নিজেকে যদি উন্মুক্ত না করি, নিজের সবটুকু যদি প্রকাশ না করি, বিশেষ করে জীবনের সেইসব কথা বা ঘটনা যা আমাকে আলোড়িত করেছে, যদি প্রকাশ না করি নিজের ভাল মন্দ, দোষ গুণ, শুভ অশুভ, আনন্দ বেদনা, উদারতা ক্রুরতা, তবে আর যাই হোক সেটি আত্মজীবনী নয়, অন্তত আমার কাছে নয়৷ কেবল সাহিত্যের জন্য সাহিত্যই আমার কাছে শেষ কথা নয়, সততা বলে একটি ব্যাপার আছে, সেটিকে আমি খুব মূল্য দিই৷
যেরকমই জীবন হোক আমার, যে রকমই নিকৃষ্ট, যে রকমই নিন্দার্হ, নিজের জীবন কাহিনী লিখতে বসে আমি কিন্তু প্রতারণা করছি না নিজের সঙ্গে৷ পাঠক আমার গল্প শুনে আমাকে ঘৃণা করুক, কি আমাকে ছুঁড়ে ফেলুক, এটুকুই আমার সন্তুষ্টি যে আমার পাঠকের সঙ্গে আমি প্রতারণা করছি না৷ আত্মজীবনী নাম দিয়ে পাঠককে কোনও বানানো গল্প উপহার দিচ্ছি না৷ জীবনের সব সত্য, সত্য সবসময় শোভন বা সুন্দর না হলেও সঙ্কোচহীন বলে যাচ্ছি৷ জীবনে যা কিছু ঘটে গেছে, তা তো ঘটেই গেছে, তা তো আমি বদলে দিতে পারবো না, আর স্বীকারও করতে পারবো না এই বলে যে, যা ঘটেছে, তা আসলে ঘটেনি৷ সুন্দরকে যেমন পারি, অসুন্দরকেও তেমন আমি স্বীকার করতে পারি৷
চারদিক থেকে এখন বিদ্রুপের তীর ছোঁড়া হচ্ছে আমাকে লক্ষ্য করে, অপমান আর অপবাদের কাদায় আমাকে ডুবিয়ে দেয়া হচ্ছে— এর কারণ একটিই, আমি সত্য কথা বলেছি৷ সত্য সবসময় সবার সয় না৷ আমার মেয়েবেলা আর উতল হাওয়ার সত্য সইলেও দ্বিখণ্ডিতর সত্য সবার সইছে না৷ আমার মেয়েবেলায় আমাকে অপদস্থ করার কাহিনী যখন বর্ণনা করেছি, সেটি শুনে লোকে চুক চুক করে দুঃখ করেছে আমার জন্য, উতল হাওয়ায় যখন স্বামী দ্বারা প্রতারিত হয়েছি, তখনও আহা আহা করেছে আমার জন্য, আর দ্বিখণ্ডিতয় যখন বর্ণনা করেছি একাধিক পুরুষের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা, তখন ছিঃ ছিঃ করতে শুরু করেছে৷ এর অর্থ তো একটিই, যে, যতক্ষণ একটি মেয়ে অত্যাচারিত এবং অসহায়, যখনই সে দুর্বল এবং যখন তার দুঃসময়, ততক্ষণই তার জন্য মায়া জাগে, ততক্ষণই তাকে ভালো লাগে৷ আর যখনই মেয়েটি আর অসহায় নয়, অত্যাচারিত নয়, যখনই সে মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়ায়, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, নিজের শরীরের এবং মনের স্বাধীনতার জন্য সমাজের নষ্ট নিয়মগুলো ভাঙে, তখন তাকে আর ভালো লাগে না, বরং তার প্রতি ঘৃণা জন্মে৷ আমাদের সমাজের এই চরিত্র আমি জানি, জেনেও কোনও দ্বিধা করিনি নিজেকে জানাতে৷
দ্বিখণ্ডিত বইটি নিয়ে বিতর্কের একটি বড় কারণ, যৌ*ন স্বাধীনতা৷ আমাদের এই সমাজের বেশিরভাগ মানুষ যেহেতু পুরুষতান্ত্রিক সংস্কারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, তাই একজন নারীর যৌ* স্বাধীনতার অকপট ঘোষণায় বিরক্ত, ক্ষুব্ধ, ক্রুব্ধ৷ যে যৌ* স্বাধীনতার কথা আমি বলি, তা কেবল আমার বিশ্বাসের কথাই নয়, নিজের জীবন দিয়ে সেই স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেছি, অথচ যে কোনও পুরুষ আমাকে কামনা করলেই পাবে না৷ এই সমাজ এখনও কোনও নারীর এমন স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত নয়৷ প্রস্তুত নয় এটা শিরোধার্য করতে, যে, কোনও নারী তার ইচ্ছেমতো পুরুষকে সম্ভোগ করতে পারে এবং তা করেও কঠোরভাবে যৌ*-সতী বজায় রাখতে পারে৷
