বইটি লিখেছি বলে বাংলাদেশের একজন লেখক আমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন, কলকাতাতেও একজন বাংলাদেশি লেখকের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন৷ কেবল মানহানির মামলা করেই ক্ষান্তহননি, দুজনই আমার বইটি নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন৷ আমি ঠিক বুঝি না, কী করে একজন লেখক আরেকজন লেখককের বই নিষিদ্ধ করার দাবি করতে পারেন৷ কী করে সমাজের সেই শ্রেণীর মানুষ, যাঁদের দায়িত্ব মুক্তচিন্তা আর বাক স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করা, মৌলবাদীদের মতো আচরণ করেন৷ আমাকে নিয়ে এ যাবৎ অনেক মিথ্যে, অনেক কল্পকাহিনী লেখা হয়েছে, আমি তো তাঁদের কোনও লেখাই নিষিদ্ধ করার দাবি নিয়ে আদালতে দৌড়োইনি! আমি বিশ্বাস করি, ভলতেয়ার যা বলেছিলেন, আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত না হতে পারি, কিন্তু আমি আমৃতু্য তোমার কথা বলার অধিকারের জন্য লড়ে যাবো৷ কেন আমাদের বিদগ্ধ লেখকগণ বাক স্বাধীনতার পক্ষে এই চরম সত্যটি অস্বীকার করতে চান!
পৃথিবীর কত লেখকই তো লিখে গেছেন নিজেদের জীবনের কথা৷ জীবন থেকে কেবল পরিশুদ্ধ জিনিস ছেঁকে নিয়ে তাঁরা পরিবেশন করেননি৷ জীবনে ভ্রান্তি থাকে, ভুল থাকে, জীবনে কালি থাকে, কাঁটা থাকে, কিছু না কিছু থাকেই, সে যদি মানুষের জীবন হয়৷ যাঁদের মহামানব বলে শ্রদ্ধা করা হয়, তাঁদেরও থাকে৷ ক্রিশ্চান ধর্মগুরু আগুস্তঁ (৩৩৫-৪৩০) নিজেই লিখে গেছেন তাঁর জীবনকাহিনী, আলজেরিয়ায় তিনি যেভাবে জীবন কাটাতেন, যেরকম অসামাজিক, অনৈতিক, বাঁধহীন জীবন— কিছুই প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি৷ তাঁর যৌ* স্বেচ্ছাচারিতা, উচ্ছৃঙ্খলতা, জারজ সন্তানের জন্ম দেয়ার কোনও কাহিনীই গোপন করেননি৷
মহাত্মা গান্ধীও তো স্বীকার করেছেন কী করে তিনি তার বিছানায় ন্যাংটো মেয়েদের শুইয়ে নিজের ব্রাহ্মচারিতার পরীক্ষা করতেন৷ ফরাসি লেখক জ্যাঁ জ্যাক রুশোর (১৭১২-১৭৭৮) কথা ধরি, তাঁর স্বীকারোক্তি গ্রন্থটিতে স্বীকার করে গেছেন জীবনে কি কি করেছেন তিনি৷ কোনও গোপন কৌটোয় কোনও মন্দ কথা নিজের জন্য তুলে রাখেননি৷ সেই আমলে রুশোর আদর্শ মেনে নেয়ার মানসিকতা খুব কম মানুষেরই ছিল৷ তাতে কি! তিনি তার পরোয়া না করে অকাতরে বর্ণনা করেছেন নিজের কুকীর্তির কাহিনী৷ মাদমাজোল গতোঁ তো আছেই, আরও রমণীকে দেখে, এমনকী মাদাম দ্য ওয়ারেন, যাঁকে মা বলে ডাকতেন, তাঁকে দেখেও বলেছেন, যে, তাঁর যৌ*কাঙ্ক্ষা জাগত৷ বেঞ্জামিন ফ্ল্যাঙ্কলিন (১৭০৯-১৭৯০) তাঁর আত্মকথায় যৌবনের উতল উন্মাতাল সময়গুলোর বর্ণনা করেছেন, জারজ পুত্র উইলিয়ামকে নিজের সংসারে তুলে এনেছিলেন, তাও বলেছেন৷
