়ে উপদেশ দেওয়ার খুব বেশি কেউ নেই। হাতে গোনা কজন ছাড়া বাকি সব চেনা জানা সব আমার মতোই রাজনীতি-না-বোঝা মানুষ। দুজনই, মানস ঘোষ আর সৌগত রায় আমার বাড়ি পৌঁছোলেন। প্রসূন মুখার্জি আমার বাড়িতে এসে ঘণ্টা দুয়েক ছিলেন, আমাকে কলকাতা ছাড়তে বলছেন, শুনে মানস ঘোষ ঠিক কী বলা উচিত কিছু বুঝতে পারছেন না। বারবারই এক কথা বলছেন, খুব খারাপ খুব খারাপ। খুব খারাপের পর যে ঠিক কী, তা অনেকক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে। থেকেও অনুমান করতে পারিনি। সৌগত রায় তো বলেই ফেলতে লাগলেন, হ্যাঁ তুমি ছিলে, ভালোই লাগতো শহরটায়। তোমাকে খুব মিস করবো।

শুনে বুক কেঁপে ওঠে। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠ আমার। মিস করবেন মানে? আপনি কি সত্যি সত্যি ভাবছেন আমাকে চলে যেতে হবে?

প্রশাসন যখন বলছেন, তোমার নিরাপত্তার কথা ভেবেই বলছেন। এখন তো তুমি, জানি না কোথায় যাবে, ইওরোপে?

না। আমি কোথাও যাবো না।

সৌগত রায় প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিকে ফোন করলেন। ওপার থেকে যা ভেসে এলো তা হল, আমি হায়দারাবাদ থেকে ফেরার পর প্রিয়রঞ্জনবাবু আমার পক্ষে কথা বলে ছিলেন। অপরাধীদের কঠিন শাস্তি দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। ছাপাও হয়েছিলো কাগজে। সে কারণে তাঁকে অসুবিধে পোহাতে হয়েছে।

কী অসুবিধে?

উত্তর মেলে না। ধারণা করে নিতে হয় যে তাঁর দলের সদস্যরা অথবা দলের মুসলিমরা আপত্তি করেছেন। আপত্তির কারণে তিনি সিদ্ধান্ত বদল করেছেন।

প্রসূন মুখার্জি যখন বলেছেন, যখন নিজে আমার বাড়িতে এসে বলেছেন, শহর শান্ত থাকলেও, হয়তো কারওরই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল না যে শহর শান্ত। পুলিশ কমিশনার তো ফাজলামো করতে আসেননি, নিশ্চয়ই আমার নিরাপত্তার এমনই অভাব হয়ে দাঁড়াচ্ছে যে পুরো রাজ্যের পুলিশ বাহিনী, আমাকে, আমার মতো একলা প্রাণীকে কোনও নিরাপত্তা দিতে অপারগ। অপারগ বলেই তো চলে যাওয়ার কথা বলা। তাঁরা একরকম মেনে নিলেন। এবং মনে মনে আমার দুরবস্থার জন্য দুঃখ করা ছাড়া তাদের খুব বেশি উপায় আছে বলে তারা মনে করলেন না। আমাকে সা না দিতেই হয়তো, বললেন, যে, আজ তো বিশেষ আলোচনা হওয়ার সুযোগ নেই, অনেক রাত হয়ে গেছে, কাল, আগামিকাল, বিকেল তিনটেয় বসা যাবে এখানে, এই ঘরে, আমার লেখার ঘরে, বাঁচার কোনও উপায় আছে কী না তা নিয়ে কথা বলতে।

সারারাত অস্থিরতায় কাটে। পরদিন দুজন এলেন বটে, কিন্তু কোনও সমস্যার সমাধান হয় না। সিদ্ধান্ত নিই, নিজেই নিই, কোথাও যাবো না আমি।

.

এদিকে একটি ঘটনা আগুনের মতো বড় হচ্ছে কলকাতা শহরে। রিজওয়ান নামের এক গরিব মুসলমান ছেলের সঙ্গে প্রিয়াঙ্কা নামের এক ধনী হিন্দু মেয়ের প্রেম, স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টে বিয়ে, প্রিয়াঙ্কার বাপের বাড়ি চলে যাওয়া, রিজওয়ানের মৃত্যু। কেউ বলছে আত্মহত্যা। কেউ বলছে খুন। পুলিশের বড় কর্তারা নাক গলিয়ে ছিল প্রাপ্ত বয়স্ক রিজওয়ান আর প্রিয়াঙ্কার ব্যক্তিগত সম্পর্কে, বিয়েতে। লালবাজারে পুলিশ অফিসে ডেকে পাঠানো হয়েছিল দম্পতিকে। প্রচার মাধ্যম নিরবধি এই গল্পই পরিবেশন করে চলেছে। অভিযোগের আঙুল পুলিশের বড়কর্তাদের দিকে। অবস্থা খুব ভালো নয় প্রসুন মুখার্জিসহ দুজন বড় কর্তার। ভালো অবস্থা না থাকুক, তাতে কার কী! ফোন করলেন প্রসূন মুখার্জি। কী, আমাকে রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে হবে।

এবারের কথোপকথন ফোনে।

প্র– হ্যালো।

ত– নমস্কার। ভালো আছেন?

প্র– ভালো থাকার কোনও উপায় আছে? কী হচ্ছে এদিকে টিভিতে, দেখছেন তো! যত্তসব। তা আপনি এখনও যাচ্ছেন না যে।

ত– কোথায় যাবো?

প্ৰ– যে কোনও কোথাও চলে যান। আপনাকে কত বার বলবো যে কলকাতায়। আপনি থাকলে গন্ডগোল হবে। রায়ট লাগবে। মুসলিম অরগাইজেশনগুলো খুব বড় প্ল্যান করছে। বুঝতে পাচ্ছেন না আপনি..

ত- আমার তো যাওয়ার কোনও জায়গা নেই।

প্র– কিন্তু কোথাও না কোথাও তো আপনাকে যেতে হবে।

ত– জায়গা যদি না থাকে, তবে যাবো কোথায়?

প্র– কেরালা যাচ্ছেন না কেন?

ত– কেরালাতেও ওই একই ব্যাপার ঘটবে। কেরালা-সরকার আমাকে রাখতে চাইবেন না কেরালায়। ওখানে কিছু যদি একটা ঘটে যায়, সেই ভয় আপনাদের মতো ওঁরাও তো পাবেন। আপনারা নিরাপত্তা দিতে পারছেন না। ওঁরা কী করে দেবেন? আমি পশ্চিমবঙ্গে থাকি, কেরালা সরকার জানেন। কেরালায় কেন ওঁরা আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবেন। মাঝে মাঝে অনুষ্ঠানে দুতিনদিনের জন্য যাই, সেটা আলাদা কথা।

প্র– হুম। আপনাকে গোপন রাখতে হবে ব্যাপারটা।

ত– কী করে গোপন রাখবো। আমাকে গোপন রাখতে দেবে কে? অন্যরা রাখবে না গোপন।

প্র– গোপন রাখা যাবে না কেন? কাউকে বলবেন না আপনি এসেছেন।

ত– আমি তো ঢোল পিটিয়ে কোথাও কিছু বলে বেড়াই না। কিছু কি আর সত্যি গোপন থাকে? জানাজানি হবেই। আমার মনে হয় না গোপনে গোপনে এত বড় একটা কাজ করা যাবে। গোপনে চলে যাওয়া কেরালায়। এসব তো কেরালা সরকার। মানবেন না। আমার পক্ষে সিকিউরিটি ছাড়া কোথাও থাকা সম্ভব হবে না। এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।

প্র– আচ্ছা, আপনি থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে কোথাও যেতে পারেন না?

ত– ওখানে কী করে যাবো? ওখানে কাউকে চিনি না আমি। আর কোথায় থাকবোই বা? আমার তো কাড়ি কাড়ি টাকা নেই হোটেলে গিয়ে থাকার।

প্র– আপনি বুঝতে পারছেন না, এখানে বিচ্ছিরি সব বন্দ ট ডাকছে।

ত– আমার মনে হয় না খুব বড় কোনও দল ওরা..

প্ৰ– আপনি না হয় শান্তিনিকেতনেই চলে যান।

ত– শান্তিনিকেতনে?

প্ৰ– ওখানে কেউ নেই আপনার?

ত–না। কেউ নেই।

প্র– আপনার এত বন্ধু বান্ধর, তাদের বাড়ি টাড়ি নেই ওখানে?

ত–আছে কারও কারও। কিন্তু..কী করে বলবো। আপনারা বলুন না, সুনীলদার বাড়ি আছে, ওখানে থাকার ব্যবস্থা হলে হয়তো থাকতে পারি।

প্ৰ– আপনার তো কলকাতা ছাড়তে হবে। কোথাও যান, বুঝলেন। আমাকে জানাবেন শিগরি। দেরি করাটা ঠিক হবে না।

ত– দেখি। আমি চেষ্টা করবো।

আমি সত্যি সত্যি ভাবতে বসি, কোথায় যাওয়া যায়! যদিও আমার মনে হচ্ছে। না খুব মন্দ কিছু ঘটবে। কত কত দিন কলকাতার রাস্তায় নিরাপত্তা রক্ষী ছাড়াই ঘুরে বেরিয়েছি। শহরে অত শত্রু থাকলে কোনও না কোনও একদিন কিছু ঘটতোই। অন্তত আক্রমণের কোনও চেষ্টা হয়তো হতো। ঠিক বুঝে পাই না কী করবো। হাতের কাছে কোনও বন্ধু নেই যে কথা বলবো এ নিয়ে। দু একজন যাদের সঙ্গে কথা বলি, ওরা বোঝে না কী বলছি আমি। অথবা বুঝলেও এ নিয়ে কী মন্তব্য করবে, তা ঠিক জানে না।

কয়েকদিন পর আবার ফোন প্রসূনবাবুর। তিনি এবার প্রথম কথাটাই বললেন এভাবে

প্ৰ– শুনুন, সিএম বলেছেন আপনাকে কেরালা চলে যেতে। খুব শিগরি, পারলে আজই যান।

ত– কেরালা?

প্ৰ– হা কেরালা। ওখানে সরকারের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। আপনাকে চলে যেতে হবে।

ত– কেরালায় লোকে যখন জানবে আমি ওখানে? ওখানেও তো মুসলমান মৌলবাদী আছে। ওরা বসে থাকবে? কলকাতায় যারা আমাকে মেরে ফেলবে বলছি লেন। ওরা বসে থাকবে? ওরা তো কেরালায় গিয়ে আমাকে মেরে আসবে।

প্র– আপনাকে যেতে হবে যে করেই হোক, সিএম বলেছেন।

ত–হাঁ বুঝতে পারছি। কিন্তু আমাকে তো আমার জীবনটার কথা ভাবতে হবে। আমি তো, আপনি বলবেন, আর, দিব্যি কোথাও মরতে যেতে পারি না। আপনারা যে আমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন কলকাতা ছাড়ার জন্য, তা তো আমাকে জানাতে হবে। তা না হলে আমি যদি কেরালায় গিয়ে মরে যাই, মানে কেউ আমাকে মেরে ফেললে দোষ আমার হবে। লোকে বলবে, হঠাৎ আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো, কলকাতা ছেড়ে কেরালায় চলে গেছি! কেন গেছি, কী কারণে গেছি তা না জেনে, লোকে আমাকেই দোষী করবে। গেলে আমাকে জানিয়ে যেতে হবে। লুকিয়ে পালিয়ে চুপিচুপি কোথাও যাবো না।

প্র– না না না এসব ব্যাপার খুব কনফিডেনশিয়ালি করতে হবে। কেউ যেন না জানতে পারে।

ত– গোপন রাখতে চাইলেই তো গোপন রাখা যায় না। আমার চেহারা তো মানুষ চিনে ফেলে, জানেন তো? চিনে ফেলবে। কোথাও গিয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখা যাবে না। আর, আমি কেন গোপন রাখবো, বলুন তো। আমি তো মিথ্যে বলি না। আর মুখ বুজে থাকলেও ওরা কারণ বের করে ফেলবে। গোপনে গোপনে রাজ্যের বাইরে যাবো। কেউ জানবে না কী করতে আমি কেরালা গিয়েছি? সবাই ভাববে শখে গিয়েছি, শখে মরতে গিয়েছি। তা কেন, বলুন! তার চেয়ে জানাই সবাইকে যে যাচ্ছি।

প্র– না না। গোপন রাখতে হবে।

ত– আমি তো গোপন রাখতে চাইছি না। আমি তো চাইছি জানাতে হয় আপনি জানাবেন, নয়তো আমি জানাবো। যে কোনও একজনকে তো জানাতে হবে। আপনাকে বলতে হবে, আপনারা আমাকে কলকাতা থেকে চলে যেতে বলছেন, কারণ। আমার নিরাপত্তা দিতে পারবেন না। অথবা আমাকে জানাতে হবে।

প্ৰ– হ্যাঁ আমিই জানাবো। খটাশ করে ফোন রেখে দিলেন।

রেখে দিলেন। কিন্তু মনে আমার অদ্ভুত এক প্রশান্তি। যে কথাগুলো বলা উচিত, সে কথাগুলো বলেছি বলে, বলতে পেরেছি বলে। আমার আর হারানোর কী আছে! জীবনে তো সবই হারিয়েছি। কী দোষ করেছি আমি যে গোপনে আমাকে শহর ছাড়তে হবে, আরেক শহরের গর্তে গিয়ে লুকিয়ে থাকতে হবে।

.

এর কদিন পর ফোন করলেন লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে সবচেয়ে সুসম্পর্ক যে লেখকের। আমার সঙ্গেও ছিল দীর্ঘকালের বন্ধুত্ব।

সু- হ্যালো তসলিমা, আমি সুনীলদা বলছি।

ত– সুনীলদা, ভালো আছেন? কতদিন পর আপনার সঙ্গে কথা হচ্ছে। ভালো আছেন তো সুনীল দা?

সু– হা ভালো। তুমি কেমন আছো?

ত– নাহ, সুনীলদা, ভালো নেই। আমাকে কোথাও বেরোতে দিচ্ছে না।

সু– হুম।

ত– ঘর থেকে বেরোতে চাইলেই বলছে, না সম্ভব নয়। এভাবে ঘরে বসে। থাকাটা ভালো লাগে? আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কী রকম দমবন্ধ লাগছে আমার?

সু– শোনো, তোমাকে যে জরুরি কারণে ফোন করেছি, তা হল, পুলিশের কাছে খবর আছে, তা হল, এখানে কিছু অবাঙালি মুসলমান তোমাকে মেরে ফেলার জন্য তৈরি হয়ে আছে। এখন, সবচেয়ে ভালো, তুমি যদি বিদেশে কোথাও চলে যাও।

ত– আমি জানি। প্রসূনবাবু আমাকে বলেছেন। তিনিও বলেছেন বিদেশে চলে যাই যেন। কিন্তু সুনীলদা, পৃথিবীর সব জায়গায় মুসলিম মৌলবাদী আছে। ইওরোপে, আমেরিকায়, কোথায় মৌলবাদী নেই? জীবনের ঝুঁকি পৃথিবীর সব জায়গায় আছে। আর আমি এ দেশ ছেড়ে যাবো কোথায়? বাংলাদেশে যদি যাওয়া সম্ভব হত, আজই চলে যেতাম। এত অপমান সয়ে এ দেশে থাকতাম না। আর, সত্যি কথা বলতে কী, আমার যাওয়ার কোনও জায়গা নেই সুনীলদা। ইওরোপের পাট চুকিয়ে এদেশে এসেছি, কলকাতায় থাকবো বলে। ইওরোপ আমেরিকায় আমি তো থেকেছি। ওসব দেশে থাকার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। আর, এই কলকাতায় যদি আমাকে মেরে ফেলে কেউ, মেরে ফেলুক। আমি কলকাতা ছেড়ে কোথাও যাবো না।

সু– আমার মনে হয় তুমি আরও ভেবে দেখো।

ত– আমি ভেবে দেখেছি সুনীলদা। আমার কোথাও যাওয়ার নেই। মরলে এ শহরেই মরবো।

সু– আচ্ছা। কী আর বলবো তবে। রাখছি।

ত– ঠিক আছে। আপনি ভালো থাকবেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ফোন আমাকে ভেতরে কাঁপায়। মুখ্যমন্ত্রী প্রসূন মুখোপা ধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সবাইকে দিয়ে আমাকে বলাচ্ছেন কলকাতা ছাড়ার জন্য!

.

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ফোনের বেশ কিছুদিন পরে এলো আরও একজন বড় লেখকের ফোন। বুদ্ধদেব গুহ। বললেন, ঐ একই কথা, চলে যাও। কী দরকার কলকাতায় থেকে? কী আছে এখানে। তিনি সরাসরিই বললেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সাথে কথা হয়েছে। তিনি চাইছেন আমি কলকাতা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাই।

এর কদিন পর বাড়িওয়ালার বউ ফোন করলেন। বাড়িওয়ালা ডাক্তার দেবল সেন। কিন্তু যোগাযোগ আমার সঙ্গে রাখেন শর্মিলা সেন, দেবল সেন-এর স্ত্রী। তিনি সবসময়ই খুব আন্তরিক। বাড়ি ভাড়া আঠারো হাজার ছিল, কিন্তু দুমাস পর ওটাকে কুড়ি হাজার করেছিলেন, বলেই নিয়েছিলেন, কুড়ি হাজারের নিচে ও বাড়ি ভাড়া হয় না। আমি একফোঁটা আপত্তি করিনি। এদিকে আবার মেইনটেইনেন্স খরচ দিতে হয় আড়াই হাজারের মতো। সব মিলিয়ে সাড়ে বাইশ হাজারে চমৎকার চলছিলাম। যদিও বাড়িতে থাকার পর থেকে অন্য ভাড়াটেরা যা পায়, তা থেকে আমি বঞ্চিতই হয়েছি। ইন্টারকম কদিন কাজ করে আর করেনি। অভিযোগ করার পরও কেউ ও যন্ত্রটা সারাতেও আসেনি। বাড়িওয়ালার কিছু ছারপোকা-ওয়ালা চেয়ার টেবিল আমাকে পুষতে হয়েছে। আর পুজোর ঘর বলে একটা ঘর আছে, ও ঘরটায় বাড়িও য়ালার কাগজপত্র ঠাসা বাক্সও পুষেছি। না, ও নিয়েও আমি কখনও আপত্তি করিনি। শর্মিল সেন বলেছিলেন, তাঁর বাড়িতে জায়গা নেই বলে এখানেই রেখেছেন। বাড়িটিতে ঢোকার পর অবশ্য বাড়িটিকে বাসযোগ্য করার জন্য পকেটের টাকা খরচ করে বাড়ির ভাঙা অকেজো নানাকিছু সারাতে হয়েছে। এ নিয়েও অভিযোগ করিনি। দেবল সেন খুব বড় কার্ডিওলোজিস্ট, কিন্তু বড় একজন ফটোগ্রাফারও। একদিন তাঁর ফটোগ্রাফির বই দিয়ে গেলেন। বন্য জন্তুর ফটো তোলা তাঁর শখ। তবে একে ঠিক শখের ফটোগ্রাফি বলা যায় না, রীতিমত পাকা হাতের কাজ। সেই ভদ্র বিনীত দেবল সেন-এর কণ্ঠস্বরও বছর তিন পর পাল্টে যেতে দেখলাম। তাঁর বাড়িতে আমি ভাড়া থাকি, এ কথাটা কাগজে লিখে দিতে হয়, ছ মাস পর পর যখন আমার রেসিডেন্স পারমিটের মেয়াদ বাড়ানোর সময় আসে। অ্যাড্রেস প্রুফ বলে একটা ব্যাপার আছে, আমি কোথায় থাকি, কোন ঠিকানায়, তা আমার কাছে যখন কোনও প্রমাণ নেই, বাড়ির ইলেকট্রিসিটি বিল যেহেতু দেবল সেন-এর নামেই আসে, তাঁকেই সই করে দিতে হয় কাগজে যে হাঁ ও বাড়িতে আমি থাকি। ওটাই প্রমাণ করে আমি রাস্তাঘা টের ঠিকানাহীন সন্ত্রাসী নই, আমার একটা ঠিকানা আছে। তবে এ বার তিনি কাগজ দেখে আকাশ থেকে পড়লেন, এ কীসের কাগজ তিনি চিনতে পারলেন না, এবং সই করলেন না। এদিকে শর্মিলা সেনও, যিনি আমার বাড়িতে এসে বাড়ি এত সুন্দর সাজানো, এত যত্ন করে রাখা, এত চমৎকার লাগছে বলে প্রশংসা করে যেতেন, একদিন ফোন করে বলেন, এ বাড়ি আমাকে ছেড়ে দিতে হবে। অদ্ভুত শোনায় তাঁর এবারের কণ্ঠস্বর।

শ– আমার বাড়িটা কিন্তু আপনাকে ছাড়তে হবে।

ত–মানে? বাড়ি ছাড়ার প্রশ্ন উঠছে কেন?

শ–আসলে কী জানেন, খুব বেশি ভাড়া দেবে, এমন একজনকে পেয়েছি। তাঁকে কথাও দিয়েছি। এখন সামনের মাসেই সেই ভাড়াটেকে দিতে হবে বাড়ি।

ত– এরকম বললে তো হয় না। আমার তো কোনও একটা অ্যাপার্টমেন্ট পেতে হবে আগে। তা না হলে কোথায় যাবো।

শ– আপনি যদি এ মাসের মধ্যেই বাড়িটা ছেড়ে দেন, ভালো হয়। আপনার। অনেক বন্ধু আছে। তাদের খুঁজতে বলুন বাড়ি।

ত–ঠিক আছে, আমি বাড়ি খুঁজতে থাকি। পেলে আমি নিশ্চয়ই চলে যাবো।

শ– বুঝলেন তো, যে কম ভাড়ায় আপনি থাকছেন, এরকম ফ্ল্যাটে এত কম ভাড়ায় কেউ থাকে না।

ত– কত টাকা ভাড়া চাইছেন? যদি আমি দিই তত টাকা, তাহলে তো নিশ্চয়ই আমাকে বাড়ি ছাড়তে বলবেন না।

শ– এ বাড়ির ভাড়া পঞ্চাশ হাজার টাকা। তবে আপনার জন্য পঁয়তাল্লিশে রাজি হতে পারি।

চমকে উঠি। এত টাকা ভাড়া হয় নাকি! কুড়ি হাজার থেকে লাফিয়ে পঁয়তাল্লিশ হাজার! কখনও শুনিনি এমন।

ত– ভাড়া, যতদূর জানি, এক দুহাজার করে বাড়ানো হয়। এভাবে দ্বিগুণের বেশি কেউ কি বাড়ায়?

শ– আমাকে বাড়াতে হবে। আর কোনও উপায় নেই আমার। একজন যখন অত টাকায় ভাড়া নেবে বলেছে, তখন তো বসে থাকতে পারি না। কালই দেখতে আসবে বাড়ি।

ত– তা দেখুন। কিন্তু আমাকে আপনার সময় দিতে হবে, যতক্ষণ না আমি কোনও জায়গা পাচ্ছি।

শ– খুব হারি। ঠিক আছে?

এর কিছুদিন পর আবারও শর্মিলার ফোন। ওই একই কথা। বাড়ি ছাড়ুন। আবারও ফোন। প্রায়ই ফোন। প্রায় প্রতিদিন ফোন। বাড়ি ছাড়ুন।

.

বিনীত গোয়েল এক সময় খুব সমীহ করে কথা বলতেন। এখন ফোন করেন, তবে কণ্ঠস্বর বিনীত নয়, ভাষাও ভিন্ন, স্বর এবং সুর দুই-ই পাল্টে গেছে।

বি– আপনাকে কোথাও তো চলে যেতে হবে।

ত– মানে?

বি– শহরের অবস্থা খুব খারাপ। কিছুদিন বাইরে কোথাও থেকে আসুন।

ত–শহর তো ঠিক আগের মতোই। কিছুই তো দেখছি না অন্যরকম।

বি– বড় মিছিল বেরোবে আপনার বিরুদ্ধে।

ত– সে কারণে শহর ছাড়তে হবে কেন? অনেকের বিরুদ্ধে তো মিছিল বেরোয়, তারা কি তাই বলে শহর ছেড়ে চলে যায়?

বি– দেখুন, আপনার ভালোর জন্য বলছি। আপনি কি চান না আপনাকে আমরা নিরাপত্তা দিই? চারদিকে গণ্ডগোল শুরু হলে আমরা কিন্তু আপনাকে নিরাপত্তা দিতে পারবো না। নিরাপত্তা ছাড়া শহরে কী করে থাকবেন।

. অন্ধকার আমাকে গ্রাস করতে থাকে।

কলকাতা শাসন করছে মৌলবাদীরা!

রুশদিকে কলকাতায় আসতে দেওয়া হবে না। খবরটি যখন শুনলাম, সত্যি বলতে কি, আমি অবাক হইনি। অবাক হবো কেন, আমাকেও তো আসতে দেওয়া হয় না, শুধু কলকাতায় নয়, পুরো পশ্চিমবঙ্গেই আমার পা রাখা নিষেধ। সেই যে ২০০৭ সালে আমাকে তাড়ানো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে, আজও আমি নিষিদ্ধ সেই রাজ্যে। শুধু আমার উপস্থিতিই নয়, আমার বইয়ের উপস্থিতিও নিষিদ্ধ। গত বছর কলকাতা বইমেলায় আমার বই নির্বাসন-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিল করে দিয়েছে পশ্চি মবঙ্গ সরকার। যে মানুষের বাক স্বাধীনতার ওপর পঁচিশ বছর ধরে হামলা হচ্ছে, দুর্বিষহ নির্বাসন-জীবন যাপন করতে যে বাধ্য হচ্ছে, বাংলায় লিখেও বাংলায় যার ঠাঁই নেই, সাত-আটটি মাথার-দাম যার মাথার ওপর, শারীরিক আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে যাকে, সে কেন এক লেখককে কলকাতার সাহিত্যক-বৈঠকে উপস্থিত হতে বাধা দেওয়ায় চমকে উঠবে।

অবাক হইনি, কিন্তু রুশদিকে কলকাতার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া। তীব্র প্রতিবাদ করছি। প্রতিবাদ করেছি মকবুল ফিদা হুসেন, এ কে রামানুজন, জেমস লেইন, রহিন মিস্ত্রি, কমল হাসান-এর মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যখন আঘাত এসেছে। যখনই ধর্মীয় মৌলবাদীরা কোনও কিছুর দাবি করে, সে দাবি যতই অন্যায় দাবি হোক, সরকারের মধ্যে তা-ই মেনে নেওয়ার একটা প্রবল প্রবণতা লক্ষ করেছি। অনেক সময় মৌলবাদীরা অখুশি হতে পারে বা ঝামেলা পাকাতে পারে এই ভয়ে আগ বাড়িয়ে সরকার-পক্ষ থেকে অনেক অযৌক্তিক এবং অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমার দ্বিখণ্ডিত বইটি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০০৩ সালে যদি কিছু হয় ভয়ে নিষিদ্ধ করেছিলেন। রুশদিকে কলকাতায় আসতে বাধা দেওয়ার পেছনে সরকারের ওই যদি কিছুর ভয়ই কাজ করেছে।

কিন্তু এসব আর কতদিন? আর কতদিন মৌলবাদীদের, বিশেষ করে মুসলিম মৌ লবাদীদের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকবে সরকার, আর কতদিন ওদের অন্যায় আবদার মাথা নত করে মেনে নেবে? ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ, ভারত বাংলাদেশও নয়, পাকিস্তানও নয়, ওসব দেশের নড়বড়ে নাম কা ওয়াস্তে গণতন্ত্রের মত ভারতের গণতন্ত্র নয়। ভারত শিল্পে, শক্তিতে, শিক্ষায়, স্থিতিতে আজ উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভারত কেন নিজেকে মুসলিম মৌলবাদীদের স্বর্গরাজ্য হতে দিচ্ছে। হাতে গোণা কিছু মুসলিম মৌলবাদীকে খুশি করার জন্য অথবা ওদের ভয়ে আজ ভারতের সংবিধানকে (১৯ক ধারা) অপমান করতে দ্বিধা করছেন না, দেশকে হাজার বছর পেছনে ঠেলে দিতে আপত্তি করছেন না নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। এর ফলে গোটা মুসলিম সম্প্রদায়, আর গোটা ইসলামই যে অসহিষ্ণ বলে প্রমাণিত হয়ে গেল, তার দায় কে নেবে! কেবল নির্বাচনে জেতার হিসেব। দেশ গোল্লায় যাক, দেশের ভবিষ্যৎ গোল্লায় যাক, আমার নির্বাচনে জেতা চাই। প্রগতিবিরোধী, নারীবিরোধী, অর্বাচীন, অগণতান্ত্রিক, অশিক্ষিত, অসুস্থ, অসভ্য মৌলবাদীদের দাবি মেনে নিয়ে যারা আজ সভ্য শিক্ষিত প্রগতিশীল শিল্পী সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীনতা হরণ কাছে, মৌলবাদীদের শক্তি এবং সাহস বাড়াচ্ছে, তারা দেশের এবং দশের শত্রু, এ কথা আমি বলতে পারি, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বলতে পারি।

কেয়ামত

বয়স যখন আমার পাঁচ, তখন প্রথম শুনলাম দজ্জালের কথা। দজ্জাল আসছে কাল বা পরশু। এ মাসে, অথবা দুমাস বাদে। দজ্জাল এক একচোখা বীভৎস দানব। হাতের তলোয়ার হাওয়ায় ঘোরাবে আর কেটে ছিঁড়ে মানুষকে রক্তাক্ত করবে যতক্ষণ না তাকে আল্লাহ বলে না মানা হবে। ছোট-বড় সবাই আমাকে বলে দিল, দজ্জাল আমার ঈমান নষ্ট করার চেষ্টা করবে, কিন্তু আমি যেন তার মিঠে কথায় বা তেতো কথায় না ভুলি। যেন আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে না যায়, যে দজ্জালই স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। আমাকে দজ্জাল শত টুকরোয় কাটুক, তবু যেন অনড় থাকি। একটু নড়চড় হলেই কপালে দোযখ।

ভয়ে আমি কুঁকড়ে থাকতাম। কত কত রাত যে ঘুমোতে পারিনি দজ্জালের কথা শোনার পর। কোথাও অদ্ভুত শব্দ হলেই মনে হত দজ্জাল। মামারাও ভয় দেখাতো দজ্জালের। বোকা ছিলাম বলে আমাকে নিয়ে মামাদের দুশ্চিন্তা ছিল, দজ্জাল বোধহয় আমার ঈমান নষ্ট না করে ছাড়বে না। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, লোকটা দজ্জাল নাকি আল্লাহ, তা বুঝবো কী করে? দজ্জালও বলবে, আমি আল্লাহ, আর সত্যিকার আল্লাহ এলেও বলবে আমি আল্লাহ। মা কিছুক্ষণ ভেবে বলেছিল, দজ্জালের একটা চোখ, দুটো নয়। প্রশ্ন করি আল্লাহর কটা? মা আর উত্তর দেয়নি।

চেনা এক পীরবাড়ি থেকে প্রায়ই আমাদের কাছে ভয়ংকর ভয়ংকর সব খবর আসতো। দজ্জাল আসার পর পরই নাকি কেয়ামত আসবে। কেয়ামত মানে পৃথিবীর পুরো ধ্বংস হয়ে যাওয়া। মৃত মানুষগুলো সব জেগে উঠবে, আখেরাতের ময়দানে এক এক করে সবাইকে হাঁটতে হবে পুলসেরাতে। পুলসেরাত পার হতে পারলে বেহেস্ত, না পার হতে পারলে দোযখ। এসব যত শুনতাম, তত ভয় পেতাম, ভাবতাম দোযখের আগুনেই বুঝি আমাকে অনন্তকাল পুড়তে হবে।

বছর গেল। তার পরের বছর গেল। তার পরের বছরও। দজ্জাল কিন্তু আসেনি। কেয়ামতও আসেনি। একটু বড় হয়ে লক্ষ্য করেছি দজ্জাল আর কেয়ামতের ভয় আমার আর নেই। বরং পীরবাড়ি থেকে ভয়ংকর সব ভয় দেখানো খবর এলে খুব হেসেছি। ওভাবেই গেছে আমার শৈশব কৈশোর।

ধর্মের রূপকথা বিশ্বাস করি না, সে তিন যুগেরও বেশি। মানুষের বিশ্বাসের প্রচণ্ডতা দেখলে এখনও অবশ্য চমকে উঠি। ঠিক বুঝি না, কুসংস্কার, যুক্তিহীন তা, অজ্ঞতা, অন্ধতা নিয়ে কী করে দিব্যি মানুষ বাস করছে, শুধু বাস করছেই না, রীতিমত সুখে শান্তিতে বাস করছে।

মাঝে মাঝেই দেখি আমার সেই ছোটবেলায় যা ঘটেছিল তা আজও ঘটে। কেয়ামত শুরু হওয়ার বা পৃথিবী শেষ হওয়ার আশঙ্কাবাণী ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ছোট-বড় চেনা-অচেনা নানা ধর্মের লোকেরা ঘোষণা করে দেয় যে আজই বা কালই পৃথিবী শেষ নিদ্রায় ঢলে পড়বে। মানুষ, একেশ্বরবাদী হোক, বহুঈশ্বরবাদী হোক, শেষ পর্যন্ত এক। মৃত্যু ভয়ে বড় কাতরায়। প্রস্তুতি নিয়ে নেয় শেষ দিনের, বাঁচার জন্য হেন কাজ নেই না করতে পারে। যে দিনটি নিয়ে ভয়, সেটি কিন্তু যথারীতি নির্বিঘ্নে পার হয়ে যায়। নতুন আরেকটি শেষ দিন নিয়ে আবার কিছু মানুষ মেতে ওঠে। এভাবেই চলে। চলছে।

আমেরিকার মায়া সভ্যতার আদি পঞ্জিকায় নাকি ২০১২-র ২১ তারিখের পর আর বার-তারিখ লেখা নেই। সুতরাং এই দিনটিই, কিছু লোক ধারণা করে, শেষের সে দিন। গুয়াতেমালায় মায়া সভ্যতার উত্তরসুরি যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তারা বলে দিল পুরোনো সভ্যতা শেষ হয়ে যাচ্ছে, নতুন সভ্যতার নতুন ভোরকেই স্বাগত জানানো হবে। মায়ার লোকদের মধ্যে বেশি কেউ ইয়া নবসি ইয়া নবসি করছে না। করছে তারা যাদের সঙ্গে মায়া সভ্যতার কোনও সম্পর্ক নেই। বিশ্বের নানা প্রান্তে হাজার হাজার ভীতু ভীরু, কুসংস্করাচ্ছন্ন, বোকা, গাধা, ভেড়া দুদিন হল পাহাড়ের চুড়োয়, নয়তো মাটির তলায় বাংকারে বসে আছে। তাদের ধারণা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, মাটির ওপরের মানুষগুলো সব মরে ভুত হয়ে যাবে, কোথাও কিছুর আর অস্তিত্ব থাকবে না, তারপর ধীরে সুস্থে পাহাড়ের চূড়া থেকে আর মাটির তল থেকে বেঁচে যাওয়া পঞ্জিকাবিশ্বাসীরা উঠে এসে ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই নতুন জীবন শুরু করবে। কেউ আবার ভাবছে, একটা মহাশূন্যযান এসে তাদের সবাইকে উঠিয়ে নতুন কোনও উজ্জ্বল পৃথিবীতে নিয়ে যাবে। নাসার মতো বড় একটা সংস্থা এই হাবিজাবির মধ্যে নাক গলাতে বাধ্য হয়েছে। খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে ডিসেম্বরের একুশ তারিখে কোনও কারণ নেই পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার। নাসার উপদেশ শুনে ওরা হঠাৎ করে দুদিনেই যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বনে যাবে, এমন অবশ্য আশা করি না। ধর্মান্ধদের অযৌক্তিক কাণ্ড দেখে, আগেই বলেছি, বিস্মিত হই, এই কেয়ামত-বিশ্বাসী লোকদের উন্মাদনা দেখেও বিস্মিত হই। বুদ্ধির হয়তো একটা সীমা আছে, বোকামোর, সত্যি বলতে কী, কোনও সীমা নেই। কেউ সব বাড়িঘর বিক্রি করে দিয়েছে, কেউ টাকা পয়সা যা ছিল সব খরচা করে ফেলেছে, কেউ ম্যাচের কাঠি, ধুপের কাঠি, নাট বল্ট, ছুরি চাকু, নিয়ে লুকিয়ে পড়েছে।

পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো ক্যালেন্ডারের ভবিষ্যত্বাণী আবার সত্যি সত্যি সত্যি হয়ে যায় কি না, যে কোনও ধর্মাবলম্বীর জন্যই এ বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটা সভ্যতার জয়জয়কার চলবে, আর এখনকার থোকা থোকা জল জ্যান্ত ধর্ম আর আর তাদের ততোধিক জলজ্যান্ত সভ্যতা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আঙুল চুষবে, তা বেশি কারও পছন্দ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই।

মাটির তল আর পাহাড়ের চূড়া থেকে দুদিন বাদে ফিরে এসে ওরা আমাদের সামনে ঠিক ঠিক মুখ দেখাতে পারবে তো? ঠিক পারবে, হয়তো পৃথিবী ধ্বংসের নতুন একটা তারিখ ঘোষণা করে তবে মুখ দেখাবে। কেন একুশ তারিখে পৃথিবী শেষ হয়েও হলো না, তার একটা ভুতুড়ে কোনও কারণ আবিষ্কার করবে। এই মায়া ঘোষিত কেয়ামত মেনে না নেওয়ার পেছনে ধার্মিকদের আর আমার মতো ধর্মমুক্ত মানুষদের যুক্তি কিন্তু ভিন্ন। কোনও এক ধার্মিক চিরতার রস খেতে পছন্দ করে না, আমিও করি না, তার মানে এই নয় যে আমরা ভাই ভাই।

এই কেয়ামত-বিশ্বাসীদের আমার নিতান্তই শিশু বলে মনে হয়। শিশু-আর্মি যেমন ভয় পেতাম, এরাও ঠিক সেরকম ভয় পায়। বিজ্ঞান সম্পর্কে আমিও ছোট বেলায় তত জানতাম না। এরা বড়বেলাতেও জানে না। শরীরটা বড় হয়েছে বটে, তবে এরা পৃথিবী কেন, পৃথিবী কী, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড কবে থেকে, বিবর্তন কী, এসব কিছুই জানতে জানতে বেড়ে ওঠেনি। অজ্ঞতা আর অবিজ্ঞানের সঙ্গে এদের গভীর বসবাস। তারপরও অবশ্য বেশ সুখে শান্তিতেই এরা বাস করছে। সুখ শান্তি বড় জটিল জিনিস। অনেকটা মাছের মতো। কেউ হাত বাড়ানোর আগেই পেয়ে যায়, কেউ বঁড়শি হাতে সারাদিন বসে থাকে, মাছের দেখা মেলে না।

 গণতন্ত্রের করুণ দশা

বাংলাদেশের কারো সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করি, দেশের কী অবস্থা। বেশির ভাগই বলে, যেমন চলছিল তেমন। কেউ কেউ বলে, সংঘর্ষ খুন হরতাল লেগেই আছে। মাঝে মাঝে বুঝি না, কী করে দেশটা চলছে। অল্প কিছু রাজনীতিক আর ধনীদের হাতে দেশ। তাদের যা মন চায়, তাই তারা করছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দুর্দশা নিয়ে ভাববার সময় খুব বেশি কারোর নেই। শুনেছি খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করা। হয়েছে, গৃহবন্দি করে বা বন্দি করে কোনো সমস্যার কি সত্যিকারের সমাধান হয়। খালেদা জিয়া যদি সন্ত্রাসের পথ দেখিয়ে থাকেন, তবে তার অন্ধ অনুচরেরা সেই সন্ত্রাসের পথেই যাবেন, খালেদা জিয়া বন্দি থাকুন বা নাই থাকুন। পয়গম্বরদের। ক্ষেত্রে এমন হয়, তারা বাঁচুন বা মরুন, তার অনুসারীরা তার মতকে বংশ পরম্পরায় অনুসরণ করে যায়। বেশির ভাগ মানুষই যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে পথ চলে না। ওপরওয়ালা বা ওপরতলার লোক যা যা আদেশ করে, অক্ষরে অক্ষরে সেই আদেশ মেনেই তারা চলে। এভাবে চলতে চলতে মস্তিষ্কের ভেতরে চিন্তা করার, যুক্তি দিয়ে বিচার করার যে কোষগুলো আছে, সেগুলো শেষ অবধি অকেজোই হয়ে যায়। দীর্ঘকাল যে কোনো কিছুকে অকেজো বসিয়ে রাখলে এমনই হয়। কিন্তু এটিই শেষ কথা নয়, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে কিন্তু যুক্তিহীন মানুষগুলো যুক্তি বুদ্ধি ঠিকই খাটাচ্ছে, শুধু একটি দুটি ক্ষেত্রে একেবারেই যুক্তি বুদ্ধির বালাই নেই, বুদ্ধির মুক্তির কোনো ব্যবস্থাই ওতে নেই। কম্পার্টমেন্টালাইজেশন একেই বলে। মস্তিষ্কের এক কোঠার সঙ্গে মস্তিষ্কের আরেক কোঠার কোনো সম্পর্ক থাকে না।

গত পরশু কয়েক লক্ষ উলেমা ভারতের উত্তরপ্রদেশের এক দরগায় গিয়েছিল, প্রতিবছরেই যায়, কোনো একটা পীরের জন্মোৎসব মহা ঘটা করে করে। সেখানেই এক মুসলিম মৌলবাদী নেতা কয়েক লক্ষ উলেমাকে জিজ্ঞেস করল, তারা রাজি আছে কি না তসলিমাকে ভারত থেকে বের করে দিতে। সকলেই হাত তুলে তাদের সমর্থন জানিয়েছে।

সরকার তাদের দাবি না মানলে তারা জানিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট অবধি যাবে। আমাকে শহর থেকে বা রাজ্য থেকে বা দেশ থেকে বের করে দেওয়া নতুন নয়। বাংলাদেশ প্রথম শুরু করেছে এই অন্যায়টি। এরপর এটি সংক্রামক হয়ে গেছে। অন্যায় অত্যাচার দুর্নীতি দুঃশাসন খুব সংক্রামক। একবার তুমি লাথি খেলে তুমি ক্রমাগতই লাথি খাবে। এক শাসক তোমাকে এক ঘরে করে পার পেয়ে গেলে বাকি

শাসকও তোমাকে একঘরে করে পার পেতে চাইবে। ভারতের ভোট ব্যাংক রাজনী তিতে খেলার জন্য তসলিমা নামে একটা ট্রাম্প কার্ড বানানো হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। এই কার্ডটা সবারই হাতের মুঠোয় অথবা বুক পকেটে। মুসলমানদের ভোট পাওয়ার জন্য অন্য কার্ড তো খেলাই হয়, তসলিমা কার্ডও খেলা হয়। তসলিমা কার্ড খেলতে হয় তসলিমাকে মেরে ধরে গৃহবন্দি করে তার বিরুদ্ধে মিথ্যে বদনাম ছড়িয়ে, তার বই নিষিদ্ধ করে, তার সিরিয়াল বন্ধ করে, তাকে দেশছাড়া করে। এটি করে মুসলমানদের তারা বুঝিয়ে দেয় যে তারা তসলিমাকে ঘৃণা করে। কে কত বেশি ঘৃণা করতে পারে তসলিমাকে, তার প্রতিযোগিতা চলে। যে যত বেশি ঘৃণা করতে পারবে, যে যত কষে লাথি দিতে পারবে তসলিমাকে, যে তাকে যত দ্রুত টেনে নিয়ে আবর্জনায় ফেলে আসতে পারবে, যে যত ভোগাতে পারবে তাকে, সে তত বেশি মুসলমানের ভোট পাবে। বাংলাদেশেও এই খেলা চলে। খালেদা জিয়া আমাকে দেশ থেকে বের করেছেন তো হাসিনা আমাকে দেশে ফিরতে দেবেন না। তসলিমাকে ঘৃণা করার প্রতিযোগিতা চলে দুই নেত্রীতে। কী যে বীভৎস এই প্রতিযোগিতা! গণতন্ত্রকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে গণতন্ত্র নিয়ে বড়াই করতে কারওর লজ্জা হয় না।

কয়েক লক্ষ উলেমা ঘোষণা করেছে, তসলিমাকে দেশ থেকে বেরিয়ে যেতে হবে, তা না হলে সর্বনাশ। তসলিমার দোষ কী! তসলিমা এক ফতোয়াবাজকে ফতোয়া বাজ বলেছে, বলেছে যারা ফতোয়া দেয়, মানুষের মাথার মূল্য ঘোষণা করে, তারা মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করে না। কিন্তু উলেমারা ফতোয়াকে দোষের বলে মনে করে না, তারা মাথার মূল্য ঘোষণা করাটাকেও দোষের বলে মনে করে না। তারা মনে করে, এ আমার দোষ আমি ইসলামী ফতোয়া মানছি না, ইসলামে যা বিধান আছে তা অমান্য করে কার সাধ্য! এই ফতোয়ার বিরুদ্ধে যে যাই বলুক, কোনো রাজনৈতিক দল কোনো কথা বলবে না। কারণ তারা বিশ্বাস করে, উলেমাদের এই গণতন্ত্রবিরোধী, বাকস্বাধীনতা বিরোধী ফতোয়াকে যে সমর্থন জানাবে সামনের নির্বাচনে সে জিতবে। সামনে লোকসভা নির্বাচন। এখন থেকেই ভোটে জেতার ছলাকলা চলছে। উত্তর প্রদেশের সরকার এর মধ্যেই আমার বিরুদ্ধে একটা মামলা দায়ের করে ফেলেছে। উলেমাদের এই তসলিমা হঠাও-এ সমর্থন জানিয়ে উত্তরপ্রদেশের সরকার কেন্দ্রের সরকারকে জানিয়ে দেবে তসলিমাকে যেন দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়। আমাকে মেরে ফেললে দুটো মুসলিম ভোট পাওয়া যাবে বলে যদি তাদের বিশ্বাস হয়, আমার মনে হয় না আমাকে মেরে ফেলতে কেউ দ্বিধা করবে। পশ্চিমবঙ্গে থেকে সিপিএম আমাকে তাড়িয়েছে ভোটের জন্য, তৃণমূল আমাকে ঢুকতে দিচ্ছে না সেও ভোটের জন্য। আখেরে ভোট কিন্তু কারও জোটে না। কারণ তসলিমা ভোটের জন্য কোনো বিষয় নয়। বিষয় হলে আমাকে তাড়িয়ে সিপিএম ভোট পেতো মুসলমানের। তা তো পায়নি, বরং গোহারা হেরেছে। তারপরও দলগুলো বিশ্বাস করবে না যে তসলিমা কার্ড খেলে ভোটে জেতা যায় না। আর মুসলমানরা এত বোকা নয় যে, তসলিমা কার্ড খেললেই তারা এক পাল ভেড়ার মতো দল বেঁধে ভোট দিয়ে আসবে। কিন্তু মুসলমানদের যারা ভেড়া বলে ভাবে, তারাই আসলে তসলিমা কার্ড খেলে। এদের, এই মুসলিম তোষণকারীদের অবশ্য মুসলিমদের বন্ধু বলে ভাবা হয়। কেউ কেউ বলে, ইমামদের ভাতা দিয়ে, মসজিদ-মাদ্রাসা তৈরি করে, মুসলমানদের অন্ধকারে রাখার, মৌলবাদী বানাবার, অকেজো বানাবার সব ব্যবস্থাই করে রেখেছে। কেউ আবার বলে, মুসলিমদের জন্য বাড়তি সুযোগ-সুবিধে দিয়ে এরা আসলে হিন্দু মৌলবাদী তৈরিতে সাহায্য করছে। দুটোই সত্যি।

গত পরশু কয়েক লক্ষ লোককে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আমি ইসলাম বিরোধী সুতরাং আমাকে শাস্তি পেতে হবে। আমাকে আল্লাহ শাস্তি দেবেন, এটা এরা বিশ্বাস করে না। আমি ইসলাম মানি না বলে এরা আমাকে শাস্তি দিতে চাইছে, আল্লাহর শাস্তির ওপর ভরসা করছে না। আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি এদের আস্থা থাকলে হাশরের ময়দানে আল্লাহর হাতে আমার বিচারের ভার ছেড়ে দিত এরা। আল্লাহর বিচারে আস্থা নেই বলেই উলেমারা আমার বিচার চাইছে, আমাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে অথবা মেরে ফেলে। একটি গণতান্ত্রিক দলও একবারও বলেনি, উলেমারা অন্যায় আবদার করছে। কারও সাধ্য নেই উলেমাদের কথার ওপর কথা বলে এই ভারতবর্ষে। আমি একা, আর ওদিকে কয়েক লক্ষ উলেমা আর মুসলিম মৌলবাদী। সরকার বা রাজনৈতিক দল কার পক্ষ নেবে? সহজেই অনুমান করা যায়। এত যে বলা হয় বিজেপি আমাকে সমর্থন করে, কোথায় বিজেপি! আমার কোনো দুঃসময়ে বিজেপি আমাকে সমর্থন করেনি বরং বিরোধিতা করেছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমাকে যখন রাজস্থানে পাঠিয়ে দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার, রাজস্থানের বিজেপি সরকার আমাকে ছয় ঘণ্টাও থাকতে দেয়নি রাজস্থানে। ভোর হওয়ার আগেই আমাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়েছে এই বলে যে আমি রাজস্থানে আছি জানলে রাজস্থানের মুসলমানরা খুব রাগ করবে। মুসলমানের ভোট বিজেপিও চায়। বিজেপিতে মুসলমান সদস্যের সংখ্যাও অনেক। কেন্দ্রে বিজেপি থাকাকালীন তো আমাকে দুই হাজার সালে ভারতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, কারণ বোম্বের মুসলমান মৌলবাদীরা আমার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল। শেষ পর্যন্ত ইসলাম সম্পর্কে একটি শব্দ উচ্চারণ করব না এই মর্মে মুচলেকা দেওয়ার পর আমাকে মাত্র তিন দিনের ভিসা দিয়েছিল বিজেপি সরকার শুধু কলকাতা থেকে আনন্দ পুরস্কার আনার জন্য। নির্বাচন আসছে, আমার ওপর আক্রমণ বাড়ছে। আমার সিরিয়াল বন্ধ হয়ে গেল। মামলা জারি করা হলো। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলো। এফ আই আর হলো। এখন দেশ ছাড়ার ফতোয়া। শুধু তাই নয়, সন্ত্রাসীরা তো ওতপেতে আছে আমাকে প্রাণে মেরে ফেল্লার জন্য। মেরে ফেললেই নাকি বেহেস্ত। এত সহজে বেহে স্তের টিকিট কে পায়। এ যাত্রা বেঁচে যেতে পারব কি না জানি না। একজন মানবতন্ত্রী লেখককে হতে হলো উপমহাদেশের রাজনীতির ফুটবল। তাকে লাত্থালাত্থি করবে রাজনীতিকরা, এক জায়গা থেকে লাথি মেরে আরেক জায়গায় পাঠিয়ে দেবে। সেই জায়গা থেকেও আবার কেউ লাথি মারবে। এতে নাকি ভোট নিশ্চিত হয়। জনগণের অন্ন বস্ত্রের জন্য, স্বাস্থ্য শিক্ষার জন্য, সন্ত্রাসমুক্ত দুর্নীতিমুক্ত দেশের জন্য রাজনীতিটা আর নয়। কাকে ফাঁসি দিলে কার ভোট জুটবে, কাকে দেশে ঢুকতে না দিলে, কাকে দেশ থেকে বের করলে, কাকে অত্যাচার করলে, কার অনিষ্ট করলে কত ভোট জুটবে সেই হিসেবই করে রাজনীতিকরা। কোনো ভালো কাজ করে নয়, মন্দ কাজ করে, অন্যায় করে, অন্যের ওপর অত্যাচার করে এরা ভোট পাওয়ার ফন্দি আঁটে। উপ মহাদেশের এই গণতন্ত্রের করুণ দশা দেখে চোখে জল আসে। এ কি গণতন্ত্র নাকি মাফিয়ারাজ?

ছোট একটা বেলি ফুলের গাছ ছিল উঠোনে

সেদিন বোয়াল মাছ কিনলাম। বোয়াল মাছ হয় আমি খুবই কম কিনেছি জীবনে অথবা প্রথম কিনলাম। খাইনি তা নয়। ছোটবেলায় খেয়েছি। বাবা কিনতো। বোয়াল নামটা আমার পছন্দ হত না বলে খেতে তেমন ইচ্ছে করতো না। স্বাদটাও খুব কিছু আহামরি ছিল না। বড়বেলায় তাই আর শখ করে বোয়াল কিনিনি। কিন্তু সেদিন বোয়ালটা কিনলাম সম্ভবত এই কারণে যে ছোটদা কিছুদিন আগে বোয়ালের গল্প বলছিল। বলছিল, সপ্তা-দু-সপ্তাআগে নাকি দেশের বাড়িতে বোয়াল রান্না হয়েছিল, কারণ দাদার। খুব বোয়ালের মাথা খাওয়ার শখ হয়েছিল। খেতে গিয়ে দাদী চেঁচামেচি করেছে, কী, রান্না ভালো হয়নি। পরদিন আবারও বোয়াল রান্না হল, দাদা সেদিনও রাগ করলো। দাদার এক কথা, ঝোলটা শুধু ঘন নয়, একটু আঠা আঠাও হতে হবে, নানি রান্না করলে ঠিক যেমন হতো। এখন নানি কী করে রান্না করতো তা বৌদি বা বাড়িতে আর যারা রান্না করে, তাদের জানার কোনও কারণ নেই। আর ঠিক ওরকম আঠা আঠা ঝোল যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ দাদা ভাত মুখে দেবে না। এর নাম কী? স্মৃতিকাতরতা? পাগলামো? যে নামেই ডাকি না কেন, ভেতরে ভেতরে বুঝি, আমারও হয় এমন। দাদা রাগ করতে পারে, আবদার করতে পারে, তার বাড়ি ভর্তি লোক। আমার তো সেরকম নয়। গোটা বাড়িতে আমি একা। কুড়ি বছর আগে, দেশ ছেড়ে, দেশের মানুষজন ছেড়ে, যখন সম্পূর্ণ একটা নতুন পরিবেশের মধ্যে এসে পড়েছিলাম, আমাকে একা বাজার করতে হতো, একা রান্না করতে হতো, অথচ রান্নাটাই কোনওদিন আমার শেখা হয়নি। দেশে। সেই সময় কাঁচা হাতে রান্না করতাম, শুধু লক্ষ্য রাখতাম, মার রান্নার মতো হচ্ছে কী না। মার রান্নায় যে স্বাদ হতো, আমার রান্নায় সেই স্বাদ না আসা পর্যন্ত নিজের রান্নাকে কোনওদিন ভালো রান্না বলিনি। সেই যে শুরু হয়েছিল, এখনও তাই চলছে। ছোটবোনের বেলাতেও দেখেছি ওই একই, রান্না যদি করে, মার মতো রান্না তার করা চাই। আমার চেয়ে ঢের বেশি ও জানে মার স্বাদের কাছাকাছি স্বাদ আনতে। ওর বাড়িতে কদিন থাকলে ওজন আমার দুতিন কিলো বাড়বেই। জিভে কী করে এত কাল আগের স্বাদটা লেগে থাকে জানি না। আসলে জিভের ব্যাপার তো নয়, এ মস্তিষ্কের ব্যাপার। মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষগুলোয় কী করে যে সব গাঁথা হয়ে থাকে। দাদার ওই আঠা আঠা ঝোলের বোয়াল মাছের মাথা খাওয়ার ছেলেমানুষী আবদারকে ঠিক দোষ দিতে পারি না। সেদিন বোয়াল কিনে আমিও তো ঠিক ওই আঠা আঠা ঝোলটাই বানাতে চেষ্টা করেছি।

ছোটবেলায় যে কত রকমের মাছ খেতাম। সব মাছের নাম মনেও নেই। ভালো লাগতো ইলিশ চিংড়ি কই রই মাগুর খেতে। চিংড়িকে অবশ্য মাছ বলা যাবে না, কিন্তু চিংড়ি মাছ নয়, ভাবলে কেমন যেন দুঃখ লাগে। রুই ছিল তখন মাছের রাজা। এখন যেমন বারোয়ারি হয়ে গেছে, তেমন ছিল না। সত্যি বলতে, গত কয়েক বছর যে। মাছকে আমি সচেতনভাবে এড়িয়ে চলি, সে হলো রুই। কলকাতায় থাকাকালীন রুইএর ওপর এই অনীহাটা আমার জন্ম নিয়েছে। যেদিকে যাই, যেখানে তাকাই, শুধু রুই, রুই আর রুই। খেতে খেতে রুইয়ের স্বাদ একসময় বিচ্ছিরি লাগতে শুরু করলো। মনে। হতে লাগলো যেন ঘাস খাচ্ছি। কলকাতায় যদুবাজার, গড়িয়াহাট, আর মানিকতলা থেকে কত রকমের যে মাছ কিনতাম আমি। এত বিচিত্র মাছ দেশের বাজারেও হয়তো দেখিনি। অবশ্য দেশের বাজারে কদিন আর গেছি। আমাদের সময় মেয়েদের মাছের বাজারে যাওয়ার চল ছিল না। মাগুর নামটা যদিও আমার ভালো লাগে না, মুগুর মুগুর লাগে শুনতে, কিন্তু খেতে ভালো লাগতো, বিশেষ করে মা যখন ধনে পাতা আর টমেটো দিয়ে মাছের পাতলা ঝোল করতো। একবার কী একটা কবিতায় আমি মাগুর মাছের নাম উল্লেখ করেছিলাম, তাই নিয়ে কিছু কবি নাক সিঁটকেছিল। কবিতায় মাগুর কেন আসবে, ইলিশ আসতে পারে, চিতল আসতে পারে। মাগুর শব্দটা নাকি কবিতাকে নষ্ট করে দেয়। ওদের কথায় আমি কিন্তু আমার এই কবিতা থেকে মাগুর মাছ বাদ দিইনি। ভেটকি শব্দটা বড় বিচ্ছিরি লাগতো। কলকাতায় তাই ভেটকি আমি প্রথম প্রথম একেবারেই কিনতাম না। রেস্তোরাঁয় আর বন্ধুদের বাড়িতে খেতে খেতে একসময় টনক নড়লো, বাহ, এ তো বেশ সুস্বাদু মাছ হে। এরপর থেকে ভেটকি কেনা শুরু হলো আমার। এখনও কিনি। কলকাতার লোকেরা, খুব অবাক হতাম, রূপচাঁদা মাছকে কেন পমফ্রেট বলে। ফরাসি ভাষায় আলুভাজাকে পমফ্রেট বলে। পমফ্রেট নামটা কোত্থেকে এলো হদিস করতে গিয়ে দেখলাম, এসেছে প্যামফ্লেট থেকে। পর্তুগিজ ভাষায় কোনও কোনও মাছকে প্যামো বলে। সেই প্যামোটাই সম্ভবত উৎস। পমফ্রেট সমুদ্রের মাছ। সমুদ্রের মাছ, জানি না কেন, নদী আর পুকুরের মাছের মতো সুস্বাদু হয় না। নাকি মিঠেপানির মাছ খেতে খেতে আমাদের জিভটাই মিঠেমিঠে হয়ে গেছে। রূপচাঁদা নামটা আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু সমুদ্রের মাছ বলেই হয়তো খেতে কখনই খুব ভালো লাগেনি। ঠিকমনে নেইমা কী করে রূপচাঁদা রান্না করতো। ভাজতো বোধহয়। ভাজলে অবশ্য অনেক বিস্বাদ জিনিসেও স্বাদ চলে আসে।

মানি আর না মানি, আমরা আমাদের শৈশব-কৈশোরকে সারা জীবন সঙ্গে নিয়ে বেড়াই। বড় হই, কিন্তু বড় হই না। নানির বাড়িতে পিঁড়ি পেতে বসে বা মেঝেয় মাদুর বিছিয়ে যে খাবারগুলো খেতাম, সেগুলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার এখনও। মাটির চুলোয় ফুকনি খুঁকে শুকনো ডাল পাতা জ্বালিয়ে মা যা রান্না করতো, সেই রান্নাই এখন অবধি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রান্না। আজকালকার অত্যাধুনিক ইলেকট্রিক স্টোভে, ওভেনে, গ্যাসে রান্না করা খাবার খেয়েছি, কিছুই মার ওই মাটির চুলোর রান্নাকে ডিঙোতে পারেনি। এ কি মাকে ভালোবাসি বলে বলি? না, মাকে কোথায় আর ভালোবাসলাম! মা তো ভালোবাসা না পেতে না পেতেই একদিন চিরকালের জন্য চলে গেল। বড় অভিমান ছিল মার। একটা কী ভীষণ দুঃখের জীবনই না কাটিয়েছে মা। আমার বোনটাও। অনেকটা মায়ের মতোই জীবন ওর। বোনটা দেখতে মায়ের মতো নয়, আমি দেখতে অবিকল মা। কিন্তু আমার জীবনটা মায়ের জীবনের চেয়ে অন্যরকম। সংসারে দুঃখ কষ্ট সওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছি আমি, কিন্তু মা যেমন নিজেকে বাঁচাতে পারেনি, বোনটাও পারেনি।

মার নানারকম গুণ ছিল, কিন্তু মার গুণগুলোকে কখনো গুণ বলে মনে হতো না। মা বলেই সম্ভবত। মাদের আমরা মা বলে মনে করি, ঠিক মানুষ বলে মনে করি না। মাদের গুণগুলো দেখি, কিন্তু না দেখার মতো করে দেখি। রান্না ছাড়াও নানির অসাধারণ সব গুণ আছে। কিন্তু কজন নানিকে সেসব বলেছে, নানির ছেলেমেয়েরা কেউ কি তার প্রশংসা করেছে কখনও? আমার মনে হয় না। মা যে বেঁচে থাকতে তার অজস্র গুণের জন্য একটিও প্রশংসা বাক্য শোনেনি সে আমি জানি। মা না হয় আজ আর নেই। নানি তো আছে। যে নানির রান্না করা বোয়াল মাছের ঝোলের মতো ঝোল না হলে দাদা বোয়াল মাছ খায় না, সেই নানিকে কদিন দাদা দেখতে গেছে? এক শহরেই তো থাকে। কদিন নানির শিয়রের কাছে বসে পুরোনোদিনের গল্প করেছে? সম্ভবত একদিনও নয়। যদি গিয়ে থাকে কখনও, নিজের কোনও স্বার্থে গিয়েছে। নানি হয়তো আর বেশিদিন নেই। দেশ থেকে ফোন এলে বুক কাঁপে এই বুঝি শুনবো নানি আর নেই। আমাদের। ছোটবেলাটা নানির বাড়িতে কেটেছে। দাদাকে যখন জন্ম দিয়েছিল মা, মা তখন অল্প বয়সী কিশোরী। মার পক্ষে একা ছেলে বড় করা সম্ভব ছিল না। নানি সাহায্য করতো। এখন দাদার সময় নেই নানির কাছে যাওয়ার। আমি যদি দেশে থাকতাম, আমি নিশ্চয়ই নানিকে খুব ঘন ঘন দেখতে যেতাম। মানুষের থাকা আর না থাকার মধ্যে পার্থক্যটা আমি খুব ভালো করে জানি এখন। মা ছিল, মা নেই। বাবা ছিল, বাবাও নেই। পর পর বেশ কিছু খালা মামা, যাদের কাছে ছোটবেলায় মানুষ হয়েছি, চলে গেছে। নানি। এখনও আছে। হীরের মতো বেঁচে আছে। যতদিন নানি আছে, তার থাকার উৎসবটা তো হওয়া চাই। সারা জীবন কেবল দিয়েছে নানি, নানিকে দেবার কেউ নেই। মেয়েদের জীবনটা যেন কেবল দিতে দিতে নিঃস্ব হওয়ার জন্যই, নিঃস্ব হতে হতে মরে যাওয়ার জন্যই। যেন কিছু পাওয়ার জন্য নয়। নানির মস্তিষ্ক এখনো সতেজ, এখনও স্মৃতিশক্তি ভালো। কিন্তু হলে কী হবে, বাড়ি ভর্তি মানুষ, শুধু নানির ঘরটায় কারও আনাগোনা নেই। সবাই অপেক্ষা করছে নানির মৃত্যুর। মানুষ উদার হতে পারে ঠিক, তার চেয়ে শতগুণ বেশি নিষ্ঠুর হতে পারে।

নির্বাসন আমাকে আমার সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। নানির ঋণ শোধ করতে দিচ্ছে না। মা বাবার ঋণ শোধ করতে দেয়নি। যাদের ভালোবাসি, তাদের সবার। কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে আমাকে নির্বাসন, আমার সেই শৈশব-কৈশোরের জীবন থেকে লক্ষ যোজন দূরে। যেন ভুলে যাই সব। কিন্তু আমি তো ভুলতে কাউকে পারি না। ছোট যে একটা বেলি ফুলের গাছ ছিল উঠোনে, সেটাকেও তো আজও ভুলতে পারিনি।

ছোটদার গল্প

বাবা বুনোহাতি নন, বাঘভালুক নন, ভুতপ্রেত নন, কিন্তু বাবার ভয়ে আমরা তটস্থ থাকতাম। বাবা একটা জগত চাইতেন, যেখানে কেউ কোনও ভুল ত্রুটি করতে পারে না।

ছেলে মেয়েরা সারাদিন এবং সারারাত পড়ার টেবিলে বসে থাকে, বইয়ের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত মুখস্ত করে ফেলে। নাওয়া খাওয়া, পেচ্ছাব পায়খানা, ঘুম নিদ্রা ইত্যাদিতে অতি সামান্য সময় ব্যয় করে, যতটুকু না হলেই নয়। জ্ঞান বর্ষণ করতেন সংস্কৃত শ্লোক আওড়ে, ছাত্ৰানাম অধ্যয়নম তপঃ। বড় বড় মাঠ ছিল বাড়ির সামনে, সেসব মাঠে খেলতে নামার স্বাধীনতা শৈশব কৈশোরে আমাদের ছিল না। বাবা ভাবতেন, ছেলে মেয়েরা বিলেত পাশ করা বড় বড় ডাক্তার হবে। ও হতে গেলে খেলাধুলা, হাসি তামাশা, আড্ডা গুলতানি সব জন্মের পর থেকেই নিষিদ্ধ করে দিতে হয়। পড়ালেখা ছাড়া আর সব কাজকেই বাবা বাজে কাজ বলে মনে করতেন। নিজে ছিলেন নামকরা ডাক্তার। ভালো ডাক্তার। অবিশ্বাস্য মনোবল আর অধ্যবসায়ের কারণে এক গহীন গ্রামের ছেলে শহরের বড় ডাক্তার বলতে পারে। না, আজ আমি আমার বাবার গল্প বলবো না। আজ বলবো ছোটদার গল্প। ছোটদা আমাদের বাড়িতে প্রথম বিপ্লব করেছিল। বাবার পায়ের আওয়াজ পেলে প্যান্টে পেচ্ছাব করে দিত বড়দা। সেখানে কি না ছোটদা বাবাকে দিয়ে নিজের জন্য একটা গিটার কিনিয়ে নিয়েছিল। আজও আমার ভাবলে অবিশ্বাস্য লাগে, কী করে তা সম্ভব হয়েছিল। ছোটদার কারণে আমাদের বাড়িতে প্রথম কোনও বাদ্যযন্ত্র এলো।

বই খাতা কলম পেনসিলের বাইরে প্রথম একটা জিনিস কিনলেন বাবা। হিমালয় নাড়িয়েছিল ছোটদা। এরপর এলো ক্রিকেটের ব্যাট বল। ছোটদা নেমে পড়লো রাস্তায়, ৬৯এর গণআন্দোলন তখন তুঙ্গে, পুলিশের গুলি চলছে, কাফু চলছে, ওসবের মধ্যে। বাবা জানলে পিঠের চামড়া তুলে ফেলবে, জানার পরও। ছোটদার কাণ্ড দেখে ভয় লাগতো। ভাবতাম, যে কোনো সময় ছোটদা বুঝি পুলিশের গুলি খেয়ে মরবে।

গিটার তো হলো, এরপর ছোটদা বাড়িতে আরও একটা জিনিস নিয়ে এলো, যেটাও আনা সম্ভব বলে কেউ কল্পনা করতে পারেনি। শহর টই টই করে ঘুরে বেড়ানো ছেলে ছোটদা। ছোটদার পক্ষেই সম্ভব ছিল। বিরাট একটা অ্যালসেসিয়ান কুকুর নিয়ে বাড়ি এলো ছোটদা। কুকুরের নাম রকেট। রকেট খেলা দেখায়, সোফায় ঘুমোয়, হ্যাঁণ্ডসেক করে। এক বিদেশি পাত্রী দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। যাওয়ার সময় তার কুকুরটা দিয়ে গেছে ছোটদাকে। আমাদের কাছে তখনও পোষা কুকুর মানে, যে কুকুর সারাদিন শেকল বাঁধা থাকে, রাতে খুলে দেওয়া হয় চোর তাড়ানোর জন্য। ছোটদার কারণেই একটা অ্যালসে সিয়ান দেখা হল। ওই অ্যালসেসিয়ানটা বাড়িতে থাকাতে ওর ওপর বড় মায়া জন্মেছিল! এই যে এখন আমি প্রাণী জগতের সব পশুপাখির অধিকার নিয়ে কথা বলি, বা বাড়িতে বেড়াল কুকুর পুষি, তার শুরুটা ওই রকেট, ওই অ্যালসেসিয়ানটাই করে দিয়েছিল। এখন যে কুকুরই পুযি, তার নাম রকেট রাখি। মনে আছে ছোটদার ওই রকেটটা যেদিন মারা গিয়েছিল, জন্মের কাঁদা কেঁদেছিলাম। এরপর ছোটদা আরও দুটো ভয়ংকর নিষিদ্ধ কাজে নিজেকে জড়িয়েছিল। এক, রাজনীতি করা। দ্বিতীয়, প্রেম করা। ছাত্র ইউনিয়ন করে বেড়াতো। প্রেম করে বেড়াতো। বাড়িতে কারও এসব করা তো দুরের কথা, কল্পনা কারও সাহস হয়নি। ছোটদার চেয়ে বেশি বয়সী বড়দা তখনও প্রেম করার কথা ভাবতেও পারতো না। সবচেয়ে সাহসী কাজ বড়দার পক্ষে যেটা করা সম্ভব হয়েছিল, তা হলো ঘরের কোনে বসে প্রেমের পদ্য লেখা। ছোটদাই ছোট ছোট রেভুলুশনগুলো করতো। একসময় সে পালিয়ে গিয়ে বিয়েও করে ফেললো। সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। ছেলে বিয়ে করেছে। কোথায় বাবা ভেবেছিলেন, বড়দার চেয়ে মাথায়-ভালো পড়াশো নায়-ভালো ছোটদা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়র হবে, আর নাক-টিপলে-দুধ-বেরোয়-ছেলে, সে কিনা করেছে বিয়ে, তাও আবার হিন্দু মেয়েকে! বাবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। বাড়িতে এনে শেকলে বেঁধে ছোটদাকে কয়েকদিন ধরে পেটালেন, কিন্তু লাভ হলো না কিছু। ছোটদা কিছুতেই তার কলেজের সহপাঠিনীকে, যাকে ফট করে কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করেছিল, ছাড়েনি।

এই কাণ্ডগুলো ছোটদার মতো না বড়দা পারতো, না আমি পারতাম, না আমার ছোটবোন পারতো। ছোটদাই পেরেছিল। বিপ্লবী ছোটদা। বেড়ালের গলায় ঘন্টাটা সে-ই বাঁধতো। তারপর যে সব বিপ্লব বাড়িতে ঘটিয়েছিলাম আমরা ভাইবোনেরা, সে ছোটদাকে দেখে শিখেই। আড়ষ্টতা, ভয়, দ্বিধা ছোটদাই কাটিয়ে দিয়েছিল। আমিও এক সময় প্রেম করতে শুরু করলাম ছোটদার মতো, আমিও কাউকে না জানিয়ে ফট করে একদিন বিয়ে করে বসলাম ছোটদার মতো। আমার ছোটবোনও তাই করলো। শুধু বঙ্গাটা একটু বেশি ভীতু ছিল বলে বাবার মারের ভয়ে না পেরেছে কারও সঙ্গে প্রেম করতে, না করতে পেরেছে বাড়ির কাউকে না জানিয়ে বিয়ে।

