মনে আছে একবার স্টকহোম শহরে আমি এক বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছি, আমি পুলিশের বুলেটপ্রুফ গাড়ি চড়ে গিয়েছি, আমার সামনে পেছনে পুলিশের গাড়ি, দশ-বারো জন পুলিশ সঙ্গে। আর সুইডেনের আইনমন্ত্রী ওই বাড়িতেই নেমন্তন্ন খেতে গেছেন সাইকেল চালিয়ে। পরে পরিচয় হওয়ার পর আমি অবাক হয়ে বললাম, আপনি মন্ত্রী হয়ে সাইকেলে এলেন, আর আমি এলাম বুলেটপ্রুফ গাড়িতে! আইনমন্ত্রী আমার অবাক হওয়া দেখে অবাক হলেন, বললেন, আপনার জীবনে থ্রেট আছে, আমার নেই। সুতরাং পুলিশ আপনার দরকার, আমার নয়। আমি প্রশ্ন করলাম, তাহলে গাড়িতে না এসে সাইকেলে এলেন কেন? উনি বললেন, বায়ু দূষণ এড়াতে। তখন বুঝিনি, এখন বুঝি বায়ু দূষণ কী মারাত্মক ব্যাপার। মানুষের এই সচেতনতার কারণে কলকারখানার দেশ হয়েও বায়ু দূষণ নেই সুইডেনে।
আমি এক সময় সিগারেট খেতাম। সিগারেট ছেড়েছি অকাল মৃত্যু চাই না বলে, ছেড়েছি দীর্ঘকাল বাঁচার জন্য। এখন মনে হচ্ছে এই দিল্লি শহরেই যদি থাকি, তবে সিগারেট ছেড়ে লাভ কী হলো! ওই পলুশান-ই তো খাচ্ছি। সিগারেট খেলে যত খেতাম পলুশান, তার চেয়ে বেশি খাচ্ছি এই দূষিত বাতাস থেকে।
বাঁচতে হলে দিল্লি ছাড়তে হবে। এই শহরে সুইডিশ আইন মন্ত্রীর মতো মানুষ একটিও নেই। এরা নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলে গর্ব করে, দেশপ্রেমিক বলে গর্ব করে, কিন্তু দেশকে দূষণমুক্ত করতে নিজেদের আরাম-আয়াশে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। আমি একা ছাড় দিয়ে এ শহরের বাতাসকে বিশুদ্ধ করতে পারব না।
সোর্স : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১০ নভেম্বর, ২০১৬
লজ্জা বইটি এখনও নিষিদ্ধ কেন?
‘লজ্জা’ বইটি লিখেছিলাম ২৩ বছর আগে। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর কবে থেকে অত্যাচার হচ্ছে, কী করে হচ্ছে, কেন হচ্ছে— লিখেছিলাম। বইটি সরকার নিষিদ্ধ করেছিল, বলেছিল হিন্দুদের ওপর কোনো অত্যাচার হয় না, কিন্তু অত্যাচার হয় দাবি করে যা লিখেছি, তা সম্পূর্ণ মিথ্যে। খালেদা জিয়ার সরকার লজ্জা নিষিদ্ধ করেছিল, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে সাধারণত খালেদা যা করেন, তার উল্টোটা করেন, কিন্তু লজ্জা থেকে নিষেধাজ্ঞা তিনি তোলেননি। লজ্জায় কি আমি ভুল কোনো তথ্য দিয়েছি? লজ্জা তথ্যভিত্তিক উপন্যাস। বইটির কোনো একটি তথ্য ভুল, তা আমার কোনো ঘোর শত্রুও কোনোদিন বলেনি।
লজ্জা আজো বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো মানবাধিকার সংগঠন, কোনো লেখক সংস্থা, কোনো ব্যক্তি—কেউই এই বইটির ওপর থেকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য আদালতে যায়নি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে লেখা এই বইটি কেন একটি ‘নিষিদ্ধ বই’ হিসেবে চিহ্নিত হবে? যারা বইটি নিষিদ্ধ করেছিল ১৯৯৩ সালে, তারা এই সত্যটির সামনে দাঁড়াতে চায়নি যে তারা দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা এই সত্যটি শুনতে চায়নি যে তাদের পুলিশ চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল যখন সন্ত্রাসীরা হামলা করেছিল নিরীহ মানুষের ওপর।
