সমাজের সাতরকম সংস্কারের ধার ধারেনি মেয়ে, বারবার তার পতনই তাকে দাঁড়াতে শিখিয়েছে, বারবার তার হোঁচট খাওয়াই তাকে হাঁটতে শিখিয়েছে, বারবার তার পথ হারানোই তাকে পথ খুঁজে দিয়েছে, ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে যে নতুন একটি বোধ আর বিশ্বাসকে সে জন্ম নিতে দেখেছে, তা হলো, তার নিজের জীবনটি কেবল তারই, অন্য কারও নয়৷ এই জীবনটির কর্তৃত্ব করার অধিকার কেবল তারই৷ আমি মেয়েটির সেই গড়ে ওঠার গল্প বলেছি— যে পরিবেশ প্রতিবেশ তাকে বিবর্তিত করেছে, তাকে নির্মাণ করেছে, পিতৃতন্ত্রের আগুনে পুড়ে পুড়ে শেষ পর্যন্ত যে মেয়ে দগ্ধ হল না, পরিণত হল ইস্পাতে, সেই গল্প৷
আমি কি অন্যায় কিছু করেছি? আমার কাছে অন্যায় বলে মনে না হলেও আজ অনেকের কাছে এটি ঘোরতর অন্যায়৷ আমি ভয়াবহরকম অপরাধ করেছি গল্পটি বলে৷ অপরাধ করেছি বলে জনতার আদালতের কাঠগড়ায় আজ আমাকে দাঁড়াতে হচ্ছে৷ অপরাধ হয়তো হতো না যদি না আমি প্রকাশ করতাম যে, যে মেয়েটির গল্প আমি বলেছি সে মেয়েটি আমি, আমি তসলিমা৷ কল্পনায় আমি যথেচ্ছাচার করতে পারি, মিথ্যে মিথ্যে আমি লিখতে পারি কোনও সাধারণ মেয়ের আর দশটি মেয়ে থেকে ভিন্ন হওয়ার গল্প, ও না হয় ক্ষমা করে দেয়া যায় কিন্তু এই বাস্তব জগতটিতে দাঁড়িয়ে রক্তমাংসের মেয়ে হয়ে কোন স্পর্ধায় আমি ঘোষণা করছি যে, ওই মেয়েটি আমি, আমি দুঃখ ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি, আমার যেমন ইচ্ছে তেমন করে নিজের জীবনটি যাপন করব বলে পণ করেছি, আমার এই দুর্বিনীত আচরণ লোকে মানবে কেন! এরকম স্পর্ধা কোনও মেয়েকেই মানায় না৷ বড় বেমানান আমি পুরো পিতৃতান্ত্রিক পরিবেশে৷
আমার প্রিয় দেশটিতে, প্রিয় পশ্চিমবঙ্গে আজ আমি একটি নিষিদ্ধ নাম, একটি নিষিদ্ধ মানুষ, একটি নিষিদ্ধ বই৷ আমাকে উচ্চারণ করা যাবে না, আমাকে ছোঁয়া যাবে না, আমাকে পড়া যাবে না৷ উচ্চারণ করলে জিভ নষ্ট হবে, ছুঁলে হাত নোংরা হবে, পড়লে গা রি রি করবে৷
এরকমই তো আমি৷ সে কি আজ থেকে!