বাবা ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। আবার ঘাড় ধরে ফেরত নিয়ে এসে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিলেন। কিন্তু তখন আর ছোটদার পড়াশোনায় মন নেই। মাধ্য মিকে কয়েকটা স্টার নিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করা ছেলে উচ্চমাধ্যমিক যেন তেন ভাবে পাশ করে অল্প বয়সে চাকরি করতে শুরু করলো। ছোটদার সঙ্গে তখন আমার সখ্য ছিল খুব। আমার ইস্কুল-কলেজের রিক্সাভাড়া থেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে ওকে দুটাকা তিন টাকা দিতাম। গল্পের বই পড়ে শোনাতাম। ছোটদার জন্য মায়া হত খুব। ছোটদার জীবনটা ছিল ভীষণ স্ট্রাগলের আবার অ্যাডভেঞ্চারেরও, যেসব আমরা কল্পনা করতে পারতাম না ওই বয়সে। হঠাৎ করে কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া, বস্তিতে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকা, এসব সিনেমায় ঘটতে দেখতাম, আর দেখতাম ছোটদার জীবনে। নিয়ম নীতির বাইরে বেরোনো, কাউকে তোয়াক্কা না করা, এমনকী বাবার মতো ভয়ংকর মানুষকে ভয়। না পাওয়া, ছোটদার কাছ থেকেই শেখা। সেই যে গিটার এনেছিল বাড়িতে প্রথম, এরপর বাড়িতে বড়দার জন্য বেহালা ঢুকেছিল, আমার জন্য একটা হাওয়াইন গিটার ঢুকেছিল, ছোটবোনের জন্য হারমোনিয়াম। ছোটদা দরজাটা খুলেদিয়েছিল, যে দরজা দিয়ে বাইরের পৃথিবীটা ঢুকেছিল বাড়িতে। কাউকে না কাউকে দরজা খুলতে তো হয়ই প্রথম।

আজ এই যে আমি অসাম্প্রদায়িক, সে কি এমনি এমনি? আকাশ থেকে অসাম্প্রদায়িকতার জ্ঞান বুদ্ধি আমার ওপর ঝরেছে? না, তা ঝরেনি। সেও ছোটদার কারণে। যখন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে প্রেম হওয়া বা বিয়ে হওয়ার প্রচলন সমাজে ছিল না, তখন ছোটদা নির্দ্বিধায় প্রেম করতো হিন্দু মেয়েদের সঙ্গে। তার ট্রাঙ্ক ভরা থাকতো প্রেমের চিঠিতে। সুযোগ পেলে সেগুলো পড়তাম, আর বিস্ময়-চাখে দেখতাম নিষেধের দেওয়াল ডিঙোনো ছোটদাকে। হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করার পর ছোটদা বাড়ির লোকদের লুকিয়ে লুকিয়ে বউকে পুজোর শাড়ি কিনে দিত, পুজোর সময় বউকে তার বাপের বাড়িতে নিয়ে যেতো যেন পুজো করতে পারে। আমাদের বাড়িতে মা ছাড়া কেউ নামাজ রোজা করতো না। কিন্তু তাই বলে যে সবাই অসাম্প্রদায়িক ছিল ভেতরে ভেতরে তা নয়। আমি অসাম্প্রদায়িক, এ কথাটা মুখে বলা সহজ, কাজে প্রমাণ করা সহজ নয়। যুদ্ধের সময় নারায়ণ নামের একটা হিন্দু ছেলেকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে জীবন বাঁচি য়েছিলেন বাবা। আর ছোটদা প্রচণ্ড হিন্দু-বিরোধী মুসলমান সমাজে জন্ম নিয়ে একটা হিন্দু মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করে নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছিল যে সে অসা ম্প্রদায়িক। ছোটবেলায় এ দুটো ঘটনা চোখের সামনে না দেখলে হয়তো লজ্জা নামের অসাম্প্রদায়িক বইটি লেখা আমার হতো না। আজ পৃথিবীর তিরিশটি ভাষায় অনূদিত লজ্জা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্যতম একটি গ্রন্থ। জীবনে কত মহীরূহর বীজ যে সেই শৈশবেই নিজের অজান্তেই বপন করা হয়ে যায়। ছোটদানা থাকলে, আমি আজ যা, অসাম্প্রদায়িক, অকুতোভয়, আপোসহীন, তা হয়তো হতে পারতাম না।

সেই যে ছোটদার জন্য মায়া হতে শুরু করেছিল ছোটবেলায়, সেই মায়াটা কখনও চলে যায়নি। বড়দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, আমি ডাক্তারি পাশ করেছি, ছোটবোন। মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছে। আমাদের চাকরি বাকরি পাওয়া কঠিন ছিল না।

বড় অসহায় চোখে ছোটদার জীবনযুদ্ধ দেখতে হতো আমাদের। একসময় অবশ্য ছোটদা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেল। বাবার সঙ্গেও ভাব হয়ে গেল। বাবা উজাড় করে। দিতেন। অভাব চলে গিয়েছিল ছোটদার। কিন্তু ছোটদার জন্য মায়াটা কিন্তু আমাদের সবারই থেকে গিয়েছিল।

কত কিছুই না ক্ষমা করে দিয়েছি। যখন সতেরো বছর বয়স আমার, নিচের পাটির দুটো মোলার দাঁতে একটু ব্যথা হচ্ছিল। ব্যস, ছোটদাতার এক দাঁতের ডাক্তারী পড়া বন্ধুর কাছে আমাকে নিয়ে গিয়ে বললো, জুয়েল, ওর দুটো দাঁত ফেলে দাও তো! ছোটদাই দেখিয়ে দিল কোন দুটো দাঁত ফেলতে হবে। সতেরো বছর বয়সে দুটো দাঁত খামোকা হারিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। অনেক বছর পর আমি বুঝতে পেরেছি, আমার দাঁত ফেলার সিদ্ধান্ত ছোটদা ভুল নিয়েছিল। কিছু বলিনি, মনে মনে ক্ষমা করে দিয়েছি। ছোটদা তো আর জেনে বুঝে ও কাজটা করেনি। ভেবেছিল, যে কোনও দাঁতে যেই না ব্যথা হবে, অমনি ওটাউপড়ে তুলে ফেলাই মঙ্গলজনক। মাথা ব্যথা হলে যেমন মাথাটা কেটে ফেলে দিতে হয়না, দাঁত ব্যথা হলেও দাঁত ফেলে দিতে হয় না। ছোটদা অনেক সময় বড় সরল, বড় নিরীহ ছিল। বাইরে থেকে সবাই তা বুঝতো না।

সিনেমার পোকা ছিলাম আমি ছোটবেলায়। একসময় সিনে-পত্রিকাগুলোতে লিখতে শুরু করলাম। বাড়িতে সিনে-পত্রিকা ঢোকার কোনও নিয়ম ছিল না। ওসব ছাইপাঁশ কিনছি বা পড়ছি জানলে বাবা হাড় গুঁড়ো করে দেবেন। মুশকিল আসান করতো ছোটদা। ছোটদা ওসব পত্রিকা বাড়িতে আনতো। আমার প্রথম লেখা কোনও একটা সিনে-পত্রি কাতেই প্রথম ছাপা হয়েছিল। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সিনেমার পত্র-পত্রিকাই ছিল সাহিত্যের পত্র পত্রিকা। ওসবেই ছোটগল্প উপন্যাস কবিতা এসব ছাপা হত। সেসময় ছোটদা আবার চিত্রালী পাঠক পাঠিকা চলচ্চিত্র সমিতির কেউ একজন হয়ে উঠলো। সিনেমার হিরোদের ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে নিয়ে আসতো অনুষ্ঠান করাতে। বিচিত্র সব বিষয়ে নিজেকে জড়িয়ে ফেল্লার ক্ষমতা ছোটদার ছিল। এই গুণ সবার থাকে না। মানুষ অসম্ভব ভালোও বাসতো ছোটদাকে। সেই ছোটবেলাতেই দেখেছি, কত বন্ধু যে ছিল ছোটদার। নানান বয়সী বন্ধু। দ্বিগুণ বয়সী কারও সঙ্গে মিশছে, আবার হাঁটুর বয়সী কারও সঙ্গে। যে কারও সঙ্গে মিশতে পারতো ছোটদা। যে কোনও দলের সঙ্গে। যে কোনও মানসিকতার মানুষের সঙ্গে, বড় বিজ্ঞানী থেকে রাস্তার ভিখিরি, সবার সঙ্গে। জানিনা সবারই মায়া হতো কি না ছোটদার জন্য। সংসারের ব্ল্যাকশিপদের জন্য ঘরে বাইরে সবারই কিছু না কিছু ভালোবাসা, লক্ষ করেছি, থাকেই।

ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সিনেমা খারাপ হতে শুরু করলো, সিনে-পত্রিকা পড়ারও চল উঠে গেল। আমরা যারা মাঝে মধ্যে লিখতাম ওসবে, অন্য পত্র পত্রিকায় বা লিটল ম্যাগাজিনে লিখতে শুরু করলাম। একসময় আমি নিজেই কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা করতে শুরু করেছিলাম, নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে প্রকাশও করতাম। ছোটদা বিজ্ঞাপন জোগাড় করে দিত, প্রেস জোগাড় করে দিত। যখন ঢাকায় চলে গেল বিমানে চাকরি নিয়ে, একবার ঢাকা থেকেও সেঁজুতি ছাপিয়ে দিয়েছিল। ছোটদার হাজার রকম বিষয়ে আগ্রহ ছিল। কোনওদিন এমন কিছু পাইনি, যা নিয়ে ছোটদা কোনও আগ্রহ দেখায়নি। ছোটদা সেই দুষ্প্রাপ্য ধরনের মানুষ, জুতো সেলাই থেকে যে চন্ডিপাঠ পর্যন্ত করতে জানতো। ছোটদা একসময় একটা নাটকের দলে নাম লিখিয়েছিল। ছোটদার কল্যাণেই একবার চমৎকার এক নাটক করে ফেলেছিলাম ময়মনসিংহ শহরের টাউন হল মঞ্চে। ছোটদাকে নাটকের একটা স্ক্রিপ্ট দিলাম, পছন্দ হলো তার, আর তার পরই শুরু হল এক পোড়োবাড়িতে কলা কুশলী নিয়ে নাটকের মহড়া। আমার ওই আঠারো বছর বয়সে রীতিমত নাটকের পরিচালক হয়ে উঠেছিলাম। নাটকটা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। বেশ অনেকগুলো শো হয়েছিল টাউন হলে। রাতে রাতে আমরা বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে নাটকের রিহার্সেলে যেতাম। ছোটদার অ্যাডভেঞ্চার আমাকে নিশ্চিতই প্রভাবিত করেছিল। সেই তখন থেকেই তো শিল্পের জগতে হাঁটি হাঁটি পা পা করে ঢুকছি আমি।

মাঝখানে অনেক বছর কেটে গেছে। দেশ থেকে আমাকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর বাবার অঢেল সহায় সম্পত্তি ছোটদা আর বড়দা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়ায়, বোনদের কোনও ভাগ না দেওয়ায় আমি খুব রাগ করেছিলাম। তারপরও ছোটদাকে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছি আমেরিকার নানা শহরে। লাস ভেগাস, এ্যাণ্ড ক্যানিয়ন, ওয়াসিংটন ডিসি। আমি যখন হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলোশিপ করছি, ছোটদা এসেছিল, তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছি বিখ্যাত হারভার্ড। এরও আগে আমি যখন জার্মানিতে, সুইডেনে, ছোটদা গিয়েছিল দেখা করতে। তখন। ছোটদাই ছিল আমার হারিয়ে যাওয়া দেশ। ছোটদা এমন একটা মানুষ যার ওপর খুব বেশিদিন রাগ করে থাকা যায় না, নাকি আমি এমন একজন মানুষ যে বেশিদিন কারও ওপর রাগ করে থাকতে পারি না, জানি না। সম্ভবত ছোটদাই, যার ওপর রাগ করে থাকা যায় না। যার ওপর সেই শৈশব থেকেই আমরা কেউ রাগ করে থাকিনি। অল্প বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সেই যে সংসার চালাবার স্ট্রাগল করে যাচ্ছিল, আমরা সবাই ছোটদার সেই স্ট্রাগল চোখের সামনে দেখেছি বলেই হয়তো। কিছু কিছু মানুষ আছে সংসারে, যারা হরদম ভুলভাল কাজ করছে, ওলোটপালোট করে দিচ্ছে সবকিছু, কিন্তু তাদের জন্য মায়া জীবনে কখনও ফুরোয় না। অভিমান হয়, রাগ হয়। কিন্তু মায়াটা কোথাও না কোথাও থেকে যায়। ছোটদা নিজের জীবন এবং জগত নিয়ে ব্যস্ত। থাকতো। ভাই বোন বাবা মার সঙ্গে সময় কাটানোর সময় তার কখনও খুব বেশি হয়নি। অভিযোগের আমার শেষ নেই। তবে ছোটদার কাছে আমি অনেক কিছুর জন্য কৃতজ্ঞও বটে। ভারত সরকার যখন আমাকে তাড়িয়ে দিল দেশ থেকে, আমি না হয় দুর দেশে গিয়ে বেঁচেছি, কিন্তু আমার পোষা বেড়ালটিকে তো দূর দেশে কেউ ঢুকতে দেবে না। ভারতবর্ষে ওকে লালন পালন করার কেউ ছিল না। ওকে অগত্যা পাঠিয়ে দিই ঢাকায়, আমার ফ্ল্যাটে। ওখানে ছোটদাই ওকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল আড়াই বছর। পরে যখন বেড়ালটাকে ফেরত চেয়েছি, ছোটদার খুব মন খারাপ, বলেছিল, মানুষটা ছিল, চলে গেলে কষ্ট হবে না বুঝি?

এর মধ্যে হঠাৎ একদিন ফোন। কী! ছোটদা দিল্লি আসবে। রুটিন টেস্ট করতে গিয়ে দেখা গেছে লিভারে হেমানজিওমা। হেমানজিওমা কোনও ক্ষতিকর কিছু নয়। তারপরও একটা দ্বিতীয় মত ভারত থেকে কে না নিতে চায়। ছোটদা খুব স্বাস্থ্য সচেতন ছেলে। চিরকালই ফিট। আমার চুল পেকে সাদা হয়ে গেল। ছোটদার চুল পাকা টাকার ব্যাপার নেই। ছোটদার সঙ্গে কোথাও বেরোলে আমাকে লোকে জিজ্ঞেস করতো ও আমার ছোট ভাই কি না। কী আর বলবো, আমার চেয়ে ন বছরের বড় ছোটদাকে আমার চেয়ে বয়সে ছোট ভাবা হচ্ছে। আসলে মিথ্যে নয়, ছোটদার বয়স হলেও ত্বকে কোনও ভাঁজ পড়েনি। চুল খুব কম পেকেছে। বিয়ার খেলেও হুঁড়ি বাড়েনি, চিরকাল ওই স্লিমই রয়ে গেছে। কিছুদিন আগে শুনেছি লাখ টাকা খরচ করে একটা ট্রেডমিল কিনেছে। এক ঘণ্টা করে প্রতিদিন হাঁটে। আমরা সবাই জানতাম আমাদের চার ভাই বোনের মধ্যে ছোটদার স্বাস্থ্যই সবচেয়ে ভালো। খামোকা কি সুন্দরী বিদুষী মেয়েরা টুপ টুপ করে প্রেমে পড়তো ছোটদার! যে কোনও বয়সের যে কোনও পেশার মেয়েই ছোটদার প্রেমে পড়ে যেতো দুদিনেই। কিছু একটা ছিল ছোটদার মধ্যে, জানি না ওই শিশুর মতো হাসিটিই কিনা।

ছোটদা এল দিল্লিতে। লিভার হাসপাতালে আমি আগেই কথা বলে রেখেছিলাম। যে রাতে এল, তার পরদিন সকাল নটায় ডাক্তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ডাক্তার ওই একই কথা বললেন, হেমানজিওমা অনেকের থাকে, এ নিয়ে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। তারপরও তিনি কিছু পরীক্ষা করতে দিলেন। লিভারের এমআরআই যখন প্রায় শেষ হয়ে আসছে, তখন ডাই এর দরকার হলো। আমার বুক কাঁপল প্রথম। ডাই-এর দরকার কেন হবে। এমআরআইএর ডাক্তারের মত, কিছু যেন পাওয়া যাচ্ছে প্যানক্রিয়াসে। রক্ত পরীক্ষা করতে দিল ওইদিনই। পরদিন অজ্ঞান করে এণ্ডোসকপি করা হলো। আমাকে দেখানো হল ভেতরের অবস্থা। ডাক্তার বললেন, প্যানক্রিয়াস ক্যানসার। অত ছোট নয়, কিছুটা এগিয়েছে, অ্যাডভান্সড, রক্তের একটা নালীর গা ছুঁয়েছে। মা মারা গেছেন কোলন ক্যানসারে মাকে না হয় সারাজীবন হেলাফেলা করা হয়েছে। জ্বলা পোড়া খাবার খেতে হয়েছে মাকে, ক্যানসার হওয়ার আগে পলিপের উপসর্গ দেখা দিলেও মাকে কেউ ডা ক্তারের কাছে নিয়ে যায়নি। কিন্তু ছোটদার কেন হবে ক্যানসার! সে তো ঘন ঘন ডাক্তা রের কাছে যেতো, বছর বছর রুটিন টেস্ট করতো! যে রোগটার নাম মুখে নিতেও ভয় হয়, সে রোগ ছোটদার শরীরে! জগত ঘুরতে শুরু করলো চরকির মতো। আমি আর কিছুতেই মন দিতে পারলাম না। মার মৃত্যুশোক আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি, কিছুদিন আগে চোখের জলে ভেসে ভেসে পুরো একটা বই লিখেছি মাকে মনে করে। আর এখন কিনা ছোটদার ক্যানসার যন্ত্রণা চোখের সামনে দেখতে হবে। অবাক হয়ে দেখি, ছোটদা এই ক্যানসারকে দিব্যি মেনে নিয়ে, যেন এ গ্যাস্ট্রিক আলসার জাতীয় কোনও রোগ, পুরো উদ্যমে চিকিৎসা করতে শুরু করলো। কোনও চোখের জল নেই, দীর্ঘশ্বাস নেই, কিচ্ছু নেই। ঘন্টার পর ঘন্টা কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে থাকা নেই। হতাশায় ডুবতে ডুবতে অবশ হয়ে যাওয়া নেই। বেড়াতে যাচ্ছে গাড়ি চালিয়ে। খাচ্ছে। গল্প করছে। ছোটদার জায়গায় আমি হলে আমি এত সব পারতাম না। কেঁদে কেটে হাল ছেড়ে দিয়ে কোনও গহীন অরণ্যে গিয়ে একা বসে থাকতাম।

সেই থেকে ছোটদা কম ভুগছে না। দিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালও লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বিস্তর ভোগান্তি দিয়েছে। প্যানক্রিয়াসের অপারেশন হবে, তার আগে এক উড়িষ্যার কার্ডিওলজিস্ট ফতোয়া দিয়ে বসলেন, আগে হার্ট অপারেশন করতে হবে। ছোটদাকে বলেছিলাম, তুমি আমেরিকার স্লোন কেটেরিংএ গিয়ে চিকিৎসা করো, সিঙ্গা পুরের ক্যানসার হাসপাতাল ভালো, ওখানে যাও, আর দুরে কোথাও না যেতে চাইলে বোম্বের টাটা মেমোরিয়ালে অন্তত যাও। ছোটদা সিদ্ধান্ত নিল দিল্লিতেই হওয়ার হবে। কেন? দিল্লিতে তার ছোটবোন, আমি, আছি। ছোটবোন ডাক্তার। হ্যাঁ ডাক্তার বটে, কিন্তু ডাক্তারি তো করি না বহু বছর। আমি ছোটবোন, আমি তো ক্যানসার ভালো করে দিতে পারবো না, সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা যেখানে পাবে, সেখানে যাও। ছোটদা শুনলোনা। আমার কাছে থেকে চিকিৎসা করালো। খামোকা একটা বাইপাস অপারেশন হতে হল, তা না হলে নাকি অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া যাবে না প্যানিক্রয়াসের দীর্ঘ হুইপল সার্জারির জন্য। সবই হলো। হার্ট সার্জারি। হুইপল সার্জারি। ছোটদা ওই ভীষণ কষ্টগুলো সব সহ্য করলো। কাতরালো। ছটফট করলো। দাঁতে দাঁত চেপে রইলো। চোখ মেললো। কিন্তু হাল ছাড়লো না। আমি তাকাতে পারতাম না ওই কষ্টের দিকে। বুক চিরে বার বার দীর্ঘশ্বাস বেরোতো। দুরে সরে থাকতাম।

অপারেশনের পর কেমোথেরাপির প্রেসক্রিপশান নিয়ে ঢাকায় ফিরে গেল ছোটদা। স্কাইপেতে কথা হতো আমাদের। ছোটদা একটা ল্যাপটপ কিনেছিল কথা বলার জন্যই। ক্যানসার নিয়ে বেশি কথা বলতো না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ভীষণ ভীষণ কাণ্ড হচ্ছে সেসব খবর দিত আমাকে। আমারও ইচ্ছে করতো না ক্যানসার নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু জোর করে কী আর মুখ বুজে থাকতে পারি। উদ্বেগ কোনও না কোনও ভাবে প্রকাশ পেতোই। ছোটদা নিয়মিত ডাক্তারের কাছে যাওয়া লোক, শুধু চেকআপের জন্য। তারই কিনা হলো এই রোগ! আমি ডাক্তারের কাছে না-যাওয়া লোক। আমার শরীরেও কোথাও নিশ্চয়ই ঘাপটি মেরে আছে এই কর্কট রোগ। ছোটদাকে বলেছিলাম, আমাদের জিন খুব খারাপ জিন। অসুখ বিসুখে ভর্তি। হাইপারটেনশন, ডায়বেটিস, ক্যানসার। ছোটদাও জানে আমাদের জিন ভালো নয়। বারবারই বলেছে ছোটদা, আমিও যেন সব কিছু পরীক্ষা করিয়ে নিই। অল্প স্বল্প মদ্যপান করেছিল বলেই কি ক্যানসার হয়েছে? কত লোক তিরিশ চল্লিশ বছর প্রতি সন্ধেয় মদ্যপান করছে, তাদের লিভার যেমন ছিল তেমনই আছে। প্যানক্রিয়াসেও এক ফোঁটা কিছু বদল নেই। জিন খারাপ না হলে এমন হতো না।

প্যানক্রিয়াস ক্যানসার সাধারণত এত আগে কারও ধরা পড়ে না, ছোটদার যত আগে ধরা পড়েছে। কোনও উপসর্গই শুরু হয়নি। প্যানক্রিয়াসের বাইরে খুব কোথাও ক্যানসারটা ছড়ায়নি। তাই আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কারণ হুইপল সার্জারি যখন সাক সেসফুল, নিশ্চয়ই অনেক বছর বেঁচে থাকবে ছোটদা। কত চেনা মানুষ ন্যানসার হওয়ার পরও হেসে খেলে কুড়ি পঁচিশ বছর বেঁচে আছে। ছোটদার বেলাতেও নিশ্চয়ই তাই হবে। কিন্তু তিনমাস কেমোথেরাপি দেওয়ার পর ছোটদা যখন এলো পরীক্ষা করাতে আবার দিল্লিতে, রক্তে ক্যানসার ধরা পড়লো প্রচুর। তার মানে কেমোথেরাপির বিষ পেয়েও কর্কট রোগের ছিটেফোঁটা মরেনি, বরং শরীর জুড়ে আরও তাণ্ডব নৃত্য করেছে। তাহলে অত বড় যে বিলেত ফেরত সমীরণ নন্দী, উনি নিশ্চয়ই হুইপল সার্জারিটা ভালো করে করতে পারেননি। আমি যখন রেগে আগুন, সব ডাক্তারদের খিস্তি করছি, ছোটদা তখন ধীর, শান্ত। কোনও ডাক্তারের বিরুদ্ধে তার কোনও অভিযোগ নেই। কোনও ডাক্তা রই নাকি ভুল চিকিৎসা করেনি। সবই নাকি ছোটদার ভাগ্য। ভাগ্যে আমি বিশ্বাস করি না। কোথাও কোনও ভুল হয়েছে নিশ্চয়ই। ভীষণ ক্রুদ্ধ আমি, সমীরণ নন্দীকে জিজ্ঞেস করলাম, ভুলটা উনিই করেছিলেন কি না। কেউ কি আর ভুল স্বীকার করে। ছোটদা ঢাকায় ফিরে গিয়ে নতুন প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রেডিওথেরাপি নিচ্ছে। জানিনা প্যা নক্রিয়াস ক্যানসারে রেডিওথেরাপি কতটা কাজ করবে। আমার খুব ভয় হয়। এখনও স্কাইপেতে কথা হয়, আগের মতো প্রতিদিন ছোটদা স্কাইপেতে আসতে পারে না। মা ঝেমাঝেই নাকি শরীর খারাপ থাকে। ভয়ে আমি ফোন করি না। ফোন এলে গা কাঁপে। না জানি কী শুনবো! প্রতিদিন সকালে যদি স্কাইপেতে না আসে, তিরতির করে একটা দুশ্চিন্তা মনের কোথাও যেন কাঁপে। দুদিন আগে বললাম, আর দিল্লি বোম্বে না গিয়ে যেন আমেরিকায় যায়, এখানে বড় ক্যানসার হাসপাতালে ডাক্তার দেখায়। বাঁচার জন্য চেষ্টা তো করতেই হবে। জীবন তো একটাই। মাঝে মাঝেই উপদেশ দিই, প্রতিটি মুহূর্তকেই যেন সে গুরুত্ব দেয়। যেন যা তার করতে ইচ্ছে করে, করে। বলি যখন, নিজের কণ্ঠস্বরই নিজের কাছে খুব অদ্ভুত ঠেকে। কেন আমি ভাবছি ছোটদা মরে যাবে শিগগিরই, আর আমি বেঁচে থাকবো অনন্তকাল? আসলে প্রতিটি মুহূর্ত সবার জন্যই মূল্যবান। জীবন সবার কাছে একবারের জন্যই আসে। এই পৃথিবীর পর আর কোনও পৃথিবী নেই, কোনও দোযখ বেহেস্ত নেই, কোথাও আমাদের কোনও যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। একবার মরে গেলে আমাদের কারও সঙ্গে কারওর কোনওদিন আর দেখা হবে না। জীবন সকলেরই অনিশ্চিত। ছোটদা যখন বিছানায় শুয়ে ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, আমরা সবাই উদ্বিগ্ন, বড়দাও, তখন বড়দারই হয়ে গেল একটা ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। মরেও যেতে পারতো। ক্যানসার ভুগিয়ে মারে। হার্ট অ্যাটাক চোখের পলকে মারে।

ছোটদা কী করে এত ধীর, এত স্থির, এত শান্ত থাকতে পারে, জানি না। মাও এমন ছিল। মাকে যদিও আমরা কেউ জানাইনি যে মার ক্যানসার হয়েছিল। মা বুঝেছিল সবই। কোনও অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই, ধরিত্রীর মতো সহিষ্ণ ছিল মা।

মাঝে মাঝে মনে হয় ছোটদা বোধহয় ক্যানসারের আতংককেই, এর সর্বগ্রাস কেই, ক্যানসারের মৃত্যুকেই অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে নিয়েছে। সেই ছোটবেলার মতো, গিটার, গণআন্দোলন, রাজনীতি, প্রেম, গান্ধর্ব বিয়ে, বস্তির ঘর, চিপাঁচস, থিয়েটার, দুশো টাকার চাকরি, বাউণ্ডুলে জীবন, বিমান, রমণীকুলের পল্লবে ডাক, মদ্যপান সবই যেমন ছিল অ্যাডভেঞ্চার! ছোটদার জন্য মায়া হয়, ভীষণ মায়া। এবার যখন এসেছিল দিল্লিতে, আশায় টগবগ করছিল ছোটদা, কিন্তু ডাক্তাররা কোনও আশার কথা শোনালো না। না শোনাক, তারপরও ছোটদাকে নিয়ে ভালো ভালোসিনেমা দেখলাম, ভালো ভালো রেস্তোরাঁয় ভালো ভালো খাবার খেলাম, ছোটবেলার, বড়বেলার গল্প করলাম প্রচুর। থেকে থেকে আমি বিজ্ঞানের কথা পেড়েছি, বিগ-ব্যাঙ, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড, প্রাণীর জন্ম, বিবর্তন, মানুষ। কত শত ঈশ্বরকে মানুষ রচনা করেছে, কত শত ঈশ্বর নির্বংশও হয়ে গেছে। ছোটদা সব মন দিয়ে শুনেছে এবার। মৃত্যুকে দুরকম ভাবে গ্রহণ করা যায়। এক, যাচ্ছি, এ যাওয়া সাময়িক, পরকালে আবার দেখা হবে। দুই, কোনওদিনই আর দেখা হবে না, আর সব প্রাণী যেমন যায়, বাঁদর-শিম্পাজি থেকে বিবর্তিত প্রাণীকেও তেমন যেতে হয়। সহস্র কোটি বছর ধরে প্রাণীজগতে এমনই হচ্ছে। ভালো যে জন্মেছিলাম, কত কিছু তাই জানলাম, দেখলাম, শিখলাম, কন্ট্রিবিউট করলাম। জীবনের অর্থ নেই। কিন্তু সামান্য কিছু হলেও তো অর্থপূর্ণ করতে পেরেছি জীবন! জীবনের ওইটুকুই সার্থকতা।

আমি দ্বিতীয় মতটিকেই সমর্থন করি। দ্বিতীয় মতে আছে সত্যকে বরণ করা, আর প্রথম মতে মিথ্যের আশ্রয়, মৃত্যুকে মেনে নিতে না পারা। মৃত্যুর মতো ভয়ংকর সত্যকে মানুষ মেনে নিতে পারে না বলেই তো স্বর্গ নরকের কল্পনা করেছে।

ছোটদা আর আমি আমার কিশোর বয়সে অচিনপুর নামে একটা উপন্যাস পড়তাম। উপন্যাসের প্রথম লাইনটা ছিল, মরবার পর কী হয়, নবুমামা?একটা আট ন বছর বয়সের ছেলে রাতের পুকুরে নেমে সাঁতার কাটতে থাকা তার নবুমামাকে এই প্রশ্নটি করেছিল। নবুমামা কী উত্তর দিয়েছিল, তা আমার আর মনে নেই। জানি না ছোটদার। মনে আছে কি না।

আমরা যতই বিজ্ঞান বুঝি, যতই তারা ধর্ম বুঝুক, কেউ মরতে চাই না। যতই বলি না কেন, দীর্ঘ যন্ত্রণাময় জীবনের চেয়ে চমৎকার নাতিদীর্ঘ জীবনই ভালো, সবাই আমরা। আসলে বাঁচতে চাই। দুঃখ কষ্টে জীবন ডুবে থাকলেও বাঁচতে চাই বেশির ভাগ মানুষ। অনন্তকাল যদি বাঁচা সম্ভব হতো, অনন্তকালই বাঁচতে চাইতাম। কেন মরবো, মরে কোথায় যাবো? কোথাও না। এই কোথাও না-টা কল্পনা করলে গা শিউরে ওঠে। এক সময় বিজ্ঞান হয়তো এমনই অগ্রসর হবে, যে, মানুষকে আর মরতে হবে না। এখনই তো অনেককিছুর রিসার্চ দেখে অনুমান করা যায়, ভবিষ্যতে মানুষ যতদিন খুশি বেঁচে থাকতে পারবে। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা ভবিষ্যতে জন্মাইনি। বর্তমানে জন্মেছি। নিশ্চয় করে আসলে কিছুই বলা যায় না। আর কুড়ি বছর পর হয়তো গোটা পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে। যেতে পারে পারমাণবিক বোমায়। আর তিরিশ বছর পর হয়তো এসটোরয়েড বা কমেট নেমে পৃথিবীর সব প্রাণীকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে, ডায়নোসরসহ সব প্রাণীকেই যেমন করেছিল ছশ পঞ্চাশ লক্ষ বছর আগে।

যখন চারদিক থেকে কোনও আশার বাণী শুনতে পাচ্ছিল না, ছোটদা এবার একটা কথা বলেছিল দিল্লিতে, সেই কথাটা এখনও বুকে বাজে, হু হু করে ওঠে ভেতরটা, আর বড় মায়া হয়, বড় মায়া হয় ছোটদার জন্য, বলেছিল, মারা যাচ্ছি এটা জানা, আর মারা। যাচ্ছি এটা না জানায় অনেক তফাৎ।

অনেকক্ষণ আমি চুপ হয়ে ছিলাম। হয়তো হঠাৎ করে বড়দা বা আমি মরে যাবো। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে, ছোটদা রয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের মৃত্যুতে এইটুকু সান্ত্বনা যে। আমরা মৃত্যুর আগে প্রতিটি মুহূর্তে জানছি না যে মারা যাচ্ছি। এই যে আমি শরীরের কোনও আনাচ কানাচে ক্যানসার বাসা বাঁধছে কিনা তা জানার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হচ্ছি না, বা টেস্টগুলো করছি না, সে সম্ভবত এ কারণেই যে, যদি ক্যানসার হয় তা জেনে প্রতি মুহূর্তে কষ্ট পাওয়ার, দুশ্চিন্তা কার, হতাশায় ভোগার দরকার নেই। মৃত্যু একবারই আসুক, শতবার নয়, প্রতিদিন নয়।

ছোটদা আরও একটা কথা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, ক্যানসার ধরা পড়ার পর দিনে একশ দুশ লোক ফোন করতো। এখন আর কেউ তেমন ফোন করে না। মনে মনে ভাবি, ক্যানসারের খবরটাই আজকাল মৃত্যুর খবরের মতো। সম্ভবত শোকবার্তাটা তাই প্রথমেই জানিয়ে দেয়।

এত খাচ্ছি, তারপরও ওজন কমছে- ছোটদা একদিন দুঃখ করে বললো। কোনও সান্ত্বনা তাকে দিতে পারিনি। জীবনে এমন কিছু কিছু সময় আসে, যখন ঠিক বোঝা যায় না কী বলবো বা কী বলা উচিত।

এরকম যদি হতো, রেডিওথেরাপি শেষ হওয়ার পর দেখা যেতো ছোটদার ক্যানসার সেলগুলো সব মরে গেছে, আর ফিরে আসবে না ক্যানসার! অন্তত কুড়ি পঁচিশ বছরের মধ্যে তো নয়ই। আমি প্রকৃতির কাছে, অলৌকিকতার কাছে প্রার্থনা করছি, ছোটদা বেঁচে থাকুক। বিপ্লবী ছোটদা, অঘটনঘটনপটিয়সী ছোটদা, অসম্ভবকে সম্ভব করা ছোটদা আরও দীর্ঘ দীর্ঘ বছর বেঁচে থাকুক। উড়ে ঘুরে দৌড়ে বাঁচুক। এভাবে অসুস্থ মানুষের মতো বিছানায় শুয়ে শুয়ে নয়। ছোটদা যা-ইচ্ছে-তাই-করে-বেড়ানোর ছেলে। ছোটদা আরও দীর্ঘ দীর্ঘ বছর যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াক। জীবনকে আরও অর্থপূর্ণ করুক, আলোকিত করুক। আবার গিটারে আগের সেই সুর তুলুক, যে সুরে পুরো শহর এক সময় মোহিত হতো।

ইচ্ছের কথাগুলো বলি একটু একটু করে। বলি, কিন্তু ছোটদার ওই ওজন কমতে থাকা শরীরটির দিকে তাকিয়ে বড় ভয় হতে থাকে। ভয়গুলো কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারি না। বাবা নেই। মা নেই। মার সামনে এই ঘটনা ঘটেনি, একদিক থেকে ভালো। ছোটদাকে খুব ভালোবাসতো মা। দেরিতে-কথা-বলা, দেরিতে-দুধ-ছাড়া ছেলেটি তার বুকের ধন ছিল। ছোটদার ক্যানসার মা কি আর একফোঁটা সইতে পারতো! কেঁদে কেঁদেই হয়তো একদিন মরে যেতো। ভয় হয়, কিন্তু নিজেকে বলি, আমরা নিশ্চয়ই আবার আগের মতো চা খেতে খেতে গল্পের বই পড়বো। আমি পড়বো, ছোটদা শুনবে। আবার নিশ্চয়ই ছোটদাকে নতুন নতুন শহর দেখাতে নিয়ে যাবো। শহরের ইতিহাস বলবো, ছোটদা মন দিয়ে শুনবে। আর ছোটদা যখন তার নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে বসবে, সেসব শুনবো মন দিয়ে, কোনওদিন বলে শেষ হবে না যেসব কাহিনী, ছোটদার অফুরন্ত রোমহর্ষক কাহিনী। আমাদের আর কী আছে স্বপ্ন ছাড়া?

ডায়রি

সেদিন একটা পুরস্কার পেলাম বেলজিয়ামের রয়্যাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স, আর্টস অ্যাণ্ড লিটারেচার থেকে। ওদিকে প্যারিস থেকে একটা ইউনিভার্সাল সিটিজেনশিপ পাসপোর্টও পেলাম।

এই পাসপোর্টটি রীতিমত স্বপ্নের মতো। কখনও হয়তো পৃথিবী এমন হবে, যখন কোনও দেশের সীমানা বা বর্ডার বলে কিছু থাকবে না, পৃথিবীই দেশ হবে সবার। কোনও ভিসা বা পাসপোর্টের দরকার হবে না কারও। যেখানে খুশি যাবার, যেখানে খুশি থাকার স্বাধীনতা থাকবে প্রতিটি মানুষের।

ইওরোপীয় পার্লামেন্ট, বেলজিয়াম সেনেট, রয়্যাল অ্যাকাডেমি, হিউম্যানিস্ট কনফারেন্স, সবখানেই পেয়েছি অভিনন্দন, সম্মান, আর বক্তৃতার পর স্ট্যাণ্ডিং ওভেশন। স্ট্যান্ডিং ওভেশনের বাংলাটা কী? কিছু কিছু শব্দ নিয়ে এত মুশকিলে পড়ি আজকাল। ইংরেজিটার বাংলা জানি না, অথবা বাংলাটার ইংরেজি জানি না। অনেক শব্দ আছে, যেগুলো অন্য ভাষায় ঠিকঠাক অনুবাদ করা যায় না। অভিমান শব্দটাকে আজো আমি ইংরেজিতে বোঝাতে পারি না। স্ট্যাণ্ডিং ওভেশন, আমি লক্ষ্য করেছি, ডাকসাইটে বক্তাদের কারও জুটছে না, কিন্তু আমার জুটছে। এবার বিখ্যাত বিবর্তন-বিষয়ক বিজ্ঞানী ব্লগার পিজি মায়ার্সকে ডাবলিনের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা বলুন তো, আপনারা এত বড় বড় স্পিকার, আপনারা স্ট্যাণ্ডিং ওভেশন পান না, আমি কেন পাই? আমার ভাষা ইংরেজি নয়, স্পিচে প্রচুর গ্রামারের ভুল, তার ওপর ভুল উচ্চারণ, আমাকে কী কারণে স্ট্যাণ্ডিং ওভেশন দেওয়া হয় সবখানে? পিজি বললেন, লোকে উচ্চারণ ভুল আর গ্রামার ভুলকে অত গ্রাহ্য করে না। তোমার স্পিচের সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিস হলো, কনটেন্ট, বিষয়। সেটাই মানুষকে স্পর্শ করে। কী জানি, কনটেন্ট তো আমার মনে হয়, আমার বক্তৃ তার চেয়ে ওঁদের বক্তৃতায় কিছু কম নয়, বরং বেশি। ওঁরা যেভাবে ওঁদের মাতৃভাষা ইংরেজিতে বলতে পারেন, ব্যাখ্যা করতে পারেন, গাদা গাদা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারেন, তার ধারে কাছেও আমি পারি না। ভাষার সীমাবদ্ধতা তো আছেই, মস্তিষ্কও আমার অত ব্যাপক নয়, মেমরিও ভোঁতা। তাহলে কি সম্মানটা পাই নির্বাসন জীবন যাপন করি বলে? পাশ্চাত্যের শিক্ষিত বুদ্ধিমানদের যতদুর আমি জানি, কারও নির্বা সনের সমবেদনায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় না। মঞ্চ থেকে নেমে এলে ঘিরে ধরে আমাকে যারা, তারা কেউ আমার নির্বাসন জীবনের জন্য চোখের জল ফেলছে বলে না। কিছু একটা নিশ্চয়ই আমার মধ্যে তবে আছে। কী সেটা? সততা! নিষ্ঠা। জানি না কী, কিছু একটা হবে।

এই যে বিদেশে সম্মান জোটে, এ কিন্তু দেশের লোকেরা কেউ জানে না। কারণ দেশের কোথাও এসব খবর ছাপা হয় না। আমার একসময় মনে হতো, আমাকে হয়তো ভুলেই গেছে দেশের মানুষ। মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। যে দেশে আমার বই ছাপানো হয় না, পত্রিকায় লেখা ছাপানো হয় না, সে দেশে কতদিন আর মানুষ। মনে রাখতে পারে একজন লেখককে। কিন্তু আমাকে যে একেবারেই ভোলেনি কেউ, তার প্রমাণ পাই, যখন মিডিয়া রীতিমত ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার সম্পর্কে লেখে, এবং লেখাগুলো সশব্দে গোগ্রাসে গেলে পাঠককূল, আমাকে নিয়ে অবশ্য তখনই কিছু লেখা হয়, যখন আমাকে কেউ মারধোর করে, গালাগালি করে, বিদ্রূপ করে, অসম্মান। করে, যখন আমাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়, আমার বই নিষিদ্ধ করা হয়, আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। কিন্তু ভিড় করে মানুষ আমার বই কেনে, বই পড়ে প্রশংসা করে, বই পড়ে অনেকে সচেতন হয়, দেশে না জুটলেও বিদেশে অনেক সম্মান জোটে– এসব খবরের কোনও চিহও উপমহাদেশের কোথাও কিন্তু কখনও দেখা যায় না। হতে পারে বিদেশের মেইনস্ট্রিমের সব ঘটনা দেশি সাংবাদিকদের জানা সম্ভব নয়। কিন্তু জানা যদি সম্ভব হতো? আমার বিশ্বাস, আমার সম্মানের কথা কেউ কোথাও লিখতো না। এর কারণ সম্ভবত এই যে, মিডিয়া দীর্ঘদিন ধরে আমার বিরুদ্ধে লিখে লিখে, দীর্ঘদিন মিথ্যেচার করে করে, শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে মানুষের মধ্যে আমার সম্পর্কে একটা রাগ, একটা ঘূণ তৈরি করতে, এখন আস্ত একটা ঘৃণার। বস্তু হিসেবে আমাকে পরিণত করার পর, তাদের এতদিনের পরিশ্রমের ফসলকে, এই ক্রিয়েশনকে দুএকটা ভালো খবর বা সত্য খবর লিখে নষ্ট করতে পারে না। আর পাঠকও আমাকে ঘৃণা করতে করতে বেড়ে উঠেছে, সেই ডাঙর পাঠককে এখন তো এমন কিছু খাওয়ানো যায় না, যা তার হজম হবে না। প্রশ্ন উঠতে পারে, মিডিয়ার কেন এত দরকার ছিল আমার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগার! নিশ্চয়ই ছিল, এবং এখনও আছে। আমি নাস্তিক বলে, বা ইসলাম এবং ইসলামের আইন নিয়ে মন্দ বলেছি বলে রাগ? সেটা হয়তো কুড়িভাগ, আশিভাগ রাগ পুরুষতন্ত্রের নিন্দা করেছি বলে। অন্তত দেখেশুনে এরকমই আমার ধারণা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজটাকে যে মানুষ পাল্টাতে চাইছে, তাকে এক ফুয়ে ভ্যানিস করে দেওয়ার দরকার সবার। সরকারের, সমাজের, পরিবারের, পুরুষের। মিডিয়া সমাজেরই অংশ। সমাজ যেমন পুরুষতান্ত্রিক, মিডিয়াও পুরুষতান্ত্রিক। আর কোনওভাবে ধ্বংস করা না গেলেও কুৎসা রটিয়ে করা যায়, বিশেষ করে মেয়েদের। এ কথা যে কোনও গাধাও জানে।

অনেকে আমার শত্রু, মৌলবাদীই শুধু নয়, নারীবিদ্বেষী লোকও। এ আমার অজানা নয়। এর জন্য কিছু কি আসে যায় আমার? আমি কি ধর্মীয় মৌলবাদী বা পুরুষতান্ত্রিক মৌলবাদীদের সমর্থন চাই, চাই তারা আমার বন্ধু হোক? আমি কি জানি না তারা আমার বন্ধু হওয়া মানে আমার সর্বনাশ হওয়া। নিজের নীতি আদর্শ বিশ্বাস। জলাঞ্জলি দিয়ে নিশ্চিতই মরে যাওয়া।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীবাদীদের কণ্ঠরোধ করছে আজ থেকে নয়, শুরু হয়েছে। অনেক আগেই। অনেক দেশেই। আজও চলছে। প্রথার বিরুদ্ধে বলে পার পাওয়া অত সোজা, বিশেষ করে নারীবিদ্বেষীদের দেশে? আমার জন্মই হয়েছে অমন দেশে। কিছু যে ভালো মানুষ ছিল না পাশে দাঁড়াবার, তা নয়। ছিল। নির্বাসনের ঝড় এসে আমাকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে সেই মানুষগুলো থেকে। দেশ থেকে নির্বাসিত আজ কুড়ি বছর। এখন দেশ বলতে আমি আর দেশ বুঝিনা। বুঝি কিছু মানুষ। যারা সভ্য শিক্ষিত একটি সমাজের স্বপ্ন দেখে, যারা নারীর পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, যারা সমাজ থেকে পুরুষতন্ত্র, নারীবিদ্বেষ,সমকামঘৃণা ইত্যাদি দূর করতে চায়, রাষ্ট্র আইন-শিক্ষা ব্যবস্থার মাটি কামড়ে পড়ে থাকা ধর্মটিকে সরাতে চায়, যারা সৎ, সাহসী, যারা কুসংস্কারমুক্ত, ঈশ্বরমুক্ত– তারাই আমার সত্যিকার স্বদেশ। তারা যে কোনও রঙের, যে কোনও জাতির, যে কোনও লিঙ্গের, যে কোনও দেশের, যে কোনও ভাষারই মানুষ। এখন গোটা দেশটা, মানে মাটির ওই পিণ্ডটা এনে যদি হাতে দেওয়া হয় আমার, আমি হয়তো দেশটাকে নেবোই না। বরং সেই মানুষগুলোকেই আমি দেশ বলে জানবো যারা ভালোবাসে। যারা ঘৃণার লোক, ঘৃণাই যাদের সম্পদ, তাদের সঙ্গে বাস করে নিজের অকালমৃত্যু ঘটাবো কেন? জীবন কি শতবার আসে? সেই মানুষগুলোকেই দেশ বলে আমি বাকি জীবন মানবো, সুখে দুঃখে, বিপদে দুর্যোগে, যারা পাশে থাকে।

দিল্লির গণধর্ষণ, গণরোষ!

ভারতীয় উপমহাদেশের মেয়েরা এ পর্যন্ত যতটুকু অধিকার অর্জন করেছে, বেশির ভাগই করেছে পুরুষের কারণে। পুরুষেরা মেয়েদের সতীদাহ বন্ধ করার, মেয়েদের ভোট দেওয়ার, বাড়ির বাইরে বের হওয়ার, ইস্কুলে যাওয়ার, চাকরিবাকরি করার অধিকারের পক্ষে নারীবিরোধী সমাজের সঙ্গে লড়াই করেছে। তারপরও কিন্তু ভালো পুরুষের সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা। পথে যে বিরাট বাধার দেওয়াল, তা কিছুটা সরিয়ে সামনে এগোতে পুরুষেরা মেয়েদের সাহায্য করেছে বটে, তবে বেশির ভাগ লোক মেয়েদের ঠেলে দিয়েছে পেছনে। মেয়েদের পেছনে ঠেলার লোকের সংখ্যা বরাবরই বড় বেশি। ভারতবর্ষকে বেশ কয়েক বছর কাছ থেকে দেখছি, যেহেতু এখানে বাস করছি আমি, যেহেতু ভারতবর্ষ ছাড়া এই উপমহাদেশের অন্য কোথাও বাস করার আমার অধিকার লঙ্ঘন করছে গণতন্ত্রে বিশ্বাস-না-করা তথাকথিত গণতা ন্ত্রিক সরকার। উপমহাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘকালীন গণতান্ত্রিক দেশ, শিক্ষায়, সম্পদে সমতায় যে দেশ প্রতিবেশী অন্যান্য দেশ থেকে অনেক এগিয়ে, সে দেশে প্রতি সকালে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে অবাক হয়ে পড়ি ধর্ষণের খবর। নাবালিকা ধর্ষণ তো। আছেই, ধর্ষণের পর ঠাণ্ডা মাথায় খুন। গলা টিপে, গুলি করে, কুপিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে, পাথর ছুঁড়ে পুরুষেরা মেয়েদের মারছে। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি, এসবের কোনও প্রতিবাদ হয় না দেখে। পেঁয়াজ বা পেট্রোলের দামের একটু এদিক ওদিক হলে রাস্তায় হাজার লোক বেরিয়ে পড়ে প্রতিবাদ করতে, আর একশ মেয়ে ধর্ষিতা হলেও একটি মেয়ে বা একটি ছেলেও রাস্তায় নামে না। ধর্ষণের কথা শুনতে শুনতে, ধর্ষণ দেখতে দেখতে, ধর্ষণ এখন ডাল ভাত হয়ে গেছে। কেউ আর ধর্ষণের খবর শুনে আঁতকে ওঠে না। ধর্ষণের খবরেও প্রচার মাধ্যমের লোকদের তেমন আর আগের মতো উৎসাহ নেই। গণধর্ষণ না হলে ওরা আজকাল খবরও করে না। দিল্লির একটি মেয়েকে সেদিন বাসের ভেতর গণধর্ষণ করেছে কিছু লোক, শুধু গণধর্ষণ নয়, আরও ভয়ংকর কিছু, পুরুষাঙ্গ দিয়েই আঘাত করে শান্ত হয়নি, লোহার রড যৌনাঙ্গে ঢুকিয়ে জরায়ু ফুটো করে পেটের নাড়ি ভুড়ি বের করে নিয়ে এসেছে। যৌনাঙ্গে যখন পেটের নাড়ি, তখনও তাদের ধর্ষণ বন্ধ হয়নি। ধর্ষণোল্লাস শেষ হলে প্রায়-মৃত মেয়েকে চলন্ত বাস থেকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। মেয়ে এখনও হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছে। বাঁচার সম্ভাবনা খুব বেশি আছে বলে আমার মনে হয় না।

এই প্রথম মানুষ রাগলো। নাকি জাগলো? জাগরণ কি এত সহজে ঘটে? তবে। এ ঠিক, এই প্রথম হাজার হাজার ছেলে মেয়ে রাস্তায় নেমে মেয়েদের নিরাপত্তার দাবি করলো সরকারের কাছে। ধর্ষকদের ফাঁসি দিতে হবে, এমন দাবিও উঠছে। সরকা রের পক্ষে ফাঁসি দেওয়া তো কোনও অসুবিধের ব্যাপার নয়। ফাঁসিতে ঝুটঝামেলা সবচেয়ে কম। এর চেয়ে সহজ কাজ আর কী আছে! কিন্তু ছেলেরা যেন মেয়েদের যৌনবস্তু হিসেবে না দেখে, শৈশব থেকে যেন মানুষ মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখে, এই ব্যবস্থা করাটা বরং সহজ নয়। এই কঠিন কাজটির দায়িত্বই তো সরকা রকে দেওয়া উচিত।

অবশ্য শৈশবে তোতাপাখির মতো নারী ও পুরুষের অধিকার সমান, নারীকে ছোটজাতের মানুষ ভাবিয়া অবজ্ঞা করিও না, তাহাদিগকে মারিও না, ধর্ষণ করিও না উচ্চারণ করলেই যে তা একেবারে মগজ অবধি পৌঁছবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। পোঁছোলেও বাড়িতে বা বাড়ির বাইরে যখন ক্রমাগত শিশু-কিশোররা দেখতে থাকে যে পুরুষেরা মাতব্বর আর নারীরা নেপথ্যের লোক, তখন এই দেখার অভি জ্ঞতাই তাদের মগজের বাকি কিছুকে সরিয়ে নিজের জায়গা করে নেয়। যৌবনে পতিতা-অভিজ্ঞতা তাদের আরও একটি জ্ঞান মগজে ঢোকায়, মেয়েদের শরীর নিয়ে যা ইচ্ছে তা করা যায়, শিশুকে ধর্ষণ করা যায়। সমাজের খুব বেশি কেউ একে ঠিক অন্যায় বলেও মনে করে না। স্ত্রীর বেলাতেও তাই, স্ত্রীকে ধর্ষণ করা আইনের চোখে অপরাধ হলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে মোটেও অন্যায় কিছু নয়। পণপ্রথা আইনের চোখে নিষিদ্ধ হলেও যেমন সমাজের চোখে নয়। পণপ্রথাই প্রমাণ করে নারী নিতান্তই নিচ, নিরীহ নিম্নলিঙ্গ, নির্বাক জীব, পুরুষকে উৎকোচ দিয়ে পুরুষের ক্রীতদাসী বনা ছাড়া তার আর গতি নেই।

বিবাহিত নারীর শরীরে নানারকম চিহ্ন থাকে জানান দেওয়ার যে সে বিবাহিত, কোনও প্রাণহীন ছবির ফ্রেমে যেমন লাল চিহ্ন দিয়ে লেখা থাকে সোল্ড, মেয়েদের কপালে, সিঁথিতে সিঁদুরের লাল চিহই মেয়েরা যে বিক্রি হয়ে গেছে তা জানান দেওয়ার চিহ্ন। বিবাহিত মেয়েদের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি স্বামীর সম্পত্তি। বিবাহিত স্বামীরা কিন্তু কোনও অর্থেই স্ত্রীর সম্পত্তি নয়। এই সব হাজারো পুরুষতান্ত্রিক প্রথা অক্ষত রেখে এখন যদি মেয়েদের ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়, তাহলে কি ধর্ষণ বন্ধ হবে? এদিকে বলিউডের নিরানব্বই ভাগ ছবিতেই দেখানো হচ্ছে নারী যৌনবস্তু, টেলিভিশনেও একই বার্তা, খবরের কাগজ খুললেই আধন্যাংটো মেয়েদের ছবি, সবখানে মেয়েরা কেবল শরীর, নিভাঁজ নিটোল ত্বক, কেবল স্তন, কেবল যোনী, মস্তিষ্ক হলেও মস্তিষ্ক নয়, দার্শনিক হলেও দার্শনিক নয়, বিজ্ঞানী হলেও বিজ্ঞানী নয়, চিন্তক হলেও চিন্তক নয়, বুদ্ধিজীবী হলেও বুদ্ধিজীবী নয়। পুরুষ তাদের নাগালের মধ্যে পেলে ধর্ষণ করবে না তো বিজ্ঞান আর দর্শন নিয়ে আলোচনা করবে? মেয়েরা ছোট পোশাক পরুক, বা ন্যাংটো হোক, ধর্ষণ করার অধিকার কারও নেই– এ কথা পুরুষেরা জানে না তা নয়, জানে। কিন্তু এও তো তারা জানে যে পুরুষই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্তা। পুরুষের পেশি বেশি, পুরুষের দেমাগ বেশি, পুরুষের সাহস বেশি, পুরুষ ঝুঁকি নিতে পারে বেশি, পুরুষের লজ্জা করা বা ভয় পাওয়া মানায় না, পুরুষেরা বীর, নির্ভীক, পুরুষের ক্ষমতা বেশি, গায়ের জোর বেশি, মনের জোর বেশি, পুরুষেরা পারে না এমন কিছু নেই– জন্মের পর থেকে তো তা-ই জেনে আসছে তারা! এসবই তো অনুক্ষণ শেখানো হয়েছে তাদের। ধর্ষণ করলে, পুরুষ মনে করে, পৌরুষের প্রমাণ দেওয়া হয়। সত্যি বলতে কী, পুরুষতন্ত্র নারীর শরীরকে যত ধর্ষণ করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি করছে মনকে। ধর্ষণ করছে মনের স্বাভাবিক বিকাশকে, মনের জীবনীশক্তিকে, প্রাণকে, প্রাণের উচ্ছ্বাসকে, অসীম সম্ভাবনাকে, স্বপ্নকে, স্বাধীনতাকে। শরীরের ক্ষত শুকিয়ে যায়, মনের ক্ষত শুকোয় না।

শতাব্দীর পর শতাব্দী এমনই ঘটছে। বিবর্তিত হতে হতে চলেছি সব প্রাণীই। ক্রমশ ভালো থেকে আরো-ভালো, আরও-ভালো থেকে আরো-আরো-ভালো অব স্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে মানুষ চলেছে বলেই মানুষ প্রজাতি টিকে আছে। এই প্রজাতিকে, শুধু যৌনাঙ্গ ভিন্ন হওয়ার কারণে, যদি অত্যাচার করতেই থাকে পুরুষেরা, তবে এই দুর্ভাগা মানুষ প্রজাতিই হয়তো একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ধর্ষণের ইচ্ছেকে যদি পুরুষেরা সংযত করতে না চায়, জোর খাঁটিয়ে আনন্দ পাওয়ার অভ্যেসকে যদি বিদেয় করতে না পারে, তবে মানুষের বিবর্তন ভালোর দিকে না এগিয়ে মন্দের দিকে এগোবে। মন্দের দিকে যাওয়া মানে বিলুপ্তির দিকে যাওয়া। হাতে গোণা খুব দুষ্ট কিছু প্রজাতি ছাড়া আর কোনও প্রজাতি নিজের প্রজাতির মেয়েদের দাবিয়ে রাখে না। গণধর্ষণ? মানুষ ছাড়া আর কোনও প্রজাতির চরিত্র এমন বীভৎস নয়।

মানুষ বুদ্ধিমান। বুদ্ধির নিদর্শন অনেক কিছুতে রাখছে। মঙ্গলগ্রহে অবধি মেশিন পাঠিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ছোট্ট এই গ্রহে, সমতায়, সমানাধিকারে, সমমর্মিতায়, সমঝো তায় সুখে আর স্বস্তিতে নারী আর পুরুষের বাস করার পরিবেশ আজও তৈরি করতে পারছে না সে কি বুদ্ধি নেই বলে, নাকি ইচ্ছে নেই বলে? আমার তো মনে হয় ইচ্ছে। নেই বলে। হাঁ বুঝলাম, পুরুষের গায়ের জোর বেশি বলে ধর্ষণ করে। কিন্তু গায়ের জোরে তো আমরা সমাজটা চালাচ্ছি না, রাজ্যটা বা রাষ্ট্রটা চালাচ্ছি না। চালাচ্ছি বুদ্ধির জোরে। পুরুষেরা কি তাদের বুদ্ধি আর চেতনকে, বিবেক আর হৃদয়কে গণধর্ষণ করে বেহুঁশ করে রেখেছে? চেতনার নাড়ি টেনে বের করে ধর্ষণ করছে নিজেদেরই ভবিষ্যৎকে!

সমাজটা তাহলে পাল্টাবে কারা? যাদের হাতে ক্ষমতা, তারা। যারা পুরুষতান্ত্রিক সমাজটা গড়েছে, তারা। যারা ক্ষমতাহীন, যারা অত্যাচারিত, ধর্ষিত, নির্যাতিত, যারা ভূক্তভোগী তাদের আর কতটুকু শক্তি! দিল্লির রাস্তায় ধর্ষণের প্রতিবাদে অত্যাচারি তের উপস্থিতির চেয়ে অত্যাচারী গোষ্ঠীর উপস্থিতি অনেক বেশি দরকারি। অত্যাচারী গোষ্ঠী অত্যাচার বন্ধ করলেই অত্যাচার বন্ধ হবে। শাস্তির ভয়ে বন্ধ করলে অবশ্য সে বন্ধ করা সত্যিকারের বন্ধ করা নয়, বোধোদয় হওয়ার পর বন্ধ করলে সে বন্ধ করা সত্যিকারের বন্ধ করা, চিরস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা সেটিরই বেশি। ভারতবর্ষ বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র, জনসংখ্যা বিচার করলে এই বাক্য অসত্য নয়। কিন্তু গণতন্ত্র শুধু ভোটের ব্যবস্থাই নয়। গণতন্ত্র নারী পুরুষ, ধনী দরিদ্র, সবার জন্য সমানাধি কার আর বাক স্বাধীনতার ব্যবস্থাও বটে। ভারতবর্ষে এ দুটোর কোনওটিই নেই। কেবল ভারতবর্ষ নয়, পুরো উপমহাদেশেরই একই হাল। সত্যিকার গণতন্ত্রে জনগণ নিরাপদে বাস করে। সত্যিকার গণতন্ত্র আনতে মধ্যবিত্তের একাংশের গণরোষ খুব কাজ দেবে কি? কাজ দেবে বিশাল এক গণজাগরণ। উপমহাদেশের রাজনীতি ছলে বলে কৌশলে গণজাগরণ বন্ধ করে রাখে। বৈষম্য দেখতে দেখতে, বৈষম্যের সঙ্গে সহবাস করতে করতে, বৈষম্যেই মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সমতা বা সমানাধিকার ঠিক কাকে বলে, বেশির ভাগ মানুষ জানে না। দুঃখ এই, বেশির ভাগ বঞ্চিতই জানে না তারা বঞ্চিত, লাঞ্ছিতরাই ঠিক বোঝে না তারা লাঞ্ছিত।

আগে জানুক, আগে বুঝুক, তারপর রাস্তায় বেরোক।

দু’চারটে চাওয়া

আমার এই ‘ভালোবাসো? ছাই বাসো’ বইটা খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছোয়নি। তখন ২০০৭ সাল, সরকারের রোষানলের শিকার আমি, আর তখনই আমাকে ভী ষণভাবে অবাক করে দিয়ে আমার এতকালের পুরোনো প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স, বিরানব্বই সাল থেকে যে আমার সব বই প্রকাশ করছে, আমার বই প্রকাশ বন্ধ করে দিল! নিজের চোখ কান কিছুকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। সরকারের বিরোধিতা সওয়া যায়, বন্ধুদের নয়, ঘরের লোকদের নয়। আনাড়ি দু একজন বইটা বের করেছিল। যথারীতি ডিস্ট্রিবিউশনের কায়দা কানুন না জানায়, বই চার দেওয়াল থেকে বেরোতে খুব একটা পারেনি। বইটার একটা কবিতা কী করে হঠাৎ হাতে এলো আজ, পড়ে মনে হল, শোনাই কবিতাটা সবাইকে। সবাই আবার কোথায়, হাতে গোণা কজন যারা আমার মুক্তচিন্তার লেখাগুলো পড়ে!

আমার কাছে এই জীবনের মানে কিন্তু আগাগোড়াই অর্থহীন,
যাপন করার প্রস্তুতি ঠিক নিতে নিতেই ফুরিয়ে যাবে যে-কোনওদিন।
গ্রহটির এই মানবজীবন ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাসে
এক পলকের চমক ছাড়া আর কিছু নয়।
ওই পারেতে স্বর্গ নরক এ বিশ্বাসে।
ধম্মে কম্মে মন দিচ্ছে– কী হয় কী হয়– সারাক্ষণই গুড়গুড়ে সংশয়।

তাদের কথা বাদই দিই সত্য কথা পাড়ি,
খাপ খুলে আজ বের করিই না শখের তরবারি!
মানুষ তার নিজের বোমায় ধ্বংস হবে আজ নয়তো কাল,
জগত টালমাটাল।
আর তাছাড়া কদিন বাদে সূয্যিমামা গ্যাস ফুরিয়ে মরতে গিয়ে
দেখিয়ে দেবে খেলা,
সাঙ্গ হবে মেলা।
জানার পরও ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিঁড়ে কামড়ে তুচ্ছ কিছু বস্তু পাওয়ার লোভ,
ভীষণ রকম পরস্পরে হিংসেহিংসি ক্ষোভ।
মানুষের কই যাবে দুর্ভোগ।
তাকত লাগে ভবিষ্যতের আশা ছুঁড়ে করতে কারও মহানন্দে মুহূর্তকে ভোগ।
ভালোবাসতে শক্তি লাগে, হৃদয় লাগে সবকিছুকেই ভাগ করতে সমান ভাগে,
কজন পারে আনতে রঙিন ইচ্ছেগুলো বাগে?

ভুলে যাস এক মিনিটের নেই ভরসা,
তোর ওই স্যাঁতস্যাঁতে-সব-স্বপ্ন-পোষা কুয়োর ব্যাঙের দশা
দেখে খুব দুঃখ করি, দিনদিনই তোর বাড়ছে তবু দিনরাত্তির কাদাঘাটা।
অরণ্য তুই কেমন করে এত বছর কামড়ে আছিস দেড় দুকাঠা?

ধুচ্ছাই,
সমুদ্দুরে চল তো যাই!

কবিতাটা, মনে আছে, লেখার পর খুব ভালো লেগেছিল। ভালো লাগার প্রধান কারণ ছিল, প্রেম বিরহের বিষয় থেকে বেরিয়ে আসা। একটা মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলাম। প্রেম কবিতার বড় একটা বিষয়, তবে একধরনের শেকলও বটে। কবিতাটা লেখার পর আনন্দের আরও একটি কারণ ছিল, ছন্দ। মাত্রাবৃত্ত আমাকে বড় আনন্দ দেয়। অক্ষরবৃত্ত যদি জীবন যাপন, স্বরবৃত্ত যদি খেলার মাঠ, মাত্রাবৃত্ত তবে প্রেম। আর, বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা? সে উতল হাওয়া। কোনও কিছু লেখার বছর দুতিন পর। এরকম খুব হয় আমার যে সেটি পদ্য হোক কী গদ্য থোক, আর ভালো লাগে না। বিষয় হয়তো ভালো, বিষয় নিয়ে সবসময় খুব বেশি আপত্তি করি না, শুধু প্রকাশ নিয়ে করি। প্রকাশ স্বচ্ছ নয়, স্পর্শ করছে না, বানের জল নেই, তুমুল তুফান নেই, আমি তাই দূরে সরাতে সরাতে যাই পুরোনো প্রাচীন যা কিছু আছে সব। নতুনের। দিকে যেতে চাই প্রতিদিন।

বেশ কয়েক বছর থেকে আমি ভাবছি, কবিতা আর ছোটখাটো নিবন্ধ প্রবন্ধ না হয় আমি লিখতে পারি নানা বিষয় নিয়ে, নিজের অভিজ্ঞতা, দর্শন, উপলব্ধি, ইত্যা দির ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু উপন্যাস কেন বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখিনা। এর কারণ, বিচিত্র বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা নেই। এবার একজন বলেছিলেন, গ্রামের জীবন নিয়ে লেখো। আমি বলেছি, লিখবো কী করে, গ্রামে কোনওদিন যাইনি, থার্কিনি। গ্রাম দেখেছি মূলত ট্রেন থেকে, বা গাড়ি থেকে, আর শহরের গা ঘেঁষে যে গ্রামগুলো, সেখানে সব মিলিয়ে চারপাঁচ বার যে যাওয়া হয়েছে, তাও সামান্য ক্ষণের জন্য। খুব কাছ থেকে গ্রামের মানুষদের জীবন যাপন দেখিনি। বস্তির জীবন? সেও দেখা হয়নি। চোর, বদমাশ, ভিখিরি, নেশাখোর, শ্রমিক, রাজনীতির জগত, বিজনেস পাড়া, বেশ্যা বাড়ি, না, কিছুই কাছ থেকে দেখা হয়নি। ছোটবেলা থেকেই খুব জানতে চাইতাম জগতটাকে। খুব দেখতে চাইতাম, কিন্তু দেখতে দেওয়া হয়নি। মামারা কাকারা দাদারা কিশোর বয়স থেকেই টই টই করে শহর ঘুরতো। কত কোথাও যেত, বন্ধুর বাড়ি, এই পার্ক, ওই মাঠ, সার্কাস, ঘোড়দৌড়, বাজার, দোকানপাট, সিনেমা, থিয়েটার, বন বাদাড়, বস্তি, পুকুরপাড়, নদীর পাড়, এই মেলা, সেই মেলা — কত নানা রকম মানুষের সঙ্গেও মিশতো, কথা বলতো, বন্ধুত্ব করতো– অবাধ স্বাধীনতা ছিল ওদের, ছেলে হওয়ার স্বাধীনতা। আমাদের মেয়েদের তা ছিল না। শুধু ইস্কুল আর বাড়ি, এর বাইরে কোথাও যাওয়া বারণ ছিল। বাবার ওপর খুব রাগ হতো, যেহেতু বাড়ির বাইরেটা, জগতটা বাবা দেখতে দিত না। কিন্তু এখন আর সেই রাগটা হয় না, কারণ মেয়েদের জন্য বাইরেটা খুব খারাপ ছিল। আমিও যদি দাদারা যেভাবে ঘুরতো সেভাবে ঘুরতাম, আমাকে দুদিনেই ছিঁড়ে খেয়ে ফেলতো লোকেরা, অথবা ভীষণ বদনাম হতো আমার। বাবা পায়ের টেংরি ভেঙে চিরকালের জন্য হয়তো ঘরে বসিয়ে রাখতো। বাড়িতে বাবাদের মামাদের দাদাদের বন্ধুরা এলে ভেতরের ঘরে চলে যেতে হতো। মেয়েদের নাকি পুরুষলোকদের আলোচনার মধ্যে থাকতে নেই। ঘরের জীবন খুব চিনি বলে বাইরের অচেনাকে চেনার বড় ইচ্ছে ছিল। মেয়েদের ইস্কুল কলেজে পড়েছি। মেয়েদের সঙ্গেই মিশেছি। ছেলেরা বড় এক রহস্যের মতো ছিল। মেডিক্যাল কলেজে ছেলেরাও পড়েছে আমাদের সঙ্গে, কিন্তু শৈশব কৈশোরে একটা দূরত্ব তৈরী হয়ে গেলে যা হয়, দূরত্বটা বড় হলেও বজায় থাকেই। সমাজটা যদি ছেলেদের মতো মেয়েদের ঘোরাফেশ্রাকে সহজে মেনে নিত, তাহলে মেয়েরা জগত দেখার সুযোগ থেকে এত ভয়ংকরভাবে বঞ্চিত হতো না। আর জুগত খুব খুঁটিয়ে না দেখলে জগত নিয়ে প্রবন্ধ বা পদ্য হয়তো লেখা যেতে পারে, কিন্তু উপন্যাস লেখা যায় না। উপন্যাসে বর্ণনা করতে হয় সব খুঁটিনাটি। জীবন যাপনের সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সবকিছু। আমার উপন্যাসগুলোয়, আমি তাই লক্ষ করেছি বৈচিত্র্য নেই। মধ্যবিত্ত মেয়েদের ঘরের জীবন, তাদের দুঃখ সুখই আমার উপন্যাসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফাঁকি দিতে পারলে বানিয়ে বানিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের, ক্ষেত খামারের, কলকারখানার, জাহাজঘাটের, অথবা অন্য কোনও বিশাল পটভূমি নিয়ে উপন্যাস লিখতে পারতাম। কিন্তু মুশকিল হলো, ওই ফাঁকিটাই আমি দিতে পারি না। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হলে শুধু উপন্যাসে নয়, অন্য লেখাতেও বৈচিত্র্য আসে। জানি কেউ কেউ বলবেন, ঘরের জীবনটা যখন জানি, ঘরের জীবনটাকেই ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলি না কেন। সে চেষ্টা আমি করি, কিন্তু দুঃখটা তো থেকে যায়। চার দেওয়ালের মধ্যে জীবনের বে শিরভাগ সময় কাটিয়ে দেওয়ার দুঃখ। একটা নারীবিদ্বেষী সমাজে জন্ম হলে মেয়েরা জীবনের কত কিছু থেকে যে বঞ্চিত থাকে! ঘরের জীবনটা আমার দাদারা দেখেছে, বাইরের জীবনটাও দেখেছে। আর, আমি আর আমার বোন মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলে শৈশব কৈশোর আর তারুণ্য জুড়ে শুধু ঘরের জীবনটাকেই দেখেছি। আমাদের তো অধিকার আছে সবকিছু দেখার এই পৃথিবীর! নাকি নেই?