‘লজ্জা’য় যেসব লজ্জাজনক ঘটনার কথা লিখেছি, সেসব আজো ঘটছে। আজো হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, মন্দির ভাঙা হয়, আজো হিন্দুরা নিরাপত্তাহীনতায় কুঁকড়ে থাকে নিজ-দেশে, আজো তারা দেশ ত্যাগ করে ভয়ে।
দু’দিন আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রায় তিনশ’ হিন্দু-বাড়িতে হামলা চালিয়েছে মুসলিম মৌলবাদীরা, শতাধিক হিন্দুকে আহত করেছে। নিরীহ অনেকের যা কিছু সম্বল ছিল নিয়ে গেছে। যে হিন্দুরা মার খেলো, আহত হলো, কী অপরাধ তারা করেছিল? শতাধিক হামলাকারী যখন হিন্দুদের বাড়িঘরের দিকে এগোচ্ছিল, হিন্দুরা আশঙ্কায় কুঁকড়ে ছিল। তারা কী অপরাধ করেছিল? কেন এদেশের মানুষকে তটস্থ থাকতে হবে এদেশেরই মানুষের ভয়ে? শুধু ধর্ম-বিশ্বাসটা ভিন্ন বলে কেন বছরের পর বছর তারা নির্যাতিত হবে? ভিন্ন তো মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাসও, সামাজিক, অর্থনৈতিক, শৈল্পিক বিশ্বাসও। এই ভিন্নতার কারণে কাউকে তো এত ভুগতে হয় না যত ভুগতে হয় ধর্মের ভিন্নতার কারণে। ধর্ম মানুষকে ভালবাসা না শিখিয়ে তবে কি ঘৃণা শেখায়? এরকম কি কোনো ব্যবস্থা আছে যে ধর্ম যা কিছুই শেখাক, আমরা মানুষকে ভালবাসতে শেখাবো! জগতের সব মানুষের আদর্শ, আকাঙ্ক্ষা, রুচি, স্বপ্ন এক নয়। সমাজের বিভিন্ন মানুষের মনে বিভিন্ন বিশ্বাস। কিন্তু বছর যায়, যুগ যায়, শতাব্দী যায়— তারপরও কেন ধর্ম-বিশ্বাস ভিন্ন হলে মানুষ ঘৃণা করে, ক্ষতি করে, হত্যা করতেও দ্বিধা করে না? মানুষ কি চিরকালই এমন বর্বর? বর্বর হলেও বর্বরতার তো শেষ হয় একদিন। একদিন তো মানুষ সভ্য হয়। কেন সভ্য, শিক্ষিত, সচেতন হতে বাংলাদেশের মানুষের এত দীর্ঘ সময় লাগে!
শুনে খানিকটা আশ্বস্ত হয়েছি যে কিছু হামলাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরকম আশা করতে ভালো লাগে যে তারা বিনা বিচারে ছাড়া পাবে না।
‘লজ্জা’ বইটি যদি নিষিদ্ধ না হতো, এটি পড়ে বাংলাদেশের অনেক মানুষই গত তেইশ বছরে অসাম্প্রদায়িক হিসেবে গড়ে উঠতে পারতো। বইটি নিষিদ্ধ থাকায় সেই সম্ভাবনাটা নষ্ট হয়েছে। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে হিন্দু মৌলবাদীরা ভারতের বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার পর মুসলিম মৌলবাদীরা যে অত্যাচার চালিয়েছিল বাংলাদেশের নিরীহ হিন্দুদের ওপর, হিন্দুদের বাড়িঘরের ওপর, দোকানপাটের ওপর, সে চোখে-দেখা দৃশ্যই বর্ণনা করেছি ‘লজ্জা’য়। কত নিরপরাধ দরিদ্র মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে, কত সহস্র মানুষ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে- তাদের একটিই অপরাধ, তারা মুসলমান নয়। মানবতার মুখ থুবড়ে এমন পড়ে থাকা দেখে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বর্বর হওয়ার বদলে উদার হতে পারতো, হিন্দুদের শত্রু ভাবার বদলে বন্ধু ভাবতে পারতো, করতে পারতো ঘৃণার বদলে শ্রদ্ধা— যে শ্রদ্ধাটি মানুষের প্রতি মানুষের থাকাটা অত্যন্ত জরুরি।