বার্টরান্ড রাসেল তাঁর জীবনীগ্রন্থে লিখে গেছেন বিভিন্ন রমণীর সঙ্গে তাঁর অবৈধ সম্পর্কের কথা৷ টি.এস. এলিয়টের স্ত্রী ভিভিয়ানের সঙ্গে, লেডি অটোলিন মোমেলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা কে না জানে! লিও তলস্তয় লিখেছেন চৌদ্দ বছর বয়সেই তাঁর গণিকাগমনের কাহিনী, সমাজের নিচুতলার মেয়ে, এমনকী পরস্ত্রীদের সঙ্গে তার যৌ* সম্পর্ক, এমনকী তাঁর যৌ*রোগে ভোগার কথাও গোপন করেননি৷ এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন তাঁরা, সমাজ যা মেনে নিতে পারে না, এমন তথ্য পাঠককে শোনাতে গেলেন! শোনানোর নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে৷ নিজেদের আসল পরিচয়টি তাঁরা লুকোতো চাননি অথবা এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁদের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাই শুনিয়েছেন৷ এতে কি তাঁদের জাত গিয়েছে নাকি তাঁদের আজ মন্দ বলে কেউ? কেউই তাঁদের মন্দ বলে না, যে অবস্থানে ছিলেন তাঁরা সে অবস্থানে তো আছেনই, বরং সত্য প্রকাশ করে নিজেদের আরও মহিমান্বিত করেছেন৷
পশ্চিমি দেশগুলোয় নারী পুরুষ সম্পর্কটি বহুকাল হলো আর আড়াল করার ব্যাপার নয়৷ হালের ফরাসি মেয়ে ক্যাথারিন মিলে তার নিজের কথাই লিখেছেন— The Sexual Life of Catherine M. বইটিতে৷ পুরো বইজুড়ে লিখেছেন ষাটের দশকে অবাধ যৌ*তার যুগে তাঁর বহুপুরুষ-ভোগের রোমাঞ্চকর কাহিনী৷ পুরো বইজুড়ে মৈথুনের নিখুঁত বর্ণনা৷ এতে কী হয়েছে? বইটিকে কি সাহিত্যের বইয়ের তাকে রাখা হয়নি? হয়েছে৷ গ্রাব্রিয়েল গর্সিয়া মার্কেজও Living to Tell the Tale and Memories of My Melancholy Whores বইটিতে পরনারীদের সঙ্গে তার লীলাখেলার কিছুই বলতে বাদ রাখেননি৷ মার্কেজকে কি কেউ মন্দ বলবে তাঁর জীবনটির জন্য, নাকি কেউ আদালতে যাবে বইটি নিষিদ্ধ করতে?
পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই বিখ্যাত মানুষদের জীবনী প্রকাশ হচ্ছে৷ বছরের পর বছর ধরে গবেষণা করে সেসব জীবনী লিখছেন জীবনীকাররা৷ খুঁড়ে খুঁড়ে বের করা হচ্ছে সব গোপন খবর৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোপন কথাটিও তো রইছে না গোপনে৷ বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে কথা বলেও তিনি কেন নিজের বালিকা কন্যাটির বিয়ের আয়োজন করেছিলেন, সেই কারণটি মানুষ আজ জানছে৷ প্রশ্ন হলো, এইসব তথ্য কি আদৌ পাঠকের জানার প্রয়োজন? কে কবে কোথায় কী করেছিলেন, কী বলেছিলেন, জীবনাচরণ ঠিক কেমন ছিল কার, তা জানা যদি নিতান্তই অবান্তর হতো, তবে তা নিয়ে গবেষণা হয় কেন? জীবনীকার গবেষকরা যেসব মানুষ সম্পর্কে অজানা তথ্য জানাচ্ছেন, সেসব তথ্যের আলোয় শুধু মানুষটি নন, তাঁর সৃষ্টিরও নতুন করে বিচার ও বিশ্লেষণ সম্ভব হচ্ছে৷