শুধু জন্মের সময় শরীরে ছোট একটা পুরুষাঙ্গ ছিল না বলে কত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমার দাদারা পুরুষাঙ্গ নিয়ে জন্মেছে, দুনিয়া দেখেছে, কিন্তু লেখার ক্ষমতা নেই বলে কিছুই লিখতে পারেনি। হয়তো অন্য খাতে খাঁটিয়েছে অভিজ্ঞতা। লেখার হাত থাকলেও অভিজ্ঞতার অভাবে অনেক সময় আমি মন খারাপ করে বসে থাকি। সেদিন খুব ইচ্ছে হয়েছিল কনস্ট্রাকশান ওয়ার্কারদের নিয়ে, ট্রেড ইউনিয়নি স্টদের নিয়ে বড় একটা উপন্যাস লিখি। কিন্তু ওদের জীবন পুরুষ হয়ে বিচরণ করলে যতটা দেখা সম্ভব, মেয়ে হয়ে ততটা সম্ভব নয়। বাইরের পৃথিবীর প্রায় সবখানেই, প্রায় সবজায়গায় মেয়েরা অনাকাঙ্ক্ষিত, অবাঞ্ছিত। যা কিছুই ঘটুক, পুরুষাঙ্গ নিয়ে জন্ম নিইনি বলে আমার কিন্তু দুঃখ হয় না, বরং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। কারণ পুরু ষশাসিত সমাজে ওই ছোট্ট অঙ্গটা থাকা খুব ভয়ংকর, রীতিমত মাথা নষ্ট করে দেয়, নীতিবোধ বলে, বিচারবোধ বলে প্রায় কিছু থাকে না, ভাবার-চিন্তা করার শক্তি লোপ পাইয়ে দেয়, নিজেকে ঈশ্বরের মতো বড় বলে মনে হয়, মুখতা আর মূঢ়তার মুকুট পরেই বসে থাকা হয় কেবল। পুরুষ হয়ে জন্মালে আমি আর দশটা পুরুষের মতো হতাম না এ কথা নিশ্চয় করে কী করে বলবো, নাও যদি হতাম, পুরুষ জাতটা তো আমার জাত হতো, যে জাতের বেশির ভাগই অবিবেচক, কূপমণ্ডুক! হয়তো অনেকে বলবে বেশির ভাগ পুরুষই ভালো, সমানাধিকারে বিশ্বাস করে, শুধু হাতে গোণা কজন পুরুষই করে না। তাই যদি হয়, বেশির ভাগ পুরুষই যদি সমানাধিকারে বিশ্বাস করে, তবে সমাজে সমানাধিকারের আজও দেখা নেই কেন? কে বাধা দেয়? বেশির ভাগ পুরুষই যদি পুরুষতন্ত্র বিরোধী, তবে আজো কেন এত বহাল তবিয়তে, এত জাঁকিয়ে, সমাজ জুড়ে বৈষম্যের মূল অপশক্তি পুরুষতন্ত্র টিকে আছে?

দেশ বলতে ঠিক কী বোঝায়?

দেশ বলতে ঠিক কী বোঝায় সম্ভবত আমি এখন আর জানি না। আজ কুড়ি বছর দেশের বাইরে। আজ কুড়ি বছর নিজের দেশে প্রবেশ করার এবং বাস করার অধিকার আমার নেই। আমার নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করছে, যারাই ক্ষমতায় আসছে, তারাই। আমাকে হেনস্থা করা, অপমান করা, অপদস্থ করা, অসম্মান করা, আমাকে গলা-ধাক্কা দেওয়া, লাথি দেওয়া, ঘরবার করা যত সহজ, তত আর কাউকে যে সহজ নয়, তা ক্ষমতায় যারা বসে থাকে, তারা বেশ ভালো জানে। আমি কি কোনও অন্যায় করেছি, মানুষ খুন করেছি, চুরি ডাকাতি করেছি? কারও কিছু লুট করেছি, কাউকে সর্বস্বান্ত করেছি? না, তা করিনি। রাজনীতি করেছি, নিজের সুবিধে চেয়েছি, লোক ঠকিয়েছি? না, তাও নয়। তবে কী করেছি যে যার শাস্তি চিরকালের নির্বাসন? কী। করেছি যে হাসিনা খালেদা তত্ত্বাবধায়ক– সব সরকারের বেলায় আমাকে আমার নিজের দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না এই একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়? কোনও একটি বিষয়ে, সব রাজনীতিবিদদের কোনও সিদ্ধান্তে কি এমন চমৎকার মিল পাওয়া যায়? কোনও একটি মানুষের বিরুদ্ধে চরম অন্যায় করে কি কোনও সরকার এমন পার পেয়ে যায়? কোনও একটি মানুষের ওপর নির্যাতন হচ্ছে দেখেও দেশের সব মানুষ। কি এমন মুখ বুজে থাকে, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ? এমন অদ্ভুত কাণ্ড সম্ভ বত ইতিহাসে নেই। কোনও লেখকের এত বই কোনও দেশের কোনও সরকার নিষিদ্ধ করেনি। লেখকদের নির্বাসনে পাঠানো হয়, তবে সরকার বদল হলে লেখকেরা আবার ফিরে যায় নিজের দেশে। আমি নিজের দেশে ফিরতে পারি না। কারণ আমার দেশে সরকার বদল হয়, সরকারের বদমাইশি বদল হয়না। আমার দেশের সব সরকার। মনে করে, দেশটা তাদের বাপের সম্পত্তি। সুতরাং তাদের বাপের সম্পত্তিতে পা দেওয়ার কোনও অধিকার আমার নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রী বিদেশে এলে তাঁকে অনেকেই প্রশ্ন করেন, তসলিমাকে কেন দেশে যেতে দিচ্ছেন না? সঙ্গে সঙ্গে তিনি উত্তর দেন, ওর তো দেশে যেতে কোনও বাধা নেই, ও যাচ্ছে না কেন? পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন তিনি মিথ্যে বলছেন। তিনি নিশ্চয়ই ভালো করেই জানেন যে বাংলাদেশের সমস্ত দূতাবাসকে সরকার থেকে কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে যে আমার বাংলাদেশ-পাসপোর্ট যেন নবায়ন করা না হয় এবং আমার ইওরোপের পাসপোর্টে যেন বাংলাদেশের। ভিসা দেওয়া না হয়। বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে দেশের মন্ত্রণালয়ে আমার। পাসপোর্ট নবায়ন করার ভুরি ভুরি দরখাস্ত পাঠানো হয়েছে প্রায় দুযুগ যাবৎ, উত্তরে জুটেছে না অথবা নৈঃশব্দ্য। প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং যাবতীয় সকল মন্ত্রীই জানেন ভ্যালিড পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়া দেশের পথে রওনা হওয়া কোনও জাহাজে বা উড়োজাহাজে উঠতে আমি পারবো না, দেশের মাটিতে পা রাখা তো দূরের কথা। মিথ্যে বলার কী প্রয়োজন! সরাসরি বলেই দিতে পারেন, আমরা ওকে দেশে ঢুকতে দিচ্ছি না, দেবোও না। কারণ আমরা যা খুশি তাই করার লোক। এ নিয়ে বিরোধী দল কোনও প্রশ্ন করবে না, দেশের জনগণও রা-শব্দ করবে না, তবে আর ওর নাগরিক অধিকার নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা কেন হবে।

আমি চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়েছি। ডাক্তারি করেছি দেশের সরকারি হাসপাতাল গুলোয়। ছোটবেলা থেকে লেখালেখির অভ্যেস, তাই ডাক্তারির পাশাপাশি ওটি চালিয়ে গেছি। মানুষের ওপর মানুষের নির্যাতন দেখে কষ্ট পেতাম, মানুষের দুঃখ দুর্দশা ঘোচাতে চাইতাম; লিখতাম– যেন সমাজ থেকে কুসংস্কার আর অন্ধত্ব দূর হয়, মানুষ যেন বিজ্ঞানমনস্ক হয়, আলোকিত হয়, যেন কারোর মনে হিংসে, ঘৃণা, ভয় আর না থাকে, যেন মানুষ মানুষকে সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। লিখেছি, বই প্রচণ্ড জনপ্রিয়ও হয়েছে, কিন্তু জনপ্রিয় বইগুলোই সরকার নিষিদ্ধ করতে শুরু করলো। এক সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্য সরকারও বই নিষিদ্ধ করেছে। নিষেধাজ্ঞা ব্যাপারটি বড় সংক্রামক। একবার নিষিদ্ধ করে যদি দেখা যায় কোনও প্রতিবাদ হচ্ছে না, তখন নিষিদ্ধ করাটা নেশার মতো হয়ে দাঁড়ায়। আমার বইগুলো যেন সরকারের খেলনার মতো| খেলনা নিয়ে যা খুশি করেছে, ভেঙেছে, ছুঁড়েছে, মাস্তি করেছে। খালেদা সরকার লজ্জা নিষিদ্ধ করেছে, লজ্জা ছিল সা ম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একটি মানবিক দলিল। আমার মেয়েবেলা নামের বইটি, যেটি হাসিনা সরকার নিষিদ্ধ করেছে, সেটি বাংলা সাহিত্যের বড় পুরস্কার আনন্দ পুরস্কার ছাড়াও বেশ কিছু বিদেশি পুরস্কার এবং বিস্তর প্রশংসা পেয়েছে। তারপর একে একে আমার আত্মজীবনীর বিভিন্ন খন্ড উতল হাওয়া, ক, সেইসব অন্ধকার নিষিদ্ধ হয়েছে। কেউ আপত্তি করেনি বই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে। নাৎসিরা জার্মানীতে বই পুড়িয়েছিল। সেই বই পোড়ানোর দিনটি এখনও ইতিহাসের কালো একটি দিন। একের পর এক আমার বই নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ সরকার কি সেই বীভৎস নাৎসি দের মতোই আচরণ করেনি। মুশকিল হচ্ছে বেশির ভাগ সরকারই সাহিত্যের কিছু জানে না, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কেও তাদের কোনও জ্ঞান নেই। অথবা আছে জ্ঞান, কিন্তু পরোয়া করে না। জনগণের সেবক গদিতে বসার সুযোগ পেলে শাসক বনে যায়, শোষক বনতেও খুব একটা সময় নেয় না।

পাকিস্তানের মেয়ে মালালা ইউসুফজাই সেদিন ইওরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার পুরস্কার (সাখারভ) পেলো। মালালা সাহসী এবং বুদ্ধিমতী একটি মেয়ে। ওর পুরস্কার পাওয়ায় আমি বেশ খুশি। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমও মালালার পুরস্কার পাওয়ায় এত খুশি যে খবরটার ব্যাপক প্রচার করেছে। মালালা যে সাখারভ পুরস্কারটি এ বছর পেয়েছে, সেই পুরস্কারটিই আমি পেয়েছিলাম ১৯৯৪ সালে। গত কুড়ি বছরে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম কিন্তু একটি অক্ষরও খরচ করেনি। নিজের দেশের মেয়ের পুরস্কার নিয়ে। ফরাসী সরকারের দেওয়া মানবাধিকার পু রস্কার বা সিমোন দ্য বুর্ভেয়ার পুরস্কার, ইউনেস্কো পুরস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্ট রেট– আমার কোনও সম্মান বা পুরস্কার পাওয়ার দিকে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ফিরে তাকায়নি। সবচেয়ে হাস্যকর ঘটনা ঘটায় বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো। আমন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও আজ অবধি কোনও রাষ্ট্রদুত উপস্থিত থাকেননি আমাকে সম্মানিত করার কোনও অনুষ্ঠানে। ইওরোপ আমেরিকা কাউকে বড় কোনও সম্মান দিলে তার দেশের রাষ্ট্রদূতকে আমন্ত্রণ জানায় সম্মান-বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য। এই সেদিন বেলজিয়ামের রয়্যাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স, আর্টস এণ্ড লিটারেচার থেকেও যখন অ্যাকাডেমি পুরস্কার পেয়েছি, অ্যাকাডেমির প্রেসিডেন্ট যথারীতি আমার দেশের রা ষ্ট্রদূতকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যথারীতি রাষ্ট্রদূত অনুপস্থিত। প্রেসিডেন্ট সম্ভবত অনুমান করেছেন রাষ্ট্রদূত লোকটা ছোটলোক। সবচেয়ে বেশি ছোটলোকি করেছিলেন কুড়ি বছর আগে বেলজিয়ামে যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন, তিনি, বিশাল একটা চিঠি লিখেছিলেন ইওরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্টের কাছে, কাকুতি মিনতি করে ছিলেন আমাকে যেন সাখারভ পুরস্কারটি কিছুতেই না দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্ট আমাকে রাষ্ট্রদূতের চিঠিটি পড়তে দিয়েছিলেন, আর ফেরত নেননি। পরদিন ঘটা করে আমাকে সাখারভ পুরস্কার দিয়েছিলেন।

প্রতিবারই যখন সম্মানিত হয়েছি, লজ্জা হয়েছে দেশটির জন্য। আজও হয়। আমার বাবা যখন মৃত্যুশয্যায়, প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে আমি অনেক অনুরোধ করেছি লাম আমাকে যেন অন্তত দুদিনের জন্য হলেও দেশে যেতে দেন তিনি। আমার বাবা কী যে ব্যাকুল ছিলেন আমাকে একটিবার দেখার জন্য। দিনের পর দিন কেঁদেছেন। হাসিনা আমাকে দেননি দেশে যেতে হয় তিনি নিজের বাবা ছাড়া আর কারোর বাবাকে মর্যাদা দেন না, নয় তিনি নিজের বাবাকে সত্যিকার ভালোবাসেন না, বাবা নিয়ে রাজনীতি করতে ভালোবাসেন। নিজের বাবাকে ভালবাসলে কেউ এভাবে অন্যের বাবাকে বঞ্চিত করেন না, বিশেষ করে যখন কোনও বাবা তাঁর কন্যাকে একবার শেষবারের মতো দেখতে চান। কন্যার হাত একবার শেষবারের মতো স্পর্শ করার জন্য মৃত্যুশয্যায় যখন কাঁদেন, তাঁকে কোনও শত্রুও বলে না, না।

জীবনে মৌলবাদীদের অত্যাচার অনেক সয়েছি, ওদের জারি করা ফতোয়া, মামলা, ওদের হরতাল, মিছিল। কিছুই আমাকে এত দুঃখ দেয়নি যত দিয়েছে আমার অসুস্থ বাবার কাছে আমাকে একটিবারের জন্য যেতে না দেওয়ার কুৎসিত সরকারি সিদ্ধান্ত। আমাকে মৌলবাদীরা দেশ থেকে তাড়ায়নি, তাড়িয়েছে সরকার। বাংলাদে শের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের পার্থক্য প্রায় নেই বললেই চলে, বাংলাদেশ থেকে যেভাবে তাড়ানো হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গ থেকেও ঠিক সেভাবেই তাড়ানো হয়েছে, ওই একই কারণে, ধর্মীয় মৌলবাদীদের মুখে হাসি ফোঁটাতে।

কিছু দূরদৃষ্টিহীন স্বার্থপর রাজনীতিকের কারণে আজ আমি নির্বাসিত। একজন আপাদমস্তক বাঙালি লেখকের আজ বাংলায় ঠাঁই নেই। বাংলা ভাষা থেকে সহস্র মাইল দূরে বসে বাংলার মানুষের জন্য আমাকে বাংলা ভাষায় বই লিখতে হচ্ছে। কী জঘন্য, কী নির্মম, কী ভয়ংকর এই শাস্তি! কী অপরাধ আমার? নিজের মত প্রকাশ করেছিলাম বলে, যেহেতু আমার মত কিছু মূর্খ, ধর্মান্ধ, আর নারীবিদ্বেষী লোকের মতের চেয়ে ভিন্ন?

তারপরও ভালোবাসার মরণ হয় না। মা নেই, বাবা নেই। যাঁরা ভালোবাসতেন, তাঁরা কেউ নেই। শামসুর রাহমান নেই, কে এম সোবহান, কবীর চৌধুরী, রশীদ করীম, ওয়াহিদুল হক নেই, দেশটা খাঁ খাঁ করছে। তারপরও দেশের জন্য, দেশে ফেলে আসা সেই নদীটা, সেই ইস্কুলঘরটা, শৈশবের সেই উঠোনটা, খেলার সেই মাঠটা, মার লাগানো সেই কামিনী গাছটা, সেই নারকেল, সেই কামরাঙা, সেই পেয়ারা গাছটার জন্য মন কেমন করে। কেউ নেই, কিছু নেই, সব বদলে গেছে, দেশ আর সেই দেশ নেই, কিন্তু তারপরও দেশ শব্দটা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর একটা কষ্ট টের পাই। এই কষ্টটার আমি কোনও অনুবাদ জানি না।

অনেকে জিজ্ঞেস করে, ইওরোপের নাগরিক হয়েও, আমেরিকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও কেন আমি দিল্লিতে বা ভারতে থাকি। আমি বলি, এখানে থাকি, এখানকার গাছগুলোর নাম জানি বলে। যারা প্রশ্ন করে, জানি না তারা ঠিক বুঝতে পারে কি না কী বলছি। এই শাল, সেগুন গাছ, এই কৃষ্ণচূড়া, এই শিমুল, এই কাঁঠালিচাপা আমি শৈশব থেকে চিনি। এই গাছগুলো যখন দেখি, মনে হয় বুঝি দেশে আছি। হিন্দি আমার ভাষা নয়, কিন্তু এই ভাষাটির ভেতর সংস্কৃত শব্দগুলো বাংলার মতো। শোনায়, সে কারণেই কি ইওরোপ আমেরিকায় না থেকে এখানে থাকি। আর এই যে কদিন পর পরই যমুনার পাড়ে যাচ্ছি, সে কেন? কী আছে ওই নদীটায়। একদিন পাড়ে দাঁড়িয়েই এক চেনা ভদ্রলোককে বলেছিলাম, জানো, আমার দেশেও একটা নদী আছে, নদীটার নাম যমুনা। ভদ্রলোক বললেন, কিন্তু ওই নদী আর এই নদী তো এক নয়। বললাম, তাতে কী! নাম তো এক।

সেদিন দেখলাম দুটো পায়রা উড়ে এসে আমার জানালার ওপারে বসলো, আমার মা যেরকম পায়রা পুষতো, ঠিক সেরকম দুটো পায়রা। তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে জল চলে এসেছিল। সন্ধ্যের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াই। কৈশোরে বেজায় ভালোবাসতাম সেই বেলি ফুলের ঘ্রাণ! ঘ্রাণটা যেদিক থেকে আসছে সেদিকে হেঁটে যাই, ঝাড় জঙ্গল যা কিছু পড়ুক সামনে, হেঁটে যাই। আর, এদিকে আমার বারান্দার টবে পুঁতেছি হাসসুহানার চারা। আমাদের ময়মনসিংহের বাড়িতে ছিল হাসনুহানা। ওর সুঘ্রাণ আমাদের ঘুম পাড়াতো। জানিনা, কী এর নাম! এই বার বার পেছন ফিরে তাকানোর! কী নাম এর। এই কুড়ি বছরে পৃথিবীর পথে অনেক হেঁটেছি। মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি অনেক। যারা ভালোবাসে, যারা আমার মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ায়, আমার নীতি আর আদর্শে বিশ্বাস যাদের, যারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমার মতোই সরব, তাদের আমার দেশ বলে মনে হয়। তারা পাশে থাকলে আমি নিরাপদ বোধ করি। দেশ মানে আমি ভালোবাসা বুঝি, নিরাপত্তা বুঝি। যে দেশ ঘৃণা করে, ছুঁড়ে ফেলে, ভয় দেখায়, সে দেশকে দেশ বলে কেন মনে। হবে! জন্ম দিলেই তো মা হওয়া যায় না, মা হতে গেলে ভালোবাসতে হয় সন্তানকে। দেশ তো কেবল মাটি, নদী, গাছপালা, আর বাড়িঘর নয়। দেশ এসবের চেয়েও আরও বড়, অনেক বড়।

বেঁচে থাকতে সম্ভবত আমার দেশটিকে খুব উদার বা মানবিক হতে দেখবো না, কিন্তু অপেক্ষা করবো এমন দিনের, যেদিন দেশটিকে নিয়ে গর্ব করতে পারি। অপেক্ষা করবো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

 ধর্ষণের জন্য কে দায়ী?

কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের সিপিআইএম (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইণ্ডিয়া, মার্কসবাদী) বিধায়ক ও রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী রেজ্জাক মোল্লা মেয়েদের সম্পর্কে কুৎসিত মন্তব্য করেছেন, শুনে সত্যি বলতে কী, আমি অবাক হইনি। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে স্বভাবচরিত্রে সিপিআইএম খুব আলাদা নয়। সত্যিকার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নারীদের সম্পূর্ণ সমানাধিকার নিশ্চিত। এ সম্পর্কে প্রচুর সিপিআইএম নেতা-সমর্থক দের কোনও ধারণা নেই। রেজ্জাক মোল্লারও নেই বলে তিনি অসমাজতান্ত্রিক, অশ্লীল, এবং অসত্য একটি মন্তব্য করেছেন। এবং করেছেন জামাতে ইসলামি হিন্দএর জমায়েতে। আদর্শগত কারণে কোনও ধর্মীয় দলের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক থাকার কোনও কথা নয়। কিন্তু ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি সত্যিকার কমিউনিজমের আদর্শ থেকে লক্ষ যোজন দূরে।

রেজ্জাক মোল্লা বলেছেন, জিনস আর টপ পরে বেরোলে মেয়েদের নিগ্রহ অনি বার্য, ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির শিকার হলেও তাদের নালিশ করা উচিত নয়, পোশাকই মেয়েদের বিপদ ডেকে আনে। –এই কথাগুলো রেজ্জাক মোল্লার একার কথা নয়, এগুলো প্রায় সব পুরুষের মনের কথা। অন্য পুরুষেরা আজকাল এসব কথা মুখে না বললেও মনে মনে বলে। রেজ্জাক মোল্লার চোখ কান অত খোলা নেই বলে ফস করে বলে ফেলেছেন, জানেন না যে আজকাল ধর্ষণের জন্য ধর্ষিতাকে দায়ী করাটা পলি টিক্যালি ইনকারেক্ট। বহু বছর ধরে নারীবাদীরা পৃথিবীর সর্বত্র সবাইকে বোঝাচ্ছে, এমনকী প্রমাণও দেখাচ্ছে যে, ধর্ষণ নারীর পোশাকের কারণে ঘটে না। ধর্ষণের কারণ: ১. বীভৎস কোনও কাণ্ড ঘটিয়ে পুরুষ তার পৌরুষ প্রমাণ করে, ২. নারীকে নিতান্তই যৌনবস্তু মনে করে পুরুষ। সুতরাং যৌনবস্তুকে ধর্ষণ করা অপরাধ নয় বলেই বিশ্বাস

নারীবাদীদের আন্দোলনের ফলে ধর্ষণের জন্য ধর্ষিতাদের দায়ী করাটা সভ্য এবং শিক্ষিত লোকদের মধ্যে এখন অনেকটা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু যারা এখনও বন্ধ করছে না, তাদের নিশ্চিতই চক্ষুলজ্জা বলতে যে জিনিসটা প্রায় সবার থাকে, নেই। পশ্চিমবঙ্গের অনেকে রেজ্জাক মোল্লার মন্তব্যের প্রতিবাদ করলেও বর্তমান তৃণমূল সরকারের কেউ কোনও প্রতিবাদ করেনি। সম্ভবত আগামী নির্বাচনে ধর্ষকদের ভোট আবার যদি না জোটে, এই ভয়ে।

রেজ্জাক মোল্লা বলেছেন, পুরুষের কুনজর থেকে বাঁচতে মেয়েদের শপিং মলে যাওয়া বন্ধ করা উচিত। রেজ্জাক কিন্তু পুরুষদের উপদেশ দেননি তাদের কুনজর বন্ধ করার জন্য। সম্ভবত এতদিনে তিনি বুঝে গেছেন পুরুষ-জাতটা খারাপ। তো এই খারাপ-জাতকে ভালো করার তাঁর মোটেও ইচ্ছে নেই। বরং ভালো-জাত না রী-জাতকে উপদেশ দিয়েছেন খারাপ-জাত থেকে গা বাঁচিয়ে চলার জন্য। মোল্লার বিবৃতি যত না নারীবিরোধী, তার চেয়ে বেশি পুরুষবিরোধী। তিনি পুরুষদের ভালো মানুষ বলে মনে করেন না। পুরুষেরা নিজের যৌনইচ্ছেকে সংযত করতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তাদের কুনজরকে সুনজর করার কোনও উপায় আছে বলে তিনি মানেন না। পুরুষবিরোধীরা যেমন পুরুষকে শুধুই কামুক, শুধুই লম্পট, শুধুই ধর্ষর্ক, লিঙ্গসর্বস্ব, শুধুই অসৎ, অবিবেচক বলে মনে করে, রেজ্জাক মোল্লাও তেমন মনে করেন। এই পুরুষবিরোধীরাই পুরুষের কুনজর থেকে বাঁচতে মেয়েদের বোরখা পরার উপদেশ দেয়।

খাপ পঞ্চায়েতের মোড়লদের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রেজ্জাক মোল্লার কোনও পার্থক্য নেই। পার্থক্য হিন্দু মুসলমানেও নেই। মেয়েদের অপদস্থ আর অপমান। করতে, মেয়েদের অসম্মান করতে, অত্যাচার নির্যাতন করতে দুই সম্প্রদায়ই সমান পারদর্শী। যখন তাঁর বক্তব্যের নিন্দা হচ্ছে খুব, রেজ্জাক মোল্লা বললেন যে তিনি যা বলেছেন মুসলমান মেয়েদের সম্পর্কে বলেছেন, অমুসলমান মেয়েদের সম্পর্কে কিছুই বলেননি। বেফাঁস মন্তব্য করে, বেগতিক দেখে, এখন নিজের ধর্মের গুহায় আশ্রয় নিয়েছেন। ধর্মের গুহা সবসময়ই খুব নিরাপদ কি না। মুসলমান মেয়েদের সম্পর্কে বলেছেন কারণ নিশ্চয়ই তিনি মনে করেন মুসলমান মেয়েদের নিয়ে যা কিছু মন্তব্য করার অধিকার তাঁর আছে। আজ তাদের সালোয়ার কামিজ পরার উপদেশ দিচ্ছেন, কাল তাদের বোরখা পরার উপদেশ দেবেন। অর্ধেক আকাশকে কালো মেঘে ঢেকে দিতে তাঁর কোনও আপত্তি নেই।

সিপিআইএম-এর চরিত্র বলে এখন আর কিছু নেই। আমার মতো একজন ধর্ম মুক্ত মানববাদী লেখককে রাজ্য থেকে দূর দূর করে যারা তাড়াতে পারে, তারা ধর্মীয় মৌলবাদীদের সঙ্গে একই সুরে কথা বলবে, অবাক হওয়ার কী আছে! মেয়েদের যৌন হেনস্থার জন্য মেয়েদের পোশাককে দায়ি করা মানে মেয়েদের পছন্দ মতো কাপড় চোপড় পরার স্বাধীনতাকে ধর্ষণ করা। সত্যি কথা বলতে, সেদিন রেজ্জাক মোল্লা মেয়েদের স্বাধীনতা আর অধিকারকে জনসমক্ষে ধর্ষণ করেছেন।

নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার অভিযানে নেমে রেজ্জাক মোল্লা বলছেন, এখন যারা প্যান্ট-গেঞ্জি-টপ পরছে তারা গোল্লায় যাক। আপনারা সালোয়ারের উপরে উঠবেন না। এই বিষয়গুলি টেনে না ধরলে বিপদ। আমরা বাড়ির দুই মেয়ের একজন ডবলিউবিসিএস এবং একজন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। তাদের দুজনকে সালোয়ার কামিজের মধ্যে ধরে রেখেছি। তিনি তাঁর কন্যাদের সালোয়ার-কামিজের মধ্য ধরে রেখেছেন, এর মানে তাঁর কন্যাদের অধিকার নেই তাদের পছন্দের পোশাক পরার। কারণ তিনি মেয়েদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। পুরুষ সিদ্ধান্ত নেবে মেয়েরা কী পোশাক পরবে। এসব বলে কমিউনিস্ট নেতা আরও স্পষ্ট করলেন যে তিনি নিজ বাসভূমে এক উৎকট পিতৃতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র বহাল রেখেছেন। এ কম লজ্জার নয়। তার ওপর আবার কতটুকু নির্লজ্জ হলে রাজ্যের বা দেশের মেয়েরা কী পোশাক পরবে, তা নির্ধারণ করতে নামেন। কোন পোশাক শালীন, কোন পোশাক শালীন নয় তাও বেশ ঘোষণা করে দেন। মেয়েদের বেলায় শুধু শালীনতা অশালীনতার প্রশ্ন ওঠে কেন! তিনি তো কোনও পুরুষের কোন পোশাক শালীন, কোন পোশাক অশালীন তা বলেন না! তাঁর বাড়ির বা পাড়ার পুরুষেরা খালি গায়ে লুঙ্গি বা গামছা পরে তার চোখের সামনে প্রতিদিন হাঁটাহাঁটি করে না। তিনি নিজেও নিশ্চয়ই করেন। কখনও কি মনে হয়েছে লুঙ্গি শালীন পোশাক নয়, খালি গা শালীন নয়, গামছা পরা অশ্লীল? যে কারণে একটি মেয়ের জিনসকে তিনি অশালীন বলছেন, সে কারণে একটি ছেলের জিনসকে তিনি অশালীন বলছেন না কেন? যে কারণে একটি মেয়ের টিসার্টঅশালীন, সে কারণে একটি ছেলের টি শার্ট কেন অশালীন নয়? শালীনতার সংজ্ঞা তৈরি করার দায়িত্বটি কার? পুরুষের? রেজ্জাক মোল্লাদের?

আধুনিক পোশাকের বদলে রবীন্দ্র-যুগের ঠাকুরবাড়ির পোশাকের পক্ষপাতী রেজ্জাক মোল্লা। বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের আমলে যে ড্রেস-কোড ছিল তা সঠিক বলে মনে করি। রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে মেয়েরা শাড়ির সঙ্গে লম্বা হাতের ব্লাউজ পরতেন, কেউ কেউ মাথায় ঘোমটাও দিতেন। সেই পোশাকই রেজ্জাক চাইছেন এখনকার মেয়েরা পরুক। আধুনিক মেয়েরা ফিরে যাক উনবিংশ শতাব্দীর পোশাকে।

শাড়ির প্রতি হিন্দু হোক মুসলিম হোক, পশ্চিমবঙ্গের সব রক্ষণশীল মানুষেরই পক্ষপাত। ইস্কুলের শিক্ষিকাদের কদিন পর পরই ড্রেস কোড দেওয়া হয়, সালোয়ার কামিজ চলবে না, সবাইকে শাড়ি পরতে হবে। অশালীন বলতে যদি শরীরের ত্বক প্রকাশ হওয়াকে বোঝানো হয়, তবে শাড়ি সবচেয়ে অশালীন পোশাক। এবং সবচেয়ে শালীন পোশাক প্যান্ট-সার্ট। শাড়ি পরে দৌড়ঝাঁপ করা, দৌড়ে বাসে ট্রামে ট্রেনে ওঠা ঝামেলা, শাড়িতে টান পড়লে শাড়ি খুলে পড়বে। শাড়ি ভারতীয় উপমহাদেশের আদি পোশাক। আমাদের পূর্বনারীরা যখন শাড়ি পরতেন, তখন কিন্তু সঙ্গে সায়া-ব্লাউজ পরতেন না। সে নিশ্চয়ই অশালীনতার চূড়ান্ত। সবকিছুর বিবর্তন হয়, কাপড় চোপ ড়েরও। বিবর্তনে যাদের বিশ্বাস নেই, তারা হাতের কাছে যা পায়, তা-ই আঁকড়ে ধরে, তা নিয়েই অনন্তকাল কাটিয়ে দিতে চায়।

রেজ্জাকের বক্তব্য, লেখাপড়া করা মানে প্যান্ট-টপ পরতে হবে এমন নয়, আপনারা শপিং মলের মতো জায়গায় যাবেন না। কমিউনিস্ট নেতা মৌলবাদী নেতার মতো কথা বলছেন, মেয়েরা কী পরবে না, কোথায় যাবে না, তা বলে দিচ্ছেন। এর অন্যথা হলে বিপদ হবে, তারও হুমকি দিচ্ছেন। মেয়েদের শুধু পুরুষের সম্পত্তি নয়, এই সমাজেরও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে বিশ্বাস করা হয়। সে কারণে সমাজের লোকেরা একটা মেয়ে কী পরলো, কী করলো, কোথায় গেল, কী খেলো, কার সঙ্গে কথা বললো, কার সঙ্গে শুলো, কখন বাড়ি ফিরলো এসবের খবরাখবর রাখে। লক্ষ্মণ রেখা পেরোলেই সর্বনাশ। সমাজের লোকেরাই সিদ্ধান্ত নেবে মেয়েকে একঘরে করতে হবে নাকি পাথর ছুঁড়ে মারতে হবে। মেয়েদের শরীরকে অর্থাৎ মেয়েদের যৌনতাকে শেকল দিয়ে বেঁধে ফেলার আরেক নাম পুরুষতন্ত্র। এই শেকল যতদিন না ভাঙা হবে, ততদিন মেয়েদের সত্যিকার মুক্তি নেই, ততদিন তাদের পোশাক আশাক আর তাদের চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকবে। রেজ্জাক মোল্লা আমাদের এই পুরুষতা ন্ত্রিক নারীবিরোধী সমাজের যোগ্য প্রতিনিধি। তিনি আজ পুরুষদের একরকম আহ্বা নই জানালেন টপ জিনস পরা মেয়েদের ধর্ষণ করার জন্য। বলেছেন টপ জিনস পরা ধর্ষিতারা যেন ধর্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না করে, কারণ ধর্ষিতারা নিজেদের ধর্ষণের জন্য দায়ী, ধর্ষকরা নয়। এখন পঙ্গপালের মতো পুরুষেরা নেমে পড়বে রাস্তা-ঘাটে ঘরে-বাইরে শপিং মলে, নির্দ্বিধায় নিশ্চিন্তে মেয়েদের ধর্ষণ করবে। রাজনীতির হর্তা কর্তাদের সম্মতি পেলে কে বসে থাকে।

মুর্খ রাজনীতিবিদরা সমাজকে যত নষ্ট করে, তত নষ্ট সম্ভবত ধর্ষকরাও করে না। ধর্ষকদের দোষ দিয়ে ধর্ষণের মূল কারণকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়। ধর্ষক হয়ে কেউ জন্মায় না। এই পুরুষতন্ত্র, পিতৃতন্ত্র, সমাজের কুশিক্ষা, ভুল-শিক্ষা, নারী-বিদ্বেষ, নারী-ঘৃণা পুরুষকে ধর্ষক বানায়। ধর্ষিতাকে দোষ দিয়ে ধর্ষণ বন্ধ করা যায় না। ধর্ষ ককে ফাঁসি দিয়েও ধর্ষণ বন্ধ করা যায় না। ধর্ষণের মূল কারণগুলোকে নির্মূল করতে পারলেই ধর্ষণ বন্ধ হবে।

শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, বাংলাদেশেও একই অবস্থা। বাংলাদেশের সমাজেও রেজ্জাক মোল্লাদের অভাব নেই। এঁরা শিক্ষিত পরিবারের শিক্ষিত লোক। কিন্তু মেয়েদের যৌ নবস্তু ছাড়া আর কিছু ভাবতে এরা পারেন না। নারীবাদীদের শত বছরের আন্দোল নের ফলে পৃথিবীতে নারী-শিক্ষা শুরু হয়েছে, নারীরা ভোটের অধিকার পেয়েছে, বাইরে বেরোবার এবং স্বনির্ভর হওয়ার অধিকার পেয়েছে, কিন্তু এই অধিকারই সব নয়, নারীর যে অধিকারটি নেই এবং যে অধিকারটি সবচেয়ে মূল্যবান, সেটি নারীর শরীরের ওপর নারীর অধিকার। নারীর শরীরকে সমাজের এবং পরিবারের দাসত্ব থেকে মুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। নারীর শরীর কোনও সমাজের সম্পত্তি, বা কোনও পরিবারের সম্মানের বস্তু নয়। যতদিন নারী তার শরীরের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা না পাচ্ছে, নারীর শরীর নিয়ে নারী কী করবে, সেই সিদ্ধান্ত নারীর না হবে, যতদিন এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পুরুষের, আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের, ততদিন নারীর সত্যিকার মুক্তি সম্ভব নয়। আর যতদিন এই মুক্তি সম্ভব নয়, ততদিন নারীর পরিচয় পুরুষের ভোগের বস্তু হয়েই থাকবে– ঘরে, পতিতালয়ে, রাস্তায়, অফিসে, বাসে, ট্রেনে সবখানে। ভোগের বস্তু নারীকে ভাবা হয় বলেই যৌন হেনস্থা বা ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ ঘটাতে পুরুষের কোনও অসুবিধে হয় না। পুরুষাঙ্গ মেয়েদের ধর্ষণ করে না, ধর্ষণ করে ঘৃণ্য পুরুষিক মানসিকতা। পুরুষাঙ্গ নিতান্তই একটা ক্ষুদ্র নিরীহ অঙ্গ। পুরুষিক মানসিকতা দূর করলে পুরুষেরা নারীকে যৌনবস্তু হিসেবে না দেখে একই প্রজাতির সহযাত্রী স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে দেখবে। পুরুষের যৌনইচ্ছের চেয়ে নারীর যৌনইচ্ছে কিছু কম নয়। নারী যদি নিজের যৌনইচ্ছে সংযত করতে পারে, পুরুষের বিনা অনুমতিতে পুরুষকে স্পর্শ না করে থাকতে পারে, পুরুষ কেন পারবে না, পুরুষ কেন চাইলে নারীর বিনা অনুমতিতে নারীকে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে না! মানুষ মাত্রই এই ইচ্ছেকে সংযত করতে পারে, কিন্তু ধর্ষকদের মধ্যে সংযত করার এই চেষ্টাটা নেই, কারণ ধর্ষকদের মস্তিষ্কের গভীরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শিক্ষাটা অনেক আগেই ঢুকে গেছে যে নারী যৌনবস্তু আর পুরুষের অধিকার আছে যখন খুশি যেভাবে খুশি যৌনবস্তুকে ভোগ করা। কিন্তু কে কাকে বোঝাবে যে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক যদি খাদ্য ও খাদকের বা শিকার ও শিকারীর হয়, তবে এ কোনও সুস্থ সম্পর্ক নয়। কোনও বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে কখনও সুস্থ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না। নারী তার সমানাধিকার না পাওয়া পর্যন্ত নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনও সত্যিকার সুস্থ সম্পর্ক গড়ে উঠবে না। সমানাধিকার কে দেবে নারীকে? যারা ছিনিয়ে নিয়েছে, তাদের দায়িত্ব নারীর অধিকার নারীকে ভালোয় ভালোয় ফিরিয়ে দেওয়া।

নাবালিকা ধর্ষণ

তেরো বছর বয়স। মেয়ে ইস্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে চাইছে না। কাঁদছে। কেন কাঁদছে? বাড়িতে দুবছর হল প্রতিদিন তাকে ধর্ষণ কছে তার বাবা, দাদা আর দুই কাকা। এ তো সবে সেদিন ঘটলো, কেরালায়। গতবছর ওই রাজ্যেই ধরা পড়েছিল এক লোক, যে তার ষোলো বছরের কন্যাকে নিজে তো ধর্ষণ করেইছে, একশ লোককে দিয়েও ধর্ষণ করিয়েছে। এমন কোনও দেশ নেই, সমাজ নেই, যেখানে পিতৃদেবের শিশু-ধর্ষণ কস্মিনকালেও ঘটে না। জরিপে দেখা যায়, শিশু-ধর্ষণের সত্তরভাগই ঘটায় পরিবারের পুরুষ, নিকটাত্মীয়। দ্বিতীয় কাতারে আছে চেনা, মুখচেনা, পাড়াতুতো কাকা-জ্যাঠা ঠাকুরদা। অচেনা লোক ধর্ষণ করে, কিন্তু খুব কম। মনে পড়ে আমেরিকার লেখক জেন। স্মাইলির উপন্যাসটির কথা, A Thousand Acres! বাবার ছিল তিন কন্যার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক! কন্যা তেরোয় পড়লে শুরু করতো সম্পর্ক, ষোলো হলে রেহাই দিত, দিয়ে ষোলোর চেয়ে কম বয়সী কন্যর দিকে হাত বাড়াতো। রক্ষকরা কী যে অনায়াসে ভক্ষক বনে যেতে পারে। ঘরে পিতা ধর্ষণ করছে, বাইরে পুলিশ ধর্ষণ করছে। মেয়েদের জন্য সম্ভবত নিরাপত্তা এখন আর অধিকার নয়, নেহাতই লাক্সারি।

বালিকা বা সাবালিকা বা নাবালিকা সব ধর্ষণই জঘন্য। বালক-ধর্ষণও ইয়াক থু। আজকাল যারা ধর্ষণ করে তারা ধর্ষণ করাটা অন্যায় জেনেই ধর্ষণ করে। মানুষ যত সভ্য হয়েছে, ধর্ষণের সংজ্ঞা তত পাল্টেছে। একসময় ধর্ষণকে কোনও অপরা ধই বলে মনে করা হত না। শিশুর সঙ্গে বয়স্কদের যৌনসম্পর্কও ছিল খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আদিকালে ঘরে ঘরে বাল্যবিবাহ হত। অত আদিতে যাওয়ারও প্রয়োজন নেই। আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই তো ন বছর বয়সী শিশুকে বিয়ে করেছিলেন। রাজস্থানে ধুমধাম করে প্রতিবছরই বাল্যবিবাহ হচ্ছে। কার সাধ্য বন্ধ করে? শিশু-সঙ্গমে আর শিশু-ধর্ষণে মূলত কোনও পার্থক্য নেই। শরীরে যৌনতার বোধ শুরু না হতেই, নিতা ন্তই কৌতূহলে বা বাধ্য হয়ে শিশুরা সঙ্গমে রাজি হতেই পারে, কিন্তু সে রাজি হওয়া সত্যিকার রাজি হওয়া নয়।

শিশু-পর্নো নিষিদ্ধ প্রায় সব সভ্য দেশে। শিশু-পর্নোর চাহিদা কিন্তু সব দেশেই প্রচণ্ড। শিশুদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, শিশুরা যন্ত্রণায় কাঁদবে, তা নয় হাসছে। একটা নকল হাসি ঝুলে আছে শিশুদের ঠোঁটে। এসব পর্নো-ছবি দেখে শিশু-ধর্ষণ করার শখ হয় পুরুষের। শিশু-ধর্ষণে ইওরোপ পিছিয়ে আছে, কিন্তু আমেরিকা আর এশিয়া অতটা পিছিয়ে নেই, দক্ষিণ-আফ্রিকায় এটি মহামারির আকার ধারণ করায় এখন সবার ওপরে আফ্রিকা।

চৌদ্দ বছরের কম বয়সী, ঋতুবতী হয়নি এমন মেয়েদের প্রতি যাদের যৌন আক স্বর্ণ, তারা মানসিক রোগী– এ কথা ভিয়েনার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রিচার্ড ক্রাফুএবিং বলেছিলেন ১৮৮৬ সালে। তারপর নানা দেশের নানা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নানা সময়ে ক্রাইএবিংএর মতকে সমর্থন করেছেন। দুরকম শিশু ধর্ষক দুনিয়ায়। প্রথম রকম হল, সত্যিকারের শিশু ধর্ষক, শিশু ছাড়া আর কারও জন্য তাদের কোনও যৌন আকর্ষণ নেই। আরেক রকম ধর্ষকরা শিশু আর প্রাপ্তবয়স্ক দুজনের প্রতিই যৌন আকর্ষণ বোধ করে, যখন যাকে হাতের কাছে পায়, তখন তাকে দিয়েই কাজ চালায়। এরা ধাক্কা খেলে বা থেরাপি পেলে সোজা হয়ে যায়। তবে সত্যিকারের শিশু-ধর্ষককে সুস্থ করা সহজ নয়, তার চেয়ে ওদের মাথার খুলি খুলে মস্তিষ্কের আনাচকানাচে লুকিয়ে থাকা দুশ কিড়ে বার করা সহজ। নাহ, বাড়িয়ে বললাম, আসলে প্রজেস্টারন হরমোন গিলিয়ে পিডোফাইলদের যৌন আকাঙ্ক্ষার বারোটা বাজানো এমন কোনও কঠিন কাজ নয়।

১২ বছর বয়সী এক মেয়েকে এক পাল পুরুষ বীভৎসভাবে ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলেছে। –এই খবরটি ভারতীয় উপমহাদেশের নানা বয়সের, নানা শ্রেণীর অর্ধলক্ষ লোককে জানাবার পর শতকরা সত্তর ভাগ বলল, পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলো। বাইশ ভাগবলল, মৃত্যুদণ্ড দাও। আট ভাগ ইনিয়ে বিনিয়ে নানা কথা বললো, what about teh menz?, পুরুষদেরও তো মেয়েরা ধর্ষণ করে, তার বেলা?, মেয়েটা নিশ্চয়ই পুরুষদের প্রভোক করার জন্য গায়ে কিছু পরেছিল, বা কিছু মেখেছিল। এদের। কাছে ধর্ষণের সমাধান মূলত দুটো মেরে ফেলো, বা কেটে ফেলো। এ দুটো শাস্তি ধর্ষকদের দিলেই নাকি নাবালিকা ধর্ষণের ইতি ঘটে। ইতি তো ঘটেইনি, বরং আকাশ ছুঁয়েছে। ধনঞ্জয়ের ফাঁসি হওয়ার পর পর ধর্ষণ বেড়ে গিয়েছিল, মনে নেই?

যে সব দেশে নাবালিকা বা শিশু-ধর্ষণ সবচেয়ে কম, সেসব দেশে পুরুষাঙ্গ কর্তন বা মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি নেই। তবে সেসব দেশে মেয়েদের মর্যাদা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। মেয়েদের স্বাধীনতা এবং অধিকার সেসব দেশে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি, সেসব দেশে মেয়েরা শিক্ষিত, মেয়েরা স্বনির্ভর, সংরক্ষিত আসনের সুযোগ ছাড়াই সংসদ সদস্যের পঞ্চাশ ভাগই মেয়ে।

নাবালিকা-সাবালিকা সব ধর্ষণই বহাল তবিয়তে চলে সেসব দেশে, যেসব দেশের বেশির ভাগ পুরুষ মেয়েদের ভোগের বস্তু, দাসী-বাঁদি, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র, বুদ্ধি শুদ্ধিহীন প্রাণী, নিচুজাতের জীব ইত্যাদি হিসেবে বিচার করে; যেসব দেশে পতিতালয় গিজগিজ করছে, শত শত বাচ্চা-মেয়েকে যৌনপাচারের শিকার করা হচ্ছে; যৌন হেনস্থা, ধর্ষণ, স্বামীর অত্যাচার, পণের অত্যাচার, পণ অনাদায়ে খুন– এই দুর্ঘটনাগু লো প্রতিদিন ঘটছে, ঘটেই চলছে।

ধর্ষণ আর যা কিছুই হোক, যৌন সঙ্গম নয়। ধর্ষণ কেউ যৌন-ক্ষুধা মেটানোর জন্য করে না। প্রায় সব ধর্ষকেরই স্থায়ী যৌনসঙ্গী আছে। ধর্ষণ নিতান্তই পেশির জোর, পুরুষের জোর, আর পুরুষাঙ্গের জোর। মোদ্দা কথা, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের পরম পূজনীয় পুরুষাঙ্গের ন্যাড়া মাথায় মুকুট পরানো বা বিজয় নিশান ওড়ানোর আরেক নাম ধর্ষণ।

ধষর্ণ বন্ধ হবে কবে অথবা কী করলে ধর্ষণ বন্ধ হবে? এই প্রশ্নটির সবচেয়ে ভালো উত্তর, যেদিন পুরুষ ধর্ষণ করা বন্ধ করবে, সেদিনই বন্ধ হবে ধর্ষণ। কবে কখন বন্ধ করবে, সে সম্পূর্ণই পুরুষের ব্যাপার। সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিক যে এই দিন থেকে বা এই সপ্তাহ থেকে বা এই মাস থেকে বা এই বছর থেকে নিজের প্রজাতির ওপর ভয়াবহ বীভৎস এইসব নির্যাতন তারা আর করবে না।

পিডোফাইল বা শিশু-ধর্ষক মানসিক রোগী। ওদের মানসিক হাসপাতালে চিকিৎ সার ব্যবস্থা করো। আর বাদবাকিদের আগাপস্তলা সংশোধন করার চেষ্টা করো। কী কারণে নাবালিকা ধর্ষণ করেছে, তার কারণ বার করো, সেই কারণকে নির্মূল করো। আর এদিকে সরকারবাবু তুমি যে মেয়েদের নিতান্তই যৌনবস্তু মনে করছো না, তার প্রমাণ দাও। প্রসটিটিউশান বন্ধ করো, জানোই তো যে প্রতিদিনই ওখানে অগুণতি শিশু ধর্ষিত হচ্ছে। শিশু-পর্নো বন্ধ করো, যেহেতু এসব পর্নো লোককে শিশু-ধর্ষণে উদ্বুদ্ধ করে। রাস্তাঘাটে অফিসে আদালতে দোকান পাটে মেয়েদের যৌন হয়রানি বন্ধ করো, বাল্যবিবাহ বন্ধ করো, পণপ্রথা বন্ধ করো, জাতপাত বন্ধ করো, মেয়েদের শিক্ষিত করো, স্বনির্ভর করো। ইস্কুলের শুরু থেকেইনারীপুরুষের সমানাধিকারের শিক্ষা সব শিশুকে দাও, দিতে থাকে। শিশুরা ভালো শিক্ষা আর ভালো পরিবেশ পেলে মানুষ ভালো হয়। ধর্ষকদের জীবন-কাহিনী ঘাঁটলে দেখা যায় বেশির ভাগেরই বিচ্ছিরি একটা শৈশব ছিল, ভালো শিক্ষা দীক্ষা বলতে কিছুই ছিল না, মারামারি দেখতে দেখতে, ঘৃণা দেখতে দেখতে, পৌরুষিক পাষণ্ডতা দেখতে দেখতে বড় হয়েছে। এগুলোই শিখেছে। শেখা সহজ, না-শেখা সহজ নয়। শিখে ফেলা তন্ত্র-মন্ত্ৰ-পুরুষতন্ত্র আর নারীবিরোধী। কুসংস্কারগুলো যে করেই হোক না-শেখা বা আনলার্ন এর ট্র্যাশনে ফেলতে হবে।

দেশকে ধর্ষণমুক্ত করতে গেলে সরকারকে প্রচুর কাজ করতে হয়। প্রচুর পরি শ্রম। তার চেয়ে ধর্ষককে ফাঁসি দেওয়ার মতো সহজ কাজ আর কিছু নেই। জনগণও খুশি হয়। তখনকার মতো সব সমস্যাকে চমৎকার ধামাচাপা দেওয়া যায়। সরকার এভাবেই মানুষকে বোকা বানায়। মানুষ বুদ্ধিমান হয়ে গেলে বেজায় মুশকিল। তখন যে কাজগুলো করলে সমাজের সত্যিকার ভালো হয়, সে কাজগুলোর দাবি সরাসরি সরকারের কাছে করে বসবে বুদ্ধিমান মানুষেরা। ওদের দাবি মেনে সমাজকে সবার জন্য নিরাপদ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে ভোট জোটানোর মতলব আঁটবে কে? একে ল্যাং মারা, ওকে দেশছাড়া করা, গণ্ডা গণ্ডা গুণ্ডা পোষা আর যুগের পর যুগ গদিতে বসে থাকার ফন্দি আঁটার সময় কোথায় তখন সরকারের?

নিষিদ্ধ

তার লেখা, তার ভাবনা, তার সবকিছুকে তো নিষিদ্ধ করেছেই, গোটা মানুষটাকেই নিষিদ্ধ করেছে এই উপমহাদেশ। আমি আমার কথা বলছি। আমার মনে হয় না পৃথিবীতে আর কোনও লেখক এমন আছে, যার সৃষ্টিকে শুধু নয়, তাকেও গোটা সমাজ আর গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা এমন প্রবলভাবে অস্বীকার করেছে। লেখক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী সবাই চোখ বুজে থাকেন, কান বন্ধ করে রাখেন, মুখে কুলুপ এঁটে রাখেন, যখন আমার বিরুদ্ধে সরকার কোনও অন্যায় সিদ্ধান্ত নেয়। এ দেখে আসছি আজ কুড়ি বছর। বাংলাদেশ থেকে একজন জনপ্রিয় নারীবাদী লেখককে যখন তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, দেশের সব লোক চুপচাপ উপভোগ করেছিল সেই জঘন্য অন্যায়। কেউ কোনও কথা বলেনি। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা আর প্রকাশনী সংস্থা যারা আমার লেখা ছাপানোর জন্য উন্মাদ ছিল, তারাও আমার নাম নিমেষে বাতিলের খাতায় লিখে ফেললো। সরকারের অন্যায়ে সেদিন জনগণ তাদের পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল। নীরবতাকে আমি সমর্থন বলেই মনে করি। সরকারের বদল হল, নতুন সরকার যে কিনা আগের সরকারের পান থেকে চুন খসলেই চুলির মুঠি ধরে গালাগালি করতো, সেই সরকারও আগের সরকারের অন্য কিছুর সঙ্গে নয়, শুধু তসলিমা বিরোধী। যাবতীয় অনৈতিক এবং বেআইনী সিদ্ধান্তর সঙ্গে একমত হলো। বাংলাদেশে একের পর এক আমার বই নিষিদ্ধ হয়েছে, মুক্ত চিন্তক বলে বড়াই করা মানুষেরা চুপ করে। থেকেছে। বাংলাদেশে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না আজ কুড়ি বছর, মানবাধিকারের জন্য লড়াই করা সৈন্য সামন্তও কোনও দিন এ নিয়ে একটি প্রশ্ন পর্যন্ত করেনি। তসলিমার বিরুদ্ধে যে কোনও অন্যায়ই, যে কোনও অবিচারই, যে কোনও নোংরামোই, যে কোনও মিথ্যেই, যে কোনও ঘৃণ্য পদক্ষেপই সমাজের সকল স্তরের, সকল মানের, সকল ক্ষেত্রের লোকেরা নিঃশব্দে মেনে নেয়। শুধু নিজের দেশে নয়, পাশের দেশেও আমি ব্রাত্য। ভারতও বারবার প্রমাণ করছে, বাংলাদেশের মতো ভারতও ডুবে আছে। একই অন্ধকারে, আর কিছুর ক্ষেত্রে না হলেও অন্তত আমার ক্ষেত্রে। কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমার লেখা একটি মেগাসিরিয়াল টিভিতে সম্প্রচার হওয়ার আগেই বন্ধ করে দিয়েছে। উনিশে ডিসেম্বর মহাসমারোহে মেগাসিরিয়ালটি দেখানো হবে। পুরো পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে মেগাসিরিয়ালের বিজ্ঞাপন, টিভিতে খানিক বাদে বাদেই বলা হচ্ছে মেগাসিরিয়াল প্রচারের কথা। মূলত অত্যাচারিত নিপীড়িত মেয়েদের সং গ্রামের কাহিনীই আমি লিখেছি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এতকাল পর সাহসী মেয়েদের গল্প সিরিয়ালে দেখবে বলে। কিন্তু টিভি চ্যানেলে আচমকা চড়াও হলো পুলিশ, হুমকি দিল, সিরিয়াল দেখানো চলবে না। কেন চলবে না, গণ্ডগোল হতে পারে, আগুন জ্বলতে পারে। এই সিরিয়ালটি ক খ গ ঘ ঙদের লেখা হলে আপত্তি ছিল না, আপত্তি গল্প নিয়ে নয়, গল্পের প্রধান চরিত্রে কলকাতার তিনটে হিন্দু মেয়ে যারা পণপ্রথা, শিশুপাচার, ধর্ষণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াই করে। আপত্তি লেখকের নাম নিয়ে। সিরিয়ালের সুটিং কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছিল, কোটি টাকা খরচ করেছে চ্যানেল, আর এ কিনা দেখানো চলবে না কারণ সিরিয়ালের লেখক তসলিমা বলে! তসলিমা নামটি এখন ভারতের ভোট ব্যাংক রাজনীতির কাজে যখন তখন ব্যবহৃত হয়। ব্যবহার করে ভারতের সব রাজনৈতিক দল। সব দলই গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে তসলিমা নাসরিন নামের মানুষটিকে থাপ্পর দাও ঘুষি দাও লাথি দাও, তাহলে ভোট পাবে অজ্ঞ অশিক্ষিত মুসলমানদের। রাজনীতিকরা বুঝে গেছেন, তসলিমার পক্ষে উপমহাদেশের কোনও রাজনৈতিক দল নেই, কোনও লেখক-বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী নেই, কোনও মানবাধিকার বা নারী অধিকার গোষ্ঠী নেই– একে যা ইচ্ছে তাই করো, এর বই নিষিদ্ধ করো, এর টিভি সিরিয়াল বন্ধ করো, একে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দাও, এর বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার মামলা করো, একে দেশ থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করো, একে বিষ খাইয়ে মারো, এর বিরুদ্ধে বস্তা বস্তা মিথ্যে বলো, কেউ কোনও টু শব্দ করবে না। জনগণ বসে বসে উপভোগ করবে একজন লেখকের ওপর, শুধু একজন লেখকের ওপরই ঘটতে থাকা জঘন্য অন্যায় অত্যাচার। এই যে এত বড় একটা মেগা সিরিয়াল যে সিরিয়ালটি এক দশকের চেয়েও বেশি সময় চলতে পারতো, পুরো মাফিয়া কায়দায় বন্ধ করে দিল পশ্চিমবঙ্গের সরকার, তা চোখের সামনে দেখেও পশ্চিমবঙ্গের শুধু নয়, পুরো ভারতেরই সমস্ত মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক দল চুপ। গণতন্ত্রের আর বাক স্বা ধীনতার বিরুদ্ধে এত নোংরা আঘাত কে কবে দেখেছে! সময় সুযোগ মতো ইসলামী মৌলবাদীদের ঘাড়ে দোষ চাপাতে সরকারের জুড়ি নেই। তসলিমাকে তারা যাতাঁকলে পিষবে, দোষটা ফেলবে মুসলিম মৌলবাদীদের ওপর। হিন্দু রাজনীতিকরা নিরীহ তসলিমা আর এক পাল মুখ মৌলবাদীদের নিয়ে খুব সহজেই এই খেলাটা খেলেন। তসলিমার গায়ে কারা কবে ইসলাম বিরোধী তকমা লাগিয়েছিল, সেই তকমাটিই এখন তাঁদের অস্ত্র। তসলিমা নারীর অধিকারের পক্ষে, বা মানবাধিকারের সমর্থনে কী বলছে, সেটি দেখার বিষয় নয় আর, তসলিমা তার মানববাদী লেখালেখির জন্য কত পুরস্কার পেলো সারা বিশ্বে, সেটিও বিষয় নয়, তসলিমা ইসলাম-বিরোধী লেখা লিখেছে, সুতরাং মুসলমানরা তসলিমার বই ছাপা হোক চায় না, বইয়ের উদ্বোধন হোক চায় না, তসলিমা এ রাজ্যে থাকুক্ষ চায় না– এসব বলে অর্থাৎ মুসলমানের দোহাই দিয়ে মুসলমান গোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিকে বাঁচানোর ভাব দেখিয়ে সরকার আমার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে, আমার বই নিষিদ্ধ করে, কলকাতা বইমেলায় আমার বইয়ের উদ্বোধন বন্ধ করে দেয়, আমার লেখা ছাপালে কোনও পত্রিকাই আর সরকারি বিজ্ঞাপন পাবে না এই হুমকি দেয়, আমার সিরিয়াল দেখালে টিভি চ্যানেলে আগুন জ্বলবে বলে শাসিয়ে যায়। ভারতের মুসলিম মৌলবাদীদের কেউ জিজ্ঞেস করুক, আমার বই পড়েছে কি না। না, তারা কেউ আমার বই পড়েনি। আমার কোন বইয়ের কোন বাক্য তাদের অনুভূতিকে আঘাত করেছে, দেখাতে বলুক কেউ। না, তারা দেখাতে পারবে না, কারণ তারা জানে না আমি কোথায় কী লিখেছি। মৌলবা দীরা সাহিত্যের, সমাজ পরিবর্তনের, মানবাধিকারের, নারী স্বাধীনতার বই পড়ে না। পড়লে ওরা মৌলবাদী হতো না। ওরা শুধু শুনেছে আর্মি ইসলাম ধ্বংস করে দিয়েছি। কার কাছে শুনেছে, কে বলেছে তাও তারা ঠিক বলতে পারবে না। আসলে তারাই সবচেয়ে বড় ইসলাম বিরোধী যারা মনে করে ইসলাম এতই ভঙ্গুর আর এতই দুর্বল। যে কারও লেখায় বা কথায় ইসলাম ধ্বংস হয়ে যায়।

কলকাতার মুসলিম মৌলবাদীরা জানেও না কী গল্প নিয়ে আমার সিরিয়াল, সর কারের আদর আর আসকারা পেয়ে তারাও ক্যামেরার সামনে বাক স্বাধীনতা বিরোধী আর নারী বিরোধী অগণতান্ত্রিক কথা বলতে দ্বিধা করে না। কোনও ধর্মীয় মৌলবাদীই মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। রাজনীতিকরা ভোটের জন্য মানুষ খুনও করতে পারে। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের এই নীরবতার কারণ কী? হিন্দু মৌলবাদীরা অন্যায় করলে তাঁরা তো ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রতিবাদ করতে। এম এফ হোসেনকে হেনস্থা করার বিরুদ্ধে কোন বুদ্ধিজীবী লেখেননি বা প্রতিবাদ করেননি? এমনকী মুসলিম মৌলবাদী রা কোনও অন্যায় দাবি জানালেও একেবারেই যে মুখ বুজে থাকেন তা নয়। সালমান রুশদির বিরুদ্ধে কেউ কিছু উচ্চারণ করুক, কোনও লেখক বুদ্ধিজীবী মুখ বুজে থাকবেন না। সালমান রুশদি সাহিত্যের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন, আমিও পেয়েছি। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার আনন্দ একবার নয়, দুবার পেয়েছি। সঙ্গে আছে। অজস্র মানবাধিকার পুরস্কার। পাহক তাহলে কেন? সালমান রুশদি ইংরেজীতে লেখেন বলে, ধনী বলে, পাশ্চাত্যে বাস করেন বলে? তাকে দুরের নক্ষত্র বলে মনে হয় বলে! নাকি সালমান রুশদি পুরুষ বলে, পুরুষতন্ত্রের সমালোচনা করেন না বলে, নারীবাদী নন বলে, সমাজ বদলানোর জন্য অঙ্গীকার করেননি বলে? কিছু তো একটা হবেই। তা না হলে তাঁর ওপর আক্রমণ হলে ভারতের বিদ্বজ্জন প্রতিবাদে মুখর, আমার বেলায় নীরব কেন? সেদিন উত্তর প্রদেশের সরকার আমার বিরুদ্ধে একটা মামলা করে বসলো। কেন? কার কী ক্ষতি আমি করেছি? আমি দোষী, কারণ আমি। লিখেছি যে ফতোয়াবাজরা লেখকের মাথার দাম ঘোষণা করে, তারা বাক স্বাধীন তায় বিশ্বাস করে না। এই সত্য কথাটি লেখার জন্য আমার আট বছরের জেল হতে পারে। আমাকে এখন নিজেকে বাঁচাতে আদালতে দৌড়োতে হচ্ছে।

মুসলিম মৌলবাদীরা দোষ দিচ্ছে আমি ইসলাম ধ্বংস করেছি। পুরুষতন্ত্রের ধারক বাহকরা বলছে আমি সমাজের ঐতিহ্য নষ্ট করেছি, অর্থাৎ পুরুষতন্ত্রের সর্বনাশ করেছি। ধর্ম আর পুরুষতন্ত্র টিকিয়ে রাখার মাতব্বররাই সমাজের মাতব্বর, তাদের বাণিজ্যে কেউ ফাটল ধরানোর চেষ্টা করলে তাকে কি কেউ আর জ্যান্ত রাখবে? আমাকে হত্যা করার জন্য শুধু মৌলবাদীরা নয়, অসৎ রাজনীতিকরাও, নষ্ট রাজ নীতির ছাতার তলায় বাস করা নষ্ট বুদ্ধিজীবীরাও, স্বার্থান্ধ লেখকরাও ওত পেতে থাকেন।

একা একজন মানুষের সততা, সাহস, আদর্শ আর বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিকট শক্তি। মুক্তবুদ্ধির মানুষেরা ভবিষ্যতে হয়তো খুঁড়ে বের করবে উপমহাদেশে ঘটে যাওয়া কলঙ্কের এই ইতিহাস। তারা হয়তো পাশে দাঁড়াবে আমার। আমি আর তখন একা থাকবো না, এখন যেমন একা। সেই ভবিষ্যতে আমি বেঁচে না থাকলেও আমি বেঁচে থাকবো। অন্তত এইটুকুই আজ আমার সান্ত্বনা। এই স্বার্থান্ধ। অসুস্থ অকৃতজ্ঞ সমাজ থেকে আমি আর কিছু আশাও করি না।

পঞ্চাশ!

কাল একটা পত্রিকা থেকে একজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করে পঞ্চাশ হওয়ার পর জীবন কেমন বোধ হচ্ছে জানতে চাইলেন। পঞ্চাশ নিয়েই একটা স্টোরি লিখছেন কাগজে। নিজেই বললেন, আগে বলা হত, চল্লিশে জীবন শুরু হয়, এখন বলা হয় পঞ্চাশে জীবন শুরু হয়। আপনিও নিশ্চয়ই তাই মনে করেন?