দ্বিখণ্ডিত লেখার কারণে যদি সহস্র খণ্ড হতে হয় আমাকে, তবু আমি স্বীকার করতে চাই না যে, আমি কোনও অপরাধ করেছি৷ আত্মজীবনী লেখা কি অপরাধ? জীবনের গভীর গোপন সত্যগুলো প্রকাশ করা কি অপরাধ? আত্মজীবনীর প্রধান শর্ত তো এই যে জীবনের সবকিছু খুলে মেলে ধরব, কোনও গোপন কথা কোনও কিছুর তলায় লুকিয়ে রাখব না৷ যা কিছু গোপন, যা কিছু অজানা, তা বলার জন্যই তো আত্মজীবনী৷ এই শর্তটাই সততার সঙ্গে পালন করতে চেষ্টা করছি৷ আত্মজীবনীর প্রথম দুই খণ্ড আমার মেয়েবেলা আর উতল হাওয়া নিয়ে কোনওরকম বিতর্ক না হলেও তৃতীয় খণ্ডটি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিতর্ক শুরু হয়েছে৷
এই বিতর্ক কিন্তু আমি সৃষ্টি করিনি, করেছে অন্যরা৷ বিতর্ক হওয়ার মতো উত্তেজক বিষয়, অনেকেই বলেছেন, আমি বেছে নিয়েছি৷ এই প্রশ্ন আর যখনই উঠুক, আত্মজীবনীর ক্ষেত্রে ওঠা উচিত নয়৷ কারণ সবরকম অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে আমার বড় হওয়া বা বেড়ে ওঠার ঘটনাগুলোই আমি বর্ণনা করেছি৷ আমার দর্শন-অদর্শন, আমার হতাশা-আশা, আমার সুন্দর, আমার কুৎসিত, আমার শোক, সুখ, আমার ক্রোধ আর কান্নাগুলোর কথাই বলেছি৷ কোনও স্পর্শকাতর বা উত্তেজক বিষয় শখ করে বেছে নিইনি, আমার জীবনটিই আমি বেছে নিয়েছি জীবনী লেখার জন্য৷ এই জীবনীটি যদি স্পর্শকাতর আর উত্তেজক হয়, তবে এই জীবনের কথা লিখতে গিয়ে আমি অস্পর্শকাতর আর অনুত্তেজক বিষয় কোত্থেকে পাবো?
বিতর্ক তৈরি করার জন্য বা চমক সৃষ্টি করার জন্য আমি নাকি বইটি লিখেছি৷ যেন বদ একটি কারণ থাকতেই হবে বই লেখার পেছনে৷ যেন সততা আর সরলতা কোনও কারণ হতে পারে না৷ যেন সাহস, যে সাহসের প্রশংসা করা হত, যে, আমি সাহস করে নাকি অনেক কিছুই বলি বা করি, সেই সাহসটিও এখন আর কোনও কারণ হতে পারে না৷ আমার লেখা নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়৷ লেখালেখির শুরু থেকেই তা হচ্ছে৷ এটিই কি মোদ্দাকথা নয় যে, পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজের সঙ্গে আপোস না করলেই বিতর্ক হয়৷
আত্মজীবীনীর সংজ্ঞা অনেকের কাছে অনেকরকম৷ বেশিরভাগ মানুষই সেই আত্মজীবনীকে গ্রহণ করতে অভ্যস্ত, যে জীবনীটি ভূরি ভূরি ভালো কথা আর চমৎকার সব আদর্শ উত্থাপন করে৷ সাধারণত মনীষীরাই আত্মজীবনী লিখে যান অন্যকে নিজের জীবনাদর্শে আলোকিত করতে, সত্যের সন্ধান দিতে, পথ দেখাতে৷ আমি কোনও জ্ঞানী-গুণী মানুষ নই, কোনও মনীষী নই, মহামানব নই, কিছু নই, অন্ধজনে আলো দেয়ার মহান উদ্দেশ্য নিয়ে আমি জীবনী লিখছি না৷ আমি কেবল ক্ষুদ্র একটি মানুষের ক্ষতগুলো, ক্ষোভগুলো খুলে দেখাচ্ছি৷
কোনও বড় সাহিত্যিক বা বড় কোনও ব্যক্তিত্ব না হলেও একথা তো অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে, খুব বড় বড় ঘটনা ঘটে গেছে আমার জীবনটিতে৷ আমার বিশ্বাস এবং আদর্শের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ যদি পথে নামে আমার ফাঁসির দাবি নিয়ে, যদি ভিন্ন মতের কারণে একের পর এক আমার বই নিষিদ্ধ করা হয়, যদি সত্য কথা বলার অপরাধে একটি রাষ্ট্রযন্ত্র আমার নিজের দেশে বাস করার অধিকার হরণ করে নেয়, তবে নিশ্চয়ই জীবনটি একটি সাদামাটা জীবন নয়! এই জীবনের কাহিনী অন্যের মুখে নানা ঢঙে নানা রঙে প্রচারিত যখন হচ্ছেই, তখন আমি কেন দায়িত্ব নেব না জীবনটির আদ্যোপান্তবর্ণনা করতে! আমার এই জীবনটিকে আমি যত বেশি জানি, তত তো আর অন্য কেউ জানে না৷
