বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক হওয়া খুব সহজ নয়। বাংলা ওয়াজগুলোয় মোল্লা-মৌলানারা সারাদিন মুসলমানদের উপদেশ দেয় হিন্দুদের ঘৃণা করতে, তাদের মন্দিরের মূর্তি ভেঙে ফেলতে। উপদেশ শুনতে শুনতে খুব অজান্তেই মগজ ধোলাই হয়ে যায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কী ঘটেছিল যে মানুষকে হিন্দুদের বাড়িঘর লুটপাট করতে হয়েছে, মন্দির ভাঙতে হয়েছে? ঘটনাটি হলো, রসরাজ দাস নামে এক ছেলে তার ফেসবুক একাউন্ট থেকে একটা ফটো শেয়ার করেছে, যে ফটো দেখে মুসলমানের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লেগেছে। আসলে ওই ফটো নেহাতই ফটোশপ করা ফটো। ফটোশপ করে কাবা শরীফের ছাদের ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে শিবের ছবি। রসরাজের দাবি, ফটোটি সে নিজে পোস্ট করেনি। তার অজান্তে কে বা কারা তার একাউন্ট থেকে পোস্ট করেছে সে জানে না। এজন্য সে সবার কাছে ক্ষমাও চেয়েছে। রসরাজকে কেউ ক্ষমা করেনি। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। রসরাজের ফেসবুক ভরে গেছে খুনের হুমকিতে।
কে রসরাজের আইডি হ্যাক করে ওই ছবি পোস্ট করেছিল তা সরকার চাইলে বের করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার চাইবে কি? রসরাজই বা কবে জেল থেকে মুক্তি পাবে? রসরাজের নিরাপত্তাই বা কে নিশ্চিত করবে? বাবরি মসজিদ ভেঙেছিল ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা। সেই মসজিদ ভাঙার দায়ে বাংলাদেশের নিরীহ হিন্দুদের অপরাধী বানানো হয়েছিল। রসরাজের একাউন্ট থেকে কোনও এক হ্যাকার একটি ফটোশপ করা ছবি পোস্ট করেছে। এ কারণে বাংলাদেশের সব হিন্দুকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হলো। মৌলবাদীরা এখন যে কোনও হিন্দুর ঘর ভেঙে দিতে পারে, যে কোনও মন্দির গুঁড়ো করে দিতে পারে, যে কোনও হিন্দুকে নির্যাতন করতে পারে। যে বা যারা অপরাধ করে, তারা শুধু নয়, তাদের ধর্মীয় গোষ্ঠীর সবাইকে শাস্তি পেতে হবে, এমনই যেন নিয়ম।
কয়েকজন মুসলমান সন্ত্রাসী সন্ত্রাস করলে সকল মুসলমানকে দোষ দেওয়া উচিত নয়— এ কথা বিশ্বের প্রায় সবাই বলে, এ কথা তারাও বলে যারা বলে একজন বা কয়েকজন হিন্দু দোষ করলে তার দায় সব হিন্দুকেই নিতে হবে।
ছাতকে, হবিগঞ্জে, গোপালগঞ্জের মন্দিরেও আক্রমণ হয়েছে। এই বৈষম্য দেখেই আমরা বড় হয়েছি, আমাদের নতুন প্রজন্ম বড় হচ্ছে। বাংলাদেশের হিন্দুর সংখ্যা দ্রুত কমছে। কট্টরপন্থিরা এ সংখ্যাটি সম্ভবত শূন্য না বানিয়ে ছাড়বে না। দেশে হিন্দু থাকবে না, শিয়া থাকবে না, আহমদীয়া থাকবে না, বৌদ্ধ থাকবে না, খ্রিস্টান থাকবে না, শুধু সুন্নি মুসলমান থাকবে। সুন্নি মুসলমানদের মধ্যেও বাছাই করা হয়। যারা ধর্মান্ধ নয়, তারা থাকবে না। যারা কোনও প্রশ্ন করবে তাদের জেলে ভরা হবে, মেরে ফেলা হবে অথবা দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। গণতন্ত্র বলে কিছু থাকবে না, নারীর অধিকার থাকবে না, মানুষের মত প্রকাশের অধিকার থাকবে না। আমরা নিশ্চিতই এমন একটি ঘোর অন্ধকার সময়ের দিকে যাচ্ছি।