আমি জানি ওপাশ থেকে হ্যাঁ উত্তরের আশা নিয়ে বসেছিলেন সাংবাদিক। আমার না শুনে বেশ অবাক হলেন। তাঁর চমকানোর শব্দও যেন ফোনে পাওয়া গেল। আমি যা বললাম তা হল, পঞ্চাশের পর জীবন শুরু হয়, এ নিতান্তই বয়স হওয়ার ফলে যে একটা চরম হতাশা আসে, সেটার সান্ত্বনা। পঞ্চাশে বরং জীবন শেষ হওয়ার শুরু। মানুষের গড় আয়ু খুব বেশি নয়। অনেক কচ্ছপও আমাদের চেয়ে বেশি বাঁচে। খুব সৌভাগ্যবান হলে আশি বা তার ওপরে বাঁচে মানুষ, তা না হলে পঞ্চাশ থেকেই সা ধারণত কঠিন অসুখগুলো ধরতে শুরু করে। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যানসার। আমার পরিবারে আছে হাই ব্লাড প্রেশার, ডায়বেটিস, মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, কিডনি ফেইলুর, ক্যানসার। আমাকে এর মধ্যেই হাই ব্লাড প্রেশারে ধরেছে, আর সেদিন। ডেঙ্গু বয়ে আনলো হাই ব্লাড সুগার। এ দুটোর টেনশন তো আছেই, তার ওপর আছে। শরীরের কোথাও আবার ক্যানসার হচ্ছে না তো চুপচাপ?– এই দুশ্চিন্তা। কয়েক মাস আগে আমার ছোটদার প্যানক্রিয়াস ক্যানসার ধরা পড়েছে। ওর বানসার সত্যি বলতে কী ভীষণ ভয় পাইয়ে দিয়েছে আমাকে। মার হয়েছিল ক্যানসার, ছোটদার হলো, তাহলে কি আমারও হবে ওই রোগ! আমারও জিনে ঘাপটি মেরে আছে কোনও মন্সটার? মা বেঁচেছিলেন সাতান্ন বছর বয়স অবধি, বাবা মারা গেলেন সাতষট্টি বছর বয়সে। দাদার একটা ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল ষাটে পা দিয়ে। আমাদের বেঁচে থাকা ওই পঞ্চাশ ষাটের খুব বেশি ওপরে যাবে না। তারপরও ভেবেছিলাম, একবার জেনোম সিকোয়ান্সিং করবো। কোটি টাকার ব্যাপার। জেনোম সিকোয়েন্সিং করবো শুনে এক বন্ধু বললো, মরার হাজার রকম কারণ থাকতে পারে, শুধু কি আর জেনেটিক ডিজিজে লোকে মরে! অ্যাকসিডেন্টে মরছে না মানুষ। তা ঠিক। এত আকাশে আকাশে উড়ি, কবে যে প্লেন ক্রাশ করবে কে জানে! ওই সিকোয়েন্সিংএর উৎসাহ তারপর আর পাইনি। সব ক্যানসারই তো জেনেটিক নয়, আমার মার আর ছোটদার ক্যানসার জেনেটিক বলে অনেক ডাক্তারই মনে করেন না। মনে না করলেও নিজের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে সেদিন লিভার হাসপাতালে গিয়ে কোলনোস্কপি করে এলাম। কোলন। ঠিক আছে। কোলন ঠিক আছে কিন্তু অন্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো ঠিক আছে কিনা কে বলবে, কিন্তু ওই প্রতি অঙ্গের টেস্ট করতে দৌড়োবো, এত উদ্যম আমার নেই। এমনিতে আমি ডাক্তারের কাছে যাওয়ার লোক নই। যত পারা যায়, ডাক্তার এড়িয়ে চলি। সারা বছর কেবল যাবো যাবো করি, যাই না। নিজে ডাক্তার বলে, সম্ভবত এই হয়, ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে অত কাঠখড় পোড়াতে ইচ্ছে করে না। অ্যাপোয়েন্টমেন্ট নাও, যাও, টাকা দাও, লাইনে দাঁড়াও, অপেক্ষা করো। ডাক্তার হওয়ার সুবাদে ওই টাকা দেওয়াটা বা অপেক্ষা করাটা থেকে বেঁচে যেতাম সবসময়। ওসব আগে কখনও করতে হয়নি। এখনও করতে ইচ্ছে করে না। আর রোগ দেখতে গিয়ে আমার সঙ্গে এদেশের কোনও ডাক্তার তো ডাক্তারী ভাষায় কথা বলেন না। আমি বরং ডাক্তারী ভাষায় প্রশ্ন ঐশ্ন করলে ডাক্তাররা ভাবেন, আমি সম্ভবত বেজায় শিক্ষিত কোনও রোগী, অথবা ইন্টারনেটে রোগ শোক সম্পর্কে পড়ে জ্ঞান অর্জন করেছি। নিজে ডাক্তার, এ কথাটামুখ ফুটে কাউকে বলি না। আজ কুড়ি বছর ডাক্তারি করি না। অত বছর ডাক্তারি না করলো নিজেকে ডাক্তার বলতে অস্বস্তি হয়। এদিকে ডাক্তার তো দিয়েই যাচ্ছেন অ্যাডভাইজ, হাঁটাটা যেন হয়। ওই আধঘন্টা হাঁটার কথা ভাবলেই শরীরে আলসেমির চাদর জড়াই। এই অঞ্চলে হাঁটতে বড় অনিচ্ছে আমার। ইওরোপ আমেরিকায় কিন্তু এই অনিচ্ছেটা হয় না। পরিবেশ খুব বড় একটাব্যাপার বটে। জীবন যে কোনও সময় ফুরোবে, এই সত্যটা আগের চেয়ে এখন বেশি ভাবি বলেই, পজিটিভ একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করছি, আমি আগের মতো সময় নষ্ট করি না। টুয়েনটিজ আর থার্টিজ গর্দভের মতো সময় প্রচুর নষ্ট করেছি। তখনও এই বোধোদয়টা হয়নি যে সময় কম জীবনের। জানতাম, কিন্তু সে জ্ঞানটাকে আমি থিওরিটিক্যাল জ্ঞান বলবো। সত্যিকার বোধোদয় হওয়ার জন্য ওই বয়সে পা দেওয়া চাই। চল্লিশেও যে খুব হয়েছিল বোধোদয়, তা বলবো না। পঞ্চাশে এসে হঠাৎ যেন নড়ে চড়ে বসেছি। প্রচুর পড়ছি, লিখছি। আজে বাজে কাজে সময় নষ্ট করি না। এমনকি রাতের ওই সাত আট ঘণ্টার ঘুমটাকেও অহেতুক আর সময় নষ্ট বলে মনে হয়। খুব লাইকমাইণ্ডেড এবং ইন্টারেস্টিং লোক না হলে কারও সঙ্গে আড্ডাও আজকাল আর দিই না। আর কিছুদিন পর ভাবছি একা বেরিয়ে পড়বো পৃথিবীর পথে। যে দেশগুলো দেখা হয়নি, অথচ দেখার খুব ইচ্ছে, দেখবো। জীবনকে অর্থপূর্ণ যতটা করতে পারি, করবো। জীবনকে যতটা সমৃদ্ধ করতে পারি, করবো। সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, সাজি কি না আগের চেয়ে বেশি।

এরও উত্তর আশা করেছিলেন, হ্যাঁ বলবো। আমি বললাম, আগেও আমি কখনও বেশি সাজগোজ করিনি, এখনও না। পঞ্চাশে এসে সাজগোজ বাড়িয়ে দেব কেন, আমি কি অস্বীকার করতে চাইছি যে আমার পঞ্চাশ? রিংকল বেড়েছে বটে, তবে ভয়ংকর কিছু নয়। আর হলেও ক্ষতিটা কী শুনি? শরীরই কি আমার সম্পদ যে এর রিংকল টিংকলগুলো লুকিয়ে রেখে কচি খুকি ভাব দেখাবো? অস্বীকার করি না, গ্রে হেয়ার। এ যে কোত্থেকে এলো জানি না, সাতান্ন বছর বয়সেও আমার মার একটিও চুল পাকেনি। পঁচাশি বছর বয়সেও আমার নানির চুল অতি সামান্যই পেকেছে। আমার বাবার চুল আমি চিরকাল মিশমিশে কালোই দেখেছি। আমার ছোটদার চুল পাকেনি বললেই চলে। তবে দাদার চুল নাকি সেই তার চল্লিশ বছর বয়সেই পেকে একেবারে পুরো সাদা। আমার চুল পাকার জিনটা আর দাদার ওই চুল পাকার জিনটা একই জিন, নিশ্চয়ই ইনহেরিট করেছি কোনও আত্মীয় থেকে। জানিনা কার থেকে। এই অকালপক্কতাকে মাঝে মাঝে কালো বা সোনালি করি। একসময় যখন দাদার মতো পুরো সাদা হয়ে উঠবে সব চুল, তখন ভাবছি অ্যাণ্ডারসন কুপার বা অমিতাভ ঘোষের মতো চুলে আর হাত দেবো না। চুল পাকার সঙ্গে বেশ বুঝি যে বয়সের কোনও সম্পর্ক নেই। আমাদের পরিবারে বয়স বাড়াবার একটা প্রবণতা আছে। আমার বাবা যে তাঁর ষাট বছর বয়স থেকে নিজের বয়স আশি বছর বলতে শুরু করেছিলেন, যতদিন বেঁচে ছিলেন আশিই বলেছেন। আমার দাদা তো প্লাস বলবেই তার বয়স বলতে গেলে। বত্রিশ প্লাস, ফরটি সিক্স প্লাস, ফিফটি টু প্লাস। প্লাসটা দিতে হয়না, দরকার নেই, এসব বলেও আমি লক্ষ করেছি দাদা প্লাসটা কিছুতেই মাইনাস করতে পারে না। দাদার ওই ছোটবেলা থেকেই মনে হতো, বেশি বয়স হলে সমাজে সম্মানটা একটু বেশি পাওয়া যায়। সম্মান পাওয়ার জন্য দাদার বরাবরই বড় শখ। সে যুগে বাবারা ছেলেমেয়েদের বয়স একটু কমিয়ে বলতেন। ইস্কুলে। কিন্তু আমার বাবা বলে কথা, বয়স সবারই এক দু বছর বাড়িয়ে দিয়েছিলেন মাধ্যমিক পরীক্ষার দরখাস্তে। অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন, অল্প বয়স বলে বিয়েটা যদি আবার না দেওয়া হয়, নিজের বয়স কয়েক বছর বাড়িয়ে বলেছিলেন, সেই যে বয়স বাড়াতে শুরু করেছিলেন, বয়স বাড়ানোর রোগটা বাবার আর যায়নি। নিজের তো বা ড়িয়েছিলেন, নিজের ছেলেমেয়েদের বয়সও বাড়িয়েছিলেন। ইস্কুলে কিন্তু আমাকে পাঁচ বছর বয়স হলে পাঠান নি। তিন বছর বয়স হতেই চ্যাংদোলা করে ক্লাস থ্রিতে নিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন। আমারও ফট করে বয়স বলে দেওয়ার স্বভাব আছে। তবে দাদার। মতো ওই প্লাসটা বলি না আমি। ওই যে লোকে বলে, মেয়েরা বয়স বলে না, কথাটা তো ঠিক নয়। বরং আমার পরিবারের বাইরের পুরুষদের আমি কখনও বয়স বলতে শুনিনি, কখনও বললেও দুতিন বছর কমিয়ে বলেছে। আসলে পঞ্চাশ হলেও পঞ্চাশ। যে হয়েছে, এটা শরীরে মোটেও অনুভব করি না, সে কারণেই সম্ভবত বিশ্বাস হয়না যে পঞ্চাশ হয়েছে। শরীরের অনুভুতিগুলো আগের মতোই আছে। এর কারণ, জানি না, মেনোপজ এখন অবধি না হওয়ার কারণে কি না। মেয়েরা যত বয়স বাড়ে তত সাহসী হয়, ছেলেরা যত বয়স বাড়ে তত ভীরু হয়। মেয়েরা যৌবনে সাতপাঁচ ভাবে, এগোবে কী এগোবে না ভাবে, ছেলেরা ডেয়ারিং যৌবনে, যত যৌবন ফুরোতে থাকে, তত একশ একটা দ্বিধা আর ভয় আর সাত পাঁচ ভাবার মধ্যে খাবি খেতে থাকে। টুয়েনটিজএ সেক্স নিয়ে বড় সংকোচ ছিল আমার, থার্টিজেও ছিল। চল্লিশের পর থেকে সেই সংকোচটা ধীরে ধীরে দূর হয়েছে। হরমোন টরমোন ফুরিয়ে গেলে কী রকম অনুভব করবো জানি না। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর যা কিছু বাড়ে, সেগুলো তো দুদ্দাড় উপভোগ করে যাবো, যেমন অভিজ্ঞতা বাড়া, বুদ্ধি বাড়া, বিচক্ষণতা বাড়া, ব্ল্যাক এণ্ড হোয়াইটে না দেখাটা বাড়া, কমপ্লেক্সিটি বোঝার ক্ষমতা বাড়া, জীবন সম্পর্কে জ্ঞানটা বাড়া। চূড়ান্ত ভালো দিকটা এখন হাতের মুঠোয়। তবে সঙ্গে নিগেটিভ যে জিনিসটা আছে, সে হলো আমি সাভান্ত নই, মনে রাখার ক্ষমতা আগের চেয়ে কম।

ভুলে যাওয়াটা আগের চেয়ে, লক্ষ্য করেছি বেশি। পনেরো বছর বয়সে, মনে আছে, একটা সিনেমা দেখে এসে আমাদের এক প্রতিবেশির কাছে পুরো সিনেমাটা বর্ণনা করেছিলাম, প্রতিটা সংলাপ, প্রতিটা অ্যাকশন, হুবুহু। আর এখন একটা সিনেমা দেখার মাসখানেক পর দেখা যায় নামটাই ভুলে গেছি সিনেমার। অনেক সময় এমন হয়, কোনও সিনেমা দেখছি, কিছুটা দেখার পর বুঝি যে এ আমি আগে দেখেছি। আর, মানুষের নাম ধাম ভুলে যাওয়ার বাতিক আমার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। নি বাসিত জীবনে শত শত মানুষের সঙ্গে শত শত শহরে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, পরে যখন ওদের সঙ্গে আবার কোথাও দেখা হয়, ওরা সব হেসে এগিয়ে এসে বলে আমাদের দেখা হয়েছিল আগে। বড় অপ্রতিভ বোধ করি। ভুলে যাই বলে মাঝে মাঝে আশঙ্কা হয় আমার বুঝি আলজাইমার রোগটা না হয়েই যাবে না। আমার পরিবারে কারও আলজাইমার ছিল না বা নেই। বন্ধুরা সান্ত্বনা দিয়ে বলে, আমার আসলে এত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে যে সবাইকে মনে রাখাটা সম্ভব নয়। কেউ কেউ বলে, আমার সিলেকটিভ আলজাইমার, মনে রাখার যেটা সেটা ঠিকই মনে রাখছি, ভুলে যাওয়ার গুলো ভুলে যাচ্ছি। সাংবাদিক এবার জিজ্ঞেস করলেন, আমি মোবাইলের নতুন নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করি কি না। পঞ্চাশে মানুষের জীবন শুরু হয়, আধুনিক টেক নোলজি ব্যবহার করে রীতিমত নার্ড বা টেকি বনে যায়। বললাম, আমি খুবই কমই মোবাইল ফোন ব্যবহার করি। অত টেকি নই। কিন্তু মাল্টিটাস্কিং খুব চলে। চব্বিশ ঘন্টা কমপিউটার ব্যবহার করি। হয় ডেস্কটপ, নয় ল্যাপটপ, নয় আইপ্যাড, নয়তো আই ফোন। কিছু না কিছু হাতে থাকেই। সেই নব্বই সাল থেকে কমপিউটারে লিখছি, আমার বইগুলো সব আমারই কম্পোজ করা। লেখালেখির জন্য যতটা টেকি হওয়ার প্রয়োজন, ততটাই আমি। তবে খেলাখেলির জন্য যতটা দরকার, ততটা নই। সোশাল নেটওয়ার্ক ইউজ করি। টুইটারে প্রচণ্ড উপস্থিতি আমার। ফেসবুকে অতটা না হলেও আছে। আসলে ফেসবুকে লোকে আমার নামে এত ফেইক অ্যাকাউন্ট খুলে রেখেছে যে ফেসবুকে যেতেই রাগ হয়। ব্লগ লিখি, ইংরেজিতে, বাংলায়। একটা ওয়েবসাইট আছে, আপডেট করাটা কম হয়। কমপিউটারে মূলত লেখা পড়ার কাজটাই করি। তবে ইন্টারনেটকে, সত্যি কথা বলি, লাইফ সাপোর্ট বলে মনে হয়। বইয়ের লাইব্রেরিকেও যেমন মনে হয়। ঘর ভর্তি বই থাকবে না, দরকার হলে একটা বই উঠিয়ে নিতে পারবো না, ভাবলেই বুকে ব্যথা হতে থাকে।

বেশ আছি কিনা। বেশ আছি। ঘরে অসম্ভব বুদ্ধিমতী একটা বেড়াল। মাঝে মাঝে বুদ্ধিদীপ্ত কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, কথা কথা হয়। কলকাতা থেকে বছরে দুবার বন্ধুরা এসে কদিন করে কাটিয়ে যায়। বিদেশের বিদ্বজ্জনের সঙ্গে কনফারে ন্সে, সেমিনারে মত বিনিময় হয়। মৌলবাদী, নারীবিদ্বেষী, ছোটমনের হিংসুক লোকেরা শত্রুতা করে ঠিক, তবে বড় মানুষের কাছে সম্মান প্রচুর পাই। বেশ আছি। বয়স হচ্ছে, এ নিয়ে দুঃখ করে তো লাভ নেই। আমি যেমন বিশ্বাস করি না পঞ্চাশে জীবনের শুরু, এও বিশ্বাস করি না পঞ্চাশেই জীবনের শেষ। তবে কোনও বয়সই মন্দ নয়। আমরা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছি, এই জীবনের পরে আর কোনও জীবন নেই, জীবন একটাই, আর চাইলেও কোনওদিন জীবন ফেরত পাবো না বলেই বয়স হয়ে যাওয়া বয়সগুলোকে মেনে নেওয়া এবং বয়সগুলোকে সে যে বয়সই হোক না কেন সেলেব্রেট করা উচিত| এই উচিত কাজটি বা ভালো কাজটিই যথাসম্ভব করতে চেষ্টা করি। ধীরে ধীরে অসুখ বিসুখ হবে, অথবা হঠাৎ করেই, মরে টরে যাবো, এ হচ্ছে অপ্রিয় সত্য। কিন্তু প্রিয় সত্যও তো আছে। জন্মেছিলাম বলে, কিছুকাল বেঁচেছিলাম বলে এই মহাবি শ্বকে জানতে পারছি, কোথায় জন্মেছিলাম, কেন, চারদিকে এত সহস্র কোটি গ্রহ নক্ষত্র, ওরা কোত্থেকে এলো, কী করে এই বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে এত কিছুর মেলা, এত কিছুরই বা খেলা কেন, কী করে আবর্তিত হচ্ছে, কী করে প্রাণের সৃষ্টি, কেন বিবর্তন, কী করে মানুষ আর তার ইতিহাস এগোলো! না জন্মালে এসব জানা থেকে, এসব দেখা থেকে, এসব বোঝ থেকে, এসবের রহস্য আর রস আস্বাদন থেকে তো বঞ্চিত হতাম। বিশ্ব হ্মাণ্ডের সবকিছু কবিতার মতো সুন্দর। সত্যের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। ছোটবেলা থেকে মিথ্যে একেবারে সইতে পারিনি। সত্যের মধ্যেই দেখেছি অগাধ সৌন্দর্য। জীবন যতক্ষণ, ততক্ষণ জীবনটাকে যাপন করবো, জীবনের উৎসব করবো। বেঁচে আছি, এ খুব চমৎকার ঘটনা। তবে বেঁচে আছির চেয়ে কী করে বেঁচে আছি, সেটা বড় ব্যাপার। অন্ধত্ব, কুসংস্কার, হিংসে, ঘৃণার মধ্যে বেঁচে থাকাটাকে আমি মোটেও ভালোভাবে বেঁচে থাকা বলি না। কেউ কেউ নিজের জন্য শুধু স্ফুর্তি আর আনন্দ কাটাতেই ভেবে নেয় বেঁচে থাকার সার্থকতা, কেউ মনে করে কাড়ি কাড়ি টাকা উপার্জন করাটাই সব, কেউ আবার ভাবে অন্যের জন্য ভালো কিছু করলে জীবন অর্থপূর্ণ হয়। কেউ কেউ পরিবারের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে জীবনে সার্থকতা আনে। এই মহাবিশ্বের কিছু যায় আসে না আমাদের ছোট ছোট জীবনের ছোট ছোট সাহকিতায় বা ব্যর্থতায়। তবে আমরা ভেবে তৃপ্তি পাই যে আমরা সার্থক। পথ চলায় এই তৃপ্তিরও হয়তো প্রয়োজন। আছে। এ আমাদের চলায় প্রাণ দেয়, চলার গতিতে ছন্দ দেয়। |

কখনও ভাবিনি পঞ্চাশ হবো। একসময় কুড়ি বা তিরিশ হওয়াকেই সবচেয়ে বয়স হয়ে যাওয়া বলে ভাবতাম। এখন পঞ্চাশে এসে মনেই হয় না যে বয়স হয়েছে। আবার মাঝে মাঝে মনে হয়, যেন হাজার বছর ধরে বেঁচে আছি। বয়স চুলে হয় না, ত্বকে হয় না, বয়স মনে হয়। আমার এখনও মনের বয়স একুশ। একুশ! একটু ক্লিশে হয়ে গেল না! হলো না, কারণ একুশ বলতে একুশ বছর বয়সী শরীরও বোঝাইনি, ভুল করা আর হোঁচট খাওয়ার বয়সও বোঝাইনি, একুশ বলতে চারদিকের অসংখ্য অজানাকে জানার ব্যাকুলতা, আর অদম্য আগ্রহের বয়সটাকে বুঝিয়েছি। কলকাতার একটা সাহিত্য পত্রিকা থেকে আজ দীর্ঘ দিন যাবৎ একটা সাক্ষাৎকার চাওয়া হচ্ছে। দেব দেব করে আজও দেওয়া হয়নি। আজ দুয়ার খুলেই প্রশ্নোত্তর দিচ্ছি।

১. প্রায় দু বছর আগে একটি সাহিত্য পত্রিকার জন্য আপনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তখন আপনার কণ্ঠে অভিমান আর ক্ষোভ অতিমাত্রায় লক্ষ্য করেছিলাম। এখন কি অবস্থা কিছুটা পাল্টেছে? উত্তর: কী নিয়ে অভিমান করেছিলাম বা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলাম, তা তো বলবেন মশাই! আমার অভিমান, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদির পেছনে বড় কোনও কারণ থাকে। এমনিতে আমি খুব হাসিখুশি মানুষ, ছোটখাটো ভুলত্রুটিগুলোর জন্য মানুষকে নিরন্তর ক্ষমা করে দিই। তার মানে এই নয় যে কারও কোনও ভয়ংকর বদমাইশি দেখবো, আর না দেখার ভান করে অন্য দিকে চলে যাবো। অন্যায় যদি দেখি, রাগ করবো না? যেদিন কিছুতেই কিছু আসবে যাবেনা আমার, ক্ষোভ টোভ মরে ভূত হয়ে যাবে, রাগ করার মতো কিছু ঘটলেও রাগ করবো না, সেদিন বুঝবেন আমার মৃত্যু হয়েছে। এই যে অতিমাত্রা শব্দটা ব্যবহার করলেন, সেটা আবার অদ্ভুত! ক্ষোভের মাত্রা কী করে মেপেছিলেন আপনি? ক্ষোভ ঠিক কতটা হলে মাত্রার মধ্যে থাকে, কতটা হলে থাকে না, সেটা বোঝাবে কে? এই মাত্রাটা মাপার দায়িত্বটা কার, বলুন তো! গজফিতেটা ঠিক কার কাছে থাকে? যে ক্ষোভ দেখায় নাকি যে ক্ষোভ দেখে? নাকি তৃতীয় কোনও ব্যক্তি? সমাজের সবাই আপনারা মাত্রা মাপার মাতব্বর হয়ে গেলে চলবে কী করে বলুন। মানুষকে একটু নিজের মতো নিজের মত প্রকাশ করতে দিন। আপনার মাথায় ডাণ্ডা যতক্ষণ নামারছি, অর্থাৎ ভায়োলেন্স যতক্ষণ না করছি, ততক্ষণ আমাকে সইতে শিখুন।

২. সেই সাক্ষাৎকারে আপনি একটি প্রসঙ্গ তুলেছিলেন যা তার আগে কেউ জানতো না। আরও বেশি মানুষের জানা উচিত বলেই আমি সেই প্রসঙ্গটি আর একবার এখানে উত্থাপন করতে চাই। আপনি জানিয়েছিলেন যে আপনি যে শুধু মুসলিম মৌলবাদ বিরোধী তা নয়, আপনি সমস্ত ধরনের মৌলবাদের বিরোধী। যে কারণে গুজরাত দাঙ্গার পর পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু মৌলবাদ বিরোধী যে সংগঠন তৈরি হয় তাতে আপনি এককালীন বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। আপনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে শঙ্খ ঘোষ সব কিছু জানা সত্ত্বেও কেন এই কথা প্রকাশ্যে জানাননি। শঙ্খ ঘোষ পরে একটি চিঠিতে আপনার কথা স্বীকার করে জানিয়েছিলেন যে আপনি নিজেই ওই কথা প্রকাশ্যে জানাতে নিষেধ করেছিলেন। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

উত্তর: আমি সব ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদ বিরোধী সেটা আমার বই পড়লেই জানা যায়। এমন নয় যে আপনাকে দেওয়া গত সাক্ষাৎকারে এই কথাটা আমি প্রথম জানিয়েছি।

এই ক্ষোভের কথাই তাহলে বলছিলেন! শুনুন, শঙ্খ ঘোষকে আমি বলেছিলাম যে, আমি যে টাকা দিলাম গুজরাতের উদ্বাস্তু মুসলমানদের জন্য, তা নিজের প্রচারের জন্য নয়, কিছু দান করে বড়াই করাআমি পছন্দ করি না। মানুষকে বরাবরই আমি নিভুতেই সাহায্য করি, ঢোল পিটিয়ে করিনা। শঙ্খ ঘোষকে বিনীত ভাবে শুধু জানিয়েছিলাম, আমি ঢোলে বিশ্বাসী নই, আর ঢোলের শব্দও আমাকে একটু অপ্রতিভ করে। কিন্তু আমাকে যখন মুসলিম বিরোধী অপবাদ দিয়ে হায়দারাবাদে শারীরিক আক্রমণ করা হলো, একটা বীভৎস মৃত্যু আমার প্রায় ছুঁই ছুঁই দূরত্বে ছিল, সেদিনই কলকাতায় ফিরে এলে আমাকে যখন ঘরবন্দি করলো সরকার, পার্ক সার্কাসের রাস্তায় কিছু পকেটমার নেমেছিল বলে মুসলিম বিরোধী অজুহাত তুলে যখন আমাকে রাজ্যছাড়া করলো, আর দিল্লিতেও আমাকে যখন নিরাপদ বাড়ির নাম করে একই রকম গৃহবন্দি করা হয়েছিল, প্রতিদিন চাপ দেওয়া হচ্ছিল দেশ ছাড়ার জন্য, মুসলমানরা রৈ রৈ করে ধেয়ে এসে আমাকে প্রায় ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে এমন যখন রাজনৈতিক অবস্থা, সামনে মৃত্যু আর নির্বাসন, যে কোনওটিকে যখন আমার বেছে নিতে হবে, তখন শঙ্খ ঘোষ চুপচাপ বসে সবই দেখছিলেন, সবই জানছিলেন, শুধু একবার মুখ ফুটে কোথাও একবারের জন্য বলেননি যে, মুসলিমবিরোধী বলে যা প্রচার হচ্ছে আমার বিরুদ্ধে, তা সত্য নয়। শঙ্খ ঘোষ চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে করেছিলেন। দান করে নাম কেনার প্রচার, আর নিবাসন বা মৃত্যু থেকে আমাকে বাঁচানোর প্রয়োজনে একটা সত্য প্রচার– এই দুই প্রচারের মধ্যের তফাতটা শঙ্খ ঘোষ জানেন না আমি বিশ্বাস করি না।

শঙ্খ ঘোষ সত্যকে সেদিন প্রকাশ করলে জানি না কতটা লাভ হতো। হয়তো খড় কুটোর মতোই মূল্যহীন হতো তাঁর বিবৃতি। তবে যেহেতু ওই দুঃসময়ে আমি হতাশার অতলে ডুবছিলাম, প্রাণপণে কিছু খড়কুটোই খুঁজছিলাম আঁকড়ে বাঁচার জন্য।

যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে। ছাড়ুন ওসব পুরোনো কথা। আমাকে পশ্চিমবঙ্গে থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। পুরো ভারতবর্ষ থেকেও বের করে দেওয়া হয়েছিলো। কয়েক বছর পর আবার অনুমতি পেয়েছি বটে দিল্লিতে থাকার, তবে পায়ের তলার মাটি এখনও বড় নড়বড়ে।

৩. আপনার বিড়াল মিনুকে নিয়ে চূর্ণী গাঙ্গুলী ছবি বানাচ্ছেন। যা আসলে আপনার জীবনের একটা অংশ। আপনার জীবন নিয়ে সরাসরি ছবি করলে অসুবিধে হতে পারে মনে করেই কি তা না করে মিনুকে নিয়ে ছবি করার কথা ভেবেছেন চূর্ণী?

উত্তর: চূর্ণী কী ভেবেছে সে তো আমি জানি না মশাই। মিনুকে নিয়ে কৌশিকের একটা স্ক্রিপ্টই তৈরি ছিল। কৌশিকেরই করার কথা ছিল ছবি। তবে এখন ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কৌশিকের স্ক্রিপ্ট নিয়ে ছবি চূর্ণীই করবে। চূর্ণী এসেছিল মিনুকে দেখতে। মিনুও তো বেজায় খুশি। মিনু, আমার কেন যেন মনে হয়, বুঝতে পেরেছে যে, ওকে নিয়ে ছবি হচ্ছে। বেশ একটা নায়িকা নায়িকা ভাব করে কদিন হাঁটা চলা করলো। শুনুন বাপু, আমার জীবন নিয়ে ছবি করতে লোকের ভয় পাওয়ার কোনও তো কারণ দেখি না। যদি কেউ ভয় পায়, সে তার দুর্বল স্নায়ুর দোষ। ভয় পেলেই ভয় পাওয়া হয়, না পেলেই পাওয়া হয় না। যারা ভয় পায়, তারা আমার বেড়াল কেন, আমার বাড়ি থেকে তিরিশ মাইল দূরে যে ইঁদুরগুলো দৌড়াচ্ছে, সেই ইঁদুরগুলোর ছবি তুলতে গেলেও দেখবেন হাত কাঁপছে।

৪. মহেশ ভাট নাকি আপনার জীবন নিয়ে ছবি করার ইচ্ছের কথা জানিয়েছি। লেন? সেটার কী হলো?

উত্তর: সেটার কী হল সেটা মহেশ ভাটকেই না হয় জিজ্ঞেস করুন। আজ তেরো বছর আগে ঘোষণা করেছিলেন আমাকে নিয়ে ছবি বানাবেন। তারপর হয়তো ছবি। বানানোর আইডিয়াটা মাথা থেকে একসময় ঝেড়েও ফেলেছিলেন। কী কারণ, কিছুই জানি না। আমি মনে করি, কোনও চিত্রপরিচালক কোনও একটা বিষয় নিয়ে ছবি বানানোর ইচ্ছের কথা বলতেই পারেন। পরে সেই ইচ্ছেটা তিনি পরিবর্তন করতেই পারেন। মত প্রকাশের যেমন অধিকার আছে, মত পরিবর্তনেরও মানুষের তেমন অধিকার আছে। তবে অবাক হয়েছি কিছুদিন আগে যখন তিনি পুরো অস্বীকার করে বসলেন যে আমাকে নিয়ে ছবি বানানোর কথা কস্মিনকালেও তিনি নাকি বলেননি। সবচেয়ে মজার বিষয়, ইন্টারনেটের দৌলতে পুরোনো কাসুন্দি বেশ ঘাঁটা যায়।

৫. আপনার ভূমিকায় যদি আপনাকে অভিনয় করতে বলা হয়, আপনি রাজি

উত্তর: না। কারণ আমি অভিনয় করতে জানি না। যারা মিথ্যে কথা বলে তারা ভালো অভিনয় জানে। যেহেতু আমি মিথ্যে বলতে জানি না, আমাকে দিয়ে আর যাই হোক, ওই অভিনয়টা হবে না।

৬. মৌলবাদীদের ভয়ে শুধু রাজনৈতিক দলগুলি নয়, বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ আপনাকে নিষিদ্ধ করেছে। তবে ইদানীং কিছু পত্রিকায় আপনার লেখা দেখতে পাচ্ছি। অবস্থাটা কি কিছুটা পাল্টেছে?

উত্তর: ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুএকজন ছাপোষা সাংবাদিক কোনওরকম নিষেধা জ্ঞার তোয়াক্কা না করে আমার লেখা ছাপাচ্ছে মাঝে মাঝে। পাঠক এতে বিষম খুশি, গোগ্রাসে পড়ছে লেখা। কেন বঞ্চিত করা হচ্ছে এত পাঠককে! দুঃখ হয়। আসলে কী জানেন, ভয়টা একটা বিচ্ছিরি রোগ। এই রোগটা বাংলাতেই বেশি। একসময় বাংলায় সব নির্ভীক প্রতিবাদী বিপ্লবী মানুষ বাস করতেন। এই বাংলা এখন আর সেই বাংলা নেই। বাংলাটা এখন যেন কেমন ভীতুদের, আপোসকামীদের, সুবিধে বাদীদের, আদর্শহীনদের, বুদ্ধিহীনদের রাজ্য হয়ে উঠছে। এই বাংলাকে ভালোবেসে সেই সুদুর নির্বাসন থেকে একসময় সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে চলে এসেছিলাম, বড় ভালোবেসে বাসা বেঁধেছিলাম। সেই বাসা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে বাংলার লোকেরা। সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা আমার ভেঙেছে, সেটা মন। এখনও দুঃস্বপ্নের মতো সেই দিনগুলো?

৭. অনেক চিত্র পরিচালক নাকি আপনার গল্প বা উপন্যাস নিয়ে ছবি করতে গিয়ে নানা ভাবে পিছিয়ে এসেছেন?

উত্তর: কোথাও নিশ্চয়ই তাঁদের সমস্যা হয়। কোথাও গিয়ে তাঁরা হয়তো বাধা পান। কোথায় সেট, এখনও জানি না। একটা ভুতুড়ে ব্যাপার এখানে আছে। পরি চালকরা আমার কাছে আসছেন। স্ক্রিপ্ট পড়িয়ে কনস্ট্রাক্ট সই করে নিয়ে যাচ্ছেন। তারপর কী যে হয়, কোন খাদে যে তাঁদের ফেলে দেওয়া হয়, কে যে ফেলে দেয়, কে যে। কী করে, তার কিছুই আমি জানি না। অনেককে শুধু অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেখেছি।

৮. পশ্চিমবঙ্গের অনেক কবি সাহিত্যিক চান না আপনার লেখা এখানে ছাপা হোক। বা আপনি কলকাতায় স্থায়ী ভাবে বাস করুন। এদের এরকম মনোভাবের কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: কেন চাননা ওঁরা, সেটা ওঁদের জিজ্ঞেস করুন। আমি কী করে বলবো ওঁরা কেন চান না আমি কলকাতায় বাস করি বা কলকাতায় আমার লেখা ছাপা হোক। এক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়া কেউ মুখ খুলে আমাকে বলেননি কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। পুরো ২০০৭ সাল জুড়ে যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমাকে রাজ্য থেকে তাড়াবার জন্য প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল, তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার আমাকে বলেছিলেন, আমি যেন ভালোয় ভালোয় চলে যাই। আর, অন্য কার মনে কী ছিল বা আছে, সেটা তো আমি বলতে পারবো না। মনের কথা খুলে বললে তবেই না বুঝতে পারা যায় মনে কী আছে। না বললে বোঝাটা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, দেখা হলে সবাই তো হাসি মুখ করে সম্ভাষণই জানাতেন। মনে-এক-মুখে-আরেকদের নিয়ে চিরকালই আমার একটু সমস্যা হয়।

৯. আপনার জনপ্রিয়তাকে এঁরা ঈর্ষা করেন বলে মনে করেন?

উত্তর: আমি জানি না কেউ ঈর্ষা করেন কি না। তবে, সহকর্মীদের জনপ্রিয়তা কে একটু আধটু ঈর্ষা প্রায় সবাই করে। শুধু সাহিত্যের জগতে নয়, সব জগতেই। লেখাপড়ার জগতে, খেলাধুলার জগতে, নাটকের জগতে, সঙ্গীতের জগতে, শিল্পের জগতে, বাণিজ্যের জগতে। কোথায় ঈর্ষা নেই? ঈর্ষা থাকা তো ক্ষতিকর নয়। বরং ঈর্ষা থাকলে প্রতিযোগিতাটা থাকে, আরও ভালো কিছু লেখার, আরও ভালো কিছু করার আগ্রহ জন্মায়। খুব কম মানুষই বলে যে কাঁধটা দিচ্ছি, কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে তুমি একটু বড় হও। কিন্তু, ওর জনপ্রিয়তাকে ঈর্ষা করি, সুতরাং ওকে এ তল্লাটে আর চাই না, ওকে যে করেই পারো খতম করে দাও, এটা কোনও ভদ্রলোকের মীমাংসা নয়। এই মীমাংসা অতি দুর্বল চিত্তের, অতি নড়বড়ে স্নায়ুর, অতি ভঙ্গুর মনের লোকেরা করে। ওদের, মানে ওই ভীতু আর কুচুটে কুচক্রীদের দিয়ে ভালো সাহিত্য হওয়াটা মুশকিল। ওরা খালি মাঠে গোল দেওয়ায় জন্য মুখিয়ে থাকে। বোঝেই না যে এতে কোনও বীরত্ব নেই।

১০. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আপনি যে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন, তাতে বাঙালির আবেগ ধাক্কা খাবে জেনেও আপনি ঝুঁকি নিয়েছেন। এতদিন। বাদে এই অভিযোগ করা কি খুব জরুরি ছিল?

উত্তর: বাঙালির আবেগে ধাক্কা না দেওয়ার দায়িত্বটা আমাকে কে দিয়েছে? যে-ই দিক, কারও আবেগ বাঁচিয়ে চলা আমার কাজ নয়। বিশেষ করে সেই আবেগ, যে। আবেগ সত্য শুনতে রাজি নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিছুদিন ধরেই বলছিলেন, উনি নাকি বই ব্যানের বিরুদ্ধে। এটি সত্য নয়। আমার দ্বিখণ্ডিত ব্যান করার জন্য ২০০৩ সালে উনি অনেক লেখালেখি করেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সরকারকে বলেছেন, আর এখন কি বলছেন তিনি চিরকালই সব রকমের বই ব্যানের বিরুদ্ধে। আমি সবিনয়ে তাঁর ভুল ধরিয়ে দিলাম। তখনই কথায় কথায় ওই প্রসঙ্গ উঠলো, যৌন হয়রানিতে আমাকেও যে বাদ দেননি সেটা। শহরের সাহিত্য জগতে শুনেছি অনেকেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অনেক কথাই জানে, কিন্তু সবাই নাকি চেপে যায়। কারণ উনি খুব নামী দামী মানুষ। নামী দামী মানুষেরা অন্যায় করলেও সেটাকে অন্যায় হিসেবে দেখতে নেই। আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তো অহরহই বলছে, পুরুষমানুষ তো, ওরকম তো একটু করবেই। কিন্তু ওরকম করাটা যদি না মানি? তবে দোষটা আমার। পুরু মানুষের অন্যায় করাটা অন্যায় নয়, তার অন্যায় না মানাটা আমার অন্যায়। এই সমাজের নামী দামী কারও বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করা মানে নিজেকে জেনে বুঝে শূলে চড়ানো।

এতদিন বাদে অভিযোগ করেছি কেন? ঠিক কতদিন বাদে অভিযোগ করলে সেটা ঠিক, আর কতদিন বাদে করলে বেঠিক, শুনি? আমি কি বাপু কোর্টে গিয়ে পিনাইল ভ্যাজাইনাল-ধষর্ণের অভিযোগ করেছি যে আমাকে খুব দ্রুত অভিযোগটা করতে হবে কারণ ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য তৈরি থাকতে হবে, কিছুদিন বাদে হলে যে পরীক্ষাটা সম্ভব নয়? যৌন হয়রানি মানেই, বেশির ভাগ ডিকহেড (বাই দ্য ওয়ে, ডিকহেড শব্দটা বাংলাভাষায় ঢোকাটা অত্যন্ত জরুরি, এর সমার্থক কোনও বাংলা শব্দ নেই।) ভাবে, পিনাস বুঝি ভ্যাজাইনাতে ঢুকেছেই ঢুকেছে, আরে বাপু ও ছাড়াও তো যৌন হয়রানি হয়। আমার বিনা অনুমতিতে আমাকে জাপটে ধরে আমার বুক খামচে ধরলেও তো হয়, নাকি হয় না? বিচ্ছিরি ঘটনাটা পুষে ছিলাম অনেকগুলো বছর। কোর্টেও যাইনি, কাগজেও যাইনি। সেদিন বই ব্যান নিয়ে ওই অনর্গল মিথ্যেটা যদি সুনীল গঙ্গোপা ধ্যায় না বলতেন, তাহলে হয়তো হয়রানির কথাটা বলাই হতো না কখনও। কিছু লেখায় দুঃখ করে যেটুকু লিখেছিলাম, সেটুকুই থাকতো। এখন মনে হয়, বলে ভালোই করেছি। কোনও অস্বস্তি মনের মধ্যে পুষে রাখা ঠিক নয়। মহামানবের সম্মান পান, আর তলে তলে যে ওই কীর্তিগুলো ঘটান, তা জানুক মানুষ। মেয়েরা এবার মুখ খুলুক, অনেক তো মুখ বুজে থাকী হল, আর কত! বাংলাদেশের এক লম্পটের মুখোশ উন্মোচন করেছিলাম বলে সারা দেশ আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করেছে, পশ্চি মবঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে। যেন সুনীল সম্পর্কে আমি একটি অক্ষর বানিয়ে বলেছি। যে হয়রানির শিকার হয়েছে, তাকে অসম্মান করে, অপমান করে, যে হয়রানি করেছে তাকে মাথায় তুলে সম্মান দেখিয়ে এরা আবারও প্রমাণ করেছে যে এরা কতটা নীচ, কতটা অসভ্য, কতটা নারীবিদ্বেষী, কতটা পুরুষাঙ্গ-পূজারী!

শুনেছি বাদল বসু বইয়ের দেশ-এ সুনীলকে মহামানব হিসেবে বর্ণনা করতে গিয়ে আমাকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি করেছেন, আমার সম্পর্কে বস্তা বস্তা মিথ্যে ঢেলেছেন। সুনীলের প্রশংসা করতে গেলে তাঁর লেখা নিয়ে কথা বলুন, তাঁর জীবনের ভালো ভালো দিক নিয়ে কথা বলুন, তাতেই তো তাঁকে বড় করা যায়। আমাকে ছোট করে তাঁকে বড় করতে হবে কেন? এত ছল চাতুরী আর মিথ্যের আশ্রয় নিতে হবে কেন? বাদল বসু সুনীলকে আমার চেয়েও বেশি চেনেন। হেনস্থা হয়রানির খবর তাঁর অজানা নয়। কিন্তু পুরুষ পুরুষেরই পক্ষ নেবে। যত বড় লেখকই হই না কেন, আমি তখন কেবলই মেয়েমানুষ। মেয়েমানুষ মুখ খুললে ওঁরা সকলেই খুব রাগ করেন।

১১. এতটা জনপ্রিয়তা আপনার প্রাপ্য ছিল না। মৌলবাদীরা আপনাকে জনপ্রিয় করেছে। কী বলবেন?

উত্তর: একেবারে উল্টো। আমি খুব জনপ্রিয় লেখক ছিলাম বলে মৌলবাদীরা আমার কলম কেড়ে নিতে চেয়েছে বা আমার লেখাকে বন্ধ করতে চেয়েছে বা আমাকে প্রাণে মেরে ফেলতে চেয়েছে। অজনপ্রিয় অনামী লেখককে নিয়ে ওরা মাথা ঘামায় না। ভয় জনপ্রিয় লেখককে, যদি সে লেখক মৌলবাদবিরোধী লেখা লেখে, যে দুটো পিলার মৌলবাদীরা সজোরে আঁকড়ে ধরে রাখে, ধর্ম আর পুরুষতন্ত্র, সে দুটোতে যদি ফাটল ধরিয়ে দেওয়ার মতো আঘাত করতে থাকে লেখা দিয়ে। আমি যখন বিরানব্বই সালে প্রথম আনন্দ পুরস্কার পাই, তখনও মৌলবাদীরা আমার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেনি বা ফতোয়া জারি করেনি। এর দেড় দুবছর পর করেছে। দেশে বিদেশে। জনপ্রিয় হয়ে উঠছি, এ তাদের আর সয়নি। মৌলবাদীদের কারণে আমার জনপ্রিয়তা শুধু নষ্টই হয়নি, বরং আকাশ থেকে পাতালে নেমেছে। ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে, আমাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছে, আর ওদিকে আমাকে তাড়িয়েও মৌলবাদীরা শান্ত হয়নি, তাদের অসংখ্য প্রচার মিডিয়া নিরন্তর ব্যস্ত থেকেছে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে কুৎসা রটাতে, আমার প্রতি মানুষের ঘৃণার উদ্রেক করতে, মানুষের মন থেকে আমাকে মুছে ফেলতে, আমার বই-পাঠ থেকে পাঠককে বিরত রাখতে। বছরের পর বছর ওরা মগজধোলাই করেছে সাধারণ মানুষের। আমি নাকি বিজেপির টাকা নিয়ে লজ্জা লিখেছি। আমার নাকি চরিত্র ভালো নয়। একটা অল্প শিক্ষিত, ধর্মভীরু, কুসংস্কারাচ্ছন্ন নারীবিরোধী সমাজে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার জাদুর মতো কাজ করেছে। এক এক করে আমার বই নিষিদ্ধ হয়েছে। প্রকাশকেরা বই প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে। পত্র পত্রিকা আমার লেখা ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছে। যে লেখক সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নন্দিত লেখক ছিল বাংলাদেশে, কেবল মৌলবাদী, ধর্মবাদী, নারীবিরোধী পুরুষতান্ত্রিকদের অপপ্রচারে সে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একটা নিন্দিত আর নিষিদ্ধ বস্তুতে পরিণত হল। এত বিরোধিতা, এত বিদ্বেষ, এত আক্রমণ, এত নিন্দা, এত কুৎসা, এত অপপ্রচার, এত নিষ্ঠুরতা, এত অসভ্যতা, এত রূঢ়তা, এত অন্যায়, এত অবিচার আমার প্রাপ্য ছিল না।

১২. অন্যান্য দেশে আপনি লেখক হিসেবে কেমন সম্মান পেয়ে থাকেন?

উত্তর: লেখক হিসেবে সম্মান কোথাও প্রচণ্ড পরিমাণে পাই। কোথাও কিছুটা কম। কোথাও মাঝারি ধরনের। কোথাও চলনসই। কিন্তু কোনও দেশ বাংলার মতো, বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো, এত অপমান আমাকে করে না। পৃথিবীর অন্য কোনও দেশ বা রাজ্য থেকে আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়না। কিছু উগ্রপন্থী ধর্মবাদীদের মতের সঙ্গে আমার মত মেলে না বলে আমাকে জন্মের মতো চোখের আড়াল করা হয় না, নির্বাসনদণ্ড দেওয়া হয় না। এত অবিবেচক আর এত অসহিষ্ণু হতে কোনও দেশকেই দেখিনি। এত ভয়ংকর নির্মমতা কোনও দেশ আমার সঙ্গে কখনও করেনি।

১৩. অন্য দেশ থেকে উল্লেখ করার মতো পুরস্কার।

উত্তর: আছে বেশ কিছু। আমার আত্মজীবনী পড়ে দেখুন। পাবেন। নয়তো যেসব বইয়ের জ্যাকেটে পরিচিতি আছে, পড়ে নিন, ওতে লিস্ট আছে।

১৪. মৌলবাদীদের চাপে অনেক শিল্পী সাহিত্যিক দেশছাড়া হয়েছেন। মকবুল ফিদা হোসেন, সালমান রুশদি, আয়ান হিরসি আলী প্রমুখ। আপনি নিজেকে এঁদের থেকে আলাদা মনে করেন?

উত্তর: কতগুলো নাম দেখি তোতা পাখির মতো শুধু মুখস্থই করেছেন। এঁদের ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না। যাঁদের নাম উল্লেখ করেছেন, তাঁদের মধ্যে এক মকবুল ফিদা হোসেন ছাড়া মৌলবাদীদের চাপে আর কেউ দেশ ছাড়েননি। সালমান রুশদি তাঁর দশ বছর বয়স থেকে ইংলেণ্ডে থাকেন। ইংলেণ্ডই তাঁর দেশ। মৌলবাদীদের চাপে তাঁকে ইংলেণ্ড ছাড়তে হয়নি। বরং তিনি ওখানে প্রচুর নিরাপত্তা রক্ষী পেয়েছেন। আয়ান হিরসি আলী সোমালিয়া থেকে এসে নেদারল্যাণ্ডে থেকেছেন, ওদেশের নাগরিক হয়েছেন, মৌলবাদীরা হুমকি দেওয়ার পর নেদারল্যা ণ্ডেই ছিলেন, ওখানেই নিরাপত্তা পেতেন। একসময় পুরোনা ফাইল পত্র ঘেঁটে একজন ডাচ সংসদ সদস্য বের করলেন যে নেদারল্যাণ্ডে আশ্রয় চাওয়ার সময় আয়ান নিজের সম্পর্কে মিথ্যে তথ্য দিয়েছিলেন, মিথ্যে তথ্য দেওয়ার কারণে আয়ানের পার্লামেন্টের সদস্য পদটী চলে যায়। তখন তিনি আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ নামের এক ডানপন্থী সংগঠনের আমন্ত্রণ পেয়ে আমেরিকায় পাড়ি দেন, ওখানেই স্কলার হিসেবে আছেন।

আমার নির্বাসন ওঁদের চেয়ে আলাদা। মকবুল ফিদা হোসেনকে ভারত সরকার। দেশ থেকে বের করে দেয়নি। আমাকে বাংলাদেশ সরকার দেশ থেকে বের করে দিয়েছে এবং কুড়ি বছর হলো, আজো দেশে ফিরতে দিচ্ছে না। মকবুল ফিদা হোসেনকে উল্টে ভারত সরকার অনেক অনুরোধ করেছিল দেশে ফেরার জন্য। কিন্তু তিনি কাতারের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন, দেশে ফেরেননি।

১৫. আপনি বিয়ে বিরোধী। অথচ আপনি আগে বিয়ে করেছেন। তখন বোঝেননি বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের অসারতার কথা?

উত্তর: না। তখন বুঝিনি। তখন বুঝিনি বলেই তো বিয়ে করেছিলাম। আমি কি জন্ম থেকেই একজন সর্বজ্ঞানী মানুষ? আমি তো ঠকতে ঠকতে, সইতে সইতে, ভুগতে ভুগতে যা শেখার শিখেছি। অন্যের জীবন থেকেও শেখা যায়, অন্যের অভিজ্ঞতা থেকেও আমরা অনেক শিখি। তবে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার কোনও তুলনা হয় না। বিয়ে করেছিলাম বলেই তো বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানের অসারতা বুঝেছি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিয়েটা যে ভীষণ কুৎসিত একটা প্রভু দাসীর সম্পর্ককে মুখ বুজে বয়ে বেড়ানো, তা বিয়ে না করলে অত হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারতাম না। যে সমাজে নারীর সমানাধিকার আছে, সে সমাজে বিয়েটা কেউ করতে চাইলে করতেই পারে।

১৬. সংসার বলতে কী বোঝেন?

উত্তর: সংসার বলতে সংসারই বুঝি। চিরকাল আমি আমার একার সংসারই করেছি। আমার এখনকার সংসারটি আমার আর আমার বেড়ালের। আমি খুব সংসারী মানুষ। বাড়িঘর গোছানো, সাজানো, নিজে বাজার করা, বাগান করা, রান্নাবান্না করা, বন্ধুদের নেমন্তন্ন করা, হৈ চৈ করে খাওয়া, আড্ডা দেওয়া, এসব তো আছেই, আর যখন একা, নীরবতা শুয়ে থাকে পাশে, তখন ভাবি, লিখি, পড়ি। এই সময়টা আমার খুব প্রিয়। প্রিয় আরও এ কারণে, যে, আমার ভাবার, লেখার, পড়ার জন্য যে নৈঃশব্দ্য প্রয়োজন, যে নির্জনতা প্রয়োজন তা আমি চমৎকার পেয়ে যাই। কেউ চিৎকার করার। নেই, কোনও কিছু দাবি করার, আদেশ করার, উপদেশ দেওয়ার, ধমক দেওয়ার কেউ নেই। দাদাগিরি বা স্বামীগিরি দেখানোর কেউ নেই এখানে। এই না থাকাটা সংসারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

সংসারটা হচ্ছে স্বাধীনতা আর নিরাপত্তা। এ দুটো যদি না থাকে, তবে সে সংসার সংসার নয়। শুধুই সন্ত্রাস।

১৭. শাহবাগ আন্দোলনকে কী চোখে দেখেন?

উত্তর: বিশাল এক ব্যাপার ঘটিয়েছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম। আমি তো রীতিমত মুগ্ধ। নো কান্ট্রি ফর উইমেন নামে যে ফ্রি হট ব্লগ লিখি আমি, ওতে অন্তত পনেরো ষোলোটা ব্লগ লিখেছি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সেকুলার আন্দোলন নিয়ে। বেশ কিছু বক্তৃতা ছিল আমার গত দুতিন মাসে, ইওরোপিয়ান পার্লামেন্টে, বেলজিয়ান পার্লামেন্টে, কানাডায়, ফ্রান্সে, আয়ারল্যাণ্ডে– এই আন্দোলন নিয়ে বলেছি। দেশ নিয়ে হতাশা ছাড়া আর কিছুই তো ছিল না। শাহবাগ একটু আশা জাগিয়েছে। একটা ট্রেণ্ড তৈরি তো হলো অন্তত। মানুষ দেখিয়ে দিল প্রয়োজনে লক্ষ লক্ষ লোক পথে নেমে ধর্মীয় বর্বরতার প্রতিবাদ করতে জানে। এর আগে তোমুখ বুজে থাকাটাই ছিল নিয়ম। কথা না বলাটাই ছিল রীতি। ভয় পাওয়াটাই ছিল সংস্কৃতি।

তবে শাহবাগ আন্দোলনের সবকিছুকেই যে একশয় একশ নম্বর দিয়েছি, তা নয়। আমি মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। মৃত্যুদণ্ডের কোনও দাবি আমি মেনে নিইনি। তবে মৌলবাদ বিরোধী ওদের যে আন্দোলন, তা ভীষণভাবে সমর্থন করেছি।

১৮. আগামী প্রজন্মের কাছে কী হিসেবে চিহ্নিত হতে আপনার ভালো লাগবে? একজন লেখক হিসেব নাকি একজন অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে?

উত্তর: আগামী প্রজন্ম তো ভেড়া নয় যে সবাই এক পথেই যাবে। কারও কবি হিসেবে, কারও লেখক হিসেবে আমাকে ভালো লাগতে পারে, কারও অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে, কারও শুধু মানুষটাকে, তার আপোসহীন সংগ্রামটাকে হয়তো ভালো লাগবে, কারও কারও ভালো লাগবে তার সততা আর নিষ্ঠাকে। কত মানুষ কত রকম ভাবে চিহ্নিত করতে পারে আমাকে। কোনও লেখকই নয়, বলবে কেউ। কেউ কেউ চিহ্নিত করবে নাস্তিক হিসেবে। অথবা, হয়তো ভুলেই যাবে আমাকে। কী হবে ভবিষ্যতে তা নিয়ে আমি চিন্তিত নই মোটেও। আমাকে মনে রাখুক বা আমাকে ভুলে যাক, একই কথা। কবে যেন একটা কবিতা লিখেছিলাম, অমরত্ব নামে। অমরত্ব নেবে? অজস্র অমরত্ব আমার পড়ার টেবিলে, বইয়ের আলমারিতে, বিছানায়, বালিশের তলায়..ঘর থেকে বেরোলে অমরত্ব আমার ব্যাগে, আমার প্যান্টের পকেটে, আমার শাটে, চুলে.. কী করে কবে যে অমরত্ব আমার খোঁজ পেয়েছিল। অমরত্ব নেবে নাও, যত খুশি। অমরত্বের কাঁটা এমন বেঁধে যে সারারাত ঘুমোতে পারিনা। যতটুকু আছে সব কেউ নিয়ে নিলে কিছুটা নিস্তার পাই। অমরত্বে বিশ্বাস নেই আমার।

 পয়লা বৈশাখের উৎসব দুই বাংলায় একই দিনে হোক

পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখের উৎসব বেশি ঘটা করে হয়, কিন্তু উগ্রপন্থী বাঙালি মুসলমানরা বাংলাদেশ থেকে বাঙালি সংস্কৃতি প্রায় ধ্বংস করে দিয়ে আরবীয় সংস্কৃতি আমদানি করছে বলে ভবিষ্যতে আদৌ এই ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি উৎ সবটি বাংলাদেশে পালন করা সম্ভব হবে কি না আমার সন্দেহ। এমনিতে বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখের তারিখ বদলে দিয়েছে এরশাদ সরকার। ১৪ই এপ্রিল তারিখটিতে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ পালন করার সরকারি আদেশ জারি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা যা পালন করছে, তা থেকে যেন একটু বদল হলেই মুসলমানিত্বটা ভালো বজায় থাকে। কী আর বলবো, মুখতার কোনও কুল কিনারা নেই! পাকিস্তানি শাসকরা চাইতো বাঙালি হিন্দু আর বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিতে বিভেদ বাড়ুক। ওরা বিভেদ না বাড়াতে পারলেও বাংলাদেশে ওদের যে অনুসারীদের ওরা রেখে গেছে, তারাই বিভেদ বাড়াচ্ছে এখন। তারাই বাংলা ক্যালেণ্ডারকে মুসলমানের ক্যালেণ্ডার বানিয়েছে। বাংলা ক্যালেণ্ডারের পেছনে মোগল সম্রাট আকবরের অবদান ছিল বলে। আকবরের ধর্মের কিন্তু কোনও অবদান ছিল না। কেবল কৃষিকাজের, কেবল ফসলের, কেবল খাজনা আদায়ের হিসেব রাখতে হিজরি ক্যালেণ্ডারের বদলে বাংলা ক্যালেণ্ডার সুবিধে বলেই ওই ক্যালেণ্ডারের সূচনা করা হয়েছিল। আমার নানি চৈত্র সংক্রান্তি তে তেতো রাঁধতেন। নানি রাঁধতেন, কারণ নানির মা রাঁধতেন। নানির মা রাঁধতেন, কারণ নানির মার মা রাঁধতেন। নানির মার মা রাঁধতেন, কারণ নানির মার মার মা রাঁধতেন। চৈত্র সংক্রান্তিতে আমার খালারা বা মামিরা কিন্তু এখন আর তেতো খাবার রাঁধেন না, তেতো খাবার খানও না। চৈত্র সংক্রান্তিতে গ্রামে গ্রামে চড়ক পুজো হত। আমার দাদারা বাঁশবন পার হয়ে চড়ক পুজো দেখতে যেতো। ওখানে বাঁশ– দড়ির খেলা দেখতো হাঁ করে। ওই দিনই লোকনাথ পঞ্জিকা কিনতো সবাই। আমার দাদারাও। বৈশাখের প্রথম দিনে নানারকম মাটির কাজ, বেতের কাজ, কাঠের কাজ, শোলার কাজের মেলা বসতো। পশ্চিমবঙ্গে একই দিনে বৈশাখের উৎসব হত। বাংলাদেশে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সব বাঙালিই বৈশাখের উৎসবে অংশ নিত। নানারকম খেলা প্রতিযোগিতা হত গ্রামে, নৌকা বাইচ, কুস্তি, লাঠি খেলা, এসব।

আমাদের মফস্বল শহরে আমরা ছোটরা সকাল থেকে বাজাতাম বাঁশি-বেলুন। বিকেলে বিন্নি ধানের খই, চিনির হাতি ঘোড়া, মাটির পুতুলের মেলায় যেতাম।

সেই সবও কি আর আছে আগের মতো! এখন শুনেছি যা হওয়ার শহরেই হয়, যারা বাঙালি সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, সেই শিল্পী সাহিত্যকদের দলটিই ভোরবেলা গান গায় রমনার অশ্বত্থ তলায়। সারা দিন গাইতে থাকে জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক, যাক ভেসে যাক, যাক ভেসে যাক। রমনায় সংস্কৃতমনা, মুক্তমনা বাঙালির ভিড় বাড়ে বৈশাখের ভোর থেকেই। পান্তাভাত, কাঁচা লংকা, ইলিশ মাছ খাওয়ার ধুম পড়ে।

সুতি শাড়ি আর পাজামা পাঞ্জাবিতে ছেয়ে যায় রমনা। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট নামের বিখ্যাত এক গানের দল বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করছে রমনায়। পাকিস্তানি শাসকের অত্যাচার সয়েছে। তার চেয়েও বেশী অত্যাচার সইছে স্বাধীন বাংলাদেশে। মুসলমান মৌলবাদীরা গ্রেনেড ছুঁড়েছে পয়লা বৈশাখে, ছায়ানটের গানের অনুষ্ঠানে। তারা পছন্দ করে নাইসলামি সংস্কৃতির বাইরে অন্য কোনও সংস্কৃতি। বিশেষ করে বাংলা সংস্কৃতি। পয়লা বৈশাখে ছায়ানট ছাড়াও উল্লেখযোগ্য উৎসব মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববি দ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘোরে। রং-বেরঙের মুখোশ, বিশাল বিশাল কাগজের বাঘ ভালুক হাতি ঘোড়া থাকে শিল্পীদের হাতে হাতে।

ঢাক ঢোলক বাজে। আটপৌরে শাড়ি, ধুতি পরে ছেলে মেয়েরা নাচে। রাস্তা আগের রাতেই মুড়ে দেওয়া হয় চমৎকার আল্পনায়। এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা দেখার জন্য আজও ভীষণ ভিড়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই নিরাপদ জায়গাটুকুতেই।

শুনেছি সোনারগাঁয়ে নাকি বউমেলা হয়। সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজো করতেই মূলত লোক আসে।

মনের গোপন বাসনা পূরণের আশায় নাকি মেয়েরাই বেশি আসে। পাঁঠাবলির রেওয়াজও নাকি আছে। সোনারগাঁর কাছেই আরেক অঞ্চলে ঘোড়ামেলাও হয়। কোনও এক সময় কোনও এক লোক নাকি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের দিনটিতে সবাইকে প্রসাদ খাওয়াতেন। লোকটি মারা যাওয়ার পর তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়েছে গাঁয়ের লোক। প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে ওই স্মৃতিস্তম্ভে একটি মাটির ঘোড়া রাখা হয়। আর ওটির আশেপাশেই রীতিমত হৈ হৈ করে মেলা বসে যায়। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ যারাই মেলায় আসে, সবাইকে কলাপাতায় খিচুড়ি খাওয়ানো। এক দিনের এ মেলায় হাজারো লোকের সমাগম ঘটে। এই ঘোড়ামেলায় শুনেছি নাগরদোলা, পুতুল নাচ আর সার্কাসও থাকে। কীর্তন হয় মধ্যরাত পর্যন্ত। এখন জানি না কীর্তন আগের মতো হয় কি না বা এখনও আদৌ ওই ঘোড়ামেলাটাই হয় কি না। আর হলেও জানিনা ঠিক কতদিন হতে পারবে এসব মেলা।

বাংলাদেশে দু যুগের বেশি হল বাঙালি সংস্কৃতিকে ঝেটিয়ে বিদেয় করে আরবীয় সংস্কৃতি আনার যে কাজ জীবনমরণ পণ করে চালাচ্ছে ধর্মান্ধ মূর্খরা, তাতে তারা অবিশ্বাস্য রকম সার্থক। একশয় একশ না পেলেও ষাট সত্তরের কাছাকাছি নম্বর জুটে যাচ্ছে। ধর্মের রীতিটুকু বাদ দিলে, সব ধর্মের বাঙালির আচার অনুষ্ঠান একই ছিল এতকাল। এখন শুনি বাঙালি মুসলমানরা নাকি গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানটিকে আর গায়ে হলুদ বলে না। বলে, মেহেদি।

মুসলমানি মেহেদি। হলুদ শাড়ির বদলে মেয়েরা মেহেদি রঙের শাড়ি পরে গায়ে হলুদের দিনে। চিরকালের লাল বেনারসির বদলে শাদা গাউন পরে শুনেছি বিয়ে করছে কেউ কেউ। একটা অসাধারণ সংস্কৃতিকে, পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে, নিজ পরিচয়কে খত্না করে দেওয়া হচ্ছে চোখের সামনে। আর খৎনা করার হাজমগুলো, হাতে ছুরি নিয়ে। তাণ্ডব নৃত্য করছে। মুখ বুজে হাজমদের নাচ দেখছে সবাই। দেশ হাজমে গিজহিজ করছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে হয়তো দেখেইনি হালখাতা, গ্রামে গ্রামে পয়লা বৈশাখের মুড়ি মুড়কির, পিঠেপুলির মেলা।

আমি বাংলাদেশের হাজমের নাচ বন্ধ করতে পারবো না। ও দেশ থেকে আজ কুড়ি বছর হল আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পয়লা বৈশাখের উৎসব আরও বর্ণাঢ্য করতেও আমি পারবো না।

ও রাজ্য থেকেও আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। দু অঞ্চলেই মুখদের সংখ্যা প্রচুর। ওই মূর্খদের খুশি করতেই নাকি আমার উপস্থিতি বাংলায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূর্খরাই মুখদের খুশি রাখে। আমি আজ শুধু একটি আবেদনই করছি– দুই বাংলায় দুটো ভিন্ন দিনে নয়, একই দিনে, একই তারিখে, পয়লা বৈশাখটা অন্তত করা হোক। বাঙলা ক্যালেণ্ডারের পয়লা বৈশাখ গ্রেগরীয় ক্যালেণ্ডারে কখনও তেরো, কখনও চৌদ্দ, কখনও পনেরো। কিন্তু বাংলাদেশে চৌদ্দ তারিখকে পয়লা বৈশাখের জন্য শেকল দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

ঈদ রোজাগুলোর তারিখ কিন্তু বাঁধা হয়নি। হিজরি ন্যালেণ্ডার অনুযায়ীই সেসব পালন করা হয়। তবে বুড়ো হজম ডেকে বাংলা ক্যালেণ্ডারের মুসলমানি করাটার দরকার কী ছিল? হিন্দু থেকে পৃথক হওয়ার জন্য ভিনদেশি সংস্কৃতি আনা, বাঙালি সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা, আরব না হয়েও জোর করে আরব হওয়ার চেষ্টা–এসবই কি সত্যিকারের মুসলমান হওয়ার রাস্তা! নিজেদের ঐতিহ্যের সবটুকু বিসর্জন দিয়ে অন্য অঞ্চলের সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি বলে বরণ করায় কোনও গৌরব নেই। ওই আরব দেশে বসে কোনও এক কালে কোনও এক লোক ধর্ম রচনা করেছিল, যে ধর্মের তুমি অনুসারি কারণ ওই অঞ্চলের কিছু লোক তোমার অঞ্চলে তাদের ধর্মকথা শোনাতে ঢুকেছিল, হয় তোমার পূর্বপুরুষ বা পূর্বনারী ওদের কথায় ও কাজে মুগ্ধ হয়ে ভিনদেশি মরুভূমির ধর্ম বরণ করেছে, নয় নিচু জাত বলে বা গরিব বলে তাদের নিজেদের ধর্মের কতিপয় দুষ্ট লোক দ্বারা উপেক্ষিত আর শোষিত হতে হতে ধর্মান্তরিত হয়েছে। আরব দেশেও কিন্তু ভিক্ষুক, মিসকিন বলে তোমাকে ঘেন্না ছিটোচ্ছে আরবরা। এই সেদিনও আট জন বাঙালি মুসলমানকে জনসমক্ষে জবাই করলো। কারা জবাই করলো মুসলমানদের? মুসলমানরা। যা তোমার বাপ দাদার সংস্কৃতি নয়, তাকেই তোমার বাপ দাদার সংস্কৃতি হিসেবে লুফে নিচ্ছ আজ। এমন নয় যে ভালোবেসে নিচ্ছ, ভয়ে নিচ্ছ, বিভ্রান্তিতে নিচ্ছ। আর পরিণত হচ্ছ নামহীন, ঠিকানাহীন, পরিচয়হীন একটা ধর্মের পিণ্ডে। ময়ূরপুচ্ছে কাকের লেজ লাগাচ্ছো মুসলমান হওয়ার জন্য। না, এই অসততা করে তুখোড় মুসলমান হয়তো হওয়া যায়, ভালো মানুষ হওয়া যায় না।

দুই বাংলায় পয়লা বৈশাখের তারিখটা এক হলে অন্তত মনে হবে, উৎসবটা বাঙালির উৎসব। দুই দেশের বাঙলা একাডেমীর কর্তারা অন্তত পয়লা বৈশাখের উৎ সবটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কথা বলুন। অন্তত একদিনের জন্য হলেও না হন হিন্দু, না হন মুসলমান। অন্তত একদিনের জন্য একবার একটু বাঙালি হন। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি এবং হাসিনা সরকার, শুনছেন? ক্যালেণ্ডারের কোনও ধর্ম নেই, লিঙ্গ নেই। ধর্মহীন, লিঙ্গহীন ক্যালেণ্ডারকে কুপিয়ে মুসলমান বানিয়েছেন মনে করছেন, আসলে ও মুসলমান হয়নি। ও এখনও আগের সেই ধর্মহীন লিঙ্গহীন বাংলা ক্যালেণ্ডা রই রয়ে গেছে। ক্যালেণ্ডারকে মানুন। আল্লাহ জানেন যে আপনারা বাঙালি, এ কোনও লজ্জার কথা নয়। আরবরাও জানে আপনারাবাঙালি, নকল আরব সাজার চেয়ে ভালো বাঙালি হন, এতে আরবদের শ্রদ্ধা পাবেন। তা না হলে যে মিসকিন, সে চালচুলোহীন নাম পরিচয়হীন মিসকিনই জীবনভর রয়ে যাবেন।

পিসফুল ডেথ!

সিঙ্গাপুরের ডাক্তার বলেছেন মেয়েটা নাকি মারা গেছে পিসফুলি, অর্থাৎ শান্তিতে। ঘুমের ওষুধ বা ব্যথা কমার ওষুধ পেটে পড়লে ব্যথাবেদনা কমে যায়, যন্ত্রণা উবে যায়, চোখ বুজলে মনে হয় শান্তিতে চোখ বুজছে, কিন্তু গভীর করে দেখলে, এই মৃত্যুর সঙ্গে পিস বা শান্তির কোনও সম্পর্ক নেই। কী করে শান্তিতে মেয়েটি মারা যেতে পারে? মাত্র ২৩ বছর বয়স, পড়াশোনা শেষ করে ফিজিওথেরাপিস্ট হওয়া তার তখনও হয়নি, জীবনের যা কিছু স্বপ্ন ছিল তখনও তার বেশিরভাগই পূরণ হয়নি, সামনে পড়ে ছিল তার অনেকটাই ভবিষ্যৎ, কোথায় সে তার জীবনটি নিজের মতো করে যাপন করবে, তা নয়, একের পর এক পুরুষ দ্বারা তাকে ধর্ষিতা হতে হল, ভয়ংকর সব অত্যাচারের শিকার হতে হল, কোনও অপরাধ করেনি, অথচ তার ওপর চলল অবিশ্বাস্য নৃশংসতা, তাকে মরতে হল। আমি তো এতে এক বিন্দু শান্তির কিছু দেখছি না।

২৩ বছর বয়সী গণধর্ষণের শিকার মেয়েটি আজ মারা গেল। সেদিন ১৭ বছর বয়সী গণধর্ষণের শিকার আরেকটি মেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে, কারণ ধর্ষকদের বিরুদ্ধে তার কোনও অভিযোগ পুলিশ তো নেয়নি, বরং বলে দিয়েছে, কোনও একটা ধর্ষককে যেন সে বিয়ে করে নেয়। ওরা হয়তো মরে বেঁচেছে, শত শত ধর্ষিতা আর গণধর্ষিতা মেয়ে কিন্তু না বাঁচার মতো বেঁচে আছে, ধুকছে ধর্ষিতা হওয়ার চরম লজ্জা আর গ্লানিতে। যে সমাজে ধর্ষকদের লজ্জা নেই, সেই সমাজে সব লজ্জা ধর্ষিতাদের। ধর্ষণ মেয়েদের জন্য প্রাচীনকালের কণ্ঠরোগের মতো, কুষ্ঠরোগীদের সমাজ ঘৃণা করতো, ওরা কুঁকড়ে থাকতো ভয়ে, মাথা নিচু করে থাকতো, লুকিয়ে থাকতো। আজকের সমাজেও কুষ্ঠরোগীর মতো ধর্ষিতারা কুঁকড়ে থাকে। একইরকম একঘরে হয়ে যায়। এভাবেই মৃত-মতো বেঁচে থাকে, যতদিনই বেঁচে থাকে। এরকম বাঁচা কি সত্যিকার বাঁচা? ওরা বেঁচে আছে কুৎসিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, যে সমাজে পুরুষেরা মেয়েদের যত দাবিয়ে রাখে, যত তাদের দাসী বানিয়ে রাখে, যত তাদের ওপর প্রভুত্ব করে, যত তাদের জীবনকে দুঃসহ করে তোলে, তত তারা বীর পুরুষ আর পুরুষের মতো পুরুষ হিসেবে সম্মানিত হয়।

গোটা পৃথিবী এখন জানে ভারতীয় একটি মেয়ে গণধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে। শুধু জানে না, শত সহস্র মেয়েকে শুধু মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ার অপরাধে বীভৎস সব অত্যাচার সইতে হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতিদিনই তাদের মরতে হচ্ছে দুঃখে, কষ্টে, যন্ত্রনায়; অবহেলায়, অপমানে। এই সমাজে মেয়েদের সুযোগ মেলে না এক টুখানি শান্তিতে বাঁচার বা একটুখানি শান্তিতে মরার।

পুংপুজো

সতীদাহ বন্ধ হয়েছে, কিন্তু নারীবিরোধী অনেক প্রথাই বেশ বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে এই ভারতীয় উপমহাদেশে। এসব দুর করার কোনও উদ্যোগ তো নেওয়া হচ্ছেই না, বরং আরও ঘটা করে পালন করার ব্যবস্থা হচ্ছে, আরও জাঁকালো উৎসব হচ্ছে। এসবের। কিছুদিন আগেই বাঙালি হিন্দু মেয়েদের সিঁদুর খেলা হল। দুর্গা-প্রতিমা। বিসর্জনের দিন পরস্পরের মাথায় মুখে গালে কপালে চিবুকে নাকে কানে সিঁদুর মাখামাখি চললো। এই উৎসবটা মূলত– স্বামী দীর্ঘজীবী হোক, অনন্তকাল বেঁচে থাকুক, স্বামীর অসুখ-বিসুখ না হোক, দুর্ঘটনা না ঘটুক, স্বামী সুস্থ থাকুক, কস্মি নকালেও না মরুক, আমাদের যা-ইচ্ছে-তাই হোক, আমাদের সুস্থতা গোল্লায় যাক, আমাদের দীর্ঘজীবনের বারোটা বাজুক-এর উৎসব। বিধবা আর অবিবাহিতদের জন্য সিঁদুর খেলা বারণ। বারণ, কারণ তাদের স্বামী নেই! মাথায় তাদের সিঁদুর ওঠেনি, অথবা সিঁদুর মুছে ফেলা হয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্ক দুজন মানুষ বিয়ে করলো, দিব্যি একজনের শরীরে শাঁখা সিঁদুর পলা লোহার উপদ্রব চাপানো হয়, আরেকজনের শরীর আক্ষরিক অর্থে রয়ে যায় যেমন ছিল তেমন। কেউ কি এই প্রশ্নটি করে যে, যে কারণে বিবাহিত মেয়েরা শাঁখা সিঁদুর পলা লোহা পরছে, সেই একই কারণে কেন বিবাহিত পুরুষেরা শাঁখা সিঁদুর পলা লোহা পরছে না? অথবা যে কারণে বিবাহিত পুরুষেরা শাঁখা সিঁদুর পলা লোহা পরছে না, সেই একই কারণে কেন বিবাহিত মেয়েরা ওসব পরা থেকে বিরত থাকছে না?

সাফ কথা হলো, পুরুষ বিশ্বাস করে এবং নারীকেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করে। যে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুটি, মানুষ প্রজাতির মধ্যে পুরুষ নামক যে প্রাণীটি আছে, তার উরুসন্ধিতে দুই বা তিন ইঞ্চি দৈর্ঘের যে লিঙ্গটি ঝুলে থাকে, সেটি। সেটি যাদের আছে, তাদের গায়ে কোনও উপদ্রব চাপাতে হয় না। তাদের জী বন-সঙ্গী বা স্ত্রীটির সুস্থ থাকার জন্য, তার পরমায়ুর জন্য কোনও ব্রত পালন করতে হয় না, তার ধনদৌলত লাভের জন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করার কোনও আচার অনুষ্ঠানে করতে হয় না, স্ত্রীর মঙ্গলকামনায় তাদের দিনভর উপোস করতে হয় না, সিঁদুর খেলতে হয় না, যেমন স্ত্রীদের খেলতে হয় স্বামীর মঙ্গলকামনায়! পুরুষেরা বরং বেশ জমিয়ে নারীকূলের পুংলিঙ্গ পুজো দূর থেকে উপভোগ করে। পুরুষতা ন্ত্রিক সমাজে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যে যে পুজোটি চলে, সে পুংলিঙ্গ পুজো। পুরুষেরা সমাজের ঈশ্বর, সমাজের মহাশক্তিমান, মহাক্ষমতাবান, পুরুষেরা নারীর প্রভু, অভি ভাবক, অধীশ্বর, নারীর কর্তা, দেবতা। পুরুষের আরও শক্তি, আরও ক্ষমতা, আরও প্রভাব, প্রতাপ এবং প্রাচুর্য বৃদ্ধির জন্য, পুরুষের দীর্ঘজীবন এবং অমরত্বের জন্য, নারীদের, দুর্বলদের, দুর্ভাগাদের, দলিতদের, নির্যাতিত, নিপীড়িতদের উপোস করতে হয়, প্রার্থনা করতে হয় ভগবানের কাছে। পুরুষের মঙ্গলকামনায়, সুখকামনায়, স্বা স্থকামনায় ভাইফোঁটা, শিবরাত্রি, রাখী, শ্রাবণ সোমবার– কত কিছুই না সারাবছর পালন করছে নারীরা।

নারী শিক্ষিত হচ্ছে, এমনকী স্বনির্ভর হচ্ছে, স্বামীর ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেকের প্রায় নেই বললেই চলে, স্বামী ছাড়া চলবে না– এমন কোনও ব্যাপারই নেই, এমন নারীও পুরুষতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থাগুলো দিব্যি মাথা পেতে মেনে নিচ্ছে। কেউ প্রশ্ন করছে না, বিয়ের পর কেন নারীর পদবী পাল্টাতে হবে, পুরুষের পদবী নয়? কেন নারীকে তার শ্বশুরবাড়িতে বাস করতে হবে, কেন স্ত্রীর মতো পুরুষের কর্তব্য নয় শ্বশুরবাড়িতে বাস করা আর শ্বশুর শাশুড়ির সেবা করা? পণের নিয়ম যদি পালন করতেই হয়, তবে শুধু স্ত্রী কেন স্বামীকে দেয়, স্বামী কেন স্ত্রীকে পণ দেয় না? যার আছে, তারই শুধু চাই চাই! গোটা সমাজ তাকেই ঢেলে দিচ্ছে, তাকেই ভরে দিচ্ছে, যার অনেক আছে। অত্যাচারীকে করছে আরও দ্বিগুণ অত্যাচারী। ছলে বলে কৌশলে মেয়েদের দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক পরনির্ভরতা, তার ওপর ধরে বেঁধে যোগ করা হয়েছে শারীরিক আর মানসিক পরনির্ভরতা।

ভারতবর্ষের বেশ কিছু রাজ্যের বিবাহিত মেয়েরা করবা চৌথ পালন করে। সূর্যোদয় থেকে চন্দ্রোদয় অবধি স্বামীর সুস্বাস্থের জন্য উপোস। চাঁদ দেখবে তবে জলস্পর্শ করবে লক্ষ লক্ষ পতিতা স্ত্রী। এটিও ওই পুংপুজো। এই সব আচার অনুষ্ঠানের একটিই সারকথা, সংসারে স্ত্রীর নয়, স্বামীর জীবনটি মূল্যবান। দরিদ্র অশিক্ষিত-পরনির্ভর মেয়েরা নয়, পুরুষতান্ত্রিক আচার অনুষ্ঠানগুলো বেশির ভাগই পালন করছে উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষিত স্বনির্ভর মেয়েরা। এই মেয়েরাই কিন্তু আজকাল ধর্ষণ এবং অন্যান্য নারী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে খুব সরব, কিন্তু সিঁদুর খেলা বা করবা চৌহ পালন করছে রীতিমত উৎসব করে। ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, করবা চৌথ, সিঁদুর খেলা– সবই পুরুষতন্ত্রের নারীবিরোধী উপসর্গ। একসময় ধর্ষণকে অপরাধ ভাবা হত না, ইদানীং ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের ফলে ধর্ষণকে ভয়াবহ অপরাধ বলে ভাবা হয়। যদি করবা চৌথএর বিরুদ্ধে মিডিয়া মুখর হয়, মানুষ পথে নামতে থাকে, করবা চৌথকেও বড় অন্যায় কাজ বলে ভেবে নেবে বেশির ভাগ মানুষ। নারীবিরোধী এসব অনুষ্ঠান নিয়ে আজকাল তুমুল বাণিজ্যও হচ্ছে। করবা চৌথের চোখ ধাঁধানো উৎসব এখন সিনেমায়, থিয়েটারে, টিভি সিরিয়ালে। বিজ্ঞাপনে পু রুষতান্ত্রিক আচারাদিতে অলংকৃত লাস্যময়ী নারীদের ঝলমলে দৃশ্য। যে মেয়েরা দূর থেকে দেখে এসব, দুঃখ দুর্দশার জীবন যাদের, তাদের ইচ্ছে হয় সাজগোজ করা ফর্সা ফর্সা সুখী সুখী মেয়েদের মতো উৎসব করতে তারাও একসময় বাণিজ্যের ফাঁদে পাদেয়, শাড়ি গয়না কেনার ফাঁদে। এমনিতেই এই সমাজ মেয়েদের পণ্য বলে ভাবে। পুংপুজোর আচারে অংশ নিয়ে মেয়েরা নিজেদের আরও বড় পণ্য করে তোলে। এসব করে যত বেশি পুরুষকে মূল্যবান করে মেয়েরা, ততবেশি নিজেদের মূল্যহীন করে। পুরুষতান্ত্রিক অসভ্যতাকে, অসাম্যকে, লিঙ্গবৈষম্যকে, নারীবিরোধিতাকে, নারীবিদ্বে ষকে, নোংরামোকে কেবল সহনীয় নয়, আদরণীয় আর আকর্ষণীয় করার পায়তারা চলছে চারদিকে। যেসব রাজ্যে করবা চৌহ পালন হতো না, এখন সেসব রাজ্যেও। পালন হয়। পুরুষতন্ত্র বড় সংক্রামক।

মানুষ সামনে এগোয়। সভ্য হয়। বৈষম্য ঘোচায়। সমাজ বদলায়। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে মেয়েরা যত শিক্ষিত হয়, যত নিজের পায়ে দাঁড়ায়, ততই পিতৃতন্ত্রকে মাথায় তুলে নাচা হয়, ততই ধর্মের ঢোল বাজানো হয়। ওপরে ওপরে মনে হয় সমাজ বদলেছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে হাজার বছরের পুরোনো সমাজ তার পচা গলা শরীর নিয়ে অন্ধকারে ঠায় বসে আছে, তাকে নাড়ায় সাধ্য কার?

