আমি জানি পুরুষেরা বলবে, ‘সব পুরুষ এক নয়’। আমি নিশ্চিত বদরুলও বলেছে এমন কথা। বলেছে সব পুরুষ এক নয়। তা ঠিক সব পুরুষ এক নয়, সব পুরুষ রাস্তাঘাটে ধর্ষণ করছে না বা খুন করছে না। অনেকে যে ইচ্ছে করেই করছে না তা নয়। অনেক পুরুষই ধর্ষণ করার বা খুন করার সুযোগ পাচ্ছে না বলেই করছে না। কিন্তু যদি রাগ ওঠে, বদরুলের মতো হঠাৎ রাগ, তাহলে কিন্তু অনেকেই করে ফেলতে পারে। কে ফেলবে, কে ফেলবে না কেউ বলতে পারে না। আমরা পারি না। আমরা পারি না বলে আমরা চাই না আমাদের ওপর কোনো পুরুষ রাগ করুক। সব পুরুষকেই খুশি রাখতে চাই আমরা। ঘরের পুরুষকে তো বটেই, বাইরের পুরুষকেও। পুরুষদের খুশি না রাখলে আমাদের লাইফ সাপোর্ট বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা তাই নারীর ওপর বিভিন্ন কারণে অখুশি হলেও পুরুষদের ওপর কোনো কারণেই অখুশি হই না। আমরা নারীকে গালি দিলেও পুরুষকে গালি দিতে ভয় পাই। গালি দিলে পুরুষেরা আমাদের জীবন পুরো নরক করে দেবে। নারীদের নরক করার শক্তি অতটা নেই বলে নারীর বিরুদ্ধে প্রায়ই খড়গহস্ত হই।
পুরুষেরা যা চায়, আমরা তাই করি। তারা যখন চায় না আমরা লেখাপড়া শিখি, আমরা লেখাপড়া শিখি না, তারা যখন চায় আমরা ইস্কুলে যাই, আমরা ইস্কুলে যাই, তারা যখন চায় না আমরা চাকরি-বাকরি করি, আমরা চাকরি-বাকরি করি না, তারা যখন চায় করি, আমরা করি। যা কিছুই আমরা করি, পুরুষেরা রাজি বলেই করি। যা কিছুই করা থেকে আমরা নিজেদের বিরত রাখি, পুরুষেরা চায় না বলেই রাখি। আমরা তাদের ক্রীতদাসী। ক্রীতদাসী শব্দটা শুনতে খারাপ শোনায় বলে আমরা বিভিন্ন নামে নিজেদের ডাকি, নিজেদের আমরা পুরুষের মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা, বান্ধবী, প্রতিবেশী,পরিচিতা ইত্যাদি বলে ডাকি।
পুরুষেরা আমাদের কাছে যা চায়, তা যদি আমরা না করি, তাহলে আমাদের কী হাল হয়, তা নিশ্চয়ই আমরা সবাই জানি। আমরা নির্যাতিত হবো, আমরা নির্বাসিত হবো। আমরা ধর্ষিতা হবো, খুন হবো। অথবা আমাদের আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হবে। আমি আজ নির্বাসিত, কারণ পুরুষের এঁকে দেওয়া সীমা আমি লঙ্ঘন করেছি। আমি সেসব কথা বলেছি, যেসব আমার বলার কথা নয়। আমি নারীর অধিকারের দাবি করেছি, পুরুষের তৈরি ধর্মগুলো মানবো না বলে ঘোষণা দিয়েছি। আমি আজ নির্বাসিত, কারণ আমি পুরুষের অবাধ্য হয়েছি।
আমি জানি অনেকে বলবে, কই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তো নারী, বিরোধী দলের প্রধানও নারী, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীও নারী। কে বলেছে নারীর সুযোগ-সুবিধে নেই? আমি কিন্তু বলি, ওঁরা নারী নন। যে যাই বলুক, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম আসলে শেখ মুজিবুর রহমান, বিরোধী দলের প্রধানের নাম হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর নাম জিয়াউর রহমান।
