বাঙালি পুরুষ লেখকদের অনেকেই গোপনে গোপনে বহু নারীর সঙ্গে প্রেম প্রেম শরীরী খেলা খেলতে কুণ্ঠিত নন, নিজেদের জীবনকাহিনীতে সেসব ঘটনা আলগোছে বাদ দিয়ে গেলেও উপন্যাসের চরিত্রদের দিয়ে সেসব ঘটাতে মোটেও সংকোচ বোধ করেন না৷ কেউ কিন্তু এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে না৷ প্রশ্ন ওঠে, কোনও মেয়ে যদি যৌ*তা নিয়ে কথা বলে৷ সে গল্প উপন্যাসে হোক, সে আত্মজীবনীতে হোক৷ যৌ*তা তো পুরুষের বাপের সম্পত্তি৷ আমার তো পুরুষ-লেখকদের মতো লিখলে চলবে না৷ আমার তো রয়ে সয়ে লিখতে হবে৷ রেখে ঢেকে লিখতে হবে৷ কারণ আমি তো নারী৷ নারীর শরীর, তার নিতম্ব, স্তন, উরু, যোনী এসব নিয়ে খেলা বা লেখার অধিকার তো কেবল পুরুষেরই আছে৷ নারীর থাকবে কেন! এই অধিকার পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আমাকে দেয়নি, দেয়নি বলে তোয়াক্কা না করে আমি যে লিখে ফেলেছি, যত করুণ হোক, যা মর্মান্তিক হোক— আমার সে কাহিনী আমি যে অনধিকার চর্চা করেছি, তাতেই আপত্তি৷
পুরুষের জন্য একাধিক প্রেম বা একাধিক নারী সম্ভোগ চিরকালই গৌরবের ব্যাপার৷ আর একটি মেয়ে সততার সঙ্গে কাগজে কলমে নিজের প্রেম বা যৌ*তা নিয়ে যেই না লিখেছে, অমনি সেই মেয়ে বিশ্বাসঘাতিনী, সেই মেয়ে অসতী, সেই মেয়ে দুশ্চরিত্র৷ আমার আত্মজীবনীতে আমি এমন কথা বলেছি, যা বলতে নেই৷ আমি সীমা লঙ্ঘন করেছি৷ আমি বাড়াবাড়ি করেছি, আমি অশীলতা করেছি, নোংরা কুৎসিত ব্যাপার ঘেঁটেছি৷ দরজা বন্ধ করে যে ঘটনাগুলো ঘটানো হয়, পারস্পরিক বোঝাপড়ায় যে সম্পর্কগুলো হয়, সেসব নাকি বলা অনুচিত৷ সেসব নাকি বলা জরুরি নয়৷ কিন্তু আমি তো মনে করি উচিত, আমি তো মনে করি জরুরি৷ কারণ আমার সংস্কার সংস্কৃতি, ধ্যান ধারণা, বিশ্বাস অবিশ্বাস নিয়ে আজ এই যে আমি, এই তসলিমার নির্মাণ কাজে জীবনের সেইসব ঘটনা বা দুর্ঘটনাই অন্যতম মৌলিক উপাদান৷ আমি যে ভুঁইফোঁড় নই, তিল তিল করে চারপাশের সমাজ নির্মাণ করেছে তিলোত্তমার বিপরীত এই অবাধ্য কন্যার৷ নিজেকে বোঝার জন্য, আমি মনে করি, জরুরি এই আত্মবিশেষণ৷
নিজের সম্মান না হয় নষ্ট করেছি, অন্যের সম্মান কেন নষ্ট করতে গেলাম! যদিও অন্যের জীবনী আমি লিখছি না, লিখছি নিজের জীবনী কিন্তু অন্যের পারিবারিক সামাজিক ইত্যাদি সম্মানহানির বিষয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন৷ আমি ঠিক বুঝি না, নিজের মান-সম্মানের ব্যাপারে যাঁরা এত সচেতন তাঁরা এমন কাণ্ড জীবনে ঘটান কেন যে কাণ্ডে তাঁরা ভালো করে জানেন যে, তাঁদের মানের হানি হবে! আমি বিশ্বাসভঙ্গ করেছি! কিন্তু, আমি তো কাউকে প্রতিশ্রুতি দিইনি যে, এসব কথা কোনওদিন প্রকাশ করব না! অলিখিত চুক্তি নাকি থাকে৷ আসলে এই চুক্তির অজুহাত তারাই তুলছেন, গোপন কথা ফাঁস হয়ে গেলে নিজের দেবতা চরিত্রটিতে দাগ পড়বে বলে যাঁরা আশঙ্কা করছেন আর তাই চোখ রাঙিয়ে শাসিয়ে দিতে চান যে সীমানা লঙ্ঘন করলে চুক্তিভঙ্গের অপরাধে আমার শাস্তিহবে৷
আমার যদি উচিৎ মনে হয় প্রকাশ করতে যা আমি প্রকাশ করতে চাই— তবে? উচিৎ অনুচিতের সংজ্ঞা কে কাকে শেখাবে? আমার কাছে যদি অশীল মনে না হয় সে কথাটি, যে কথাটি আমি উচ্চারণ করছি— তবে? শীল বা অশীল হিসেব করার মাতব্বরটি কে? সীমা মেপে দেয়ার দায়িত্বটি কার? আত্মজীবনীতে আমি কি লিখব না লিখব, কতটুকু লিখবো, কতটুকু লিখব না, তার সিদ্ধান্তআমিই নেব! নাকি অন্য কেউ, কোনও মকসুদ আলী, কোনও কেরামত মিয়া বা পরিতোষ বা হরিদাস পাল বলে দেবে কী লিখব, কতটুকু লিখব!