এই সমাজ নারীকে নানাভাবে উৎসাহিত করে পুরুষতন্ত্রের শিকার হতে। পুরুষের অধীনতা মেনে নিলে সমাজ নারীকে বাহবা দেয়। নিজের অধীনে নয়, নারী যেন কোনও না কোনও পুরুষের অধীনে থাকে। নারীর অধীনতাকে বা পরাধীনতাকে নারীর গুণ হিসেবে ধরা হয়। গুণবতী নারী হওয়ার এই পুরস্কারটি যার জোটে, সমাজ তার ওপর খুব খুশি থাকে। সমাজকে খুশি করতে মেয়েরা যে করেই হোক চায়। কারণ একে অখুশি রেখে বা অসন্তুষ্ট রেখে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব।

পুংরা যে সমাজে প্রতিদিন বধূহত্যা করছে, বধূনির্যাতন করছে, ধর্ষণ করছে, গণ ধর্ষণ করছে, কন্যাশিশু হত্যা করছে, সেই সমাজে আড়ম্বর করে মেয়েরাই পুংপুজো। করছে। পুংপুজোর দৃশ্য দেখে মাঝে মাঝে আঁতকে উঠি। পুংদের বোধোদয় কি আদৌ ঘটবে কোনওদিন? পুংআধিপত্যবাদের কৌশল শিখে বেড়ে ওঠা পুরুষেরা কি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারবে যা শিখেছে সব? ঝেড়ে না ফেললে সমানাধিকারের শিক্ষাটা গ্রহণ করায় যে খুব মুশকিল হবে!সমানাধিকারের কোনও চর্চাই নেই নারী পুরুষের সম্পর্কে। পুরুষ মনে করে তার পুরুষত্ব খানিকটা খসে গেলে বুঝি অপমান হবে তার, নারী মনে করছে তার নারীত্ব কিছুটা কমে গেলে রক্ষে নেই। এক একজন প্রাণপণে বজায় রাখতে চায় পুরুষ আর নারীর জন্য সমাজের বানানো কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, পুরুষত্ব, আর নারীত্ব। যদি ধরেই নিই পুরুষের ভেতর তথাকথিত এই পুরুষত্ব আর নারীর ভেতর তথাকথিত এই নারীত্ব আছে, তারপরও কিন্তু নিশ্চয় করে বলা যায় যে পুরুষের ভেতরে যা আছে তার একশভাগই পুরুষত্ব, নারীর ভেতরে যা আছে তার একশভাগই নারীত্ব– এ সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সমাজ চোখরাঙায় বলে পুরুষ প্রকাশ করতে চাইছে না তার ভেতরে যেটুকু নারীত্ব আছে সেটুকু। নারীকে প্রকাশ করতে বাধা দেওয়া হয় তার ভেতরের পুরুষত্বটুকু। যদি সমাজের বাধা না থাকতো, যদি সত্যি সত্যি খুলে মেলে ধরতে পারতো নিজেদের সত্যিকার চরিত্র, তাহলে সমতা আসতো সম্পর্কে। পুরুষও কষ্ট পেলে হু হু করে কাঁদতো, শিশুপালন করতো, ভালোবাসার মানুষকে বেঁধে খাওয়াতো, তার শাড়ি কাপড় কেচে ইস্ত্রি করে রাখতো। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যে মাথার ওপর বসে খবরদারি করছে। পুরুষকে শুধু নৃশংসতা করে যেতে হবে, নারীকে শুধু সর্বংসহার মতো সয়ে যেতে হবে। যতই যা হোক, নারী কিন্তু প্রমাণ করেছে পুরুষ যা পারে নারীও তা পারে। নারী পুরুষের মতোই পোশাক পরতে পারে, পুরুষের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে পারে, পুরুষের মতোই পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে পারে, মহাশুন্যে পাড়ি দিতে পারে, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে বাণিজ্য করতে যেতে পারে। পুরুষ কিন্তু আজও প্রমাণ করতে পারছে না নারী যা পারে, তা পুরুষও পারে। ঘরদোর সাফ করা, সংসারের রান্নাবান্না করা, খাবার পরিবেশন করা, শিশুর লালন পালন এখনও করছে না পুরুষেরা। যতদিন না করবে, ততদিন এ কথা বলার উপায় নেই যে সংসারে বৈষম্য নেই। যতদিন সমাজে পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্র টিকে আছে, ততদিন এই সমাজ কাউকে সমতার আর সমানাধিকারের দিকে হাত বাড়াতে দেবে না। হায়ারার্কি বা স্তরতন্ত্র কিন্তু গড়ে উঠেছে পেট্রিয়ার্কি বা পিতৃতন্ত্রের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই। স্তরতন্ত্রে অধীনতা এবং আধিপত্যের অবসান ঘটানো, অথবা ক্ষমতার উঁচু নিচু স্তরকে ভেঙে সমান করে দেওয়া সম্ভব নয়। সম্ভব করতে হলে স্তরতন্ত্রটাকেই আগেবাতিল করতে হয়। নারী পুরুষের সমতাও পিতৃতন্ত্রের বিলুপ্তি না হলে কখনও সম্ভব নয়। পণপ্রথা বন্ধ করো, ধর্ষণ বন্ধ করো, বধূ নির্যাতন বন্ধ করো বলে বলে সারাবছর চেঁচালেও এসব উপসর্গ কখনও উবে যাবে না। যতদিন রোগটা আছে, উপসর্গগুলো ঘাপটি মেরে থেকেই যাবে। রোগটা সারাতে হবে।

প্রেম ট্রেম

অনেকদিন প্রেম না করলে এমন হয়, প্রেম করতে ভুলে যাই। প্রেম না করে বছরের পর বছর কী করে যে পার করি। ভাবলেই কষ্ট হতে থাকে সারা শরীরে। প্রেম কার সঙ্গে করবো? হাবিজাবি লোকদের সঙ্গে প্রেম করার চেয়ে বেড়াল নিয়ে খেলা করা অনেক ভালো। প্রেম না করার অনেক সুবিধে আছে, প্রচুর সময় জোটে যা ভালো লাগে তা করার, পড়ার, লেখার, ভাবার,কোথাও যাবার। প্রেমিক থাকা মানে চব্বিশ ঘণ্টা তাকে নিয়ে থাকতে হবে, তার সঙ্গে কথা বলতে হবে, তাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে, ঘন ঘন তাকে ফোন করতে হবে, টেক্সট করতে হবে, তার সুবিধে অসুবিধে দেখতে হবে, সে কী খেতে কী শুনতে কী করতে পছন্দ করে– সব মুখস্ত রাখতে হবে, তার জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, সে বেড়াতে চাইলে বেড়াতে যেতে হবে, সঙ্গে বসে খেতে হবে, শুতে চাইলে শুতে হবে, যা কিছুই বলুক, যত অর্থহীন কথাই বলুক, মন দিয়ে শুনতে হবে। এসব ভাবলে আমার গায়ে জ্বর চলে আসে। ফুলটাইম প্রেমিকের বদলে পার্ট টাইম প্রেমিক থাকা ঢের ভালো। আমার জীবনটা বেশির ভাগ সময় আমারই রইলো, ফুল টাইমের ধকল থেকে বাঁচলো, পর্বতপ্রমাণ দায়িত্বের বোঝা বয়ে হাড়গোড় গুঁড়ো হল না, মাঝে মধ্যে তুমুল প্রেমও হল, শুকিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচলো জীবন। কিন্তু সাপিয়োসেক্সয়ালদের জন্য যার তার সঙ্গে প্রেম করা একটু অসুবিধেই বটে। সাপিয়োসেক্সয়ালরা প্রতিভাবান, বু দ্ধিদীপ্ত মানুষ ছাড়া আর কারও প্রতি আকৃষ্ট হয় না। একটা ছফুট হ্যাঁণ্ডসাম গবেট এনে দাও, দু মিনিট কথা বলে আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবো। শেষ প্রেম তিন বছর আগে করেছিলাম। পার্ট টাইমই ছিল। কিন্তু বেচারা এমনই ফুল টাইম প্রেমিকের মতো আচরণ শুরু করেছিল, যে, আমার লেখাপড়ার বারোটা বেজেছিল। উপদ্রব বিদেয় হয়েছে, বেঁচেছি। আজ আবার তিনবছরের হিসেবটা করে মনে হচ্ছে জীবন শুকিয়ে যাচ্ছে, কালে ভদ্রে একটু মদ্যপান করার মতো কালে ভদ্রে একটুখানি প্রেম না হলে মনে হচ্ছে আর চলছে না। দীর্ঘ দিন লেখাপড়ায় ডুবে থাকলে নিজেকে কেমন জম্বি বলে মনে হয়, তখন আড়মোড়া ভেঙে, উঠে, চা-টা খেয়ে, চান টান করে, বিছানায় গা এলিয়ে দিলে ইচ্ছে হয় কেউ এসে ঠোঁটে আলতো করে একটু চুমু খাক, কবিতা শোনাক, একটুখানি ভালোবাসুক। উন্মাদের মতো ভালোবাসুক, চাইনা। ও খুব রক্তক্ষয়ী। বেশ কবার আমাকে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলে পালাতে হয়েছে।

চিরকালই আমি ভুল মানুষের সঙ্গে প্রেম করেছি, এতে সবচেয়ে বড় যে সুবিধে হয়েছে তা হল কারও সঙ্গে দীর্ঘকাল সংসার করতে হয়নি আমার। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ একটা লোক আমার শোবার ঘরে, আমার পড়ার ঘরে, আমার বসার ঘরে, আমার বারান্দায়, আমার বাথরুমে অবাধ বিচরণ করবে, আর ভালোবাসার শর্ত হিসেবে আমার তাকে বর্ণনা করতে হবে আমি কোথায় গেলাম, কী করলাম, কী লিখলাম, কী ভাবলাম, কী খেলাম, থেকে থেকে মিষ্টি মিষ্টি হাসতে হবে আর তাকে সুখ শান্তি দিতে সকাল সন্ধ্যা বলতে হবে অথবা বোঝাতে হবে যে তাকে ভালোবাসি, — ভাবলে আমার শ্বাসকষ্ট হতে থাকে। ভালোবাসলে যে কারও গাধামো আর ছা গলামোকেও মধুর মনে হয়, জানি। দীর্ঘদিন ভালোবাসা পেলে পদার্থও কিন্তু অপদার্থ হয়ে ওঠে, আর অপদার্থের সঙ্গে এক বাড়িতে জীবন যাপন বেশিদিন করলে সত্যিকার জম্বি হয়ে যেতে হয়। পার পাওয়ার কোনও পথ থাকে না। মাঝে মধ্যে ভাবি, ভুল প্রেমিকের বদলে ঠিকঠাক প্রেমিক পেলে সর্বনাশ হতো আমার। ওই এক চেহারা দেখতে দেখতে, ওই এক পড়া-বই বারবার পড়তে পড়তে, বিরক্ত হওয়ারও বোধ শক্তিও বোধহয় হারিয়ে যেত। দীর্ঘদিন কারও সঙ্গে বাস করলে ওই হয়, বোধবুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। তারপর বাচ্চা কাচ্চা ঘটে যাওয়া মানে তো নির্ঘাত পরপারে চলে যাওয়া। ভুল প্রেমিকেরা আমাকে জন্মের বাঁচা বাঁচিয়েছে। এখন একখানাভুল প্রেমিক জুটে গেলে দীর্ঘ তিন বছরের প্রেমহীন জীবনের দুঃখও কিছু ঘোচানো যাবে। মুশকিল হল, এই জোটানো জিনিসটাই আমি সারাজীবনে পারিনি। ও পথে আমার পা এক পাও চলে না। লোকেরা বরং সময় সময় আমাকে জুটিয়ে নিয়েছে। আমার নিজের পছন্দে একটি প্রেমও আমি আজ অবদি করিনি। অন্যের পছন্দের বলি হয়েছি ব্বেল। ভাবলে শিউরে উঠি। এই তো গত সপ্তাহে এক চোখ ধাঁধানো বেঞ্জ যুবকের সঙ্গে পরিচয় হল। নিউরোসায়েন্সে পিএইচডি করেছে, এখন শখের ফিল্ম ফেস্টিভেল সা মলাচ্ছে কদিনের জন্য। আমি ছিলাম ওই মিলেনিয়াম ফিল্ম ফেস্টিভেলের অতিথি। ছবিতে আমার পাশে সাদা সার্ট পরা ছেলেটিই ডেভিড, যার কথা বলছিলাম।

ওকে দেখে আমার মনে হল প্রেম করার জন্য পারফেক্ট একটা ছেলে। বুদ্ধিদীপ্ত, তার ওপর সুদর্শন। কিন্তু হলে কী হবে, ওর বয়স সাতাশ। আমার হাঁটুর বয়সী। বয়সটা শুনে প্রেমের উদ্রেক হওয়ার বদলে একটুখানি স্নেহের উদ্রেক হল। এখানেই পুরুষের মতো হতে পারি না। না পারার পেছনে কতটা আমি আর কতটা সমাজের মরালিটি লেসন, তা মাপা হয়নি। হাঁটুর বয়সী মেয়েদের সঙ্গে পুরুষেরা দিব্যি প্রেম করছে। আর মেয়েদের যেন বেছে নিতেই হবে দ্বিগুণ ত্রিগুণ বয়সী বুড়ো ভামকে। না, আজকাল বুড়োদের আমি আমার ত্রিসীমানায় ঘেষতে দিতে রাজি নই। কলকাতার এক ভেতরে-ভেতরে-বুড়ো-কিন্তু-বাইরে-বাইরে-তুখোড়-যুবকের প্রেমে হঠাৎ করে পড়েছিলাম, কী ভীষণ ঠকাই না ঠকেছিলাম। লাভের লাভ এক বই কবিতা লেখা হয়েছে। যদিও খুব জ্ঞানীগুণী দার্শনিকের মতো আমরা প্রায়ই বলি, জীবন একবারই আসে,জীবন খুব ছোট, চোখের পলকে ফুরিয়ে যায়, জীবনটাকে উপভোগ করো, সাধ মিটিয়ে প্রেম করো– কিন্তু বুঝি যে বলা সহজ, করাটা সহজ নয়। প্রেম করা কি অতই সহজ! বিশেষ করে মেয়ে হয়ে জন্মালে, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, পুরুষেরা যেখানে রাজা, আর মেয়েরা প্রজা? প্রভু আর দাসীর সম্পর্কের তুলনা নাহয় আজ বাদই দিলাম। নারী-পুরুষে সমানাধিকার নেই যে সমাজে, সে সমাজে নারী পুরুষের মধ্যে আর যা কিছু হোক, প্রেম হয় না। সমকামীদের সম্পর্ক বিষমকামীদের সম্পর্কের তুলনায়, আমি মনে করি, ঢের ভালো। অন্তত জেণ্ডারের বৈষম্যটা ওই সম্পর্কে নেই। প্রেম করার চেয়ে বরং সেক্স করা ভালো এইসব সমাজে। তাই বা বলি কী করে, সেক্সটা পুরুষরা ভাবে, অব দ্য পুরুষ, ফর দ্য পুরুষ, বাই দ্য পুরুষ। ভারতীয় উপম হাদেশের কোনও পুরুষের মুখে আমি আজ অবদি শুনিনি, উই মেইক লাভ, এ যাবৎ যা শুনেছি, তা হল, আই মেইক লাভ টু হার। এমন যারা বলে তাদের সঙ্গে শুতে ইচ্ছে করে? একদমই না। শুধু বলেই না, মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে সেক্সটা ম্যান। থিঙ্গ বড় করুণা হয় বেচারা পুরুষগুলোর জন্য। দাসীবাঁদি, অধঃস্তনদের জীবনসঙ্গী করে জেনারেশনের পর জেনারেশন কাটিয়ে গেল। সমকক্ষ অথবা সমানে সমান মেয়েদের সঙ্গে একটা সভ্য সমৃদ্ধ জীবন কাটালো না। পুরুষ-নারীতে এত বড় এক (মেন-মেইড) ব্যবধান তৈরি করা হয়েছে যে এটা সারাতে আরও কশ বছর লাগে কে জানে! জানি অনেকে অবাক হচ্ছে, এই বয়সেও প্রেম আর সেক্স নিয়ে ভাবছি আমি! আসলে ওরা তো ওদের মা দিদিমাকে দেখেছে কুড়িতেই বুড়ি হতে, না হলেও মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি প্রবাদটা তো শুনতে শুনতে বড় হয়েছে! এইসব নিম্নমানের নারীবিরোধী প্রবাদ একসময় আমাকেও প্রভাবিত করতো। উনিশ পেরোতেই হুড়মুড় করে আমার ভেতরে বার্ধক্য চলে এলো। একুশ বছর বয়সে বেশ অনেকগুলো মৃত্যুর কবিতা লিখে ফেলেছিলাম। জীবন আসলে আমি যাপন করতে শুরু করেছি আমার চল্লিশের পর থেকে। এর আগে প্রতি বছরই আমাকে লোকেরা ভাবতে বাধ্য করতো যে জীবন ফুরিয়ে গেছে, যদিও ভীষণ টগবগে জীবন আমি যাপন করে গেছি, পু রুষতন্ত্রের গায়ে চাবুক চালানোর মতো স্পর্ধা করেছি, সেই ষোলা সতেরো বছর বয়স থেকেই প্রচলিত কোনও নিয়ম কানুন মানিনি, নানা প্রথা আর নিষেধের দেয়াল ডিঙিয়েছি একা একা, রীতিগুলো পায়ে মাড়িয়েছি, বাধাগুলো ছুঁড়ে ফেলেছি, অসম্ভব অসম্ভব কাণ্ড করেছি। আমার জীবনে প্রেমের খুব বড় ভূমিকা কখনও ছিল না। যখন প্রেমের পেছনে যৌবন ব্যয় করার কথা, ব্যয় করেছি প্রেমপ্রার্থী যুবকদের সামনে উঁচু দেয়াল তৈরি করতে, যেন আমার ছায়াই কখনও না মাড়াতে পারে। সেই কিশোরী বয়স থেকেই আমি ছিলাম ধরা ছোঁয়ার বাইরে একটা মেয়ে। বাবার বাড়ি-কাম-দুর্গে জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে। হাসপাতালের চারদেয়ালের মধ্যে ডাক্তারি পড়ায় আর ডাক্তারি করায় ব্যস্ত থেকেছি। কুড়ির কোঠায় বয়স, সুন্দরী বিদুষী ডা ক্তার-কাম- লেখক, তাও আবার জনপ্রিয় লেখক, লোভ করেনি ছেলে কমই ছিল। গা বাঁচাতেই ব্যস্ত ছিলাম, প্রেম করার ইচ্ছে হঠাৎ হঠাৎ উদয় হতো, কিন্তু সে কল্পনার কোনও ভালমানুষ পুরুষের সঙ্গে। বাস্তবে যে কটা পুরুষকে চোখের সামনে দেখেছি, কেউই আমার সেই ভালোমানুষ পুরুষটার মতো ছিল না। নিতান্তই সরল সহজ, মিথ্যে না বোঝা, জটিলতা না বোঝা, হিংসে বিদ্বেষ, ছল চাতুরি না বোঝা, সাহিত্যে আর চিকিৎসাশাস্ত্রে বুঁদ হয়ে থাকা আমি তারপরও দুএকজন বাস্তবের পুরুষকে ভা লোমানুষ কল্পনা করে নিয়েছিলাম, নেওয়ার দুদিন পরই জ্বলে পুড়ে ছাই হতে হল। বলে না, চুন খেয়ে মুখ পুড়লে দুই দেখে ভয় লাগে। আমারও তাই হয়েছিল, ধেয়ে আসা পুরুষদের আমার মনে হতো নরকের আগুন। না, আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না কেউ। একটা অদৃশ্য দুর্গ চিরকালই আমি রচনা করে রেখেছি। আমি ছাড়া কারও সাধ্য নেই সেই দুর্গের দরজা খোলে।

জীবনের অনেকটা পথ চলা শেষ করে, একটা জিনিস আমার জানা হয়েছে, খুব কম পুরুষই, সে দেশের হোক বিদেশের হোক, সাদা হোক কালো হোক, নারী-পুরুষের সমানাধিকারে যে মেয়েরা প্রবল ভাবে বিশ্বাস করে, সেই সচেতন, শিক্ষিত, স্বনি ভর মেয়েদের সঙ্গে সংসার করতে বা প্রেম করতে আগ্রহী। পুরুষ যদি ইনসিকিউর না হতো, পুরুষতন্ত্রকে কবেই সমাজ-ছাড়া করতো। আত্মবিশ্বাস না থাকা পুরুষই বৈষম্যের পুরোনো প্রথাকে আঁকড়ে ধরে রাখে, তাদের ভীষণ ভয়, পুরুষতন্ত্র ভেঙে পড়লেই বুঝি মেয়েরা পুরুষের প্রভু বনে যাবে, হাজার বছর ধরে পুরুষদের নির্যাতন করবে, যেরকম নির্যাতন হাজার বছর ধরে পুরুষেরা করছে মেয়েদের। ইনসিকিউর লোকদের সঙ্গে প্রেম করে আনন্দ নেই, এ কথা নিশ্চয় করে বলতে পারি।

ফাঁসিতে বিশ্বাসী দেশগুলো কাদের মোল্লার ফাঁসির সমালোচনা করছে কেন?

 

আমি ফাঁসি বিরোধী মানুষ। আমি মনে করি, প্রতিটি মানুষের বাঁচার অধিকার আছে। প্রতিটি যুদ্ধাপরাধীর বিচার হওয়া উচিত। ফাঁসির বদলে অন্য যে কোনও শাস্তি তারা পেতে পারে। যাবজ্জীবন? নয় কেন? অবশ্য আজকাল আমি যাবজ্জীবনেও আপত্তি করি। জেলখানা ব্যাপারটাকেই আমি পছন্দ করি না। জেলখানাগুলো হতে পারে সংশোধনী কেন্দ্র। যতদিন মাথার কুচুটে কীটগুলো মরে যাচ্ছে, বা মাথা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, ততদিন অপরাধীরা থাকবে ওই কেন্দ্রে। কে যেন একজন বলেছিলেন, জে লখানার ঘরগুলো হতে পারে এক একটা ক্লাসরুম, আর জেলখানাগুলো এক একটা বিশ্ববিদ্যালয়। কিছুদিন আগে সুইডেনের কিছু জেলখানা বন্ধ করে দিতে হয়েছে, কারণ জেলে মোটে লোক নেই। অপরাধের সংখ্যা কম, তাই আসামীর সংখ্যাও কম। সমাজটাকে বৈষম্যহীন যুত করা যায়, যত সমতা আনা যায় মানুষে-মানুষে, অপরাধ তত কমে যায়। সে সুইডেনের ব্যাপার, বাংলাদেশ তো আর সভ্য হয়নি, জেলখানা বন্ধ করে দেওয়ার স্বপ্ন না হয় আপাতত থাকুক। অন্য কথা বলি। বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বলছে, বলুক। তারা সারা পৃথিবীর যে দেশেই মৃত্যুদণ্ডের আইন আছে, সেই দেশকেই বলছে, মৃত্যুদণ্ডের আইন বাতিল করো। কিন্তু আমার প্রশ্ন, যে দেশগুলো মৃত্যুদণ্ডের আইন বহাল রেখেছে, নিজেরাও মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে ঘনঘন, সেই দেশগুলো বাংলাদেশের মৃত্যুদণ্ড নিয়ে অত অশ্রু বিসর্জন করছে কেন? তারা কি অন্য কোনও দেশে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে এমন হামলে পড়ে, এমন মড়াকান্না কাঁদে? তারা কি চীনের বা সৌদি আরবের বা। ইরানের বা আমেরিকার বা উত্তর কোরিয়ার চৌকাঠে নাছোড়বান্দার মতো এমন বসে থাকে? বাংলাদেশে অন্য কারও ফাঁসি হলে তো এদের চেহারা দেখা যায় না। তবে। কি কাদের মোল্লার ফাঁসি বলেই এত হাহাকার? কাদের মোল্লা মৌলবাদী বলে? আর। যাকেই মারো, ইসলামী মৌলবাদীর গায়ে আঁচড় কাটতে পারবে নাঃ কাদের মোল্লা যুদ্ধাপরাধী এ কথা কেউ বলছো না কেন? আজও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের খুনীদের বিচারে নানা দেশের শোক দেখে স্তম্ভিত হই। মৌলবাদী অপশক্তির বন্ধুর সংখ্যা কম নয় আজ সারা বিশ্বে। যে পশ্চিমী দেশ গুলোকে ইসলামের শত্রু বলে ভাবা হতো, তারাও দেখা যায় ইসলামী মৌলবাদীদের প্রতি অস্বাভাবিকরকম সহানুভূতিশীল। আমার আর ইচ্ছে করে না ভাবতে কী কী রাজনীতি আছে মৌলবাদ সমর্থনের পেছনে। একাত্তরের যুদ্ধকে মৌলবাদ সমর্থক পশ্চিমী গোষ্ঠী যুদ্ধই মনে করতে চায় না। যেন গরিব দেশের যুদ্ধ কোনও যুদ্ধ নয়, তিরিশ লক্ষ মানুষের মরে যাওয়া কোনও মরে যাওয়া নয়, দুলক্ষ মেয়ের ধর্ষণ কোনও ধর্ষর্ণ নয়। যেন আমাদের দুর্ভিক্ষ, আমাদের ক্ষুধা, আমাদের অভাব, অশি ক্ষাই সত্য, আর কিছু সত্য নয়। যেন আমাদের ভাষা, আমাদের গান, ভালোবাসা, আমাদের ব্যক্তিত্ব, আমাদের সংগ্রাম, আমাদের সাহস, আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন– কিছুই সত্য নয়, মূল্যবান নয়।

আমি মৃত্যুদণ্ডে কেন বিশ্বাস করি না, তা বলছি। কোনও প্রাণীই বা কোনও মানুষই অপরাধী বা সন্ত্রাসী হয়ে জন্ম নেয় না। একটি শিশুকে যদি সুস্থ সুন্দর শিক্ষিত পরিবেশ দেওয়া না হয়, একটি শিশুর গড়ে ওঠার সময় যদি তার মস্তিষ্কে ক্রমা গত আবর্জনা ঢালা হতে থাকে, তবে এই শিশুরাই বড় হয়ে অপরাধে আর সন্ত্রাসে নিজেদের জড়ায়। এ কি ওদের দোষ? নাকি যারা আবর্জনা ঢালে, আবর্জনা ঢালার যে প্রথা যারা চালু রাখছে সমাজে, তাদের দোষ! একই সমাজে বাস করে আমি মৌলবাদ বিরোধী, কাদের মোল্লা বা দেলওয়ার হোসেন সাইদি মৌলবাদী, কেউ খুনী, ধর্ষক, চোর, আবার কেউ সৎ, সজ্জন। সমাজ এক হলেও শিক্ষা ভিন্ন বলেই এমন হয়। একদল লোক বিজ্ঞান শিক্ষা পাচ্ছে, মানবাধিকার সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করছে, আলোকিত হচ্ছে। আরেক দলকে ধর্মান্ধ, মুখ, কূপমণ্ডুক আর বর্বর বানানো হচ্ছে, ফেলে রাখা হচ্ছে ঘোর অন্ধকারে। শিক্ষার ব্যবস্থাটা সবার জন্য সমান হলে, শিক্ষাটা সুস্থ শিক্ষা হলে, সমানাধিকারের শিক্ষা হলে, মানুষেরা মন্দ না হয়ে ভালো হতো। ছোটখাটো অভদ্রতা, অসভ্যতা, টুকিটাকি অপরাধ থাকলেও সমাজ এমনভাবে নষ্ট দের দখলে চলে যেতো না, এত লক্ষ লক্ষ লোক খুনের পিপাসা নিয়ে রাজপথে তাণ্ডব করতো না। কাদের মোল্লার জন্য বিদেশের কয়েকজন কাঁদলেই আঁতকে উঠি, কিন্তু দেশের লোকেরা যে উন্মাদ হয়ে উঠেছে কাদের-প্রেমে? এরাই তো এক একজন কাদের মোল্লা। এক কাদের মোল্লাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু হাজার হাজার কাদের মোল্লা যে বিজ্ঞানমনস্ক মৌলবাদ-বিরোধী মানুষদের গলা কাটছে, তাদের কী করা হবে? গুটিকয় মৃত্যুপথযাত্রী অথর্ব যুদ্ধপরাধীর চেয়েও লক্ষ লক্ষ ইসলামী মৌলবাদী নিসন্দেহে ভয়ংকর। তারা আজ যুদ্ধপরাধী কাদের মোল্লার স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক একজন সৈনিক।

যে দেশে সবার জন্য খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা স্বাস্থ্য নেই, সেই দেশে অরাজকতা থাকেই। অন্য সব ব্যবস্থার মতোই বিচার ব্যবস্থাতেও আছে গলদ। সে কারণেই অপরাধ করলে কী কারণে অপরাধ করেছে, কোথায় ভুল ছিল এসব না ভেবে, ভুলগুলো শোধরানোর চেষ্টা না করে অপরাধীকে জেলে ভরা হয়, মেরে ফেলা হয়। ফাঁসি দিয়ে অনেক সমস্যার চটজলদি সমাধান করতে চায় সরকার। কিন্তু এতে সমস্যার সত্যিকারের সমাধান হয় না। আমি ভবিষ্যতের কথা ভাবি, মৌলবাদী অপশক্তির অবসান চাই। অবসান ফাঁসি দিয়ে হয় না, এই অবসান সুশিক্ষা দিয়ে করতে

সমাজকে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, নারীবিদ্বেষ থেকে মুক্ত করতে হলে মানুষকে। শিশুকাল থেকেই শিক্ষা দিতে হবে বিজ্ঞান, মানববাদ, সমানাধিকার। এই শিক্ষা পেলে শিশুদের ধর্মান্ধ, ধর্ষর্ক আর খুনী হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।

জামাতে ইসলামির লোকেরা যে ভয়ংকর বর্বরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশে, তা দেখে আমি অবাক হইনি। কারণ আমি অনেক বছর থেকেই জানি যে জামাতে ইসলামি একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত হলেও এটি একটি সন্ত্রাসী দল ছাড়া কিছু নয়। এদের রাজনীতি ঘৃণার, বৈষম্যের, অন্ধত্বের, অকল্যাণের, পঙ্গুত্বের, হত্যার। এই রাজনীতিকে সমাজে প্রবেশের করার সুযোগ দিলে এই রাজনীতি মানুষকে, দেশকে, দেশের ভবিষ্যতকে ধ্বংস করে দেবে। খুব সংগত কারণেই জামাতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা উচিত। পৃথিবীর সব দেশেই সন্ত্রাসী দল নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে গেলে গেল রে গেল রে বলে ছুটে এসে বাধা দেয় অনেকেই। যে দল গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, সেই দলকে গণতন্ত্রের নামে বাঁচিয়ে রাখবো আর হাসতে হাসতে সে আপনার রগ কাটবে, আমার গলা কাটবে– এ আমরা জানি। জেনেও না জানার ভান আর কেউ করলেও আমি করি না। বাংলাদেশকে একটা ধর্মীয় মৌলবা দীতে ঠাসা, অনুন্নত, অশিক্ষিত, ধর্মান্ধ দেশ হিসেবে তৈরী করার বাসনা দেশের এবং দেশের বাইরের অনেকেরই যথেষ্ট। আমি মত প্রকাশের স্বাধীনতায় প্রচণ্ড বিশ্বাসী হয়েও একটি দলকে নিষিদ্ধ করতে চাইছি, কারণ জামাতে ইসলামী রাজনৈতিক দল। হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য নয়।

যুদ্ধাপরাধীরা প্রায় সবাই ইসলামী মৌলবাদী। মৌলবাদী-যুদ্ধাপরাধী বাইসলামী মৌলবাদীদের খুব বড় শত্রু আমি। তারা আমাকে খুন করার জন্য আজ একুশ বছর হলো ছুরিতে শান দিচ্ছে। হাতের কাছে পেলেই আমাকে জবাই করবে। এটা জেনেও আমি কিন্তু ওদের কারো ফাঁসি চাইছি না। ওরা ভালো মানুষ হোক, চাইছি। ওদের সন্তানেরা প্রগতির পক্ষের মানুষ হোক, চাইছি। ওদের সন্তানের সন্তানেরা যেন না জানে ধর্মান্ধ মৌলবাদ কাকে বলে, যেন সবাই একটা শ্রেণীহীন, বৈষম্যহীন, কুসংস্কা রহীন সুন্দর পরিবেশ পায় বাস করার। সব মানুষ, এবং সব সন্তানই যেন পায়। সেই স্বপ্নের জন্য লড়াই আমার। আমি ওই সমতার সমাজ বেঁচে থাকতে দেখতে পারবো। না, কিন্তু আমি সামান্য ভূমিকা রাখতে চাই সেই সুস্থ সমাজ গড়ায়, তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েও লিখছি, মানুষকে লড়াই কার প্রেরণা দিচ্ছি। যে দেশকে আজ দেশ বলে মনে হয় না, যে দেশ নিয়ে আজ লজ্জা হয়, চাইছি, সেই দেশ নিয়ে ভবিষ্যতের মানুষেরা গর্ব করুক। রক্তাক্ত রাজপথ নিয়ে নয়, একটি নিরাপদ স্বদেশ নিয়ে গর্ব।

ভারত এখন তরুণ তেজপাল নিয়ে ব্যস্ত। তরুণ তেজপাল তেহেলকার সম্পাদক, নামী দামী বুদ্ধিজীবী। তাঁর তেহেলকা হিন্দু মৌলবাদের বিরুদ্ধে খুব সরব। যেহেতু আমি মৌলবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল সংগ্রাম করছি, তেহেলকার এই ভূমিকাকে শুরু থেকেই স্বাগত জানিয়েছি। মাঝে মাঝে তেহেলকায় খুঁজেছি মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে একই রকম বলিষ্ঠ লেখা, খুঁজেছি ক্রিশ্চান মৌলবাদের বিরুদ্ধে লেখা। হয়তো কখনো কখনও কিছু লেখা হয়, তবে খুব বলিষ্ঠ নয়। বেশির ভাগ সময় মুসলিমদের পক্ষ নিতে গিয়ে ইসলামের গুণগানও গেয়ে ফেলে। এটিই দুর্ভাগ্যবশত ভারতীয় সেকুলার বা বামপন্থী নরমপন্থীদের সমস্যা। তাঁরা সব ধর্মের সব মৌলবাদের বিরুদ্ধে ঠিক একই ভাবে দাঁড়ান না। কোনও এক মৌলবাদী গোষ্ঠীর অন্যায় দেখলে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন, আবার আরেক মৌলবাদী গোষ্ঠীর অন্যায় দেখেও দেখছেন না ভাব দেখান।

তেহেলকা এদিকে গোয়ায় থিংক ফেস্ট করেছে। জমকালো অনুষ্ঠান। দেশ বিদেশের নামী সব লোক, এমনকী হলিউডের বিখ্যাত সব অভিনেতাও এসেছেন। আমন্ত্রিত হয়ে। আমার এক ফরাসি বন্ধুও দেখলাম থিংক ফেস্টে আমন্ত্রিত। অবশ্য খুব অবাক হয়েছিলাম তালিবান নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে দেখে। আমরা কি ইতিমধ্যে জানি না তালিবানরা কী চায়, তাদের মত এবং মতলব? তালিবান নেতাকে তার মত প্রকাশের জন্য কি ভারতের সবচেয়ে প্রগতিশীল মঞ্চটি দেওয়ার দরকার ছিল? গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, নারীর-অধিকারের বিরুদ্ধে, মানবতার বিরুদ্ধে, সারা পৃথিবীকে দারুল ইসলাম বা ইসলামের জগত বানানোর জেহাদি শপথ নেওয়া তালিবান নেতার বক্তব্য প্রচার খুব কি জরুরি ছিল তেহেলকার? সভ্য শিক্ষিত হিন্দুত্ব বিরোধী বুদ্ধিজীবীদের আদর পেয়ে তালিবান নেতা নিশ্চয়ই মহাখুশী। থিংক ফেস্টে তালিবান নেতা অতিথি হিসেবে আসার পর মনে হলো সমাজের সবরকম বিশ্বাসের লোককে মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার শুদ্ধ বৃহত্তর গণতন্ত্রের চর্চা করছে তেহেলকা। কিন্তু মনে খচ খচ করা পুরোনো প্রশ্নটি আবার করলাম, তাহলে কি তেহেলকা সেই দিগভ্রান্ত বাম বুদ্ধিজীবীদের মতো, যাঁরা হিন্দু মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন, কিন্তু মুসলিম মৌলবাদকে নানা ছলছুতোয় সমর্থন করেন? ইওরোপীয় সংসদ থেকে মা নবাধিকারের ওপর সপ্তাহ খানিকের একটা কনফারেন্স শেষ করে দিল্লি ফিরেই শুনি। তেহেলকার সম্পাদক তরুণ তেজপাল তেহেলকারই একটি তরুণী সাংবাদিককে যৌন নিগ্রহ করেছে, খবরটি শুনে হতবাক বসে ছিলাম। এই দিল্লিতে খুব বেশিদিন হয়নি একটি ঘৃণ্য ধর্ষণের বিরুদ্ধে বিরাট বিক্ষোভ হয়েছে। সারা পৃথিবীর মানুষ সমর্থন জানিয়েছে ভারতীয়দের বিক্ষোভকে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে তেহেলকার ভূমিকাও ছিল বড়। আর এরই সম্পাদক কিনা সহকর্মী, তাও আবার কন্যার বান্ধবী, তাকে ধর্ষ ণের চেষ্টা করেছে! তরুণ তেজপাল অসম্ভব সব কাজ করেছেন সাংবাদিক হিসেবে। আবার বইও লিখেছেন, পুরস্কারও পেয়েছেন। এত বড় মানুষ হয়েও মেয়েদের যৌন বস্তু হিসেবে দেখছেন। মুখে বলছেন একরকম, লিখছেন একরকম, আর কাজ করছেন আরেক রকম! এর নামই তো হিপোক্রিসি! যারা অন্য লোকের হিপোক্রেসির নিন্দা করে, তারা নিজেরাই আজ হিপোক্রিট।

তরুণ তেজপালের সঙ্গে আমার আলাপ নেই। দুহাজার সাত-আট সালে আমি যখন ভারত-সরকার দ্বারা গৃহবন্দি, আমার যখন সবচেয়ে বড় দুঃসময়, আমাকে গৃ হবন্দি করার বিরুদ্ধে লেখক অরুন্ধতী রায়ের উদ্যোগে বুদ্ধিজীবীদের যে প্রতিবাদ সভা হয়েছিল দিল্লির প্রেসক্লাবে, সেই সভায় যোগ দেওয়া বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একজন। ছিলেন তরুণ তেজপাল। কিন্তু তাই বলে তরুণ তেজপালের ধর্ষণকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবো, তা কখনোই নয়। অতটা স্বার্থান্ধ আমি কোনওদিন নই। তবে এ কথা ঠিক যে, সেকুলার তেজপালকে আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু যৌনহেনস্থাকারী তেজপালকে, সত্যি বলতে কী, ঘৃণা করি।

তরুণী সাংবাদিকটির, তরুণ তেজপালের, আর তত্ত্বাবধায়ক সম্পাদক সোমা চৌধুরীর যে ইমেইলগুলো প্রচার হয়েছে, তা থেকেই ঘটনাগুলো সব স্পষ্ট এখন। ওগুলো পড়লেই দোষ কার, নিদের্ষ কে, সব আমরা খুব সহজেই অনুমান করতে পারি। তরুণ তেজপাল নিজেই বলেছেন, তিনি অন্যায় করেছেন। ক্ষমা চেয়েছেন। এমন কি ছমাসের ছুটি-শাস্তিও নিয়েছেন নিজে। শেষ পর্যন্ত মিডিয়ায় খবরটা এলে থানা পুলিশ হল। তা না হলে এভাবেই হয়তো তেহেলকার তত্ত্বাবধায়ক সোমা চৌধুরী আর সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান তরুণ তেজপাল কিছু সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে পুরো ধর্ষণের ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়ে দিতেন। এরকম নিশ্চয়ই আরও অনেক কোম্পানীতে ঘটে। মেয়েরা ধর্ষণের বিনিময়ে চাকরি বাঁচায়। প্রতিবাদ করলে চাকরি চলে যায়। নয়তো চাকরি ছেড়ে দিয়ে পথে বসতে হয়। কাস্টিং কাউচের সমস্যা সারা ভারতে ভীষণ। যাদের প্রতিবাদ করার কথা এসবের বিরুদ্ধে, তারাই যদি একই চরিত্রের হয়, ধর্ষক হয়, তবে কারা আর সমাজ বদলাবে! তরুণ তেজপাল তাঁর কন্যার বান্ধবীকে ধর্ষণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, এটিই সবচেয়ে সহজ পন্থা যদি তার চাকরিটি সে বাঁচাতে চায়। কী ভয়ংকর হুমকি! মৌলবাদীদের চরিত্র নষ্ট হলে, রাজনীতিকদের চরিত্র নষ্ট হলে সমাজ নষ্ট হয় না, কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র নষ্ট হলে সমাজ নষ্ট হয়। বুদ্ধিজীবীরাই তো অন্যায়ের অসত্যের অত্যাচারের অবিচারের প্রতিবাদ করে। সমাজকে শুদ্ধ করে, বাঁচায়, প্রগতির পথে নিয়ে যায়। কিন্তু নিজেরাই অন্যায় করলে কোন অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ করবে? তরুণ তেজপাল মেয়েদের যৌন বস্তু হিসেবে দেখেন। বুদ্ধিজীবী-মুখোশের আড়ালে তিনি তাঁর ধর্ষকের মুখটা আড়াল করে রেখেছিলেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি নারীবাদী-মুখোশের আড়ালে এতকালের নারীবিরোধী মুখটা যখন অনেকে বেরিয়ে এসেছে। অন্যান্য ধর্ষকদের বিরুদ্ধে তাঁরা ভীষণ সরব, কিন্তু তেজপালের ধর্ষণের ঘটনায় খুব কায়দা করে ইনিয়ে বিনিয়ে তাঁকে সমর্থন করেছেন। নিজের চোখ কানকে বিশ্বাস করা যায় না। সোমা চৌধুরী নিজেকে বারবারই নারীবাদী হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু ধর্ষিতা সাংবাদিক টির পক্ষে তিনি কিন্তু মূলত কিছুই করেননি, বরং ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। কেন ও দ্বিতীয়বার লিফটে চড়লো, যেন লিফটে চড়েছে বলেই ও দ্বিতীয়বার ধর্ষণের মুখে পড়েছে, যেন লিফটে চড়েছে, কারণ আগের দিনের যৌনতায় ওর সায় ছিল। শুধু সোমা চৌধুরী নন, তাঁর মতো অনেকেই গলার স্বর পাল্টে ফেলেছেন, ধর্ষণ আর ধর্ষকদের বিরুদ্ধে তাঁরা আগে যেমন গর্জে উঠতেন, তেমন আর উঠছেন না। অশিক্ষিত আর গরিবরা ধর্ষণ করলে সেই ধর্ষণকে জঘন্য অপরাধ বলা হয় আর শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা ধর্ষণ করলে তাকে বলা হয়, মিসকনডাক্ট। ভারতবর্ষ বিভক্ত জাত ধর্মে ততটা নয়, যতটা শ্রেণীতে। আমার শ্রেণীর লোক, সুতরাং তাকে আমি সমর্থন করবো, সে যত অন্যায়ই করুক না কেন। অনেকের মধ্যে এরকম শ্রেণী সমর্থন দেখছি।

কোনও একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলে বিভিন্ন রাজনীতির লোকেরা অন্যায়ের পক্ষে অথবা বিপক্ষে সটান দাঁড়িয়ে যান। মিথ্যের প্রয়োজন হলে অবলী লায় মিথ্যে বলেন। সৎ, নিরপেক্ষ বলতে প্রায় কিছুই নেই। আসারাম নামের এক ধর্মগুরু ধর্ষণ করছে অল্প বয়সী মেয়েদের, এই খবরটা প্রচার হওয়ার পর আসা রামের ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে দেখি, একটি রাজনৈতিক দল বলছে আসারাম কস্মিনকালেও ধর্ষণ করেনি, আবার আরেকটি দল বলছে, আলবৎ করেছে। তেজপালের ধর্ষণের বেলায়, আসারামের পাশে দাঁড়ানো দল বলছে, তেজপাল দোষী, আবার যে দলটি আসারামকে দোষ দিয়েছে, সেই দল বলছে, তেজপাল দোষী নয়, দোষী ধর্ষিতা মেয়েটিই। আর আমি যদি আসারাম আর তেজপালের দুজনের অন্যা য়ের বিরুদ্ধেই একইরকম তীব্রকণ্ঠে প্রতিবাদ করি, আমি খুব একা হয়ে পড়ি। আমার পাশে শেষ পর্যন্ত কেউ থাকে না। সবাই আমাকে ক্ষণকালের জন্য বন্ধু মনে করলেও শেষে গিয়ে আমার নাম শত্রুর খাতায় লেখে। এই সমাজে কোনও দলের হয়ে কথা না বললে একা হয়ে যেতে হয়। একা হয়ে যাওয়ায় আমার অভ্যেস আছে। চিরকালই আমি একা। যখন থেকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে একা প্রতিবাদ করতে শুরু করেছি, তখন থেকেই। আমার আর কিসের ভয়!

তেজপালের বিচার যদি সঠিক না হয়, তবে যে সব কোম্পানীর উঁচু পদে বসে থাকা শত শত পুরুষ উর্ধতন বা চাকরিদাতা হওয়ার সুবাদে অবাধে ধর্ষণ করে যাচ্ছে। তরুণী সহকর্মীদের, তা মহাউৎসাহে, তা মহাআনন্দে, মহা বিজয়ের সঙ্গে করে তো যাবেই, এই সংখ্যাটা আরও বাড়বে। কাস্টিং কাউচ জমকালো হবে আরও।

তরুণ তেজপাল নিশ্চয়ই স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি যে ভারতবর্ষে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর লোকের কোনও অভাব নেই। যৌন অপরাধ করার পরও তাঁর সমর্থক আর অনুরাগীর সংখ্যা কিছুমাত্র কমেনি। পুরুষ বলেই অবশ্য কমেনি। ধর্ষণের সঙ্গে পৌরুষের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। ধর্ষণ আইনের চোখে হয়তো অপরাধ, নারীবিরোধী সমাজের চোখে এখনও এটি অপরাধ নয়, এটি এখনও পুরুষের অধিকার। সে কারণেই তেজপালের বিরুদ্ধে সমাজের বড় নেতারা, বড় রাজনৈতিক দল, নারীবাদী বা মানবাধিকার গোষ্ঠী একযোগে প্রতিবাদী হচ্ছে না। তেজপাল বড় সাংবাদিক, বড় বুদ্ধিজীবী– এসব বলে বলে, তাঁর যৌন নির্যাতনের অপরাধকে একটু ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখার জন্য যেন একরকম আহ্বান জানানোহচ্ছে। কিন্তু কথা হল, যে লোকেরা বিনা অনুমতিতে কোনও মেয়ের যৌনাঙ্গে আঙুল ঢোকাতে পারে, তারা কিন্তু কোনও একদিন জোর খাঁটিয়ে মেয়েদের যৌনাঙ্গে লোহার রড ঢোকাতে পারে। কাকে বিশ্বাস করবে মেয়েরা?

ধর্ষণের বিরুদ্ধে ধর্ষিতাকে দোষ দেওয়ার প্রবণতা এখনও যায়নি। এখনও ধর্ষিতা মেয়েটিকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে লিফটে একবার তেজপাল দ্বারা যৌন হেনস্থার শিকার হওয়ার পরও কেন ও তেজপালের সঙ্গেই দ্বিতীয়বার লিফটে চড়লো। এর কারণ তো খুব সহজ, মেয়েটা তার চাকরি বাঁচাতে চেয়েছে। ধর্ষিতা হয়ে নয়, ধর্ষিতা না হয়ে চাকরি বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। ধর্ষণের জন্য কোনও ধর্ষকের লিফটের দরকার হয় না। ধর্ষকরা সহজে ধরা পড়বে না এমন যে কোনও জায়গায় ধর্ষণ করে। যদি দ্বিতীয়বার মেয়েটি না চড়তো লিফটে, তাহলে কি তাকে দোষ দেওয়া হতো না? ঠিকই হতো, যারা তাকে আজ দোষ দিচ্ছে লিফটে চড়ার জন্য, তারাই বলতে কী ব্যাপার তেহেলকার সম্পাদক তোমাকে যৌন হেনস্থা করার পরও তুমি তেহেলকায় দিব্যি চাকরি করে যাচ্ছো, নিশ্চয়ই তোমার সায় ছিল ওই যৌন হেনস্থায়!

তেজপাল বেশ স্পষ্ট করেই তাঁর ইমেইলে লিখেছেন যে মেয়েটির অসম্মতি তেই মেয়েটির যৌনাঙ্গে তিনি আঙুল ঢুকিয়েছেন। ইমেইল প্রচারিত হওয়ার পরও মেয়েটিকে দোষী বানানো হচ্ছে। সমাজ, সত্যি বলতে কী, ভীষণরকম নারীবিদ্বেষী। এই সমাজে সব শ্রেণীর পুরুষেরাই সব শ্রেণীর মেয়েদের যৌনাঙ্গে যা ইচ্ছে তাই ঢুকিয়ে বিকৃত আনন্দ পায়, মেয়েদের এতে সায় আছে কী নেই, তা অনেকেই মনে করে না, দেখা সবার আগে প্রয়োজন। দিল্লি বাসের অসভ্য অশিক্ষিত সেই ধর্ষক দের সঙ্গে দিল্লির সভ্য শিক্ষিত তরুণ তেজপালের পার্থক্য খুব বেশি নেই। ওদের। মতো তরুণ তেজপালও মেয়েদের যৌনবস্তু হিসেবে মনে করেন। ঘূণী করতে হলে দিল্লি বাসের ধর্ষকদের চেয়ে তরুণ তেজপালকেই বেশি করা উচিত। কারণ তিনি জেনে বুঝে অপরাধটি করেছেন। দিল্লি বাসের ধর্ষকরা নারীবাদের ওপর কোনও বই পড়েনি। নারীরা যে মানুষ, নারীরা যে যৌন বস্তু নয়, এ তাদের কেউ শেখায়নি। কিন্তু তরুণ তেজপাল সব জেনেও, নারী-পুরুষের বৈষম্য যে কোনও সভ্য সমাজে থাকা উচিত নয়, পুরুষের যে অধিকার নেই নারীর বিনা অনুমতিতে নারীকে স্পর্শ করার, তা বুঝেও, জোর করে এক নারীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করতে চেয়েছেন। তরুণ তেজপালের নিশ্চিতই এক জ্ঞানপাপী।

এখনকার অফিসআদালতে তথাকথিত সভ্য শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা মেয়ে-সহক র্মীদের যৌন হেনস্থা করে চলেছে, এ সকলেই জানে, এ থেকে মেয়েদের বাঁচানোর জন্যও তেজপালের শাস্তি জরুরি। তেজপালের মতো অগুণতি যৌন হেনস্থাকারীর টনক নড়বে। বুঝবে. এত নিশ্চিন্তে হেনস্থা চালিয়ে যাওয়া যাবে না, ধরা পড়লে সর্বনাশ। অবশ্য আমরা সকলেই জানি যে, শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড দিয়ে কখনও কোনও অপরাধকে কমানো যায়নি সমাজে। আসলে তরুণ তেজপাল যে চোখে মেয়েদের যৌনবস্তু হিসেবে দেখেন, পুরুষের সেই দেখার চোখটা যতদিন পাকাপাকি ভাবে বন্ধ। না হয় বা অন্ধ না হয়, ধর্ষণ, যৌন হেনস্থা ইত্যাদি কমবে না।

আমার আত্মজীবনীতে লিখেছিলাম, বাংলাদেশের বয়স্ক এক নামী লেখক আমাকে ছলে কৌশলে দূরের এক শহরে নিয়ে গিয়ে এক ঘরে ঘুমোবার ব্যবস্থা করেছিলেন। লেখকটি আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন, এই আশঙ্কায় সারারাত আমি ঘুমোতে পারিনি। এই ঘটনা লেখার পর লোকে ওই লেখককে দোষ না দিয়ে আমাকে দিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের এক বড় লেখকের যৌন হেনস্থা করার খবর যেদিন বলি, ওখানেও একই অবস্থা হয়েছিল। লোকে যৌন হেনস্থাকারী লেখককে দোষ না দিয়ে আমাকে দোষ দিয়েছিল। ওঁদের ছি ছি না করে আমাকে ছি ছি করেছিল। যেন ওঁরা কেউ নন, অন্যায়টা বা অপরাধটা আমি করেছি। জানি সাধারণ লোকেরা বড় লেখক বুদ্ধিজীবীদের দেবতা বলে মনে করে। তাঁদের পক্ষে যে কোনও দুঃসময়ে দাঁড়ায়। আমি নিজে কিন্তু বানের জলে ভেসে আসা মেয়ে নই, বা এক্স ওয়াই জেড নই। দেশ বিদেশের অনেক পুরস্কার পাওয়া জনপ্রিয় লেখক, কিন্তু যত বড় লেখকই আমি হই না কেন, আমি মেয়ে, আমি মেয়ে বলেই কেউ আমার পাশে দাঁড়ায়নি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বেশিরভাগই লোকই বিশ্বাস করে যৌন হেনস্থা করার অধিকার পুরুষের আছে, এবং পুরুষের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ করার অধিকার। কোনও মেয়ের নেই, বিশেষ করে সে পুরুষ যদি নামী দামী কোনও পুরুষ হয়। সমাজটা আসলে শুধু পুরুষের নয়, সমাজটা নারী বিদ্বেষী নারীবিরোধী পুরুষের।

বর্বরতাকে একবার প্রশ্রয় দিয়েছো কী মরেছো

রুশদিকে কলকাতায় আসতে দেওয়া হয়নি, এ নিয়ে মড়া-কান্না শুরু হয়ে গেছে চারদিকে। যারা এখন কেঁদে কেটে বুক ভাসাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই মুখ বুজে ছিল অথবা বই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কথা বলেছিল, যখন ২০০৩ সালে আমার দ্বিখণ্ডিত বইটি মুসলমা নদের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে কারণ দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। মুসলমানরা রাস্তায় নামেনি, বই নিষিদ্ধ করার দাবি করেনি। কিন্তু তখনকার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আগ বাড়িয়ে বইটি নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাঁর মাথা থেকেই বই নিষিদ্ধের কুবুদ্ধিটা বেরিয়েছিল। তিনি অবশ্য বলেছিলেন, ২৫ জন বুদ্ধিজীবী নাকি আমার দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করার জন্য তাড়া দিচ্ছিলেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বোঝা উচিত ছিল, যারা লেখকের বই নিষিদ্ধ করার আবদার করেন, তারা আর যাই হোন না কেন, বুদ্ধিজীবী নন। বই নিষিদ্ধ করার পেছনে যে কারণগুলো দাঁড় করানো হয়েছিল, সেসব যে নেহাতই ভিত্তিহীন আর হাস্যকর, তা বই নিষিদ্ধ হওয়ার দুবছর পর কলকাতা হাইকোর্টই বলে দিয়েছে, বইটিকে মুক্তিও দিয়েছে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কী দায় পড়েছিল মুসলমানদের মনের আঘাত বাঁচাতে গণতন্ত্রের সব চেয়ে বড় শর্ত বাক স্বাধীনতার ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার?

কলকাতায় আমি তখন পাকাপাকিভাবে বাস করছি। একসময় আমার সঙ্গে সখ্য থাকলেও বই নিষিদ্ধ করার পর রীতিমত ব্রাহ্মণের মতো আচরণ শুরু করলেন, আমার মতোনমশুদ্রর ছায়াও আর মাড়ালেন না। বই মুক্তির পর তো আরও নয়। ভেবেছিলাম বুদ্ধবাবু হয়তো একদিন নিজের ভুল বুঝতে পারবেন। কিন্তু ভুল ভাবনা। হায়দারা বাদি মুসলিম মৌলবাদীরা আমায় আক্রমণ করার পরদিন থেকেই তিনি নতুন নকশা আঁকতে শুরু করেছিলেন। আমি জানিনা সেই নকশা আঁকায় মোট কজন বুদ্ধিজীবী তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমি নিরীহ, নির্যাতিত, নির্বাসিত মানুষ। রাজনীতির প্যাঁচ কোনওদিনই ঠিক বুঝতে পারি না। ২০০৭-এর আগস্টে আক্রান্ত হলাম, সেই আগস্টেই কলকাতার মৌলবাদী নেতারা হায়দারাবাদের মৌলবাদী নেতাদের ডেকে এনে কলকাতার ধর্মতলায় রাস্তা বন্ধ করে বিশাল এক জনসভা করলেন, আমার মাথার দাম ঘোষণা করার জনসভা। কেউ আমার মাথাটা কেটে নিয়ে গেলে তাকে আনলিমিটেড অ্যামাউন্ট টাকা দেওয়া হবে। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশের বড় কর্মকর্তারা। সেদিনের সেই মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের কাউকে বেআইনি ফতোয়া জারি করার জন্য গ্রেপ্তার করা তো হয়ইনি, বরং বেশ সম্মানই করা হয়েছিল। তখন থেকেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পুলিশের বড় বড় কর্তাদের পাঠাতে শুরু করলেন আমার বাড়িতে, কী, কলকাতা থেকে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে, পারলে দেশ থেকে আমাকে বেরিয়ে যেতে হবে। কেন বেরোতে হবে? আমি কলকাতায় বাস করলে কলকাতার মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে, তাই।

এদিকে নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর আর রিজওয়ান নিয়ে রাজ্যে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। মুসল মানরা সিপিআইএমএর ওপর ক্ষেপে আগুন হয়ে আছে। নভেম্বরের একুশ তারিখে পার্ক সার্কাসের গলি থেকে কিছু লোক বেরিয়ে গাড়ি পোড়াতে শুরু করলো, পুলিশকে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করলো। কেন রাগ? নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরে মুসলমান মেরেছো কেন, রিজওয়া নকে মেরেছো কেন, তাই রাগ। হঠাৎ সারাদিন পর কে একটা হাতে লেখা একটা কাগজ উঁচু করে ধরলো, ওতে লেখা তসলিমা গো ব্যাক। ব্যস, আমাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হল জয়পুর। টিকিট মুখ্যমন্ত্রী আগেই কেটে রেখেছিলেন। ওয়ান ওয়ে টিকিট। তারপর শত চেষ্টা করেও আর পশ্চিমবঙ্গে পা দিতে পারিনি। আমার বাড়ি ঘর, বেড়াল, বন্ধু– সব কলকাতায়। বাংলাদেশ থেকেও আমাকে তাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়ানোটা বাংলাদেশের চেয়েও নিষ্ঠুর আর মর্মান্তিক। আজও পশ্চিম বঙ্গের ত্রিসীমানায় যাওয়া আমার জন্য নিষিদ্ধ। মমতা বন্দোপাধ্যায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কোনও কিছু না মানলেও এটা মানেন যে তসলিমার জায়গা পশ্চিমবঙ্গে নেই। আমার ক্ষেত্রে তিনি বুদ্ধদেবের পদাঙ্ক খুব নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে চলেছেন।

রুশদিকে একবেলার জন্য কলকাতায় আসতে না দেওয়ার পেছনে ওই একই কারণ। রাজ্য নষ্ট হয়ে গেছে। রাজ্য নষ্ট করার জন্য দায়ী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি যদি সেদিন আমার বই নিষিদ্ধ না করতেন, আমাকে জন্মের মতো না তাড়াতেন আমার কলকাতার বাড়িঘর থেকে, তাহলে আজ নিশ্চিতই রুশদি কলকাতায় যেতে পারতেন। তাঁর ওই একদিনের অনুষ্ঠানে কলকাতা ভ্রমণে কোনও বাধা আসতো না।

বুদ্ধবাবুই মৌলবাদীকে শক্তি এবং সাহস জুগিয়েছেন। আজ তারা তাই এয়ারপোর্ট অবধি চলে যেতে পারে এবং একইভাবে ওই রকম কাগজ নিয়ে, রুশদি গো ব্যাক। কারণ তারা জেনে গেছে, তারা যা চায়, তাই তাদের পাইয়ে দেওয়া হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রে চাওয়ার আগেই প্রাপ্তি চলে আসে। আজ যে বুদ্ধবাবু বলছেন তিনি রুশদিকে আসতে দিতেন ক্ষমতায় থাকলে। মিথ্যে কথা। অথবা দিতে চাইলেও তার মৌলবাদী ফ্রাংকেনস্টাইন রুশদিকে সর্বশক্তি দিয়ে বাধা দিত, রায়ট বাধাতো। ওই ফ্রাংকেনস্টা ইনই যেমন বুদ্ধবাবু-সহ তাঁর পুরো দলকে ভোটে হারিয়েছে, তসলিমাকে তাড়িয়ে একটি বাড়তি ভোটও যেমন জোটেনি, ঠিক তেমনই হত।

আজ শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখছি অসহিষ্ণুতা। কা শ্মীরের মুফতি ফতোয়া দিলেন মেয়েরা গান গাইতে পারবে না। তামিলনাড়ুতে কমল হাসানের ছবি দেখানো চলবে না। আর্ট গ্যালারিতে নড় ছবি রাখা যাবে না। অসহিষ্ণ তাকে প্রশ্রয় দিতে দিতে এমন হয়েছে যে অসহিষ্ণুতা এখন মাথায় উঠে বসেছে। একবার যদি মাথায় উঠতে দিয়েছো, একবার যদি আপোস করেছো বর্বরতার সঙ্গে, তাহলে বাকি জীবন আপোস করে যেতেই হবে। বর্বরতা এমনই জিনিস, একবার একে মাথায় উঠতে দিলে আর নামাতে পারবে না। দোষ বর্বরতার নয়, দোষ তোমার, বর্বরতাকে তুমি জেনে শুনেই ডেকে এনেছো। জেনে শুনে তুমিই বিষ পান করেছে। এখন মৃত্যুর সময় অন্তত নিজের ভুলগুলো স্বীকার করো।

বাংলাদেশ ১

কুড়ি বছরের নির্বাসিত জীবনে দেশের খুব একটা খবর রাখিনি, দুএকজন আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে কদাচিৎ কথা হতো। রাজনীতির খবরে মোটেও উৎসাহ ছিল না আমার। বাবা মা মারা যাওয়ার পর ব্যক্তিগত যোগাযোগও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ ক্রমে ক্রমে একটা দূরের দেশে পরিণত হয়। দেশে যে বাড়ি ঘর ছিল আমার, ফেলে আসা জিনিসপত্তর, ওসবেরও আর কোনও খবরাখবর পরিবারের কেউ আমাকে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। ওই দেশ, ওই সমাজ, ওই পরিবারের প্রতি বিবমিষা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না। আমার এত যে গুণমুগ্ধ পাঠক পাঠিকা, প্রকাশক, সম্পাদক, তাদের চিহ্ন এই কুড়ি বছরে, সত্যি বলতে কী, দেখতে পাইনি। প্রকাশক রয়্যালটি দেয় না, জাল বইয়ে বাজার ছেয়ে থাকে, একের পর এক সরকার আমার বই নিষিদ্ধ করছে, এসবের প্রতিবাদও কেউ করেনি। সম্পাদকরা ঘুরতো লেখা চাইতে, তাদেরও আর টিকিটি দেখিনি। সরকার আমাকে তাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে গোটা দেশ যেন মুহূর্তে সরকারের গোলাম বনে গেল। সরকার যাকে পছন্দ করছে না, তাকে পছন্দ করার কোনও অধিকার তখন যেন আর কারোর নেই। এমন ভণ্ড ভীতু সমাজ আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। বছর বছর সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি, দেশে ফিরতে চাই, মার অসুখ, বাবার অসুখ। কিছুতেই বর্বর সরকারগুলোর সায় পাইনি। আমার জন্য দেশের দরজা বন্ধ। যেন দরজাটা ওদের বাপের সম্পত্তি। হঠাৎ হঠাৎ বাংলাদেশের পত্রিকায় বিকৃত করে আমার ভুল ভাল খবর ছাপাহত। পত্র পত্রিকাগুলো গত কুড়ি বছরে আমাকে ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা তো কম করেনি। কিন্তু বিকৃত করে ছাপানো খবরগুলো যে কোনও কারণেই হোক বন্ধ করেনি, সম্ভবত যারা ভুলছে না। আমাকে, তারা যেন ঘৃণাটা অন্তত করতে পারে, সেকারণে। সেই হঠাৎ হঠাৎ খবর গুলোর তলায় দেখতে পেতাম মানুষের, বিশেষ করে নতুন ছেলেমেয়েদের মন্তব্য। নোংরা কুৎসিত সব মন্তব্য। পড়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো। এখনকার তরুণ তরুণী জঘন্য ভাষায় গালাগালি করছে আমাকে, আমাকে না পড়েই, না বিচার করেই, না ভেবেই! এরা কি চেনে আমাকে? জানে আমাকে? আমার লেখা কোনওদিন পড়েছে? না, এরা কারও লেখা পড়ে না। এরা হয়তো কোনও বদমাশদের মুখে আমার নাম শুনেছে, আর বদনাম শুনেছে। এরাই দেশের ভবিষ্যৎ, এরাই নতুন প্রজন্ম। এক গাদা অন্ধত্ব, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, মুখতা, নির্বুদ্ধিতাই শুধু দেখলাম। ঘেন্না লাগলো। হ্যাঁ ঘেন্না। একটিও প্রাণী নেই, যার বোধ বুদ্ধি আছে, বিবেক আছে? সেই লক্ষ লক্ষ লোক কোথায় যারা গোগ্রাসে আমার বই পড়তো, আমার লেখা ভালোবাসতো? সেই সব লেখকই বা কোথায়, যারা আমার লেখার হুবহু নকল করে নারীবাদী লেখা শুরু করেছে বাংলাদেশে? সবাই হাওয়ায় উবে গেছে, শুধু জ্বলজ্বল করছে এক থোকা নতুন প্রজন্ম নামক অন্ধকার।

দেশটার কথা ভাবলে সব কিছু মিলিয়ে ঘেন্না ছাড়া আর কিছুর উদ্রেক হত না আমার। এমন সময় একদিন দেখি কিছু লোক টুইটারে আমাকে বাংলাদেশের খবর দিচ্ছে। ঢাকার শাহবাগে লোক জমায়েত হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাইছে, খবরটি জানি কি না জানতেও চাইল কেউ কেউ। উত্তর দিইনি। বাংলাদেশে আমার উৎসাহ নেই, ফাঁসিতেও নেই। ওই দেশে কারও ফাঁসি চাওয়া হচ্ছে শুনলে মনে পড়ে তিরানব্বই-চুরান্নবই সালে কী করে লক্ষ লোকের জমায়েত হত শহরে, মিছিল হত, আমার ফাঁসি চাওয়া হত। সেই সব ভয়ংকর দিনগুলোর কথা ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না? কেউ আমার ভেতরে এক ফোঁটা আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি শাহবাগের জনসমাগম নিয়ে। মিশরের তাহরির স্কোয়ারেও লক্ষ লোক জমেছিল, ওরা ভোট দিয়ে মুসলিম মৌলবাদীদের জিতিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে– মানেই মৌলবাদের বিরুদ্ধে নয়। আর মৌলবাদের বিরুদ্ধে– মানেই ধর্ম নিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজমের পক্ষে নয়, ধর্মভিত্তিক আইন তুলে দেওয়ার পক্ষে নয়। বাংলাদেশের আন্দোলন নিয়ে কিছু লিখছি না বলে কেউ কেউ আমাকে আবার তিরস্কারও করতে শুরু করে। কারো অনুযোগে অভিযোগে তিরস্কারে আমার কিছু যায় আসে না। নতুন প্রজন্ম, যারা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাইছে, তারা কী করবে ফাঁসি দেওয়া হয়ে গেলে, শুনি? এই প্রশ্নের ভালো কোনও উত্তর পাইনা কারও কাছ থেকে। চল্লিশ বছর আগে কিছু লোক কিছু দোষ করেছিল, কিছু লোককে মেরেছিল, কিছু মেয়েকে ধর্ষণ করেছিল, তার প্রতিশোধ নেবে নতুন প্রজন্ম। আসলে লেখক শিল্পীদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত লিখেছে, ছবি বানিয়েছে, নাটক করেছে, যে, বাংলাদেশের আজকালকার ছেলেমেয়েরা দুনিয়ার নব্বইভাগ ইতিহাস না জানলেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটা ভালো জানে।

আমার আগ্রহ সৃষ্টি হল সেদিন, যেদিন শাহবাগের কয়েকজনকে দেখলাম, জামাতি ইসলামি দলটির নিষিদ্ধকরণ চাইছে। আমি সমর্থন করে লিখলাম। যদিও আমি সব রকম নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে, কিন্তু এই নিষিদ্ধকরণ মেনে নেওয়ার কারণ, জামাতি ইসলামি কাগজে কলমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল হলেও এটি মূলত একটি সন্ত্রাসী দল। কাউকে পছন্দ হল না তো মেরে কেটে পঙ্গু বানিয়ে রাখলো, কারও মত তাদের মতের থেকে ভিন্ন হলে জবাই করে ফেলো, ধর্মের নামে বহু বছর যাবৎ যা খুশি করছে ওরা। ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠছে আজকাল।

