ধর্মের কথাও উঠেছে৷ আমি, যাঁরা আমাকে জানেন, জানেন যে, সব ধরনের ধর্মীয় দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলি৷ ধর্ম তো আগাগোড়াই পুরুষতান্ত্রিক৷ ধর্মীয় পুরুষ ও পুঁথির অবমাননা করলে সইবে কেন পুরুষতন্ত্রের ধারক এবং বাহকগণ! ওই মহাপুরুষরাই তো আমাকে দেশছাড়া করেছেন৷ সত্যের মূল্য আমি আমার জীবন দিয়ে দিয়েছি৷ আর কত মূল্য আমাকে দিতে হবে!
দাঙ্গার অজুহাত দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম নয়, এর আগে বাংলাদেশেও আমার বই নিষিদ্ধ হয়েছে৷ এই যে নিরন্তর দাঙ্গা হচ্ছে উপমহাদেশে, আমার বই বা বক্তব্য কিন্তু দাঙ্গার কোনও কারণ নয়৷ কারণ অন্য৷
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অতাচারে, গুজরাতের মুসলমান নিধনে, অসমে বিহারি নিগ্রহে, খ্রিস্টানদের ওপর হামলায়, পাকিস্তানে শিয়া-সুন্নি হানাহানিতে আমি আদৌ কোনও ঘটনা নই৷ অকিঞ্চিৎকর লেখক হলেও আমি মানবতার জন্যই লিখি, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল মানুষই যে সমান, সকলেরই যে সমান অধিকার মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার সে কথাটি হৃদয় দিয়ে লিখি৷ না, আমার লেখার কারণে দাঙ্গার মতো ভয়াবহ কোনও দুর্ঘটনা কোথাও ঘটে না৷ যদি কিছু ঘটে, সে আমার জীবনেই ঘটে৷ আমার লেখার কারণে শাস্তিএক আমাকেই পেতে হয়, অন্য কাউকে নয়৷ আগুন আমার ঘরেই লাগে৷ সকল গৃহ হারাতে হয় এই আমাকেই৷
পৃথিবীর প্রাচীনতম নির্যাতন
ক্রীতদাসপ্রথার শুরু থেকে ঘটনা ঘটছে। ক্রীতদাসরা যখন তুলো ক্ষেতে চাষের কাজ করত, দাসমালিকরা সেখানে প্রায়ই সশরীরে উপস্থিত হয়ে কিছু ক্রীতদাসীকে যৌনকর্মের জন্য তুলে নিয়ে যেত। ত্বক যাদের একটু কম কালো, সাধারণত তাদেরই পছন্দ করা হতো। মালিকরা যা চাইত, ক্রীতদাসীদের তাই করতে হতো। বাজারে নিয়ে মালিক তাদের চড়া দামে বিক্রি করে দিত, নয়ত যৌন ব্যবসার জন্য ভাড়া খাটাত, নয়ত সরাসরি পতিতালয়ে দরদাম করে নগদ টাকায় বিক্রি করত। আঠারো/উনিশ শতকে যে প্রথাটাকে বলা হতো ক্রীতদাসপ্রথা, বিংশ/একবিংশ শতকে সেই প্রথাকে বলা হচ্ছে পতিতাপ্রথা।
উনিশ শতকে ক্রীতদাসপ্রথার বিলুপ্তির সময় মানুষের ক্রয়—বিক্রয় নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল বিরাট বিতর্ক। ক্রীতদাসদের মুক্তির প্রশ্ন উঠলে সমাজের অনেক সাদা ভদ্রলোক মন্তব্য করেছিল, ‘আফ্রিকার কালো মানুষগুলো আসলে ক্রীতদাস হিসেবেই ভালো আছে। স্বাধীনতা উপভোগ করার কোনো অধিকার বা যোগ্যতা তাদের নেই। সত্যি কথা বলতে কী, এই ক্রীতদাসগুলোর সঙ্গে যত না মানুষের মিল, তার চেয়ে বেশি জন্তু—জানোয়ারের মিল।’
শুধু সাদারা নয়, অনেক ক্রীতদাসীও তখন ছিল, যারা এই প্রথার বিলুপ্তি চায়নি, বিশেষ করে সেই ক্রীতদাসীরা, যারা মালিকদের বাড়িতে রান্নাবান্না বা বাচ্চা—কাচ্চা দেখাশোনা বা ঘরদোর পরিষ্কারের কাজ করত। তাদের অবস্থা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা চাষের ক্ষেতের ক্রীতদাসীদের চেয়ে ভালো ছিল মালিকদের বাড়ির খাবার খেয়ে, যদিও উচ্ছিষ্ট, তৃপ্তই ছিল বাড়ির ক্রীতদাসীরা। আসলে, ক্রীতদাসীর জীবন ছাড়া অন্য কোনো জীবনের কথা তারা নিজেদের জন্য ঠিক কল্পনাও করতে পারত না। বাড়ির ক্রীতদাসীরা না চাইলেও ক্ষেতের ক্রীতদাসীরা কিন্তু ক্রীতদাসপ্রথার বিলুপ্তি চেয়েছিল।