আমি যখন খাদিজাকে কোপানোর ভিডিওটা দেখছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল খাদিজাকে নয়, আমাকে কোপানো হচ্ছে। বদরুল নামের ছেলেটির প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হইনি বলে আমাকে কুপিয়ে মেরে ফেলছে বদরুল। যদি রাজি হতামও, যদি বদরুলের সঙ্গে প্রেম করতাম অথবা তাকে বিয়ে করতাম, তাহলেও কোপাতো। আমাকে সংসারের খাঁচায় বন্দী করতো। প্রতিদিন আমার ইচ্ছেগুলোর ওপর কোপ পড়ত।
বদরুল জানে মেয়েদের মারলে শাস্তি পেতে হয় না, তাই মেরেছে। প্রতিদিন মেয়েরা মার খাচ্ছে পুরুষের হাতে, কোনও পুরুষই শাস্তি পাচ্ছে না। স্বয়ং ঈশ্বরই বলে দিয়েছেন মেয়েদের ঘাড়ের রগ একটু ত্যাড়া, ওদের শাসন করতে হয়, কথা না শুনলে মারতে হয়। মেয়েরা ঘরে বাইরে প্রতিদিনই মার খাচ্ছে। মার খাওয়াটা তাদের অনেক আগেই গা সওয়া হয়ে গেছে। বদরুল ঈশ্বরের উপদেশ মেনেই মেরেছে। অথবা সমাজের প্রথা মতোই মেরেছে। কিন্তু মারটা নিয়ে মিডিয়া চিৎকার করেছে বলেই মারের বিরুদ্ধে কিছু মানুষ জড়ো হয়েছে। এটা নিয়ে মিডিয়া চুপ হয়ে গেলে মানুষ ভুলে যাবে খাদিজাকে, বদরুল মুক্তি পেয়ে আরও মেয়েদের কোপাতে থাকবে, শারীরিক না হলেও মানসিক। কত শত মেয়েকে কত শত পুরুষেরা নির্যাতন করেছে, এখনো করছে। পৃথিবীর কত কিছু ওলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে, শুধু মেয়েদের ওপর পুরুষের আধিপত্যেরই কোনো হেরফের হয়নি। সম্ভবত এটি থেকেই যাবে পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত। অথবা একটা সময় আসবে, যখন মেয়ে বলে কিছু আর থাকবে না। পৃথিবীজুড়ে শুধু থাকবে পুরুষ, পুরুষ আর পুরুষ।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২০ অক্টোবর, ২০১৬
সত্য বললে বিপদ
সৈয়দ শামসুল হক মারা যাওয়ার পর আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম,— “সৈয়দ শামসুল হক মারা গেছেন ৮১ বছর বয়সে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মান, সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, প্রচার, জনপ্রিয়তা, সরকারি-বেসরকারি পুরস্কার— সবই পেয়েছেন তিনি। একজন লেখকের যা যা কাঙ্ক্ষিত থাকতে পারে, তা পাওয়া হয়ে গেলে তাঁকে সফল বা সার্থক লেখকই বলা যায়। সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে আটের দশকের শেষদিকে ভালো যোগাযোগ ছিল আমার। মাঝে মধ্যে ময়মনসিংহে গেলে আমার সঙ্গে দেখা করতেন। একবার আমার সাহিত্য সংগঠন ‘সকাল কবিতা পরিষদ’-এর অনুষ্ঠানে তাঁকে বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনি গিয়েছিলেন। ভালো বক্তৃতা করেছিলেন। সেসময় আমার সাহিত্যচর্চার বেশ খবর নিতেন তিনি। আমার লেখা কবিতাগুলো মন দিয়ে পড়তেন, মন্তব্য করতেন। তিরিশ বছরের বড় ছিলেন, আমাকে কন্যার মতো স্নেহ করেন বলতেন।