লিখবো না লিখবো না করেও অনেকগুলো ব্লগ লেখা হয়ে গেল শাহবাগ নিয়ে। এই লেখাগুলোর প্রথম দিকে হতাশা থাকলেও ধীরে ধীরে আশা এসেছে। স্বপ্ন এসে চমৎকার সাজিয়েছে ঘরদোর। কিন্তু দিন দিন যে সব খবর পাচ্ছি, তাতে মনে হয় না বাংলাদেশের ধর্মমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে অদুর ভবিষ্যতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবেন কথা দিয়েছেন, কিন্তু রাষ্ট্রকে ধর্মের কবল থেকে মুক্ত করার তাঁর কোনও ইচ্ছে আছে বলে মনে হয় না। জামাতি ইসলামির সন্ত্রাসীরা মুক্তচিন্তক তরুণ তরুণীদের গলা কাটছে, আর ওই কূপমণ্ডুকদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টে দেশের প্রধানমন্ত্রী মুক্তচিন্তকদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন শাস্তি দেবেন বলে। ইতিমধ্যেই ওদের ব্লগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কেউ যেন না পড়তে পারে ইসলাম বা মুহম্মদের সমালোচনা। অশিক্ষিত ধর্মব্যবসায়ীদের মতো প্রধানমন্ত্রীও ধর্মব্যবসায় মাতেন, দেখতে বড় বিচ্ছিরি লাগে। ঘেন্না লাগে।

আমার বেলাতেও ঠিক এমন করেছিলেন খালেদা জিয়া নামের আরেক প্রধানম স্ত্রী। দেশ জুড়ে ধর্মীয় মৌলবাদীরা তাণ্ডব করছে আমাকে ফাঁসি দেবে বলে, আর প্র ধানমন্ত্রী ওই কূপমণ্ডুকদের খুশি করতে আমার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করলেন, আমাকে শাস্তি দিলেন, দেশ থেকে আমাকে বের করে দিলেন, আমার বই নিষিদ্ধ করলেন। আজ কুড়ি বছর পর সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এক রানি গিয়ে আরেক রানি আসে, এক রাজা গিয়ে আরেক রাজা আসে। তবে সব রানিরই, সব রাজারই চরিত্র এক। এঁরা আর যার ভালো চান, দেশের ভালো চান না। দেশের ভালো চাইলে দেশকে ধর্মের বিষ গিলিয়ে এঁরা দেশের সর্বনাশ করতেন না।

বাংলাদেশ ২

আজ বাংলাদেশে নাস্তিক ব্লগার ও ইসলাম বিদ্বেষীদের শাস্তির দাবীতে লং মার্চ ডাকছে এক পাল মুখ আর এক পাল খুনী।

ঠিক এরাই অথবা এদের বাপ দাদারা ২০ বছর আগে একই রকম লং মার্চ ডেকেছিল আমার শাস্তির দাবিতে, সারা দেশ থেকে লোক এসেছিল মানিকমিয়া এভি ন্যতে, তিন লক্ষ লোকের সভা। কী চাই? তসলিমার ফাঁসি চাই। তসলিমা নাস্তিক। ওর ফাঁসি না হলে ইসলাম বাঁচবে না। দেশ জুড়ে কী ভীষণ তাণ্ডব চালিয়েছিল এরা। আর এদের সঙ্গে তাল মিলিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসা চরম এক মূর্খ মহিলা। মুখদের কলে দেশ পড়লে এ-ই হয়, যা হয়েছে আজ দেশ।

বেশির ভাগ শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী বিদ্বজ্জন তখন কী করেছেন? দূর থেকে দেখেছেন আমার ওপর আক্রমণ হচ্ছে। হয় মুখ বুজে থেকেছেন নয়তো বলেছেন, এসব তসলিমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

সারাদেশের ধর্মান্ধরা আমাকে জবাই করতে আসছে আমার লেখা পছন্দ হয় না বলে। আর এ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার? গুণীজনদের বক্তব্য, দেশে কোনও মৌলবাদী নেই। আমি নাকি ইচ্ছে করেই ঝামেলা পাকিয়েছি। আমার ঝামেলা আমাকেই সামলাতে হবে, সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসবে না।

এই ধর্মান্ধদের দুধ কলাখাইয়ে বড় করেছে দেশের ধুরন্ধর রাজনীতিকরা। কাউকে কাউকে তো সংসদ সদস্য, এমনকী মন্ত্রীও বানিয়েছিল। আমি ইসলাম ধ্বংস করে ফেলেছি অথবা ফেলবো, ঠিক এরকম একটা অবস্থায় নাকি ছিল ইসলাম। এক গরিব দেশের এক নিরীহ গোবেচারা মেয়ে, ডাক্তারি করে, আর মাঝে মাঝে লেখালেখি করে, সে নাকি ১৪০০ বছর ধরে টিকে থাকা কোটি কোটি লোকের অন্ধত্বকে কলমের একটা খোঁচা মেরে দূর করে দিয়েছে! এই ক্ষমতাটা যদি সত্যিই আমার থাকতো, আমার চেয়ে সুখী কেউ হতো না।

আমার বিরুদ্ধে বিরাট বিরাট মিছিল, লং মার্চ, সভা, হরতাল নির্বিঘ্নে হয়েছে। না বাধা দিয়েছে সরকার, না আপত্তি করেছে বুদ্ধিজীবীরা। সেদিন যদি একশটা লোকও আমার পক্ষে মুখ খুলতে, আমার পাশে দাঁড়াতো, আমাকে নির্বাসনদণ্ড দিতে পারতো না সরকার।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখছি। এখন নাস্তিক ব্লগারদের ধরে ধরে জবাই করছে। ধর্মের খুনীরা। বুদ্ধিজীবীরা কি ওদের নাস্তিকতা অস্বীকার করে বলবেন তওবা তওবা ওরা নাস্তিক নয়, নাকি সেই আগের মতো বলবেন, এসব নাস্তিকদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, ওদের ঝামেলা ওরাই সামলাক! ইতিহাস থেকে যদি শিক্ষা নিতে হয়, এখনই সময়। বুদ্ধিজীবীদের স্বার্থপরতা, ঈর্ষার শিকার আমি হয়েছি। মুক্তচিন্তক এই তরুণ ব্লগারদের যেন না হতে হয়। আজ দেশের মানুষের মুখ বুজে থাকা অথবা ধর্মব্যবসায়ীদের লম্ফঝম্ফের দোষ নাস্তিকদের দেওয়া মানে দেশের একশ বছর পেছনে ঠেলে দেওয়া। আমাকে তাড়িয়ে যেমন দেশকে একশ বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। হয়নি? না হলে আশির দশকে জাতীয় পত্র-পত্রিকায় ধর্মের এবং মুহম্মদের অবাধ সমালোচনা করে যে লেখাগুলো আমি লিখেছি, তাতে এক নদী জল মিশিয়ে তরল করলেও আজ সেসব লেখা ছাপানোর কল্পনা অবধি কেউ করতে পারে না কেন? ধর্মের সমালোচনা না করে তুমি সভ্য হতে চাও? এই বিজ্ঞানের যুগে ধর্মের মতো আজগুবি রূপকথাকে সত্য বলে মেনে, স্বঘোষিত সব ঠগবাজ পয়গম্বরকে পথ প্রদর্শক বলে মেনে তুমি কচু সভ্য হবে। তোমার সভ্য হওয়া চুলোয় যাক, ইসলা মের আসল চেহারা চোখ খুলে যারা দেখতে পেয়েছে, যারা বেরিয়ে এসেছে, সেই আলোকিত তরুণ তরুণীদের গায়ে যদি আঁচড় লাগে আজ, এর দায় ওই চোখ বন্ধ করে রাখা অন্ধদের চেয়েও বেশি সব বুঝেও না বোঝার ভান করা বুদ্ধিজীবীদের, অদূরদর্শী রাজনীতিকদের আর ক্ষমতার আসনে বসা এক পাল মুই যেন কী হনুরে দের।

 বাংলাদেশের বিজয় দিবস

আজ ১৬ই ডিসেম্বর। বাংলাদেশের বিজয় দিবস।

১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে নমাস যুদ্ধ করে জিতেছিল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। ভারত সাহায্য করেছিল যুদ্ধে জিততে। ওই সা হায্যটা না করলে বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধে জেতা সম্ভব হত বলে আমার মনে হয় না। বাংলাদেশের জন্ম আমাদের বুঝিয়েছিল, ভারত ভাগ যাঁরা করেছিলেন, দূরদৃষ্টির তাঁদের খুব অভাব ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই, হোক না তারা বাস করছে হাজার মাইল দূরে, হোক না তাদের ভাষা আর সংস্কৃতি আলাদা, যেহেতু ধর্মটা এক, বিরোধটা হবে না। ভূল ভাবনা। ভারত ভাগ হওয়ার পর পরই বিরোধ শুরু হয়ে গেল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শোষণ করতে শুরু করলো পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের। নিজেদের ভাষাও চাপিয়ে দিতে চাইলো। আরবের ধনী মুসলমানরা যেমন এশিয়া বা আফ্রিকার গরীব মুসলমানদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, মানুষ বলে মনে করে না, পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকরা ঠিক তেমন করতো, বাঙা লিদের মানুষ বলে মনে করতো না। পূর্ব পাকিস্তান ফসল ফলাতো, খেতো পশ্চিম পাকিস্তান। পুবের ব্যবসাটা বাণিজ্যটা ফলটা সুফলটা পশ্চিমের পেটে। এ কদিন আর সয়! মুসলমানে মুসলমানে যুদ্ধ হল। শেষে, বাঙালি একটা দেশ পেলো। ভীষণ আবেগে দেশটাকে একেবারে ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ইত্যাদি চমৎকার শব্দে ভূষিত করলো। কজন মানুষ ওই শব্দগুলোর মানে বুঝতো তখন? এখনই বা কতজন বোঝে? বোঝেনি বলেই তো চল্লিশ বছরের মধ্যেই দেশটা একটা ছোটখাটো পাকিস্তান হয়ে বসে আছে। ইসলামে থিকথিক করছে দেশ। টুপিতে দাড়িতে, হিজাবে বোরখায়, মসজিদে মাজারে চারদিক ছেয়ে গেছে। মানুষ সামনে এগোয়, বাংলাদেশ পিছোলো। চল্লিশ বছরে যা পার্থক্য ছিল বাংলাদেশে আর পাকিস্তানে, তার প্রায় সবই ঘুচিয়ে দেওয়া হয়েছে। সমান তালে মৌলবাদের চাষ হচ্ছে দুদেশের মাটিতে। বাংলাদেশ মরিয়া হয়ে উঠেছে প্রমাণ করতে, যে, মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। দ্বিজাতিতত্ত্বের ব্যাপারটা ভুল ছিল না, ঠিকই ছিল। দেশের সংবিধান বদলে গেছে। পাকিস্তানি সেনাদের আদেশে উপদেশে যে বাঙালিরা বাঙালির গলা কাটতো একা ত্তরে, পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে চায়নি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর খুব বেশি বছর যায়নি, দেশের তারা মন্ত্রী হয়েছে, দেশ চালিয়েছে। আমার মতো গণতন্ত্রে সমাজতন্ত্রে সমতায় সততায় বিশ্বাসী একজন লেখককে দেশ থেকে দিব্যি তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কিছু ধর্মীয় মৌলবাদীকে খুশি করার জন্য। যারা তাড়ালো, যারা আজও দেশে ঢুকতে দিচ্ছে নাআমাকে, সেই রাষ্ট্রনায়িকারা ওপরে যা-ই বলুক, ভেতরে ভেতরে নিজেরাও কিন্তু মৌলবাদী কম নয়।

বিজয় উৎসব করার বাংলাদেশের কোনও প্রয়োজন আছে কি? আমার কিন্তু মনে হয় না। আসলে ঠিক কিসের বিরুদ্ধে বিজয়? পাকিস্তান আর বাংলাদেশের নীতি আর আদর্শ তো এক! সত্যিকার বিরোধ বলে কি কিছু আছে আর? পাকিস্তানের ওপর নয়, বরং বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের রাগ একাত্তরের মিত্রশক্তি ভারতের ওপর। বিজয় দিবস করে খামোকাই নিজের সঙ্গে প্রতারণা না করলেই কি নয়! ১৬ ডিসেম্ব রে নয়, বাংলাদেশ বরং ১৪ই আগস্টে উৎসব করুক। পাকিস্তানের জন্মোৎসব করুক ঘটা করে। পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে মিশে রীতিমত জাঁকালো উৎসব। মুসলমানের উৎসব। বিধর্মীদের থেকে মুসলমানদের আলাদা করার ঐতিহাসিক উৎসব। বিজয় উৎসব।

বাঙালি নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই

পৃথিবীর এত জায়গায় বাঙালির উপস্থিতি দেখে মনে হয়েছিল পৃথিবীর সর্বত্র বুঝি বাঙালি আছে। আইসল্যাণ্ডে বাঙালি আছে কি না জিজ্ঞেস করেছিলাম আমার আইস ল্যাণ্ডের প্রকাশককে। বলেছিলেন, নেই। সে বহুকাল আগের কথা। এর মধ্যে হয়তো বসত শুরু করে দিয়েছে। ইওরোপ আমেরিকায় প্রচুর বাঙালি। যে করেই হোক পাঁচিল টপকেছে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোকেরা লটারি জিতে, নয়তো নানারকম ফন্দি ফিকির করে হাজির হয় বিদেশে, তারপর অবৈধ ভাবে বছরের পর বছর থেকে যেতে যেতে একসময় বৈধের ছাড়পত্র জুটিয়ে ফেলে। ভারতের বাঙালিদের রাজনৈতিক আশ্রয় জোটে না, যেহেতু দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি তারা হয়না। মূলত পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যায় বিদেশে, বা কোনও কাজ নিয়ে, তারপর আর দেশে ফেরে না, পাকাপাকিভাবে বাস করতে থাকে বিদেশে। ভারতের বাঙালিরা নিজেদের বলে, ভারতীয়। আর বাংলাদেশের বাঙালিরা নিজেদের বলে, বাঙালি। দুই অঞ্চলের বাঙালিতে মেশামেশির চল নেই। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে যা হয়। বাংলাদেশের বেশির ভাগ বাঙালি তুলনামূলকভাবে গরিব, শ্রমিক শ্রেণীর লোক। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বেশির ভাগই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ভালো চাকরি করা বা ব্যবসা করা লোক। টাকা পয়সা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির পকেটে ঢের বেশি। তবে দুই বাঙালিই একইরকম কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ঘটা করে পুজো আঠা,ঈদ রোজা কায় কেউ কারও চেয়ে কম যায় না। অবিজ্ঞান, অন্ধত্ব, অজ্ঞতা দ্বারা কারা বেশি আচ্ছন্ন, এসবের বিচার হলে দুদলেরই একশয় একশ নম্বর জোটে।

বাঙালি কবি সাহিত্যকরা হামেশাই বাঙালির পরব উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে বিদেশ যান। আমিও যাই খুব, তবে বিদেশি সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক, মানবাধিকার গোষ্ঠী বা সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা আমন্ত্রিত হয়ে। একবারই জীবনে বাঙালির আমন্ত্রণে, প্রথমে কিছুতেই রাজি না হয়ে, শেষে সম্মেলনের কর্তারা হাতে পায়ে ধরায় নিমরাজি হয়ে, গিয়েছিলাম। বঙ্গ সম্মেলনে। নিউইয়র্কের মেডিসন স্কোয়ারে অনুষ্ঠান হল। পনেরো হাজার বাঙালি হিন্দু বুড়ো বুড়ি, মধ্যবয়সী, কাচ্চা বাচ্চা। দেশের গান-বাজনা শুনতে এসেছে, দেশি নাচ দেখতে এসেছে, সেখানে পড়লাম কি-না কবিতা আমেরিকার বিদেশ নীতির সমালোচনা করে। এক দল চিৎকার করে উঠলো, তারা আমেরিকার সমালোচনা শুনতে চায় না, আমেরিকা তাদের খাওয়ায় পরায়, আমেরিকা ইরাকে আফগানিস্তানে যা করছে, উচিত কাজ করছে, মুসলমানদের মেরে শেষ করে দেওয়াই উচিত। ব্যস। আমাকে মঞ্চ থেকে নেমে পড়তে হল কবিতা শেষ না করেই। বাঙালি সভ্য শিক্ষিত দেশে বাস করছে, কিন্তু মন মানসিকতা উন্নত হচ্ছে কি না, ছোট একটা হুগলি, বা কলকাতা বা দুর্গাপুর বানিয়ে ওরা বেশ দিব্যি আছে। ভুতের মতো টাকা রোজগার করো, পছন্দের রাজনৈতিক দলকে টাকা পাঠাও, দেখে শুনে একটা অ্যাপ টমেন্ট কিনে দরজায় তালা লাগিয়ে চলে এসো, বছরে একবার দেশ থেকে ঘুরে এসো, আর এদিকে ও বড় গাড়ি কিনেছে তো ওকে আরও বড় গাড়ি কিনে দেখিয়ে দাও। মুক্ত চিন্তার চর্চা? নৈব নৈব চ। আজকাল দেখি বাঙালি লেখক শিল্পীরা, চাঁদা তুলে বিদেশের বাঙালিরা ঘরোয়া যেসব অনুষ্ঠান করে, ওসবে গান গেয়ে বা কবিতা পড়ে চাঁদার কিছু ভাগ নিজের পারিশ্রমিক হিসেবে নিয়ে এসে নিজেদের নামের আগে বেশ আন্তর্জাতিক শব্দটা লাগিয়ে ফেলেন, নয়তো নামের শেষে বিদেশ ফেরত।

ইওরোপ আমেরিকায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা সদাই মুখিয়ে থাকে সাহেবদের সঙ্গে মেলামেশা করার জন্য। ওদিকে বাংলাদেশের বাঙালির জীবনে সাহেবদের আনাগোনা একেবারে নেই বললেই চলে। সাদা কারও সঙ্গে ওঠাবসা যদি থাকে, সে শ্রমিক শ্রেণীর সাদা। ট্যাক্সি চালাচ্ছে, পান বিড়ির দোকান শুরু করেছে, ভাত মাছের দোকান বা দেশ থেকে আসা মুড়ি, মশলা, তেল, শুঁটকি, পটল কুমড়ো, আর বরফ-মাছের দোকান। দিয়েছে, নয়তো রাস্তায় ফুল ফল বিক্রি করছে। এগুলোর বাইরে যে জীবন নেই তা নয়। অনেক বাংলাদেশের বাঙালি খেটে খুটে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও হয়েছে, বিরাট ধনীও হয়েছে। বাংলাদেশের বড়লোক বাঙালিরা তাদের ছেলেমেয়েদের আজকাল বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পাঠায়। শ্রমিক শ্রেণীর বাঙালির কেউ কেউ আবার পত্রিকা ছাপাচ্ছে। এক নিউইয়র্কেই তো দশ বারোটা বাংলা দৈনিক। সবগুলোর মালিক আর সম্পাদক বাংলাদেশের বাঙালি। বেশির ভাগই অর্ধশিক্ষিত। সব পত্রিকার চুলের। ডগা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত বাংলাদেশের পত্রিকার খবরগুলোর পুনর্মুদ্রণ। এসব বাং লা-পত্রিকা ব্যবসায় কলকাতার বাঙালি নেই। তারা বাঙালির চেয়েও বেশি ইণ্ডিয়ান। নিজের বাঙালি পরিচয় নিয়ে অনেকেরই বড় কুণ্ঠা। গৌতম দত্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বিদেশে গিয়েছে, কবিতা লেখার বিস্তর চেষ্টা করে। সে তার নিজের নাম পাল্টে গ্যারি ডাট রেখেছে। এ নাম নাকি বিদেশিদের পক্ষে উচ্চারণ করা সুবিধে। সাদা আমেরিকানদের সুবিধে হবে এমন কিছুর জন্য অনেকে নিজের সত্যিকার না মটাকেই বিসর্জন দিয়ে দেয়। আমার বোনের মেয়ের নাম রেখেছিলাম স্রোতস্বিনী ভালোবাসা। সে তার নামটাকে ঘৃণা করে, কারণ বিদেশিদের নাকি তার নাম উচ্চারণ করতে কষ্ট হয়। এখন সে নিজের নাম রেখেছে আশা, ওদের সুবিধের জন্য। ওদের মধ্যে কেউ কি বাঙালির উচ্চারণের সুবিধের কথা ভেবে নিজের নাম পাল্টে ফেলেছে? না, এরকম অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুনিনি।

বাংলাদেশের যে হিন্দুরা বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে চমৎকার বাস করছে, তারা অনেকেই পশ্চিমবঙ্গে একআধখানা বাড়ি বানিয়ে রেখেছে। দেশে ঘুরতে গেলে বাংলাদেশ আর ভারত দুটোই ঘুরে আসে। সে না হয় এলো, কিন্তু বিদেশ বিভুয়ে বাঙালি না হলেও, অন্তত হিন্দু হওয়ার দৌলতে যেন পশ্চিমবঙ্গের দাদারা একটু খাতির টাতির করেন, তার চেষ্টা তারা নিরন্তর করে গেলেও খাতির ওই বাংলাদেশের গরিব মুসলমানদের থেকেই বেশি জোটে। দেশি লোকের খাতির। শ্রমিক শ্রেণীর হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে দেশে ভাই ভাই না হতে পারলেও বিদেশে কিন্তু অনেকটা ভাই ভাইই।

বেশির ভাগ বাঙালি বিদেশের যে জায়গায় বাস করে, তাকে কুয়ো বলা চলে। রীতিমত কুয়োর ব্যাংএর জীবন! তুলনায় বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ পুকুর। মুক্তচি ন্তার চর্চা কিছুটা হলেও কেউ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু নদী বা সমুদ্র? না, তার কোনও আভাস নেই। হাতে গোনা দুএকজন পাওয়া যাবে খুঁজলে, যাদের সমুদ্রে সাঁতার।

একসময় তিরিশ চল্লিশের দশকের উপন্যাস আর প্রবন্ধ পড়ে মনে হত, ভারতীয় উপমহাদেশে বাঙালিই সেরা বুদ্ধিজীবী। হয়তো ঠিকই। হয়তো তা-ই ছিল তখন। বাংলাদেশে মুক্তবুদ্ধি আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, পশ্চিমবঙ্গে সমাজতান্ত্রিক চেতনা, বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের আধুনিক মনন, মানুষের জন্য কাব্য, সঙ্গীত, সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথের অগাধ ভাণ্ডার, সব কিছু বাংলাকে কী ভীষণই না সমৃদ্ধ করেছিল। আজ অন্নদাশংকর, শিবনারায়ণ রায়, আর অম্লান দত্তের মৃত্যুর পর মনীষীর আকাল দেখি পশ্চিমবঙ্গে। যাঁরা আছেন, তাঁদের অনেকেই রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করেন, লেখকের বই নিষিদ্ধ করতে পরামর্শ দেন। তাঁদের বেশির ভাগ হয় সিপিএম বুদ্ধিজীবী, নয়তো তৃণমুলী বুদ্ধিজীবী, ওদিকে বাংলাদেশে প্রায় সব বুদ্ধিজীবীই আওয়ামি লীগ বুদ্ধিজীবী, নয়তো বিএনপি বুদ্ধিজীবী, নয়তো জামাতি ইসলামি বুদ্ধিজীবী… কেউই এখন আর নিরপেক্ষ মত প্রকাশ করতে পারেন না। সবাই এখন, যা বললে তাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলের লাভ হবে, তাই বলেন। দলের স্বার্থে বাক স্বাধীনতার বি রুদ্ধেও বলেন প্রচুর। আমার পাঁচটা বই বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কোনও বুদ্ধিজীবী আমার বই নিষিদ্ধর বিপক্ষে একটি কথাও উচ্চারণ করতে পারেননি, কারণ সব রাজনৈতিক দলই আমাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের, যে কোনও কারণেই হোক, ধারণা হয়েছে, আমার দেশে ফেরার অধিকার, আমার লেখার অধিকার, আমার কথা বলার অধিকার লংঘন না করলে দল জনপ্রিয়তা হারাবে।

আরও ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গে। পঁচিশ জন বুদ্ধিজীবী তৎকালীন মু খ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়ে বলেছে আমার দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ করতে হবে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বুদ্ধিজীবীদের প্রস্তাব ফেলতে পারেননি, তিনি বই নিষিদ্ধ করেছেন। পৃথিবীর কোথাও এমন ঘৃণ্য ঘটনা ঘটেনি। সব দেশেই লেখকরা লেখকদের মত প্রকাশের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেন। লেখকের বইনিষিদ্ধ করার জন্য আদালতেও যান না, রাজা মন্ত্রীর কাছেও দৌড়ান না। কিন্তু বাংলায়, পূর্ব আর পশ্চিম বাংলায় এই ঘটনা ঘটেছে। একটা সমাজ সচেতন, নারীবাদী, মানববাদী লেখককে কেউ সহ্যই করতে পারছে না। অথচ তার বই কিন্তু সেই পঁচিশ বছর ধরে মানুষ পড়েই যাচ্ছে। জনপ্রিয়তা নষ্ট করার জন্য দুই বাংলার সাহিত্য জগত তাকে নিষিদ্ধ করেছে, তার লেখা ছাপানোই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র চারিদিকে।

পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের চেয়ে অসহিষ্ণুতায় আরও এগিয়ে আছে। অন্তত আমার ক্ষেত্রে তাই দেখেছি। বাংলাদেশে চার লক্ষ লোকের জমায়েত হয়েছিল আমার বিরুদ্ধে, প্রায় প্রতিদিনই দশ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার লোকের মিছিল হত আমার ফাঁসির জন্য। হরতাল ডাকা হত। গাড়ি ঘোড়া অফিস আদালত বন্ধ করা হত শুধু আমাকে মেরে ফেলার দাবিতে। সেই অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার আমাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছে। অন্য লোকেরা আমার বিরুদ্ধে অন্যায় করেছে, সে কারণে শাস্তি দেওয়াহয়েছে আমাকে। অত্যন্ত অন্যায় কাজ আমাকে দেশ থেকে তাড়ানো। পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমাকে দেশ থেকে তাড়িয়েছে আমার বিরুদ্ধে লক্ষ লোকের মিছিল হয়েছে বলে? না, হায়দারাবাদে আমাকে কটা মৌলবাদী আক্রমণ করেছিল বলে, আর পার্ক সার্কাসের গলি থেকে কয়েকশ মানুষ বেরিয়ে বদমাইশি করেছিল বলে। প্রায় কিছু না ঘটতেই শাস্তি দেওয়া। হল আমাকে, মশা মারতে কামান দাগানোও হল, পশ্চিমবঙ্গ থেকে জন্মের মতো আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। রাজনীতিকরা মুহুর্মুহু অন্যায় করেন, প্রায় সব দেশেই। কিন্তু সুস্থ সচেতন মুক্তচিন্তক বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদ করেন অন্যায়ের। বাংলার বেলায় উল্টো। পুরোনো আমলের রাজকবিদের মতো আজকালকার সাহিত্যিকরা রাজার বদ মাইশিতে মাথা নেড়ে সায় দেন। বিবেক লোপ পেয়েছে বাঙালির। শুধু দুটো পয়সা, দুটো পুরস্কারএর লোভে নিজের সম্মান, মান, মর্যাদা, বোধবুদ্ধি বিক্রি করে দিতে দ্বিধা করেন না। রাজনীতিকদের চরিত্র নষ্ট হলে কোনও সমাজ নষ্ট হয় না, সমাজ নষ্ট হয় যখন শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র নষ্ট হয়।

বাঙালির চরিত্র বুঝতে আমার নিজের জীবনে যা ঘটেছে, সেটা জানলেই যথেষ্ট। আমার মতো বাঙালি, যে কিনা বিদেশের যশ খ্যাতি ফেলে দেশে ফেরার জন্য আকুল, যে কিনা পশ্চিমবঙ্গে বাস করতে শুরু করেছিল, আজ সে দু বাংলা থেকে প্রত্যাখ্যাত হতে হতে ইংরেজিতে ব্লগ লিখছে, ফ্রিথট ব্লগ। ফ্রিথট বা মুক্তচিন্তার অভাব বাংলায়, তাই বলে এর অভাব তো পৃথিবীর সর্বত্র নেই। বিদেশি লোকেরা বিস্তর প্রশংসা করছে, দিশি লোক মুখ ফিরিয়ে আছে। বাঙালির কাকঁড়া-চরিত্র আজও ভয়াবহ আকারেই বিরাজ করছে। সেদিন ভাষা দিবসে একটা কবিতা লিখলাম, শুনুন।

আজ ভাষা দিবস।
ঘরে আমি আর আমার বেড়াল,
আর কেউ নেই। কোথাও যাবার নেই সারাদিন।
না আমার, না বেড়ালের। আজ তোমরা গান গাও, আজ নাচো।
ভাষার উৎসব করো, স্বরবর্ণে সাজাও শহর,
ব্যঞ্জনবর্ণে শরীর।
কবিতা পড়তে পড়তে চোখের জল ফেলো। গান গাইতে গাইতে
শহিদ মিনারের দিকে হাঁটো। যত ফুল আছে দেশে,
মিনারের পাদদেশে দাও। ভাষাকে ধন্য করো।
আজ তোমাদের দিন।
তোমরা এক একজন সৈনিক ভাষার কসম খেয়
বড় বড় প্রস্তুতি নাও আগামীর, নিতে হয়, এই দিনে এমনই নিয়ম।

এ দিন আমার নয়। ছিল কোনও একদিন আমার দিন।
আমার ভাষা থেকে আমাকে তাড়িয়েছ আজ দেড়যুগ হল,
ভাষার ত্রিসীমানা থেকে আমাকে বিদেয় করেছ দেড়যুগ হল।
অন্য ভাষাকে অনুচ্চারিত রেখে, অন্য দেশকে অস্বীকার করে,
তোমাদের বন্ধ দরজার সামনে অপেক্ষা করছি অনেক বছর,
দরজা কিন্তু কেউ খুলছো না।
আমি যে দাঁড়িয়ে আছি, দেখছ, কিন্তু কোথাও বলছো না দেখছো
যেন দেশটা তোমাদের একার,
যেন তোমাদের একার ভাষা, যে ভাষায় আমি কথা বলি।
যে ভাষায় লিখি, তা আমার নয়, তোমাদের, তোমাদের একার।
যে ভাষায় আমার শৈশব কৈশোর, যে ভাষায় যৌবন,
যে ভাষায় স্বপ্ন দেখি, আমার নয়, কখনও ছিল না, তোমাদের সব।
ভাষাকে যেন আমি যত বাসি, তার চেয়ে বেশি ভালোবাসো
বা বেসেছিলে কোনওদিন!

আজ ভাষা দিবস,
আমিও ভাষার উৎসব করবো আজ।
তোমাদের ওই ভাষায় একটি শব্দও আমি উচ্চারণ করবো না আজ,
একটি শব্দ কোথাও লিখবো না আজ,
আজ উৎসব করবো কোনও স্বপ্ন না দেখে,
আজ শুধু বেড়ালের সঙ্গে কথা বলবো, বেড়ালের ভাষায়।

বাঙালির বোরখা

ষাটের দশকের শেষ দিকে আমি বিদ্যাময়ী ইস্কুলে পড়ি। ময়মনসিংহ শহরের সবচেয়ে নামকরা মেয়েদের ইস্কুল। হাজারো ছাত্রী, কিন্তু কেউই কখনও বোরখা পরতো না। কোনো ছাত্রী তো নয়ই, কোনও শিক্ষিকাও নয়। বোরখার কোনও চলই ছিল না। খুব পদানসীন মৌলবী পরিবারের বয়স্ক মহিলারা বাইরে বেরোলে রিকসায় শাড়ি পেঁচিয়ে নিত। ওদেরও পরার বোরখা ছিল না। সত্তরের দশকে আমি ওই শহরেই রেসিডেন্সি য়াল মডেল ইস্কুলে পড়ি। সারাইস্কুলে একটি মেয়েই বোরখা পরতো। তখন বোরখা কিনতে পাওয়া যেত না। পরতে চাইলে কাপড় কিনে বানিয়ে নিতে হত। মেয়েটির বোরখাও কাপড় কিনে বানিয়ে নেওয়া। তার মৌলবী-বাবা জোর করে তাকে বোরখা পরাতো। মেয়েটি আমাদের ক্লাসেই পড়তো। নাম ছিল হ্যাপি। লম্বা টিংটিঙে মেয়ে। আমিও ছিলাম হ্যাপির মতো লম্বা টিংটিঙে। হ্যাপি তার বোরখাটা ইস্কুলের গেটের কাছে এসেই খুলে ফেলতো, বোরখাটাকে বইখাতার ব্যাগে ঢুকিয়ে তবেই ইস্কুলে ঢুকতো। সে যে বোরখা পরে ইস্কুলে আসে তা কাউকে জানতে দিতে চাইতো না। কিন্তু খবরটা একদিন ঠিকই জানাজানি হয়ে যায়। জানাজানি হওয়ার পর ইস্কু লের মেয়েরা সবাই হ্যাপিকে নিয়ে হাসাহাসি করতো। হ্যাপি ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসতো বোরখা পরার লজ্জায়। সঙ্গে আবার পড়াশোনা ভালো না করার লজ্জাও ছিল। আমি ভালো ছাত্রী হলেও সবার সঙ্গেই মিশতাম। হ্যাপির সঙ্গেও। হ্যাপি খুব অসভ্য অসভ্য গালি জানতো। ক্লাসের অন্য মেয়েরা হ্যাপির মতো অত গালি জানতো না। আমি তো আগে কোনওদিন শুনিনি ওসব গালি। হ্যাপি যখন ক্লাস নাইনে বা টেন-এ, তখন তার বাবা জোর করে তার বিয়ে দিতে চাইছিল। হ্যাপি তার হবু-স্বামীর কথা বলতো আর তার বাপ মা তুলে গালিগালাজ করতো। আমি অবাক হয়ে ওসব শুনতাম। ক্লাসের সবচেয়ে ডাকাবুকো মুখ-খারাপ মেয়ে কিনা বোরখা পরে। আর আমরা যারা কোনও গালি জানি না, আমরা যারা সরল সোজা ভালোমানুষ, তারা কোনওদিন বোরখার কথা কল্পনাও করিনি। বোরখা একটা হাস্যকর পোশাক ছিল ষাট আর সত্তর দশক জুড়ে। দুএকজন যারা পরতে বাধ্য হতো, তারা লজ্জায় রাস্তাঘাটে মাটির সঙ্গে মিশে থাকতো।

আশির দশকের শেষ দিকে শাড়ির ওপর একটা বাড়তি ওড়নার মতো কাপড় পরা শুরু হয়েছিল। নব্বই দশকের শুরুতেও তাই ছিল। একটা বদ হাওয়া টের পাচ্ছিলাম, প্রাণপণে রুখতে চাইছিলাম সেই বদ হাওয়া। সমাজের ইসলামীকরণ এবং নারীবিরোধী ইসলামী আইনের প্রতিবাদ করেছিলাম। সে কারণে আমাকেই তাড়িয়ে দেওয়া হল দেশ থেকে। চুরানব্বই থেকে দেশের বাইরে। নির্বাসন জীবনে দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে সব খবর রাখার সুযোগ হতো না। হঠাৎ সেদিন, এই বছর দুয়েক আগে, চমকে উঠেছি কিছু ছবি দেখে। আমাদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ঘটে যাওয়া রজত জয়ন্তী উৎসবের ছবি, যে উৎসবে আমার প্রচুর সহপাঠী গিয়েছিল, সবাই এখন দেশ বিদেশের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। ছবিগুলোর সামনে আমি হতভম্ব, হতাশ বসে থেকেছি সারাদিন। প্রায় সব সহপাঠী মেয়ের মাথায় হিজাব, কালো কাপড়ে কপাল অবধি ঢাকা, অত সুন্দর চুলগুলো সব লুকিয়ে ফেলেছে। আর প্রায় সব সহপাঠী ছেলের মুখে দাড়ি নয়তো মাথায় টুপি, কপালে মেঝেয় কপাল ঠুকে নামাজ পড়ার কালো দাগ। এই ছেলেমেয়েগুলো পুরো আশির দশক জুড়ে আমার সঙ্গে ডাক্তারি পড়েছে, কোনওদিন কাউকে এক রাকাত নামাজ পড়তে দেখিনি, কোনওদিন কাউকে আল্লাহর নাম মুখে নিতে শুনিনি। এমন আধুনিক সব চিকিৎসাবিজ্ঞানী কি না হয়ে উঠেছে পাঁড় ধর্মান্ধ? কে এই বিজ্ঞানীদেরও মাথার খুলি খুলে গোবর ভরে দিয়েছে। তবে কি সেই বদ হাওয়া, যেটিকে রুখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু রুখতে দেওয়া হয়নি, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল বিষাক্ত ভাইরাস, যুক্তি বুদ্ধি চিন্তাশক্তি লোপ পাইয়ে দেওয়ার ভাইরাস? যদি ডাক্তারদেরই এই হাল, কল্পনা করতে পারি আর সব সাধারণ মানুষ এখন ধর্মান্ধতার কোন স্তরে পোঁচেছে। পোঁচেছে না বলে সম্ভবত তাদের কোন স্তরে পোঁছোনো হয়েছে বলা ভালো। আজ দেশ থেকে একজন জানালো, মিতা হকের বক্তব্য নিয়ে দেশে নাকি হুলস্থুল কাণ্ড হচ্ছে। ইউটিউবে কিছুক্ষণ আগে শুনলাম ওঁর কথা। চলতে ফিরতে রাস্তাঘাটে বাজারে অফিসে যেখানেই যত মেয়েদের চোখে পড়ে, প্রায় সবারই পরনে নাকি থাকে কালো বোরখা, শুধু চোখদুটো খোলা, যেন হোঁচট না খায়! প্রায় সবাই তবে চলমান কয়েদি! সবারই গায়ে মস্ত কালো সতীত্ব বন্ধনী! মিতা হক যা বলতে চেয়েছেন, তা হল, নিজেদের সংস্কৃতিকে সম্মান করো, আরবের ধর্ম গ্রহণ করেছো, কিন্তু আরবের পোশাক-সংস্কৃতি তোমাকে গ্রহণ করতে হবে কেন!

বোরখা ঠিক আরবের পোশাক নয়, বোরখা ইসলামের পোশাক। আরবে ইসলাম আসার আগে বোরখা বলে কিছু ছিল না। ইসলামকে নিরীহ বাঙালি মুসলমানদের মস্তিষ্কের কোষে কোষে এমন গভীরভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে গত দুদশক ধরে বাঙালি মুসলমান মেয়েরা বোরখাকে নিজের পরিচয়ের অংশ বলে মনে করছে, অথবা মনে করতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা বৌদ্ধ, আমরা হিন্দু, আমরা খিস্টান, আমরা। মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি–সত্তর দশকে বাঙালিরা এই গানটা খুব গাইতো। এই গান কেউ আর এখন গায় বলে মনে হয় না। এখন বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় মুসলমান পরিচয়। এই পরিচয়টি যখন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বোরখার চল বাড়ে। দাড়ি টুপির প্রকোপ বাড়ে। তুমি মসজিদ মাদ্রাসা বানিয়ে দেশ ছেয়ে ফেলবে, তুমি ইসলামি আইন রাখবে দেশে, তুমি সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখবে, তুমি ইসলামি মৌলবাদীদের রাজনীতি করতে দেবে, তাদেরকে সংসদে বসতে দেবে, তাদেরকে অবাধে ওয়াজ মাহফিল আর ইসলামি জলসা করতে দেবে, তোমার চোখের সামনে ইসলামিকরণ হবে দেশটার, আন্তর্জাতিক মৌলবাদী-সন্ত্রাসী চক্র কাড়ি কাড়ি টাকা পাঠাবে দেশের যুব সমাজকে নষ্ট করার জন্য, যুব সমাজ নষ্ট হতে থাকবে আর তুমি শাড়ি পরে কপালে টিপ পরে সাহিত্য সংস্কৃতির ছোট একটা শহুরে গোষ্ঠীর মধ্যে ঘোরাঘুরি করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে গাইতে স্বপ্ন দেখবে বাঙালির বাঙালি পরিচয়টা বড় মুসলমান পরিচয়ের চেয়ে, তা কী হয়! এ তো রীতিমত জেগে ঘুমোনোর মতো

মেয়েদের বোরখা পরার অর্থ হল, মেয়েরা লোভের জিনিস, ভোগের বস্তু, মেয়েদের শরীরের কোনও অংশ পুরুষের চোখে পড়লে পুরুষের যৌন কামনা আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে, লোভ লালসার বন্যা নামে, ধষর্ণ না করে ঠিক শান্তি হয় না। পুরুষদের এই যৌনসমস্যার কারণে মেয়েদের আপাদমস্তক ঢেকে রাখতে হবে। এই হলো সপ্তম শতাব্দীতে জন্ম হওয়া ইসলামের বিধান। এই বিধান বলছে, পুরুষেরা সব অসভ্য, সব বদ, সব যৌন কাতর, ধর্ষক, তারা নিজেদের যৌন ইচ্ছেকে দমন করতে জানে না, জানে না বলেই শরীরের আপাদমস্তক ঢেকে রাখার দায়িত্ব মেয়েদের নিতে হয়। সত্যি কথা বলতে কী, বোরখা মেয়েদের যত অপমান করে, তার চেয়ে বেশি করে পুরুষদের। বোরখার প্রতিবাদ পুরুষদেরই করা উচিত। অবাক হই, পুরুষেরা কী করে তাদের নিজেদের ধর্ষক পরিচয়টিকে টিকিয়ে রাখতে চায় মেয়েদের বোরখা পার বিধানটি জারি রেখে নিজেদের আত্মসম্মানবোধ বলে কিছুই কি নেই পুরুষের? তারা কেন এখনও বলছে না, আমরা মেয়ে দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়বো না, আমরা আমাদের যৌনইচ্ছেকে সংযত করতে জানি, আমরা বর্বর নই, আমরা অসভ্য অসংযত ধর্ষক নই। আমরা শিক্ষিত, সভ্য। মেয়েরাও আমাদের মতো মানুষ। মেয়েদেরও তো যৌনইচ্ছে আছে, সে কারণে আমাদের তো বোরখা পরতে হয় না। যদি মেয়েরা তাদের যৌনইচ্ছেকে সংযত করতে জানে, আমরা জানবো না কেন? আমরা জানি মেয়েদের সম্মান করতে। আমাদের দোহাই দিয়ে মেয়েদের বোরখার কারাগারে ঢুকিয়ে অত্যাচার করা আর চলবে না। মিতা হকের আরব সংস্কৃতি নিয়ে বেশ রাগ। আরব সংস্কৃতি কেন বাংলায় এসেছে, এ প্রশ্ন অবান্তর। আরব, পারস্য, তুরস্ক, সমরখন্দ– এসব দেশ থেকে মুসলমানরা ভারতবর্ষে এসেছে, সঙ্গে ইসলাম এসেছে, দশম-একাদশ শতাব্দীতে মুসলমান সুফিয়া বেশ জনপ্রিয় হতে শুরু করেছিল। আমাদের হিন্দু পূর্বপুরুষ ধর্মান্তরিত হয়েছেন নানা কারণে, সুফিদের অমায়িক ব্যবহারে অথবা ব্রাহ্মণদের জাতপাতের অত্যাচারে। কোনও ভাষা বা কোনও সংস্কৃতি মন্দ নয়, অসুন্দর নয়। আমাদের নিজেদের ভাষা আর সংস্কৃতিও পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা আর সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেছে, মিশেছে। ভাষা আর সংস্কৃতির বিবর্তন সবসময় ঘটছে, বাংলার মেয়েরা সবসময় এভাবে শাড়ি পরতো না, যেভাবে এখন পরে। বাঙালিরা সবসময় ঠিক এই ভাষায় কথা বলতো না, যে ভাষায় আমরা এখন কথা বলছি বা লিখছি। আমাদের ভাষার মধ্যে অন্য অনেক ভিনদেশি শব্দ ঢুকেছে। দরজা খোলা রাখাই ভালো, অন্য শব্দ, অন্য সুর, অন্য গল্প ঢুকতে চাইলে ঢুকুক। নিজের ভাষা আর সংস্কৃতি এতে মরে যায় না, বরং সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু ক্ষতি হয় যখন কোনও ধর্ম তার মৌলবাদী চরিত্র নিয়ে ঢোকে। কারণ মৌলবাদী ধর্ম মানবতার আর মানবাধিকারের ঘোর বিরোধী। ভারতবর্ষে যে। সুফি ইসলামের প্রচার হয়েছিল, সেটির চরিত্র ছিল উদার। সুফিরা নামাজ রোজায় বিশ্বাসী ছিলেন না। বুলেহ শাহ নামের এক সুফি কবি তো মসজিদ মন্দির সব ভেঙে ফেলার কথা বলতেন। বলতেন, মসজিদ মন্দির ভেঙে ফেলো, হৃদয় ভেঙো না, হৃদয়ই সবচেয়ে বড় পবিত্র স্থান, কাবার চেয়েও পবিত্র। সুফি ইসলামকে সরিয়ে মৌলবাদী ইসলাম গেড়ে বসলো ভারতবর্যে, সম্ভবত তিরিশ চল্লিশের দশকেই, গোটা পৃথিবীকেই দখল করার জিহাদি স্বপ্ন নিয়ে তখন মাওলানা মওদুদি বানিয়ে ফেললেন তাঁর জামাতে ইসলামি দল। ভারত ভাগের পর ভৌগোলিক সুবিধের কারণে অত দ্রুত মৌলবাদী ইসলাম এসে নষ্ট করতে পারেনি হিন্দু বৌদ্ধ বেষ্টিত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমানদের। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকের দুঃশাসন থেকেও পূর্ব পাকি স্তান ব্যস্ত ছিল নিজেদের বাঁচাতে। সুফি ইসলামের তখনও রেশ ছিল বলে মুস লমানিত্বের চেয়ে বাঙালিত্ব বড় ছিল বাঙালি মুসলমানদের কাছে। একাত্তরের পর যখন সেনাবাহিনীর লোকেরা শাসন করতে শুরু করলো দেশ, মৌলবাদী ইসলামকে তারা বেশ সোহাগ করে বড় আসন পেতে দিল বসতে, ননীটা ছানাটা খাইয়ে নাদুস। নুদুস করলো, আর সত্যিকার নষ্ট হতে থাকলো তখন দেশ। মৌলবাদী ইসলামে দেশ ছেয়ে গেলে বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে মুসলমান পরিচয়, বাংলা ভাষার চেয়ে মূল্যবান হয়ে ওঠে আরবী ভাষা, হৃদয়ের চেয়ে পবিত্র হয়ে ওঠে মক্কা মদিনা। আমি মনে করি না ভালোবেসে কেউ তখন আরবীয় সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি বলে গ্রহণ করে। ভয়ে গ্রহণ করে, আল্লাহর ভয়ে, দোযখের ভয়ে। ইসলামের জন্মভূমির সব কিছুকে অনুকরণ করে দোযখের আগুন থেকে যদি বাঁচা যায়, চেষ্টা করে। মানুষ তখন বিভ্রান্ত। একগাদা রূপকথাকে সত্যি বলে ভেবে নিলে অপ্রকৃতিস্থর মতো আচরণ তো করবেই। দোকানপাটে তো ঝুলবেই শত শত রেডি মেইড বোরখা। কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হবে মেয়েদের নাম পরিচয়, মেয়েদের অস্তিত্ব। মেয়েরা তখন শুধু জম্বি, ওয়াকিং ডেড, ফেসলেস। শুধুই নো-বডি, কেউ। নয়। দুঃখ এই, এইটুকু বোঝার ক্ষমতাও মেয়েরা হারিয়ে ফেলছে যে বোরখা তাদের কেউ থেকে কেউ নয় বানিয়ে ফেলে।

বোরখার বিরুদ্ধে বলেছেন বলে মিতা হককে নাকি লোকেরা খুব গালি গালাজ করছে। যে পুরুষগুলো বলে বোরখা খুব ভালো পোশাক, সুন্দর পোশাক, চমৎকার। পোশাক, ওই পুরুষগুলো কেন বোরখা পরছে না কেউ জিজ্ঞেস করেছে? কেউ কেন ওদের জিজ্ঞেস করছে না, বোরখা যদি অত ভালো পোশাক, তাহলো তোরা বোরখা পরছিস না কেন? দুদিন ভালো পোশাকটা পরে দেখ না কেমন ভালো লাগে!?

ব্যক্তিগত কিছু ঈর্ষা-জনিত কারণে তাঁর স্ত্রীদের জন্য বোরখার প্রচলন শুরু করে ছিলেন পয়গম্বর। বেশ ছিল। হঠাৎ কী মনে হল কে জানে, বলে দিলেন সব মুসলমান মেয়েকেই এখন বোরখা পরতে হবে। চৌদ্দশ বছর আগে যে কারণেই মুসলমানদের মধ্যে বোরখার চল শুরু হোক না কেন, এখন এই একবিংশ শতাব্দীতে মেয়েদের বোরখা পরার পেছনে কোনও যুক্তি নেই। সত্যি বলতে কী, বোরখা মেয়েদের কাজে লাগে না, লাগে পুরুষের কাজে। বোরখাআসলে পুরুষের পোশাক, চোর ডাকাত খুনী পুরুষের পোশাক। পুরুষেরা যখন চুরি ডাকাতি করে, খুন করে, বোরখা পরে নেয়। এতে ওদের সুবিধে হয় বেশ, কেউ চিনতে পারে না। চোর ডাকাতের পোশাককে ধর্মের নামে মেয়েদের গায়ে চাপানোর কোনও মানে হয়?

 বাবা

ছোট ছিমছাম শহর। দুপুরবেলায় রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। কিছু কুকর জিভ বার করে হাঁটে, কিছু গাছের ছায়ায় ঘুমোয়। রাতেও শহরটা নৈশব্দের কুয়োর মধ্যে ডুবে থাকে। এমন এক শহরে হঠাৎ করে নানা রকম লোক আসতে শুরু করেছে, কারণ কল কারখানা গড়ে উঠছে, প্রচুর কাজ জুটছে লোকের। মাটির তলায় প্রাকৃতিক গ্যাস। আবিষ্কার হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে, এরপর শহরের লোকেরা হয়তো ভুলেও গিয়েছিল গ্যাসের কথা, কিন্তু রাজধানীর লোকেরা ভোলেনি। দিব্যি গ্যাস তোলার দিন তারিখ ঠিক করে ফেলেছে। রীতিমত ঘোষণা দিয়ে নেমে পড়া যাকে বলে। পিঁপড়ের মতো মানুষ আসছে আশেপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে। শহরে যেন গ্যাস নয়, গুড় পাওয়া গেছে কোথাও, ফ্রি গুড়।

এসময়, যখন চারদিকে লোকেরা চাকরি পাচ্ছে, বাবার চাকরিটা চলে গেল। বাবা একটা ফার্নিচার কোম্পানীতে ডিজাইনারের কাজ করতো। কোম্পানীটা যে বিল্ডিংএ ছিল, সেটাকে এখন গ্যাসের বিল্ডিং করা হয়েছে। আশেপাশে যে কটা বিল্ডিং ছিল, কিনে নিয়েছে গ্যাসের লোকেরা। কোম্পানীর মালিক বলেছেন সময়মতো বাবাকে জানানো হবে কবে থেকে ফের চাকরিতে যোগ দিতে হবে। বাবা ছমাস বসে কাটালো। সংসার তো এভাবে চলে না। মামারা সাহায্য করছে। ছমাস বাবা নানারকম ব্যবসায় টাকা খাঁটিয়ে টাকার সর্বনাশ করেছে। বাড়িটায় ঝাঁক ঝাঁক হতাশ কুণ্ডুলি পাকিয়ে কুকুরের মতো শুয়ে থাকে দিন রাত। ডানাও নেই যে তাড়ালে কোথাও উড়ে যাবে। চারদিক থেকে প্রচুর পরামর্শ আসছে, রামেন্দু-বাবার সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ। রামেন্দু-বাবার নাম বছর দুই হলো সবার মুখে মুখে। তার আশীর্বাদের ফলে নাকি লোকের চাকরি জুটছে, ব্যবসাপাতি ভালো হচ্ছে। বাবা শুনে উড়িয়ে দিয়েছিল। বাবা কোনও বাবায় বিশ্বাস করে না, সাফ সাফ বলে দিয়েছিল। চেঁচিয়ে বলেছিল, আমি যাবো লোক ঠকানো ভণ্ড লোকের কাছে আশীর্বাদ চাইতে? আমি নয়, আমার লাশ যাবে।

সপ্তাহ চার পরে বাবার লাশ নয়, বাবা নিজেই গিয়েছে রামেন্দু-বাবার বাড়িতে। ফিরেছে হাসিখুশি মুখে। এরপর প্রতিদিনই গেছে। আপাদমস্তক বিজ্ঞান-বিশ্বাসী মানুষ চোখের সামনে রামেন্দু-বাবার ভক্ত বনে গেল। রামেন্দু-বাবা আশা দিয়েছে, ভালো চাকরি বা ভালো ব্যবসা বাবার শীঘ্র হবে। কিছুদিন পর বাবা বললো, রামেন্দু-বাবা বাড়ির সবাইকে নিয়ে তার কাছে যেতে বলেছে সামনের সপ্তাহে। আমি বলে দিয়েছি, যাবো না। মুহূর্তে বাবার ওই হাসিখুশি মুখখানা মলিন হয়ে গেল। তারপর অবশ্য বাবার মুখে হাসি ফেরাতে আমাকে বলতেই হয়েছে, যাবো। বাড়ির সবাই বলতে বাবা, মা, আমি আর আমার ছোটভাই সন্তু। আমরা গেলাম একদিন ঠিক ঠিক। আমাদের ভালো ভালো জামাকাপড় পরে গেলাম। রামেন্দু-বাবা গেরুয়া রংএর কাপড় গায়ে। পেঁচিয়ে রেখেছে। আশেপাশে লোক প্রচুর। উঠোনে মখমলের চাদর বিছানো। সারা বাড়িতে রামেন্দু-বাবার বড় বড় মূর্তি। যেন ভগবান তিনিই। বাবা সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলো, মাও করলো, আমাকে আর সন্তুকে বলা হলে সন্তু করলো, আমি করিনি। লোকটা শুরু থেকেই আমার দিকে কেমন চোখে তাকাচ্ছিল আমার ভালো লাগছিল না। রামেন্দু-বাবার চোখের চেয়ে অগ্নির চোখের চাহনি ভালো লাগে আমার। অগ্নি আমার বন্ধু। ভালো লাগা পর্যায়ে অগ্নির সঙ্গে সম্পর্কটা আটকে আছে। বাবা পছন্দ করলেও, অগ্নিকে পছন্দ নয় মার। মা বলে, অগ্নি ছোট জাত। জাতপাত আমি মানি না। আমি অনেকটা বাবার মতো। বাবাও জাতপাত মানে না। কিন্তু বাবাও রাগ করেছিল অগ্নির সঙ্গে যখন আমি জয়দেবের মেলায় গিয়েছিলাম। ফিরেছিলাম তিনদিন পর। মা বলেছিল, বিয়ের আগে মেয়েরা কারও সঙ্গে সম্পর্ক করলে পরে বর পেতে অসুবিধে হয়। এসব খবর চাপা থাকে না। জয়দেবের মেলায় তিনদিন হারিয়ে যাওয়ার খবর পাত্রপক্ষ ঠিকই নেবে। মা তারপরও অগ্নিকে পাত্র বলে ভাবতে পারেনি। মাথায় হাত ছুঁইয়ে চুঁইয়ে সবাইকে আশীর্বাদ করলো রামেন্দু-বাবা। শুধু আমাকেই হেঁচকা একটা টান দিয়ে নিজের কোলের কাছে নিয়ে পিঠে আর মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বললো, এ খুব দুষ্ট, তাই না, এ তো আমাকে প্রণাম পর্যন্ত করলো না, কী, এই মেয়ে কি ভগবানে বিশ্বাস করে না? মা তাড়াতাড়ি বললো, হ্যাঁ তা নিশ্চয়ই করে, আসলে ওর অনেকদিন মনটা ভালো নেই,শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করলো। এন্ট্রান্স পরীক্ষা নিয়ে টেনশনে থাকে খুব। অনেক জায়গায় অ্যাপ্লাই করেছে। রামে দু-বাবা হেসে বললো, তাই নাকি? তাহলে ওকে শনিবারে আর মঙ্গলবারে পাঠিয়ে দিও আমার কাছে, বিকেল পাঁচটায় চলে এসো মা, বুঝলে? দুচারদিন আশীর্বাদ নাও, আমার কথা মেনে কাজ করো, শরীর মন সব ঠিক হয়ে যাবে। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ হবে। চিন্তামুক্ত থাকো।

কথা বলতে বলতে কত রকম যাদু দেখাচ্ছিল যে রামেন্দু বাবা, পকেট থেকে একটা টাকা বার করলো, মুহূর্তের মধ্যে টাকাটাকে উধাও করে ফেললো, পাশ থেকে একটা রুমাল তুলে নিল, রুমালটা হঠাৎ কলম হয়ে গেল। এসব দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হল সন্তু। তারপর হল মা। মা তো ভক্তিতে গদগদ। পারলে আশীর্বাদের জন্য আজকেই আমাকে রেখে যায় রামেন্দু-বাবার আশ্রমে।

আমাকে শনিবারে আসতেই হয়েছে রামেন্দু-বাবার কাছে। ধরে বেঁধে বাবা মা। দুজনই রেখে গেছে রামেন্দু-বাবার দায়িত্বে। রামেন্দু-বাবা আমাকে ভেতরের ঘরে নিয়ে অনেকবার ধর্ষণ করেছে। আমি আর ধর্ষণের ঘটনাগুলো বর্ণনা করতে চাই না। করলে। আমি জানি আমি আর পারবোনা কথা বলতে, আমার সারা শরীর কাঁপবে, আমি কাঁদবো, আমি চিৎকার করবো, সেদিন যেমন করেছিলাম, আর আমার হাত পা ধরে রেখেছিল দুটো লোক, মুখ চেপে রেখেছিল এক মহিলা, আর উলঙ্গ রামেন্দু-বাবা আমাকে যেন কাঁচা খেয়ে ফেলবে এমন করে ধর্ষণ করেছে। এরপর আমাকে একটা বাথটাবের গরম জলে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মুখ চেপে ধরা মহিলা সুগন্ধী সাবান মাখা নরম একটা স্পঞ্জ আমার সারা গায়ে বুলোতে থাকে। এভাবে কোনওদিন আমি স্নান করিনি। বাবা আমাকে ফেরত নিতে এলে রামেন্দু-বাবা বলে দিয়েছে, ও ঘুমোচ্ছে, ওকে টেক কেয়ার করছে আশ্রমের মন্দিরা, আজ রাতটা ও আশ্রমেই কাটাক। চরম ডিপ্রেশনে ছিল মেয়েটা। এখন ঠিক হয়ে যাবে, চিন্তা করো না। মন্দিরা, স্নান করানো মহিলা আমাকে জানালো। ঠিক কী বলেছে বাবাকে রামেন্দু। মন্দিরা আমাকে বাথটাব থেকে তুলে নরম একটা সাদা তোয়ালে দিয়ে আলতো করে গা মুছিয়ে একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ল্যাভেণ্ডারের গন্ধ ছড়ানো ঘরে নিয়ে আসে। শুইয়ে দেয় সাদা নরম বিছানায়। অনেকগুলো সুস্বাদু মিষ্টি খাইয়ে দেয়, হলুদ হলুদ রঙের ঠাণ্ডা শরবত মুখের সামনে ধরে, খেতে হয়। আমাকে এমন যত্ন করা হয়, যেন আমার কঠিন কোনও অসুখ হয়েছে। কিছু তো একটা হয়েছেই। শরীরে কোনও শক্তি পাচ্ছি না। এই ঘুমোচ্ছি, এই জাগছি। সম্ভবত ঘুমের ওষুধ আর ব্যথার ওষুধও দুটোতেই আমাকে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে দেখি ঘরে আর কেউ নেই, আমার শরীরের ওপর রামেন্দুর মস্ত বড় শরীর। তার ওই শরীরটা আমাকে চেপে চ্যাপ্টা করে ফেলছে। লোকটা আমার বাবার থেকেও অনেক বয়সে বড়। আমার মুখ দিয়ে আর শব্দ বেরোয় না। আমি দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করি। কেন করি, কে জানে। আমি তো চিৎকার করে লোকটাকে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সরিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে পারি, অন্তত চেষ্টা তো করতে পারি। কিন্তু শরীরে এক ফোঁটা শক্তি আছে বলে মনে হয় না। এমন কী চিৎকারটুকুও চেষ্টা করে দেখেছি, পারি না। দুদিন পর বাড়ি পৌঁছেছি। বাড়িতেও ঘুমোচ্ছি। কারও সঙ্গে কোনও কথা বলিনি। মা খাটের পাশে টেবিলে খাবার রেখে গেছে। একটু খেয়ে আবারও ঘুমিয়ে পড়েছি। সম্ভবত কোনও কঠিন ঘুমের ওষুধ আমাকে রামেন্দু-বাবা খাইয়েছিল। এত ঘুম দেখে বাবা মা দুজনই ভেবেছে আমার বোধহয় দুশ্চিন্তা ঘুচেছে। রামেন্দু-বাবার কাছে যাওয়ার আগে আমার ঘুমই হত না ভালো। ইনসোমনিয়ায় ধরেছিল। সেটি তো অন্তত গেল! মায়ের চোখ আমার শরীরে ঘটে যাওয়া ধর্ষণটি দেখতে পাচ্ছেনা। মেয়েরা তো মেয়ের শরীর বোঝে বলে জানতাম। ভক্তি বোধহয় মানুষকে অন্ধ করে দেয়। এর পরের সপ্তাহে আবারও আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় রামেন্দু-বাবার আশ্রমে। ওখানে রেখে আসা হয়, দুদিন পর বাড়ি ফিরিয়ে আনা হয় আমাকে। বাবা কি বুঝতে পারে না, মাও কি পারে না যে আমাকে ওই ধর্ষকের বাড়ি রেখে আসাটা ঠিক হচ্ছে না! নাকি একটা ভালো চাকরির জন্য বা ভালো ব্যবসার জন্য নিজের মেয়ের সর্বনাশ করতে দ্বিধা করছে না ওরা! হয়তো সব জেনেও না জানার ভান করছে। দ্বিতীয়বার বাড়ি ফিরে আমি বাবা আর মা দুজনকেই বলেছি, রামেন্দু-বাবা আমাকে ধর্ষণ করেছে। শুনে বাবা শক্ত একটা চড় মেরেছে আমার গালে। বলেছে, খবরদার গুরুজীর নামে আর একটা মিথ্যে কথা উচ্চারণ করবি না। লোকটা যে ভগবানের দূত নয়, একটা ধর্ষক, তা বারবার বলেছি আমি, কিন্তু আমার কথা শোনার মত বা বোঝার মতো মন কারওর নেই। ভগবান বললে সন্তানের গলাও কাটতে পারে লোকে। আমার বাবা মা আর সবার মতোই। মা বলেছে, এর ধর্মে বিশ্বাস নেই। পুজো আচ্চা তো কিছু করেই না। মাথায় শুধু পাপের চিন্তা। বাবা মা দুজনই রামেন্দু-বাবা বা গুরুজী বলতে অজ্ঞান। চাকরিটা যে বাবার এখনও হচ্ছে না, তা নিয়েও বাবার মাথাব্যথা নেই। বাবা মা এখন আর বাবা মা নেই। গুরুজী যা বলে তাই অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করে। সাশাকে গলা টিপে মেরে ফেলো, গুরুজী এই আদেশ করলে আমার বিশ্বাস, বাবা মা ঠিক ঠিকই আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলবে। যত যাই ঘটুক বাড়িতে, আমি যে কিছুতেই যাবো না রামেন্দ-বাবার কাছে আর, জোর করলে পুলিশ ডাকবো, তা ঘোষণা করে দিই। এও বলি, আমি যাবো না, যদি যেতেই হয়, আমার লাশের ওপর দিয়ে আমি যাবো।

এরপর পেটে বাচ্চা এলো, বললাম মাকে। মা বিলাপ শুরু করলো। বাবাকে জানালো, বাবা স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। দুজনেরই দৃঢ় বিশ্বাস বাচ্চা অগ্নির। অগ্নির সঙ্গে আমার কোনও শারীরিক সম্পর্ক নেই, তারপরও ওদের অভিযোগগুলো চুপচাপ শুনতে হয় বসে বসে। যতবারই বলি প্রেগনেন্ট হয়েছি রামেন্দু-বাবার ধর্ষণের কারণে, বাবা আর মা দুজনই আমাকে অসভ্যের মতো মারতে শুরু করে, কেউ বিশ্বাস করে না। রামেন্দু-বাবা আমার শরীর স্পর্শ করেছে। পেটের বাচ্চা নষ্ট করবো, জানিয়ে দেওয়ার পরও কেউ এগিয়ে আসে না। কোনো উৎসাহই যেন নেই আমাকে নিয়ে আর। আমার। জীবন নিয়ে আমি যেন যা ইচ্ছে তাই করি। আমার মুখ তারা দেখতে চায় না। আমি তাদের মান ইজ্জত সব নষ্ট করে দিয়েছি। কোথাও আর তাদের মুখ দেখানোর জো নেই। শেষ অবদি অগ্নিকে বলি আসতে। অগ্নিকে সব বলার পর অগ্নি ক্লিনিকে নিয়ে অ্যাবরসন করিয়ে আনে। টাকাটা ওঁই দেয়। অ্যাবরসন করার পর দুসপ্তাহ আমাকে শুয়ে থাকতে হয়। অগ্নির বাড়িতে আসা বারণ। মা বাবা এখন আর কেউ চায় না যে অগ্নি আসুক আমার কাছে। পরনির্ভর এই অবস্থায় বাড়ি থেকে বেরিয়েও যেতে পারি না। একটা স্নেহের ভালোবাসার সংসার তছনছ হয়ে গেল। অগ্নিকে যে বলবো, বাড়ি থেকে চলে যাবো, অগ্নির সঙ্গে থাকবো, তাও বলছি না। অগ্নি নিজেই এখনও কলেজে পড়ছে, ছোট জাত বলে, গরিব বলে অবহেলা অপমান পায় চারদিকে, ও পড়ালেখা শেষ করে ভালো কিছু কাজ করুক। ওর কাঁধে চড়ে বসে ওর স্বপ্নকে মেরে ফেলতে আমি চাই না। আমাদের ফোনে কথা হয় প্রতিদিন।

পুরোপুরি সুস্থ হইনি, এরমধ্যে একদিন অগ্নির কাছে শুনি, আমার বাবা অগ্নির বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, অগ্নি আপাতত পালিয়ে যাচ্ছে শহর ছেড়ে। অগ্নির জন্য আমার খুব কষ্ট হতে থাকে। একবার মনে হয় আত্মহত্যা করি। কিন্তু সে পথে না গিয়ে আমি নিজেকে বোঝাই, একটু সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলে পুলিশ স্টেশনে গিয়ে রামেন্দু-বাবার বিরুদ্ধে মামলাটা আমি নিজেই করবো, পুলিশ যদি কথা না শোনে, তাহলে সোজাসুজি মিডিয়ায় যাবো। বসে বসে চোখের জল ফেলার চেয়ে জল টল মুছে একটু রুখে দাঁড়ানোই ভালো। এইসব ধর্ষক বাবাদের মুখোশখানা এখন না খোলা হলে কবে আর খোলা হবে।

বিয়ের প্রয়োজনীয়তা আদৌ আছে কি?