সমালোচকরা আমার স্বাধীনতাকে চিহ্নিত করতে চাইছেন স্বেচ্ছাচারিতা বলে৷ আসলে আমাদের সুরুচি-কুরুচি বোধ, পাপ পূণ্য বোধ, সুন্দর অসুন্দর বোধ— সবই যুগ-যুগান্তর ধরে পিতৃতন্ত্রের শিক্ষার পরিণাম৷ নারীর নম্রতা, নতমস্তকতা, সতীত্ব, সৌন্দর্য, সহিষ্ণুতা সেই শিক্ষার ফলেই নারীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্বীকৃত৷ আমাদের সুনিয়ন্ত্রিত চেতনা কোনোও রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হতে তাই আতঙ্ক বোধ করে৷ কোনো নিষ্ঠুর বাক্য শুনলে কানে আঙ্গুল দিতে ইচ্ছা করে, ঘৃণায় ঘিন ঘিন করে গা৷ অনেক সমালোচকেরও বাস্তবে তাই হচ্ছে৷ আমি লেখক কিনা, আমার আত্মজীবনী তাও আবার ধারাবাহিকভাবে লেখার অধিকার আছে কিনা— এমন প্রশ্নও তুলেছেন৷ বস্তুত সবার, যে কোনও মানুষেরই আত্মকথা লেখার অধিকার আছে৷ এমনকি আত্মম্ভর সেই সাংবাদিকেরও সেই অধিকার আছে যিনি মনে করেন আমার হাতে কলম থাকাই একটি ঘোর অলক্ষুণে ব্যাপার৷ আমাকে দোষ দেয়া হচ্ছে এই বলে যে, আমি চরম দায়িত্বহীনতার কাজ করেছি৷ দায়িত্বহীন হতে পারি, যুক্তিহীন হতে পারি, তবু কিন্তু আমার অধিকারটি ত্যাগ করতে আমি রাজি নই৷
জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, A reasonable man adopts himself to the world. An unreasonable man persists in trying to adopt the world to himself. therefore, all progress depends upon the unreasonable man. —বুদ্ধিমান বা যুক্তিশালী লোকরা পৃথিবীর সঙ্গে মানিয়ে চলে৷ নির্বোধ বা যুক্তিহীনরা চেষ্টা করে পৃথিবীকে তার সঙ্গে মানিয়ে চলতে৷ অতএব সব প্রগতিনির্ভর করে এই যুক্তিহীনদের ওপর৷ আমি তসলিমা সেই যুক্তিহীনদেরই একজন৷ আমি তুচ্ছ একজন লেখক, এত বড় দাবি আমি করছি না যে পৃথিবীর প্রগতি আমার ওপর সামান্যতমও নির্ভর করে আছে, তবে বিজ্ঞদের বিচারে আমি নির্বোধ বা যুক্তিহীন হতে সানন্দে রাজি৷ নির্বোধ বলেই তো মুখে কুলুপ অাঁটিনি, যে কথা বলতে মানা সে কথা বলেছি পুরো একটি সমাজ আমাকে থু থু দিচ্ছে দেখেও তো সরে দাঁড়াইনি, নির্বোধ বলেই পিতৃতন্ত্রের রাঘব বোয়ালরা আমাকে পিষে মারতে আসছে দেখেও দৃঢ় দাঁড়িয়ে থেকেছি৷ আমার মূর্খতাই, আমার নির্বুদ্ধিতাই, আমার যুক্তিহীনতাই সম্ভবত আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ৷