আমাদের নামী-দামী পুরুষ-লেখকরা আমাকে এখন মহানন্দে পতিতা বলে গাল দিচ্ছেন৷ গাল দিয়ে নিজেরাই প্রমাণ করছেন— কী ভীষণ নোংরা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সুবিধেভোগী পুরুষ-কর্তা তাঁরা৷ পতিতাকে তাঁরা ভোগের জন্য ব্যবহার করেন, আবার পতিতা শব্দটিকে তাঁরা সময় সুযোগমতো গাল হিসেবেও ব্যবহার করেন৷ নারীকে যৌ*-দাসী হিসেবে ব্যবহার করার নিয়ম আজকের নয়৷ যদিও দ্বিখণ্ডিত বইটিতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে আমার লড়াই এর কথা বলেছি, বলেছি নারী আর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সমাজের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কথা, কেউ কিন্তু তা নিয়ে একটি কথাও বলছেন না, যারাই বলছেন, বলছেন যৌ*তার কথা৷ আমার কোনও কষ্টের দিকে কান্নার দিকে কারও চোখ গেল না, চোখ গেল শুধু যৌ*তার দিকে৷ চোখ গেল আমার সঙ্গে পুরুষের সম্পর্কগুলোর দিকে৷ যৌ*তার মতো গভীর গোপন কুৎসিত আর কদর্য বিষয় নিয়ে আমার মুখ খোলা স্পর্ধার দিকে চোখ৷
পৃথিবীর ইতিহাসে, কোনও অন্ধকার সমাজে যখনই কোনও নারী পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে উঠেছে, নিজের স্বাধীনতার কথা বলেছে, ভাঙতে চেয়েছে পরাধীনতার শেকল, তাকেই গাল দেয়া হয়েছে পতিতা বলে৷ অনেক আগে নষ্ট মেয়ের নষ্ট গদ্য বইটির ভূমিকায় আমি লিখেওছিলাম— নিজেকে এই সমাজের চোখে নষ্ট বলতে আমি ভালবাসি৷ কারণ একথা সত্য যে, যদি কোনও নারী নিজের দুঃখ-দুর্দশা মোচন করতে চায়, যদি কোনও নারী কোনও ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের নোংরা নিয়মের বিপক্ষে রুখে দাঁড়ায়, তাকে অবদমনের সকল পদ্ধতির প্রতিবাদ করে, যদি কোনও নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সজাগ হয় তবে তাকে নষ্ট বলে সমাজের ভদ্রলোকেরা৷ নারীর শুদ্ধ হবার প্রথম শর্ত নষ্ট হওয়া৷ নষ্ট না হলে এই সমাজের নাগপাশ থেকে কোনও নারীর মুক্তি নেই৷ সেই নারী সত্যিকার সুস্থ ও শুদ্ধ মানুষ, লোকে যাকে নষ্ট বলে৷
আজও একথা আমি বিশ্বাস করি, যে, কোনও নারী যদি তার সত্যিকার স্বাধীনতা অর্জন করতে চায়, যদি সত্যিকার মানুষ হতে চায়, তবে এই সমাজের চোখে তাকে নষ্ট হতে হয়৷ এই নষ্ট সমাজ থেকে নষ্ট বা পতিতা উপহার পাওয়া একজন নারীর জন্য কম সৌভাগ্যের ব্যাপার নয়৷ এ যাবৎ যত পুরস্কার আমি পেয়েছি, পতিতা উপাধির পুরস্কারটিকেই আমি সর্বোত্তম বলে বিচার করছি৷ পুরুষতন্ত্রের নষ্টামির শরীরে সত্যিকার আঘাত করতে পেরেছি বলেই এই উপাধিটি আমি অর্জন করেছি৷ এ আমার লেখক-জীবনের, আমার নারী-জীবনের, আমার দীর্ঘকালের সংগ্রামের সার্থকতা৷