মানুষ বিয়ে করে কেন? নির্বিঘ্নে যৌন সম্পর্ক করা, সন্তান জন্ম দেওয়া–এর জন্য বিয়ের তো দরকার নেই! মানুষ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনও প্রাণীর মধ্যে বিয়ের কোনও রীতি নেই, অথচ দিব্যি তারা একত্র-বাস করছে, সন্তান জন্ম দিচ্ছে, সন্তানকে খেটে খুটে বড় করছে। পরস্পরেরর প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্যও বিয়েটা জরুরি নয়। অনেক প্রাণী। আছে যারা যৌবনের শুরুতে যে সঙ্গী বেছে নেয়, সেই সঙ্গী নিয়েই দিব্যি সুখে শান্তিতে বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়। অন্য কারও জন্য লোভ করে না, কাউকে নিয়ে আবার নতুন সংসার পাতার কোনও স্বপ্ন আর দেখে না। অবিশ্বাস্যরকম বিশ্বস্ত, একগামী। যত দুরেই যাক, যত সমুদ্রই পেরোক, যত বয়সই বাড়ুক, ঘরে ফিরে পুরোনো সেই সঙ্গীকেই চুমু খায়, তার বুকেই মাথাটা রাখে। পরকীয়া কাকে বলে, বহুগামিতা কাকে বলে, বিশ্বাস ঘাতকতা কাকে বলে জানেই না। অ্যালবাট্রোস, রাজহাঁস, কালো শকুন, ন্যাড়া ঈগল, টার্টল পায়রা, ডিক-ডিক হরিণ, বনেটমাথা হাঙ্গর, গিবন, ফ্রেঞ্চ এঞ্জেলফিস, ছাইরঙা নেকড়ে, প্রেইরি ভোল– এদের কথা বলছি।

মানুষ তো বিয়ে করে একসঙ্গে সুখে শান্তিতে সারা জীবন কাটানোর জন্য কিন্তু কজন পারে, শুনি? বেশির ভাগের বিয়েই হয় ভেঙে যায়, অথবা টিকে থাকলেও ভালোবাসাহীন টিকে থাকে। টিকিয়ে রাখতে হয় সন্তানের অসুবিধে হবে বা স্বচ্ছলতা কমে যাবে, বা লোকে কী বলবে –ভয়ে। এভাবে টিকে থাকাকে ঠিক টিকে থাকা বলে না। ঘরে স্ত্রী রেখে বা স্বামী রেখে দিব্যি অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছে মানুষ। সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলে আবার নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মানুষ ন্যাড়া ঈগল নয়, বা কালো। শকুন নয়। একগামিতা মানুষের চরিত্রে নেই। মানুষ বহুগামী। মানুষ বহুগামী, এও কিন্তু হলফ করে বলা যায় না। মানুষ আসলে জটিল এবং বিচিত্র। একগামী, বহুগামী, অসমকামী, সমকামী, উভকামী, কামহীন–মানুষ অনেক কিছুই। নতুন কিছুতে অভ্যস্ত হতে, পুরোনো স্বভাব পাল্টাতেও মানুষের জুড়ি নেই।

প্রায় সব ধর্মই বিয়েকে পুরুষ আর নারীর পবিত্র মিলন বলে ঘোষণা করেছে। ঈশ্বরই নাকি আগে থেকে সঙ্গী নির্বাচন করে রাখেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আর যা কিছু ঘটুক, বিচ্ছেদ যেন না ঘটে, ঈশ্বর সতর্ক করে দিয়েছেন। তাতে কী! প্রচণ্ড ঈশ্বর ভুক্ত রাও ঈশ্বরের এই উপদেশ আজকাল আর মানেন না। ঈশ্বরের নির্বাচিত সঙ্গীকে দিব্যি তালাক দিয়ে নিজে সঙ্গী নির্বাচন করেন। ম্যাচমেকার হিসেবে ঈশ্বর পুরো মার খেয়ে গেছেন, এ খবর কে না জানে! প্রায় সব ধর্মই বিয়েতে নাক গলিয়েছে। বয়স, লিঙ্গ, জাত, বিশ্বাস কী হওয়া চাই, স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য এবং দায়িত্বই বা কী হওয়া উচিত– এ নিয়ে বিস্তর উপদেশ দিয়েছে, কঠোর কঠোর নিয়মও তৈরি করেছে। বিয়ে যদিও ব্য ক্তিগত ব্যাপার, কিন্তু ধরে বেঁধে একে সামাজিক করে ফেলা হয়েছে। পুরুষদের না করা হলেও মেয়েদের করা হয়েছে সামাজিক সম্পত্তি। বিয়ের আগে মেয়েটা কারও সঙ্গে প্রেম করেছে কি না, ঠিকঠাক কুমারী ছিল কি না, বিয়ের পর স্বামী ছাড়া আর কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছে কি না, কার সঙ্গে বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছে, কখন ফিরছে, বাইরের কোনও পুরুষলোক বাড়িতে ঢুকেছে কি না, এসব শুধু বাড়ির নয়, বাড়ির বাইরের লোকও লক্ষ রাখছে। সমাজের দশটা লোকের এ নিয়ে মাথা ব্যথা বলেই পানি থেকে চুন খসলে মেয়েদের নিয়ে সমাজে মুখ দেখাতে পারে না বাবারা, ভাইয়েরা, কাকারা। মেয়েদের খুন করে পরিবারের সম্মান রক্ষা করে।

সভ্য শিক্ষিত বিশ্ব থেকে বিয়ে প্রায় উঠে যাচ্ছে। কিছু লোক অবশ্য করছে বিয়ে! এভারেস্টটা আছে বলে যেমন অনেকে এভারেস্টে চড়ে, বিয়েটা আছে বলেই অনেকে বিয়েটা করে। বিয়ের চল চলে গেলে আর করবে না। যে প্রথা চলছে, অধিকাংশ লোক সেই প্রথাকেই চালিয়ে নিয়ে যায়। আর, যার চল নেই, তাকে চালু করতে খুব অল্প কজনই উদ্যোগ নেয়। অনেক প্রেমিক-প্রেমিকা বিয়ে না করেও দিব্যি সংসার করছে বছরের পর বছর। বিয়ে না করেই সন্তান জন্ম দিচ্ছে। বিয়ের পিতৃতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে বিস্তর হাসাঠাট্টা করছে। কিন্তু ধর্ম যেমন মিথ্যে প্রমাণিত হওয়ার পরও টিকে আছে, বিয়েটাও ওই ধর্মের মতোই। যুক্তিহীন, কিন্তু টিকে আছে। কুসংস্কার যেমন হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকে। তবে ওরা ধীরে ধীরে বিলুপ্তও হয়ে যায় বটে। কত শত ধর্ম বিলুপ্ত হল, কত শত ঈশ্বর! কোথায় এখন সেই শক্তিশালী অ্যাপোলো, জুপিটার, জিউস, হারমেস, কোথায় থর, অডিন? বিয়েরও বিলুপ্তি ঘটবে। উত্তর-ইওরোপের দেশগুলোয় বিয়ে করার পেছনে গোপন একটি কারণও অবশ্য আছে, বিয়ে করলে ট্যাক্স কম দিতে হয়, সন্তানাদি পোষার খরচ সব রাষ্ট্রই দেয়। মানুষ বিয়ে করছে না, বাচ্চাকাচ্চাতেও খুব একটা কারওর উৎসাহ নেই, বিয়ের প্রথাটি ভেঙে গেলে সন্তান উৎপাদন যে হারে কমছে, সেটি আরও কমে যাবে, উত্তর-ইওরোপীয়দের অস্তিত্বই ভবিষ্যতে থাকবে না, এই ভয়ে বিয়েতে উৎসাহ দিতে জনগণের নাকের ডগায় ট্যাক্স কমানোর মুলো ঝুলিয়েছে সরকার। সুযোগ সুবিধের আশায় বিয়ে করছে বটে কিছু লোক, তবে বেশির ভাগ লোকই হয় একা থাকে, নয়তো বিনে-বিয়েয় একত্র-বাস করে। একত্র-বাস যারা করছে, তারাও অবশ্য বিবাহিত দম্পতির মতো রাষ্ট্রের সব সুবিধে পায়। পাশ্চাত্যে বহুবিবাহের চল নেই, বহুগামিতা তুলনায় প্রাচ্যের চেয়ে কম, তবে যা আছে তা হল, একের পর এক একনিষ্ঠ একগামিতা, ইংরেজিতে যাকে বলে সিরিয়াল মনোগ্রামি। অনেকটা পেঙ্গুইনের মতো।

ষাট দশকের শেষ দিকে সমাজের বাধা নিষেধ উপেক্ষা করে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ। বেরিয়ে এসেছিল পুরোনো রাজনীতি আর পুরোনো সমাজব্যবস্থা আমূল পাল্টে ফেলতে। ভালো মেয়ে হতে হলে কৌমার্য, সতীত্ব, মাতৃত্ব ইত্যাদি রক্ষা করতে হয় — পুরোনো এই ধারণাটির গায়েও কুড়োল বসিয়েছিল। রীতিমত বিয়ে করাই বন্ধ করে দিয়েছিল সেদিনকার হিপিরা। অনেকে একবাড়িতে বাস করতো, কেউ কারও সম্পত্তি ছিল না, সবার সঙ্গে সবারই সেক্স হত, বাচ্চাকাচ্চা হলে সবাই মিলে লালনপালন করতো। সেই কমিউন জীবন বেশি বছর টেকেনি। হিপিরা জয়ী হলে আজ বিয়েটা ইতিহাসের পাতায় স্থান পেতো, সমাজে নয়।

অনেক কবি সাহিত্যিক দার্শনিক বিয়ে সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, বিয়েটা যে অন থক একটা জিনিস, তা বেশ কায়দা করে বুঝিয়েও দিয়েছেন। নিজের বিয়ের আর। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পার্থক্য একটাই, বিয়ের ফুলগুলোর গন্ধ শুঁকতে পারো, আর অন্ত্যে ষ্টির ফুলগুলোর পারো না। অস্কার ওয়াইল্ড বলতেন, সবসময় প্রেম ভালোবাসায়। ডুবে থাকা উচিত। সে কারণেই কখনও বিয়ে করা উচিত নয়। ক্যাথারিন হেপবার্ন সে আমলেও নারী পুরুষের এক বাড়িতে বাস করার পক্ষে ছিলেন না। বলেছিলেন, একটা নারী আর একটা পুরুষ পরস্পরের সব কিছু পছন্দ করছে? যদি এরকম ঘটনা ঘটেই থাকে, তবে সবচেয়ে ভালো হয় তারা যদি একই পাড়ায় থাকে, মাঝে মাঝেই দেখা হবে! এও বলেছিলেন, একটা লোক অপছন্দ করবে বলে যদি অনেক পুরুষের প্রেমকে তুচ্ছ করতে চাও,তা হলে যাও, গিয়ে বিয়ে করো। অসাধারণ কিছু মন্তব্য করেছেন কজন ব্যক্তিত্ব। বিয়েটা চমৎকার আবিষ্কার, ঠিক যেমন সাইকেল মেরামত করার যন্ত্রটাও চমৎকার আবিষ্কার। বিয়েটা একটা খাঁচা, খাঁচার বাইরের লোকেরা খাঁচায় ঢোকার জন্য ব্যাকুল, আর খাঁচার ভেতরের লোকেরা খাঁচা থেকে বেরোবার জন্য ব্যাকুল। বিয়েটা শুধু তাদের জন্য ভালো, যারা একা ঘুমোতে ভয় পায়। অন্য আরও কজন বলেছেন, বিয়েটা চমৎকার ইনস্টিটিউশন। কিন্তু কে চায় ইনস্টিটিউ শনে বাস করতে? প্রেমিকের স্নায়ুতন্ত্র পুরোটা উপড়ে তুলে নিলে যেটা পড়ে থাকে, সেটা স্বামী। বিয়েটা ঘুষ, যেন বাড়ির চাকরানী নিজেকে বাড়ির মালিক বলে মনে করতে পারে। ফরাসি লেখক বালজাক বলেছিলেন, বেশির ভাগ স্বামীকে দেখলেই আমার সেই ওরাংওটাংটির কথা মনে পড়ে, যে খুব বেহালা বাজানোর চেষ্টা করছিল। সব মন্তব্যই বিয়ের বিপক্ষে নয়। পক্ষেও কিছু মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। যেমন, যদি এমন কোনও ধনকুবের পুরুষের দেখা পাই, যে প্রতিজ্ঞা করবে তার সহায় সম্পত্তির অর্ধেকটা আমায় লিখে দেবে, লিখে দিয়ে এক বছরের মধ্যে মরে যাবে, তবে তাকে আমি নিশ্চয়ই বিয়ে করবো।

পাশ্চাত্যে যখন হিপি বিপ্লব, নারী স্বাধীনতার আন্দোলন, প্রাচ্যে তখনও মেয়েদের হাতেপায়ে অদৃশ্য শেকল, যৌনাঙ্গে অদৃশ্য সতীত্ববন্ধনী। বিয়েটা যে কারণে শুরু হয়েছিল, প্রাচ্যের বেশির ভাগ পুরুষ এখনও সেই কারণেই বিয়ে করে। একটা জরায়ু দরকার, যে জরায়ু একটা নির্দিষ্ট পুরুষের ঔরসজাত সন্তান ধারণ করবে। পিতৃত্বের নি শ্চয়তাই বিয়ের মূল উদ্দেশ্য। পুরুষের স্বার্থে পুরুষকে বিয়ে করে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা হাজার বছর ধরে টিকিয়ে রাখছে মেয়েরা। মেয়েরা বেঁকে বসলে পুরুষতন্ত্রের বিরাট বেলুনটি সশব্দে চুপসে যেত কবেই!

বাঙালি সমাজে দেখেছি, বিয়ের পর মেয়েদের ডানাটা গোড়া থেকে কেটে দেওয়া হয়। নিজের ঘরদোর-আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব-পরিবেশপ্রতিবেশ-শহরবন্দর সব ছাড়তে হয় মেয়েদের নিজের নামের শেষে স্বামীর পদবী জুড়তে হয়। শ্বশুর বাড়িতে বাস করতে হয়। মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলেও, শিক্ষিত হলেও, সে চাকরি করবে কি করবে না সেই সিদ্ধান্ত স্বামী এবং স্বামীর আত্মীয় স্বজন নেয়। একসময় তো প্রচলিত ছিলই, এখনও অনেকে বলে, যে, বিয়ের পর চাকরি করা চলবে না। সতী-সাবিত্রীর জীবন চাই, এ কারণে ঘরে থাকাটা ভালো, ঘর পয়পরিষ্কার করবে, রান্না বান্না করবে, পরিবেশন করবে, পরিবারের সবার সেবাযত্ন করবে, সন্তান মানুষ। করবে। গ্লোরিয়া স্টাইনেম একটা চমৎকার কথা বলেছিলেন, সে-ই স্বাধীন মেয়ে, যে বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক করে, আর বিয়ের পরে, চাকরি। আজকাল অবশ্য স্বামী এবং স্বামীর আত্মীয় স্বজন শিক্ষিত বা কর্মক্ষম মেয়েদের শুধু ঘর সংসারের কাজ করিয়েই তুষ্ট নয়, তারা চায় মেয়েরা বাইরেও চাকরি করুক, সংসারে বাড়তি রোজ গারটা হোক। পুরুষদের চেয়ে মেয়েদের রোজগার বেশি হলেও মেয়েদের রোজগা রকে বাড়তি বলার প্রবণতা বাঙালির ঘরে ঘরে। পুরুষতন্ত্রে দীক্ষিত মেয়েরা নিজের রোজগারের টাকাটা স্বামীর হাতে সমর্পণ করে লক্ষ্মী মেয়ে উপাধি পায়। মেয়েদের রোজগারের টাকা কী খাতে খরচ হবে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক মেয়েরা নয়, অধিকাংশ সময়ই পুরুষ, সে যতই গবেট পুরুষই হোক না কেন। টাকাপয়সা ভালো রোজগার করতে পারলেও মেয়েরা ঠিক টাকাপয়সাটা নাকি বোঝে না, সে কারণে টাকা পয়সা জনিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পুরুষেরাই নিজ দায়িত্বে নিজের ঘাড়ে নিয়ে নেয়। অধিকাংশ বাঙালি মেয়ে স্বাধীনতা কাকে বলে জানে না।

কলকাতায় স্বামী-স্ত্রীর প্রেমহীন সম্পর্ক দেখে আঁতকে উঠতাম মাঝে মাঝে। প্রায়ই জিজ্ঞেস করতাম, বিয়েটা ভেঙে যেতে চাইলে ভেঙে যেতে দাও, জোর করে দাঁড় করিয়ে রাখছো কেন? ভালো কোনও উত্তর কখনও পেতাম না। অসুখী জীবনে বহুদিন থাকতে থাকতে মেয়েরা অভ্যস্ত হয়ে যায়। যে সন্তানের জন্য বিয়ে না ভাঙা, সেই সন্তান সংসারের অশান্তি দেখতে দেখতে বড় হয়। এমন সংসারে সন্তানের বেড়ে ওঠায় লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। আসলে, মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা আর নিরাপত্তা সমাজে না থাকলে একা বাস করা বা একা সন্তান মানুষ করা দুরূহ। কিন্তু তাই বলে কি অত্যাচারী স্বামীর সঙ্গে আপোস করতে হবে। বধু নির্যাতন আর বধু হত্যা যে হারে বাড়ছে, তা দেখে গা শিউরে ওঠে। পুরুষতন্ত্রের বীভৎস নারীবিদ্বেষ আর নারীঘৃণা কী উৎকটভাবেই না প্রকাশ পায়।

যে সমাজে শিক্ষিত, স্বনির্ভর, সচেতন মেয়ের সংখ্যা বেশি, সেই সমাজে বিচ্ছেদের সংখ্যাটা বেশি, বিয়ের সংখ্যাটা কম। ভারতীয় উপমহাদেশে অবশ্য উপার্জনহীন পরনির্ভর মেয়েদের মতো পুরুষতন্ত্রের মন্ত্র মেনে চলা স্বনির্ভর শিক্ষিত মেয়েরাও অত্যাচারী বা বহুগামী স্বামীর সঙ্গে সংসার করছে মুখ বুজে। এধরনের সমাজে, বিয়েটা নিতান্তই পুরুষের ক্ষেত্রে অর্জন, মেয়েদের ক্ষেত্রে বিসর্জন। বিয়ে কাউকে একাকীত্ব থেকে মুক্তি দেয়, কারও পায়ে পরায় নির্মম শেকল। এখনও সমাজে দেদার বর্বরতা চলে, চলে জাত বর্ণের হিসেব, পণের হিসেব, স্ত্রীকে নিতান্তই যৌনসামগ্রী, ক্রীতদাসী আর সন্তান। উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা, সন্তান বিশেষ করে পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার চাপ, কন্যাভ্রণকে জন্মাতে না দেওয়া, জন্মালেও পুঁতে ফেলা, পুত্র না জন্মালে তালাক, পুনর্বিবাহ। নিয়ম মেনে চলার লোক যেমন প্রচুর আছে, নিয়ম ভাঙার লোকও কিন্তু আছে। মানুষ যত সভ্য হচ্ছে, বিয়ের পুরোনো নিয়মগুলো তত ভেঙে পড়ছে। সমাজ বদলায় হাতে গোনা কিছু লোক। সমাজের সব লোক দল বেঁধে সমাজ বদলায় না। বেশির ভাগ লোক বরং দল বেঁধে প্রাচীন নীতি রীতি শক্ত করে আকঁড়ে রাখে।

বিয়ের পর মেয়েদের চাকরি বাকরি ব্যবসা বাণিজ্য চলবে না, স্বামীর আদেশ নিষেধ অমান্য করা চলবে না, বিধবা বিবাহ চলবে না– এই নিয়মগুলো প্রাচ্যের কিছু সাহসী মেয়ে এখন আর মানে না।

বিয়ের বিবর্তন ঘটেছে। বিয়ের উদ্দেশ্য পাল্টেছে, ধরন পাল্টেছে। পাশ্চাত্যে, যেখানে মেয়েদের স্বাধীনতা আর অধিকারের সংগ্রাম দীর্ঘকাল চলেছে, এবং শেষ পর্য স্ত মেয়েরা অনেকটাই সমানাধিকার ভোগ করছে, সেখানে বিয়েটা এখন আর পুরুষের বংশরক্ষা করার জন্য নয়, মেয়েদের দিয়ে সংসার আর সন্তান সামলানোর হাড়ভাঙা পরিশ্রম কৌশলে করিয়ে নেওয়া নয়। সন্তান না জন্মালেও ক্ষতি নেই। সম্পর্ক আর সংসার সুখময় করার জন্য যে জিনিসের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা বিয়ে নয়, তা হলো, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধ।

ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধ থাকলে মানুষ পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে। বিয়ে যদি বিশ্বস্ত রাখতে পারতো, তাহলে এত পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠতো না। বিয়ে না করে যারা সংসার করছে তাদের মধ্যেও পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ব থাকার একই অলিখিত শর্ত থাকে।

সব দম্পতিই যে একগামিতা বা বিশ্বস্ততা চায়, তা নয়। কিছু স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে ভালোবেসেও একঘেয়েমি দূর করতে ভিন্ন নারী ও পুরুষকে নিজেদের যৌনসঙ্গমে সঙ্গী হতে আমন্ত্রণ জানায়। কোনও লুকোচুরি নেই, নিজেদের শোবার ঘরে, নিজেদের বিছানায়, দুজনের সঙ্গে যোগ হয় এক দুই তিন বা তারও চেয়ে বেশি। এই দলবদ্ধ যৌনতা, দম্পতিরা বিশ্বাস করে, দাম্পত্যজীবনে বৈচিত্র্য আনে, সম্পর্ককে তাজা রাখে। কিছু সমাজবিশেষজ্ঞ গুচ্ছ-বিয়েকে বেশ জোরেসোরে সমর্থন করেছেন। বিয়ের বিচ্ছেদ না ঘটিয়ে সন্তানের সুবিধের কথা ভেবে গুচ্ছ-বিয়ে মেনে নেওয়াই নাকি বুদ্ধিমানের কাজ। গুচ্ছ-বিয়েটা অনেকগুলো নারী পুরুষের সমাহার, যারা সকলেই সকলের স্ত্রী বা স্বামী। গুচ্ছপ্রেম বা পলিয়ামোরি বলেও একধরনের সম্পর্ক আছে। একাধিক নারী পুরুষ, প্রত্যেকে পরস্পরের প্রেমিক বা প্রেমিকা। বহুবিবাহ তো বহু সমাজেই যুগের পর যুগ চলেছে, এক স্বামীর বহু স্ত্রী। আবার আরেক ধরনেরও বহুবিবাহও কিছু কিছু সমাজে চলে, এক স্ত্রীর বহু স্বামী। দুনিয়াতে সবকিছুরই চর্চা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। কিন্তু সব ছাপিয়ে এক-স্বামী-এক-স্ত্রীর বিয়েই এখন পর্যন্ত রাজত্ব করছে। ছড়ি ঘোরানোটা এই সম্পর্কে বড় সুবিধে কিনা। বিয়েটামুলত যৌন সঙ্গমের লাইসেন্স। এই লাইসেন্সটাই ঢাক ঢোল পিটিয়ে নেওয়া হয়। নিতান্তই প্রাচীন, পিতৃতান্ত্রিক, অযৌক্তিক একটি প্রথা। এই প্রথাটির জীবিত থাকার কোনও কারণ নেই। অনেক প্রথাই মরে গেছে বা যাচ্ছে, যেমন সতীদাহ, যেমন ডাইনি-হত্যা। অর্থহীন অনেক প্রথাই মানুষকে ভয় দেখিয়ে বা মানুষের বোধবুদ্ধি লোপ পাইয়ে দিয়ে চালু রাখা হচ্ছে বটে, তবে বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথার ব্যবহার না হতে থাকলে, প্রথা ধীরে ধীরে মরে যেতে বাধ্য। যেহেতু শতাব্দী ধরে প্রমাণ হচ্ছে বিয়ের কোনও ভূমিকা নেই সম্পর্ক টেকানোর, বা সংসার শান্তির করার বা সন্তানের গুণী হওয়ার জন্য তাই এটিরও ভবিষ্যত খুব উজ্জ্বল নয়। বিবর্তন আমাদের পূর্বপুরুষের লেজ খসিয়েছে প্রয়োজন নেই বলে। বিবর্তন আমাদের সমাজ থেকে বিয়ে নামক একটি অপ্রয়োজনীয় সংস্কার দূর করবে না, এ কোনও কথা? এককালের দার্শনিক নিৎসে, কান্ট, হেগেল প্রবল নারীবিরোধী ছিলেন। দর্শনেরও বিবর্তন ঘটেছে, নারীর প্রতি অমন তীব্র ঘৃণা নিয়ে আজকাল দার্শনিক বনার কোনও উপায় নেই।

নারীর প্রতি ঘৃণার কারণে জন্ম নিয়েছে পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্র জন্ম দিয়েছে অনেক নারীবিরোধী প্রথা, এর মধ্যে বিয়ে একটি। পুরুষতন্ত্র যত পরাজিত হবে, যত পর্যদস্ত হবে, নারী যত তার স্বাধীনতা ফিরে পাবে, যত সে আত্মবিশ্বাসী হবে, যত সে না রীবিরোধী ধর্ম আর সংস্কারকে সমাজ থেকে ঠেলে সরাতে পারবে, বর্বরতাকে যত দুর করতে পারবে সমাজ, যত সভ্য হবে সমাজ, যত সভ্য হবে পুরুষ, পুরুষতান্ত্রিক প্রথার গায়েও তত মরচে ধরবে। আমরা এর মধ্যেই দেখছি সভ্য সমাজে বিয়ে কমে যাচ্ছে। অসভ্য-অশিক্ষিত-সমাজে বিয়ে প্রথা চলছে। কিন্তু একটি সমাজ তো চিরকাল অসভ্য আর অশিক্ষিত থেকে যায় না? সমাজও বিবর্তিত হয়। সমাজ সভ্য হয়েছে কখন বুঝবো? যখন দেখবো নারী আর ধর্ষিতা হচ্ছে না, নির্যাতিতা হচ্ছে না, নারী সমানাধিকার ভোগ করছে, পুরুষের দাসী বা ক্রীতদাসী বা যৌনদাসী কোনওটাই নয় নারী, তুমুল প্রেমে পড়ে একত্র-বাস করছে কিন্তু বিয়ে নৈব নৈব চ, অথবা বিয়ে নামক জিনিসটিই বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তখন।

বিয়েটা আসলে নারীর ওপর পুরুষের প্রভুত্ব কায়েম করার একটা সামাজিক চুক্তি পত্র ছাড়া কিছু নয়। বিয়ের বিপক্ষে কথা বলেছেন অনেক নারীবাদী লেখক। আন্দ্রিয়া ডোরকিন তোমনেই করতেন, বিয়েটা স্রেফ ধর্ষণ করার জন্য। আর একজন বেশ চমৎ কার বলেছিলেন, বিয়েটা নিতান্তই ইনটিমেট কলোনাইজেশন। অনেকেই মনে করেন, বিয়ের বাধাটা দূর না হলে মেয়েদের সত্যিকার স্বাধীনতা অসম্ভব। প্রায় সব নারীবাদীই বিশ্বাস করতেন, এখনও অনেকে করেন, যে, পুরুষতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য বিয়েটা বেশ অসাধারণ একটা প্রথা। নারীবাদীদের কেউ কেউ প্রেম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, প্রেমটা নাকি একরকম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, মেয়েরা সেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিয়ে করতে অর্থাৎ শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। নারীবাদীদের কাছে বিয়েটা এত আপত্তিকর হতো না, স্ত্রীর ভূমিকা যদি এমন দাসী-বাঁদির না হতো। যখন সভ্য অসমকামীরা বিয়ে থেকে বেরিয়ে আসছে, তখন সভ্য সমকামীরা বিয়ের অধিকারের জন্য আন্দোলন করছে। সভ্য দেশগুলো ধীরে ধীরে সমকামীদের বিয়ে করার অধিকার দিচ্ছে। সভ্য মানুষেরা, এমনকী যারা বিয়েতে বিশ্বাসী নয়, তারাও সমকামীদের বিয়ের অধিকারের পক্ষে, যেহেতু সমকামীদের বিয়েটা সমাজের বেশির ভাগ লোক মেনে নেয় না। সমকামীদের বিয়ে সমর্থন করা মানে, ধর্মের শাসনকে আর রক্ষণশীল সমাজের চোখ রাঙানোকে মধ্যম আঙুল দেখানো। এ কথা ঠিক, সমকামীদের বিয়েতে সম-অধি কারের সম্ভাবনা অসমকামীদের চেয়ে বেশি কারণ ওদের মধ্যে লিঙ্গ-বৈষম্যের বালাই নেই। তবে এটা ঠিক, একসময় যখন সমকামীদের বিয়ে অসমকামীদের বিয়ের মতো ডাল-ভাত হয়ে উঠবে, তখন সমকামীরাও, যারা আজ বিয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে, অর্থহীন এই বিয়ে প্রথাটির বিরুদ্ধে মুখ খুলবে।

একদিন মরে পড়ে থাকবে বিয়ে। আগামী দিনের নৃতত্ত্ববিদরা ইতিহাস খুঁড়ে বিয়ের ফসিল আবিষ্কার করবেন, আলোকিত মানুষকে পুরোনো দিনের গল্প শোনাবেন। — পৃথিবীতে একটি যুগছিল, সে যুগের নাম অন্ধকার যুগ। সেই অন্ধকার যুগে একটি প্রথা দীর্ঘদিীর্ঘকাল টিকে ছিল, প্রথাটির নাম বিয়ে। বিয়েটা কী এবং কেন, এসব বোঝাতে গিয়ে পুরুষতন্ত্রের প্রসঙ্গ উঠবে, তখন নিশ্চয়ই ভবিষ্যতের সেই সব মানুষের গা কেঁপে উঠবে আমাদের এখনকার এই বীভৎস সমাজটি কল্পনা করে। ইউটোপিয়া? না হয় ইউটোপিয়াই।

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে নামে একটি ছোট উপন্যাস লিখেছি গত বছর। বইটি পড়ে আমার চেনা জানা সবাই বললো এটি নাকি আমার জীবন কাহিনী। তাদের ভাষ্য, যমুনা আমি, আমিই। যমুনা আমি ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে না। কিন্তু যমুনার সঙ্গে আমার জীবনের কোনও কিছুর মিল নেই।

সুস্মিতা ভট্টাচার্যের সঙ্গে এ নিয়ে সেদিন কথা হলো।

– তোমার ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বইটা পড়লাম। খুবই ভালো লেগেছে। এখনো ঘোরের মধ্যে আছি। আমি এখন যমুনার সঙ্গে কথা বলছি, ভাবতেই ভালো লাগছে।

–যমুনার সঙ্গে মানে?

–যমুনার সঙ্গে, মানে তোমার সঙ্গে।

–সুস্মিতাদি, কী কারণে তোমার মনে হচ্ছে, যমুনা আমি?

–মনে হচ্ছে কারণ তোমার জীবন কাহিনীই তো লিখেছো তুমি।

–কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে তো আমার আত্মজীবনী নয়, এটা একটা উপন্যাস।

— হ্যাঁ উপন্যাস, তবে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস।

–আমার নাম তো যমুনা নয়। যমুনা বাংলাদেশের মেয়ে বলে বলছো? আমার উপন্যাসে বাংলাদেশ, ময়মনসিংহ, ব্রহ্মপুত্র খুব থাকে। আমার জন্ম আর বড় হওয়া ওই দেশে আর ওই শহরে আর ওই নদের পাড়ে বলেই সম্ভবত। তার মানে কিন্তু এই নয় যে আমি উপন্যাসের ওই যমুনা।

–তোমার নাম যমুনা নয়, নামটা পাল্টে দিয়েছে।

–তাই বুঝি? যমুনাকে তার বাবা বিয়ে দিয়েছিল, আমাকে তো ওভাবে আমার বাবা বিয়ে দেয়নি।

— তা দেয়নি।

–যমুনা ডিভোর্স করার পর তার এক প্রেমিকের সঙ্গে শুয়ে একটা বাচ্চা নিয়েছিল। এরকম কোনও ঘটনা আমার জীবনে নেই। আমার কোনও বাচ্চা নেই।

— তা নেই।

–যমুনা ফিজিক্সে পিএইডি করেছিল। চাকরি করতো সোলার এনার্জিতে। আমি ফিজিক্সেও পড়িনি, ফিজিসিস্ট হিসেবে চাকরিও কোথাও করিনি।

–তা করোনি।

–যমুনা খুন করেছিল তার প্রেমিককে। আমি কাউকে খুন করিনি।

— তা করোনি।

–যমুনা দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল খুনের বিচার থেকে বাঁচতে। আমি দেশ থেকে পালাইনি।

–তুমি দেশ ছেড়েছিলে।

–দেশ ছাড়তে আমাকে বাধ্য করেছিল সরকার। রাজনৈতিক কারণে। দুটো দেশ ছাড়ার কারণ এক নয়।

— তা নয়।

–যমুনা একটা মালায়ালি ছেলেকে বিয়ে করে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়েছিল, যখন সোলার এনার্জির ওপর গবেষণা করছিল কেরালায়। আমি কেরালায় কোনও কিছু নিয়ে গবেষণা করিনি, ভারতের কোনও লোককে বিয়েও করিনি, ভারতের কোনও নাগরিকত্বও নিইনি।

–তা নাওনি।

–যমুনা কলকাতায় গিয়েছিল কেরালা থেকে। কলকাতায় চাকরি করতো। বাড়ি কিনেছিল, মেয়েকে ভালো ইস্কুলে পড়াতো। এসবের কিছুই আমার জীবনে ঘটেনি। আমি কলকাতায় থেকেছি বটে, তবে চাকরি করিনি। বাড়িও কিনিনি।

— তা ঠিক।

–যমুনার লেসবিয়ান রিলেনশিপ ছিল। নির্মলা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে থাকতো। কলকাতায় আমি একা ছিলাম। কোনও মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল না।

– তা ঠিক। ছিল না।

–যমুনার মেয়ে হারভার্ডে পড়তো। আমার কোনও ছেলে বা মেয়ে নেই, হারভার্ডেও পড়ে না।

–তা ঠিক।

–যমুনা মরে গেছে। আমি মরিনি।

–তা মরোনি।

–যমুনা আত্মহত্যা করেছে। আমি আত্মহত্যার বিরুদ্ধে। যমুনার বোন এসে যমুনার মৃতদেহ নিয়ে যায় দেশে। আমি মরিওনি, আমার মৃতদেহ কেউ নিয়েও যায়নি কোথাও।

— তা যায়নি।

— তাহলে কেন বলছো আমি যমুনা?

–তুমি যা বলছে তা আমি মানছি। তারপরও বলবো তুমি যমুনা।

–কেন? যমুনা সাহসী ছিল বলে? আর আমাকেও সাহসী হিসেবে মনে করো বলে? কিন্তু সাহসী মেয়েদের গল্প তো হামেশাই লিখছে লেখকরা। আর, যমুনাকে আমার কিন্তু খুব সাহসী মেয়ে বলে মনে হয় না। সাহস থাকলে ও আত্মহত্যা করতো না।

— তা ঠিক।

–এখনও বলবে আমিই যমুনা? নিশ্চয়ই নয়।

–আসলে তুমি যতই অস্বীকার করো না কেন, তুমিই যমুনা।

এরপর আমি আর কথা বলার উৎসাহ পাইনি। কী কারণে আমার উপন্যাসের চরিত্রকে আমার চরিত্র বলে ভাবা হয়, আমি জানি না। সে কি কয়েক বছর আমার আত্মজীবনী পড়ছে বলে গুলিয়ে ফেলে সব? উপন্যাস আর আত্মজীবনীর পার্থক্য ঠিক বুঝতে পারে না? ঠিক বুঝি না এ লেখকের দোষ, নাকি পাঠকের দোষ? যমুনা যে কাজগুলো করেছে, তার কিছুই আমি করিনি। যমুনা যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষায় আমি কথা বলি না। তবে কী কারণে আমাকে যমুনা বলে ভাবা হয়! যমুনার জন্ম ময়মনসিংহে, জীবনের কিছুটা সময় কলকাতায় বাস করেছিল, যমুনার এক বোন আছে, আমেরিকায় থাকে, যমুনার ভাই পারিবারিক সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছে, এ ছাড়া যমুনার আর কোনও কিছুর সঙ্গে আমার কোনও কিছুর মিল নেই। কিন্তু এই মিলটুকুর কারণে আমাকে যমুনা বলে মনে করাটা রীতিমত অযৌক্তিক।

আমি তো আমার পরিচিত জগতের কথাই উপন্যাসে লিখবো, যা চিনি না জানি না তা কী করে লিখবো? লিখতে গিয়ে আমার নিজের জীবন, আমার চারপাশের জীবন, আমার দেখা, শোনা এবং পড়া নানারকম জীবনের অভিজ্ঞতাই আমার গল্প। উপন্যাসের চরিত্রে চলে আসে। কিন্তু উপন্যাসের কোনও চরিত্রকে আমার চরিত্র বলে। মনে হওয়ার কারণ কী? — হতে পারে লিখতে লিখতে আমার অজান্তে কোনও না। কোনওভাবে আমি একাকার হয়ে যাই সেই চরিত্রের সঙ্গে, সেই চরিত্র আর আমার চরিত্র ভিন্ন হলেও কোথাও না কোথাও দুটো চরিত্রের গভীর মিল থেকে যায়, খালি চোখে যে মিল দেখা যায় না, আর, দেখা গেলেও আমি হয়তো দেখিনা, অন্যরা দেখে। অথবা আমার যারা চেনা জানা, যারা বলে আমার উপন্যাসের চরিত্র আমার চরিত্রই, তারা আমাকে চেনে বা জানে বলে বিশ্বাস করে, আসলে তারা আমার কিছুই চেনে না বা জানে না।

মিডিয়া আর মিডলক্লাস মিডিওকার

কাল সকালে কলকাতা থেকে এক বন্ধুর ফোন এলো। কথাগুলো আমাদের এমন ছিল–

শ– আহ, কী যে ভালো লাগছে আজ। আনন্দবাজারে তোমাকে নিয়ে লিখেছে। আমি পড়ছি শোনো। সেই আগুন জ্বলে উঠেছে এখন তসলিমা নাসরিনের মধ্যেও। ইন্টারনেট খুললেই গোটা দুনিয়া তাঁর ঘরের ভেতর। সময়টা যেহেতু ফুরিয়ে আসছে, জীবনের সবটুকু রস আগ্রাসী ভাবে পেতে ইচ্ছে করে তাঁর। ফেসবুক-টুইটারে থেকে বন্ধুদের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে যোগাযোগ রাখছেন। আইপ্যাডেও সমান সিদ্ধহস্ত। আর এ সব নিয়েই তিনি এখন দিব্যি আছেন বাহান্নতে।

ত– বাহান্নতে?

শ– হ্যাঁ বাহান্নতে।

ত– বাহান্ন লিখেছে?

শ– হ্যাঁ বাহান্ন লিখেছে।

ত– কিন্তু আমি তো বাহান্ন নই।

শ– বাহান্ন নও মানে? বাহান্নই তো লেখা আছে এখানে।

ত– কে লিখেছে?

শ– সংযুক্তা বসু লিখেছে। আনন্দবাজারের সাংবাদিক।

ত–ও তো আমাকে ফোন করেছিল কদিন আগে। বাহান্ন শব্দটাই তো উচ্চারিত হয়নি। পঞ্চাশ নিয়েই কথা হচ্ছিল। ও কিছু প্রশ্ন করেছিল। আমি ওর প্রশ্ন আর আমার উত্তর নিয়ে একটা ব্লগও লিখেছি। সংযুক্তা তো পড়েছে ব্লগটা।

শ– তোমার ওই পঞ্চাশ নামের ব্লগটা তো? আমিও তো পড়েছি। আমি তোমার সব ব্লগ পড়ি।

ত– কিন্তু ভাবছি, সংযুক্তা এই ভুলটা করলো কেন। পঞ্চাশের বদলে বাহান্ন লেখার কারণ কী? সে কি জানে না আমার বয়স? আমাকে তো জিজ্ঞেস করলো, পঞ্চাশ হওয়ার পর কেমন ফিল করছেন বলুন। বয়স না জানলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতো, আমার যে কোনও বই ওল্টালে তার জ্যাকেটেই পেতে পারতো জন্ম তারিখ, আমার ওয়েবসাইটেও আছে, নেটে সার্চ করলেই বেরিয়ে পড়তো। আমার বয়স জানা তো বেজায় সহজ। কিন্তু বানিয়ে বাহান্ন লিখবে কেন! আজকাল সাংবাদিকরা বড় আলসে হয়ে গেছে। সন্ধেবেলায় কোন মদের পার্টিতে যাবে তার হিসেব রাখতেই ব্যস্ত। সিরিয়াসলি সাংবাদিকতার কাজটা করে না। মানে বাট মুভ করে না। ডেস্কে বসেই দুনিয়ার খবর লেখে।

শ– শোনো, আমাদের কলকাতায় আমরা এভাবেই বলি।

ত–মানে?

শ–মানে আমরা প্লাস দিয়ে বয়স বলি। ধরো ষাট প্লাস, বাষট্রি প্লাস।

ত– কিন্তু ও তো প্লাস লেখেনি। লিখেছে বাহান্ন। আর প্লাস বললেও তুমি তো পঞ্চাশ প্লাস বলবে আমাকে, বাহান্ন তো নয়।

শ– বাহান্ন তো পঞ্চাশের পরই আসে। বাহান্নই তো।

ত– বাহান্ন কী করে হলো? তুমি তো সেদিন আমার পঞ্চাশ জন্মোৎসব পালন করতে এলে। এর পর তো এক বছরও পার হয়নি। একান্নর উৎসবে তুমি বলেছো আসতে পারবে না। এখানে বাহান্নটা তুমি পাচ্ছো কোথায়?

শ–পঞ্চাশ হয়েছে। এখন একান্ন হবে। আর একান্ন হলে আমরা একান্ন প্লাস বলি, তার মানে বাহান্ন।

ত– কিন্তু আমার তো এখনও একান্ন হয়নি। একান্ন না হলে তো একান্ন প্লাস হয় না। আর একান্ন প্লাস যার হয়নি, তার বাহান্ন কী করে হলো?

শ– আমরা কলকাতায় এভাবেই বলি।

ত– আবারও বলছো ওভাবেই বলো। কীভাবে বলো, যার সবে পঞ্চাশ হলো, তাকে বাহান্ন বছর বয়স বলো?

শ– তুমি বাহান্ন না হলে আনন্দবাজার লিখবে কেন বাহান্ন?

ত– সেটাই তো বলছি। লেখাটা তো উচিত হয়নি। তোমার কাছে এখনও কি মনে হচ্ছে আমার বয়স বাহান্ন?

শ– কাগজে তো সেরকমই লিখলো। তোমার বয়স নিশ্চয়ই বাহান্ন।

ত– তাহলে আমার সত্যিকারের জন্মসাল কি ভুল?

শ– সে কী করে জানবো?

ত–তুমি কি তাহলে মনে করছো আনন্দবাজারে সংযুক্তা বসু নামে যে মহিলাটি চাকরি করে, যাকে আমি চিনিনা, আমার যা বয়স লিখেছে, সেটি ঠিক, আর আমার বয়স যা আমার জন্ম থেকে আমার মা জানে, বাবা জানে, যে জন্মসাল আমার পাসপোর্টে, বইএর জ্যাকেটে, আমার সার্টিফিকেটে, সমস্ত পরিচিতিতে– সব ভুল?

শ– কাগজে কি এমনি এমনি লিখবে?

ত– তুমি যে আমার জন্মদিন পালন করতে এলে, সেটা কত বছরের জন্মদিন ছিল?

শ– পঞ্চাশ।

ত– তুমি যে এসেছিলে, একবছর পার হয়ে গেছে?

শ– না।

ত– তাহলে আমার বয়স কত এখন?

শ– বাহান্ন।

ত– আমার বয়স তো পঞ্চাশ হয়েছে। তাহলে নিশ্চয়ই পঞ্চাশ।

শ– কিন্তু আনন্দবাজারে তো বাহান্ন লিখেছে।

ত– আনন্দবাজারে যেহেতু বাহান্ন লিখেছে, তোমার হিসেবে না মিললেও আমার বয়স বাহান্ন?

শ–তোমার বয়স যদি বাহান্ন না হয়, তাহলে আনন্দবাজার কেন বাহান্ন লিখবে?

ত– সেটাই তো বলছি, ওরা ভুল করেছে।

শ– ভুল করেছে? কাগজ ভুল করেছে?

ত– হ্যাঁ। কেন? তোমার কি মনে হয় আমার বয়সের ব্যাপারে আমি ভুল করতে পারি, কিন্তু কাগজ ভুল করতে পারে না।

শ– কাগজ ভুল করবে কেন?

ত– আচ্ছা বাদ দাও, একটা কথা বলোতো, আমি কলকাতা ছাড়ার পর তুমি এবং আমার আরও বন্ধুরা তো একটা অভিযোগই করো যে আমি কারও সঙ্গে যোগাযোগ করি না। কাউকে ফোন করি না। ইমেইল করি না। অভিযোগ করো না?

শ– হ্যাঁ, তা তো করিই। তুমি তো কখনও কোনও বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করো না।

ত– আর ফেসবুকে, টুইটারে?

শ– কত মেসেজ রেখেছি ফেসবুকে, কোনওদিন কোনও উত্তর দাওনি। তোমার বন্ধুরা এখন কোনও উত্তর আশাও করে না। আমরা সবাই জানি তুমি কোনও মেসেজের উত্তর দেবে না। কিন্তু তাতে কী! তোমাকে সবাই আমরা ভালোবাসি। তুমি লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকো, ইওরোপ আমেরিকায় কদিন পর পরই যাচ্ছো লেকচার দিতে, তোমার মতো ব্যস্ত লেখক কজন আছে! তুমি আমাদের ফোন করবে, এসএমএস করবে, ইমেইল করবে, ফেসবুকে আসবে, স্কাইপে আসবে, সত্যি বলছি, কল্পনার বাইরে আমাদের। তুমি মন দিয়ে লেখো, তোমার কাজ করো, সেটাই চাই। যোগাযোগ আমরাই করে নেবো। সাতদিন ফোন না ধরলেও একদিন তো ধরবে। এ কি আর আজ থেকে? আমরা অভ্যস্ত এই নিয়মে।

ত– তাহলে আনন্দবাজারের এই লেখাটা তোমার ভালো লাগলো কেন?

শ– এতে লেখা ভালো না লাগার কী আছে? তোমাকে নিয়ে কতদিন পর লিখলো।

ত– কাগজে তো লিখেছে, আমি নাকি বন্ধুদের সঙ্গে খুব যোগাযোগ করি।

শ– হ্যাঁ লিখেছে। নিশ্চয়ই যোগাযোগ করো। তা না হলে লিখবে কেন?

ত–তুমি তো একটু আগে বললে, আমি যোগাযোগ করি না কোনও বন্ধুর সঙ্গে।

শ– করো না। কিন্তু হয়তো হয়তো করো।

ত– তুমি তো আমার বাড়িতে অনেকদিন থেকেও গেছো, দেখেছো কারও সঙ্গে কনটাক্ট করতে?

শ– না তা দেখিনি। সাংবাদিকদের মতো কি ওভাবে দেখতে জানি? সাংবা দিকরা অনেক বড় মানুষ। আমরা তুলনায় অতি তুচ্ছ, অতি সাধারণ লোক। তুমি সেলিব্রিটি হয়ে আমাদের সঙ্গে মিশছো। কজন সেলিব্রিটি মিশবে এভাবে?

ত– তাহলে মনে করছো তোমাদের সঙ্গে নেটে যোগাযোগ করি, আড্ডা দিই, যেটা তুমি এবং আমি জানি না, কিন্তু কাগজওয়ালারা জানে?

শ– কাগজের লোকেরা অনেককিছু জানে।

ত– তাহলে এটাও, এই কটাক্টের ব্যাপারটাও, তোমার মনে হচ্ছে ঠিক লিখেছে?

শ– আনন্দবাজার কেন ঠিক লিখবে না?

ত– এরকম হতে পারে না যে ওরা ভুল লিখেছে?

শ– আনন্দবাজার?

ত– হ্যাঁ আনন্দবাজার।

শ– জানি আনন্দবাজারের ওপর তোমার অনেক রাগ আছে..।

ত– কেন ভাবছো আমি রেগে বলছি এসব কথা? আমার কথায় তুমি কোনও যুক্তি পাচ্ছো না? বন্ধুরা-চেনা পরিচিতরা সবাই বলে, আমি যোগোযোগ করি না। আমিও জানি আমি যোগাযোগ করি না। সেখানে যে ওভাবে লিখে দিল, আমি বন্ধু দের সঙ্গে যোগাযোগ করি সারাক্ষণ, তাতে তোমার মনে হয়না ওরা একটা ভুল তথ্য ছাপিয়েছে? নাকি যেহেতু এটা ছাপার অক্ষরে দেখেছো, তাই তুমি বিশ্বাস করছো, ওরা যা লিখেছে, সেটাই ধ্রুব সত্য, আর আমি যা জানি, তুমি যা জানো, আমি যা দেখছি, তুমি যা দেখেছো, সব মিথ্যে, ভুল?

ফোন রেখে দিয়ে অন্য এক বন্ধুকে ফোন করলাম।

ফোন করতেই ও বললো, সূর্য কি পশ্চিমদিকে উঠলো?

ত– কেন?

প– আমাকে ফোন করলে! তুমি তো ফোন করো না তাই বললাম।

ত– আজকের আনন্দবাজার পড়েছো?

প– হ্যাঁ পড়েছি। তোমার অংশটুকু বেশ লাগলো কিন্তু।

ত– কেন বেশ লাগলো? কী লিখেছে?

প– লিখেছে বেশ আছো।

ত– বয়সের কথা কী লিখেছে?

প– বয়স বাহান্ন।

ত– কী করে? তুমি তো জানতে আমি পঞ্চাশ। তাই না?

প– পঞ্চাশ নয়। বাহান্ন।

ত– কেন? বাহান্ন কেন?

প– আনন্দবাজার তো বাহান্নই লিখেছে।

ত– তুমি তো আমার পঞ্চাশ পালন করতে এসেছিলে, তাই না? আবার একান্ন পালন করতেও আসবে বলেছো, তাহলে বয়স আমার কী করে বাহান্ন হলো?

প– ছাড়ো তো, পঞ্চাশ আর বাহান্ন, একই জিনিস।

ত– কিন্তু একই জিনিস তো নয়! তোমার কি বাহান্ন শব্দটা পড়ে একটুও অবাক লাগেনি?

প– কই না তো?

ত– কেন?

প– কেন অবাক লাগবে। অবাকের কী আছে?

ত– কাগজে ভুল লিখেছে বলে মনে হয়নি?

প– কাগজে কেন ভুল লিখবে? আমি তো কোনও কারণ দেখছি না। তোমার বয়স ভুল লেখার পেছনে কাগজের কী স্বার্থ?

ত– তুমি তাহলে মনে করছো, যেহেতু আমার বয়স ভুল লেখার পেছনে ওদের কোনও স্বার্থ নেই, তাহলে যে বয়সটাই লিখেছে, সেটাই ঠিক বয়স?

প– হ্যাঁ। কেন? ঠিক নেই?

.

এর মধ্যে অন্য এক বন্ধু ফোন করলো। কলকাতা থেকেই।

ত– এই, আমার বয়স নাকি আজ আনন্দবাজারে বাহান্ন লিখেছে?

স– হ্যাঁ তাই তো পড়লাম। আমি তো জানতাম পঞ্চাশ।

ত– তারপর?

স– কবে এদিকে বাহান্ন হয়ে বসে আছো, সে খবর তো জানি না।

ত– তোমার হাতের কাছে আমার কোনও বই আছে?

স– ঠিক হাতের কাছে নেই। পাশের ঘরে যেতে হবে। ওখানে আছে।

ত– যাও ওখানে। একটা বই নিয়ে খোলো তো।

স– যাচ্ছি।

ত– বই খোলো। কী লেখা আছে?

স– লেখা তো জন্মসাল ২৫ আগস্ট, ১৯৬২.

ত– গোনো এখন। কত দাঁড়ায় বয়স?

স–(গোনার পর) দাঁড়ায় তো পঞ্চাশ।

ত– তাহলে কেন বলছো, বাহান্ন হয়ে গেছি।

স– কারণ কাগজ তো ভুল করে না।

ত– কাগজে কখনো কোনও মিসইনফরমেশন পাওনি? ভুল সংবাদ পড়োনি?

স– আমি তো বুঝতে পারছি না ভুল টা কেন করবে ওরা। ইনটেনশ্যানালি করেছে বলতে চাও?

ত–ইচ্ছে করে করেনি। ধরো, ভুল করেছে। হতে পারে না? ভেবেছে আমার বাহান্ন। কোথাও চেক করে দেখেনি ঠিক আছে কি না। হতে পারে না?

স– ওরা ভুল করেছে? কেন করবে?

ত– যেহেতু তুমি বুঝতে পারছে না ভুল টা কেন করবে ওরা, তাই ওরা কোনও ভুল করেনি!

স– সম্ভবত কাগজের অন্য কোনও হিসেব আছে।

ত– হিসেব? যেমন?

স– যে বয়সে পা দিলে তুমি, সেটা হয়তো কাউন্ট করে না, যে বয়সে পা দেবে সেটা কাউন্ট করে।

ত–মানে ভবিষ্যতের বয়সটা?

স– ধরো তাই।

ত–মানে আমি একান্ন হবো, সেই ভবিষ্যতের বয়সটাই আমার বয়স?

স– হ্যাঁ।

ত–ঠিক আছে, তাহলে তো আমি একান্ন হবো, বাহান্ন আসে কোত্থেকে।

স– একান্নয় আর বাহান্নয় খুব কি আর পার্থক্য আছে?

ত– তাহলে তুমি মনে করছো, ভবিষ্যতের যে বয়সটা আমার হতে যাচ্ছে, সেটা এখনই দিয়ে রাখলে কোনও অসুবিধে নেই।

স– অসুবিধে কেন?

এরপর আমি আর তর্কে যাইনি।

এ কিছুই নয়। মানুষ ছাপার অক্ষরকে কী রকম বিশ্বাস করে তার একটা বড় অস্বস্তিকর ঘটনার সাক্ষী আমি। আমি তখন গৃহবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। সেসময় বেশ কয়েকজন বন্ধু আর আত্মীয় আমার বাড়িতে এসেছিল। কেউ কোথাও যাইনি সারাদিন। সবাই সারাদিন বাড়িতে। খাওয়া দাওয়া, চা, আড্ডা, ছবি এসবই হয়েছে দিনভর, রাতভর। পরদিন সকালে পত্রিকা এলো, ওতে লেখা, কাল আমাকে নদীর ধারে লাল শাড়ি পরে আনমনে হাঁটতে দেখা গেছে একা একা। আমি দুদিন যাবৎ ঘরে একটা নীল টী সার্ট আর সাদা একটা শর্টস পরে ছিলাম। সবার চোখের সামনেই। সবাই জানে কাল আমি কোথাও বেরোইনি। শুধু কাল কেন, গত দুমাস আমাকে ঘর থেকে বেরোতে দিচ্ছে। না সরকার। দিচ্ছে না বলেই, আমার বেরোনোর অনুমতি নেই বলেই বন্ধুরা আমাকে সঙ্গ দিতে এসেছে। কিন্তু খবরের কাগজের ওই লেখাটা পরে সবাই এর ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো। ফিসফিস করে বলতে শুরু করলো–

বাইরে কখন গেছে, জানতেই পারলাম না আমি। এই তুই দেখেছিস?

আমি দেখিনি।

তাহলে দেখেছে কে?

তুমি জানো?

আমি তো দেখিনি।

ব কে জিজ্ঞেস করো তো, ব দেখেছে?

না, আমি তো দেখিনি। দরজা তো আমিই ভেতর থেকে তালা দিয়ে রেখেছি। চাবি আমার ব্যাগে, আলমারিতে।

আলমারির চাবি কার কাছে?

ওটিও আমার কাছে।

ব কি ঘুমিয়ে পড়েছিলে?

আমি তো রাত দুটোয় শুতে গেলাম।

না না তাহলে নয়। কাগজে লিখেছে বিকেলে।

ট বিকেলে কী করছিলে?

বিকেলে তো সবাই ছবি দেখছিলাম।

ওই সময় কী করে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে গেল, টেরও পাইনি।

ছবিটা যখন চলছিল। একবার দেখেছিলাম বারান্দায় গেল।

বারান্দায় নয়, বাথরুমে গিয়েছিল। ও বেরোলে আমি গেলাম।

বাথরুম থেকেই কি চলে গিয়েছিল?

বাথরুম থেকে তো ঘরে এসেছিল ছবি দেখতে।

সকাল আটটায় উঠেছে, নটায় ব্রেকফাস্ট করেছে। দশটার দিকে কী করলো?

দশটায় চা খেতে খেতে পেপার পড়লো আর পুরোনো দিনের গল্প করলো। ট আর ন গান গাইলো, শুনলো।

বারোটা পর্যন্ত তো তাই হলো। তারপর রান্না করলো। দুপুরে সবাই মিলে খেলাম। খাওয়ার পর তো অপর্ণা আর ঋতুপর্ণের ছবি, পর পর দেখা হল। ছবি দেখা শেষ হল সন্ধেয়, সাড়ে ছটার দিকে। তারপর আবার চা খেলো, তাস খেললো, কমপিউটারে কী কাজ করলো, নটা পর্যন্ত। নটায় ডিনার করলো। তারপর?

তারপর আবার কমপিউটারে লিখলো, স্টাডির বেডে ঘুমিয়ে পড়লো।

কটায় ঘুমিয়েছিল?

এগারোটা সাড়ে এগারোটায়।

এদিকে বেডরুমে তো আমরা আড্ডা দিয়ে অনেক রাতে ঘুমিয়েছি।

ওই সময় কোথাও গেল?

না, ওই সময় ন স্টাড়িতে বসে ওর একটা বই পড়ছিল।

যখন ও ঘুমোচ্ছিল?

হ্যাঁ যখন ঘুমোচ্ছিল।

আর আজ সকালে তো সাতটায় উঠলো। নিজেই চা করে খেলো।

তাহলে গেল কখন?

সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু গেছে তো নিশ্চয়ই।

আলমারির ভেতরে গেটের চাবি। আলমারির চাবি তো তোর কাছে।

হ্যাঁ আমার পকেটে।

কীরকম মিসটেরিয়াস লাগছে সবকিছু।

বড় ভুতুড়ে ব্যাপার।

শাড়িটা কোন ঘরে পরেছে। টেরই পেলাম না।

লাল শাড়ি আবার কবে কিনলো, ওর কোনও লাল শাড়ি নেই তো। কোনওদিন দেখিনি।

হয়তো কিনেছে এর মধ্যে।

কালই তো আলমারি খুলেছিল। শাড়িগুলো দেখলাম সব।

হয়তো আমরা জানি না লাল শাড়ির খবর। অন্য কোথাও ছিল হয়তো।

কোথায় থাকবে শাড়ি।

আজকাল তো শাড়ি টাড়ি পরে না।

অথচ দেখ, কাল শাড়ি পরে বেরোলো। কে বললো পরে না। ঠিকই পরে।

কোথায় শাড়িটা পরলো ভাবছি।

কোনও ঘরে নিশ্চয়ই পরেছে।

হয়তো বাথরুমে।

কিন্তু বাথরুমে তো একবারই গিয়েছিল। বেরোলো যখন, তখন তো শর্টসই ছিল পরনে।

এর মধ্যেই বেরিয়ে গেছে আমরা কেউ বুঝতেই পারিনি।

কাউকে বললো না? কী আশ্চর্য!

আলমারির চাবিটা যে কী করে নিল। দেখ, কাউকে কিছু বললো না। বললে কী হতো?

লুকিয়ে যাওয়ার কী ছিল, আমাদের কেউ তো সঙ্গে যেতে পারতাম।

.

সবাই যখন আমি বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, বিশ্বাস করছে, কোনও প্রমাণ নেই বাইরে বেরোবার, তারপরও বিশ্বাস করছে, বাড়িতে ছিলাম তার সমস্ত প্রমাণ থাকার পরও করছে, আমি জিজ্ঞেস করলাম,– তোমাদের কারো কি একবারও মনে হচ্ছে না কাগজ ভুল লিখেছে? তোমরা সবাই জানো, কাল সারাদিন আমি তোমাদের সঙ্গেই এখানে ছিলাম, রাতে তোমাদের সামনেই ঘুমিয়েছি। তোমাদের কেউ দেখনি আমাকে বাড়ি থেকে বেরোতে দেখনি, কারণ আমি বেরোইনি। তাহলে কেন মনে হচ্ছে না কাগজের লোকেরা কিছু ভুল করেছে?

না কারও এরকম মনে হচ্ছে না যে কাগজে ভুল লিখেছে। কারণ কাগজে ছাপার অক্ষরে লেখা আছে যে আমি কাল নদীর ধারে আনমনে হেঁটেছি, সুতরাং এ মিথ্যে হতে পারে না। বাড়িতে এতগুলো মানুষ থাকা সত্ত্বেও, সবার চোখের সামনে রক্ত মাংসের আমি ছোট একটা তিনরুমের ফ্ল্যাটে সারাদিন কাটালেও, আমার বাইরে যাওয়ার কোনও প্রমাণ না থাকলেও ওদের দৃঢ় বিশ্বাস, আমি বাইরে গিয়েছি, নদীর ধারে হেঁটেছি।

কেউ বিশ্বাস করে না কোনও বড় পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে কিছু লেখা ছাপা হলে সেই লেখা কখনও ভুল হতে পারে। ওরা জ্বলজ্যান্ত আমাকে অস্বীকার করে, ওরা। ওদের চোখকে অস্বীকার করে, কিন্তু কাগজের মিথ্যেকে সত্য বলে মানে। আমি যাদের কথা বলছি, তারা সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ। তারা আছে বলেই সম্ভবত মিডিয়া আছে।

যার কেউ নেই তার নাকি ভগবান আছে। এই মিডলক্লাস মিডিওকারদের জন্য মিডিয়াই ভগবান। ভগবান কি কখনও ভুল করতে পারে! ভুল মানুষ করে।

মিল এবং অমিল

অনেকে সালমান রুশদির সঙ্গে আমার নামটা প্রায়ই উচ্চারণ করে, দেশে বিদেশে সবখানে। কিন্তু একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজনের যদি বিরাট পার্থক্য থাকে, তবে এই উচ্চারণ খুব স্বাভাবিক, যে, অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাকে যখন সরাস রিই বলা হয় আমি মহিলা রুশদি, আজকাল প্রশ্ন করি, সালমান রুশদিকে বরং পুরুষ নাসরিন বলছো না কেন শুনি? এক ফতোয়া ছাড়া, আমি বেশ ভালো জানি, যে, আমাদের মধ্যে যা আছে, সব অমিল। রুশদি পুরুষ। আমি মেয়ে। এটা অনেক বড় অমিল। পুরুষ হওয়ার কারণে তিনি সুবিধে ভোগ করেন আর মেয়ে হওয়ার কারণে আমি অসুবিধে ভোগ করি। অমিলগুলো এক এক করে বলছি– ফতোয়া জারি হওয়ার পর রুশদি মৌলবাদীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, তওবা করে খাঁটি মুসলমান। হওয়ার পণ করেছিলেন। আমি ক্ষমা চাইনি। আমি মুসলমান হতেও চাইনি। শৈশব থেকেই আমি নাস্তিক, মাথা উঁচু করে সেই নাস্তিকই রয়ে গেছি, যত ঝড়ঝাঁপটাই আসুক না কেন। যে দেশ থেকে রুশদির বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি হয়েছিলো, সেই ইরান। নামের দেশে রুশদি কোনওদিন বাস করেননি। যে দেশে আমার ফাঁসি চেয়ে জঙ্গিদের মিছিল হয়েছে বছরের পর বছর, যে দেশে আমাকে হত্যা করার জন্য অসহিষ্ণু মুসল মানরা উন্মাদ হয়ে উঠেছিলো, যে দেশে সরকারের রুজু করা মামলার কারণে আমার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়েছিলো, আর তার ফলে আমাকে রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে মাসের পর মাস, যে দেশে আমাকে হাতের কাছে পেলে মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা ছিঁড়ে ফেলতো, সেই দেশেই আমি যাবতীয় তাণ্ডবের সময় সশরীরে উপ স্থিত ছিলাম। মৌলবাদী এবং সরকারের সকল অত্যাচার আমাকে সইতে হয়েছে একা। ফতোয়ার কারণে রুশদিকে কেউ তাঁর দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়নি। তাঁর নির্বা সনদণ্ড হয়নি। ইংলেণ্ড রুশদির দেশ, ওখানে তিনি ছিলেন, ওখানেই তিনি থাকছেন। রুশদির ওপর জারি হয়েছে সাকুল্যে একটি ফতোয়া, আমার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে তিনটে ফতোয়া, ভারত থেকে পাঁচটা। সবগুলোতেই মাথার দাম ধার্য করা হয়েছে। রুশদিকে কোনও দেশ থেকে নয়, আমাকে দু দুটো দেশ থেকে আমার লেখার কারণে তাড়ানো হয়েছে। রুশদির একটা বই নিষিদ্ধ হয়েছে, আমার পাঁচটা বই নিষিদ্ধ। লজ্জা, আমার মেয়েবেলা, উতল হাওয়া, দ্বিখণ্ডিত, সেই সব অন্ধকার। রুশদি ধর্মের নিন্দা করলেও ধর্মমুক্ত মানববাদী কোনও দলের সঙ্গে বা মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে জড়িত নন, আমি সক্রিয়ভাবে জড়িত। ব্যক্তিজীবনে রুশদি অত্যন্ত উন্নাসিক লোক, আমি সম্পূর্ণ তার বিপরীত। রুশদি একটার পর একটা নিজের হাঁটুর বয়সী মেয়েদের ধরছে, ভোগ করছে আর ছাড়ছে। তাঁর বুড়ো বয়সের ভীমরতিকে ভীমরতি হিসেবে দেখা হয়না বরং তাঁকে বেশ শক্ত সমর্থ সুঠাম সুন্দর প্রেমিক হিসেবেই সম্মান করা হয় এবং বেশির ভাগ পুরুষের কাছে তিনি ঈর্ষার পাত্র হয়ে ওঠেন। আর, এদিকে পু রুষসঙ্গীহীন জীবন কাটালেও আমাকে নিয়ে নানারকম যৌনতার কেচ্ছাকাহিনী লিখে বেড়ানো এবং আমাকে বেশ্যা বা বিকৃত মেয়েমানুষ বলার লোকের অভাব নেই। যৌন জীবন উপভোগ করবে পুরুষ। মেয়েরা তা উপভোগ করলে বাউপভোগ করার অধিকারের কথা বললে বা লিখলে সে বেশ্যা। লেখালেখি শুরু করার শুরু থেকে লোকের নিন্দা আর ছিছি শুনে আসছি। মেয়েদের যৌন স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করে আমি নাকি সমাজের বারোটা বাজাচ্ছি। রুশদির সঙ্গে আর একটা চমৎকার মিল বা অমিল আমার আছে। রুশদিকে যারা ভালো লেখক বলে, তাদের বেশির ভাগ লোকই রুশদির লেখা পড়েনি। আমাকে যারা খারাপ লেখক বলে, তাদের বেশির ভাগ লোকই আমার লেখা পড়েনি।

রুশদির নামের সঙ্গে আমার নাম জড়ানো হচ্ছে ১৯৯৩ থেকে। ইরানি ফতোয়া জারি হওয়ার পর রুশদি তখন আলোচিত এবং বিখ্যাত একটি নাম। এদিকে আমার মাথার দাম ঘোষিত হওয়ার পর বাংলাদেশ আর ভারতের সীমানার বাইরে লোকে সবে জানলো আমার নাম। আমি যখন অন্তরীণ অবস্থায় ছিলাম বাংলাদেশে, তখন অন্য সব ইওরোপের লেখকদের আমার পক্ষে খোলা চিঠি লেখার আন্দোলনে রুশদিও ছিলেন। এরপর যখন দেশান্তরী করা হলো আমাকে, নির্বাসন জীবনেই শুনেছি জা মানির এক পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর সম্পর্কে আমার মন্তব্য পড়ে রুশদি নাকি রীতিমত রেগে আগুন। ওই পত্রিকায় আমি হতাশা প্রকাশ করেছিলাম এই বলে যে ফতোয়ায় ভয় পেয়ে রুশদির ক্ষমা চাওয়া নিশ্চিতই একটি কাপুরুষোচিত আচরণ।

.

রুশদি এখন নিউ ইয়র্ক শহরে বাস করছেন। নিউইয়র্ক শহরে আমিও বাস করছি। কিন্তু আমাদের দেখা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। তিনি আমেরিকার লেখক কবিদের যে বড় সংগঠন আছে, পেন ক্লাব, তার প্রেসিডেন্ট পদে বহাল। দু বছর ধরে পেন ক্লাব থেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশাল অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। এশিয়া আফ্রিকার বিভিন্ন লেখককে নিয়ে আসা হয়েছে, প্রায় সবাই অচেনা। সালমান রুশদি জানেন যে আমি ভারত থেকে সবে বিতাড়িত হয়ে এসেছি। আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যে আঘাত এসেছে তা ঘৃণ্য এবং অবিশ্বাস্য। আমার প্রায় সব বইই বাংলাদেশে হয় সরকারীভাবে, নয় সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ। শুধু বাংলাদেশ থেকে নয়, লেখার কারণে আমাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়ানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ সাড়ে সাত মাস আমাকে কলকাতায় আর দিল্লিতে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছে তাড়ানোর প্র ক্রিয়া চালাতে গিয়ে। শেষ পর্যন্ত আমাকে ভারত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। জ্বলজ্বল করা আমার ইতিহাসকে ছলে বলে কৌশলে অস্বীকার করে সালমান রুশদি বাক স্বাধীনতার উৎসব করছেন। তিনি যা ইচ্ছে করতে পারেন। নিজের নিরাপত্তা রক্ষীদের একজন তাঁর বিরুদ্ধে বই লিখেছেন, সেই বই ছাপা না হওয়ার জন্য তিনি প্রকাশকের সঙ্গে ব্যবস্থা করে রেখেছেন। হ্যাঁ, তিনিই বাক স্বাধীনতার উৎসব করছেন। তিনি পুরুষ, ষাট পার হলেও কচি মেয়েদের দিকে লোভ করলে লোকে মন্দ বলে না। মেয়েরা যদিও অভিযোগ করেছে যে রুশদি তাদের যৌন বস্তু ছাড়া অন্য কিছু মনে করেন না, তাতেও লোকে ঘৃণা ছোড়ে না তাঁর দিকে। এই প্রচণ্ড পুরুষবাদী লেখক প্রচুর নাম, প্রচুর যশ, প্রচুর খ্যাতি পাওয়া লোক, তার সঙ্গে ফতোয়ার মিল ছাড়া আর কোনও মিল নেই বলে আমি স্বস্তি বোধ করি, এবং তাঁর নামের সঙ্গে আমার নাম কেউ যোগ করলে সত্যি বলতে কী, বিরক্তিবোধ করি আমি।

.

আরও একটা নামের পাশে আমার নাম গত দু বছর ধরে বেশ জড়ানো হচ্ছে। তিনি মকবুল ফিদা হোসেন। তিনি বিশাল শিল্পী। তাঁর ছবি ভারতে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়। তাঁকে ভারতের এক নম্বর শিল্পী বলে মনে করেন অনেকে। তিনি সম্প্রতি হিন্দুর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন সরস্বতীর উলঙ্গ ছবি এঁকে। হিন্দুরা তাঁর ছবি নষ্ট করে দিয়েছে, তাঁকে হুমকি দিয়েছে, তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আমি মানুষের একশ ভাগ বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। মকবুল ফিদা হোসেনের যা ইচ্ছে করে তাই তার আঁকার স্বাধীনতা আছে এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তাঁকে এ কারণে অত্যাচার করার কোনও অধিকার কারও থাকতে পারে না। ফিদা হোসেনের মতো বিশাল একজন শিল্পীর নামের সঙ্গেও আমার মতো ক্ষুদ্র নামটি যুক্ত হলে আমি অস্বস্তি বোধ করি। কারণ ক্ষুদ্র হলেও আমি আমার আদর্শকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করি, আমার আদর্শের সঙ্গে মোটেও মেলে না এমন কোনও মানুষ, সে মানুষ। পৃথিবীতে যে কোনও কারণেই হোক বিখ্যাত হলে তাঁর প্রতি আমার কোনও পক্ষপাত জন্ম নেয় না। তাঁর নামের পাশে আমার নাম উচ্চারিত হলে আমি সামান্যও পুলকিত হই না। মকবুল ফিদা হোসেনের উলঙ্গ সরস্বতী আঁকা নিয়ে ভারতে যখন বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে, আমি খুব স্বাভাবিক কারণে শিল্পীর স্বাধীনতার পক্ষে। মুসলমানদের মধ্যে যেহেতু নাস্তিকের সংখ্যা বিরল, ওরা ধর্মমুক্ত বা নাস্তিক হলে বিষম আরাম। বোধ করি। মকবুল ফিদা হোসেনের ছবি এরপর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখি হিন্দু ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্ম নিয়ে, বিশেষ করে তাঁর নিজের ধর্ম ইসলাম নিয়ে তিনি কোনও ব্যঙ্গ করেছেন কীনা? দেখলাম কিছুই করেননি। বরং আরবিতে আল্লাহু শব্দটি লিখে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধাসহ ব্যবহার করেছেন ক্যানভাসে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই ইসলামে তার অগাধ শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস। ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মে তিনি বিশ্বাস করেন না। হিন্দুত্বের প্রতি অবিশ্বাস থেকেই লক্ষ্মী এবং সরস্বতীকে উলঙ্গ এঁকেছেন। তিনি কি মুহম্মদ কে উলঙ্গ আঁকবেন? আমি নিশ্চিত, তিনি আঁকবেন না। আমার কোনও অসুবিধে নেই সব ধর্মের দেবদেবী বা পয়গম্বরদের উলঙ্গ আঁকতে। পৃথিবীর সব ধর্মের প্রতি আমার সমান অবিশ্বাস। কোনও ধর্মকে একটির ওপরে স্থান দেবো, একটিকে ঘৃণা করবো, আরেকটিকে ভালোবাসবো, বা বিশ্বাস করবো, এই সমস্যা আমার নেই। সব ধর্মই বলে তোমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ এবং সত্য এবং নির্ভুল, তোমার ঈশ্বরই সত্যিকার ঈশ্বর, বাকি ধর্ম ভুল, বাকি ঈশ্বর মিথ্যে! এই শিক্ষা নিয়ে গড়ে ওঠা ধর্মান্ধ সন্ত্রা সীরা খুব সহজেই বিধর্মীদের আক্রমণ করে। ক্রিশ্চান সন্ত্রাসীরা একসময় ভীষণ সন্ত্রাস চালিয়েছে, ইওরোপে। এখনও গর্ভপাতের বিরুদ্ধে থেকে থেকে তারা হিংস্রতা দেখাচ্ছে। হিন্দু সন্ত্রাসী সম্প্রতি আক্রমণ করেছে ভারতের অযোধ্যায়, গুজরাতে মুসলমান সন্ত্রাসীদের আক্রমণে ভারতবর্ষ কেন, সারা বিশ্বই কেঁপে উঠছে বারবার।

ফিদা হোসেন সেই সব ধার্মিকদের মতো, যারা নিজের ধর্মে বিশ্বাস রেখে অন্য লোকের অন্য ধর্মে বিশ্বাসকে নিন্দা করেন। ফিন্দা হোসেনের সঙ্গে নাম উচ্চারিত হতে, যদিও তিনি মহীরুহ,আমি তুচ্ছ তৃণ, আমার আগ্রহ হওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ আমি নাস্তিক, এবং তিনি শুধু আস্তিক নন, শুধু তাঁর নিজের ঈশ্বরের বেলায় তিনি আস্তিক। শত শত অন্য ঈশ্বর যে আছে জগতে, সেগুলো বিশ্বাসের প্রশ্ন উঠলে তিনি অবশ্য আস্তিক নন।

.

ফিদা হোসেনের সঙ্গে আমার মিল শুধু একটিই, প্রায় কাছাকাছি সময়ে একদল ধর্মান্ধ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছে আমাদের। এ ছাড়া আর যা আছে সব অমিল। প্রথম অমিলটি হল, তাঁর নির্বাসনটি স্বেচ্ছা নির্বাসন, আমার নির্বাসনটি স্বেচ্ছার নয়। আমার কলকাতার বাড়ি থেকেই শুধু নয়, আমাকে ভারত থেকেই বের করে দেওয়া হয়েছে। না, কোনও ধর্মান্ধরা বের করেনি, বের করেছে স্বয়ং সরকার। ফিদা হোসেনের বাস করার বাড়ি ঘর আছে বিদেশে, আমার নেই। ফিদা হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য সরকার চেষ্টা করছে, আমাকে না বাংলাদেশের সরকার, না ভারতের সরকার ফিরতে দিচ্ছে। ভারত থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর যতবারই আমি ভারতে বাস করার জন্য ঢুকেছি, পত্রপাঠ আমাকে বিয়ে করে দেওয়া হচ্ছে। ফিদা হোসেন একটি ধর্ম নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন, আমি নারীর অধিকারের কথা বলতে গিয়ে সব ধর্মের নারীঅধিকারবিরোধী শ্লোকের সমালোচনা করে মুলত যে কথাটি বলি তা হল সমানাধিকারের ভিত্তিতে আইন তৈরি হোক, নারী বিরোধী আইন এবং সংস্কৃতির অবসান হোক, ধর্মের সমালোচনা করলে আমি সব ধর্মের সমালোচনা করি, নিজের আত্মীয় স্বজনের ধর্ম ইসলামকে বাদ দিয়ে করি না।

রুশদি এবং ফিদা হোসেনের মতো নাম যশ খ্যাতি প্রতিপত্তি আমার নেই। কিন্তু তারপরও আমি তাঁদের নামের সঙ্গে আমার নাম কোনও কারণে উচ্চারিত হোক চাই না। দীর্ঘ বছর যাবৎ আমি যেভাবে নির্যাতিত হচ্ছি ধর্মান্ধ এবং ক্ষমতাসীন সরকার দ্বারা, এই নির্যাতনের সামান্যও তাঁরা কেউ ভোগ করেননি। যেভাবে গৃহহীন অবস্থায় অনিশ্চয়তার অন্ধকারে দিনের পর দিন আমাকে বিদেশ বিভূঁইয়ে কাটাতে হচ্ছে, অসুখে অভাবে একা আমাকে নিজের বাঁচার সংগ্রাম, একই সঙ্গে নিজের আদর্শ এবং বিশ্বাসের জন্য সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে, তা ফেলনা জিনিস নয়। রুশদি বা হোসেনকে এমন দুঃসহ অবস্থার ধারে কাছেও কাটাতে হয়নি। তাঁদের শিল্পের প্রতি আমি অপরিসীম শ্রদ্ধা রেখেই বলছি যে ওই দুজন পুরুষের সঙ্গে আমাকে এক ব্রাকেটে ফেলা অনুচিত। ধর্মমুক্ত ও বৈষম্যমুক্ত, সাম্য ও সমানাধিকার সম্বলিত একটি সমাজের জন্য আমার নিরন্তর সংগ্রাম মানুষ যে চোখেই দেখুক, আমার আদর্শের ধারেকাছে আসার কোনও যোগ্যতা তাঁদের নেই,তাঁরা যত বড় শিল্পীই হোক না কেন।

মেয়েরা নাকি তেঁতুলের মতো!