আমরা আজ সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি করছি! পতিতাপ্রথার পক্ষে সাধারণত যারা মুখর, তারা নিজেরা কখনো পতিতা ছিল না বা যৌন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল না, পতিতালয়ের বা পতিতা প্রথার নির্যাতন তাদের সইতে হয়নি। যৌন ব্যবসায় জড়িত এমন অনেক মেয়েও পতিতাপ্রথার পক্ষে কথা বলছে, তারা বলছে, ‘অন্য যে কোনো শ্রমের মতো পতিতাবৃত্তিও শ্রম।’ আগ বাড়িয়ে এও কেউ কেউ বলছে যে এই শ্রম নাকি সমাজে মেয়েদের ক্ষমতায়নে সাহায্য করছে। ‘কলগার্ল’ হিসেবে যারা কাজ করে, ‘ম্যাডাম’—এর ভূমিকায় যারা, তাদের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে রাস্তার পতিতাদের চেয়ে ভিন্ন। তাই পতিতাদেরও উঁচু শ্রেণী, মাঝারি শ্রেণী, আর নিচু শ্রেণীতে ভাগ করার একটা প্রবণতা দেখা দেয়। এ কিন্তু অনেকটা সেই ক্রীতদাসীর শ্রেণীভাগের মতো। বাড়ির ক্রীতদাসীরা উঁচু শ্রেণীর ক্রীতদাসী, আর ক্ষেতে খাটা ক্রীতদাসী নিচু শ্রেণীর ক্রীতদাসী। তা ঠিক, তবে সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য হলো তারা সবাই ক্রীতদাসী, এক মালিকের অধীনেই তাদের দাসত্ব করতে হয়েছে। দাসত্ব চকচক করলেই দাসত্বের সংজ্ঞা পাল্টে যায় না। যে মেয়েরা আজ পতিতাপ্রথার ভেতরে থেকে এই প্রথার পক্ষে বলছে, এই প্রথা থেকে তারা না বেরিয়ে এলে তাদের পক্ষেও বোঝা সম্ভব নয় প্রথাটি ঠিক কী। সুবিধে পাওয়া ওই ‘বাড়ির ক্রীতদাসী’দেরও ক্রীতদাসপ্রথার বাইরে এসে বুঝতে হয়েছে ক্রীতদাসপ্রথাটা সত্যি কী ছিল।
ক্রীতদাসপ্রথা আর পতিতাপ্রথার মূলে আছে খাঁটি দাসত্ব। শুধু পরিচয়টা দু’ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে হয়। পতিতাপ্রথার জন্য দরকার যৌন পরিচয়, আর ক্রীতদাসপ্রথার জন্য দরকার বর্ণপরিচয়। এই দুই প্রথা ও প্রতিষ্ঠান একই প্রকৃতির। একই প্রক্রিয়ায় মানুষের ওপর শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার চালানো হয়, মানুষকে অসম্মানিত, অপমানিত, নির্যাতিত, নিগৃহীত করা হয়।
এই পৃথিবীতে মেয়েদের বিরুদ্ধে একটা যৌনযুদ্ধ চলছে, দীর্ঘকাল এই যুদ্ধটা চলছে। এটাকে ‘পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশা’ বলে লোককে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা হয় বটে, আসলে এটা কিন্তু মেয়েদের বিরুদ্ধে ‘পৃথিবীর প্রাচীনতম নির্যাতন।’ শুধু মেয়েদের বিরুদ্ধে বলাটা ঠিক নয়, শিশুদের বিরুদ্ধেও বটে। আজ বিশ্বের প্রায় সর্বত্র শিশুদের জোরজবরদস্তি করে, ভয় দেখিযে, ধর্ষণ করে, মেরে আধমরা করে যৌনক্রীতদাসী বানানো হচ্ছে। পুরুষের যৌনক্ষুধা মেটাতে, পুরুষের শরীরকে কিছুক্ষণের জন্য পুলক দিতে লক্ষ কোটি অসহায় মেয়ে ও শিশুকে বেঁচে থাকার সর্বসুখ বিসর্জন দিতে হচ্ছে, মানুষ হয়েও মানুষের ন্যূনতম অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হতে বাধ্য হচ্ছে।