যেদেশে মুক্তচিন্তকের, যুক্তিবাদীদের স্থান নেই, যেদেশে নারীবাদীদের লাঞ্ছিত হতে হয়, যে দেশ নারী-বিদ্বেষী অজ্ঞ অশিক্ষিত লোকদের দখলে চলে গেছে, সেদেশে রসরাজ দাস ফটোশপের ছবি পোস্ট করলেও মার খাবে, না করলেও মার খাবে। কারণ সে রসরাজ দাস। রসরাজ দাসকে যদি মুক্তি না দেওয়া হয়, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হয়, যদি হামলাকারীদের সবাইকে শাস্তি না দেয়া হয়, তবে আরও মানুষকে শুধু হিন্দু হওয়ার অপরাধে এভাবে নির্যাতিত হতে হবে। হামলাকারীরা উৎসাহ পেতে থাকবে, তাদের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে।
মানুষ মানুষকে মারছে। এসব দেখে এখন আর দুঃখ কষ্ট হয় না, এখন আর রাগও হয় না, এখন আশঙ্কা হয় এই বর্বর মানুষজাতিকে বোধ হয় একদিন বিলুপ্ত করবে ধর্মান্ধতা।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ০৩ নভেম্বর, ২০১৬
এরা কি মানুষ!
১. বাংলাদেশে পূজা নামের এক মেয়ে ধর্ষিতা হয়েছে। পূজার বয়স পাঁচ বছর। এই পাঁচ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ করেছে সাইফুল ইসলাম নামের বিয়াল্লিশ বছর বয়সী এক চার বাচ্চার বাবা। এই নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে। লোকটিকে শিশুটি ‘বড় বাবা’ বলে ডাকতো। প্রতিবেশী ছিল লোকটি। হয়তো শিশুটি সাইফুল ইসলামের কন্যাদের খেলার সাথী ছিল। যতদূর জানি শিশু-ধর্ষণের সত্তরভাগই ঘটায় পরিবারের পুরুষ, নিকটাত্মীয়, অথবা পাড়াতুতো কাকা-জ্যাঠা-ঠাকুরদা, অথবা চেনা কোনো লোক। সাইফুল ইসলাম পাড়াতুতো জ্যাঠা ছিল পূজার। এই লোকটি, আমার আশঙ্কা, তার কন্যাদেরও ধর্ষণ করেছে, ধর্ষণ করার সুযোগ যদি না পেয়েও থাকে, তাহলে ধর্ষণ করার সুযোগ খুঁজেছে, সুযোগ না পেয়ে মনে মনে প্রতিদিনই ধর্ষণ করেছে। মেয়েদের ‘নিরাপত্তা’ বলতে কিছু আর নেই পৃথিবীতে।
বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছায়নি এমন শিশুদের প্রতি যদি কারো যৌন আকর্ষণ থাকে, তাহলে তাকে ইংরেজিতে ‘পিডোফাইল’ বলা হয়। পিডোফাইলের কোনো বাংলা আছে কিনা জানি না, আমিই বাংলাটা আপাতত করে নিচ্ছি— শিশুধর্ষণেচ্ছুক। নারীর চেয়ে পুরুষেরাই বেশি শিশুধর্ষণেচ্ছুক।
শুধু পিডোফাইল-ই নয়, সমাজে হেবেফাইল, এফেবোফাইল-ও আছে। হেবেফিলিয়া মানে ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের প্রতি যৌন আকর্ষণ। এফেবোফিলিয়া মানে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের প্রতি যৌন আকর্ষণ। হেবেফিলিয়াকে না হয় বাংলায় ছোট কিশোরী ধর্ষণেচ্ছা, আর এফেবোফিলিয়াকে বড় কিশোরী ধর্ষণেচ্ছা বলছি। এখন প্রশ্ন হলো, এই যে পুরুষেরা শিশু কিশোরীদের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করে, কেন করে, এবং এরা কারা?