 

বাংলাদেশ থেকে খুব কমই ফোন আসে। বছরে একটি কিংবা দুটি। মাঝে মাঝে নিজেই আঁতকে উঠি। জন্মেছি, ও দেশেই কাটিয়েছি শৈশব কৈশোর যৌবন। ও দেশেই আছে আত্মীয় স্বজন, খেলার সাথী, ও দেশেই আছে একসময়ের সহপাঠীরা, সহকর্মীরা, লেখক-বন্ধুরা, অনুরাগী পাঠকেরা। দিব্যি ভুলে গেছে সবাই। তা যাক, আমিও ও নিয়ে দুঃখ করতেও অনেকদিন ভুলে গেছি। আজ কিন্তু ফোন আসা বা না আসা নিয়ে লিখতে বসিনি। লিখছি, কারণ বিকেলে একজন ফোন করেছিল দেশ থেকে। মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে জড়িত | শাহবাগেও ছিল। আমার নিষ্ঠ পাঠক। বন্ধু। বললো, আপনি কিছু লিখছেন না কেন, এই যে মেয়েদের তেলের সঙ্গে তুলনা করলো আল্লামা শফী। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লামা শফীটা কে, শুনি? কথোপকথনটা তারপর এভাবে এগোলো।

— হিফাজতে ইসলামের আমীর।

— হিফাজতে ইসলামটা কী?

–একটা মৌলবাদী দল। কয়েক লক্ষ লোকের মিছিল নামিয়েছিল ঢাকায়। এখন প্রচুর প্রতিবাদ হচ্ছে তার বক্তব্য নিয়ে। আপনার লেখা মিস করছি। লিখুন।

– কেন প্রতিবাদ হচ্ছে? কী বলেছে সে?

– জনসভায় বলেছে, আপনারা মেয়েদের স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে লেখাপড়া করাইতেছেন। কেন করাইতেছেন? তাদের ক্লাস ফোর-ফাইভ পর্যন্ত পড়াইবেন যাতে বিবাহ শাদী দিলে স্বামীর টাকা-পয়সার হিসাব রাখতে পারে। আপনার মেয়েকে স্কুল কলেজ, ভার্সিটিতে পড়াইতেছেন, লাখ লাখ টাকা খরচ করতেছেন। কিছুদিন পর আপনার মেয়ে, নিজে নিজে একটা স্বামী জোগাড় কইরা লাভ ম্যারেজ, কোর্ট ম্যারেজ কইরা চইলা যাবে। আপনার কথা স্মরণ করবে না। মহিলাদের ক্লাসে সামনের দিকে বসানো হয়, পুরুষরা কী লেখাপড়া করবে? আরও জঘন্য কথা বলেছে।

— যেমন?

— বলেছে, আপনার মেয়েকে কেন দিচ্ছেন গার্মেন্টসে কাজ করার জন্য? চাকরি তো অনেকে করতেছেন। আপনি নিজে করতেছেন, আপনার বউ করতেছে, মেয়েরা করতেছে। কিন্তু তারপরওতো পারতেছেন না। খালি অভাব আর অভাব। আগের যুগে শুধু স্বামী রোজগার করত আর সবাই মিইলা খাইত। এখন বরক্ত নেই। সবাই মিল্লা এত টাকা কামাইয়াও তো কুলাইতে পারতেছেন না।

গার্মেন্টসে কেন দিচ্ছেন আপনার মেয়েকে? সকাল ৭-৮টায় যায়, রাত ১০ ১২টায়ও আসে না। কোন পুরুষের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে, তুমি তো জান না। কতজনের সঙ্গে আপনার মেয়ে চলছে তা তো জানেন না। জেনা কইরা টাকা কামাই করতেছে, বরকত থাকবে কেমনে। মেয়েদের কাজ ঘরের ভেতর। নারীদের ঘরে থাকতে বলেছে ইসলাম। তোমরা জাহিলিয়াতের সময়ের মতো বেপর্দায় ঘর থেকে বাইর হইও না, উলঙ্গ অবস্থায় মাঠে-ঘাটে-হাটে আপনারা মহিলারা মার্কেট করতে যাবে না। স্বামী আছে সন্তান আছে তাদের যাইতে বলবেন। আপনি কেন যাবেন? আপনি স্বামীর ঘরের মধ্যে থাইকা উনার আসবাবপত্র এগুলার হেফাজত করবেন। ছেলে-সন্তান লালন পালন করবেন। এগুলা আপনার কাজ। আপনি বাইরে কেন যাবেন?

— তাই নাকি?

— বলেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ কেন করেন? বার্থ কন্ট্রোল কেন করেন? বার্থ কন্ট্রোল হলো পুরুষদের মরদা থাইকা খাসি কইরা ফেলা। মহিলাদের জন্মদানী সেলাই কইরা দেয়া। এরই নাম বার্থ কন্ট্রোল। বার্থ কন্ট্রোল করলেও ডেথ তো কন্ট্রোল করতে পারবা না। রিজিকের মালিক হচ্ছে আল্লাহ। খাওয়াইব তো উনি। তুমি কেন বাহা কন্ট্রোল করবা? বড় গুনাহের কাজ এইটা। পারলে চাইরটা পর্যন্ত বিবাহ করবা। খাওয়াইব তো আল্লাহ। বার্থ কন্ট্রোল করবা না। এইটা বড় গুনাহের কাজ।

— আল্লাহ তো খাওয়ায় না সবাইকে। আল্লাহ শুধু ধনীদের খাওয়ায়। পুষ্টিকর খাবার, সুস্বাদু খাবার সব তো আল্লাহ একটা শ্রেণীকেই খাওয়াচ্ছে। আল্লাহ আবার কবে গরিবদের খাওয়ালো? গরিবরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তবেই সামান্য খাবার যোগাড় করে, তাও আবার আধপেট খেয়ে বেশির ভাগ বেঁচে থাকে। আর কাজ যদি না জোটে, বা পরিশ্রম করার শরীর যদি না থাকে, তবে না খেয়ে মরে। আল্লাহর কথা বাদ দাও, আল্লামা কী বলেছে বলো? তেঁতুল টেতুল কী যেন তখন বলছিলে!

–বলেছে, মেয়েরা হচ্ছে তেঁতুলের মতো। ছোট্ট একটা ছেলে তেঁতুল খাইতেছে, তা দেখলে আপনার মুখ দিয়া লালা ঝরবে। তেঁতুল গাছের নিচ দিয়া আপনি হাঁটা যান তাইলেও আপনার লালা ঝরবে। দোকানে তেঁতুল বিক্রি হইতে দেখলেও আপনার লালা ঝরবে। ঠিক তেমনি মহিলাদের দেখলে দিলের মাঝে লালা ঝরে। বিবাহ করতে মন চায়। লাভ ম্যারেজ কোর্ট ম্যারেজ করতে মন চায়। দিনরাত মেয়েদের সঙ্গে পড়ালেখা করতেছেন, আপনারা দিল ঠিক রাখতে পারবেন না। রাস্তাঘাটে মেয়েদের সঙ্গে চলাফেরা করতেছেন, আপনার দিল ঠিক রাখতে পারবেন না। যতই বুজুর্গ হন আপনার মনের মাঝে কু খেয়াল আইসা যাবে। এইটা মনের জেনা, দিলের জেনা। এইটা এক সময় আসল জেনায় পরিণত হবে। আপনার রিয়েকশান?

— তেঁতুল আমি খুব পছন্দ করতাম ছোটবেলায়। এখনও জিভে জল চলে আসে তেঁতুল দেখলেই। এত ফুল থাকতে আল্লামা লোকটা তেঁতুল বেছে নিয়েছে কেন? ছেলেরা তো অত তেঁতুল পছন্দ করে না। মেয়েরা পছন্দ করে। সে ক্ষেত্রে বরং কোনও ছেলেকে দেখলে মেয়েদের মনে হতে পারে ছেলেটা তেঁতুলের মতো। স্মার্ট হ্যাঁণ্ডসাম ছেলে দেখলে বরং মেয়েদের লালা আসাটা স্বাভাবিক। ছেলেদের, ধরা যাক, কোনও কারণে লালা ঝরলো। তা ঝরলে ক্ষতিটা কী, শুনি! বিয়ে করতে মন চাইলে করবে। এতে অসুবিধেটা কোথায়? সেক্স, বিয়ে, এসব তো অন্যায় কোনও কাজ নয়। অন্যায় কাজ হল, অন্যের আপত্তি সত্ত্বেও গায়ের জোরে সেক্স করা বা গায়ের জোরে বিয়ে করা।

–উফ। আল্লামা শফীর কথার প্রতিবাদ করুন, সিরিয়াসলি করুন।

–একটা অশিক্ষিত মিসোজিনিস্ট কী বললো না বললো, তা নিয়ে অত ভাবছো। কেন? ওই ব্যাটাকে এত মূল্য দেওয়ার কী আছে?

– কী বলছেন, এত সব বাজে কথা বলে পার পেয়ে যাবে? আপনি প্লিজ প্রতিবাদ করুন।

– পার তো পেয়েই যাবে। প্রতিবাদ করলেও পাবে, না করলেও পাবে। লোকটা শুধু কিছু কথা বলেছে। যা বলেছে, সেই মতো কাজ করে লক্ষ লক্ষ লোক প্রতিদিন পার পেয়ে যাচ্ছে। কাউকে তো দোষ দিচ্ছ না। বেচারা আল্লামাকে দোষ দিচ্ছ কেন খামোকা? প্রতিদিন মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মেয়েদের ঘরের বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না, যদি যেতেই হয় বোরখা পরে যেতে হচ্ছে, মেয়েদের চাকরি করতে দেওয়া হচ্ছে না, বার্থ কন্ট্রোল করতে দেওয়া হচ্ছে না, মেয়েদের দিয়ে পুরুষের ঘর সংসার সন্তান সামলোনার কাজ করানো হচ্ছে। প্রতিদিন ঘরে বাইরে মেয়েরা যৌনবস্তু হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আল্লামা এসব কথা না বললেও এভাবেই চলছিল সমাজ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারণেই তো চলছিল। একেই তো তোমরা ট্রাডিশান বা কালচার বলো। আল্লামা লোকটা, আমার মনে হচ্ছে, খুব। সৎ লোক। পলিটিক্যালি কারেক্ট হওয়ার কায়দাটা এখনও শেখেনি। ধুরন্ধররা ওসব শিখে নেয় আগেভাগে। তারপর তলে তলে সমাজটাকে নষ্ট করে। আল্লামা কিন্তু নতুন কোনও কথা বলেনি। সবার জানা কথাগুলোই বলেছে।

–একটা মৌলবাদীকে সৎ লোক বলছেন?

–বলছি কারণ লোকটা যা বিশ্বাস করে, তা অকপটে বলে দিয়েছে। সমাজের ভদ্রলোকেরা মনের কথাটা বলে না। লুকিয়ে রাখে। লুকিয়ে রেখে ওপরে আধুনিক হওয়ার ভাব দেখায়। ভাব দেখায় তারা মেয়েদের স্বাধীনতায় আর অধিকারে বিশ্বাস করে। টোকা মেরে দেখ কিছুই আসলে বিশ্বাস করে না। আসলে সবাই প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে ওই আল্লামা শফীর আদর্শে বিশ্বাস করে। আল্লামার আদর্শ তো আসলে আল্লাহ পাকের আদর্শ, হযরতের আদর্শ। কোরানে আছে, শত শত হাদিসেও লেখা আছে এসব কথা চারটে বিয়ের কথা কি আল্লামা প্রথম বললো? ও তো স্বয়ং আল্লাহ পাকই বলে দিয়েছেন। তার পর ধরো, মেয়েদের ঘরের বাইরে না যাওয়ার কথা, পর পুরুষের সামনে না যাওয়ার কথা। এসব তো হাদিসের কথা। ঘরের বার না হলে, পর পুরুষের সামনে না গেলে তুমি ইস্কুল কলেজে যাবে কী করে শুনি, চাকরি বাকরি করবে কী করে। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করবে, আবার নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করবে, তা তো হয় না! দুটো পরস্পরবিরোধী জিনিস।

–দেশের মানুষ তো আল্লামার মতো এত ছোটলোক নয়।

— মানুষ আবার দল বেঁধে বড় লোক কখন হলো? হয়তো কেউ কেউ ছোটলোক নয়। তবে আল্লামা যা বলেছে, তা বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের মনের কথা। হয়তো মেয়েদের ঠিক ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ানোর বদলে কেউ কেউ ক্লাস এলেন। টুয়েলভ অবধি পড়াতে চায়, কেউ এম এ, বি এ বা তারও বেশি পড়াতে চায়, কেউ কেউ মেয়েরা চাকরি করুক তাও চায়, তারাও দেখ গিয়ে মেয়েদের তেঁতুলের মতোই মনে করছে।

— আপনি বলছেন অন্য লোকও মেয়েদের তেঁতুলের মতো মনে করছে। শুধু আল্লামা নয়?

–তা তো নয়ই। অধিকাংশ লোকই মেয়েদের তেঁতুলই ভাবে। কেন, কত পু রুষ-কবি মেয়েদের কত ফুল-ফলের সঙ্গে তুলনা করেছে, পড়োনি? কমলা, ডালিম, নাসপাতি, আপেল, পেয়ারা, আনারস, গোলাপ, বেলি এরকম আরও কত নামে ডেকেছে মেয়েদের। কেবল তেঁতুল বললেই রাগ হয়? তেঁতুল খুব সস্তা ফল বলে? দামী ফলের সঙ্গে তুলনা করলে হয়তো এত রাগ হতো না। শুধু ফুল ফল! সবজিও তো আনা হয়েছে তুলনায়। পটলচেরা চোখ! শোনো, নারী-পুরুষের পরস্পরের প্রতি যৌন আকর্ষণ থাকাটা অতি স্বাভাবিক। কিন্তু নারীকে নিতান্তই বস্তু ভাবাটা, যৌন-বস্তু ভাবাটা ঠিক নয়। যেন গোটা মানুষটা একটা ভ্যাজাইনা, গোটা মানুষটা একজোড়া স্তন, গোটা মানুষটা ত্বক, নাক চোখ, চুল; আর কিছু নয়। যেন মেয়েদের জ্ঞান বুদ্ধি, চিন্তা ভাবনা, ইচ্ছে অনিচ্ছে, নিজস্বতা, স্বকীয়তা, সম্মান, ব্যক্তিত্ব এসব নেই, বা থাকলেও এসবের কোনও মূল্য নেই। মেয়েরা যেন নিজের জন্য জন্মায়নি, জন্মেছে পুরুষের জন্য, পুরুষের যৌন তৃষ্ণা মেটানোর জন্য। তেঁতুলের প্রসঙ্গ তো এলো সে কারণে। ওই লোক কিন্তু পুরুষকে তেঁতুল বলেনি। মেয়েদেরও তো যৌন তৃষ্ণা আছে বাবা! যদি পুরুষের চোখে মেয়েরা তেঁতুলের মতো, মেয়েদের চোখে পুরুষও তো তেঁতুলের মতো। কিন্তু এরা মেয়েদের যৌনতাকে কোনওদিন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে তো করেই না, বরং অস্বীকার করে, ওটি থাকলে মেয়েদের বেশ্যা বলে গালাগাল করে। এদের চোখে, পুরুষ হচ্ছে ফুলফ্লেজেড হিউম্যান, আর মেয়েরা হচ্ছে সেক্স-অবজেক্টস কাম স্লেভস। পুরুষকে যৌনতৃপ্তি দেওয়ার, পুরুষের সন্তান জন্ম দেওয়ার, সেই সন্তানকে লালন পালন করার, ঘর সংসারের সব কাজকর্ম করার, রান্নাবান্না করার, পরিবেশন করার কাজ ছাড়া তাদের আর কোনও কাজ নেই। পুরুষের মা, স্ত্রী, বোন, কন্যা– এসবই হচ্ছে মেয়েদের পরিচয়। আর কোনও পরিচয় সমাজের কটা লোক মানে, বলো। পুরুষতন্ত্র হচ্ছে মেয়েদের বন্দি করে রাখার জন্য বোরখার মতো একটা বন্ধ কারাগার।

— কেউ তো আল্লামা শফীর মতো এমন আজগুবি কথা আগে বলেনি।

— সবাই বলছে। আল্লামা রাখঢাক না করে, একটু অসভ্য ভাষায় বলেছে, এই যা। সভ্য ভাষায় সভ্য লোকেরা যখন বলে, ওটা তোমাদের শুনতে অত মন্দ লাগেনা। কোরান হাদিসও ভালো করে পড়ে দেখ, এসব কথাই লেখা আছে। কোরান হাদিস হচ্ছে কট্টর পুরুষতন্ত্র। ঠিক আল্লামার মতো কথা বলে, চোদ্দশ বছর আগে একজন লোক আল্লাহর পেয়ারা বান্দা, বন্ধু, মেসেঞ্জার, রসুল ইত্যাদি বনে গিয়েছিল। সেই রসুলকে তোমরা মন প্রাণ ঢেলে শ্রদ্ধা করছো, তাকে বিশ্বাস করছো, আর ঠিক একই ধরনের কথা বললেও আজ আল্লামা শফীকে বিশ্বাস করছে না, তাকে বরং তোমরা ঘৃণা করছো। রীতিমত কন্ট্রাডিকটরি। কেন আল্লামাকে নিন্দা মন্দ করছো, সে তো তোমাদের রসুলে করিমের বিশ্বাসের উল্টো কোনও কথা বলেনি! রসুলের কথাগুলোই ইনোসেন্টলি ফুঁ গোপযুগী করে রিপিট করেছে আল্লামা।

–কী বলছেন?

— হ্যাঁ। যা বলছি ঠিকই বলছি। কী চাও? বৈষম্য নাকি সমতা, বর্বরতা নাকি মানবতা– একটাকে তোমাদের বেছে নিতে হবে। ধর্মে, সোজা কথা সাফ কথা– সমানাধিকার নেই, সত্যিকার মানবতাও নেই। আগেই বলেছি, ধর্ম আগাগোড়াই, মানে টপ টু বটম পুরুষতন্ত্র। যদি ইসলামে কারও অবিশ্বাস থাকে তাকে কুপিয়ে মেরে ফেলার কথা লেখা আছে। এর চেয়ে মানবতা বিরোধী কাজ আর কী হতে পারে। অ্যাডাল্টারি করলে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলতে হবে মেয়েদের। মেয়েদের আপাদমস্তক ঢেকে রাখতে হবে। কারণ তাদের দেখলে পুরুষের যৌন-ইচ্ছে জাগতে পারে। পুরুষের যৌন ইচ্ছে জাগতেই পারে, জাগুক। মেয়েদের যদি একই সঙ্গে সেই ইচ্ছেটা না জাগে, তবে পুরুষকে কন্ট্রোল করতে হবে। একই রকম মেয়েদের বেলাতেও। মেয়েরা তো কন্ট্রোল করছে, পুরুষরা কেন করবে না?

— পুরুষরা তো কন্ট্রোল করতে জানে না।

–কে বলেছে জানেনা? যারা জানে না তারা চরিত্রহীন, তারা বদমাশ, লোচ্চা। মেয়েদের বোরখা পরাটা প্রমাণ করে সমাজের সব পুরুষ চরিত্রহীন। মেয়েদের বোরখা পরিয়ে শুধু মেয়েদের ছোট করা হয় কে বলেছে, সত্যিকার ছোট করা হয় পুরুষদের। ওই সমাজের পুরুষেরা কোনও জাতের না, সব পুরুষই লিটারেলি এক একটা ডিকহেড, এটাই প্রমাণ করে। কে বলেছে পুরুষরা সেক্সের আর্জ কন্ট্রোল করতে জানে না? সভ্য সমাজে সভ্য পুরুষরা তো কন্ট্রোল করছে। তাদের মেয়েরা হাফ উলঙ্গ হয়ে চললেও পুরুষরাতো মনে করছেনা তাদের অধিকার আছে ওই মেয়েদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার? তুমি বলছো তোমাদের সমাজে পুরুষরা কন্ট্রোল করতে জানে না! ঠেকায় পড়লে কিন্তু ঠিকই জানে। কিন্তু ঠেকা নেই তো এখন। পুরুষরা তোমাদের ব্যাকওয়ার্ড সমাজের মাতব্বর। মাতব্বরেরা মনে করে, তাদের যৌনআকাঙ্ক্ষা সংযত করার কোনও দরকার নেই। তারা যা খুশি করতে পারে। যার ওপর ইচ্ছে তার ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়ার, ধর্ষণ করার অধিকার তাদের আছে। তাদের পেশিতে শক্তি আছে, মেয়েদের ওপর পেশির শক্তি তারা খাটাবে। এই শক্তি আল্লাহর দেওয়া। জগতটা তাদের স্মৃর্তির জন্য। কিন্তু তা তো আসলে নয়। জগতটা নারী পুরুষ উভয়ের। পরস্পরের প্রতি সম্মান না থাকলে জগতটাতো চলবে না। মেয়েদের ঘরবন্দি না করে, বোরখা না পরিয়ে বরং পুরুষগু লোকে মানুষ করার চেষ্টা করো। পুরুষ লোচ্চামি করবে বলে প্রাপ্য অধিকার থেকে মেয়েদের বঞ্চিত করার মতো অন্যায় কাজ আর কিছু নেই। আমরা যত সভ্য হচ্ছি, তত সমাজ পাল্টাচ্ছি। আমরা বলে কয়ে নিয়েছি যে আমরা পেশি দিয়ে বা পুরুষাঙ্গ দিয়ে জগত, রাষ্ট্র বা সমাজ চালাবো না। বুদ্ধি দিয়ে চালাবো। সুবুদ্ধি দিয়ে। সুবিবেচনা দিয়ে।

–অবশ্য সব পুরুষ এক নয়। সব পুরুষই ধর্ষণ করে না।

–অবশ্যই সব পুরুষ এক নয়। অনেক পুরুষই নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাস করে। কিন্তু তাদের সংখ্যাটা নিতান্তই কম। এই সংখ্যাটা দ্রুত বাড়া উচিত। শুধু পুরুষ নয়, নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাস করা নারীর সংখ্যাও খুব বেশি নয়। ওই সংখ্যাটাও বাড়াতে হবে।

— আর আল্লামার কী হবে? ওর অনুসারীর সংখ্যা তো অনেক বেশি।

— সে ওর কৃতিত্ব। তোমরা পিতৃতন্ত্রকে আঘাত করতে পারোনি বলেই এমন হচ্ছে। মানুষকে বিজ্ঞান শিক্ষায় যথেষ্ট শিক্ষিত করতে পারেনি বলে মানুষ আজ অন্ধত্ব, কুসংস্কার, গোঁড়ামির মধ্যে বড় হচ্ছে। সমতা, সমানাধিকার, নারী-স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে মানুষকে শিক্ষিত করোনি বলে মানুষ আজ নারীবিরোধিতা, নারী-ঘৃণা, পুরু ষপ্রাইড ইত্যাদি নিয়ে বেড়ে উঠেছে। বেড়ে উঠেছে বলেই সহজেই আল্লামা শফীর কথাগুলো তাদের মনঃপুত হয়। শফীর প্রতিবাদ করে যত না কাজ হবে, তার চেয়ে বেশি কাজ হবে যদি প্রচার মাধ্যমকে ব্যবহার করো মেয়েদের অধিকার সম্পর্কে, মানবা ধিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জ্ঞান দিতে। ইস্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষা কম্পালসারি করো। ধর্ম শিক্ষা উঠিয়ে দাও ইস্কুলের সিলেবাস থেকে। মাদ্রাসা উঠিয়ে দাও। ধর্ম শেখার জিনিস নয়। ধর্ম বিশ্বাস করার জিনিস। হাবিজাবি আজগুবি অবাস্তব গল্প চোখ কান বুজে বিশ্বাস করার জিনিস। ও ঘরে বসে যত পারো বিশ্বাস করো। বাইরেটা ধর্মমুক্ত রাখো। বিজ্ঞানটা অবশ্য ভালো ভাবে অন্তঃস্থ করলে ধর্ম থেকে বিশ্বাস উঠবেই। এবং এতেই হবে পুরুষতন্ত্রের, ধর্মের, আল্লামা শফীর আর আল্লাহর নবীর ফতোয়াকে চ্যা লেঞ্জ করা। দুদিন মিছিল করে, তিনটে কলাম লিখে, চারদিন চিল্লিয়ে সমাজটাকে খুব বেশি বদলানো যায় না। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছোতে হবে তোমাদের। মুশকিল হল, বছরগুলোকে গড়িয়ে যেতে দিয়েছো, আর এই ফাঁকে শহর বন্দর গ্রাম গঞ্জের মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে আল্লামারা। তাই ডাক দিলে পিঁপড়ের মতো লোক বেরিয়ে আসে রাস্তায়। চোখের সামনে কী দ্রুত তৈরি হয়ে গেল একটা গণ্ডমূখের সমাজ। বড় দুঃখ হয়।

রাফ খাতা

ছোটবেলায় আমাদের দু ধরনের খাতা থাকতো, রাফ খাতা, আর ফেয়ার খাতা। ফেয়ার খাতায় কোনও হাবিজাবি লেখা চলবে না। রাফ খাতায় চলবে। রাফ খাতায় থাকতো আমার রাজির হাবিজাবি। যে কোনও লেখাই রাফ খাতায় আগে প্র্যাকটিস করে পরে তবেই ফেয়ার খাতায় লিখতাম। রাফ খাতা ছিল স্বাধীনতা, ফেয়ার খাতা ছিল থমথমে একটা পরাধীনতা। রাফ খাতার মার্জিনে বা মাঝখানে, অংক করতে গিয়ে, বা নানা রকম বাড়ির কাজ প্র্যাকটিস করতে গিয়ে কত যে মনের কথা লিখেছি তার কোনও হিসেব নেই। বছর শেষ হলে নতুন ক্লাসে উঠলে পুরোনো বই খাতা সের দরে বিক্রি করে দেওয়া হত, আর বিক্রি না হলেও ওসব বাঁচিয়ে রাখা যেতো না, উইপোকা খেয়ে ফেলতো। লেখার হাতেখড়ি আমার রাফ খাতায়।

একসময় গোটা একটা রাফ খাতাকে লেখার খাতাই করে ফেললাম। ও নিয়ে ইস্কুলের লেখাপড়ার চেয়েও বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। খাতাটা বাবা মার চোখের আড়ালে রাখতে হত। তবে লুকিয়ে ইস্কুলে নিতাম খাতাটা। ক্লাসের মেয়েরা কাড়াকাড়ি করে গোগ্রাসে পড়তো আমার লেখা। একসময় ওরা বাড়িতে নিয়ে যেতে শুরু করলো খাতা, পড়া শেষ হলে ফেরত আনতো, তখন আরেকজন পড়তে নিত। যার খাতা তার হাতে আসতে আসতে মাস চলে যেতো। দাদারা কবিতা-পত্রিকা। বার করতো, বাড়িতেই পত্রিকা ভাঁজ করে করে পোস্ট করা হতো গ্রাহকদের। ভাঁজে অংশ নিতাম, মুখস্ত করে ফেলতাম ছাপা হওয়া কবিতাগুলো। ওসবে দাদারা কবিতা লিখতো। তখনও কবিতা ছাপানোর মতো বয়স আমার হয়নি।

তবে বয়স হওয়ার আগেই আমার লেখা শুধু দাদাদের পত্রিকায় নয়, শহরের, এমনকী শহরের বাইরের লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা হতে শুরু করলো, এমনকী জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হলো বেশ কিছু। আর বয়স হওয়ার আগেই, যখনও বাড়ির চৌকাঠ আমার ডিঙোনো নিষেধ, কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা আর প্রকাশনা দুটোই শুরু করলাম। তখন সবে সতেরো আমি।

সেই যে লেখার শুরু। আজও চলছে সেই লেখা। মাঝখানে গেল মেডিক্যাল কলেজের কঠিন পড়াশোনা, হাসপাতালের চাকরি– লেখার গতি কমেছে, কিন্তু লেখা ছাড়িনি। কেন ছাড়িনি, ছাড়তে পারিনি বলেই ছাড়িনি। কারণ যে কথা মনে আনাগোনা করে, সে কথা অন্য আর কোনও কিছু করে প্রকাশ করতে আমি পারিনা। আমি না জানি গান গাইতে, না জানি নাচতে। আমি না পারি নাটক করতে, না পারি ভালো ছবি আঁকতে। শুধু লেখাটাই জানি। লেখাতেই বলতে পারি কী বলতে চাইছি। যা লিখে বোঝাতে পারি, তা বলে বোঝাতে পারি না। বলতে গেলে সব তালগোল পাকিয়ে যায়। মনে কী এমন কথা আমার যা প্রকাশ করতেই হবে? না, মনে নতুন কোনও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নেই, গ্রহ নক্ষত্র আবিষ্কারের গোপন কোনও পরিকল্পনাও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে না। খুব সাধারণ কিছু কথা মনে, না বললে আর সব মেয়েদের মতো চিরকালই কথাগুলো বুকের ভেতর পুষে রাখতে হবে। সাধারণ কথা, আমি কী চাই, কী না চাই, আমার কী ভালো লাগে, কী ভালো লাগে না, এসব। পুরুষেরা বলে। বেশির ভাগ মেয়েরাই বলে না, কারণ মেয়েদের অত কথা বলতে নেই, অত চাওয়া থাকতে নেই, অত নিজস্বতা থাকতে নেই, অন্যের ভালোয় মেয়েদের ভালো।

কিন্তু যেহেতু আমি বিশ্বাস করি না মেয়ে বলে আমি কিছুটা কম মানুষ, যেহেতু বিশ্বাস করি না অধিকার বা স্বাধীনতা আমার কিছুটা কম হলেও চলে, তাই বলি, তাই লিখি, সময় সময় চেঁচাই। লিখি কেবল আমার জন্য নয়, লিখি তাদের জন্যই বেশি, যাদের জানতে দেওয়া হয় না কতটা অধিকার তাদের আছে নিজের জীবনটা নিজের পছন্দমতো যাপন করার। লিখে সেই মেয়েদের, সেই মানুষদের স্থবির জীবনে যদি সামান্যও তরঙ্গ তুলতে পারি, তবেই আমার লেখা সার্থক। সার্থক হই বলেই আর যা কিছুই ছাড়তে পারি, লেখাটা পারি না।

রোগের নাম পুরুষতন্ত্র

ইনদোরের এক লোক তার স্ত্রীর যৌনাঙ্গে তালা লাগিয়ে রেখেছিল চার বছর। স্ত্রী অতিষ্ঠ হয়ে বিষ খেয়ে মরতে যাচ্ছিল, তড়িঘড়ি তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করার সময় ধরা পড়লো তার যৌনাঙ্গ তালা বন্ধ। হাসপাতালে না নিয়ে গেলে কেউ জানতে পারতো না যে এই একবিংশ শতাব্দীতে আক্ষরিক অর্থেই যৌনাঙ্গ তালা বন্ধ করা হয়। যৌনাঙ্গের দুই অংশে সত্যিকার ছিদ্র করে ওতে তালার নল-অংশটা ঢুকিয়ে সত্যিকার চাবি দিয়ে তালা বন্ধ করে রাখা হচ্ছে প্রতিদিন। চাবি স্বামীর জিম্মায়। অন্য কোনও পুরুষাঙ্গ যেন ওই যৌনাঙ্গে প্রবেশ করতে না পারে সে কারণেই এই তালা চাবির আয়োজন। স্বামীর প্রয়োজনে স্বামী স্ত্রীর যৌনাঙ্গের তালা খোলে। এই খবরটা যখন পড়ি, আমার মনে পড়ছিল অন্ধকার যুগে ইওরোপের মেয়েদের শরীরে লোহার তৈরি সতীত্ব-বন্ধনী বা চেস্টিটি বেল্ট লাগানো হত। দুর দুরান্তে যাওয়ার আগে স্ত্রীদের যৌনাঙ্গে ভারী চেস্টিটি বেল্ট নামক লোহার খাঁচা পরিয়ে যেত স্বামীরা। স্ত্রীরা ওই লোহার খাঁচা খুলতে পারতো না যতক্ষণ না স্বামী এসে ওটির তালা খোলে। স্ত্রীর যৌ নঙ্গের মালিক স্ত্রী নয়, মালিক স্বামী। স্ত্রীরা ছিল পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি যে যেভাবে পারে রক্ষা করে। যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা সেই অন্ধকার যুগে মেয়েদের যৌনাঙ্গে তালা লাগাতো, সেই একই মানসিকতা নিয়ে ইনদো রএর লোক তার স্ত্রীর যৌনাঙ্গে তালা লাগিয়েছে। সেই যুগ এবং এই যুগের মাঝখানে বেশ কিছু শতাব্দী পার হয়েছে, কিন্তু মানসিকতার কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। ঘটনা জানার পর লোকটিকে লোকে ছিছি করেছে, মাথা-খারাপ, বদমাশ ইত্যাদি বলে গালি দিয়েছে। অনেকে স্তম্ভিত, কারণ এরকম ঘটনা এ যুগে ঘটে না। তা ঠিক, সত্যিকার তালা লাগানোর ঘটনা ঘটে না, কিন্তু যে মানসিকতা তালা লাগায়, সেই মানসিকতাই সবার চারপাশে, সেই মানসিকতার লোকই আজকের সমাজ চালাচ্ছে। আসলে, তালা দৃশ্যমান হলেই লোকের আপত্তি। অদৃশ্য তালাতে কিন্তু কারও আপত্তি নেই।

নারী শুধু তার স্বামীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, পুরো সমাজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। নারী বিয়ের আগে কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করবে কি না, বিয়ের পর কার সঙ্গে কিভাবে চলবে, কত রাত অবদি বাইরে থাকবে, কাদের সঙ্গে মিশবে, কাদের সঙ্গে মিশবে না, কার সঙ্গে হাসবে, কার সঙ্গে হাসবে না, বাড়িতে কে কে আসবে, কে কে আসবে না, কার সঙ্গে শোবে, কার সঙ্গে শোবে না, এ গুলো শুধু স্বামী বা পরিবার নয়, পুরো সমাজই বলে দেয়, বুঝিয়ে দেয়, বুঝতে একটু সমস্যা হলে আঙুল তুলে শাসিয়ে যায়। নারীর পান থেকে চুন খসলে চারদিকে অস্ত্র হাতে সৈন্যরা দাঁড়িয়ে থাকে হয় পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলার জন্য, নয়তো একঘরে করার জন্য, নয়তো ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য।

অদৃশ্য তালা সমাজের প্রতিটি মেয়ের যৌনাঙ্গে। যে মানসিকতা সতীত্ব বন্ধনী বা দৃশ্যমান তালা পরাতে মেয়েদের বাধ্য করতো, সেই মানসিকতাই আজ অদৃশ্য তালা পরাতে বাধ্য করে। তালা দেখা যায় না, কিন্তু তালা আছে। এই অদৃশ্য তালা যদি সমাজের কোনও মেয়ের যৌনাঙ্গে না থাকে, তাহলেই বরং তুলকালাম কাণ্ড ঘটে। সেই মেয়েকে সমাজে কেউ মেনে নেয় না যদি যৌনাঙ্গের অদৃশ্য তালাটি যথাস্থানে লাগানো না থাকে। এই অদৃশ্য তালার নাম পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্র। পিতৃতন্ত্র বা পু রুষতন্ত্রের খাঁচায় নারীরা বন্দি, পারিবারিক এবং সামাজিক শেকলে নারী বন্দি, তার জন্য তাই আলাদা করে লোহার খাঁচা বা লোহার তালা বানাতে হয় না। পুরুষতন্ত্রর খাঁচা বাহ্যিক লোহার খাঁচা বা তালা বা শেকলের চেয়ে অনেক বেশি মজবুত, অনেক বেশি শক্তিশালী। লোহার খাঁচা ভাঙা সহজ, পুরুষতন্ত্রের শেকল ভাঙা অনেক কঠিন। এই পুরুষতন্ত্রে পুরুষের ভূমিকা হল, প্রভু, কর্তা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক, ভোগ করার মালিক। মেয়েদের ভূমিকা হল, পুরুষের দাসী, পুরুষের যৌনবস্তু আর পুরুষের। সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র। এটাই মূল ভূমিকা, নানারকম কায়দা কানুন করে, রং চং লাগিয়ে একে দেখতে ভিন্ন করা হয় বটে, কিন্তু যারা জানে, তারা জানে কাঠামোটাই দাঁড়িয়ে আছে বৈষম্যের ওপর। কাঠামোতেই যদি গলদ থাকে, তাহলে তার ওপর টাওয়ার বানানো হলে সেই টাওয়ারে ফাঁকি থাকে। ফাঁকি দিয়ে জীবন যাপন করা হচ্ছে। যার সঙ্গে সারাজীবন বাস করছো, তার সঙ্গেই প্রতারণ? কোনও প্রজাতি কি আছে যে নিজের প্রজাতিকে শুধু যৌনাঙ্গ ভিন্ন হওয়ার কারণে তাকে ঠকিয়ে, প্রতারিত করে, তার মানবাধিকার আর স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে নিজে মজা লোটে, সুখ করে? শুধু সে মেয়ে বলে? মুলে সমস্যা আর আমরা চাই বাইরেরটা গোছাতে, ওপরটা সুন্দর করতে, ওপরটা ঝকঝকে করতে। তাতে আসলে কাজ হয় না বলে। আজও নারীর বিরুদ্ধে একটি বৈষম্যরও বিলুপ্তি হয়নি। এখনও মেয়েরা যৌন দাসী, এখনও মেয়েরা যৌন পাচারের শিকার, এখনও গৃহহিংসা, অনার কিলিং, ধর্ষণ, গণ ধর্ষণ, কন্যাশিশু হত্যা, কন্যা-ভ্ৰূণ হত্যা, এসিড নিক্ষেপ, যৌতুক প্রথার শিকার। পণ দিতে অক্ষম হলে ঘরে ঘরে বধু পোড়ানো, বধু হত্যা চলছে– নারী বিরোধী কোনও নৃশংসতাই বিলুপ্ত হয়নি সমাজ থেকে।

অনেকে বলে নারী শিক্ষিত হলেই নাকি নারীর সমস্যা ঘুচে যাবে। কিন্তু দেখা গেছে, শিক্ষিত নারী পুরুষতন্ত্রের নিয়মাবলি যত ভালো ভাবে শিখতে পারে, তত ভালো ভাবে অশিক্ষিত নারী পারে না। শেখার ক্ষমতা শিক্ষিতদের বেশি। শিক্ষিত মেয়েদের বিয়ে হলে ঠিক ঠিক তো বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে। অশিক্ষিত, দরিদ্র মেয়েরা যেমন যায়। নিজের নামের পদবী ফেলে দিয়ে স্বামীর পদবী লুফে নিচ্ছে শিক্ষিত নারীরা। ছেলেমেয়েদের জন্য পিতার পদবী, মায়ের নয়। এর অর্থ, মহিলা এবং তার সন্তানেরা পুরুষ স্বামীর অধীনস্থ। মহিলা এবং তার সন্তানের মালিক পুরুষটি। পিতৃতান্ত্রিক নিয়মে একটি মেয়েকে থাকতে হবে শিশুকালে তার পিতার অধীনে, বিয়ের পর স্বামীর অধীনে, আর বৃদ্ধ বয়সে পুত্রের অধীনে। শাস্ত্রেও এ কথা লেখা আছে। ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমতি, স্বাধীনতায় নারীর কোনও অধিকার নেই।

নারীকে পুরুষতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী সারাজীবন পুরুষের অধীনে থাকতে হবে। তার নিজস্ব স্বকীয়তা বলে কিছু থাকতে পারবে না। এই হল সমাজের নিয়ম, এই নিয়মটাকে অক্ষত রেখে নারীর জন্য লেখাপড়া শেখা আর কাজ করে টাকা রোজগার কাটা মেনে নেওয়া হয়েছে ইদানিং, কিন্তু সমাজের পুরুষতন্ত্রের কাঠামোতে কোনো রকম পরিবর্তন আনতে দেওয়া হয়নি। মেয়েদের কাপড় চোপড় পাল্টেছে, একবার তারা নিজেদের আপাদমস্তক কাপড়ে ঢেকে রাখতে বাধ্য হচ্ছে, আরেকবার বাধ্য হচ্ছে। সব খুলে ফেলতে। তারা সেক্সয়াল অবজেকটিফিকেশনের শিকার, সবখানে। তারা কসমেটিকস মাখছে, কারণ পুরুষতান্ত্রিক জগত মেয়েদের মুহুর্মুহু উপদেশ দিচ্ছে। পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় হতে, আকর্ষণীয় হওয়ার জন্য শরীরের মাপ কী হওয়া চাই, বুক কত, কোমর কত, নিতম্ব কত, সব বলে দেওয়া আছে, কালো আর বাদামী রংএর মেয়েদেরও বলে দেওয়া হয়েছে, তোমার রংটা খারাপ, যত সাদা হতে পারবে, তত তোমার আকর্ষণ বাড়বে। ত্বকের জন্য খারাপ এমন কেমিক্যালে বাজার ছেয়ে গেছে, ত্বকের রং উজ্জ্বল করার জন্য, ত্বকের ভাঁজ বন্ধ করার জন্য। মেয়েরা এক তাল মাংস আর মুখ-বুক-যৌনাঙ্গ ছাড়া আর কিছু না। মেয়েদের যে মস্তিষ্ক আছে, ওতে যে বুদ্ধি ধরে, তা কখনও ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয় না। মেয়েরা হল পণ্য। পণ্যদের সাজতে হয়, ঝলমলে ঝকমকে হয়ে থাকতে হয়। সেভাবেই রাখা হয় মেয়েদের। কুমারীত্ব বজায় রাখতে হবে, পুরুষতন্ত্রের কঠিন নিয়ম। সব পুরুষই আকাঙ্ক্ষা করে কুমারী মেয়ে। একবার কারও সঙ্গে কোনও মেয়ের যৌন সম্পর্ক হয়েছে, এ খবর প্রচার হলে পুরুষেরা আর বিয়ে করতে ইচ্ছুক হয় না সেই মেয়েকে। আর বিয়ের পর বজায় রাখতে হবে সতীত্ব। এই নিয়মটিই তো যৌনাঙ্গে শেকল বা তালা পরানোর নিয়ম। নারীর যৌনাঙ্গ নয় শুধু, নারীর জরায়ুর মালিকও পুরুষ। পুরুষ বা স্বামী সিদ্ধান্ত নেয় কটা সন্তান একটা মহিলা গর্ভে ধারণ করবে, এবং কোন লিঙ্গের সন্তান সে জন্ম দেবে। জরায়ু নিজের, অথচ নিজের জরায়ুর ওপরও কোনও অধিকার নেই মেয়েদের। পুরুষের যৌনাঙ্গে কোনও তালা লাগানোর নিয়ম নেই। পুরুষের জন্য বরং সারা পৃথিবীতেই খোলা হয়েছে পতিতালয়, পুরুষ যখন খুশি যৌনইচ্ছা চরিতার্থ করতে পারে। কোটি কোটি মেয়েকে ছলে বলে কৌশলে এই সমাজ পতিতা বা যৌন দাসী বানায় পুরুষ যেন তাদের ভোগ করতে পারে, পুরুষের স্ত্রী থাকুক বা না থাকুক সে। কোনও বিষয় নয়।

একসময় পুরুষরাই ঘরের বাইরে যেত, লেখাপড়া করতো, মেয়েদের সে অধিকার ছিল না। একসময় শিক্ষিত পুরুষরাই বলল, মেয়েদের লেখাপড়া করা উচিত। উনবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষিত পুরুষেরা আসলে কামনা করেছিলেন শিক্ষিত যৌনসঙ্গীর। তাদের আশা পূরণ হয়েছে। মেয়েরা লেখাপড়া শিখেছে, বিদুষী হয়েছে।

বিয়ের বাজারে শিক্ষিত মেয়ে ভালো বিকোয়। তবে শিক্ষিত হোক, অশিক্ষিত হোক, প্রায় সব পুরুষই পণ দাবি করে। শিক্ষিত এবং ধনী হলে পণ আকাশ ছোঁয়া। নারী শিক্ষা নারী নির্যাতন ঘোচাবে, নারীর বিরুদ্ধে যে বৈষম্য, তা ঘোচাবে, এ বি শ্বাসযোগ্য কথা নয়। ইস্কুল কলেজ পাশ করলেই কেউ শিক্ষিত হয় না। বেশির ভাগ মানুষ পড়ালেখা শেখে পরীক্ষায় পাশ করার জন্য, আর ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য। সচেতন হওয়ার জন্য যে শিক্ষা, সত্যিকার আলোকিত মানুষ হওয়ার জন্য যে শিক্ষা, সে শিক্ষা অন্য শিক্ষা। আমরা যদি একটা সুস্থ সুন্দর সমাজ চাই, তবে মনে রাখতে হবে সেই সমাজে নারীর সমানাধিকার থাকতে হবে, নারী ও পুরুষের সম্পর্ক প্রভু ও দাসীর সম্পর্ক নয়, সম্পর্কে বন্ধুতা, সহমর্মিতা ইত্যাদি থাকতে হবে। সমাজের তৈরি করা বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করতে হবে। কিন্তু কজন বাবা-মা কজন সন্তানকে এই শিক্ষা দিচ্ছে যে নারী আর পুরুষের অধিকার সমান?

পুরুষের শরীর পেশিবহুল, কিন্তু আমরা সমাজ, বা রাষ্ট্র বা পরিবার পেশির জোর দিয়ে চালাই না, আমরা বুদ্ধি দিয়ে চালাই। বুদ্ধি নারী ও পুরুষের কারওর কারও চেয়ে কম নয়। নারী প্রমাণ করেছে, যে কাজগুলোকে এতকাল পুরুষের কাজ বলা হত, সেই সব কাজ নারী করতে সমর্থ। (অবশ্য এখনও পুরুষ প্রমাণ দেয়নি। নারী যে কাজে পারদর্শী, বা যেসব গুণ তাদের আছে সেসব কাজে পুরুষও পারদর্শী, সেসব গুণ তাদেরও আছে, যেমন বাচ্চা লালন পালন, সংসারের রান্না বান্না, ঘরদোর পরিষ্কার, সহানুভূতিশীল হওয়া, নরম নম হওয়া, কোমল হৃদয়ের হওয়া ইত্যাদি)।

পিতৃতন্ত্র পুরুষ দ্বারা তৈরি পুরুষের আরাম আয়েস করার জন্য, প্রভূত্ব কায়েম করার জন্য একটি ব্যবস্থা। কিন্তু নারীর সাহায্য ছাড়া পিতৃতন্ত্র টিকে থাকতো না। নারীই পিতৃতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য পুরুষকে সব রকম সাহায্য করছে। আফ্রিকায়। মেয়েদের যৌনাঙ্গের অংশ অল্প বয়সেই কেটে ফেলা হয়, মেয়েরা যেন যৌন সুখ। কোনওদিন অনুভব করতে না পারে। অনেকের যৌনাঙ্গ আবার শেলাই করেও বুজিয়ে। দেওয়া হয়। অনেক মহিলাই এই কাজটা করেন। মেয়ে হয়ে নিজ হাতে মেয়েদের পঙ্গু করেন। শুধু আফ্রিকা নয়, ভারতের বহরা মুসলিমদের মধ্যেও যৌনাঙ্গ-কর্তনের রীতি আছে। এশিয়ায় ইন্দোনেশিয়া সহ আরও কিছু দেশে এই কর্তন চলছে। যৌন পাচার তো চলছেই, যৌন দাসত্ব বা পতিতাবৃত্তি চলছে, মহিলারাও মহিলাদের বিরুদ্ধে জঘন্য এই নারী পাচারে সহায়তা করছে। মহিলারা পিতৃতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে চান, কারণ তাদের মাথায় এই বিশ্বাস ছোটবেলাতেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে পুরুষ বড় জাতের আর নারী ছোট জাতের মানুষ। নারী নিতান্তই পুরুষের ভোগের সামগ্রী। এ ছাড়া অন্য কোনও পরিচয় নারীর নেই। এই জঘন্য নারীবিরোধী কূৎসিত মন্ত্র পুরুষের মাথাতেও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পিতৃতান্ত্রিক নিয়মই নারীরা মাথা পেতে বরণ করে নিয়েছে, এই নিয়মই বশংবদ ভূতের মতো পালন করছে, নারীকে অবমাননা করার, পণ্য হিসেবে ব্যবহার করার সব নিয়মে নারীও অংশগ্রহণ করছে, সব রকম ধর্মীয় সামাজিক নারী বিরোধী অনু শাসন অনুষ্ঠান মহাসমারোহে পালন করছে। শিক্ষিত স্বনির্ভর নারীরাও এতে অংশ গ্রহন করছে। তারা করছে কারণ নারীর শিক্ষা আর স্বনির্ভরতা অর্জন করার মানে তারা কখনও মনে করে না যে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। নারীরা শিক্ষা আর স্বনির্ভরতা অর্জন করছে পিতৃতন্ত্রের গণ্ডির মধ্যে বাস করে এবং শিক্ষা ও স্বনিভ রতাকে ব্যবহার করছে নারীর স্বকীয়তা বিনাশে, এবং পুরুষের স্বার্থে, পুরুষতন্ত্রের বিকাশে। নারীর তথাকথিত এই শিক্ষা আর স্বনির্ভরতা বেশির ভাগই নারীর নিজের যত উপকারে লাগছে, পুরুষের লাগছে বেশি। পুরুষরা এখন শিক্ষিত স্ত্রী পাশে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে, পুরুষের পুত্ররা শিক্ষিত স্ত্রীর কাছে লালিত পালিত হচ্ছে, স্ত্রীর উপার্জিত অর্থ স্বামীর পকেটেই বেশির ভাগ যাচ্ছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক এখনও পুরুষরাই। নারীর উপার্জিত টাকা নারী কি খাতে ব্যয় করবে, সেই সিদ্ধান্তটি বেশির ভাগ নারীই নেয় না, নেয় পুরুষ। নারীর উপার্জিত টাকা নারীর যৌনাঙ্গের মত, বা জরায়ুর মতো অনেকটা। নারীর যৌনাঙ্গ কী খাতে ব্যবহার হবে, জরায়ু কী জন্য ব্যবহার হবে, কখন ব্যবহার হবে, কার দ্বারা ব্যবহার হবে, সেই সিদ্ধান্ত যার জরায়ু সে নেয় না, পুরুষ নেয়। অনেক স্বাধীনতাই মেয়েরা পাচ্ছে, রাস্তায় যাওয়ার, ইস্কুল কলেজে যাওয়ার, অফিস আদালতে যাওয়ার, কিন্তু যৌন-স্বাধীনতা এখনও পাচ্ছে। না। কারণ ওই বন্দিত্বই নারীর সত্যিকার বন্দিত্ব। পুরুষতন্ত্র নারীর যৌনাঙ্গকে খুঁটি দিয়ে বাধে। যৌন স্বাধীনতার মানে কিন্তু কখনও যার তার সঙ্গে শুয়ে বেড়ানো নয়। যৌন স্বাধীনতার মানে নিজের পছন্দ মতো মানুষের সঙ্গে শোয়া, এবং শোয়ায় সব সময় হাঁ নয়, না বলাটাও যৌন স্বাধীনতা। বলতে চাইছি, যৌন সম্পর্কে রাজি হওয়াই যৌন স্বাধীনতা নয়, রাজি না হওয়াও যৌন স্বাধীনতা।

মোদ্দা কথা হল, যৌনাঙ্গ-বন্দিত্ব, যৌন পরাধীনতা, কন্যাভ্রণ হত্যা, শিশুকন্যা হত্যা, পণ প্রথা, পণের অত্যাচার, বধূহত্যা, যৌন দাসত্ব বা পতিতাবৃত্তি, নারী ও শিশু পাচার, ধর্ষণ কোনও রোগ বা সমস্যা নয়, এসব হল রোগ বা সমস্যার উপসর্গ। রোগের নাম পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্র। এদিকে আমরা উপসর্গ সারাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি, রোগ সারাতে নয়। রোগ না সারালে উপসর্গ কোনওদিন বিলুপ্ত হবে না, যত চেষ্টাই করি না কেন।

লিঙ্গসূত্র

তেরো বছর বয়স আমার তখন। একদিন শুনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র হঠাৎ মেয়ে হয়ে গেছে। নাম ছিল আবুল হোসেন, মেয়ে হওয়ার পর নাম হোসনে আরা। কদিন পরই লাল বেনারসি পরে হোসনে আরা বিয়ে করে ফেললো তার রুমমেটকে। ঘটনাটা আমকে খুব আলোড়িত করেছিল। খবরের কাগজে আবুল হোসেন আর হোসনে আরা ছবি পাশাপাশি ছাপা হত। আবুল হোসেন সবসময় মৌলানাদের স্কার্ফের মতো একটা স্কার্ফ পরতো, বুক আড়াল করার জন্য। ভেতরে। ভেতরে মেয়েই ছিল সে, কিন্তু জন্মের পর আত্মীয় স্বজন ভেবেছিল সে ছেলে, ভাবার নিশ্চয়ই কোনও কারণ ছিল। বড় হয়ে আবুল হোসেন বুঝতে পেরেছিল সে ছেলে নয়। লজ্জায় ভয়ে অনেক বছর কাউকে কিছু বলেনি। ছেলেদের হোস্টেলে থাকতো, সবাই তাকে ছেলে বলেই জানতো। কিন্তু একসময় অস্বস্তির চরমে পৌঁছে ডাক্তা রের শরণাপন্ন হল। ডাক্তার কী একটা অপারেশন করলেন, ব্যস, আবুল হোসেন মেয়ে হয়ে গেল। খবরটা পড়ে আমার খুব ইচ্ছে হয়েছিল হঠাৎ একদিন ছেলে হয়ে যাওয়ার। কিন্তু বুঝতাম, আবুল হোসেনের শরীরটা যেমন ভেতরে ভেতরে। মেয়ের শরীর ছিল, আমার শরীরটা ভেতরে ভেতরে ছেলের শরীর নয়। আসলে মেয়েদের ওপর পারিবারিক সামাজিক ধার্মিক রাষ্ট্রিক অত্যাচার এত বেশি হত যে ছেলেতে রূপান্তরিত হয়ে এসব থেকে বাঁচতে চাইতাম। অন্য কোনও কারণ ছিল। না। মেয়েদের পোশাক পরতাম, কিন্তু ফাঁক পেলেই ছেলেদের পোশাক পরার ইচ্ছে হত | তখনও আমাদের শহরের মেয়েদের মধ্যে ছেলেদের প্যান্টের মতো প্যান্ট পরার চল শুরু হয়নি। মনে আছে প্রথম যখন প্যান্টের কাপড় কিনে দরজির কাছে গিয়ে নিজের জন্য একখানা প্যান্ট বানানোর প্রস্তাব করলাম, দরজি বানাতে চাইল না, পরে দাদাকে দিয়ে অনুরোধ করার পর বানালো বটে, কিন্তু ছেলেদের প্যান্টের মতো সামনে চেইন দিল না, চেইন দিল কিনারে। বলার পরও পকেট দিল না প্যান্টে। প্যান্ট যদি নিতান্তই মেয়েরা পরতে চায়, তবে সেই প্যান্ট পুরুষের প্যান্টের চেয়ে ভিন্ন করে বানানোর জন্য সত্তর দশকের ময়মনসিংহে দরজিদের কায়দা কানুনের কমতি ছিল না। প্যান্ট পরাই তখন রেভুলুশান, সার্টের প্রশ্নই আসে না। অবশ্য সার্টও বানিয়েছিলাম, দরজিরা কায়দা করে ছেলেদের সার্টের চেয়ে একটু আলাদা করে বা নিয়েছিল। বুক পকেট তো দেয়ইনি, বরং বুকের ওপর অনর্থক দুতিনটে কুঁচি বসিয়ে দিয়েছিল। পরে অবশ্য দরজিকে বেশ ধমক টমক দিয়ে মেয়েদের পোশাক পুরুষের পোশাকের থেকে যে করেই হোক ভিন্ন করার ওদের দুষ্টুমিটা বন্ধ করেছিলাম। যেহেতু নিষেধ ছিল ছেলেদের পোশাকের মতো পোশাক পরা, নিষেধ ভাঙতেই ওই কাজটা করতাম। কিছু লোক নিয়ম বেঁধে দেবে কী করে হাঁটতে হবে, হাসতে হবে, কাঁদতে হবে, খেতে হবে, কী করে কথা বলতে হবে, কী বলতে হবে, কণ্ঠস্বরটা কতখানির পর আর ওঠানো চলবে না, কী পোশাকের বাইরে কী পোশাক পরা যাবে না, বাড়ি থেকে কখন বেরোতে হবে, কখন ফিরতে হবে, আর আমিও সেই নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো, কোনও প্রশ্ন করবো না, এ মানা আমার সেই কৈশোরেই আমার মনে হয়নি যে উচিত। ছেলেদের পোশাক মেয়েদের পরতে হয় না- এই উপদেশ উঠতে বসতে শুনতাম বলে ছেলেদের পোশাক পরে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, যে, ইচ্ছে করলে যা খুশি পরা যায়। আমি তখন বুঝে পাইনি, ছেলেরাও কেন মেয়েদের জন্য বরাদ্দ পোশাক পরে বুঝিয়ে দেয় না যে তারাও নিয়ম মানে না। কেন তারা স্কার্ট পরে না, শাড়ি, কামিজ পরে না? পুরুষ তো কম বিপ্লব করেনি, তবে পোশাকের এই বিপ্লবে এত আপত্তি কেন? পরে অবশ্য বুঝেছি, মেয়েদের স্থান সমাজে এত নিচে নামিয়ে রাখা হয়েছে, যে, বেশির ভাগ পুরুষ মনে করে, নিচুদের পোশাক পরা মানে নিজে নিচু হওয়া, অথবা দ্বিতীয় লিঙ্গের পোশাক পরার অর্থ প্রথম লিঙ্গকে অপমান করা। আর ওদিকে মেয়েরা যারা পুরুষের পোশাক পরে, তাদের মধ্যে অনেকেই মনে মনে এই ভেবে সুখ পায়, যে, একটু বুঝি প্রভুদের কাতারে ওঠা গেল, মানটা বাড়লো। পুরুষ ক্রস-ড্রেসারদের অনেকে ট্রান্সজেণ্ডার বা রূপান্তরকামী হলেও মেয়ে ক্রস-ড্রে সারদের অনেকেই তা নয়। পুরুষ আর নারীর সামাজিক বৈষম্য না থাকলে সম্ভবত একই পোশাক পরতো উভয়েই। হাসপাতালে, জেলখানায় উভয়ের একই পোশাক। ডাক্তারিশাস্ত্রের চোখে সব রোগী, আইনের চোখে সব অপরাধী সমান বলেই হয়তো।

পুরুষ আর নারীর শরীরে, মাঝে মাঝে মনে হয়, এক সুতোর ব্যবধান। নারীজাণ দিয়ে পুরুষের যাত্রা শুরু, মাঝপথে ওয়াই ক্রেমোজম এসে নারীকে পুরুষণে রূপান্তর করে। নারী পুরুষ দুজনের শরীরেই থাকে পুরুষ-হরমোন টেস্টোস্টেরন আর নারী-হরমোন এস্ট্রোজেন। পুরুষের শরীরে একটু বেশি টেস্টোস্টেরন আর নারীর শরীরে একটু বেশি এস্ট্রোজেন, এই যা পার্থক্য। হরমোনের পরিমাণ একটু এদিক ওদিক হলেই মেয়েকে দেখতে লাগবে ছেলের মতো, ছেলেকে মেয়ের মতো। চাইলে হরমোন কিন্তু আরও ভয়ংকর ভয়ংকর কাণ্ডও করতে পারে। পুংলিঙ্গ আর স্ত্রীলিঙ্গ উল্টে পাল্টে ফেলতে পারে। লিঙ্গ অত সহজ নয়, যত সহজ বলে একে ভাবা হয়। লিঙ্গ শুধু শারীরিক নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিকও। অধিকাংশ লোক ভাবে, জগতের সব সুস্থ মানুষই বুঝি শরীরে পুরুষ, মনেও পুরুষ, অথবা শরীরে নারী, মনেও নারী। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। ব্যতিক্রমটা বুঝতে হলে জেণ্ডার বা মনোলিঙ্গ বুঝতে হবে। শরীরে যেমন লিঙ্গ থাকে, মনেও একধরনের লিঙ্গ থাকে, লিঙ্গবোধ থাকে। যাদের জৈবলিঙ্গের সঙ্গে মনোলিঙ্গের কোনও বিরোধ নেই, তারা সিসজেণ্ডার। জগতের সবাই সিসজেণ্ডার নয়, অনেকে ট্রান্সজেণ্ডার, সিসজেণ্ডারের ঠিক উল্টো। পুরুষের শরীর নিয়ে জন্মেছে, কিন্তু মনে করে না যে সে পুরুষ, মনে করে সে নারী, আবার ওদিকে নারীর শরীর নিয়ে জন্মেছে, কিন্তু মোটেও সে বিশ্বাস। করে না যে সে নারী, তার দৃঢ় বিশ্বাস সে পুরুষ। এই ট্রান্সজেণ্ডারা বা রূপান্তরকা মীরা নড়নচড়নহীন রক্ষণশীল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পেইন ইন দ্য অ্যাস। এদের দুর্ভোগ প্রতি পদে পদে। প্রচলিত ধ্যানধারণার বাইরে গেলে সবাইকেই অবশ্য দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

ধরা যাক, জন্মানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শরীরে পুরুষাঙ্গের উপস্থিতি দেখে বাবা মা বা ডাক্তাররা রায় দিয়ে দিলেন, সন্তান ছেলে, পরিবারের এবং সমাজের সকলে জানলো যে সে ছেলে, কিন্তু নিজে সে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে আর অনুভব করতে থাকে যে সে ছেলে নয়, সে মেয়ে। সে যখন নিজেকে মেয়ে ভেবে মেয়েদের সাজ-পোশাকে বাইরে বেরোয়, এবং সত্য কথাটা প্রকাশই করে ফেলে যে পুরুষের শরীর সে ধারণ করছে বটে, কিন্তু সে আসলে পুরুষ নয়, সে মেয়ে, লোকেরা তাকে হাস্যরসের বস্তু ভাবে, সার্কাসের ক্লাউনের চেয়েও বড় ক্লাউন ভাবে, চিড়িয়াখানার চিড়িয়া ভাবে, তাকে শেকলে বাঁধে, পাগলা গারদে বন্দি করে। লোকেরা কেউ ছি ছি করে, কেউ বিদ্রাপ ছোঁড়ে, কেউ গালি দেয়, ন্যাংটো করে, পেটায়। কেউ কেউ জন্মের মার মেরে তার মাথার ভুত তাড়াতে চায়। মাথার ভুত মাথা ছেড়ে কিন্তু এক পা নড়ে না। মাথার লিঙ্গ মাথা কামড়ে পড়ে থাকে।

মেয়েরা ছেলেদের মতো আচরণ করলে আজকাল তবু সহ্য করে মানুষ, কিন্তু ছেলেরা মেয়েদের মতো আচরণ করলে আজও অধিকাংশ মানুষ সহ্য করে না। দ্বিতীয় লিঙ্গ প্রথম লিঙ্গকে অনুকরণ করে করুক, কিন্তু প্রথম লিঙ্গের লিঙ্গাভিমান এমনই যে, দ্বিতীয় লিঙ্গের কিছু অনুকরণ করার মানে দাঁড় করায় প্রথম লিঙ্গের অপমান। মেয়েরা দিব্যি ছেলেদের মতো পোশাক পরছে, ব্যবসাবাণিজ্য করছে, ছেলেদের মতো। মদগাঁজা খাচ্ছে, মোটরবাইক চালাচ্ছে, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়র, বিজ্ঞানী বৈমানিক হচ্ছে, নেতা মন্ত্রী হচ্ছে, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করছে, মানুষ খুন করছে। আর, ওদিকে, ছেলেরা। চোখে সামান্য একটু কাজল, ঠোঁটে একটুখানি লিপস্টিক আর মেয়েদের মতো জামা জুতো পরলেই সমাজের ভিত কেঁপে ওঠে।

মানুষ তার নিজের জীবনটা যাপন করবে, নাকি নিজের যৌন পরিচয়কে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করার যুদ্ধই করে যাবে সারা জীবন? নিজের যৌনপরিচয় দেবার ভার নিজের কাছে থাকলে উটকো অনেক ঝামেলা থেকে বাঁচে মানুষ। তুমি নিজেকে যে লিঙ্গের মানুষ বলে মনে করছে, কেউ মানুক বা না মানুক, সেটাই তোমার সত্যিকারের লিঙ্গ পরিচয় বা যৌন পরিচয়।

কোনও পুরুষ যদি বলে সে নারী, অথবা কোনও নারী যদি বলে সে পুরুষ অথবা কোনও নারী বা পুরুষ যদি বলে সে নারীও নয় পুরুষও নয়, পাগল সন্দেহ না করে তাকে বরং আমাদের বিশ্বাস করা উচিত। কারণ একমাত্র সেই মানুষটাই জানে সে কী। আমাদের সমাজ এখনও নারী আর পুরুষের ভাঙা-ভোঁতা সংজ্ঞা খাড়া করে। জোর গলায় বলে, যাদের শরীরে এক্স এক্স ক্রোমোজম, তারা কেউ পুরুষ হতে পারে না, আর যাদের শরীরে এক্স ওয়াই, তারা কেউ নারী হতে পারে না? কেন হতে পারে না, শুনি? নিশ্চয়ই হতে পারে। কোনও ক্রোমোজম আর কোনও জৈবলিঙ্গের ওপর মনোলিঙ্গ নির্ভর করে না। শরীরের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে না, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, ডাক্তার বদ্যি তাকে কী লিঙ্গে চিহ্নিত করলো, তার ওপরও নির্ভর করে না। জেণ্ডার বা মনোলিঙ্গ সেক্স বা জৈবলিঙ্গের চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেটে ছিঁড়ে মাড়িয়ে পুড়িয়ে গলিয়ে থেতলে আর যে লিঙ্গকেই দূর করা যাক, মনের লিঙ্গকে করা যায় না। জৈবলিঙ্গটা শরীর, মনোলিঙ্গটা আইডেনটিটি, প্রেজেনটেশন, সেল্ফ এক্সপ্রেশন,ইন্টারপারসোনাল সম্পর্ক, সোশিয়-কালচারাল রোল।কোনও মেয়ে তার নিজের শরীরের দিকে তাকালেই যদি দেখে শরীরটা অন্য কারো, শরীরটা অচেনা, অদ্ভুত, শরীরটা পুরুষের, যে শরীরটা তার শরীর হলেও তার শরীর নয়, শরীরটাকে নিজের বলে ভাবতে তার অস্বস্তি হয়, কষ্ট হয়, যন্ত্রণা হয়, এ শরীর তাকে শুধুই দুঃসহবাস দেয়, তবে কী করবে সে? গুমরে গুমরে একলা ঘরে কাঁদবে সারা জীবন? দরজা বন্ধ করে সকলের চোখের আড়ালে পুরুষের পোশাক খুলে নারীর পোশাক পরে চোরের মত নিজেকে দেখবে আয়নায়, বছরের পর বছর? বন্ধ দরজাটা খুললেই বা সত্য উচ্চারণ করলেই লোকের লাঞ্ছনা গঞ্জনা সইতে হবে তাকে। এ কার দোষ, তার, নাকি যারা বাস্তবকে মেনে নেয় না, তাদের? এ তাদের দোষ, যারা প্রকৃতির এক রূপকে স্বীকার করে, আরেক রূপকে করে না, যারা মনে করে দুনিয়াতে সিসজেন্ডারই বা অরূপান্তরকামীরাই সত্য, ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামীরা নয়, যারা মনে করে নারী ও পুরুষের যৌনআকর্ষণই সঠিক যৌন আকর্ষণ, বাকি সব যৌন আকর্ষণ ভুল, মিথ্যে।

তুমি ট্রান্সজেণ্ডার, রূপান্তরকামী। তুমি লিঙ্গ পরিবর্তন করে এখন ট্রান্সসেক্সয়াল হয়েছো। তুমি সাজতে ভালোবাসো, গয়না পরতে ভালোবাসো, মেয়েদের পোশাক পরতে পছন্দ করো, পুরুষের সঙ্গে শুতে পছন্দ করো, তাই বলে কিন্তু তুমি লিঙ্গ পরি বর্তন করোনি। তুমি লিঙ্গ পরিবর্তন করেছো, কারণ তুমি মূলত নারী, তুমি তোমার মতো করে তোমার নারীত্বকে প্রকাশ করেছো। তোমার জেণ্ডার নারীর, তোমার শরীরটা দেখতে আকাশ বাতাস হাতি ঘোড়া এক্স ওয়াই যা কিছুই হোক না কেন, তুমি মনে প্রাণে, অন্তরে বিশ্বাসে নারী। যৌনসম্পর্কের জন্য পুরুষকে পছন্দ না করে, তুমি কোনও মেয়েকেও পছন্দ করতে পারতে। সম্ভবত তুমি মনে মনে বিষমকামী বা হেটারোসেক্সয়াল নারী বলেই পুরুষের প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করেছো। তুমি কিন্তু তোমার প্রেমিক পুরুষকে বিষমকামিতার সুখ দিতে নিজের লিঙ্গ বদলাওনি, তুমি লিঙ্গ বদলেছো কারণ তোমার ভয়ংকর যন্ত্রণা হচ্ছিল একটা পুরুষের শরীরকে বছরের পর বছর অকারণে বহন করতে, এ অনেকটা কাঁধে হিমালয় নিয়ে হাঁটার মতো। ভালুকের ছাল পরে প্রতিটা দিন যাপন করলে আমার ঠিক কেমন বোধ হবে, ভাবি। ট্রান্সজে গুর বা রূপান্তরকামী মানুষদের বোধহয় ঠিক সেরকমই অসহ্য অস্বস্তি হয় আর ওই ওপরের আবরণটা খোলসটা ঝামেলাটা উপদ্রবটা খুলে ফেলতে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। লিঙ্গ-বদল সব ট্রান্সরা করে না। কেউ কেউ করে। করুক বা না করুক, করার। অধিকার সবারই আছে। মানবাধিকার সবার জন্যই। জীবন একটাই, এই একটা মাত্র জীবনকে যেমন ইচ্ছে যাপন করার অধিকার সবার। লিঙ্গ যারা অক্ষত রাখতে চায় রাখুক, যারা একে কেটে বাদ দিতে চায় দিক, যে লিঙ্গকে তাদের মন বা মস্তিষ্ক নিজের লিঙ্গ বলে বিশ্বাস করে– সেই লিঙ্গকে যদি শরীরে স্থাপন করতে চায় করুক। অনা কাঙ্ক্ষিত অবাঞ্ছিত লিঙ্গের বোঝা শরীরে বহন করে জীবনভর ভোগা থেকে বাঁচুক। নারীর শরীরটাকে পুরুষের শরীর করে ফেলা, অথবা পুরুষের শরীরকে নারীর করে ফেল্লা যদি সম্ভব হয় তবে করবে না কেন? আমার শরীর নিয়ে আমি যা খুশি করবো, এতে অন্যের আপত্তি হবে কেন? শরীরটা আমার নাকি অন্যের?

লিঙ্গান্তর করে যদিও একশ ভাগ পুরুষ বা একশ ভাগ নারী হওয়া যায় না, কিন্তু যতটুকুই হওয়া যায়, তাতে যদি সুখ পায় মানুষ, সুখ পাওয়ার অধিকার তাদের একশ ভাগ।

নাতালি নামে আমার এক বন্ধু এখন আপাদমস্তক মেয়ে। কদিন আগে তার গোটা শরীরটাই ছিল পুরুষের। তার মন তার শরীরকে কখনও মেনে নেয়নি। শুধু নারীর পোশাক পরে নাতালির নারী হওয়ার সাধ মেটেনি, লিঙ্গ বদলে ফেলে সে তার সাধ মিটিয়েছে। নিজের শরীর নিয়ে যা কিছু করার অধিকার তার আছে। কাউকে কৈফিয়তই বা দিতে হবে কেন সে কী করেছে বা যা করেছে কেন করেছে? নাতালিকে মেয়ে বলে না মানা মানে নাতালিকে অশ্রদ্ধা করা, নাতালির মানবাধিকার, ট্রান্সঅ ধিকার লম্বন করা। পুরুষাঙ্গ নিয়ে জন্মেছিল, সেই পুরুষাঙ্গটির কারণে লিঙ্গান্তরিত নাতালিকে এখন পুরুষ বলে সম্বোধন করলে তাকে ঘোরতর অপমান করা হয়। ওই কাজটা আমি অন্তত করিনি। তাকে মিস্টার এক্স বলিনি, মিস নাতালি বলেই ডেকেছি। যারা লিঙ্গ বদলে নিয়েছে শুধু তাদেরই কেন, শরীরে আস্ত একটি পুরুষাঙ্গ থাকা সত্ত্বেও যারা নিজেদের নারী বলে মনে ক